Showing posts with label প্যারালাল পৃথিবী. Show all posts
Showing posts with label প্যারালাল পৃথিবী. Show all posts

Sunday, March 8, 2026

ও'দিকে

এ'দিককার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বপনবাবুর বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। লাউঞ্জে আসা মাত্রই একজন বেশ সুন্দরী রিসেপশনিস্ট এসে মিহি সুরে "ওয়েলকাম" বলে দু'টো ফর্ম ধরিয়ে দিলে। বেশ সাদাসিধে ফর্ম, মিনিট চারেকের মধ্যেই 'ফিল আপ' হয়ে গেলো। প্রম্পটনেস ব্যাপারটা স্বপনবাবু বরাবরই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। কাজেই ফর্ম জমা দেওয়া মাত্রই যখন অন্য আর এক রিসেপশনিস্ট এসে তাঁকে রুম নম্বর সেভেন-বি'তে রিপোর্ট করতে বললো, ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন।
সেভেন-বি'তে নক করতেই একটা বেশ চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "ভিতরে আসুন"। দেখা হলো এক ভারিক্কি মেজাজের মাঝবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে। ইশারায় স্বপনবাবুকে বসতে বলে একটা পেল্লায় ফাইলে মুখ গুঁজলেন ভদ্রলোক। বলাই বাহুল্য ফাইলের ওপর লেখা, স্বপন চট্টরাজ, (জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১, ১২:৩২ / মৃত্যু ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৩)। চেয়ারে জুত করে বসতে ভারিক্কি ভদ্রলোকই কথা পাড়লেন,
"স্বপনবাবু, আমিই এই স্টেশনের ম্যানেজার, সভ্রহেজ্বজা"।
"নমস্কার..সভ্র..হে..ইয়ে"।
"সভ্রহেজ্বজা। এই স্টেশনের ম্যানেজার"।
"এ'রকম স্টেশন আরো আছে নাকি"?
"ন্যাচেরালি। সমস্ত এক্সপায়ারি তো একটা স্টেশনের পক্ষে হ্যান্ডল করা সম্ভব নয়"।
"তা, আমার এখন কী.."।
"আপনার ভেহিকল তৈরি আছে। তা'তে করে সোজা কোয়ার্টার্সে"।
"কোয়ার্টার্স"?
"হ্যাঁ। সে'খানেই ব্যবস্থা। আমি একটা ব্রশার আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি.."।
"না মানে, সভ্রবাবু.."।
"সভ্রহেজ্বজা"।
"বলছিলাম,সে কোয়ার্টার কি স্বর্গ না মানে.. ন..নরক"।
"আজ্ঞে"?
"মানে, স্বর্গ না নরক"?
"ও'সব ছেলেমানুষি কনসেপ্ট আপনাদের মুখে প্রায়ই শুনি। কিন্তু এ'খানে মশাই সবার জন্য পাইকারি হারে একই ব্যবস্থা"।
"সর্বনাশ। এত পুণ্য অর্জন করলাম, সব কি জলে গেল"?
"ওয়ান ম্যানস পুণ্য ইজ আনাদার ম্যানস সিন। আর মানুষ মাত্রই ঢ্যাঁটা, তাদের পলিটিক্সে আমরা মাথা ঘামাইনা। আপনি যা অর্জন করেছেন, তা হিউম্যান কারেন্সি। ও দিয়ে এখানে ফুটুরডুম হবে"।
"আর ইয়ে, রিবার্থের ব্যাপারটা"?
"মানুষের শখ যত দেখি তত অবাক হই বুঝলেন"।
"ওই ব্যাপারটাও তা'হলে.."।
"অবাক। অবাক হই। আপনাদের দেখে। একটা গোটা জীবন ঘ্যানঘ্যান করে কাটিয়ে দিলেন অথচ এ'দিকে আসা মাত্রই রিবার্থ রিলেটেড এনকোয়্যারি"।
"লাস্ট কোশ্চেন। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড স্যার। ভেহিকল যে'টা দিচ্ছেন, সে'টার উইন্ডো সীট পাবো কি? আসলে নতুন এলাকা তো তাই.."।

Sunday, March 16, 2025

অন্য গ্যালাক্সিতে



রাত সোয়া দশটা; বাসস্টপে একলা দাঁড়িয়ে ছিলেন সহদেব সাহা। ভদ্রলোকের বয়স চুয়ান্ন, চেহারা মজবুত। কাঁচাপাকা চুল, দিন চারেক না-কামানো খোঁচা দাড়ি গালে। কাঁধে ঝোলানো ফলস-লেদারের জরাজীর্ণ অফিস ব্যাগ। নীল-সাদা চেক হাফ শার্টটা ময়লা, পায়ের চামড়ার চটিটা যে অন্তত বছর তিনেক পুরনো তা বলে দিতে হয় না।

অন্তত ঘণ্টাখানেক হলো এ'খানে দাঁড়িয়ে সহদেববাবু। খান চারেক বাস এসে চলে গেছে। সদ্য কেনা বিড়ি বান্ডিলটাও অনেকটা খরচ হয়ে গেছে। সাড়ে দশটা নাগাদ অফিস ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল ফোনটা বের করলেন তিনি। এলাকাটা এতটাই নিরিবিলি যে মোবাইলে নম্বর ডায়্যাল করার পিকপিক শব্দটা বোধ হয় রাস্তার ও'পার থেকেও শোনা যেত।

- হ্যালো।
- আজ্ঞে, আজ্ঞে আমি সহদেব।
- সহদেব?
- সাহা। রেজিস্ট্রেশন নম্বর বারো বাই সি অব্লিক থ্রি ফোর সেভেন সিক্স নাইন ট্যু।
- বলুন সহদেববাবু।
- এ'টা স্টারফ্লায়্যার কোম্পানির হেল্পলাইন তো?
- আমি স্টারফ্লায়্যারের কাস্টোমার কেয়ার এক্সেক, জেমিনাই দত্ত।
- জে...জেমিনাইবাবু..। আমি রাজি। আপনাদের অফার, আমার আপত্তি নেই ও'তে।
- শিওর?
- আজ্ঞে।
- ফ্যামিলির কথা ভেবে দেখেছেন?
- যে আজ্ঞে।
- স্ত্রীর কথা ভেবে..।
- আপনাদের স্পেসশিপে জায়গা নেই কি?
- আছে তো। তবু। ভালো করে ভেরিফাই না করে নিলে..।
- আমি প্রস্তুত কিন্তু। এলআইসি, ব্যাঙ্ক; সব ব্যাপারস্যাপার আজ সামলে নিয়েছি। কারুর কোনো অসুবিধে হবে না।
- টাকাটাই তো একমাত্র সুবিধেঅসুবিধের ব্যাপার নয়।
- আপনার তাই ধারণা জেমিনাইবাবু?
- আমি ঠিক সে অর্থে সংসারী নই।
- তা'হলে আপনি বুঝবেন কী করে?
- ইয়ে। আর ফেরা হবে না কিন্তু।
- জানি। অন্য গ্রহ।
- অন্য গ্যালাক্সি সহদেববাবু।
- অন্য শহর হলেও একই ব্যাপার হত আমার জন্য।
- ইয়ে সহদেববাবু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আপনি আগ্রহের বশে রাজি হচ্ছন না বাড়ি থেকে পালাচ্ছেন?
- ছেলেবেলার পর বাড়ি থেকে পালানো যায় কি?
- বাড়ির লোক, অফিসের লোক, পাড়ার লোক খুব খোঁজখবর করবে আপনার মাসখানেক।
- স্বাভাবিক। ক'টা দিন উমার বড্ড খারাপ কাটবে। তারপর সামলে নেবে ঠিক।
- আর একবার জিজ্ঞেস করছি। আপনি নিশ্চিত তো?
- একশোবার।
- বহুত খুব। দশটা বেজে বেয়াল্লিশ মিনিট বারো সেকেন্ডে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াব আপনার সামনে। চার দুই চার দুই নম্বর। বিনাবাক্যব্যয়ে উঠে পড়বেন।
- ট্যা..ট্যাক্সি?
- কলকাতার রাস্তায় ফ্ল্যায়িং সস্যার নামালে স্টারফ্লায়্যারের ব্যবসা টিকবে ভেবেছেন?

**

সহদেববাবুর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন ভদ্রলোক টের পেলেন যে তার পরণে একটা সুতীর শাড়ি। শরীরটা মারাত্মক ভাবে অচেনা। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন ভদ্রলোক। চারপাশ তাকিয়ে টের পেলেন এ'টা তাঁর মধ্যমগ্রামের ফ্ল্যাটের শোওয়ার ঘর। মাথা তখনও ঝিমঝিম, গায়ের ব্লাউজ ঘামে ভিজে গেছে। হুড়মুড়িয়ে ঘরের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। অবাক হয়ে নিজেকে দেখলেন সহদেববাবু, বা বলা ভালো দেখলেন উমাকে। বিশুর "মা" ডাক শুনে বুক কেঁপে উঠলো তাঁর, কখন সে ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাননি তিনি।

"মা, থানা থেকে বড়বাবু ফোন করেছিলেন। এলাকার সমস্ত হাসপাতাল মর্গ ওরা খুঁজে দেখেছে। বাবার কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না"।

"সহদেব সাহাকে আর যে খুঁজে পাওয়া যাবে না রে বিশু", বলে মস্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন উমাদেবী।

***
(ছবি: জেমিনাই)

অফিসটাইম



কী অদ্ভুত। আজ বাসস্টপ প্রায় ফাঁকা বললেই চলে। আশেপাশের দোকানপাটগুলোতেও লোকজন কম, কয়েকটা দোকানের আবার শাটার নামানো। কে জানে কেউ বনধ-টনধ ডেকেছে কিনা। সুদীপবাবু অফিস-টাইমের ঝুলোঝুলিতে দিব্যি অভ্যস্ত, তবে মাঝেমধ্যে এমন ফাঁকায় ফাঁকায় অফিস যেতে পারলে মন্দ লাগে না।

পৌনে আটটার এল-সেভেন-বাই-সতেরো বাসটা অবশ্য টাইমেই এলো। আজ বাসও প্রায় ফাঁকা। জনা সাতেক লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। একটা পছন্দসই জানালা বেছে বসে পড়লেন সুদীপবাবু। এপ্রিল মাসের রোদ্দুরও মিষ্টি মনে হলো ভদ্রলোকের। খান-তিনেক স্টপেজ পেরোনোর পরেও বাসের লোকজন তেমন বাড়লো না, শহরটাই আজ যেন ঝিমিয়ে আছে।

মিনিট দশেকের মাথায় কন্ডাক্টর এগিয়ে এলেন। এ রুটে বছর সতেরো যাতায়াত করছেন সুদীপবাবু, প্রায় সব কন্ডাক্টরই তাঁর মুখ-চেনা, মাঝেমধ্যে "ভালো তো?" গোছের হাসির আদানপ্রদানও হয় তাঁদের সঙ্গে। কিন্তু এই ভদ্রলোককে ঠিক চেনা ঠেকল না। পরিপাটি চেহারা, বয়স ওই সুদীপবাবুরই মত, চল্লিশ পেরিয়েছে নির্ঘাত।

"একটা পলসন স্ট্রিট অফিস মোড়" বলে মানিব্যাগ বের করলেন সুদীপবাবু। কী আশ্চর্য, কন্ডাক্টর মিষ্টি হেসে বললেন, "আপনার আজ টিকিট লাগবে না"। খানিকটা হকচকিয়ে কন্ডাক্টর ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন সুদীপবাবু। অমায়িক মেজাজে কন্ডাক্টর বললেন,

- এ রুটের পুরনো কাস্টোমারদের জন্য আজ স্পেশ্যাল ট্রিপ, ভাড়া লাগবে না!
- মানে?
- মানে, এ রুটের বাস বছর দশেক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও যারা আমাদের সঙ্গে ছাড়েনি, তাঁদের জন্য স্পেশ্যাল হাওয়া-খাওয়া ট্রিপ।
- ইয়ার্কি মারছেন?
- তৌবা তৌবা।
- টিকিটটা দিন।
- এ রুট এখন বন্ধ, বললাম তো সুদীপবাবু। আজ আপনাদের ট্যুর অফ অনার। উপভোগ করুন।

কন্ডাক্টর সরে গেলেন। ফালতু ইয়ার্কি সুদীপবাবুর ঘোর অপছন্দ, তাও আবার সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের মুখ থেকে। পাত্তা না দেওয়াই ভালো।

বাস পলসন স্ট্রীটে পড়ার পর জানালার বাইরে চেয়ে আরও খানিকটা অবাক হতে হলো সুদীপবাবুকে। রাস্তাটা একই আছে, কিন্তু এলাকার দোকানপাট বাড়ি-ঘরদোরগুলো সব কেমন অন্যরকম। অফিসপাড়ার বাসস্টপ আসতে নেমে পড়লেন তিনি, কন্ডাক্টরকে আর ভাড়া নিয়ে সাধাসাধি করার মানে হয় না। বাসস্টপের পাশেই অমিয়র পান দোকান। সে'খানে দাঁড়িয়ে একটা ফ্লেক ধরিয়ে অফিসের দিকে হেঁটে যাওয়াটা পুরনো অভ্যাস। আজ অমিয়কে দেখে সামান্য অবাক হতে হলো। সে যেন একদিনের মধ্যে অনেকটা বুড়িয়ে গেছে।

- শরীর কেমন অমিয়?
- ওই, যেমন থাকে আর কী।
- একটা ফ্লেক।
- সে কী, আপনি আবার সিগারেট ধরলেন নাকি? কী দরকার বলুন তো এ বয়সে। চ্যুয়িংগগামেই তো বছর কয়েক দিব্বি চললো। ও জিনিস আর ধরবেন না।

সামান্য বিচলিত বোধ করলেন সুদীপবাবু। স্ত্রীকে একটা ফোন করা দরকার, রহমানের এসটিডি বুথটা অমিয়ের পানের দোকান ঘেঁষে। কিন্তু সে'দিকে তাকেতেই টের পেলেন ওখানে রাতারাতি একটা এটিএম গজিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে টের পেলেন তাঁর বুক পকেটে মোবাইল ফোন। আর সবচেয়ে বড় কথা, অমিয়র পানের দোকানের সামনে নিজের মারুতি গাড়িটা বেশিক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখাটা ঠিক হচ্ছে না; 'নো পার্কিং' এলাকা; যখন-তখন ট্র্যাফিক পুলিশ চালান ধরিয়ে দিতে পারে।

কাঁচকলা

ড্রোনটা এসে নামলো বিন্দিপুর গ্রামের বিমলাবালা দেবী গার্লস হাইস্কুলের মাঠে। রবিবারের কাঁচা ভোর, তাই স্কুলবাড়ি সুনসান। অবশ্য অজস্র মানুষজন থাকলেও সে ড্রোনের নেমে আসা কেউ টের পেত না। সে ড্রোন দেখতে অবিকল একফোঁটা কুয়াশার মত। আরও সহজ করে বললে সে ড্রোনকে প্রায় দেখাই যায় না।

ড্রোনটা নামা মাত্রই স্কুলের দারোয়ান বিনোদবিহারীর ছোট্ট এক কামরার ঘরের ভিতর দু'টো পিং শব্দ হলো। পিং বললাম বটে, টুং-ও বলা যেত। ওই মৃদু যান্ত্রিক একটা ব্যাপার। খুব কান পেতে না শুনলে টের পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বৃদ্ধ বিনোদবিহারীর ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। তিনি জানেন ই-সেভেন-থ্রি-রেভ নেমেছে। তিনি জানেন এ'বারে কী হবে। এফএম রেডিওয় বেজে চলা মহম্মদ রফির গান থেমে গেলো, এরপর পনেরো-কুড়ি সেকেন্ড শুধু স্ট্যাটিকের শব্দ। বিনোদবিহারী নিজের ঘুপচি ঘরের ছোট্ট জানালার পাল্লাটা টেনে বন্ধ করে দিলেন।

স্ট্যাটিক থেমে গেলো। খানিকক্ষণ উসখুস করে বিনোদবিহারী নিজের খয়েরি হাফশার্টের বুকপকেট থেকে একটা খৈনির ডিবে বের করলেন। খৈনির ডিবেটা এক প্যাঁচে মাঝ-বরাবর খুলে ফেললেন বিনোদবিহারী। ডিবের মধ্যের ছোট্ট স্ক্রিনটার ওপর তরতরিয়ে সবুজ রঙের কোড আসা যাওয়া করছিল। আর দেরী নয়। ডিবের অন্যদিকে আলতো চাপ দিয়ে ড্রোনের ট্রান্সমিটারকে 'অ্যাফার্মেটিভ' জানালেন বিনোদবিহারী।

আড়াই সেকেন্ড মত লাগলো গোটা ব্যাপারটা ঘটে যেতে। আপাতত ক্লাসে মেয়ে পড়ানো, খেলারমাঠে হুটোপুটি, স্টাফরুমের গোলমাল ক'দিনের জন্য বন্ধ। অবশ্য "ক'দিন" ব্যাপারটা বিনোদবিহারীর মনে হয়। অঙ্কের মাস্টার অমিয়বাবু হলে ভারিক্কি গলায় বলতেন "এই যে তোমার দারোয়ানগিরি, আমার মাস্টারি আর এই যে চাদ্দিকে এত মানুষজন, পলিটিক্স গানবাজনা, হইহুল্লোড়..এতটা আসতে কদ্দিন সময় লেগেছে জানো বাবা বিনোদবিহারী? থার্টিন পয়েন্ট এইট বিলিয়ন ইয়ার্স। তার আগে ছিল প্রবল এক কাঁচকলা।বিলিয়নের কন্সেপ্ট বোঝো"?

বিনোদবিহারী ফ্যালফ্যালে চোখে মাথা নাড়তেন। তৃপ্তির হাসি হাসতেন অমিয়বাবু। সে ধরণের হাসি আবার দেখতে হলে এ'বার বেশ কয়েকদিনের অপেক্ষা, অমিয়বাবুর ভাষায় থার্টিন পয়েন্ট এইট বিলিয়ন ইয়ার্স। এই বিলিয়ন ইয়ার্স ব্যাপারটা বিনোদবিহারীর আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারলে না। অবশ্য বিনোদবিহারী এ'ও বেশ জানেন যে অমিয়মাস্টারের 'প্রবল কাঁচকলার' কন্সেপ্টে মারাত্মক খামতি আছে।

Thursday, November 21, 2024

ইশারা



বেড়লটা ইশারায় ডাকলো বলেই সমরবাবু সাইকেল দাঁড়িয়ে করিয়ে ফুটপাথ ধরে এগিয়ে গেলেন। ছিমছাম একটা কফিশপ, সেটার দরজার বাইরে সাদা রঙের বেড়ালটা বসেছিল। এর আগে কোনোদিনও বেড়ালের ইশারার মুখোমুখি হননি সমরবাবু। অতএব সামান্য নার্ভাস বোধ করছিলেন।

বেড়ালকে তো আর "আমায় ডাকছিলেন কি" মার্কা প্রশ্ন করা যায় না। তাই সামনে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে ভুরু নাচাতে হলো। কী আশ্চর্য, ল্যাজের ইশারায় সে বেড়ালটা সমরবাবুকে কফিশপের ভিতরে যেতে বললে। এ'সব দামী কফি সমরবাবুর ধাতে সয় না, কিন্তু বেড়ালের এহেন ইন্সট্রাকশন উড়িয়ে দিতে মন সরল না। কফিশপের দরজা খুলে পিছন দিকে তাকিয়ে বেড়ালটার চোখের সামনে তর্জনী ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলেন যে সে কফিশপে ঢুকতে আগ্রহী কিনা। কিন্তু বেড়ালটা ততক্ষণে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

কফিশপে তেমন ভিড় নেই, কোণের একটা টেবিল দেখে বসলেন সমরবাবু। সবচেয়ে সস্তা কফির অর্ডার দিলেন, খিদে ছিল পেটে কিন্তু এখানে এত দাম দিয়ে কিছু নেওয়ার মানে হয় না। শৌখিন কফি শৌখিনতর কাপে এলো, খয়েরি কফির ওপর সাদা ফেনায় একটা হার্ট সাইন আঁকা। বেশ জমকালো ব্যাপার আর কী। তবে বেড়ালের ইশারা ব্যাপারটা দামী কফির চেয়েও জব্বর ব্যাপার, এই ভেবে কফিতে চুমুক দিলেন তিনি।

কফিটা তড়িঘড়িই শেষ করলেন সমরবাবু। বেড়ালটিকে আর একবার দেখা দরকার, ফের যদি ইশারায় কিছু বলে। বিল মিটিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যখন কফিশপের দরজা খুললেন বেড়ালটা তখন দোকানের বাইরে রাখা চেয়ারের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে। সাইকেলের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও থমকালেন সমরবাবু। স্পষ্ট মনে আছে বেড়ালটার ল্যাজ বাদে গোটা গা ধবধবে সাদা ছিল। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে পিঠের দিকে একটা পেল্লায় খয়েরী রঙের গোল ছোপ, আর তার ওপরে সাদা শৌখিন একটা হার্ট চিহ্ন।

আর তখুনি জিভে বিশ্রী কিছু একটা ঠেকলো। জিভে হাত দিয়ে দেখতেই দিতেই সে'টা আঙুলের ডগায় উঠে এলো। সে'টা চোখের কাছে আনতেই সমরবাবু বুঝলেন যে বিশ্রী জিনিসটা আদতে একগোছা সাদা লোম।

পড্‌

অনিন্দ্য দিব্যি রোব্বারের মেজাজে সোফায় বসেছিলেন। সামনের দেওয়ালের মিউট রাখা টিভিতে এক আধুনিক গাইয়ে অত্যাধুনিক ভাবভঙ্গি করে গাইবার চেষ্টা করছিলন। সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা প্লেটটা সাফ হয়ে গেছে, তবে লুচি-বেগুনভাজার এঁটো চিনতে অসুবিধে হয় না।

এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো।
-হ্যালো!
- অনিন্দ্যবাবু! কেমন আছেন?
- আপনি কে? আমি...আমি কোথায়..।
- হে হে। আমি অফিস অ্যালার্ম। আপনার ড্রিমপডের দশ মিনিট কোটা শেষ। এ'বারে যে কাজে ফিরতে হয়।
- ওহ। তাই তো। যাচ্চলে। লুচির গন্ধটা এখনও আঙুলের ডগায় যে।
- এই না হলে সুপার পাওয়ার ন্যাপ। এ'বারে চটপট টেবিল গিয়ে বর্গিন অ্যান্ড বার্ক্সের ফাইলটা প্রসেস করে ফেলুন। বস অপেক্ষা করছেন।

মিউ



বাতাসে একটা মিঠে ভাব, চারদিকটা কী অপূর্ব ভাবে শান্ত। মনের মধ্যে আজ একটা অনাবিল স্বস্তি।
অরূপবাবু ঢুলছিলেন ভালো লাগায়, তৃপ্তিতে।

তিব্বতিবাবার থেকে নেওয়া মন্তরটা এদ্দিন পরখ করে দেখা হয়নি। গত বছর প্রভিডেন্ট ফান্ড ভাঙিয়ে কৈলাসযাত্রাটা দিব্যি হয়েছিল, সেখানেই সে বাবাজীর সঙ্গে আলাপ। মাস দেড়েক বাবার পদসেবাতেই কেটেছিল অরূপবাবুর। বৈদ্যবাটির মানুষ, অথচ ভক্তির গুণে তিব্বতি পাহাড়ের গুহার হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডাও সয়ে গেছিল অরূপবাবুর। ফেরার মুখে সে বাবাই এ মহামন্ত্র কানে দিয়েছিলেন। তিব্বতি ভাষায় মন্ত্রের নাম যহিদ্যেয্যাবশোস, সে মন্ত্রেই নাকি আদত মুক্তি। মুক্তির প্রসেসটা ঠিক কী'রকম সে'টা খোলসা করেননি বাবা। তাছাড়া আত্মোপলব্ধি ছাড়া মুক্তির মত হাইভোল্টেজ জিনিস আয়ত্ত করা সম্ভবও নয়। মুক্তি তো আর শর্টহ্যান্ডে ডিক্টেশন নেওয়া নয়।

সংসারের হ্যাপা অরূপবাবুকে সামলাতে হয়নি কোনোদিন। তবুও, তিব্বত থেকে ফেরার পর অফিস আর পাড়ার ক্লাব নিয়ে ফের মেতে ওঠায় মুক্তি ব্যাপারটায় সামান্য জল এসে মিশেছিল। তবে তিব্বতি বাবা পইপই করে বলে দিয়েছেন এ জিনিস নিয়ে তাড়াহুড়ো কিছুতেই নয়। মুক্তির ডাক যেদিন অন্তরে এসে টোকা মারবে, সেদিনই সেই মন্ত্রের প্রতি নিজেকে সঁপে দিতে হবে।

আজ সন্ধের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে একটু নিরিবিলি এলাকা দেখে বসে পড়েছিলেন। আজকের সূর্যাস্তটা যেন খানিকটা অন্যরকম ঠেকলো; খানিকটা বিষণ্ণ, আর খানিকটা স্বস্তির। টের পেলেন অরূপবাবু; সময় এসেছি। তিব্বতিবাবাকে সতেরোবার পেন্নাম ঠুকে বাহাত্তরবার সে মহামন্ত্র আওড়ালেন। যাবতীয় কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলো। একটা অসামান্য তন্দ্রায় ভেসে যাচ্ছিলেন অরূপবাবু। টের পাচ্ছিলেন মুক্তির রঙ পানসে গোলাপি। বুঝতে পারছিলেন আর পিছুটান রইল না।

এ'ভাবেই কেটে গেল ঘণ্টা দুই। অরূপবাবু চোখ মেলে দেখলেন তাঁর চারপাশটা অয়েলপেন্টিংয়ের মত মায়াবী। আড়মোড়া ভেঙে অরূপবাবু বলতে চাইলেন "বাহ্"। অথচ স্পষ্ট শুনলন যে তাঁর মুখ দিয়ে যে শব্দটা বেরোল সে'টা একটা সুস্পষ্ট এবং সুরেলা "মিউ"।

Tuesday, January 2, 2024

অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীর ল্যান্ডিং



স্পেস-ক্র্যাফট ল্যান্ড করেছে আড়াই ঘণ্টা আগে। এক্কেবারে মাখনের মত ল্যান্ডিং, অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীকে সামান্য বিষমও খেতে হয়নি। বেশ চনমনে মেজাজে ককপিটের মধ্যে খানিকক্ষণ ইউরেকা-মারদিয়াকেল্লা-উরিউরিবাবা-কীদারুণ বলে নাচানাচি করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু স্পন্ডেলাইসিসের জ্বালাতনের কথা ভেবে লাফালাফির ব্যাপারটা বাদ দিলেন চৌধুরীবাবু। স্পেস-ক্র্যাফট নেভিগেশন কনসোল স্পষ্ট বাতলে দিচ্ছে যে ল্যান্ডিং একদম খাপেখাপ হয়েছে। তিনি এসে পড়েছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, এই গ্যালাক্সির নাম উরগেন। পৃথিবী থেকে উড়ে আসতে সময় লেগেছে সতেরো মাস বাইশ দিন সতেরো ঘণ্টা উনিশ মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড। কলকাতা স্পেস সেন্টারে বসে হিসেব কষে যা দেখে গেছিল, তার থেকে রীতিমত আড়াই মিনিট কম। ফিরে গিয়ে একটা মেডেল-টেডেল পাওয়া যেতে পারে, কপালে থাকলে সরকারের থেকে কোনও বাহারে খেতাব আর তার পাশাপাশি স্পেশ্যাল বখশিশ হিসেবে মিক্সারগ্রাইন্ডার বা সরবতের গ্লাসের সেটও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পৃথিবীতে সুখবরটা পাঠানোর আগে একটু এই নতুন গ্রহে নেমে হাঁটাহাঁটি করে নেওয়া দরকার। জরুরী কিছু ডেটা আর স্যাম্পল সংগ্রহ হয়ে গেলেই বাহাদুরির ব্যাপারটা স্পেস-সেন্টারে জানিয়ে দেওয়া যাবে'খন। লোকে জানুক, অরবিন্দ চৌধুরী এলেবেলে অ্যাস্ট্রনট নয়। হিসেব অনুযায়ী ঘণ্টা-চারেকেই কাজ সেরে ফেলা যাবে। তারপর স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি গুটিয়ে দুগগা বলে বাড়ির দিকে রওনা হওয়া। বেরোনোর আগে গ্রহটার একটা নাম দিয়ে যেতে হবে। গিন্নীর অনারে এ গ্রহের নাম সুতপাস্ফেয়ার দেওয়ার ইচ্ছে অরবিন্দবাবুর। আশা করা যায় এই রোম্যান্টিক চমকের ফলে বিবাহবার্ষিকীর খরচ কিছুটা কমানো যাবে।

ফ্রুটজ্যাম আর পার্মাফ্রেশ পাউরুটির চার স্লাইস খেয়ে টেস্টিং আর স্যাম্পল কালেকশন কিট গুছিয়ে নিলেন অরবিন্দবাবু। এক্সিট ডোরের দিকে এগোনোর আগে এনভারোনমেন্ট-চেক মনিটরের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ অবাক হতে হলও অরবিন্দবাবুকে। এ গ্রহের বাতাস-টাতাস যে অনেকটা পৃথিবীরই মত, বিজ্ঞানীদের হিসেব তেমনটাই আভাস দিয়েছিল বটে। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়, আজকাল গোল্ডিলক কন্ডিশনস সমেত প্রচুর গ্রহেই পৃথিবীর মানুষ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। বহু এলিয়েন প্রজাতির চোখ ধাঁধানো সভ্যতা সম্বন্ধে পৃথিবীর মানুষ এখন সবিশেষ ওয়াকিবহাল। এই উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে যে কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে আছে তা অরবিন্দবাবুর জানা নেই; তবে মনিটরের দিকে তাকিয়ে গ্রহের এ অঞ্চলের পলিউশন কাউন্ট দেখে চমকে যেতেই হলও; যেন অবিকল পৃথিবী।

তবে কি এই প্রথম মানবসভ্যতার কাছাকাছি কিছু নজরে পড়তে চলেছে? উফ্‌, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

পিলে চমকানো কিছু আবিষ্কার করতে পারলে কালীঘাটে জোড়া পাঁঠা বলি দেবেন ফিরে গিয়ে, এমন প্রার্থনা করেই স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুললেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। 

***

মিনিট দুয়েকের মধ্যে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। একের পর এক চমক। আর এক বিশ্রী আতঙ্ক যা বর্ণনা করার ভাষা অরবিন্দবাবুর জানা নেই।

স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুলতেই অদ্ভুত কতগুলো জিনিস ধাক্কা দিল ভদ্রলোককে।

প্রথমত, গন্ধ। আলুর চপ, এগরোল, ঘাম, পারফিউম, আর ডিজেল পোড়া ধোঁয়ার ককটেল। এ ককটেল তার সুপরিচিত।

দ্বিতীয়ত, শব্দ। এ'খানেও রকমারি ব্যাপারস্যাপার; হাজার-হাজার মানুষের হইহই আর সে হইহইয়ের সিংহভাগই যে মোটা-দরের কলকাতাইয়া বাংলা, তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। এমন কি মাইকে দু'বার ঘোষণাও শুনতে পেলেন; "বজবজ থেকে চোদ্দ বছরের বাপটু সান্যাল মেলায় এসেছেন ছোটদাদু হরিহর সান্যালের সঙ্গে। বাপটু হারিয়ে গেছে, ছোটদাদুর ধারণা বাপটু ছোটদাদুকে ফাঁকি দিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। বাপ্টু তুমি যে'খানেই থাকো আমাদের কমিট অফিসের সামনে চলে এসো। তোমার ছোটদাদু রেগে বোম হয়ে এ'খানে পায়চারি করছেন"। দূরে ফাটা মাইকে কুমার শানুর গান ভেসে আসছে - "অমর শিল্পী তুমি কিশোরকুমার, তোমাকে জানাই প্রণাম"।  আর সব ছাপিয়ে; স্পেস-ক্রাফটের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের করতালি আর উল্লাস। পিলে চমকে কানে তালা লেগে অরবিন্দবাবুর সে এক বিশ্রী অবস্থা।

তৃতীয়ত, একটা হাড়-হিম করে দেওয়া দৃশ্য। অরবিন্দবাবু নিশ্চিত যে তার স্পেস-ক্র্যাফট এসে নেমেছে কলকাতার মিলন-মেলা প্রাঙ্গণে। নির্ঘাত মরশুমি আনন্দমেলা বসেছে। 

এত বড় ভুল হলটা কী করে? পকেট থেকে ইন্টার-গ্যালাক্টিক নেভিগেশনট্র্যাকার বের করে দেখলেন - কী আশ্চর্য, হিসেবে কোনও ভুল নেই। তিনি রয়েছেন উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে। কিন্তু, এ'সব তবে কী?

ঠাহর করার আগেই অরবিন্দবাবু বুঝতে পারলেন যে মেলার ঠিক মাঝখানে এসে নেমেছেন তাঁর স্পেস-ক্র্যাফট। আর মেলা-কমিটির করিতকর্মা লোকজন একটা টিকিট কাউন্টার বসিয়েছে।  সর্বনাশ, লোকে লাইনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকবে বলে। চারজন ছোকরা ছেলে চোঙা হাতে ক্রমাগত চিল্লিয়ে যাচ্ছে; "আপনার ঠেলাঠেলি করবেন না। হাত টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন। শিগগিরি স্পেস-ক্র্যাফট ভ্রমণ শুরু হবে। লাইন ভাঙবেন না, লাইন ভাঙলেই টিকিট ক্যান্সেল। আর হ্যাঁ, দয়া করে মুড়ি বেগুনির ঠোঙা বা এগরোল হাতে স্পেস-ক্র্যাফটে প্রবেশ করবেন না। সেলফি নিতে গিয়ে অযথা ভিড় বাড়াবেন না"। 

গলা শুকিয়ে এলো অরবিন্দবাবুর। এ কী কাণ্ড! কিন্তু চট করে যে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকে দরজা বন্ধ করবেন সে উপায়ও নেই, পা'দুটো একতাল লোহার মত ভারি। এমন সময় স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন এক মধ্যবয়স্ক হেডমাস্টার-গোছের এক ভদ্রলোক, বুকপকেটে ব্যাজ আঁটা, তা'তে লেখা, "অলোক হালদার, সভাপতি, কলকাতা আন্তর্জাতিক মেলা কমিটি। 

***

- আ...আ...আমি...।
- আপনি অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। ওয়েলকাম টু মিলন-মেলা প্রাঙ্গণ ইন কলকাতা, প্ল্যানেট পৃথিবীজ গ্রেটেস্ট সিটি।

- ইয়ে, আপনার কিছু ভুল হচ্ছে...অলোকবাবু। আমি এসেছি পৃথিবী নামক গ্রহের কলকাতা নামক শহর থেকে।

- হে হে। আপনি তেমনটা ভাবতেই পারেন। কিন্তু আমাদের কাছে আপনি এসেছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ থেকে।

- না না, সে'টা আপনাদের গ্রহের পোজিশন। আমাদের গ্রহ পৃথিবীর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে।

- হে হে হে...আপনার কাছে যা সোজা, আমাদের কাছে তাই উলটো। অসুবিধে কীসের। তবে আপনার অনেক ধকল গেছে। আসুন, মেলা কমিটির অফিসে বসে বিশ্রাম নেবেন। আপনার জন্য ফাইভ স্টার অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সে'খানে। আর ইয়ে, আমাদের এমএলএ বিপিনবাবু আসছেন স্পেস-ক্র্যাফট বিলাসভ্রমণ উদ্বোধন করতে। তিনি খুব আগ্রহী আপনার সঙ্গে আলাপ করতে।

- আমার মাথাটা কেমন গুলোচ্ছে অলোকবাবু। আমি অ্যাস্ট্রনট। আমার অনেক কাজ। আর স্পেস-ক্র্যাফটে এত লোক ঢোকানোটা কি ঠিক হবে?

- ও মা! যে'দিন আপনি যাত্রা শুরু করলেন, সে'দিনই গোটা শহর জুড়ে পোস্টার পড়ে গেল। এ'সব ইন্টার-গ্যালাক্টিক মুভমেন্ট আমরা ট্র্যাক করে থাকি কিনা। আপনি এ পাড়ায় পায়ের ধুলো দেবেন খবর পাওয়ায় মেলা বসার পারমিশন হয়ে গেল। ইকনোমি বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল। আপনি সময়মত এসে পৌঁছনোয় আমরা খুব খুশি।

- আমার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে যে।

- ডোন্ট ওরি। মেলা তো ক'দিন মাত্র। ক'দিন না হয় রিয়েল কলকাতা উপভোগ করে যান।

- রিয়েল কলকাতা যে রিয়েল পৃথিবীতে রয়েছে অলোকবাবু।

- রিয়েল এ'টাই স্যার।

- এ তর্কের কোনও মানে হয়? এ'সব বাদ দিন। আমায় ফেরত যেতে হবে।

- আপনি ভয় পাচ্ছেন অরবিন্দবাবু। ভয় পাচ্ছেন সেই ভয়াবহ আবিষ্কারের। আপনার পৃথিবী আদত পৃথিবী নয়, আপনাদের কলকাতা আদত কলকাতা নয়; এ ধাক্কা যে মারাত্মক ধাক্কা। তবে মনখারাপ করবেন না। অলটারনেট কলকাতা তো এ দুনিয়ায় কম নেই। গত বারো বছেরো আপনি এ নিয়ে সাত নম্বর মক্কেল। এর আগের ছ'জন নাকে খত দিয়ে স্বীকার করে গেছেন যে আসল কলকাতা এ'খানেই। 


***

মেলা-কমিটির অফিসের সোফায় গা এলিয়ে পড়েছিলেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। তাঁর চোখমুখ পরিতৃপ্ত, ঠোঁটে এক রোমান্টিক হাসি। আনন্দমেলা দু'দিন আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু মেলা কমিটির আতিথ্যে কোনও ঘাটতি পড়েনি। অলোক হালদার নিজে এ'বেলা ও'বেলা তাঁর খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছেন। ফিরতে হবেই, কিন্তু অরবিন্দবাবুর বিশেষ তাড়া নেই। এ'খানকার ক্যালেন্ডারে এখন মার্চের সতেরো তারিখ। আর অরবিন্দবাবুর সামনের টেবিলে থরে থরে সাজানো খাঁটি হাইকোয়ালিটি এবং টাটকা নলেন গুড়ের সন্দেশ। যে পৃথিবীর কলকাতায় নির্ভেজাল নলেনের বাস বছরে সাড়ে চার মাস, তার পৃথিবীত্ব ও কলকাতাত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা মুর্খামি; এ সত্য অস্বীকার করার ক্ষমতা অরবিন্দবাবুর নেই। হপ্তা-খানেক পর অরবিন্দবাবু ফিরে যাবেন গ্রহ ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, যে'খানে সুতপা তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। স্পেস-ক্র্যাফটের কন্ট্রোলড পরিবেশে আদত কলকাতার কিলো দশেক টপ-ক্লাস নলেন সন্দেশ নিয়ে ফিরতে কোনও অসুবিধেই হবে না। বিবাহবার্ষিকীতে গিন্নীর জন্য এর চেয়ে ভালো উপহার আর কীই বা হতে পারে। 


(ছবিটা রেয়া আহমেদের আঁকা। বংপেন ৭৫-য়ের জন্য এ'টা আর আরো জমজমাট কিছু স্কেচ এঁকেছিল সে) 

Sunday, December 31, 2023

গৌতমবাবুর বুকপকেট

১।।

 

অফিস যাওয়া  মানেই গৌতমবাবুর বুকপকেটে তিনটে জিনিস থাকবেই৷  একটা দশ-কুড়িটাকা দামের ডটপেন৷ একটা পকেট নোটবই যে'টায় অফিসের বড়সাহেবের ফরমায়েশ থেকে শুরু করে গেরস্থালীর মাসকাবারি ফর্দ আর ধোপার লেনদেন; সবরকমের হিসেবকিতেব লিখে রাখা হয়  আর একটা নীল প্লাস্টিক মোড়কে ঢাকা রেলের  মান্থলি টিকিট৷ মাঝেমধ্যে অবশ্য 'দেড়েক টাকাও থাকে। কিন্তু আজ ব্যাপারটা একটু হিসেবের বাইরে চলে গেল৷

 

রোজকার মত আজও অফিস-ফেরতা ট্রেনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে মৌজ করে ঝিমচ্ছিলেন গৌতমবাবু৷ সে একটা আধো-ঘুম অবস্থা, গৌতমবাবুর ভাষায় ডেলিপ্যাসেঞ্জারি-ট্রান্স৷ ঝিমুনি কাটল পাশে দাঁড়ানো ভাস্কর সমাজপতির আলতো টোকায়;

 

"গৌতমদা, আপনার কলমটা দিন না প্লীজ৷ আমারটার আচমকা কালি শেষ"

 

ভাস্কর পাশে দাঁড়িয়েই ইংরেজি কাগজের ক্রসওয়ার্ড পাজল সলভ করছিলেন। ভিড়ের সুবিধে হল ট্রেনের ঝাঁকুনিতেও গড়িয়ে পড়ার বিশেষ চান্স নেই, কাজেই নিশ্চিন্তে ভাস্কর সময়টা রোজ ব্যবহার করেন ক্রসওয়ার্ড সাধনায়৷ নিজের কলমটা বিট্রে করায় গৌতমবাবুর কাছে চাইতে হল। গৌতমবাবুও বিনা-বাক্যব্যয়ে বুকপকেটে হাত দিলেন কলম বের করতে।

 

কিন্তু কোথায় কলম, কোথায় নোটবই, কোথায় রেলের মান্থলি টিকিট৷

 

স্তম্ভিত গৌতমবাবু নিজের বুকপকেট থেকে একটা গ্রেনেড বের করে এগিয়ে দিলেন।

 

২।।


- "মাইরি গুরু, তুমি কিছু চিজ বটে৷ গ্রেনেড শালা কেউ পকেটে নিয়ে ঘোরে"

- "গ্রেনেডকে আমি বিড়ির প্যাকেটের চেয়ে বেশি ইজ্জত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনা"


নিজের মুখ থেকে বেরোনো শব্দগুলোয় নিজেই মেরে গেলেন গৌতমবাবু। কথায় কী অদ্ভুত ধার, কী রোয়াব! এমন মেজাজ তো তাঁর নিজেরই অচেনা। আর কোথায় ট্রেনের দুলুনি? কোথায় ডেলিপ্যাসেঞ্জারদের হুল্লোড় আর ভিড়ভাস্কর আর তাঁর ক্রসওয়ার্ড পাজলই বা গেল কোথায়? একটা ঘুপচি গলির এক প্রান্তে; প্রচুর লোহার ড্রামের আড়ালে আধশোয়া হয়ে রয়েছেন তিনি। তাঁর সেই অফিস যাওয়ার চেক-চেক হাফ শার্ট আর নিখিল-দর্জির সেলাই করা নস্যি রঙের প্যান্ট পালটে গেছে। পরনে আগাগোড়া একটা মিশকালো পোশাক। মুখে কালিঝুলি। কিন্তু এই পোশাকটা গৌতমবাবুকে আদৌ চমকে দিল না, ভদ্রলোক জানেন যে তিনি এখানে কেন আছেন। দুই মাস্তানদের দলের চুলোচুলি; টাই তাঁর রোজকার জীবন। চারদিকে বোমা, গুলি চলছে; বারুদের গন্ধ আর চিৎকার-চ্যাঁচামেচি মিলেমিশে সে এক বিশ্রী অবস্থা। দৃশ্য তাঁর অতি-পরিচিত। গৌতমবাবু জানেন যে গৌতম নামটার কোনও অস্তিত্বই তাঁর জীবনে নেই; তাঁর আদত নাম গুপে মাস্তান। কিন্তু ওই ট্রেনের দৃশ্য, পাশে দাঁড়ানো সেই ভাস্কর, সেই অফিসটাইমের ভিড় ট্রেনের শব্দ-গন্ধ-দৃশ্যগুলো যেন মনের মধ্যে বড্ড বেশি টাটকা। কী অদ্ভুত। কয়েক মুহূর্তের জন্য সেই জগতটায় পৌঁছে গেলেন কী করে?

সম্বিৎ ফিরল যখন একটা গুলি প্রায় কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল।

পাশ থেকে চিৎকার করে উঠল গুপের স্যাঙাৎ হাবলাঃ

 “আরে গুরু! এইসব কেলোর কীর্তির মধ্যিখানে তুমি অমন লেতকে শুয়ে কী ভাবছ বলো দেখি? ওপরের বাঁদিকের জানলাটার পাশে দুজন টেঁটিয়া বড় জ্বালাচ্ছে। গ্রেনেড আমি চার্জ করছি। তুমি বরং আমার রিভলভারটা নিয়ে পিঁপড়েগুলোর একটা হেস্তনেস্ত করে দাও


এই বলে নিজের পিস্তলটা গুপের দিকে ছুঁড়ে দিল হাবলা।

 

উড়ে আসা পিস্তলটা খপ করে লুফে নিলো গুপে মাস্তান। কিন্তু গুপে অবাক হয়ে দেখল যে সে যেটা লুফেছে সেটা পিস্তল নয়, একটা দলা-পাকানো নীল রঙের কাগজ।

 

৩।।

 

দলা-পাকানো কাগজ। আবছা নীল। তার ওপর কালো কালিতে লেখা চিঠি।

 

বিনয়দা,

 অপেক্ষা করব, বিকেল ৪টে। কোথায়? সে'টা তুমি জানো।

আর দেরী কোরো না। প্লীজ। বাড়ি ফিরতে দেরী হলেই বাবা খুব বকাবকি করবে।

এসো! কেমন?

 

লিপি

দলা পাকানো কাগজটাকে হাঁটুর ওপর টানটান করে মেলে, তারপর যত্নে  ভাঁজ করে বুক পকেটে রাখল বিনয়।

 

লিপি ডেকেছে,

লিপি ডেকেছে,

লিপি ডেকেছে।

বুকের ভিতরটা কেমন একটা দোলা দিয়ে উঠল। লাস্ট ক্লাসটা মিস হবে। হোক গে, লিপি ডেকেছে বলে কথা। কিন্তু কী অদ্ভুত, কিছুক্ষণ আগেও যেন এই কলেজের এই বারান্দাটা তার জীবনে ছিলনা। শুধু কলেজ কেন, লিপিও ছিল না, বিনয় নিজেও ছিলনা। কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা অন্য জীবনে ছিল যেন সে। চারদিকে গোলাগুলি, সে বারুদের গন্ধ যেন এখনও নাকে লেগে আছে। কী অদ্ভুত।

গুপে মাস্তান কি তা'হলে কেউই নয়? হাবলা এখন কোথায় আছে? তারা কি স্রেফ উবে গেছে?

 

মাথাটা গুলিয়ে আসে বিনয়ের।

 

ধুরছাই, লিপির ভাবনায় মন দিল সে। লিপি ডেকেছে বলে কথা। একটা কিশোরকুমারের গান গুনগুন করতে করতে কলেজ ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে গেল বিনয়।

 

এমন সময় একটা পিছুডাক শুনে ঘুরে তাকালো সে। ডাকটা সুপরিচিত। অথচ যে ডেকেছে; সে কিন্তু বিনয়ের নাম ধরে ডাকেনি। অথচ কী অদ্ভুত, বিনয় জানে যে ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই।

ডাকটা বিনয়ের কানে বাজতে লাগল;

গৌতমদা, গৌতমদা! ঝিমচ্ছেন নাকি? এগিয়ে চলুন, আজ তিন নম্বরে ঢুকছে ট্রেন। আর এই যে আপনার কলমটা


৪।।

বিনয় ঘুরেই টের পেলে বুকের চিনচিনটা।

 

লিপি আসবে না।

লিপি হয়ত নেই কোথাও, অন্তত তাঁর আশেপাশে তো কোথাও নেই।

বিনয় নিজেও নেই।

 কোথায় বাহারে বাটিক প্রিন্টের হাফ-পাঞ্জাবি, কোথায় পিঠে ঝোলানো কলেজের বইয়ের ব্যাগ, কোথায় ক্লাস পালিয়ে ঘাটের দিকে ছুটে যাওয়ার হাতছানি। পরনে এখন একটা সাতবুড়ো হাফশার্ট, ট্রেনের ঘেমো ভিড়, ঠেলাঠেলি। তিনি টের পেলেন যে বিনয় তিনি নন, তিনি গৌতম। অফিস-ফেরতা এই ঝুলোঝুলিই তাঁর জীবন।

 

সমস্তটাই স্পষ্ট! তবুও লিপির না থাকার দুঃখটা বড় বিশ্রীভাবে বুকে বাজল গৌতমবাবুর। বেজার মুখে ভাস্করের হাত থেকে কলমটা নিয়ে নিজের বুকপকেটে চালান করলেন তিনি। আর তখনই তাঁকে আবারও ভেবড়ে যেতে হল।

 

বুক পকেটে ছোট নোটবই, মান্থলি টিকিটের পাশাপাশি রয়েছে একটা যত্নে ভাঁজ করা নীল কাগজ যেটা খানিকক্ষণ আগেই নির্ঘাত কেউ দুমড়ে-মুচড়ে দলা পাকিয়ে ছুঁড়েছিল। নিজের চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ঢোক গিললেন গৌতমবাবু।

 

সাহস করে নিজের বুকপকেটে উঁকি দিয়ে নীল কাগজটার ভাঁজ একটু খুলেই নজরে পড়ল কালো কালিতে নিখুঁত হাতের লেখায়;

দেরী কোরো না, লিপি"!

 

গৌতমবাবু বেশ টের পাচ্ছিলেন যে ওই নীল কাগজের চিঠির গায়ে সামান্য বারুদের গন্ধ লেগে আছে।