Friday, March 27, 2026

লাল চা

- মিন্টুদা। একটা লাল চা। ক্যুইক।

- বসো। শিঙাড়া ভাজছি।

- না। শুধু চা।

- বিস্কুট? 

- শুধু চা।

- এই দিই। দু'মিনিট জিরোও।

- মিন্টুদা। ব্যাপারটা ভালো বুঝছি না।

- সে তোমার মেজাজ দেখেই ধরেছি।

- সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।

- চিনি দিই হাফচামচে?

- দাও। জানো, আর ভাল্লাগেনা।

- জানি আর কতটা। তবে খানিকটা ঠাহর করতে পারি।

- সেই মার্ফির গল্প। হোয়াটএভার ক্যান গো রং, ইজ ডেফিনিটলি গোয়িং রং। 

- এই যে, চা।

- দাও...আহ্‌। শিঙাড়া ভাজা হয়ে গেলে এসো। গপ্প করি।

- বলো না। এইত্তো। বসলাম।

- ও মা। শিঙাড়া? 

- না-ভাজা শিঙাড়ারা তো পালিয়ে যাচ্ছে না। খদ্দেরের ভিড়ও নেই। বসি। 

- পালিয়ে যাওয়াটা অপশন নয়।

- কীসের থেকে পালাতে চাও জানি না। তবে হ্যাঁ, ও'পথে না যাওয়াই ভালো।

- বিড়ি আছে?

- আছে। তবে তোমার তো ও নেশা নেই, থাক তা'হলে।

- ধুস। 

- শিঙাড়ার ব্যাপারটা বরং ভেবে দেখো। বিড়ির চেয়েও পায়াওরফুল।  

- মাঝেমধ্যে মনে হয় ব্যাপারগুলো ঠিক হচ্ছে না। অন্যায় হচ্ছে। আবার পরক্ষণেই মনে হয় সমস্তটাই ডিজার্ভ করি।

- তোমার মুখচোখ বেশ বসে গেছে।

- হেহ্‌।

- নিজের জন্য মুড়ি মেখেছিলাম৷ সর্ষের তেল, চানাচুর, কাঁচালঙ্কা দিয়ে। আনি হাফবাটি।

- উফ। শিঙাড়া পেরিয়ে আসল জিনিসে পৌঁছনোর জন্য কত কসরত করতে হলো।

- এই তো সেই উজ্জ্বল মুখ। সাবাশ। রুকো। এখুনি আসছি।

Tuesday, March 24, 2026

পসার

 - প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড। ফেলো-প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে গায়ে পড়ে খেজুর আমি পারতপক্ষে করি না। কিন্তু আপনাকে জিজ্ঞেস করতেই হচ্ছে। আচ্ছা, অ্যাস্ট্রলজিতে আপনার ইন্টারেস্ট আছে?

- আমি আদৌ মাইন্ড করছি না। আড়াই ঘণ্টার ট্রেন জার্নিতে কোম্পানি ব্যাপারটা মন্দ নয়। তবে সরি টু ডিস্যাপয়েন্ট, ও বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহ বা বিশ্বাস কোনোটাই নেই।

- ওহ। আই সী। আসলে আপনার মুখের মধ্যে একটা অদ্ভুৎ..।

- আপনি কি জ্যোতিষী নাকি মশাই?

- হে হে। যদিও আপনার বিশ্বাস নেই। তবু, আসুন। এই আমার কার্ড।

- ওরে বাবা। বেশ পসার আচ্ছে দেখছি আপনার।

- দুর্গাপুর চলেছি একজন পলিটিশিয়ানকে গাইড করতে। অ্যাসেম্বলিতে কনটেস্ট করতে চলেছেন, তাই।একটু কনসাল্ট করতে চেয়ে ডাকলেন। হাই ফিজের ভয় দেখিয়েও ভদ্রলোককে দমানে গেলো না। হেঁ হেঁ। 

- বাহ। 

- আপনার মুখের মধ্যে একটা..একটা অদ্ভুৎ..একটা অদ্ভুৎ..।

- অদ্ভুৎ কিছু রয়েছে? ফিউচারে? সে'সব জানতে আপনাদের হাত দেখার দরকার পড়ে না?

- পামিস্ট্রি বাদেও তো কত কিছু রয়েছে। 

- যেমন ফেস রীডিং?

- ঠিক তাই।

- তা আমার মুখে কিছু দেখলেন নাকি মিস্টার চন্দ্র?

- সামনের হপ্তায় কিছু উইন্ডফল মানি এক্সপেক্ট করতে পারেন।

- বলেন কী!

- অঙ্কটা হাতে পড়লে আপনার মাথা ঘুরে যাওয়া উচিৎ।  তবে কত টাকায় আপনার মাথা ঘুরবে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।

- পামিস্ট্রিতে আমার বিশ্বাস নেই তবে টাকায় আছে। কাজেই আপনার কথা ফললে খুশিই হবো।

- সমস্যা হল, ও টাকা আপনি ভোগ করতে পারবেন না। ও টাকা বিষাক্ত। অবিশ্যি, মানি মানেই পয়জন।

- মানুষে গুণ্ডা লাগায় শুনেছি। তবে সমু আমার পিছনে জ্যোতিষী লাগিয়েছে জেনে হাসি পাচ্ছে।

- সমু? ব্যাপারটা আমি তো ঠিক..।

- মেজোকাকা আমার নামে ওর সম্পত্তি উইল করে গেছে। সমু যদিও কাকার নিজের ছেলে কিন্তু সে একটা লম্পট৷ সে ডিজার্ভ করে না এক পয়সাও। কাকা সে'টা জানতেন। আজ সে যদি ভেবে থাকে জ্যোতিষ দিয়ে আমায় শাসাবে..।

- কোনো একটা ভুল হচ্ছে বুঝলেন..। আমার প্রেডিকশন কিন্তু খাঁটি..!

- অতগুলো সীট খালি। আপনি উঠে গিয়ে অন্য কোথাও বসবেন না আমি উঠবো?

- ইয়ে, মাইরি, আপনি নিজের বেস্পতির পোজিশনটা যদি জানতেন..।

- সমুকে এক পয়সা আমি দেব না। ওকে বলে দেবেন। রাস্কেল একটা!

***

- হ্যালো! সমুবাবু। কাজ হয়ে গেছে।

- গুড। পুলিশের নজর পড়েনি তো?

- রেলে কাটা পড়াও তো পুলিশ কেস। তবে চিন্তা নেই, ধাক্কার ব্যাপারটা কেউ ধরতে পারবে না।

- যাক।

- আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু নিরামিষ ভাবে ব্যাপারটা সলভ করতে। ভদ্রলোকের বেস্পতি যে কী ব্লাডথার্স্টি হয়ে বসেছিল সে'টা ওঁর মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। এত করে বোঝালাম তবু ওয়ার্নিং শুনলেন না। জ্যোতিষ ব্যাপারটাকে স্রেফ উড়িয়ে দিলেন৷ 

- অ্যাস্ট্রলজির ভাঁওতা ছেড়ে খুন করার সাইন্টিফিক প্রফেশনটা নিয়েই থাকুন না। সে'দিকেও তো কম পসার অর্জন করেননি।

- কিন্তু অ্যাস্ট্রলজিই যে আমার রিয়েল প্যাশন মশাই।।জানেন, আমার প্রেডিকশন একটাও ফেল করেনি এদ্দিনে। সে কথাই আপনার ঢ্যাঁটা দাদাটিকে বোঝাতে গেলাম। কত করে বললাম এই টাকাটা বিষাক্ত,  এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কিন্তু চন্দ্র জ্যোতিষীর কথা ভদ্রলোক বাসি করে ছাড়লেন। 

- থ্যাঙ্ক গড।

Monday, March 16, 2026

শুরু

- হ্যান্ডস আপ! আমার পকেটে রিভলভার আছে। কোনোরকম চালাকি করলেই পকেট থেকে বের করে গুড়ুম!

- আমোলোযা! পকেটে বন্দুক রেখে হ্যান্ডস আপ বলতে নেই, তাক করে বলতে হয়..!

- ওহ, তাই কি?

- আলবাত। সিনেমায় দেখোনি?

- তবু। হ্যান্ডস আপ করুন না প্লিজ।

- সর্বনাশ! এ লাইনে এসে "প্লিজ"? ভাই। তুমি আজ এসো। আমিও এগোই, সোয়া বারোটার লোকালটা পেয়ে যেতে পারি। আর পারলে কাল থেকে সল্টেড বাদাম বিক্রিতে নেমে পড়ো। রাহাজানিতে ফিউচার নেই তোমার।

- ইয়ে, আমার পকেটে কোনো বন্দুক নেই। জানেন। 

- আঁচ করেছিলাম। ওই নেলাবোলা রিস্ট নিয়ে পিস্তল চালানো সহজ না।

- পঞ্চাশটা টাকা দেবেন?

- না।

- কুড়ি?

- তোমার দ্বারা দেখছি বাদাম বিক্রিও হবে না।

- সরি। কিছু মনে করবেন না। আসলে প্রথম অ্যাটেম্পটেই একদম খালি হাতে ফিরব..সে'টা ভেবে একটু দমে যাচ্ছি। এমনিতে কিছু টাকা পয়সা আমার কাছে আছে। মানে, আমি বেগ করছি ভাববেন না। 

- আই সী। বেশ। এই নাও, একশো টাকা। আর শোনো, আপাতত রিভলবার যেহেতু নেই; একটা ছোরা রাখলেই পারো তো।

- থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ দাদা।

- তুমি আমায় নিতাইদা বলে ডাকবে। আমার মন বলছে আবার দেখা হবে। 

- আমার নাম..।

- যদ্দিন লাইনে আছ, কাউকে নিজের নাম বলতে যেও না। কেমন?


**

নিতাইবাবু আজ রিটায়ার করলেন। বাহান্ন বছরের কেরিয়ারে শেষ মক্কেলের পকেট কেটে মাত্র একশো সত্তর টাকা পাওয়া গেছিল। তা থেকে আবার একশো ফেরতও দিতে হলো। তবে ব্যাপারটা বেশ ভালোই লেগেছে। ছেলেটি সরলমতি, নিতাইবাবুর ভালো লেগেছে তাকে। সে ব্যাটাকে সামান্য কোচিং দিলে একটা জীবন পাল্টে যেতে পারে। এখন তো এমনিতেই অখণ্ড অবসর।

এ লাইনে নেমে নিতাইবাবু চিরকাল শুধু নিয়েই গেছেন, কিন্তু আজ সামান্য একশো টাকা দিয়ে বেশ অন্যরকম ভালো লাগলো। এ'বার কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার সময়। কোচিং ক্লাসটা খুলে ফেললেই হয়। ট্রেনের জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজলেন নিতাইবাবু।

Saturday, March 14, 2026

তল্পিতল্পা নিয়ে এ'বার

- ভাইটি, এ'বারে সন্ন্যাস নেব।

- অফিসে গোলমাল হয়েছে?

- আমার আবার অফিস। তার আবার গোলমাল। 

- সংসারে সমস্যা?

- আমার আবার সংসার। তার আবার  সমস্যা।

- ব্লাডশুগার? ব্লাড প্রেশার?

- আমার আবার ব্লাড। তার আবার শুগার। 

- তব আর কী। তল্পিতল্পা নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।

- আমার আবার তল্পি। তার আবার তল্পা।

- তা, হিমালয়? না জঙ্গল?

- কী হবে? হিমালয়ে? কী পাবো? জঙ্গলে?

- তবে তো দাদা ভারি সমস্যায় পড়া গেলো। একবারটি কাঁচরাপাড়া ঘুরে আসবেন নাকি। শুনেছি সে'খানে এক রিমার্কেবল বাবাজি এ'সে ক্যাম্প করেছে মাসখানেক। গাঁদাফুল হোমের আগুনে পুড়িয়ে থেঁতো করে একধরণের টোটকা দিচ্ছে যা'তে নাকি হাঁপানি টু স্পন্ডেলাইসিস সব সেরে যাচ্ছে।

- রোস্টেড গ্যাঁদায় কী হবে বলো। রিলীফ চাই না, চাই মুক্তি। 

- সন্ন্যাস ছাড়া তবে গতি নেই।

- নেই। নেই। নেই।

- অতএব?

- অতএব চলো দু'রাউন্ড ফুচকা খেতে খেতে প্ল্যান করি হিমালয় না জঙ্গল। 

- চলুন। আর মায়া বাড়িয়ে কী হবে।

- হরি হে মাধব, পথ দেখাও বাবা। পথ দেখাও। 

Friday, March 13, 2026

শুগার-ফ্রি



- আপনাদের এ'খানে শুগারফ্রি মিষ্টি কিছু আছে কি?

- গাঁয়ের মিষ্টির দোকান স্যার। ও'সব জিনিস এখানে বিক্রি হয় না। 

- আই সী।

- আর বলেন কেন। সে'দিন মন্টু হালদার দোকানের ওপর সে কী বিশ্রি তম্বি করে গেল। কী? না দানাদারটা নাকি যথেষ্ট মিঠে হয় নি, ভাবুন দেখি অবস্থাটা। কাজেই শুগারফ্রি মিষ্টি চাইলে আপনাকে টোটো বা সতেরো নম্বর বাসে উঠে পড়ে সোজা যেতে হবে টাউনে। সে'খানে রয়েছে অরবিন্দ সুইটস। সে'খানে আপনি ও'সব ফ্যাশনে মিষ্টি পেলেও পেতে পারেন।

- ভারি সমস্যায় পড়া গেল। এনিওয়ে, আপনাদের এ'খানে কম মিষ্টি দেওয়া আইটেম কিছু আছে কি?

- শিঙাড়া আছে। নিমকি আছে। তারপর গিয়ে ধরুন এই সন্ধে নামলে আলুরচপ ভাজা হবে।

- মিষ্টির কথা বলছি যে। শুগারফ্রি।

- আমাদের এ'খানে সব মিষ্টিই এক্কেবারে চাবুক মিষ্টি বুঝলেন কি না। তা, আপনি বোধ হয় এ'দিকে ঘুরতে এসেছেন?

- আমি যাচ্ছি বর্ধমান। ওই সামনের ওই গাড়িটা আমার। লাঞ্চ সঙ্গেই এনেছিলাম। শুধু খাওয়ার পরে একটা মিষ্টি না হলে আমার চলে না। কিন্তু আমি আবার প্রি-ডায়বেটিক কিনা, শুগারফ্রি মিষ্টি না হলে...।

- নাহ্‌। ও জিনিস এ'খানে পাবেন বলে মনে হয় না। একটা রসগোল্লা বরং খেয়েই নিন।

- খেয়ে নেব?

- নিন না। গাঁয়ের রসগোল্লা, শহরের ওই ঘেসো স্পঞ্জ মাল নয়। জিভে লেগে থাকবে। আজ খাবেন, সামনের মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সে স্বাদ জিভে লেগে থাকবে।

- না, থাক। 

- এই যে কড়াকড়ি, ডাক্তারের নির্দেশ না গিন্নির? কী মশাই? হে হে হে হে...।

- আমার গিন্নিই যে ডাক্তার।

- ও। না স্যার। আমার দোকানের মিষ্টি আপনি খেতে যাবেন না। এ হচ্ছে মন্টু হালদারের গাঁয়ের দোকান, এ মিষ্টির ওজন আপনার রক্ত বইতে পারবে না।

- ইয়ে, ডায়েট কোক আছে?

- ডায়েট? কোক?

- নেই, না?

- লেবু সরবত খাবেন?

- লাইম সোডা? সল্টেড প্লীজ। নো শুগার। পেপার স্ট্র না থাকলে এমনিই দেবেন। প্লাস্টিকের স্ট্র ব্যাপারটা অ্যাভয়েড করছি আজকাল।

- দাদা, আপনি এ'দিকে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন না। এ গাঁয়ের জলবাতাসে আপনার শুগারকে চাগিয়ে দেবে। তবে ইয়ে, লেবুজলটা আমিই বানাবো। স্পেশ্যাল। আপনার জন্যে। পাতিলেবু, কুঁজোর জল, ফ্রিজের বরফ, আর সামান্য বিটনুন। স্টিলের গেলাসে। পত্রপাঠ সে জিনিস ঢকঢক করে খেয়ে ফেলে গাড়িতে গিয়ে বসুন। নয়তো এই ট্রেতে সাজিয়ে রাখা মিষ্টি থেকে অতি-মিষ্টি রশ্মি বেরিয়ে আপনার বডিতে মিশে যাবে। সে এক কেলেঙ্কারি!

Wednesday, March 11, 2026

সাবজেক্ট



- এক্সকিউজ মি! আমিই শ্রী অনিকেত সামন্ত।

- অতএব?

- ইয়ে...মানে?

- আপনার নাম অনিকেত সামন্ত। অতএব আমায় কী করতে হবে?

- আমার যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল আপনার সঙ্গে! আজ সকাল সোয়া দশটায়! আমি কিন্তু সাত মিনিট আগেই চলে এসেছি। এই আপনার বারান্দায় ঘুরঘুর করছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম একদম সঠিক মুহূর্তে এন্ট্রি নেওয়ার...। যেই না সাড়ে দশটা বেজেছে...আসলে সময় ব্যাপারটা আমার কাছে...।

- বসুন।

- থ্যাঙ্কিউ। থ্যাঙ্কিউ মিস্টার চট্টরাজ। ইট ইজ সাচ অ্যান অনার ট মিট ইউ স্যার...।

- কাজের কথা বললে হয় না?

- কমপ্লিমেন্টটাও যে কাজের কথা স্যার। এই আপনার মত একজন পেল্লায় আর্টিস্টের সঙ্গে দেখা করতে পারাটা যে আমার জন্য কত বড় একটা ইয়ে...।

- সুমন আপনাকে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে আশা করি।

- সুমন? ও...সুমন দত্ত, আপনার সেক্রেটারি। নাইস ইয়ং চ্যাপ। ভারী সদালাপী বুঝলেন। ভারী মিশুকে। হ্যাঁ, উনি আমায় স্পষ্টভাবে সবকিছুই বুঝিয়ে দিয়েছেন।

- আর আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি?

- রীতিমত।

- তবে আর কী। কালকের মধ্যে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে চলে আসুন। সুমন আপনাকে দোতলার একটা ঘরে চালান করে দেবে'খন। বাড়ির নিয়মকানুনও সেই বুঝিয়ে দেবে।

- আমার আবার বাক্স আর প্যাঁটরা, কী যে বলেন মশাই। আমি আজ থেকেই এখানে তাঁবু ফেলতে পারি আর কী। তবে ইয়ে, আপনি আমায় একটু বাজিয়ে দেখবেন না?

- আমি আর্টিস্ট। আমি আপনার পোর্ট্রেট আঁকব। একটা নয়, অনেকগুলো। বছরখানেক ধরে। আপনি আমার কাছে একটা অন্যরকমের সাবজেক্ট। আপনার মধ্যে যা কিছু ইউনিক, সে'টা খুঁজে নেওয়ার দায়িত্বটা আমার। আর আপনাকে বাজিয়ে দেখার কাজ সুমনের ছিল। সে যে নিজের কাজটুকু ভালোভাবেই করেছে সে বিশ্বাস আমার আছে।

- ইয়ে, একটা কথা আপনি জানেন কিনা জানি না। আমি কিন্তু এককালে আঁকিয়ে ছিলাম।

- বটে? রিয়েলিস্ট? ইম্প্রেশনিস্ট...?

- আজ্ঞে, এককালে হিন্দি ছবির পোস্টার আঁকতাম। সিনেমা পাড়ায় কিঞ্চিৎ সুনামও অর্জন করেছিলাম এক কালে। তারপর ওই কালের ফেরে যা হয় আর কী। আজকাল তো সবকিছুই লারেলাপ্পা।

- কিছু মনে করবেন না। আমি একটু ঠোঁটকাটা মানুষ। সিনেমার পোস্টার ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা লারেলাপ্পা ব্যাপার। এগেইন, প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড।

- হেহ্‌। না না, বিন্দুমাত্র না। তা আপনার কাজ কবে শুরু হচ্ছে?

***

- আই অ্যাম রিয়েলি সরি সুমন। চট্টরাজবাবু আচমকা এভাবে চলে যাবেন...ওয়েল, আমরা কেউই ভাবিনি। হি ওয়াজ রিমার্কেবলি ফিট ফর হিজ এজ।

- হ্যাঁ। উনি বেঁচে থাকলে এই পোর্ট্রেট সিরিজটা কমার্শিয়ালি বাজার এস্পারওস্পার করে দিত। তাই না মিস্টার শাসমল?

- সে'টা ভেবেই তো ওঁকে কমিশন করা। এ'রকম অভিনব কাজ ভূভারতে এর আগে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যাক গে, সিরিজটা হল না বটে। তবে একটা পোর্ট্রেট যে'টা ভদ্রলোক এঁকে যেতে পেরেছেন, সে'টার দাম এখন দশগুণ হবে গ্যারেন্টি দিচ্ছি। সাবজেক্ট হিসেবে আপনার এই অনিকেত সামন্ত সত্যিই পাওয়ারফুল। ওঁর সঙ্গে একবার দেখা করা যায়? উনি কি অন্তত একবার একটা পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স দিতে রাজি হবেন?

- সম্ভবত না। চট্টরাজবাবু যে'দিন মারা গেলেন সে'দিন তিনিও বেশ উদাস ভাবি 'চলি' বলে সরে পড়লেন।

- স্যাড। ভেরি স্যাড। যা হোক, আমি আর্টিস্ট নই। তবে আর্টের ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই বিলক্ষণ বুঝি। তবে কথা দিচ্ছি এ ছবি অনেক দূর যাবে।

- ইয়ে। আর একটা পোর্ট্রেট আছে।

- এক্সকিউজ মি? চট্টরাজবাবু দু'টো ছবি এঁকে গেছেন? জ্যাকপট! আরে আগে বলবেন তো মশাই!

- তা ঠিক নয়। বুঝিয়ে বলছি। আপনি এদিকে আসুন।

- চলুন।

- এই যে মিস্টার শাসমল। এই হল দ্বিতীয় পেন্টিং। মিস্টার চট্টরাজ মারা যাওয়ার পর এ'টা আমি আবিষ্কার করি।

- মাই গুডনেস! মাই... গুডনেস!

- এই ছবিতে চট্টরাজবাবু নিজেই সাবজেক্ট।

- সুমনবাবু, আমি হলফ করে বলতে পারি যে আর্টের নিরিখে এ পোর্ট্রেটের স্থান চট্টরাজবাবুর শেষ পোট্রেটের চেয়ে অনেক উপরে। এ'টা কে এঁকেছে বলুন দেখি?

- ছবির নীচে অনিকেত সামন্তর সই আছে।

- ও মাই গড!

- আপনি চট্টরাজবাবুকে দিয়ে পৃথিবীর প্রথম ভূতের পোর্ট্রেট আঁকাতে চেয়েছিলেন। আমি অনেক খেটেখুটে সে ব্যবস্থা করেও দিয়েছিলাম। ভূতের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করে তাঁকে সাবজেক্ট হতে রাজি করানো যে কী হ্যাপা। নেহাত সামন্তবাবু এককালে নিজেই ছবি আঁকতেন, তাই এই আর্টের জন্য জ্যান্ত মানুষের সামনে বসতে আপত্তি করেননি। তা, এ ছবির দাম কেমন হবে?

- মিলিয়নস! ডলারে। মানুষকে দিয়ে আঁকানো ভূতের ছবির ভালো দাম পাবেই তা জানতাম। কিন্তু এ যে ভূতের হাতে আঁকা মানুষের ছবি! ওরেবাবা! এ তো অমূল্য। এ ছবি আপনার আমাকে দিতেই হবে, কমিশনে আমি আপনাকে লাল করে দেব সুমনবাবু।

***

অনিকেত সামন্তর রেখে যাওয়া চিরকুটের ব্যাপারটা শাসমলকে না জানানোটাই ঠিক মনে করলেন সুমন। শাসমল চলে যেতে বুকপকেট থেকে কাগজের টুকরোটা বের করে ফের একবার পড়লেন তিনিঃ

"সুমনবাবু।

চলি।

চট্টরাজবাবু ভালো শিল্পী, তবে অহঙ্কারি। ফিল্মের পোস্টার আঁকার ব্যাপারে তাঁর অবজ্ঞা আমার মোটে ভালো লাগেনি। তাই একটা হঠকারী কাজ করে ফেললাম আর কী।

আর হ্যাঁ, আমিও একটা ছবি এঁকেছি। বোদ্ধাদের দিয়ে যাচাই করিয়ে দেখবেন কার শিল্পবোধ বেশি গভীর; পদ্মশ্রী শিল্পী চট্টরাজের না এই এলেবেলে পোস্টার আঁকিয়ে সামন্তর।

ইতি,

ঁঅনিকেত।" (ছবিঃ চ্যাটজিপিটি)

Tuesday, March 10, 2026

স্কিড

- ও দাদা, ঠিক আছেন? চোট-টোট...?

- সারপ্রাইজিংলি শুধু রিস্টওয়াচটা গেছে দেখছি...। এহ..ডায়ালটা এক্কেবারে... আর এই কনুইটা সামান্য...।

- অল্পের ওপর দিয়ে গেলো তো তা'হলে। যে'ভাবে ট্রাকটা আপনার স্কুটার ঘেঁষে বেরোলো আর আপনি স্কিড করে পড়লেন...।

- আর বলবেন না, টার্ন নিতে গিয়ে আচমকা দেখি আমার ডান দিক থেকে...। আসলে ট্রাকটা এমনভাবে চেপে দিলে আমায়...ড্রাইভারটা বেহেড মাতালের মত চালাচ্ছিল...।

- দাঁড়ান...স্কুটারটা তুলি আপনার...। 

- আমি...আমি পারব...।

- এক মিনিট...এই যে...তা আপনি কি পারবেন চালাতে?

- হ্যাঁ হ্যাঁ, কোনও অসুবিধে হবে না।

- দু'মিনিট জিরিয়ে নিন। তারপর না হয়। হাফ-কিলোমিটারের মধ্যে একটা ডিসপেনসারি আছে।

- দত্ত মেডিকেল তো? হ্যাঁ চিনি। সে'দিকেই যাব ভাবছি।

- হাঁটু-টাঁটুও চেক করে নিন...। ঠিকই আছে অবশ্য যা মনে হচ্ছে। এক মিনিট, আমার ব্যাগে একটা জলের বোতল আছে। একটু চোখে মুখে দিন...।

- থ্যাঙ্কিউ। কিন্তু ইয়ে, আপনার কাঁধে তো কোনও ব্যাগ-ট্যাগ দেখছি না...।

- এই দেখেছেন, ব্যাগটা ফেলে এসেছি স্পটে।

- স্পটে?

- বেহেড মাতাল ট্রাক ড্রাইভারটা আপনার স্কুটারকে চেপে দেওয়ার মিনিট দশেক আগে আমার সাইকেলটা রগড়ে দিয়ে গেলো বুঝলেন। ব্যাটার গতিপ্রকৃতি দেখেই ঠাউরেছিলাম এমন আরও কাণ্ড ঘটাবে আজ। হতচ্ছাড়াকে একবার হাতের কাছে পেলে...।

Sunday, March 8, 2026

বড়ম্যাচ

- এই যে, দীপক। তোমরা নাকি মেস ছেড়ে দল বেঁধে মনোহরবাবুর বাড়িতে খেলা দেখতে যাচ্ছ?
- যাচ্ছি তো। আপনিও চলুন না রায়দা। বেশ গল্প আড্ডা হবে। তা'ছাড়া মনোহরবাবুর নতুন রাঁধুনিটি শুনেছি গুণী মানুষ। অতএব সুখা ক্রিকেট দিয়ে দিন শেষ হবে না।
- তোমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে?
- বুঝলাম না। আরে, সেই যে! সে'বার ঘটা করে আমরা সবাই মনোহরবাবুর বাড়িতে টেস্ট ম্যাচের ফিফথ ডে টেলিকাস্ট দেখতে গেলাম। অবধারিত জেতা ম্যাচ খুইয়ে বাড়ি ফিরলাম।
- খুইয়ে মানেটা কী। আপনি তো খোয়াননি। টিম হেরে গেলো। ক্রিকেটে অমন হয়।
- এক সেকেন্ড। আর তার বছরখানেক আগের ব্যাপারটা? মনোহরের সোফায় আমি বসা মাত্রই আজহারের হাতের সেঞ্চুরি ফসকে যাওয়াটা? সে'টা কিছু নয় বলছ?
- আপনি তো আর আজহারকে রানআউট করিয়ে দেননি। সে ঘটনায় আপনার, বা মনোহরবাবুর বাড়ির সোফা বা সে টিভির কোন ভূমিকা নেই।
- মাই গুডনেস! আধুনিক যুগের মানুষ তোমরা, ইয়াং টার্কস! তোমরা ডেটা রিফিউস করছ?
- এ'টা ডেটা?
- এক্সেলে টেবিল বানিয়ে দিলে বুঝতে কি সুবিধে হবে?
- রায়দা। আপনার সঙ্গে বাজে গল্পে আটকে থাকলে আমার স্নানের লাইন মিস হয়ে যাবে। ভুতো আর বিপিনবাবুর পর ঢুকতে হলে আমার সেই সন্ধে হয়ে যাবে। মনোহরবাবুর বাড়ি যেতে হবে স্নান না করে। রোববারের স্নানটা আবার আমার কাছে পিলিগ্রিমেজ।
- যা হোক, তোমরা লায়েক হয়েছ। আজ মেসের বাজার সামলাচ্ছো, কাল অফিস, পরশু দেশ সামলাবে। শুধু ভেবে দেখো, ভজার চায়ের দোকানে বসে তোমরা অন্তত খান চারেক সিরিজ আর টুর্নামেন্ট জয় দেখেছ। এগেইন, ডেটা কথা বলে ভায়া।
- তা অবিশ্যি ঠিক।
- মানছি। ভজার দোকানের বেঞ্চিতে মনোহরবাবুর এসির হাওয়া খাওয়া সম্ভব নয়। মানছি বেচারি ভজা চা আর মামলেটের বেশি কিছু সাপ্লাই করতে পারে না। কিন্তু স্রেফ আরাম আর মুর্গি পোলাওয়ের লোভে অমন হান্ড্রেড পার্সেন্ট হেরো জায়গায় গিয়ে তোমরা দেশকে ডোবাবে, সে'টা যে পুরোপুরি সেলফিশ আর সুইসাইডাল, গুরুজন হিসেবে এ কথা আমি বারবার বলবো।
- ব্যাপারটা...ব্যাপারটা নেহাত ভুল বলেননি...ভুতোও কথাটা বলেছিল বটে একবার।
- ভুতো অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে। জিমেটিমে যায় বটে, তবে এখনও মাথাটা তেমন মুটিয়ে যায়নি।
- শুধু মনোহরবাবু যে কী মনে করবেন...।
- কিচ্ছুটি না। ভদ্রলোক নিজেও ব্যাপারটা ভালো ভাবে বুঝবেন। তুমি চাইলে আমি নিজে কনভে করে দেব ভদ্রলোককে।
- সেই ভালো। আমি গিয়ে বাকিদের বলি। এতদিন পর এত বড় একটা ফাইনাল..। চান্স নেওয়াটা ঠিক হবে না।
- তাই তো বলছি...।
- ইয়ে, আপনি তা'হলে...।
- আমার জন্য আবার রথতলার শ্যামা ইলেটকট্রনিক্সের রাস্তার দিক তাক করা পেল্লায় টিভি সেটটা ভীষণ লাকি। মনে নেই সে'বার একা হাতে লাস্ট ইনিংস চেজটা ম্যানেজ করে দিচ্ছিলাম? কী ভীমরতি ধরল পান খাওয়ার জন্য খানিকদূরের পান দোকানে গেলাম আর শচিন আউট। ব্যাস, খেল খতম।
- বেশ। সে কথাই রইলো। আমি বাকিদের কনভিন্স করছি।


******

- আরে, রায়বাবু যে। আসুন আসুন। তা আপনাদের মেসের দলবল কই...।
- তাঁরা আজ আসতে পারলে না বুঝলেন। ইয়ং ছেলেপুলের দল। ও'দের আবার হইহই ছাড়া কিছুই জমে না। আমরা আবার খানিকটা সিনিয়র, তাই হাই ভোল্টেজ সিচুয়েশনে ঠিক খোলতাই করে চেলামেল্লি করতে পারে না। অতএব বুঝতেই পারছেন...।
- বটেই তো বটেই তো। বেশ তো। যাক আপনি এসেছেন। আমার একজন সঙ্গী হলো।
- আমার আবার হইহট্টগোল না-পসন্দ বুঝলেন। এই দু'জন মিলে গা এলিয়ে একটু খেলা দেখবো। উপভোগ করবো। বাজে গল্প কানে আসবে না। সমস্ত ফোকাস শুধু ম্যাচে। এই দল বেঁধে খেলা দেখলে সেই ফোকাসটা নষ্ট হয়ে যায়।
- তা তো ঠিকই। তা, ম্যাচ শুরু হল বলে। রতনকে বলি চায়ের সঙ্গে কিছু ভাজাভুজির ব্যবস্থা করতে।
- আপনার রতনের সুনাম আছে কিন্তু বেশ বাজারে। তা, ওঁর হাতের মোরগ পোলাওটা নাকি লেজেন্ডারি?

পল্টুবাবুর দোকান

- আরে! কদ্দিন পর এলেন বলুন দেখি।
- কদ্দিন আর কই। এই তো সে'দিন তোমার দোকানে বসে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে গেলাম সমরদের সঙ্গে। চা আর মামলেট অর্ডার করলাম। জোরাজুরি করা সত্ত্বেও মামলেটের দাম নিলে না, সে'টা নাকি আমার জন্য অন দা হাউস।
- সে তো গেলো মাসে। যাক গে, বসুন। আজ পেঁয়াজি ভাজা হচ্ছে।
- বেশ বেশ। দিয়ো দুটো। তবে আগে চা দিতে বলো পল্টু। গলা না ভেজালেই নয়।
- আপনাকে বেশ ক্লান্ত লাগছে দত্তদা। রোদ্দুরে ঘোরাঘুরি হয়েছে বিস্তর কি?
- ওই সেই পেনসন আটকে যাওয়ার ব্যাপারটা। এই নিয়ে টাকাটা চার মাস জমা হয়নি। গতকাল জানলাম লাইফসার্টিফিকেটে কোনো সমস্যা আছে। তা নিয়ে আজ বিস্তর ছোটাছুটি হলো।
- তা সমস্যা মিটেছে কি?
- আশা করি। সামনের মাস পড়লে বুঝবো। বুড়োবুড়ির সংসার। বুঝতেই পারছো, তিনমাস ব্যাঙ্কে টাকা জমা না পড়লে...।
- বিলক্ষণ। আসুন, এই যে। আপনার স্পেশ্যাল আদা চা।
- আহ। তৃপ্তি। গিন্নীকে আমি বার বার বলি, পল্টুর হাতের চায়ে যে কী একটা ম্যাজিক রয়েছে...।
- আজ পেঁয়াজিটা কিন্তু ভজন ভাজছে। ওই মেদিনীপুর থেকে যে ছোকরাটা এসেছে আর কী। ভালো খারাপ; সব দায় সে ব্যাটার। পেঁয়াজিটা নতুন ইন্ট্রোডিউস করলাম আজ দোকানে, কাজেই ওটার দাম দিতে যাবেন না। আপনাকে টেস্ট করিয়ে শুভারম্ভ হবে'খন।
- আহ, রোজ রোজ এলেই যদি দামটাম না নিয়ে খাইয়ে যাও, তাহলে তো আসা মুশকিল।
- রোজ রোজ আর আপনাকে পাচ্ছি কই দত্তদা।
- বেড়ে গন্ধ ছড়িয়েছে তোমার পেঁয়াজির।
- ভজনা, চারটে পেঁয়াজি এ'দিকে দিয়ে যা বাবা।
- আবার চারটে কেন...।
- খান না, খান। আমি দেখি।
- পল্টু, আমি খেয়াল করেছি যে'দিন থেকে আমি সমরদের পেনসন আটকে যাওয়ার ব্যাপারটা বলেছি...তুমি...।
- আজ্ঞে, আমি একটু ও'দিকটা দেখে আসছি...খদ্দেররা বসে রয়েছে...দোকানের ছেলেগুলো এমন ফাঁকিবাজ হয়েছে বুঝলেন...আমি না কড়া হাতে সুপারভাইজ না করলে...।
- আমি কিন্তু একদম ব্যাঙ্করাপ্ট নই হে, পকেট একদম গড়ের মাঠ নয়...ওই দ্যাখো...চলে গেলো।...এই...এই যে...তুমিই ভজন? দেখি কেমন ভেজেছ পেঁয়াজি...। দাও...।
পল্টুবাবু খেয়াল করেছেন যে যে'দিন থেকে দত্তবাবুর থেকে তিনি টাকা নিতে ইতস্তত করছেন, সে'দিন থেকে ভদ্রলোক আসাযাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। যে বৃদ্ধ চারমাস হল পেনসন পাচ্ছেন না, তাঁর থেকে টাকা নিতে পল্টুবাবুর মন সরে না। অথচ দত্তবাবুকে নিরস্ত করাও চাট্টিখানি কথা নয়, ভারি ঢিঁট বুড়ো।
ও'দিকে অমন দুর্দান্ত পেঁয়াজিতে কামড় দিয়েও ঠিক সুবিধে করতে পারলেন না দত্তবাবু। ফ্রি মামলেট পেঁয়াজির ঠেলায় এমন সুন্দর আড্ডার জায়গায় আজকাল আর তাঁর নিয়মিত আসা হয় না। পল্টুটা আচ্ছা আহাম্মক।

সঙ্গী


"ওই যে, ওই দিকে। আর ধরুন..এই মাইল দেড়েক"।
"অদ্দূর যেতে পারবো নাকি মশাই। হাঁটুর সিচুয়েশন তো বলেইছি"।
"ক্ষতি নেই। এ'খানেই হাত পা ছড়িয়ে দিব্যি বসা যায়। কফির ফ্লাস্কটা আছে তো আপনার ঝোলাব্যাগে"?
"তা আছে, কিন্তু ভাই...আপনি অনায়াসে ঘুরে আসতে পারেন কিন্তু। এদ্দূর এসে ওই সাররিয়াল ওয়াটারফলটা আপনি আমার জন্য মিস করছেন ভাবলেই..না না..বড্ড খারাপ লাগছে"।
"রেস্টহাউস থেকে একসঙ্গে বেরোলাম। পৃথক ফল নিয়ে ফেরত গিয়ে কী লাভ বলুন"।
"বেশ। গপ্পই হোক"।
"আহা, গপ্প নয়। স্রেফ ছড়িয়ে বসা। ঝর্ণার যে শব্দ আসছে, সে'টাকে আমরা অনার করবো"।
"কফির চুমুকের শব্দটা চলবে তো"?
"সে'টা তো চেরি অন টপ"।
"বেশ। ফ্লাস্ক খুলছি আর মুখ বন্ধ করছি"।
"মিউজিক"।

অবশেষে



অবশেষে
অন্ধকার কেটেছে, ঝড় থেমেছে।

ঝগড়াবিবাদ মিটিয়ে নিয়ে সাদাসিধে মানুষের দল যে যার বাড়ি ফিরেছে।
পুড়ে যাওয়া ট্রান্সফর্মার সারাই হওয়ায় তিনদিনের লোডশেডিং পর্বে ইতি টানা গেছে।

বৃষ্টি থামায় পিচ থেকে কভার সরিয়ে ডাকওয়ার্থ ল্যুইসের অঙ্কে মন দেওয়া গেছে।

সাতটা পোস্টকার্ডের খোঁচা দিয়ে একটা পেল্লায় ইনল্যান্ড লেটারি উত্তর আদায় করা গেছে।

অবশেষে
বম্বের পাড়ায় পাতে দেওয়ার মত ডিমতড়কার সন্ধান পাওয়া গেছে।

মহেন্দ্রনাথ ও নজরুল

ভাঙা আসরে একলা পড়ে রইলেন বাবু মহেন্দ্রনাথ। মঞ্চ থেকে গায়ক বিদেয় নিয়েছেন, বাজিয়েরা সরে পড়েছেন। দর্শকরা শতরঞ্চি এলোমেলো করে গায়েব। সুর কানে একা রয়ে গেছেন মহেন্দ্রনাথ। তাঁর চোখ ছলছল, আর বুকপকেটে শালপাতায় মোড়া জর্দাবিহীন সাদা পান। আজকাল বড় একলা হয়ে পড়েছেন তিনি। এই ফুরিয়ে যাওয়া জলসায় সে একাকিত্ব ইয়াব্বড় হয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। মহেন্দ্রনাথ বাধ্য হয়ে গান ধরলেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠে সুর নেই, তবে প্রাণে আছে। নজরুলগীতিতে প্রাণ ঢাললেই তা জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে, ফিজিক্সের নিয়ম প্রায়।

নজরুল ছুঁয়ে ভেসে চলেছেন মহেন্দ্রনাথ।
গান ভাসছে হাওয়ায়। প্রবল একলা মহেন্দ্রনাথ তখন একাই গানের আসর হয়ে নিজেকে মাত করছেন। একা মানুষের লজ্জা পেতে নেই, মিইয়ে যেতে নেই। জগতসংসারে যে যত একা, তার তত গানের প্রয়োজন, তার তত হাউহাউয়ের প্রয়োজন।

দু'টো নজরুল পেরিয়ে সবে একটা দরদী বাউলে এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় বাবু মহেন্দ্রর রসভঙ্গ হলো।
"মহিন্দর সাহাব, ডু ইউ ওয়ান্ট আ বিয়ার"?
দড়াম করে ক্লাবের বিলিয়ার্ড রুমে এসে পড়লেন বাবু মহেন্দ্রকুমার।

একটা পালিশ দেওয়া "অফ কৌর্স" বলে তড়িঘড়ি সেই বাউল পরিস্থিতি ধামাচাপা দিয়ে লিলির হাতটা নিজের দিকে টেনে নিলেন ভদ্রলোক।

ও'দিকে

এ'দিককার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বপনবাবুর বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। লাউঞ্জে আসা মাত্রই একজন বেশ সুন্দরী রিসেপশনিস্ট এসে মিহি সুরে "ওয়েলকাম" বলে দু'টো ফর্ম ধরিয়ে দিলে। বেশ সাদাসিধে ফর্ম, মিনিট চারেকের মধ্যেই 'ফিল আপ' হয়ে গেলো। প্রম্পটনেস ব্যাপারটা স্বপনবাবু বরাবরই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। কাজেই ফর্ম জমা দেওয়া মাত্রই যখন অন্য আর এক রিসেপশনিস্ট এসে তাঁকে রুম নম্বর সেভেন-বি'তে রিপোর্ট করতে বললো, ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন।
সেভেন-বি'তে নক করতেই একটা বেশ চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "ভিতরে আসুন"। দেখা হলো এক ভারিক্কি মেজাজের মাঝবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে। ইশারায় স্বপনবাবুকে বসতে বলে একটা পেল্লায় ফাইলে মুখ গুঁজলেন ভদ্রলোক। বলাই বাহুল্য ফাইলের ওপর লেখা, স্বপন চট্টরাজ, (জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১, ১২:৩২ / মৃত্যু ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৩)। চেয়ারে জুত করে বসতে ভারিক্কি ভদ্রলোকই কথা পাড়লেন,
"স্বপনবাবু, আমিই এই স্টেশনের ম্যানেজার, সভ্রহেজ্বজা"।
"নমস্কার..সভ্র..হে..ইয়ে"।
"সভ্রহেজ্বজা। এই স্টেশনের ম্যানেজার"।
"এ'রকম স্টেশন আরো আছে নাকি"?
"ন্যাচেরালি। সমস্ত এক্সপায়ারি তো একটা স্টেশনের পক্ষে হ্যান্ডল করা সম্ভব নয়"।
"তা, আমার এখন কী.."।
"আপনার ভেহিকল তৈরি আছে। তা'তে করে সোজা কোয়ার্টার্সে"।
"কোয়ার্টার্স"?
"হ্যাঁ। সে'খানেই ব্যবস্থা। আমি একটা ব্রশার আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি.."।
"না মানে, সভ্রবাবু.."।
"সভ্রহেজ্বজা"।
"বলছিলাম,সে কোয়ার্টার কি স্বর্গ না মানে.. ন..নরক"।
"আজ্ঞে"?
"মানে, স্বর্গ না নরক"?
"ও'সব ছেলেমানুষি কনসেপ্ট আপনাদের মুখে প্রায়ই শুনি। কিন্তু এ'খানে মশাই সবার জন্য পাইকারি হারে একই ব্যবস্থা"।
"সর্বনাশ। এত পুণ্য অর্জন করলাম, সব কি জলে গেল"?
"ওয়ান ম্যানস পুণ্য ইজ আনাদার ম্যানস সিন। আর মানুষ মাত্রই ঢ্যাঁটা, তাদের পলিটিক্সে আমরা মাথা ঘামাইনা। আপনি যা অর্জন করেছেন, তা হিউম্যান কারেন্সি। ও দিয়ে এখানে ফুটুরডুম হবে"।
"আর ইয়ে, রিবার্থের ব্যাপারটা"?
"মানুষের শখ যত দেখি তত অবাক হই বুঝলেন"।
"ওই ব্যাপারটাও তা'হলে.."।
"অবাক। অবাক হই। আপনাদের দেখে। একটা গোটা জীবন ঘ্যানঘ্যান করে কাটিয়ে দিলেন অথচ এ'দিকে আসা মাত্রই রিবার্থ রিলেটেড এনকোয়্যারি"।
"লাস্ট কোশ্চেন। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড স্যার। ভেহিকল যে'টা দিচ্ছেন, সে'টার উইন্ডো সীট পাবো কি? আসলে নতুন এলাকা তো তাই.."।