Showing posts with label ক্রিকেট. Show all posts
Showing posts with label ক্রিকেট. Show all posts

Sunday, March 8, 2026

বড়ম্যাচ

- এই যে, দীপক। তোমরা নাকি মেস ছেড়ে দল বেঁধে মনোহরবাবুর বাড়িতে খেলা দেখতে যাচ্ছ?
- যাচ্ছি তো। আপনিও চলুন না রায়দা। বেশ গল্প আড্ডা হবে। তা'ছাড়া মনোহরবাবুর নতুন রাঁধুনিটি শুনেছি গুণী মানুষ। অতএব সুখা ক্রিকেট দিয়ে দিন শেষ হবে না।
- তোমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে?
- বুঝলাম না। আরে, সেই যে! সে'বার ঘটা করে আমরা সবাই মনোহরবাবুর বাড়িতে টেস্ট ম্যাচের ফিফথ ডে টেলিকাস্ট দেখতে গেলাম। অবধারিত জেতা ম্যাচ খুইয়ে বাড়ি ফিরলাম।
- খুইয়ে মানেটা কী। আপনি তো খোয়াননি। টিম হেরে গেলো। ক্রিকেটে অমন হয়।
- এক সেকেন্ড। আর তার বছরখানেক আগের ব্যাপারটা? মনোহরের সোফায় আমি বসা মাত্রই আজহারের হাতের সেঞ্চুরি ফসকে যাওয়াটা? সে'টা কিছু নয় বলছ?
- আপনি তো আর আজহারকে রানআউট করিয়ে দেননি। সে ঘটনায় আপনার, বা মনোহরবাবুর বাড়ির সোফা বা সে টিভির কোন ভূমিকা নেই।
- মাই গুডনেস! আধুনিক যুগের মানুষ তোমরা, ইয়াং টার্কস! তোমরা ডেটা রিফিউস করছ?
- এ'টা ডেটা?
- এক্সেলে টেবিল বানিয়ে দিলে বুঝতে কি সুবিধে হবে?
- রায়দা। আপনার সঙ্গে বাজে গল্পে আটকে থাকলে আমার স্নানের লাইন মিস হয়ে যাবে। ভুতো আর বিপিনবাবুর পর ঢুকতে হলে আমার সেই সন্ধে হয়ে যাবে। মনোহরবাবুর বাড়ি যেতে হবে স্নান না করে। রোববারের স্নানটা আবার আমার কাছে পিলিগ্রিমেজ।
- যা হোক, তোমরা লায়েক হয়েছ। আজ মেসের বাজার সামলাচ্ছো, কাল অফিস, পরশু দেশ সামলাবে। শুধু ভেবে দেখো, ভজার চায়ের দোকানে বসে তোমরা অন্তত খান চারেক সিরিজ আর টুর্নামেন্ট জয় দেখেছ। এগেইন, ডেটা কথা বলে ভায়া।
- তা অবিশ্যি ঠিক।
- মানছি। ভজার দোকানের বেঞ্চিতে মনোহরবাবুর এসির হাওয়া খাওয়া সম্ভব নয়। মানছি বেচারি ভজা চা আর মামলেটের বেশি কিছু সাপ্লাই করতে পারে না। কিন্তু স্রেফ আরাম আর মুর্গি পোলাওয়ের লোভে অমন হান্ড্রেড পার্সেন্ট হেরো জায়গায় গিয়ে তোমরা দেশকে ডোবাবে, সে'টা যে পুরোপুরি সেলফিশ আর সুইসাইডাল, গুরুজন হিসেবে এ কথা আমি বারবার বলবো।
- ব্যাপারটা...ব্যাপারটা নেহাত ভুল বলেননি...ভুতোও কথাটা বলেছিল বটে একবার।
- ভুতো অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে। জিমেটিমে যায় বটে, তবে এখনও মাথাটা তেমন মুটিয়ে যায়নি।
- শুধু মনোহরবাবু যে কী মনে করবেন...।
- কিচ্ছুটি না। ভদ্রলোক নিজেও ব্যাপারটা ভালো ভাবে বুঝবেন। তুমি চাইলে আমি নিজে কনভে করে দেব ভদ্রলোককে।
- সেই ভালো। আমি গিয়ে বাকিদের বলি। এতদিন পর এত বড় একটা ফাইনাল..। চান্স নেওয়াটা ঠিক হবে না।
- তাই তো বলছি...।
- ইয়ে, আপনি তা'হলে...।
- আমার জন্য আবার রথতলার শ্যামা ইলেটকট্রনিক্সের রাস্তার দিক তাক করা পেল্লায় টিভি সেটটা ভীষণ লাকি। মনে নেই সে'বার একা হাতে লাস্ট ইনিংস চেজটা ম্যানেজ করে দিচ্ছিলাম? কী ভীমরতি ধরল পান খাওয়ার জন্য খানিকদূরের পান দোকানে গেলাম আর শচিন আউট। ব্যাস, খেল খতম।
- বেশ। সে কথাই রইলো। আমি বাকিদের কনভিন্স করছি।


******

- আরে, রায়বাবু যে। আসুন আসুন। তা আপনাদের মেসের দলবল কই...।
- তাঁরা আজ আসতে পারলে না বুঝলেন। ইয়ং ছেলেপুলের দল। ও'দের আবার হইহই ছাড়া কিছুই জমে না। আমরা আবার খানিকটা সিনিয়র, তাই হাই ভোল্টেজ সিচুয়েশনে ঠিক খোলতাই করে চেলামেল্লি করতে পারে না। অতএব বুঝতেই পারছেন...।
- বটেই তো বটেই তো। বেশ তো। যাক আপনি এসেছেন। আমার একজন সঙ্গী হলো।
- আমার আবার হইহট্টগোল না-পসন্দ বুঝলেন। এই দু'জন মিলে গা এলিয়ে একটু খেলা দেখবো। উপভোগ করবো। বাজে গল্প কানে আসবে না। সমস্ত ফোকাস শুধু ম্যাচে। এই দল বেঁধে খেলা দেখলে সেই ফোকাসটা নষ্ট হয়ে যায়।
- তা তো ঠিকই। তা, ম্যাচ শুরু হল বলে। রতনকে বলি চায়ের সঙ্গে কিছু ভাজাভুজির ব্যবস্থা করতে।
- আপনার রতনের সুনাম আছে কিন্তু বেশ বাজারে। তা, ওঁর হাতের মোরগ পোলাওটা নাকি লেজেন্ডারি?

মেজোপিসের কমেন্ট্রি

মেজোপিসের সঙ্গে খেলা দেখতে বসলে শুভর খেলাটা আর দেখা হয় না, পিসের কমেন্ট্রিতে কান রেখেই সময় কেটে যায়। সমস্যা হলো পিসেমশাইয়ের ব্যক্তিত্ব যতটা তীক্ষ্ণ, অবজার্ভেশনগুলো ততটাই মোটা-দাগের। কাজেই চট করে "আরে থামো না পিসে" বলাও যায় না, আবার অযথা গালগল্পও সহ্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

ব্যাটার মিস করলে, পিসে বললে, "উইকেটে লাগলেই আউট ছিলো"। আরে বাবা, উইকেটে লাগলে আউট যে হবে সে'টা বলার কী দরকার।

স্টেপ করে কেউ ছক্কা হাঁকালে। পিসে; "স্টেপ আউট না করলে এই শটটা মারতে পারতো না বুঝলি। স্টেপ আউট করেছে তাই পারলে"। এ কথার প্রতিবাদ হয় না, মেনে নেওয়াও যায় না।

বোলার ওয়াইড বল করলে। মেজোপিসে জানালে যে বোলার রানআপ শুরু করার আগেই নাকি তাঁর মন বলছিল যে এ'বারে ওয়াইড দেবে। পরের বলে কী হবে মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলবে "পরের বলের ব্যাপারে ঠিক ফিলিংটা আসছে না। ইনস্টিঙ্কট সবসময় কাজ করে না রে"।

কেউ ছয় মারলে। "আরে তোর রোল ধরে খেলার"। ঠিক আছে, মেনে নিলাম। পরের বলেই ব্লক করলে। "আরে ধরে খেলবি মানে কি রানই নিবি না"?

শুভ ভাবছে হয় ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দেবে অথবা পরিবার-সহ পিসির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে। কিন্তু দিনের পর দিন এই "ভালো না খেললে জেতা মুশকিল" ধরণের মন্তব্য শুনে আর খেলা হজম হচ্ছে না।

Tuesday, July 16, 2024

বই পড়া ক্রিকেট দেখা



অরিন্দমদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল বই পড়া আর ক্রিকেট দেখা নিয়ে৷ সুবিধের ব্যাপার হলো, আমাদের দু'জনেরই সাহিত্যজ্ঞান আর ক্রিকেটবুদ্ধিতে আদৌ তেমন গভীরতা নেই; যে'টা আছে সে'টা হলো মুগ্ধতা। এই দু'টো ব্যাপারেই মজে যেতে পারলে যে কী প্রবল আনন্দ অনুভব করা যায়; সে'টা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল৷ ঘরে ভাজা ভালো শিঙাড়ার ওই একটা গুণ; আড্ডিয়েরা যতই খেলো হোক না কেন, আড্ডা অতি সহজেই ধারালো হয়ে ওঠে৷

আড্ডা শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে, সেই আহ্লাদ গিয়ে গড়িয়ে পড়ল ক্রিকেট বিষয়ক বইয়ে। তারপর কী'ভাবে যেন মতি নন্দী হয়ে শান্তিপ্রিয় বন্দোপাধ্যায়ে নেমে ছেলেবেলায় পড়া গল্পের বইয়ে এসে পড়লো। আমরা বলছিলাম যে একবার বই পড়া বা ক্রিকেট দেখায় ডুব দিতে পারাটা যোগব্যায়ামের মত৷ অরিন্দমদা আমার ভাগের একটা শিঙাড়া খানিকটা ভেঙে নিয়ে একটা জরুরী কথা বললে, "ক্রিকেট বা বই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বুঝলি তো। আদত ব্যাপারটা হলো ডুব দিতে পারায়৷ যে কোনো বিষয়ে এক মিনিটের জন্যও ডুব যেতে বলে যে'টা দরকার সে'টা হলো সেল্ফ-ডিসিপ্লিন৷ কোনো কিছুকে দরদ দিয়ে কদর করতে হলে এই সেল্ফ-ডিসিপ্লিন অত্যন্ত জরুরী। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ডিসিপ্লিনে হাড় জ্বলে যায়, কিন্তু নিজের ভালো লাগাকে ডিসিপ্লিনে বেঁধে ফেলায় যে তৃপ্তি, তা তুলনাহীন"। এরপর বেহিসেবের শিঙাড়াটা পুরোটাই সাফ করে অরিন্দমদা যোগ করলে, "আরো একটা ব্যাপার আছে জানিস। রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টের পরোয়া করলে সেই প্রোভার্বিয়াল ডুব দেওয়া যায় না৷ ইন ফ্যাক্ট, এ বই পড়ে কী হবে, ও ম্যাচ দেখে কী হবে; অত অঙ্ক করে বসলে সারাক্ষণ মনের মধ্যে খচখচ চলে। কিন্তু হাভাতের মত গা ভাসিয়ে দিতে পারাটাই হচ্ছে আদত থেরাপি"।

ম্যাটিলডার বাস রোল্ড ডাহলের কল্পনায়, কিন্তু ভদ্রলোকের লেখার গুণেই ম্যাটিলডা মেয়েটি জীবন্ত; প্রাণোচ্ছল। ছোট্ট ম্যাটিলডার জীবন না-পাওয়ায় ভরপুর অথচ সে'সব না-পাওয়া ছাপিয়ে ম্যাটিলডা আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে ডিকেন্সে৷ ম্যাটিলিডা জিনিয়াস বা সুপারগার্ল; বইয়ের মূল কথা সে'টা নয়। দু:খে জেরবার না হয়ে পুঁচকে একটা মেয়ে ডিকেন্সে ডুব দিয়ে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে; আসল রূপকথা রয়েছে সেইখানে। অরিন্দমদার কথা শুনে মনে হলো অতটুকু মেয়ে ইয়াব্বড় সব বই পড়তে পারছে; সে'টা অবাক কাণ্ড বটে কিন্তু ম্যাজিক নয়৷ ম্যাজিক হলো ম্যাটিলডা এই যে মিসেস হ্যাভিশ্যাম, এস্টেলা আর পিপের জগতে হারিয়ে গিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, সেই ব্যাপারটায়। আবার আহমেদনগর কেল্লায় বন্দী থেকে নেহেরু যতটুকু লেখালিখি করেছেন, সে'গুলো পড়েও স্পষ্ট যে ম্যাটিলডার মতই ভদ্রলোক পড়াশোনার ডিসিপ্লিনে ডুব দিয়ে নিজেকে মজবুত করছেন। সেই পড়া এবং লেখা কতটা ভালো এবং কতটা মন্দ হলো, সে হিসেবে না গিয়ে প্রসেসে গা ভাসাচ্ছেন।

আমি বা অরিন্দমদা ম্যাটিলডা বা জহরলালের নখের যোগ্য নই, তবে সামান্য গা-ভাসানোর সুযোগ আমাদেরও আছে, সে আনন্দ কম কীসে। সে আনন্দেই সে'দিন সেকেন্ড রাউন্ড শিঙাড়া ভাজতে গেছিলাম হয়ত।

কে কে আর

করব।
(ভেবেচিন্তে৷ এই একটু চারপাশের হালচালটা বুঝেটুঝে নিয়ে। দিনকাল সুবিধের নয়, ঝাঁপিয়ে পড়লেই তো হলো না)

লড়ব।
(তবে একটু নরম করে, কেমন? বেশি দৌড়ঝাঁপ না হওয়াই ভালো। আর সামান্য দু'চারটে ব্রেনস্টর্মিং তেলেভাজা ব্রেক নিতে পারলে লড়াইতে বেশ আমেজ আসবে আর কী)

জিতব।
(না জিতলে অবশ্য দুনিয়াটা রসাতলে যাচ্ছে না৷ জীবন তো আর লিঙ্কডইনও নয়, জি-বাংলাও নয়)।

তবে ইয়ে।
সবার আগে দুপুরবেলাটা সামান্য গড়িয়ে নেব ভাবছি।

Sunday, January 14, 2024

ব্যাটম্যান



ছাতা হাতে নয়৷
ব্যাগ পিঠে নয়৷
এমন কী ছড়ি হাতেও নয়৷
ভদ্রলোক একটা আস্ত ব্যাট নিয়ে বাড়ি-অফিস-বাড়ি যাতায়াত করেন, নিয়মিত। 

ব্যাট নিয়ে যাতায়াত করার রকমারি সুবিধে।

১। বাসস্টপের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে রাস্তার পিচ ঠুকঠাক করর নেওয়া যায়৷ সে'ভাবেই তিনি মনের রাশ টেনে রাখেন৷

২। অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে দু'একটা শ্যাডো শট খেলা যায়; বেশি মারকুটে কিছু নয়, ব্যাট স্যুইং বেশি হলে আশেপাশের মানুষজনের অসুবিধে।  এইসব শ্যাডো ডিফেন্স বা নিখুঁত লেগ-গ্লান্সে মেজাজের চনমন বজায় রাখা যায়৷

৩। ট্রেনের দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর সময় ব্যাটটা কাঁধে গদার মত নিয়ে দাঁড়াতে পারলে বুকে বাড়তি বল পাওয়া যায়৷ ব্যাটের সুইটস্পট বুকের যত কাছে, ততটাই দাপট নিয়ে চোয়াল শক্ত রাখা যায়৷

৪। সব চেয়ে বড় কথা বাড়ি ঢোকার সময় পায়ের আগেও চৌকাঠ পেরোয় ভদ্রলোকের ব্যাট৷

শুধু ব্যাট তুলে স্টেডিয়ামের অভিবাদনে সাড়া দেওয়ার ভঙ্গীমায় বাড়ি ফিরে ব্যাট তুলে "আমি ফিরে গেছি" বলাটাকে গিন্নী "বাড়াবাড়ি কোরো না" বলায় সামান্য চেপে যেতে হয়।

**

(ছবিটা এক লহমার। কিন্তু সে ছবিতে ভর দিয়ে নিজের কল্পনায় এমন একটা রূপকথার মানুষকে গড়ে নিতে বেশ লাগে)।

Tuesday, January 2, 2024

টুপি

- ঘনাদা, আপনার টেবিলে ওই সবুজ ন্যাতাটা নতুন দেখছি? ওটার পিছনেও কোনও পেল্লায় গল্প আছে নাকি?

- কেন? আমার চারপাশে শুধুই গালগল্প থাকে নাকি? এ'টা দিয়ে গতকাল থেকে আমি টেবিল পরিষ্কার করছি৷

- ওহ্, আমি ভাবলাম..।

- ভাবা বন্ধ করো।

- আচ্ছা, আসি..।

- শোনো..।

- কিছু বলবেন?

- তোমার অস্ট্রেলিয়ায় যাতায়াত আছে?

- আজ্ঞে?

- অস্ট্রেলিয়া..ডাউন আন্ডার..সে'দিকে যাতায়াত আছে?

- কই..না তো..কেন বলুন তো?

- না, এমনি৷ খামোখা দাঁড়িয়ে না থেকে এ'বার এসো৷



Wednesday, December 6, 2023

ক্রিকেটম্বল

ডিনার সেরে খেলা দেখতে বসেছিলাম৷ নিশ্চিত জেতা ম্যাচ, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই৷ সমস্যা বলতে ওই হাতের কাছে একটা চানাচুরের বয়াম। ভরা পেট, তাই সে চানাচুরের বয়ামের গায়ে হাত বুলোচ্ছিলাম শুধু।

এমন সময় ম্যাক্সওয়েল বেদম পেটানি শুরু করলে। ক্রমশ ম্যাচ সামান্য গোলমেলে পর্যায় এসে দাঁড়ালো৷ আর কোনো এক জাদুমন্ত্রবলে চানাচুরের বয়াম আপনা থেকেই নিজের ঢাকনা সরিয়ে আমার কাছে সরে আসলে।

এক একটা চার-ছয়, এক এক মুঠো চানাচুর। ভরা পেটের ব্যাপারটা ব্রেন তখন প্রসেস করতে পারছে না, ভারি অদ্ভুত। শেষ বলে হেরে যাওয়ার পর টের পেলাম বয়াম ফাঁকা।

যা বুঝছি, অন্তত শরীর স্বাস্থ্যের জন্য রাতবিরেতে ক্রিকেট দেখা বন্ধ করতে হবে।

ফাইনালের পরে



(ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৩: ফাইনালের পরে লেখা)

**
কাল বিরিয়ানি খাওয়ার প্ল্যান ছিল। ধরেই নিয়েছিলাম; আনন্দধারা ভুবনে বইবে,  তা'তে গা না ভাসালে চলবে কেন?

কিন্তু৷ কপালে লেখা আছে ভেজা গামছা গায়ে ভ্যাপসা গরম সন্ধেবেলা ছাতে পায়চারি করে হদ্দ হব। অথচ ছক কষব আদ্দির পাঞ্জাবি পরে নিজেকে বাবু পেল্লায়কুমার ভেবে বাহারে গজল শুনতে শুনতে হাঁটুতে তাল দেওয়ার; তা' চলবে কেন?
 
আমার প্ল্যানের কান মুলে আনন্দধারা বাবাজী পা পিছলে আলুরদমত্ব লাভ করলেন৷ তারপর মচকানো ঠ্যাঙে চুন-হলুদ লাগিয়ে বিছানায় সেঁটে রইলেন, ভুবন অন্ধকার।

সে অন্ধকার সাফ হবে কী করে? আনন্দ-বিরিয়ানির ঝাড়বাতি প্ল্যান বাতিল।
এলো বিষাদ-বিরিয়ানির সন্ধাপ্রদীপ প্ল্যান।

তা'তেই মুক্তি, তা'তেই উত্তরণ।

মনে রাখবেন, বকুলতলা ক্রিকেট ম্যাচ হেরেছিল বটে, কিন্তু তাদের 'ম্যাচ তো জিতবই' ভেবে সেই যে ঢালাও রান্নাবান্না ও ফিস্টির আয়োজন; সে'সব যারা ব্যর্থ বলে, তারা আর যাই হোক ক্রিকেটপ্রেমী নন।

পুনশ্চ:

টীম বকুলতলা, টীম বেলতলার বা কোচ লায়ন রে'র নাম যারা শোনেননি, তাদের আর ক্রিকেট দেখে কাজ নেই; তারা বরং ইঞ্জিন অয়েল সম্বন্ধে পড়াশোন করুন গিয়ে।

ফাইনালের আগে


(ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৩: ফাইনালের আগে লেখা। ইয়ে, বোধ হয় না লিখলেই ভালো হতো)

**

১। দেখুন, খেলায় হারজিত আছেই৷
(থেকে থেকেই শিউরে উঠছি কেন কে জানে, বম্বেতে শীত পড়েছে কি? হতে পারে)

২। বয়স তো কম হলো না৷ আমি ও'সব ফাইনাল-টাইনাল নিয়ে আলাদা করে নিয়ে টেনশন নিই না৷ চাপ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। 
("মুর্গির ঝোলে এত বাউন্স কম কেন" প্রশ্ন করে ফেলাটা স্রেফ ফ্রয়ডিয়ান ইয়ে বা তেমন কিছু হবে)

৩। অস্ট্রেলিয়া ভালো টীম৷ তবে আমি এ যুগের ইন্ডিয়ান টীমের ফ্যান, ওদের আমি ভয় পাবো? ফুঁহ্। হাসি পায় আজকাল এ'সব খেলো কথা শুনলে। 
(সকালের দিকে মুদীর দোকানের সামনে হলুদ জামা পরা এক ছোকরাকে দেখে কেন যে অমন মারাত্মক ডাউন আন্ডার বিষম খেলাম, সে'টা এখনও একটা মিস্ট্রি)

৪৷ আজ নিশ্চিন্ত মনে খেলা দেখতে বসছি৷ বায়াসড ফ্যান হিসেবে নয়, ক্রিকেট ভালোবাসা একজন মানুষ হিসেবে। মে দ্য বেস্ট টীম উইন৷ ক্রিকেট-ভক্ত হিসেবে এ'টুকুই চাওয়া। 
(সোফার ডান দিকের হাতলে অর্ধেক হেলান দিয়ে বসার কথা, রোহিতের ব্যাটিংয়ে সে ব্যাপারটা খুব হেল্প করে৷ সে'খানে খোকা বসে গুলতানি মারছিল। চ্যাংদোলা করে শিফট করিয়ে দিয়েছি৷ বাপের সঙ্গে চালিয়াতি করে লাভ নেই)।

Tuesday, December 5, 2023

ইঞ্জিন অয়েল



এক দম্পতি নিজেদের গাড়িতে বসে। তাঁরা জরুরী আলোচনায় মগ্ন - ছেলেমেয়েকে কোন স্কুলে দেওয়া যায়, কতটা খরচ কোন স্কুলে, কী'ভাবে সে'সব সামাল দেওয়া যাবে; ইত্যাদি। এদিকে গাড়ির ইগনিশনে সমস্যা হচ্ছে৷

এমন সময়, হাওয়া মেঘ সরায়ে রাহুল দ্রাবিড় গাড়ির জানলা দিয়ে উঁকি মেরে বললেন, "ছেলেমেয়ের স্কুল নিয়ে যতটা ভাবনাচিন্তা করছেন, অতটা চিন্তা যদি ইঞ্জিন অয়েল নিয়ে করতেন তা'হলে তো এমন সমস্যায় পড়তে হত না"।

অকাট্য। অব্যর্থ৷

এ'বার ইঞ্জিনঅয়েল নিয়ে ভাবনাচিন্তা না বাড়ালেই নয়। গাড়িটাকে তো আর বখে যেতে দেওয়া যায় না, ওর ভবিষ্যতের চিন্তা তো আমাকেই করতে হবে৷

Sunday, July 2, 2023

সুযোগ



- ভাই পল্টু, অ্যাটেনশন! সোমা লাইব্রেরিতে একা বসে।

- তা'তে কী?

- তা'তে কী মানে! এই তো সুযোগ৷

- সুযোগ?

- সুবর্ণ সুযোগ।

- কীসের সুযোগ?

- তুই এতটাই গবেট?

- আহ্। খুলে বল না।

- মনের কথা জানান দেওয়ার এত বড় মওকা আর পাবিনা৷

- লাইব্রেরিতে গিয়ে এ'সব কথা বলব? সমরেশবাবু পেটাবেন যে!

- আরে ধের। সেই যে রোমান্টিক চিঠিটা লিখে রেখেছিস, ওই যে, কী'সব কঠিন কবিতাফবিতা কোট করে৷ ওইটা স্ট্রেট গিয়ে ওর সামনে রেখে দে৷ কথার চেয়ে ওই চিঠিতে কাজ দেবে বেশি৷ তা'ছাড়া সোমার তোর প্রতি উইকনেস আছে৷ ওর চোখে সে'টার রিফ্লেকশন আমি দেখেছি।

- সত্যি দেখেছিস ভাই?

- মা কালীর দিব্যি৷

- তা'হলে চিঠিটা গিয়ে দিয়েই দি বল? লাইব্রেরিতে?

- শুভস্য শীঘ্রম।

- ইয়ে৷ সমরেশবাবু যদি বাগড়া দেন? যদি..চিঠি দেওয়াটা ট্র‍্যাক করে ফেলেন? লাইব্রেরিয়ান হিসেবে বড্ড বদমেজাজি ভদ্রলোক৷ লাইব্রেরির স্পিরিট নষ্ট করেছি বলে আমায় না রগড়ে দেন৷

- হুম। অকারণে বেজায়গায় নাক গলানোর অভ্যাস আছে বটে ভদ্রলোকের। একটা কাজ কর..হেডস্যার আমায় একটা অফিস মেমো দিয়েছিলেন লাইব্রেরিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য৷ এ'টা বরং তুইই নিয়ে যা৷ সমরেশবাবুর হাতে আগে দিয়ে দে। এ'টা নিশ্চয়ই উনি খানিকক্ষণ মন দিয়ে পড়বেন৷ সেই ফাঁকে সোমার পাশের চেয়ার বসে; চিঠি দিয়ে কেল্লা ফতে।

- তোর মত বন্ধু হয় না ভাই। তোকে যে আমি কী বলে..।

- বলার কী দরকার। খাইয়ে দিবি না হয়৷ ফিশফ্রাই, চিকেন ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন। আর চকোলেট আইসক্রিম৷

- হবে৷ হবে। সব হবে৷ 

- এই যে, সেই লাইব্রেরির মেমো। এ'বার ছুট্টে যা দেখি৷ তা, প্রেমপত্রটা সঙ্গে আছে তো?

- এক্কেবারে বুকপকেটে। অলওয়েজ৷

***

সোমা বসে ছিল লাইব্রেরির উত্তর দিকের জানালার সামনে৷ নরম রোদ্দুরে যে কী মায়াময় দেখাচ্ছিল তাকে। সোমার একটা ডাকনাম দিয়েছে পল্টু, মনে মনে; সুমি৷ সুমি, সুমি; মনে মনে বার দুই বলতেই বুকের ভিতরটায় কেমন মিষ্টি হাওয়া বয়ে গেল৷ আহা৷

কেমিস্ট্রির ঢাউস রেফারেন্স বইটা থেকে আচমকা চোখ তুলল পল্টুর সুমি। পল্টুর মনে হল সুমি তাকে দেখে খানিকটা খুশিই হয়েছে৷ চিঠি দিয়ে মন জয় করার এই আদর্শ সুযোগ, সমরেশবাবু এখন নির্ঘাৎ হেডমাস্টারের মেমোয় নিমজ্জিত। 

সুমির সামনের চেয়ারটা টেনে বসলে পল্টু৷ মুখে    বেকায়দা হাসি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কাঁপা হাতে এগিয়ে ধরল সেই যত্নে রাখা প্রেম-দলিল৷ সুমি যেন সে চিঠির অপেক্ষাতেই ছিল। কাগজটা ফস্ করে নিজের হাতে বাগিয়ে নিল সে। তিনটে প্রকাণ্ড ঢোক গিলল পল্টু। 

কেমিস্ট্রির বইয়ের আড়াল সম্বল করে চিঠির ভাঁজ খুললো সোমা; পল্টুর সুমি৷ কিন্তু একটা চাবুকের শপাং টের পেল পল্টু যখন সোমার মুখের হাসি সুট্ করে মিলিয়ে গেল৷ ততক্ষণে তার হাতের তেলো ঘামতে আরম্ভ করেছে৷ তবে কি হিসেবে গড়বড়? সোমা কি পল্টুর সুমি হতে চায় না? 

এ'বার সোমা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে শুধোল, "এই পল্টু, লাইব্রেরিয়ানের জন্য লেখা হেডমাস্টারমশাইয়ের মেমো আমায় দেওয়ার কী মানে"? 

মাথাটা ভোঁভোঁ করে উঠলো পল্টুর৷ আর তখনই একটা জলদগম্ভীর হিমশীতল কণ্ঠস্বর লাইব্রেরির স্তব্ধতা চুরমার করে দিলে; "এই যে রসের নাগর পল্টেকুমার! আমার সঙ্গে মস্করা? এ'দিকে আয়, তোর চামড়া ছাড়িয়ে যদি পুরো এনসাইক্লোপিডিয়ার সেট মলাট না দিয়েছি তো আমি হেডলাইব্রেরিয়ান সমরেশ সাহা নয়"!

Saturday, July 1, 2023

ক্রিকেট দেখুন



মনকে ভালো রাখতে,
মেজাজকে চনমনে রাখতে,
ক্রিকেট দেখুন।

মোবাইলে, ল্যাপটপে, টিভিতে, ক্রিকইনফোতে;
প্রয়োজনে পাশে বসা মানুষটার স্ক্রিনে উঁকি মেরে।
যে'খানে জোটে, ক্রিকেট দেখুন।

লাইভ ম্যাচে সুবিধে না করতে পারলে, ইউটিউবের দ্বারস্থ হোন।
প্রিয় ব্যাটসম্যান বোকার মত আউট হলে বা প্রিয় বোলার বেদম ঠ্যাঙানি খেলে; তাঁদের পুরনো পার্ফর্ম্যান্স দেখে গর্জে উঠুন।
কিন্তু দেখুন, ক্রিকেট দেখুন।

মনভার বুকে-হুহু যাই হোক, ক্রিকেট ছাড়বেন না।
কারণ আপনার শত দুঃসময়েও; ক্রিকেট আপনাকে ছেড়ে যায়নি।

নারদ নারদ



আকাশে মেঘ।

বিরাট: বৃষ্টি হবে না৷ এই আমি লিখে দিলাম।
গম্ভীর: বন্যায় সব ভেসে যাবে৷ কই রে, কে কোথায় আছিস, স্টাম্পপেপার আন৷ আমি হলফনামাটা দিয়ে রাখি।
বিরাট: কোথাকার মাকাল ফল হে তুমি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এ মেঘ উড়ে যাবে৷ হাওয়ার তেজ দেখেছ?
গম্ভীর: হাওয়া কই? হদ্দ গুমোট চাদ্দিক। তুমি কি গবেট না সেফটিপিন?
বিরাট: মুখ সামলে৷ ইনসাল্ট হজম করব না! আমি গবেট? থোঁতামুখ এক্কেবারে...।
গম্ভীর: আর আমায় মাকালফল কে বলেছে? তোমার মেজপিসে?
বিরাট: তবে রে রাস্কেল? আমার মেজপিসে তুলে এত বড় কথা? দেব দু'ঘা?
গম্ভীর: কী? তুইতোকারি? তবে রে..এই কেউ ফুলঝাড়ুটা আন দেখি..।
বিরাট: শুধু তুইতোকারি কেন রে ব্যাটা৷ কে রাস্কেলও বলেছি।
গম্ভীর: দাঁড়া শালা৷ আমি তোর নামে মামলা ঠুকব।
বিরাট: আমি তোর পিছনে গুণ্ডা লেলিয়ে দেব!
গম্ভীর: থাম থাম৷ পিছনে নেই চাম, রাধাকেষ্টর নাম!
বিরাট: চল ব্যাটাচ্ছেলে৷ রাস্তায় চ'৷ এস্পারওস্পার করে দিচ্ছি।
গম্ভীর: হয়েই যাক। দেখিয়েই দি, কত ধানে কত চাল!
বিরাট: ইয়ে..। বলছিলাম যে..।
গম্ভীর: বলেই ফেল না বে।
বিরাট: বৃষ্টি তো নামবে না৷ খানিক পরেই খটখটে রোদ্দুর উঠবে৷ একটা স্কিন অ্যালার্জি ট্রাবল দিচ্ছে তো৷ ডাইরেক্ট রোদ্দুরটা ঝ্যামেলায় ফেলতে পারে।
গম্ভীর: বৃষ্টি? ঢালবে। ঢেলে মাত করে দেবে৷ তবে আমার আবার বৃষ্টিতে ভিজলেই টনসিলটা টনটন করে ওঠে। এ'সময় রাস্তায় না গেলেই ভালো।
বিরাট: যাক, আজ তা'হলে ছেড়ে দিলাম তোমায়।
গম্ভীর: হ্যাঁ৷ আজ তোর বরাত ভালো৷ লটারি কেন৷ আমি যাই, একটু গড়িয়ে নিই গিয়ে৷

(আইপিএল ২০২৩-য়ের সময় লেখা)

রাসেল ও নীতিশ

আমার ধারণা প্রতি ম্যাচের আগে ব্যাপারটা ঠিক এইরকম দাঁড়ায়।
নীতিশ রানা: রাসেলদাদা, বলছিলাম যে, পরের ম্যাচে..।
রাসেল (আচমকা গম্ভীর, চোয়াল শক্ত ইত্যাদি): কী..।
নীতিশ রানা: না মানে, বলছিলাম যে..।
রাসেল: কী..?
নীতিশ রানা: আমি? না৷ আমি কিচ্ছু বলিনি৷ ভেঙ্কি স্যার বলছিলেন আর কী।
রাসেল: কী!
নীতিশ রানা: এই তোমার বড্ড খাটাখাটনি যাচ্ছে৷ এই প্রতি ম্যাচ দু'চার বল অমন ঘাম ঝরিয়ে খেলা..।
রাসেল (এ'বার নীতিশের কাঁধে হাত রেখে, সুর নরম করে) : কী?
নীতিশ রানা: ভ..ভেঙ্কি পিসেমশাই বলছিলেন পরের রাসেলে ম্যাচকে বিশ্রাম দিতে। না..মানে..পরের ভেঙ্কিতে বিশ্রামকে রাসেল দিতে। সরি..। মানে..বিশ্রাম বলছিলেন...।
রাসেল (নীতিশকে আলতো করে কাছে টেনে): বিশ্রাম?
নীতিশ: কার বিশ্রাম?
রাসেল: তুমি বলো।
নীতিশ: আমার বিশ্রাম দরকার। খুব দরকার।
রাসেল: তোমার বিশ্রাম দরকার?
নীতিশ: হ্যাঁ। কাঁ..কাঁধটা কেমন টনটন করছে..।
রাসেল: তুমি কী বলতে এসেছিলে?
নীতিশ: আমি? আমি বলতে এসেছিলাম৷ আমার বিশ্রাম দরকার।
রাসেল: আচ্ছা৷

***
(আইপিএল ২০২৩ আর কেকেআর ফ্যানের ব্যথা)

বাপ্পাদা ও রাসেল

আজ হঠাৎ বাপ্পাদার কথা মনে পড়ল৷ বারবার বলত যে রান্নাটা ওর প্যাশন৷ খাসির মাংসের অন্তত বাহাত্তর রকম ঝোলের রেসিপি প্রায় আবৃত্তি করার স্টাইলে আউড়ে যেতে পারত৷ আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। পিকনিক বা ফিস্টির প্ল্যানে বাপ্পাদা থাকা মানেই বুকে বল পাওয়া যেত; "বাপ্পাদা আছে৷ মাংস রান্নার চিন্তাটা অন্তত করতে হবে না"৷ সব প্ল্যানই সাজানো হত বাপ্পাদার সুবিধে-অসুবিধে ভেবে; আর যাই হোক; মেনুর স্টার আইটেমটার দায়িত্বে আছে৷ আমরা কাঁচা-হুজুগে ছেলেছোকরার দল ভাত পুড়িয়ে ফেলি, চাটনি জোলো করে ফেলি, ডিমভাজায় নুন দিতে ভুলে যাই৷ কিন্তু মাংসের ঝোল হাইক্লাস হলে পিকনিকের জৌলুস নিয়ে ভাবতে হয় না৷ আর মাংসের ঝোল উতরে দেওয়ার জন্য রয়েছে বাপ্পাদা৷
কিন্তু৷ কিন্তু৷ প্রতি পিকনিকেই সেই বাপ্পাদার মাংস রান্নার রোম্যান্সটা কী'ভাবে যেন হোঁচট খেয়ে যেত।
"এহ্৷ কোন ইডিয়ট মাংস আনতে গেছিলিস রে? আরে ছাগল নিয়ে এসেছিস! রামোহ্। এ জিনিস আবার মানুষে খায়৷ এ'সব আমায় রাঁধতে বলে আমার ইনসাল্ট করিসনা৷ তোর যা করতে হয় কর৷ আর শোন, ও জিনিস আমি দু'চার পিসের বেশি খেতে পারব না"।
" না রে৷ এই কড়াইটার শেপে প্রবলেম আছে৷ কার থেকে ভাড়া করে এনেছিস? খবরদার পুরো টাকা দিবি না৷ তোদের ছেলেমানুষ পেয়ে ডিফেক্টিভ মাল গছিয়ে দিয়েছে৷ তোরাই একটা ঝোলটোল করে নে। এ কড়াইয়ে তো আমার সেই উজবেকি মাটন দিলকশ রাঁধতে পারব না"।
"এ'বারটা থাক। বুঝলি৷ শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে৷ আমি বরং একটু মাদুর পেতে জিরিয়ে নিই"।
আজ আন্দ্রে রাসেল আউট হওয়ার পর আচমকা বাপ্পাদার কথা মনে পড়ল। কেন কে জানে৷

**

( ১৪ই এপ্রিল ২০২৩-য়ে লেখা। যথারীতি আইপিএল চলাকালীন। কেকেআর-কে সাপোর্ট করা চাট্টিখানি কথা নয়)

রিঙ্কুবাবুর প্রতি



ছয় নম্বর ১:
ছবি বিশ্বাস স্টাইলে: "প্রথমে ভাতের পাশে মুলোছেঁচকি দিয়ে খেতে দিলে। তারপর শেষ পাতে চাটনির পর মাংসের ঝোলের বাটি থেকে আলু তুলে দিয়ে মাতব্বরি! উদ্ধার করেছে আর কী! খাওয়াটা তো জলেই গেছে"।

ছয় নম্বর ২:
পাহাড়ি সান্যাল স্টাইলে: "ঠিক আছে৷ ঠিক আছে৷ আরে আধঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সিনেমার টিকিট পাওয়া গেল না বলে কি অভিমানে ফুচকাটাও খাব না? আরে জীবন থেকে রোম্যান্স বাদ দিলে চলবে কেন বলো। যা পেলাম, যে'টুকু পেলাম - চেটেপুটে নিই না"।

ছয় নম্বর ৩:
তুলসী চক্রবর্তী স্টাইলে: "বুকের ভিতর দিয়ে, বুঝলে ভায়া, কেমন যেন একটা ব্রিটিশ আমলের লিফট ঘটঘটাং করে ওঠা নামা করছে৷ মনে হচ্ছে, কেউ যেন ট্রামের ভিতরে বসিয়ে আলোর গতি নিয়ে কেঠো সব অঙ্ক কষতে দিয়েছে। বড্ড নার্ভাস বোধ করছি ভায়া"।

ছয় নম্বর ৪:
উৎপল দত্ত স্টাইলে: "ওরে তোরা যে যে'খানে বসে; খবরদার নড়বি না৷ নড়লেই তোদের আমি জেলে পুরব৷ এক মিনিট, খামোখা জেলে পুরে কী হবে, তোদের আমি গুলি করব৷ এক মিনিট, অত সহজে পার পাবি না৷ তোদের আমি আলকাতরা দিয়ে ব্ল্যাকফরেস্ট কেক বানিয়ে গেলাব। আর এই যে, তুমি৷ হ্যাঁ তোমায় বলছি! ইতিহাস তৈরি হতে চলেছে, আর এই সময় তোমার পিঠ চুলকোচ্ছে? রাস্কেল! তোমায় আমি ত্যাজ্যপুত্র করব! কী? তুমি আমার ছেলে নও? বেশ। তবে আগে দত্তক নেব, তারপর...। খবরদার যদি এক ইঞ্চিও নড়তে দেখি৷ ও কী! বাতাসে তোমার চুল উড়ছে কেন"?

ছয় নম্বর পাঁচ:
উত্তমকুমার স্টাইলে: রিঙ্কুবাবু, এই একবারটির জন্য বলেই দিলাম; তুমিই উত্তমকুমার!

(৯ এপ্রিল ২০২৩-য়ে লেখা। সে'দিনের আইপিএল স্কোরকার্ডে চোখ বুলোলেই চলবে)

Sunday, February 19, 2023

ফিরোজ শাহ কোটলায় ক্রিকেট-হুজুগিস্ট



আমরা যারা ক্রিকেট-হুজুগিস্ট, তাদের চোখ দিয়ে খেলাটাকে বিশ্লেষণ করতে চাওয়া আর শালপাতার দোনায় ইলিশের ঝোলভাত খাওয়া একই ব্যাপার। আমাদের ক্রিকেট-আড্ডায় ক্রিকেটটাই ভেসে যায় বিকট হ্যা-হ্যা-হো-হো অথবা অযথা গলাবাজিতে; তবে সেই ভেসে যাওয়াটা বোধ হয় নেহাৎ অক্রিকেটিয় নয়৷ ক্রিকেট গ্যালারির 'লক্ষ্মী' হল এই হুজুগিস্টরাই (নিজেদের গান নিজেরাই গাইব, তা'তে আর আশ্চর্য কী)। তাদের পাগলামিতেই মেক্সিকান ওয়েভ উত্তাল হয়, স্টেডিয়ামের গেটের বাইরে শস্তা জার্সির হাজারে হাজারে বিক্রি হয়, আধমাইল দূরে দাঁড়ানো প্লেয়ারদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে চেল্লামেল্লি জুড়ে দেওয়া হয় যেন সে কোহলি-রোহিত নয়; পাড়ার বাপ্পাদা, আমাদের ডাক শুনলেই এগিয়ে এসে সিগারেটের কাউন্টার দেবে বা চা-মামলেট কিনে খাওয়াবে৷

যা হোক, সেই ক্রিকেট-হুজুগিস্ট-অ্যাসোসিশিয়েনের অন্যতম সভ্য হিসেবে আজ গেছিলাম ফিরোজ শাহ কোটলায়, ভারত-অস্ট্রেলিয়া সেকেন্ড টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা দেখতে৷ একটামাত্র টিকিট জুটেছিল, কাজেই পরিব্রাজকের মত একাই সক্কাল-সক্কাল পৌঁছে গেলাম৷ কোভিডের পর এই প্রথম মাঠে যাওয়ার সুযোগ, একা-দোকা ভাবলে চলবে কেন? তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢোকার কথা। ঢোকার মুখে প্রতিবার যা করি, এ'বারও করলাম৷ জার্সি দরদাম; কখনও কিনি, কখনও কিনি না৷ কিন্তু জার্সি বিক্রিবাটা যে'খানে হচ্ছে, সে'খানে গিয়ে খানিকক্ষণ না দাঁড়ালেই নয়৷ আজ খানিক্ষণ বেশ কয়েকটা জার্সি কেনাকাটির জটলায় দাঁড়িয়ে মনে হল কোহলির পর, সবচেয়ে বেশি চাহিদা হল সূর্যকুমারের জার্সির। তারপর রোহিত এবং ধোনি৷ যা হোক, আমি খোকার জন্য সুভ্যেনির হিসেবে একটা জার্সি কিনে নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়লাম।

ভিটামিন-ডি-য়ের হয়ে বেশ জোরালো সওয়াল রাখে ফিরোজ শাহ কাটলা৷ বেশির ভাগ দর্শকদের মাথার ওপর ছাত নেই৷ তবে আমি যে অঞ্চলে ছিলাম, সে'খান থেকে পিচের ভ্যিউ চমৎকার। কাজেই খুঁতখুঁত ছিল না মনে৷ ইনিংস শুরুর মিনিট কুড়ি আগেই পৌঁছে গেছি৷ এ মাঠে এই আমার প্রথমবার, তাই সবার আগে টয়লেটের খোঁজটা নিয়ে রাখা দরকার। ইডেনের মতই; সে ব্যবস্থা আর যাই হোক, ঝাঁচকচকে নয়৷ তবে ব্যবহারযোগ্য৷ এরপর গেলাম খাওয়ার জলের ব্যবস্থা দেখতে৷ দুর্ভাগা দেশের ক্রিকেট দর্শক আমরা, ব্যাগ-জলের বোতল ইত্যাদি নিয়ে ঢোকা বারণ (সে দায়ভার অবশ্য আমাদেরই)৷ কাজেই স্টেডিয়ামের ভিতর জলের ব্যবস্থাটা ভালো মত জেনে না রাখলে সমস্যার পড়তে হবে।  আমি যে'খানে ছিলাম, সে'খানে কাগজের গেলাসে জল বিক্রি হচ্ছিল, দশ টাকার এক গেলাস৷ ইয়ে, এক বিক্রেতা অবশ্য আধো-গোপন ব্যবস্থাপনায় জলের বোতলও বিক্রি করছিলেন, কুড়ি টাকার বোতল পঞ্চাশে৷ কিন্তু বার বার সীট ছেড়ে উঠে গিয়ে এক গেলাস জল কিনে খেতে হলে ক্রিকেটটা জলে যাবে৷ অগত্যা সেই বোতলই কিনতে হল। খাবারদাবারের মধ্যে আমাদের এলাকায় ছিল তেল চুপচুপে ঠাণ্ডা কচুরি ও শিঙাড়া, রাজমা বা ছোলেসহ ভাত, রকমারি চিপ্স, পপকর্ন, আর কোল্ডড্রিঙ্কস৷ খান চারেক স্টল, তারা মোটামুটি হিমশিম খাচ্ছে। ও'সব বিস্বাদ আইটেমগুলোরও যে কী চাহিদা মাঠের মধ্যে; ক্যাপ্টিভ অডিয়েন্স, তাদের পেটে খিদে, গলায় তেষ্টা, প্রাণে ক্রিকেট৷ এই অদরকারী ক্যাপ্টিভ অডিয়েন্সের জন্য বিসিসিআই যদি একটু মায়াদয়া বাড়াত, তবে বর্তে যেত কত হাজার হাজার ক্রিকেট হুজুগিস্ট৷ তারা সকলে ক্রিকেট বোদ্ধা নয়, অথচ এই অব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে দিনের পর দিন তারা মাঠ ভরিয়ে দিচ্ছে, "ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া" বলে চিল্লিয়ে কানঝালাপালা করে দিচ্ছে৷ ভালোবাসার যে কী টান।  সামান্য পানীয় জলের আশ্বাস, পরিষ্কার খাবারদাবারের ব্যবস্থা, সাফসুতরো বাথরুম আর ছ'সাত ঘণ্টা বসার জন্য আরামদায়ক ব্যবস্থা; এগুলো ব্যবস্থা করা কি খুবই কষ্টকর? কে জানে! হয়ত আমাদেরই দাবীর শেষ নেই। কিন্তু ভারতীয় বোর্ড যেহেতু ব্যবসাটা ভালো বোঝে (এ'টা তীর্যক মন্তব্য নয়, আন্তরিক সেলুট), কাস্টোমার ডিলাইট নিয়ে তাদের কি কোনও মাথাব্যথা থাকবে না? বিশেষত, যখন হোর্ডিংয়ের কদর্যতায় স্টেডিয়ামগুলো দুর্গাপুজোয় কলকাতার রাস্তাঘাটকেও দশ গোল দেবে। না হয় আরও দু'চারটে ব্যানার-ফেস্টুন বাড়লো, কিন্তু দু'দণ্ড আয়েস করে যেন মানুষ খেলাটাকে উপভোগ করতে পারে৷

যা হোক, এ'সব অদরকারী গপ্প থাক৷ হুজুগে ফেরত আসি৷ তবে ইয়ে, ক্রিকেট নিয়ে লিখতে বসিনি৷ গ্যালারির হয়েই লিখছি৷ টিভির ক্রিকেট টেলিকাস্ট দুরন্ত (এবং অপরিহার্য) কারণ ক্রিকেটে অ্যানালিটিকাল অ্যাপ্রিশিয়েশনের প্রচুর সুযোগ রয়েছে, আর আর সে'টার আইডিয়াল মিডিয়াম হচ্ছে টেলিভিশন (বা যে কোনও স্ক্রিন)। তা'হলে মাঠের ম্যাজিক কোথায়? শুধুই গ্যালারির আবেদনে? হই-হল্লা ফুর্তিতে? হুজুগের চোখ দিয়েই বলি, ক্রিকেটও আছে তো৷ ব্যাটার যখন নিখুঁত টাইমিংয়ে মিডঅনের দিকে বল ঠেলে দিয়ে এক রান নিচ্ছেন, টেলিভিশনের অত্যাধুনিক টেকনলোজিও কিন্তু দর্শকের কাছে মাঠে-শুনতে পাওয়া বল-ব্যাটে-পড়ার ঠকাস্ জাদু-শব্দের ইকো পৌঁছে দিতে পারছে না৷ অর্থাৎ বাড়ির সোফায় বসা 'আমি'র কাছে যে'টা স্রেফ 'রোহিত এক রান নিয়ে স্ট্রাইক রোটেট করল' মার্কা নিরামিষ একটা ব্যাপার, মাঠে বসা 'আমি'টি কিন্তু প্রায় লাফিয়ে উঠছি "কী মারাত্মক কন্ট্রোল রেখে খেললো, কী মাপা টাইমিং" বলে৷ আমার পাশের হাজার হাজার মানুষও প্রতিটা ছোটখাটো ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, সেই উচ্ছ্বাস আমায় স্পর্শ করছে, উজ্জীবিত করছে, ইন্সপায়্যার করছে। আবারও বলি, মাঠে বসে ব্যাট-বলের (বা স্টাম্পে-বলের) যে খটাস শব্দ, সে ম্যাজিক টিভিতে ট্রান্সফার করা বোধ হয় সম্ভব নয়৷ 




আর একটা ব্যাপার৷ রান জমে ওঠার ব্যাপারটা মাঠে বসে যেন আরও একটু গভীর ভাবে অনুভব করা যায়৷ সে'খানে বিজ্ঞাপন বিরতি নেই, পাশের ঘর থেকে হেঁটে আসা নেই, চ্যানেল পালটানো নেই, রেগে টিভি বন্ধ করে দেওয়াও নেই। আছে শুধু ক্রিকেটের অমোঘ সব সংখ্যা। কয়েক হাজার মানুষ সেই সংখ্যাগুলোকে এস্কেপ করতে পারছেন না৷ এই যেমন আজ। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের রান ২৬৩৷ আজ গোটা দিন এই সংখ্যাটাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে৷ একটানা হিসেব করে চলেছি 'ডেফিসিট' আর কত৷ বাড়িতে খেলা দেখতে বসেও তাইই করি, কিন্তু মাঠের উত্তাপের সঙ্গে তুলনা চলে না৷ আজ খেলা দেখে এলাম, আগামী হপ্তাখানেক মনের মধ্যে এই ২৬৩ সংখ্যাটা ভাইব্রেট করে চলবে। এখানে ওভার শেষে বিজ্ঞাপন হচ্ছে না, আছে শুধু ঢাউস স্কোরবোর্ড। মেক্সিকান ওয়েভের ভিড় থেকে উঁকি মেরে দেখছি; স্কোরবোর্ড৷ লাঞ্চ কেনার সময়ও চোখ চলে যাচ্ছে স্কোরবোর্ডের দিকে। প্রতিটা রান যেন ইলিশের দামে কেনা হচ্ছে, বিশেষত কোহলি আউট হওয়ার পর থেকে। প্রায় প্রতিটা রান, প্রতিটা উইকেট এক একটা গল্পের মত মনের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। হাতের ফিটনেস ওয়াচ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে হার্টরেট এক্কেবারে চালিয়ে খেলছে, বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে এই ম্যাচটাই যদি দেখতাম, ধুকপুকানিটা এমন জমাট বাঁধত না৷ অশ্বিন আর অক্ষরের (অক্সর লিখব?) পার্টনারশিপ যখন একশো ছুঁল, মনে হল গোটা দিন বাগানের মাটি কোপানোর পর এ'বার চারাগাছ লাগানোর সময় এসেছে৷ কাজেই হা-হা শব্দে লাফালাফি যে শুরু করবই, এ'তে আর আশ্চর্য কী। কারণ স্টেডিয়ামে থাকা মানে, আমিও যে ওই স্কোরবোর্ডেরই অংশ। স্কোরবোর্ডে গ্যালারির উপস্থিতি নামহীন হতে পারে, তবে অদরকারী নয় কোনও মতেই। তা, এই গ্যালারির খ্যাপাটে মানুষজনদের কথা কি বিসিসিআই আর একটু দরদ দিয়ে ভাববে না? ভাবলে তেমন ক্ষতি হবে না কিন্তু, মাইরি।