Wednesday, September 9, 2026

নীলুবউয়ে জেল্লা


নীলুবাবুর সে কী জেল্লা তুমি যদি দেখতে। ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি, তকতকে গালে ওল্ডস্পাইসের মিঠে সুবাস। কবজির চামড়ার ব্যান্ড সাদা ডায়্যালের ঘড়িটা সস্তা হলেও রুচিশীল; ভদ্রলোকের কবজি ও ব্যক্তিত্ব আলো করে রেখেছে যেন৷ বুক পকেটে শৌখিন ফাউন্টেন পেন। মুখে স্মিত হাসি যার জেল্লা সহজেই মাত দিয়েছে ঠোঁটের মিঠে পান চেবানো মোলায়েম লালকে। সন্ধেয় শ্যাম্পু করে বেরিয়েছেন অতএব নরম চুল ফুরফুরে ঠিক তার মেজাজের মতই।

ট্যাক্সিওলাকে একটা রহিসি টিপ দিয়ে আঙুলের হাওয়া-সেলামে টাটা বলে দুলকি চালে গিয়ে ঢুকলেন পেল্লায় বাড়িটায়। সাতপুরনো কোল্যাপ্সিবল গেটওলা লিফট ঠেঙিয়ে সোজা উঠলেন সাত তলায়। অবাঙালি লিফটম্যান দরজা খুলে দিতে ধারালো মেজাজে একটা বাইশ ক্যারেটের "শুক্রিয়া" বলে বেরিয়ে এলেন। সাতশো সাত নম্বর ফ্ল্যাটে বেল বাজালেন। মুখের হাসিটা তখন উজ্জ্বলতর।

বেরিয়ে এলো সোমা।
- নীলু, আজ আমার মন ভালো নেই। তুমি আজ এসো।
- ওহ, তাই কী? মনের সমস্যা? শিঙাড়া নিয়ে আসি? তোমার ফ্ল্যাটের নীচেই যে ভদ্রলোক চপ শিঙাড়া ভাজেন তার সঙ্গে গেলবার চমৎকার আলাপ জমিয়ে গেছি..।
- প্লীজ নীলু। তোমার মত আনন্দ-উল্লাস আমার জীবনে নেই। আর ঝামেলা যা আছে তা শিঙাড়ায় দূর হওয়ার নয়। প্লীজ৷ কিছু মনে কোরো না, আজ তোমায় কিছুতেই ভিতরে ডাকতে পারছি না।
- ওহ আই সী। নোউ প্রব্লেম সোমা। বাবলুকে একবার ডেকে দেবে? এই ফ্যান্টাসটিক গল্পের বইটা গতকাল কলেজ স্ট্রিটে দত্তর দোকানে জাস্ট জলের দরে পেলাম৷ টুক করে তাই...।
- দাও। আমি দিয়ে দেব।
- ওহ, শ্যিওর। মৌস্ট কাইন্ড অফ ইউ। তা'হলে আজ আমি..।
- নীলু। কোর্ট স্পষ্ট বলেছে। মাসে একবার বাবলুর সঙ্গে..একবার মাসে। প্রতি হপ্তায় নয়। এত বছরের ভুল হঠাৎ বইয়ে শিঙাড়ায় কাটে নীলু?
- অফ কৌর্স। অফ কৌর্স। কোর্টের ইন্সট্রাকশনের ব্যাপারে আমি কিন্তু জেনুইনলি সিরিয়াস। অলরাইট দেন...শিঙাড়া তা'হলে বরং পোস্টপোন করি।
- এসো আজ।

***

মুশকিল হল চাকরি না থাকার ব্যাপারটা সোমাকে বলা হলো না। অবশ্য সোমার করার কিছু নেই এই বিষয়ে। সুলভে ঢুকে চোখ মুখ ভালো করে ধুয়ে বেরিয়ে এলেন নীলুবাবু। চোখের লাল ভাবটা জলে দেওয়া যায় না৷ তা'ছাড়া নিজের হাবিজাবি দু:খ নিয়ে নিজের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতে হলে ফুলকপির শিঙাড়ায় কাজ হবে না। সস্তা, পুষ্টিকর ও চোখের লালে লাল মার্কা সলিউশন চাই। "থ্যাঙ্ক গউড এ অঞ্চলের সবচেয়ে সস্তা পানশালার ম্যানেজারটির সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছি ক'দিন আগেই"। নিজের একপেশে হাসিটা হেসে বুকপকেট থেকে একটা মশলার কৌটো বের করে দু'চারটে এলাচদানা মুখে ফেলে একটা রোম্যান্টিক ফিল্মি গান ধরলেন নীলুবাবু।

হাবুডুবুকুমার


- এ যে সাংঘাতিক বৃষ্টি।
- ফোরকাস্ট বলছে রাতভর চলবে।
- সর্বনাশ।
- সর্বনাশ কীসের? গরমে জেরবার অবস্থা হয়েছিল। এইবারে দু'দিন স্বস্তি।
- উঁহ্! স্বস্তি না ছাই! গোটা রাত বৃষ্টি হলে আমাদের বাড়ির সামনে হাঁটুজল থাকবে। সে জল ভেঙে গিয়ে মেন রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে তারপর বাস। এ'দিকে ইন্টারভিউয়ের জন্য সেই দামী প্যান্টটা ইস্তিরি করে রেখেছি, সে'টার বারোটা বাজুক আর কী।
- উফ। বিয়ের আগে কত ইন্টারভিউ তুমি দিয়েছিলে। তখন তোমায় এত নার্ভাস দেখিনি। অথচ এই কালকের ব্যাপারটা নিয়ে..।
- তখন সবে পাশ করেছি। শরীরে তাজা রক্ত। তোমার প্রেমে হাবুডুবু, বিয়েটা আর্জেন্টলি না করলেই নয়। সে সময়টাই আলাদা ছিল। আর এখন..বুড়ো বয়সে এসে চাকরিটা গেলো। নতুন করে সব কিছু..এ'বয়সে এসে আর যাই হোক চালিয়ে খেলা যায় না। কাজেই নার্ভাস না হয়ে উপায় কী বলো।
- অসীমদার অফারটা নিয়ে ভাবলে?
- তোমার কি মত? ঘুষ দিয়ে জোটানো চাকরি...ঠিক হবে?
- তিনমাস সংসার চালানোর টাকা আছে। আমার টিউশনির টাকায় না হয় আরো কিছুদিন টানা গেলো। তারপর আমায় জিজ্ঞেস করলে কী বলব জানি না। তবে আজ অন্তত মনে হচ্ছে তোমার ও পথে না যাওয়াই ভালো।
- অতএব কাল ইন্টারভিউ।
- স্মার্টলি হাফপ্যান্ট পরে বেরোও। ব্যাগে ফর্মাল প্যান্ট জুতো গামছা। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে না হয়..।
- কোয়ালিফিকেশনের দিক থেকে তো কমতি নেই। কিন্তু কনফিডেন্সটা কিছুতেই পাচ্ছি না। আসলে দুম করে এ'ভাবে এই বয়সে চাকরিটা নট হয়ে যাওয়ায়..।
- আমায় ডিভোর্স দাও। তারপর আবার আমার প্রতি সেই ছেলেবেলার মত হাবুডুবু প্রেমে পড়ো। দ্যাখো আবার তাজা রক্তের সাপ্লাই পাও কিনা। তা'তে যদি আবার ইন্টারভিউ জয়ের কনফিডেন্স ফিরে আসে।
- কিছু বললে? সরি। নিজের স্ট্রেন্থ আর উইকনেস কী বলব সে'টা মনে মনে একটু ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। কী বললে আর একবার বলো দেখি..।
- নাহ্। কনফিডেন্স জিনিসটা অল্পবয়সেই তোমায় মা্নাতো। তবে ভীতু মানুষরা কিন্তু নেহাৎ ফেলনা নয়। সংসারে অফিসে সর্বত্র তাদের প্রয়োজন। সবাই যদি সিনা চওড়া করে ঘুরে বেড়ায় তা'হলে ঠোকাঠুকিতেই দিন যাবে। কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না।
- ভীতুরও কদর আছে বলছ?
- আলবাত আছে।
- তাই হবে। কনফিডেন্স ব্যাপারটাই ওভাররেটেড।
- ষোলো বছর আগে ভিক্টোরিয়ার সামনে প্রথমবার হাত টেনে ধরার সময় একবারও মনে হয়নি যে কনফিডেন্স ব্যাপারটা ওভাররেটেড?
- সরি। কিছু বলছিলে? ট্রু লিডারশীপ কাকে বলে তা নিয়ে একটা মারাকাটারি লাইন ভাবছিলাম। কাল ইন্টারভিউয়ে সুযোগ বুঝে সে'টা নামাতে পারলেই কেল্লাফতে। তা, বলো না। কিছু বলছিলে?
- তেমন কিছু না। ভাবছিলাম তুমি হয় নিপাট হাবাগোবা নার্ভাস একটা মানুষ। নয়তো একটি হাড়বজ্জাত।
- হাবাগোবা ও বজ্জাত; একটাই স্পেক্ট্রামের দু'টো দিক। আর সে স্পেক্ট্রামের ঠিক মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে নির্ভীক চিরযুবক প্রেমিক; ভিক্টোরিয়া আলো করা শ্রী শ্রী হাবুডুবুকুমার।

ইডিয়ট

- মিস্টার দত্ত। আপনার ফাইনাল সেটলেমেন্টের কাগজপত্র হিসেবনিকেশ সমস্ত মেল করে দিয়েছি। তিনমাসের স্যালারির যে কম্পেনসেশনটা, ও'টা আগামীকালের মধ্যে ক্রেডিট হয়ে যাবে।
- থ্যাঙ্ক ইউ সুবিমল।
- কিছু যদি মনে না করেন..এরপর কিছু ভেবেছেন?
- ভাবার সময় পেলাম কই সুবিমল..এই আজ সকালেই তো। আর দুপুরের মধ্যেই..হেহ্। ফাইনাল সেটলমেন্ট।
- আই অ্যাম রিয়েলি সরি।
- কফি খাওয়াবে? বেরোবার আগে গলাটা না ভিজিয়ে নিলেই নয়।
- অফ কোর্স। অফ কোর্স।

***

- বুড়ো, একটা গোল্ডফ্লেক দে।
- ব্যাপার কী গুরু। আজ তো শুক্রুবার। আজ তো প্যাকেট নেওয়ার দিন।
- সিগারেট এ'বার ছেড়ে দেব। ধীরেসুস্থে।
- হঠাৎ?
- চিন্তা করিস না। পান খাওয়া বাড়াব। খয়ের ছাড়া সাদা পান।
- শরীরটরীর ভালো তো গুরু?
- দিব্যি। দে দেখি একটা পান। তবে আজ সাদা না। উর্দুতে যাকে বলে বনারসি মিঠা।
- এই দিই। গুরু। একটা রিকুয়েস্ট ছিলো।
- ইরশাদ।
- ওই যে তোমায় বলেছিলাম না, একটা ফ্রিজ নেওয়ার বড় দরকার দোকানের জন্য। তা হাজার পাঁচেক কম পড়ছিল। আমার বলতে ভারি লজ্জা লাগছে কিন্তু তুমি মাইরি ইয়াব্বড় চাকরি করো। তাই..।
- ইউপিআই করে দিচ্ছি। ভালো ব্র‍্যান্ডের নিস বুড়ো।
- গুরু আমার ফেরত দিতে কিন্তু কিছুটা সময় লাগবে..।
- আমারও সিগারেট ছাড়তে কিছুটা সময় লাগবে।

**

- এই সময় তুমি হুট করে দিয়ে দিলে পাঁচ হাজার?
- ইয়ে মানে। আসলে বুড়োর দরকারটা কিন্তু জেনুইন।
- জাস্ট দিয়ে দিলে?
- জাস্ট দিয়ে দিলাম। বোকামো হলো তাই না? মাইরি তখন আমার মনে হচ্ছিল বটে..। মেয়ের স্কুলের ফিজ, বাড়িভাড়া..। কিন্তু তা সত্ত্বেও..এহ হে..।
- এই যে তুমি হুট করে দিয়ে দিতে পারলে..।
- জাস্ট দিয়ে দিলাম..।
- দিও। নিশ্চিন্তে দিও। এ'ভাবে দিতে পারো বলেই আমি নিশ্চিন্দি। এই দিতে পারাটাই তোমার স্ট্রেন্থ। তোমার মত মানুষ বেশিদিন কর্মহীন হয়ে থাকতে পারবে না। গ্যারেন্টি দিলাম। ছোটমামাও তাই বলছিল আজ ফোন করে।
- হে হে হে। তুমিও মাইরি..আমাদের সংসারের যে কী হাল হবে। তবে কী জানো, এই যে আমায় বেকার না বলে কর্মহীন বললে; তা'তে ইজ্জতে সামান্য মলম পড়লো। ভাষার কী গুণ সুমি।
- দু'টো নতুন টিউশনি পেয়েছি।
- দু'মাসের এক্সট্রা স্যালারি ঢুকবে। তোমার নতুন টিউশনি। চলো তিনজনে সিনেমা দেখে আসি।
- বড়মামা সাধে তোমায় উড়নচণ্ডী ইডিয়ট বলে?

রেখে যাওয়া গান

ভালোবাসায় দু'একটা না দেওয়া (অথবা না পাওয়া) চিঠি না থাকলেই নয়। "কত কিছু বলা হলো না"র ধুত্তেরি না থাকলে যত গান, যত কবিতা সব মিথ্যে।

সন্ধের ঘোলাটে আলোয় যে ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো ঘাট ছেড়ে যাওয়া লঞ্চটার দিকে; সে ফ্যালফ্যালে সমস্ত সিনেমা মিথ্যে হতে বাধ্য। ছেলেটির বুকপকেটে চানাচুরের দাগ, বাঁ পায়ের আচমকা ছিঁড়ে যাওয়া চামড়ার চটিতে সেফটিপিন। লঞ্চে ঝাপসাচোখজোড়া এক মেয়ের হাতে অগোছালো আধখাওয়া চানাচুরের ঠোঙা, আঁচলের সেফটিপিনের ভেসে গেছে। নদী ক্রমশ চওড়া হয়ে আসে। না দেওয়া চিঠি, না পাওয়া চিরকুটের ভারে কলকাতা নুয়ে পড়ে প্রায়।

সে'রকম প্রতিটা অসময়ে ভালোবাসাবাসি মানুষদের আশেপাশে কে যেন গান রেখে যান। মানুষের ভালোবাসায় সুর দিয়ে ক্রমাগত নিজেকে সৃষ্টি করে যান ঈশ্বর।

বেড়ালিত



গোড়ার দিকে মাসখানেক আমরা বেড়াল পুষেছিলাম। তারপর রণেভঙ্গ দিতে হয়েছে। এখন সে আমাদের পুষছে।

ইতিমধ্যে আমাদের বিছানা বেহাত হয়েছে।
ঘোরাঘুরি প্রায় ডকে।
কিঞ্চিৎ খরচ বেড়েছে।
ব্যস্ততা বেড়েছে।

এর পাশাপাশি বেড়েছে গলাগলি, আদর আর খেজুর। তাকে সত্তরটা কথা বললে সে একবার মিউ ডাকে আর তা'তেই সবার কী আনন্দ। মিনিট পনেরো তার গায়ে হাত বুলোলে সে আধবোজা চোখে একটিবার তৃপ্তিতে মাথা নাড়ে; তাতেই সবাই ধন্য।

হ্যাঁ। হিপনোটিজমের প্রসেসটা মোটামুটিভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দুনিয়ার কোনো বেড়ালকেই পর বলে মনে হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে বেরোলে মানুষের চেয়ে বেড়ালের সঙ্গে আলাপ জমানো সহজ মনে হচ্ছে। বিভূতিভূষণ পড়া, সুমনের গান শোনা বা লুচিভাজার মতই; পেয়ারের বেড়ালের পাশে চুপটি করে বসে থাকাটা একটি অতি উচ্চমার্গের সাধনা বলে বোধ হচ্ছে।