Monday, October 31, 2016

ডাব্লু টি এফ

চলন্ত মিনিবাস থেকে হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে ধাক্কা লাগলো রবীন্দ্রনাথের সাথে।
ভদ্রলোকের দাড়ির আড়াল থেকে ফিক হাসি স্পষ্ট দেখা গেল।

"ডাব্লু টি এফ", বলে মাথা চুলকে নিলাম খানিকটা। একটা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ওপর আর্টিকল পড়তে পড়তে চোখ লেগে এসেছিল।

এখন হয় কন্ডাক্টর এসে ঘুম ভাঙাবে অথবা...। শিউরে উঠতে হলো। অথবা আমি সত্যিই চলন্ত বাস থেকে নেমেছিলাম কিন্তু...।
স্পটডেড না স্বপ্ন?
ধ্যেত্তেরি, ভদ্রলোকের দাড়ি কাঁপানো মিচকে হাসি তবু থামে না।

**

বাইশ বছর ধরে কন্ডাক্টরি করছেন অনন্ত হালদার। কত রকমের প্যাসেঞ্জারই না দেখলেন। কিন্তু এই প্রথম কেউ তাকে টিকিট ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়লে। খানিক আগেও বাঁ দিকের দ্বিতীয় সারির জানালায় নীল হাফশার্ট পরা ভদ্রলোককে দেখেছিলেন, গোলপার্ক থেকে উঠেছিলেন সম্ভবত। মৌলালির হট্টগোলে হাওয়া।

নীল হাফশার্টের ভদ্রলোকের বদলে যিনি এখন সে'খানে বসে তিনি দিব্যি রবীন্দ্রনাথের সেজে বেরিয়েছেন। থিয়েটারের লোক? দাড়িটাড়ি তো প্রায় রিয়েল বলে মনে হয়। জব্বর মেকআপ।

**

ও'দিকে ততক্ষণে রবীন্দ্রনাথের মিচকি হাসি হাওয়া, গলা শুকিয়ে কাঠ।

Sunday, October 30, 2016

সামন্তবাবুর বাতিক

রাত বারোটা কুড়ি নাগাদ উঠেছিলেন সামন্তবাবু। ডায়াবেটিসে এই এক অসুবিধে।

ঘুম মাখানো চোখে বারান্দায় এলেন তিনি, বারান্দার ও'পাশে বাথরুম।
থমকে গেলেন বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা থান গায়ে জড়ানো মহিলার দিকে তাকিয়ে। বারান্দার আলোটা অল্প পাওয়ারের। সে ঘোলাটে আলোয় সেই থান জড়ানো মহিলাকে দেখেই বুক হিম হয়ে গেল সামন্তবাবুর। এমন বিধবা তো এ বাড়িতে কেউ নেই। ভূত? উফফ!

চোখ রগড়ে নিলেন, তবুও সে মহিলা স্থির দাঁড়িয়ে।  গলা শুকিয়ে আসাটা বেশ টের পাচ্ছিলেন সামন্তবাবু। ঠিক তখনই মহিলার ফ্যাকাশে সাদা মুখটা নজরে এলো। চেনা, বড্ড চেনা। সে মুখে যেন একরাশ ভয় আর আতঙ্ক জমে আছে।

"ওহ হো। ও'টা তো নীলিমা", সামন্তবাবুর স্বস্তি পেয়ে আপন মনে বলে উঠলেন, "আহা, এই সবে তিনদিন হলো বেচারি বিধবা হয়েছে, তাই খেয়াল থাকে না।  নিজের বৌ বলে বলা নয়,নীলিমার মত মেয়ে হয় না। তবে আনন্দের খবর এই যে ডায়াবেটিসের দুশ্চিন্তাটা গেছে তাহলে। বাথরুমের দিকে রাতবিরেতে হেঁটে যাওয়াটা স্রেফ বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে"।

Thursday, October 27, 2016

কুঞ্জবনে

- গুরু!
- ইয়েস বস।
- আরেক টান হবে নাকি?
- নাহ্। এটুকুই। থাক বরং।
- মিইয়ে গেছ দেখছি?
- আমি? মিইয়ে? আরে না না! আর্কিমেডিস এখন আমায় দেখলে ইউরেকা ইউরেকা বলে লাফাতে পারতেন। ফ্লোট করছি কিনা। দুঃখের যতটা ওজন, ততটাই স্ফুর্তির জল ডিস্পলেস করছি। উথাল পাথাল, কিন্তু ডুবে যাওয়ার চান্স নেই।
- দুঃখ? গুরু? আমি থাকতে তোমার দুঃখ?
- আসে, যায়। যায়, আসে। দে। অত জোর করছিস যখন। বামুন মানুষ, দু'টানে তো আর জাত যাবে না। না নিলে বরং তুই খারাপ পাবি।
- এই যে গুরু।
- আহহহহহহহ, বুকের আগুনপানা স্টোভে কেউ জল ছিটিয়ে দিলে রে।
- বল না গুরু। অমন ম্যাদা মেরে কেন রয়েছ!
- ম্যাচোমাস্তানদের ম্যাদা মারতে আছে রে পাগলা?
- বত্রিশ বছর ধরে ট্রাকের খালাসি গুরু। অল ইন্ডিয়া পারমিটের। তার মধ্যে সাড়ে একত্রিশ বছর তোমার পায়ের কাছে বসে "ডাইনে লেও বাঁয়ে লেও" করে গেছি। তুমি হ বলতে আমি হরিদাসের ধাবার ডিম তড়কা বুঝি গুরু। ডবল ঝাল।
-  হ'য়ে হরিদাসের ধাবার তড়কা। আহা। তোর এ জীবনে কবি হওয়ার কথা ছিল রে। ট্রাক ধুয়ে আর মুন্নি বদনামে উজাড় হয়ে গেলি। একটু যদি কেউ তোকে বিভূতিভূষণে ঠেলে দিত। সময়মত। তবে। তবে আমিও তো ঠেলিনি। তোর কোনও দোষ নেই রে। কবিদের কোনও দোষ থাকে না।
- গুরু। কী হয়েছে?
- কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স শুধু নয় রে, ইউনিভার্সিটি কাঁপানো রেজাল্ট।
- জানি গুরু। তুমি কলেজে টপাটপ পাশ দিয়ে ট্রাক চালাতে এসেছো। কিন্তু সে তো বছর পঁয়ত্রিশ আগের কেস! এখন ব্যথা শুরু হল?
- ধুর। ট্রাক আর ন্যাশনাল হাইওয়ে তো আমার হিমালয় রে! শুধু কৌপীনের বদলে লুঙ্গি।
- তবে? গুরু? নেতিয়ে পড়েছ যে বড়?
- জানিস...।
- গুরু!
- "কোয়েলা ডাকল আবার, যমুনায় লাগল জোয়ার; কে তুমি আনিলে জল ভরি মোর দুই নয়নে"!
- আইব্বাস!
- কী?
- তোমার গলায় সুর রয়েছে গুরু!
- গাঁজা। গাঁজা সুর ঢালে। গলায় না। কানে।
- গুরু! গাও না।
- সন্ধ্যের বারান্দা জানিস। বৃষ্টির।  ঝিরঝির দেখা যায় ল্যাম্পপোস্টের বাতির তলে। উঠোনের জুঁইয়ে বাতাস ভার। মা গানের ভালো লাগায় চোখ বুজে ফেলেছেন। আমি ভ্যাবলার মত বসে মায়ের আঁচল চিবুচ্ছি। দু'জনেই অপেক্ষায়। বাবা আসার সময় হয়ে এসেছে। মা গাইছেন। গাইছেন। সেই। গানে জুঁইয়ে ডুবে ভাসছি। সন্ধ্যে মায়ের গান বেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলেছে। "আজি মোর শূন্য ডালা, কী দিয়ে গাঁথব মালা? কেন এই নিঠুর খেলা খেলিলে আমার সনে, কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে, হৃদি মোর উঠল কাঁপি চরণের সেই রণনে"।
- গুরু। আঁখো মে পানি। ম্যাচো মাস্তানা?
- হেহ। শোন। বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছিল। বারান্দার বাইরের সে অন্ধকারে রাস্তার আবছা হলদে আলোর মায়া আর মা মেশানো। বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে মা গুনগুনিয়ে চলেছিল; "হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি-ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে, কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে"।
- আহ। গুরু।
- আসেনি।
- হুঁ?
- বাবা। আসেনি। আর কখনও। ট্রাকচাপা পড়ার পর ফিরলে অবশ্য ব্যাপারটা ভয়েরই হত।
- ও।
- সেই শেষ মাকে গাইতে শোনা। জানিস! সেই শেষ। মা আর কথাই বলতে পারতেন না, তো গান। গান ছাড়া মাকে চিনিনি। গান যাওয়াতেই মা চলে গেছিল। তাই গান ছাড়া মাকে ছেড়ে আসতে কোনও কষ্ট হয়নি।
- গুরু। আরেক টান নেবে?
- আজ...আজ নাকে ফের জুঁইয়ের গন্ধ এলো। মাই ডিয়ার খালাসিবাবু, দ্য কুঞ্জবন ইস ডেসার্টেড। বাট দ্য মিউজিক প্লেস অন। আমি এদ্দিন শুধু শুনতে পেতাম না। মাকে পাথর ভেবে পালিয়ে এলাম অথচ সে সুর ডাকাত হয়ে কলার টেনে রাখলে।
- গুরু।
- মা! মাগো। আয়দার লেট দ্য মিউজিক গো অর পুল মি ক্লোজার। ক্লোজার। "হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি - ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে"।
- জী। গুরু। এ'বার চলো।
- হুঁ। এইবার।

Wednesday, October 26, 2016

অন্য গাল

গান্ধী – কেউ এক গালে থাবড়া মারলে আর এক গাল এগিয়ে দাও। অপর পক্ষের রাগ ডায়লুট হতে বাধ্য।

রাবণ – অন্য গাল এগিয়ে দিলে দুশমনের রাগ পড়বে বলছেন?

গান্ধী – আলবাত!

রাবণ – রাগ পড়লে ভালো, না পড়লেও অন্তত নরম হয়ে আসবে। তাই তো?
গান্ধী – নিশ্চিত।

রাবণ – দু’নম্বর গাল এগিয়ে দেওয়ায় রাগ একটু নরম হয়েছে দেখলেই তিন নম্বর গাল এগিয়ে দেব। কেমন হবে? আফটার অল গালের তো অভাব পড়েনি।

গান্ধী – গুড। তুমি বুঝেছ। ও’তেই হবে।

রাবণ – ও’তে হলেই বা হতে দিচ্ছে কে? রাগ গলে জল না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত গাল ফায়ার করে যাব! তিনের পরে চার, চারের পরে পাঁচ।

গান্ধী – হয়েছে। হয়েছে। সমঝদার ছেলে তুমি। তবে ওই, কোনও কিছুতেই বাড়াবাড়ি ভালো নয়!

রাবণ- রাগের শেষ দেখে ছাড়াটাই কর্তব্য...। অতএব পাঁচের গালে থাপ্পড় শুষে নিয়ে ছয় নম্বর গাল এগিয়ে দেব! ছয়ে পরে সাত...!

গান্ধী – বোঝ কাণ্ড!

রাবণ - সাতের পরে আট, আটের পরে নয়...!

গান্ধী – অন আ সেকেন্ড থট, থাপ্পড়ের রেসপন্সে বেশি মেনিমুখো না হওয়াই বোধ হয় ভালো...।

রাবণ – নয়ের পরে দশ নম্বর গাল। দশের পরে এগারো!

গান্ধীর – ইন ফ্যাক্ট বেশি গড়বড়ে মেজাজ দেখলে পালটা দু’ঘা বসিয়ে দিলে মন্দ হয় না মনে হচ্ছে!

রাবণ – এগারোর পরে বারো, বারোর পরে তেরো নম্বর গাল...।

গান্ধী – ডাব্লু টি এফ?

রাবণ – চোদ্দ, পনেরো, ষোলো...! গালে গলিয়ে ছাড়বো! সতেরো...আঠারো...।

গান্ধী – ব্যাটাচ্ছেলে!

রাবণ – উনিশ...।

*গান্ধীর থাপ্পড়ে রাবণের পতন ও মূর্ছা*

Monday, October 24, 2016

বড়

হাওড়া ব্রীজটাকে লম্বায় বড় জোর একফুট মনে হচ্ছিল অনিন্দ্যর। এই যে হুগলীর জলে পা ডুবিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তার গোড়ালিটুকুই ভিজেছে বড় জোর। তার পায়ের পাতার সামান্য নড়চাড়াতেই জলোচ্ছ্বাস স্ট্র‍্যান্ড রোড ভাসিয়ে দিচ্ছিল। ইতিমধ্যে অন্তত খানকুড়ি বাস ট্যাক্সি ভেসে গেছে।

তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনিন্দ্য। এত উপর থেকে সমস্ত মানুষকে খুদে খুদে পোকার মত মনে হচ্ছে, এ'দিক ও'দিক বেপরোয়া পা ফেলেলেই শয়ে শয়ে মরবে। দূর থেকে পুলিশের ফায়ারিংগুলো হাঁটুর আশেপাশে চোরকাঁটার মত বিঁধছে।

অর্ধেক কলকাতাটা দিব্যি দেখতে পারছিল অনিন্দ্য। তবে এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। কয়েক পা ফেলে সে এগিয়ে গেল লেকটাউনের দিকে।

অতিসাবধানে পা ফেলেও দু'একটা ফ্লাইওভার আর খান দশেক ফ্ল্যাটবাড়ির ধসে যাওয়া আটকাতে পারলে না সে।

মিতালি দাঁড়িয়েছিল বাড়ির ছাদে। খুদে, এই এত্তটুকু। আঙুলের ডগায় পিঁপড়ের মত নিয়ে নেওয়া যায় ওকে।
অত নিচে কিছুই ভালো করে দেখা যায় না, তবে অনিন্দ্য বেশ বুঝতে পারছিলো যে মিতালির চোখে জল। অনিন্দ্যর মাথায় একটা প্লেন গোঁত্তা খেয়ে টলে পড়লো। ভাগ্যিস প্লেনটা মিতালিদের বাড়ির থেকে দূরে গিয়ে ধসে পড়েছিল।

মিতালি বোধ হয় কিছু বলছিল, কিন্তু এত ওপরে ওর কথার আওয়াজ এসে পৌঁছচ্ছিল না। অবশেষে অনিন্দ্য মৃদু স্বরে জানালে;

"সরি মিতা, আসলে তোমার বাবা যেদিন বলেছিলেন যে তোমায় পেতে হলে আমায় আরও বড় হতে হবে, সে'দিনই কেমন মাথায় একটা রোখ চেপে গেছিল। বায়োকেমিস্ট মানুষ, কী করতে কী করে ফেলেছি। প্লীজ ক্ষমা করো"!

নতজানু অনিন্দ্যর হাঁটুর চাপে নিউটাউনের অর্ধেকটা ধুলোয় মিশে একাকার হয়ে গেছিল।

একটা সোমবার ও সাহাবাবু

***
সোমবার, সকাল পৌনে ন'টা।
***
- একটু শুনুন! প্লীজ।
- আমায় বলছেন?
- আজ্ঞে। এই কলমটা আপনার? আপনার সীটের পাশে পড়েছিল। দেখুন, রেনল্ডসের ডট।
- না।
- ও। আচ্ছা, এই স্টেটসম্যানটা আপনার?
- না। এ'টাও আমার সীটের পাশে পড়েছিল?
- আজ্ঞে। আর এই পাঁচটাকার কয়েনটা? এ'টাও ওই। সীটের পাশে।
- বাসের এ সীটের পাশে চাইলে রবীন্দ্রনাথের দাড়িও পাবেন বোধ হয়। ফাজলামো থামান তো মশাই। রুবি আসতে এখনও আধ ঘণ্টা। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাবেন না। 

***
সোমবার দুপুর একটা পনেরো
***

- স্যার, এ'খানে একটা সিগনেচার করে দিন প্লীজ।
- আমার পেনটা আবার ফাউন্টেন। লীক করছে। আপনার কাছে ডট আছে সাহাবাবু?
- সরি স্যার।
- ধ্যুত। কিছু চাইলেই সরি স্যার। আপনাদের মত ওল্ডটাইমারদের এই এক সমস্যা। নড়তেচড়তে আঠারো মাস। এই যদি অফিসের কোনও ইয়ং টার্ক, যেমন দত্তর কাছে ডটপেন চাইতাম সে ফস করে বের করে দিতো। বসকে দিয়ে কাগজ সই করাতে এসেছেন অথচ সঙ্গে পেন নিয়ে আসেননি?

***
সোমবার দুপুর সোয়া তিনটে
***

- সাহাবাবু!
- আজ্ঞে স্যার?
- আজকের স্টেটসম্যানে একটা জরুরী বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে সাতের পাতায়। জোগাড় করুন দেখি।
- স্টে...!
- স্টেটসম্যান!  নাম শোনেননি নাকি?
- না মানে, এত বেলায় স্যার। কাগজের স্টলেও বোধ হয়...।
- সেই এক দোষ! কোনও কিছু চাইলে আপনার কাছে পাওয়া যায় না। যাই দত্তকেই বলি স্টেটসম্যান জোগাড় করতে। আপনার কাছে কিছু চাওয়াটাই ভুল। এ'দিকে সামনের হপ্তায় প্রমোশনের সময় আপনার বদলে লিস্টে দত্তর নাম থাকলে মুখ হাঁড়ি করে বসে থাকবেন।
- প্রমোশন? সামনের হপ্তায়?
- লিস্ট বেরোচ্ছে। যাক গে, দত্তকে বলি স্টেটসম্যান জোগাড় করতে।

***
সোমবার বিকেল সাড়ে চারটে।
***

সাহাবাবু নিশ্চিত ছিলেন। এমন কিছুই একটা হবে।
বিকেলের সিগারেট বিরতি বস ও দত্তর সাথেই নেন তিনি। তিনজনে অফিস থেকে বেরিয়ে নগিন্দর পানওলার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ান। বসই রোজ তিনটে সিগারেট কেনেন সকলের হয়ে।
আজই পাঁচটাকার খুচরো কম পড়েছিল বসের পকেটে।
আজই সাহাবাবুর পকেটে একদম খুচরো ছিল না।
যথারীতি দত্ত হিপপকেট থেকে একটা পাঁচের কয়েন বের করেন নগিন্দরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে; একটা জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি বসের সিগারেটের ডগার দিকে এগিয়ে দিলে।
যথারীতি বসের মুখে "আমি জানতাম" গোছের বাঁকা হাসি।

***
সোমবার সন্ধ্যে পৌনে সাতটা
***

রুবির মোড়ের মুখেই হয়েছিল অ্যাক্সিডেন্টটা। সাহাবাবু অফিস ফেরতা জ্যামে ফেঁসে নাজেহাল। তবে বাস থেকে নেমে অকুস্থলে ঢুঁ মারতে ইচ্ছে হল না তার, অন্য কয়েকজনের অত্যুৎসাহির মত। এমনিতেও দিনটা বড় গোলমেলে গেছে কিনা। সকালের বাসের সেই অদ্ভুত ভদ্রলোককে আর একবার পেলে হয়!

সে অদ্ভুত ভদ্রলোকের দেখা অবিশ্যি সাহাবাবু পেতেই পারতেন, যদি তিনি বাস থেকে নেমে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে যেতেন ।  বাসচাপা পড়া লাশের বুকপকেটে থ্যাঁতলানো সস্তা রেনল্ডসের পেন,এক হাতে ধরা রক্তমাখা স্টেটসম্যান। সে লাশে দেখে সাহাবাবু হলফ করে বলতে পারতেন যে লাশের পকেটে কোথাও একটা পাঁচটাকার কয়েন নিশ্চই আছে যা নগিন্দর পানওলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় তাঁর কাছে ছিল না।

সবার সব সয় না। আর সইলেই যে সব পেতে হবে, তেমন মাথার দিব্যি কেউ দিয়েছে কি? 

Sunday, October 23, 2016

মন্টুবাবু ও গুজিয়া

গুজিয়া নিয়ে ব্যাগ ব্যাগ সাহিত্য হয় না।

ঠিক যেমন বালুচরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার রোম্যান্স নিয়ে একজন ছাড়া তেমন কেউই বিশেষ রকমের লাগসই কথা বলে যেতে পারেননি।

ছোট্ট বাক্সে আট পিস। বাক্সের গায়ে নীলে লেখা কল্পতরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, দু'টো গার্ডার। দিব্যি এ'টে যায় মন্টুবাবুর পাঞ্জাবির পকেটে। মন্টুবাবু ভিজিটিং কার্ড, লেটার প্যাড বা ওই ধরণের জিনিসপত্র ছাপান। এ অফিস থেকে সে অফিস ঘুরে অর্ডার নেন এবং সাপ্লাই করেন।

মন্টুবাবু রোজ নতুন গুজিয়ার বাক্স পকেটে গুঁজে দিন শুরু করেন। চারটে নিজে খান। দু'টো লাঞ্চের পরে, আর দু'টো অন্য যে কোন সময়; মনখারাপে, ক্লান্তিতে, আনন্দে, ফুরসতে। জিভে গুজিয়া ঠেকলেই চনমনিয়ে ওঠেন ভদ্রলোক, এ কথা তিনি নিজেই বলেন।

আর বাকি চারটে তিনি অন্যদের অফার করেন। অটোচালক আগ বাড়িয়ে খুচরো দিলো, মন্টুবাবু গলে গিয়ে গুজিয়া অফার করলেন।
বাসে কেউ টেস্ট জেতার খবর শোনালো, মন্টুবাবু শুধোলেন "গুজিয়া খাবেন? অমায়িক ফ্লেভার। মিষ্টি কড়া নয়"।
কোনও অফিসে গিয়ে দেখলেন পরিচিত কেউ ঝামেলায় জর্জরিত, তিনি বাক্স এগিয়ে বললেন "আসুন সেনসাহেব, আসুন! ফাইলপত্তর তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, মেজাজটা আগে একটু শরিফ করুন দেখি"।

স্মার্ট ফোনের অভ্যেস আয়ত্ত না করতে পারলেও, স্মার্ট গুজিয়ার বাক্সই পঁয়ষট্টি বছরের মন্টুবাবুর ব্যবসার ট্রেড সিক্রেট। মন্টুবাবুর হাত থেকে আজ পর্যন্ত কোনও অফিস স্টেশনারি অর্ডার ফস্কে যায়নি।

মন্টুবাবুকে আজ পর্যন্ত কেউ রাগতে দেখেনি।

হেঁসেল

- রান্নাঘরটা জব্বর হবে বুঝলে ম্যাডাম!
- মডিউলার?
- ফুহ্! ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দেখা?
- তব?
- রান্নাঘরের দেওয়ালে ক্যালভিন আর হবসের নাচুনির ছবি।
- রান্নাঘরের দেওয়ালে ক্যালভিন? হব্স?
- স্বাদের দানাগুলো জিভে ক্যালভিনের মত ছটরফটর করে যাবে। রান্নার সুবাসের বাঘ সে দানাগুলোর সাথে মিলেমিশে হল্লা করবে। এ পোস্টার সিম্বলিক।
- আর?
- তুমি স্কিলড আমি আনস্কিল্ড। তুমি ঝুরি আলু কুচোবে, নরম আঁচে পেঁয়াজ ভাজবে।  আমি স্কচব্রাইট ভিমবার আর এঁটো ডেকচি নিয়ে সিঙ্কের নিচে থেবড়ে বসে শ্যামল মিত্র গাইব।
- তুমি শ্যামল মিত্র? হয়েছে!
- খুন্তি কড়াইয়ের খনখনকে নূপুরে চুড়িতে নিউট্রালাইজ করতে হবে, পারবে?
- যো হুকুম।
- মাংস মাছ আমি ধোব। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্র‍্যাক্টিস। মাংস ধোয়ার সময় পঙ্কজ উদাস জমে ভালো। জিয়ে তো জিয়ে ক্যায়সে, বিন আপ কে।
- রান্নাঘরের দেওয়াল নরম সবুজ।
- আমি হলুদ ইম্যাজিন করেছিলাম।
- সবুজ। নরম।
- জী।
- কী হল?
- প্রশ্ন।
- কী?
- আমি বুঝি হব্স? আমার বুঝি আদতে থাকতে নেই?
- আমি কি না ক্যালভিন। আমার আনন্দে নয়, ইউফোরিয়ায় বাঁচার কথা।
- কেয়া হুয়া ক্যালভিনওয়া? ইমোসান?
- উয়ো কুড ভি রান্নাঘর মে, তুম কাটতা হ্যায় পেঁয়াজ অউর আমার চোখে ভিমবারের ছিটে।
- মিঠে

**
- রান্নাঘরটা জব্বর হবে বুঝলে ম্যাডাম!
- মডিউলার?
- ফুহ্! ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দেখা?
- তব?
- রান্নাঘরের দেওয়ালে ক্যালভিন আর হবসের নাচুনির ছবি।
- রান্নাঘরের দেওয়ালে ক্যালভিন? হব্স?
- স্বাদের দানাগুলো জিভে ক্যালভিনের মত ছটরফটর করে যাবে। রান্নার সুবাসের বাঘ সে দানাগুলোর সাথে মিলেমিশে হল্লা করবে। এ পোস্টার সিম্বলিক।
- আর?
- তুমি স্কিলড আমি আনস্কিল্ড। তুমি ঝুরি আলু কুচোবে, নরম আঁচে পেঁয়াজ ভাজবে।  আমি স্কচব্রাইট ভিমবার আর এঁটো ডেকচি নিয়ে সিঙ্কের নিচে থেবড়ে বসে শ্যামল মিত্র গাইব।
- তুমি শ্যামল মিত্র? হয়েছে!
- খুন্তি কড়াইয়ের খনখনকে নূপুরে চুড়িতে নিউট্রালাইজ করতে হবে, পারবে?
- যো হুকুম।
- মাংস মাছ আমি ধোব। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্র‍্যাক্টিস। মাংস ধোয়ার সময় পঙ্কজ উদাস জমে ভালো। জিয়ে তো জিয়ে ক্যায়সে, বিন আপ কে।
- রান্নাঘরের দেওয়াল নরম সবুজ।
- আমি হলুদ ইম্যাজিন করেছিলাম।
- সবুজ। নরম।
- জী।
- কী হল?
- প্রশ্ন।
- কী?
- আমি বুঝি হব্স? আমার বুঝি আদতে থাকতে নেই?
- আমি কি না ক্যালভিন। আমার আনন্দে নয়, ইউফোরিয়ায় বাঁচার কথা।
- কেয়া হুয়া ক্যালভিনওয়া? ইমোসান?
- উয়ো কুড ভি রান্নাঘর মে, তুম কাটতা হ্যায় পেঁয়াজ অউর আমার চোখে ভিমবারের ছিটে।
- মিঠে। মিথে।

টুকরো গল্প

- কে ওখানে?
- আমি। পরেশ।
- ইয়ার্কি হচ্ছে?
- মানে?
- পরেশকে বলা হচ্ছে আমি পরেশ? আলোয় আয় ব্যাটা।
- ইয়ে...আমি পরেশ চ্যাটার্জি।
- আরে দরজার ওপাশের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কেন রে? আলোয় আয়! দেখা যাবে রিয়েল পরেশ চ্যাটার্জি কে।
- আপনিও? পরেশ চ্যাটার্জি? কী আশ্চর্য!  তবে আমি কিন্তু আদতে এ পাড়ার নই। বেলিয়াতোড়ে আদত বাড়ি। বাপ মাও সেখানেই।
- তবে রে হারামজাদা? বাপ মা বেলিয়াতোড় তুলে লেগ পুল? আজ তোরই একদিন কি আমার!
- বলছিলাম একের বারো মধু মল্লিক লেন ঠিক কোনদিকে বলতে পারেন?
- এ'টা। এ'টাই একের বারো মধু মল্লিক লেন। আর আজ এখানেই তোকে পুঁতবো।

ঠিক তখুনি মেঝে ফুঁড়ে রাত কাঁপিয়ে ভেসে এলো কণ্ঠস্বরটা ;

"রোজ রাত্তিরে এই এক ঝ্যামেলা! গজরগজরগজর! আরে আর ক'বার পোঁতা হবে? ডায়রেক্ট পুঁতে দিলেই পারত। না, তা নয়! তার আগে কুচিকুচি করে কাটা চাই। আর কী কুক্ষণেই না দু'টুকরো বাইরে পড়ে গেছিল। আহাম্মক ইনএফিশিয়েন্ট মার্ডারার্স"!

স্পা

শুভ্রশঙ্খ মাস শুরু করে স্পা দিয়ে। শরীর মন ঝরঝরে হয়ে যায়। শিউলি বছরভর শহরে না থাক, অন্তত সে সুবাস মনের মধ্যে হুহু করে। জ্যান্ত লাফানো কইয়ের মত স্ফুর্তি থাকে বুকে।

আসল বিউটি ট্রিটমেন্ট তো মনকে মালিশ করেই শুরু, আর সে থিওরি মেনেই মাসের প্রথম রোববার সকাল সকাল নিউ সানফ্লাওয়ার সেলুনের বেঞ্চিতে এসে বসে সে।

স্পা স্রেফ ফেল কড়ি মাখো তেল কিস্সা নয়। হুড়মুড়ে মেজাজে অফিসটাইমে মিনিবাস ধরা যায়, স্পাতে তা চলে না।

সানফ্লাওয়ার সেলুনের বেঞ্চিতে বসার আগেই মনোকে ইশারায় নিজের উপস্থিতি জানান দেয় শুভ্রশঙ্খ। মনো, মানে মনোরঞ্জন মাইতি। কাঁচির কাইজার, মালিশ মারাঠা ইত্যাদি নানা উপাধি মনোরঞ্জনের পাওনা বলে শুভ্রশঙ্খর বিশ্বাস। কিন্তু বাঙালি যোগ্যতার দাম দিতে শেখেনি, তাই আজও মনোকে পুজোর বখশিশ চাইতে হয়।

বেঞ্চির সামনে রাখা নিচু কাঠের টেবিলে স্তুপ করে রাখা আনন্দলোক। আনন্দলোক হচ্ছে প্রি-স্পা রিল্যাক্সেশন টূল, শুভ্রশঙ্খ সে সম্বন্ধে অবগত। টুকরো টলিউডি গসিপ, ক্লাসিকাল যুগের উত্তম যোগ ব্যায়াম করছেন গোছের কিছু ছবি, কিছু চটুলরচনা, কিছু মনোগ্রাহী ছবি; এ'সবে নার্ভ আরামদায়ক ভাবে শীতল হয়ে আসে।

খান চারেক আনন্দলোকের পাতা ফরফরিয়ে উলটে যেতে না যেতেই মনের চিনচিন কমে আসে। অন্যদিকে এমপি থ্রি প্লেয়ারে কুমার শানুর গান একটানা বেজে চলে, আনন্দলোককে যোগ্য সঙ্গত দেয় সে'সব গান।

"তু পেয়ার হ্যায় কিসি অউর কা, তুঝে চাহতা কোই অউর হ্যায়,
তু পসন্দ হ্যায় কিসি অউর কি, তুঝে মাঙ্গতা কোই অউর হ্যায়"।

রিল্যাক্সিং মেলোডি।

হাঁটুতে তাল ঠুকে চলে শুভ্রশঙ্খ। মিনিট কুড়ির মাথায় মনোর ডাক আসে। "আসুন"!

চেয়ারে বসে শুভ্রশঙ্খ চোখ বুজে ফেলার মানে মনো জানে। দাড়ি, চুল কাটা নয়, মাথা মাসাজ। শুভ্রবাবু অবশ্য বলেন "হেড স্পা"।

মনোর স্ট্রেন্থ হলো যে যে তালুতে কম আর আঙুলে বেশি খেলে। ব্রুট স্টেন্থ নয়, শুভ্রশঙ্খ জানে যে ফিনেসটাই এ যুগে কোয়ালিটি আউউটপুটের মূলমন্ত্র।

"কত যে সাগর নদী"তে কুমারশানু ডুব দেওয়ার সাথে সাথে মনোর হাতের দুপদুপে অবশ হয়ে আসে শুভ্রশঙ্খ। নবরত্নের দু'টো ছোট পাউচ  কেটে মাথাময় বরফ
নির্বাণ ছড়িয়ে দেয় মনো। সে আরামে স্বয়ং ঈশ্বরও মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

হেড-স্পা করানোর পর দিন তিনেক আনন্দবাজার বা নিউজচ্যানেলগুলোকে এড়িয়ে চলে শুভ্রশঙ্খ।

অমরবাবুর রাত

"বাতি নিভিয়ে শুতে এসো"।

প্রত্যুত্তরে আচ্ছা বলাটাই ভদ্রতা। তেমনটাই বললেন অমরবাবু। "আচ্ছা"।

বাতি নেভালেন।
দু'কলি "হরি দিন তো গেলো গাইলেন"।

"আর কতক্ষণ গো? রাত দু'টো বাজতে চললো যে!

অতিশয়োক্তি। অমরবাবু জানেন। এখন সবে সোয়া একটা। এ'সব আবদারে ডাক। তবু। কানে দিব্যি লাগে এ ডাকের মায়াটুকু।

তারপরই খাটের বাঁ পাশ ঘেঁষে গা এলিয়ে দিলেন তিনি।

"এখন এতরাত্রে আর জ্বালিও না বাপু। ঘুমোও। কাল ভোর থেকে মেলা কাজ পড়ে"। খাটের ডান দিক থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর। নরম, মিঠে। কী প্রবলভাবে আদুরে।

মৃদু বিরক্তির "ত্যুত্ " শব্দে ভাসিয়ে দিয়ে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন তিনি। অন্যপাশে ফিরে নিজের পাশবালিশটা বুকে জড়িয়ে চোখ বুজলেন ভেন্ট্রিলোক্যুইস্ট অমর সমাদ্দার।

পাঁচ কুড়ি

- কোড বলুন।
- কোড..হ্যাঁ..ইয়ে..ইশ...এইমাত্তর মনে ছিল..।
- নেক্সট স্পার্মসেল প্লীজ।
- মিস এগ! মনে পড়েছে। "বাঁশঝাড়"।
- শর্টলিস্টেড। রিক্রুটমেন্ট ক্লোজড।

- আসুন।
- আজ্ঞে?
- আসুন।
- কিন্তু..।
- আসুন। উপায় নেই।
- শিওর?
- ট্রাক পিষেছে আপনাকে।
- তাই বলে নরক?
- ভেজ বিরিয়ানির প্যাকেট ছিল আপনার হাতে।

- জনাব!
- জনাবিয়ে বেগমজান।
- অর্জ কিয়া হ্যায়।
- অর্জাইয়ে।
- বোলিয়ে ইরশাদ।
- আচ্ছা। ইরশাদিয়ে।
- রাতে মাটন কষা। হ্যাশট্যাগ তিন শব্দের শায়রি।
- চুমু।
- চুমাইয়ে।

"মানুষের গল্প" পাঠ করা। হাজার ঝামেলা!
ঢোক গিললেন অনাদিবাবু।
বাতি জ্বালো রে,
দেরাজ থেকে মাথা বের করে চশমায় আঁটো রে...।

মানিব্যাগের দরজা খুলতেই অনিকেতকে ইশারায় ডেকে নিলেন একশোটাকারনোটবাবু।
পাঁচশোটাকাজ্যেঠু বারবার বলেছিলেন "ক'দিন জিরিয়ে নে"।
একশোটাকারনোটবাবুর একটাই উত্তর;

"টাইম ইজ পিপল"।

চিয়ার্স

- ধরুন...।
- হুঁ!
- ধরুন পৃথিবীতে আর কোনও মন্দ রইলো না...।
- ইউটোপিয়া?
- ইউফোরিক ব্যাপার। কেউ কারুর মাথায় কাঁঠাল ভাঙছে না। কেউ এগরোলে সস দিচ্ছে না। কেউ লোভে হন্যে হচ্ছে না। উইকেন্ডে সবাই কাহারবা নয় বলে মৃদু দুলছে কিন্তু কমোডে মুখ গুঁজে ওয়াক তুলছে না।
- অফিস টাইমের লোকালে ভিড় থাকছে না। প্রেমের চিঠিতে বানান ভুল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তো?
- আজ্ঞে! ধরুন তেমনটাই। দুনিয়াটা।
- তাতে কী?
- যদি তেমন হত মশাই...।
- তেমন হলে?
- তেমন হলে আয়না থেকে আপনার দিকে গেলাস তাক করে চিয়ার্স বলতে হত না।

নবাব ও বেগমজান

১.

সিলিং ফ্যান থেকে দড়ির মত করে ঝোলানো শাড়ি। ফাঁসটাও পোক্ত। নিখুঁত ব্যবস্থা।

খাটের ওপর মচমচে চেয়ারটা রেখে বেশ তৃপ্ত বোধ করছিলেন বিপাশা। চেয়ারে দাঁড়িয়ে সবে ফাঁসটা গলায় জড়াতে যাবেন..অমনি খচখচটা মাথায় এলো। বালুচরি কাঞ্জিভরম থাকতে সস্তা ছাপায় ঝুলবেন? সবচেয়ে ভালো হত আসাম সিল্কে ঝুললে।  অপূর্ব, যেমন খোলতাই সবুজ তেমন মসৃণ। কিন্তু এমন দরকারি দিনেই সে'টা নেই। কী কুক্ষণেই না লন্ড্রি কাচাতে দিয়েছিলেন।

২.

নন্দবাবুর মেজাজ গেল নিমতেতো হয়ে। একটা সুইসাইড করতে এত টালবাহানা, ভাবা যায়? গত হপ্তায় পুড়ে মরার প্ল্যানটা ক্যানসেল হল কলকাতায় বড্ড গরম পড়েছে বলে।
আজ ঝুলে মরার প্ল্যান ক্যানসেল হলো আসাম সিল্কের শাড়ি রাধাগোবিন্দর লন্ড্রিতে দেওয়া আছে বলে।
বৌকে নিয়ে এ এক মহাফাঁপর।

৩.

- আচ্ছা, জলে ডুবে মরলে কেমন হয়?
- কোথায়? গঙ্গায় যাবে?
- গেলে গঙ্গাই ভালো গো। আত্মহত্যার পাপ লঘু হবে।
- কাল অফিস যাওয়ার পথে ঘাটে নামিয়ে দিয়ে যাই। লাঞ্চের পরপরই ফেরত আসব, কেমন?

৪.

- আজ কী হল?
- মন কেমন করলো গো!
- মন কেমন?
- আর চাইলাম আর মরে গেলাম! তাও হয়? আমার মরব মরব গা করলো আর আমি অমনি সরে পড়লাম, খোলামকুচি নাকি? ও'দিকে তারপর তোমার গেরস্থালী মাথায় উঠুক।
- এমন উদ্ভট শখ পোষার সময় মনে ছিল না? সতেরো বছর ধরে ভেবে আসছি; তুমি মরবে আর আমি এই হারামির গাছ অফিসের মুখে লাথি মেরে বেরিয়ে আসব। বাড়িতে ঠোঙা বানাবো। রাজার হালে থাকব। সতেরো বছর ধরে তোমার খালি টালবাহানা আর টালবাহানা। এ'দিকে আমি রইলাম ঝুলে।
- এক কাজ করি চলো, পুরী ঘুরে আসি। কেমন? তা'তে তোমার আমার মন ভালো হবে। ফিরে এসে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ব'খন। ইঁদুরের বিষে অসাধ্য সাধন হয় শুনেছি। দিন সাতেক ঘুরে আসি পুরী, তারপর না হয় তুমি আমায় কয়েক প্যাকেট এনে দিও, কেমন?
- সতেরো বছরে এ নিয়ে বত্রিশ নম্বর পুরী ট্রিপ।
- টিকিট দেখো।
- সেই ভালো।

কাফকাইস্টস

- খোট্টাগুলো ক্যালক্যাটাকে ছাতুর সরবতে গুলে খেয়ে ফেলবে মশাই।
- তাঁরা কী করলে?
- নুইসেন্স। রাস্তাঘাটে, সব জায়গায়। নোংরা, ক্লাসলেস। আর খবর নিয়ে দেখুন কলকাতায় ক্রাইম দুনিয়ায় তাঁদের প্রকোপ কতটা।
- অ। ওরা ছাতুতে ক্যালক্যাটা গুলে খাবে?
- আলবাত।
- কলকাতা গুলে খেতে চাইলে কলকাতার ফুটপাথ আর দেওয়ালগুলোও বোধ হয় গোলা হবে তাই না?
- মানে?
- মানে চিন্তা করবেন না। খোট্টারা বাঙালি কলকাতাকে ছাতুতে গুলে খেতে চাইলেও বেশি সুবিধে করতে পারবে না। অল্প সময়েই বমিতে উগরে দিতে হবে।
- কেন?
- ওই। কলকাতার রাস্তাঘাটে দেওয়ালে এত কালচারড  বাঙালি হিসি মিশে আছে যে সে ছাতুর সরবত খোট্টাদের রিক্সাটানা পেটানো পেটেও সইবে না। নিশ্চিন্তে খিস্তি করে যান। আরেকটা কফি বলি? কাফকা নিয়ে পড়ুন এবার খোট্টাদের ছেড়ে।

Wednesday, October 19, 2016

খোকার ঘুম

ধরুন দু'শো বত্রিশজন মিলে যদি নিজেদের মধ্যে টিনের ফাঁপা গদা আর অ্যালুমিনিয়ামের তলোয়ার নিয়ে খনখনাৎ করে যুদ্ধ শুরু করে; তার যে হইহইরইরই শব্দ।

সেই হইহইরইরইয়ের শব্দ ত-বাবু শুনতে পান যখন সাড়ে পাঁচ মাসের খোকাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিজের বুকে চেপে ধরেন।

ত-বাবু খোকা কোলে গাইলেন 'ঘুম যায় ও চাঁদ",  খোকা হৌহৌহৌ-খ্যেকখ্যেকখ্যেক করে জানান দিলে সে বেশ স্ফুর্তি অনুভব করছে।

ত-বাবু পায়চারির গতি ও ছন্দের ম্যাজিকে খোকার দুলুনি আর খ্যাক হাসিকে ঘায়েল করতে চাইলেন। খোকার চোখে চিকচিক ভেসে উঠলো। ও চোখ জোড়ায় খুঁজলে রাবণের স্যান্ডোগেঞ্জি পাওয়া যেতে পারে কিন্তু ঘুম? লেশমাত্র নেই।

"হরিদাসের বুলবুল ভাজা"র অন্তরায় এসে পায়চারীরত ত-বাবুর তন্দ্রা কাটলো খোকার ট্যাঁয়্যায়্যায়্যায়্যা শব্দে। আধ-ঘুমন্ত মানুষের পায়চারীর ট্র‍্যাজেক্টরিতে নিজের বিপদ আঁচ করেই গাঁকগাঁক করে চিল্লিয়েছিল সে।

ত-বাবু "ইয়ে কালি কালি আঁখে, ইয়ে গোরে গোরে গাল"য়ের কলিতে নিজের ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা শুরু করলেন।

অদ্ভুত। কাজ হল মাখনের মত। আকস্মিক।

"ম্যায় মিলি, তু মিলা"র আলাপ পেরোতেই খোকা নেতিয়ে পড়লে।

সেই চোখের পাতায় মেঘের ভেসে বেড়ানোর শব্দ পাওয়া  যায়। খোকার ঘুমে ল্যাতপেতে হয়ে আসায় শীতলপাটি পাতার যে মিহি হাফসেকেন্ডের শব্দ; তা স্পষ্ট অনুভব করতে পারেন ত-বাবু।

খোকার ঘুমন্ত মুখের ডাকনাম "বে অফ বেঙ্গল" দিয়েছেন ত-বাবু। ত-বাবু আজকাল মনেমনে নিজেকে  শ্রী স্বর্গদ্বার বলে ডেকে থাকেন।

Tuesday, October 11, 2016

বিজয়ার ছাত



- দীপু!
- উঁ।
- কী রে?
- কী?
- ঘাটে এলি না যে বড়?
- এমনি।
- এমনি? ইয়ার্কি হচ্ছে? নান্টুমামা রেগে ফায়ার! তোর কাছে নাকি তুবড়ির ব্যাগ ছিল!
- উঁ?
- তুবড়ির ব্যাগ! তোকে দেওয়া ছিল। আর তুই এই ছাদে এসে একলা বসে! ও'দিকে ঠাকুর ভাসানোর সময় হাহাকার! নান্টুমামা তোকে পরের পাঁচটা ম্যাচ সাত নম্বরের আগে ব্যাটিং দেবে না বলেছে।
- ওহ্।
- দীপু।
- উহ্।
- কী?
- উহ্।
- সিদ্ধি তোর সয় না।
- মাও। তাই বলে।
- তবু খেলি কেন?
- সয় না বলে।
- ও।
- ঢাকে কাঠি পড়লে কানে আঙুল দিস। তবু গোটা দিন মণ্ডপে পড়ে থাকিস কেন?
- ওই। ধুপুরধাপুর। সয় না। বাবা রে! উফফ!
- সয় না বলে পড়ে থাকিস? কিচি?
- মেজমামা বলেছে। স্কচ মিঠে সরবত হলে তার কদর রইত না।
- বেশ।
- দীপু।
- হুঁ।
- কলেজ গিয়ে খুব লায়েক হয়েছিস, না?
- হুঁ?
- চিঠি লিখিস না।
- হুঁ।
- চিঠি বুঝি সয়ে এসেছে? তাই লিখতে মন সরে না?
- ধুস।
- আমি সয়ে এসেছি?
- ধুস।
- তুই নিধিরাম সর্দার হলে তোর এই ধুস হলো তোর ঢাল-তলোয়ার।
- ঝিমঝিম করছে। দুলছে।
- দিব্যি, তাই না?
- ভাসছে। দ্যাখ। ছাদটা। ওই বাতিটা।
- বাবু।
- হুঁ।
- কাঁপছে কিচি।
- কেন খাস?
- সয় না যে। তাই।
- শরীর কেমন করছে?
- জিভের তলাটা শুকনো। কাঠ। জানিস। আর বুকের ভিতরে...।
- ভিতরে?
- দিদার মাথায় জবাকুশুম তেল, তাতে সিঁদুর থ্যাবড়ানো সিঁথি। আঁচল কী ঘুচিমুচি নরম! সমস্ত মিলে একটা দলা পাকানো গন্ধ। বুকের ভিতরে। দিদার সেই গন্ধটা। গুলি পাকিয়ে ঘুরছে। ঘুরছে। দ্যাখ। ওই ডিশ অ্যান্টেনাটা দ্যাখ। ওই খানে ভূতের ভয়।
- এ নিয়ে তিন নম্বর পুজো।
- দিদা ছাড়া। করেক্ট। তুই মনে রাখিস।
- ঘরে চ' বাবু।
- পরে।
- কান ধরব?
- হিঁড়হিঁড় করে টেনে নামাবি?
- শরীর খারাপ লাগছে?
- নামাবি? হিঁড়হিঁড় করে?
- কী হয়েছে?
- তোর পায়ে রক্ত বাবু।
- আলতা।
- রক্ত।
- বেশ। তো?
- ভয় কিচি। ভয়! সয়ে আসবে কী করে?
- ভয়? শুধু ভয়? ছেলেবেলা থেকে হোমিওপাতি ওষুধে বড় হয়ে উঠলে খোকারা এমনই নেদু হয়।
- কিচি।
- হুঁ?
- অর্জুনদা বড় ভালো।
- বড্ড পেকেছিস।
- আইআইটি কিচি। আইআইটি। কোথায় আইআইটি আর কোথায় মোতিঝিল। কাকুর অর্জুনদার সাথে ইন্টারেস্টিং সব সাব্জেক্টে কথা হয়, ফিজিক্সের নোবেল, গড পার্টিকল কত কী! আর আমার সাথে বছরে একবার কথা "পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা আর এদিকে চাঁদা চাইতে আসা হয়েছে"। এবারেই দ্যাখ। বিল কাটলাম আড়াইশো। মাধ্যমিকের নম্বর নিয়ে খোঁটা দিয়ে রফা করলেন পঁচিশ টাকায়। তাও পাঁচটাকার খুচরো ছিল না তাই ডিউ স্লিপ রেখে দিয়ে যেতে বললেন।
- তো?
- অর্জুনদা চাঁদা চাইতে বেরোয় না।
- বড্ড বাতেলাবাজ। অত ধুপুরধাপুর কথা সহ্য হয় না।
- ঢাকও তো তোর সহ্য হয় না। তবু মণ্ডপে পড়ে থাকিস। ওর বাতেলাও সয়ে যাবে।
- কবিরাজি তোর নাকি সইত না। কলেজ কেটে, পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ কামাই করে তিন্নির সাথে গিয়ে ফিশ কবিরাজি তো দিব্যি গিলে যাচ্ছিস। দিনের পর দিন।
- দু'দিন।
- পিঠের চামড়া তুলে নেব।
- পাঁচ দিন।
- পাঁচ?
- কিচি! হাত ছাড়!
- জুডোওয়ালির সাথে বাওয়ালি?
- আট দিন।
- গুণধর।
- অর্জুনদা তোকে কথোপকথনের পুরো সেট দিয়েছে।
- তাই? তাই আমি সয়ে এসেছি? কিন্তু তিন্নির সাথে বাবুঘাট সয়নি?
- হাত। কিচি! ছাড়!
- নুন হলুদ লাগাতে পারবে? তিন্নি?
- অর্জুনদার ওয়ালেটে তোর ফটো!
- মিথ্যে কথা।
- এই দেখ।
- এ'টা কী!
- অর্জুনদার মানিব্যাগ।
- তুই পকেট কেটেছিস?
- মণ্ডপে তোর ছবি মানিব্যাগ থেকে নিজের বন্ধুদের দেখাচ্ছিল। রাস্কেল। ভাসানের ভিড়ে পকেট থেকে ঝেড়ে পালিয়ে এসেছি।
- ও আইআইটি, তুই মোতিঝিল। ওর মানিব্যাগ আর তোর পকেট কাটা। ছিঃ বাবু।
- মর তুই।
- কত আছে?
- কী কত?
- ন্যেকু। মানিব্যাগে। কত টাকা?
- রহিস। দেড়!
- আমাদের ছয় মাসের কাটলেট আর বাবুঘাট। তিন্নি বাদ, কেমন? বাবু?
- মরে যাস না কেন?
- তোর সিদ্ধি সয় না, তাও খাস। আমার মতিঝিলওলাদের সহ্য হয় না, তবু তোকে ধরে রাখতে হয়। মরে যাব কই?
- ও। হুঁ।
- বাবু, ঠোঁট সয়?
- বদ মেয়ে।
- সয়?
- না।
- শুভ বিজয়া।
- আমি তোর চেয়ে দু'দিনের বড় কিচি। প্রণাম কর।