Showing posts with label কলকাতা. Show all posts
Showing posts with label কলকাতা. Show all posts

Wednesday, December 31, 2025

শাসমলবাবু ও বম্বের আমেজ


- হ্যালো, শাসমলদা!
- আরে দত্ত যে। কদ্দিন পর ফোন করলে। তা তোমরা আছ কেমন সব কলকাতায়?
- এই চলে যাচ্ছে দাদা। আমাদের আবার থাকা আর না থাকা। আপনি বরং বম্বের খবরটবর বলুন..।
- বম্বে মানেই তো হাইভোল্টেজ অ্যাকশনের জায়গা ভায়া। ওই, হ্যাপেনিং যাকে বলে। এ তো আর ক্যালক্যাটা পাওনি যে সময় থমকে থাকবে। এ'খানে সময়ের দাম আছে।
- সে তো বটেই৷ তা ও'দিকে এখন ওয়েদার কেমন শাসমলদা? শীতটীত পড়েছে কি?
- শ..শী..শীত...ইয়ে মানে। বাতাসে একটা প্লেজ্যান্ট ইয়ে আছে কিন্তু। রাতে ফ্যানের স্পীড কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
- বাহ্‌। বিউটিফুল। ওটাই আইডিয়াল বুঝলেন। এ'বার আবার কলকাতায় বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। এই দেখুন না এখনও শালমুড়ি দিয়ে বসে। এ'সব আবার বাড়াবাড়ি। বম্বের টেম্পারেচার ব্যালেন্সটা বেশ ঈর্ষনীয়।
- যাকেগ বাদ দাও সে'সব কথা। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের যুগে আবার শীত কীসে।
- এটা একদম মোক্ষম কথা বলেছেন। এ শীত আজ আছে কাল নেই। এর আবার কী ভ্যালু। ফালতু যত জয়নগরের মোয়া বিক্রির মার্কেটিং গিমিক আর কী।
- অ। মোয়া উঠেছে বাজারে?
- আরে বেশিরভাগই ফ্রড। তবে বাধ্য হয়ে খুঁজেপেতে দু'এক বাক্স মাঝেমধ্যে আনছি। ওই, হুজুগ আর কী। তবে কলকাতার আর কিছু হওয়ার নয় কিন্তু বুঝলেন। ও'দিকে বম্বের যে একটা আমেজ..।
- ঠিক। ঠিক বলেছো দত্ত। আমেজ। একবারে আসো দেখি এ'দিকে। দেখে যাও আরবসাগরের চার্ম কাকে বলে।
- যাবো। নিশ্চয়ই যাবো। শুধু নলেনের সিজনটা কেটে যাক। বোঝেনই তো, আজকাল জেনুইন নলেনের উইন্ডো এত শর্ট। কলকাতা জাস্ট গোল্লায় গেছে। মাস দেড়েকের বেশ হাইকোয়ালিটি গুড়ের সন্দেশ আর রসগোল্লা পাওয়ার উপায় নেই। জাস্ট ফালতু জায়গা।
- নলেন৷ রসগোল্লা। হুম৷
- ও কী। কিছু ভাবতে বসলেন নাকি?
- না না। আমার আজকাল মিষ্টি তেমন পোষায় না বুঝলে। হেলথের ব্যাপারে একটু নজর দিচ্ছি কিনা।
- হক কথা। মিষ্টি তো নয়। বিষ বিষ। আমার গিন্নীর আবার এই এক রোগ বুঝলেন শাসমলদা। সোয়েটার ট্রাঙ্ক থেকে বেরোতে না বেরোতেই পিঠেপুলির বাই। আরে বাবা ঠাণ্ডা পড়েছে আর গুড়ের সাপ্লাই আছে মানেই কি সাপের পাঁচ পা দেখতে হবে নাকি? ডায়াবেটিস হলে কে দেখবে?
- দত্ত। তোমার সঙ্গে বাজে গল্পের সময় আমার নেই। কাজকর্ম নেই নাকি তোমার? অত খেজুরের সময় পাও কী করে? ফোন রাখো তো। যত সময় নষ্ট। এ'টা আমার এখন বড়াপাও খাওয়ার সময়। তুমি ফোন রাখো।
- ওহ। বড্ড হিংসে হচ্ছে শাসমলদা। কোথায় আপনার সেই ফ্যান্টাস্টিক বড়াপাও। আর কোথায় আমার সামনের এই বাটিতে রাখা সমরদার মিষ্টির দোকানের একজোড়া ফুলকপির শিঙাড়া। নাহ, মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেলো।
- ব্যাটাচ্ছেলে দত্ত! তোমায় আমি জুতোপেটা করবো!

Thursday, December 4, 2025

দেখা হ্যায় পেহলি বার


এ ছবিটা ঢাকুরিয়ায় তোলা। অফিস-ঘেঁষা চায়ের দোকানে। দোকানি দাদাটির বড় গুণ ছিল যে তার মধ্যে ছিঁটেফোঁটাও তাড়াহুড়ো ছিলো না। ডিমটা ফাটাতেন ধীরেসুস্থে। পাউরুটি ফালি করতেন মিহিমেজাজে। অফিসটাইমের দৌড়ঝাঁপ অথবা খদ্দেরদের ব্যস্ততা তাকে স্পর্শ করতে পারতো না।

তেল সঠিক লেভেলে গরম না হলে চাটুতে ডিম পড়তো না। স্টোভের আঁচ গনগনে রাখতেন না ডিম ভাজার সময়, কড়া তাপে ডিমের সেনসিটিভিটি ম্যানেজ দেওয়া যায় না। পাউরুটির গায়ের ডিম নির্ভুল লালে পৌঁছনো পর্যন্ত তিনিও চাটুর দিকে দেখছেন আর্টিস্টের মেজাজে, আমিও চাটুর দিকে চেয়ে আছি ভক্তের চোখ নিয়ে। তারপর সে ডিমপাউরুটি তুলে নেওয়া হবে পরিষ্কার প্লেটে, ছড়িয়ে দেওয়া হবে সামান্য মশলা ও নুন। সামান্যই; সে'টাই হলো ব্যালেন্স।

সকাল-সকাল অমন ভালো ডিমপাউরুটি পাতে পেলে যাবতীয় দায় বুকপকেটে নিয়েও অনায়াসে বিশ্বজয় করা যায়।

Sunday, March 16, 2025

প্রতিজ্ঞা

- সামনের বইমেলায় কিন্তু কলকাতা ফিরবই! ফিরবই!
- ইয়েস!
- দেখতে পাচ্ছিস তো আমার চোয়ালটা কী ট্রিমেন্ডাস শক্ত হয়ে আছে?
- স্পষ্ট! ঠিক যেন একতাল লোহা!
- রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে ভাবলেই। মিনিমাম এক হপ্তা থাকবো, বুঝলি। রোজ মেলায় যাবো; দুপুর থেকে রাত মেলাতেই পড়ে থাকবো। বোনাসের টাকার একটা মোটা অংশ সরিয়ে রাখবো ফর বইমেলা এক্সপেন্সেস।
- এই না হলে সাচ্চা বাঘের বাচ্চা!
- মনে মনে প্রায় পৌঁছেই গেছি পরের বইমেলার মাঠে।
- সে'টাই তো আসল। ভেরি গুড। তবে ইয়ে..।
- ইয়ে কীসের? কীসের ইয়ে?
- গত পুজোয় অফিসে বসে সামনের পুজোতে এক হপ্তার জন্য বাড়ি ফিরবি প্ল্যান করেছিলিস না? টানা পাঁচ রাত জেগে ঠাকুর দেখবি, হাবিজাবি খাবি আর ভোর হলে প্যানফর্টি চার্জ করে শুয়ে পড়বি?
- হুম?
- তা'হলে সামনের পুজোয় এক হপ্তা ছুটি প্লাস সামনের বইমেলায় আরো এক হপ্তা ছুটি, তাই তো?
- হুম?
- ও কী রে, তোর চোয়ালটা কি সামান্য ঝুলে পড়ছে? টেনেটুনে রাখ ভাই!

ছোট আর বইমেলা



- ভূতের গল্প পড়ছিস বড়দা?
- না। হাড়কাঁপানো প্রেমের গল্প।
- ও। তা, ঘুমোবি কখন রে?
- কী চাই?
- বলছিলাম, কাল অফিসের পর বইমেলায় যাবি?
- আমি গেলে তোর কী লাভ ছোট?
- না মানে, আমিও ঘুরতাম তোর সঙ্গে। ও'দিকেই একটা টিউশনি ছিল। সে'খান থেকে বেরিয়ে না হয়..।
- ফার্স্ট ইয়ারের লায়েক ছোকরা। ইয়ারদোস্ত থাকতে আবার এই গোবেচারা বড়দাকে কী দরকার।
- ইয়ারদোস্ত তো আর বই কেনাকাটা স্পন্সর করে না।
- বেশ তো। আমি টাকা দিয়ে দেব। বই কিনিস পছন্দমত।
- তুই আমায় সাইড করছিস কেন বল তো? প্রেম করতে যাবি নাকি বইমেলা?
- কান ছিঁড়ে নেবো ডেঁপোমি করলে।
- যাচ্ছি কি আমরা বইমেলায়? সোজাসুজি বল।
- ঠিক আছে। পাংচুয়ালি সাড়ে পাঁচটায় চার নম্বর গেটের সামনে দেখা করবি। আর ঘোরার সময় বকবক কম করবি, দেখবি বেশি।
- কিপটেমো করবি না তো?
- পিঠের চামড়া গুটিয়ে নেব ছোট।
- আচ্ছা দাদা, বইমেলা ঘুরে কোথাও রুটি মাংস খেতে যাবি?
- এই দ্যাখো। বসতে দিলে শুতে চায়।
- চ' না রে। এত ভালো চাকরি করছিস। আজ বাবাকে দামী রেজার তো কাল মাকে কানের দুল কিনে দিচ্ছিস। আমার ব্যাপারেই যত হিসেব।
- আর কোনো ফরমায়েশ আছে?
- ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরব প্লীজ। রুটি মাংসের পর বই বোঝাই ব্যাগ হাতে বাস-ট্রাম ভালো লাগবে না।
- ছোট। তোর হাবভাব ভালো বুঝছি না।
- তা'হলে সে কথাই রইলো?
- এখন ভাগ। রাত অনেক হয়েছে।
***
ছোট ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বইটা বন্ধ করে খাটের পাশের টেবিলে রাখলেন সুবিমল। এখন কিছুক্ষণের অপেক্ষা। একটু পরেই ঘুম ভাঙবে। তখন এই টালিগঞ্জের বাড়ির পুরনো ঘরটা উবে গিয়ে নিউটাউনের ফ্ল্যাটের সবুজ দেওয়াল স্পষ্ট হবে। সামনের দেওয়ালে এখন যে মা তারা হার্ডওয়্যার স্টোর্সের ক্যালেন্ডার চোখে পড়ছে, তার বদলে দেখা যাবে ফটোর-ফ্রেমে বাবা-মা। ওদের ফটোর ডানদিকে ছোটর ফটো।
স্বপ্নটা এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে সুবিমলের। মাঝেমধ্যেই ঘুরে ফিরে আসে। ছোটর সেই একই আব্দার। কত বছর আগে সেই অফিসের বিশ্রী একটা মিটিংয়ে আটকে গিয়ে বইমেলায় যাওয়া হয়নি সুবিমলের। তখন মোবাইল-টোবাইল ছিল না তাই ছোটকে জানানো হয়নি। সে বেচারি একাই ঘুরেছিল হয়তো বইমেলা, কিন্তু বড়দা না থাকায় বিশেষ কেনাকাটা করতে পারেনি। আর পারেনি বাড়ি ফিরতে; রাস্তা পেরোতে গিয়ে দুর্ঘটনা । সেই থেকে সে বারবার সুবিমলের স্বপ্নে ঘুরে ফিরে এসে ঝুলোঝুলি করে, "বইমেলা যাবি বড়দা"।
স্বপ্নটা দিব্যি চিনতে শিখেছেন সুবিমল। এই দু'ণ্ডের আব্দারটুকু এখন তাঁর অভ্যাস। স্বপ্নে ছোট অন্তত তাঁকে সেই পুরনো বাড়িতে এনে ফেলে বারবার। সে জগতে পাশের ঘরে বাবা-মা শুয়ে। অন্য ঘরে অঙ্ক করার অছিলায় ছোট রেডিওয় হিন্দী গান শুনছে। আর নির্ঘাৎ পরের দিন কী কী বই কিনবে তার ছক কষছে। প্রথমদিকে মনকেমন হত, এখন এ স্বপ্নের জগতটা উপভোগ করেন সুবিমল। মাঝেমধ্যে সন্দেহও হয়, নিউটাউনের ছোট-হীন জগতটাই আদতে স্বপ্ন নয় তো? কাল হয়তো সত্যিই বইমেলা যাওয়ার আছে?
বালিশে মাথা রেখে চোখ বুজে ছোটর রেডিওয় বেজে চলা সুরটা চেনার চেষ্টা করলেন সুবিমল। ছোটকে কাল বইমেলা ঘোরনোর পর পার্ক স্ট্রিটে নিয়ে গিয়ে চাইনিজ খাইয়ে চমকে দিলে কেমন হয়?

Thursday, November 21, 2024

ঢাকুরিয়া, ২০১২



ঢাকুরিয়া, ২০১২।

তখন যৌবন। যৌবন মানে নির্দ্বিধায় পর পর দু'টো ডাবল এগ চিকেন রোল খেয়ে সন্ধের টিফিন সেরে ফেলতে পারি। তখনকার আকাশ বেশি নীল ছিল কিনা জানি না, কিন্তু মেজাজের জেল্লা ছিল অন্য মাত্রায়।

এই রাস্তার অন্য প্রান্তেই বেদুইনের (গড়িয়াহাটেরটা নয়) রোলের দোকান। সে'খানে রোলের মধ্যে সামান্য আলু দেওয়ার চল ছিল। খুঁতখুঁত করলেও সে রোল জিভে মন্দ লাগত না৷ এ রাস্তা ধরে খানিকটা পিছিয়ে এলে দক্ষিণাপণ শপিং কম্পলেক্সের মেনগেট, তার সামনে যে ফুচকাদাদা-বৌদি; তাঁদের ভাঁড়ারে অমৃতসম আলুর দম। উল্টোদিকের এসবিআইয়ের ব্রাঞ্চের সামনে সন্ধেবেলা এক বৌদি মোমোর ডিবে নিয়ে দাঁড়াতেন; অতি-উপাদেয়৷ এই স্টলগুলোর সঙ্গে তখন আমার সুনিবিড় আত্মীয়তা, নিয়মিত যোগাযোগ, আত্মার আদানপ্রদান। সে আত্মীয়তাই আমার যৌবনের আস্ফালন, রণহুংকার।

হাফপ্লেট



বছর সাতেক পুরনো ছবি, কলকাতায় তোলা৷ কোন অঞ্চল সে'টা সঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত যোধপুর পার্কের আশেপাশে৷

যা হোক, এই ফর্ম্যাটের রোল-চাউমিনের দোকান কলকাতার রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে৷ রোলের মধ্যে পাওয়া যাবে এগ, ডবল এগ, এগ চিকেন, ডবল এগ চিকেন আর ডবল এগ-ডবল চিকেন৷ মাটন রোল পাওয়া গেলে বুঝতে হবে এ দোকান একটু উঁচু স্তরের৷ চাউমিনের মধ্যে পাওয়া যাবে ভেজ, এগ, চিকেন আর এগ চিকেন৷ আবার এ'টা উঁচু স্তরের দোকান হলে ডিম-মুর্গির সঙ্গে কুচো চিংড়ি দেওয়া মিক্সড চাউমিনও পাওয়া যাবে। উপরি থাকবে কাচের শোকেস আলো করা চিকেন পকোড়া আর স্টিলের গামলায় রাখা চিলি চিকেন যে'টা পিস হিসেবে বিক্রি হয়।

এ'সব দোকানে আমার পছন্দ হলো গিয়ে চাউমিন; হাফপ্লেট কিন্তু ডবল ডিম দেওয়া৷ স্টিলের প্লেটে চাউমিনের ঢিপি ঘেঁষে দু'টো বিটনুন ছড়ানো চিকেন পকোড়া, যে'গুলো চাটুতে আর একবার সেঁকে তারপর প্লেটে দেওয়া হয়েছে৷ চাউমিনের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হবে চিলিসস, টমেটো সস আর পেঁয়াজ-লঙ্কাকুচি৷ আর সবার ওপরে পড়বে, স্পেশাল রিকুয়েস্টের মাধ্যমে আদায় করে নেওয়া চিলি চিকেনের গ্রেভি৷

এত রাত্রে এ'সব ভেবে জিভ জলে টইটম্বুর। বিস্কুট-চানাচুর ছাড়া আর কোনো গতি নেই৷ কাজেই মন-মেজাজ মারাত্মক উদাস হয়ে পড়েছে৷ ভয় হচ্ছে খসখস করে দু'চারটে কবিতাফবিতা না লিখে ফেলি।

Tuesday, January 2, 2024

অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীর ল্যান্ডিং



স্পেস-ক্র্যাফট ল্যান্ড করেছে আড়াই ঘণ্টা আগে। এক্কেবারে মাখনের মত ল্যান্ডিং, অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীকে সামান্য বিষমও খেতে হয়নি। বেশ চনমনে মেজাজে ককপিটের মধ্যে খানিকক্ষণ ইউরেকা-মারদিয়াকেল্লা-উরিউরিবাবা-কীদারুণ বলে নাচানাচি করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু স্পন্ডেলাইসিসের জ্বালাতনের কথা ভেবে লাফালাফির ব্যাপারটা বাদ দিলেন চৌধুরীবাবু। স্পেস-ক্র্যাফট নেভিগেশন কনসোল স্পষ্ট বাতলে দিচ্ছে যে ল্যান্ডিং একদম খাপেখাপ হয়েছে। তিনি এসে পড়েছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, এই গ্যালাক্সির নাম উরগেন। পৃথিবী থেকে উড়ে আসতে সময় লেগেছে সতেরো মাস বাইশ দিন সতেরো ঘণ্টা উনিশ মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড। কলকাতা স্পেস সেন্টারে বসে হিসেব কষে যা দেখে গেছিল, তার থেকে রীতিমত আড়াই মিনিট কম। ফিরে গিয়ে একটা মেডেল-টেডেল পাওয়া যেতে পারে, কপালে থাকলে সরকারের থেকে কোনও বাহারে খেতাব আর তার পাশাপাশি স্পেশ্যাল বখশিশ হিসেবে মিক্সারগ্রাইন্ডার বা সরবতের গ্লাসের সেটও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পৃথিবীতে সুখবরটা পাঠানোর আগে একটু এই নতুন গ্রহে নেমে হাঁটাহাঁটি করে নেওয়া দরকার। জরুরী কিছু ডেটা আর স্যাম্পল সংগ্রহ হয়ে গেলেই বাহাদুরির ব্যাপারটা স্পেস-সেন্টারে জানিয়ে দেওয়া যাবে'খন। লোকে জানুক, অরবিন্দ চৌধুরী এলেবেলে অ্যাস্ট্রনট নয়। হিসেব অনুযায়ী ঘণ্টা-চারেকেই কাজ সেরে ফেলা যাবে। তারপর স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি গুটিয়ে দুগগা বলে বাড়ির দিকে রওনা হওয়া। বেরোনোর আগে গ্রহটার একটা নাম দিয়ে যেতে হবে। গিন্নীর অনারে এ গ্রহের নাম সুতপাস্ফেয়ার দেওয়ার ইচ্ছে অরবিন্দবাবুর। আশা করা যায় এই রোম্যান্টিক চমকের ফলে বিবাহবার্ষিকীর খরচ কিছুটা কমানো যাবে।

ফ্রুটজ্যাম আর পার্মাফ্রেশ পাউরুটির চার স্লাইস খেয়ে টেস্টিং আর স্যাম্পল কালেকশন কিট গুছিয়ে নিলেন অরবিন্দবাবু। এক্সিট ডোরের দিকে এগোনোর আগে এনভারোনমেন্ট-চেক মনিটরের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ অবাক হতে হলও অরবিন্দবাবুকে। এ গ্রহের বাতাস-টাতাস যে অনেকটা পৃথিবীরই মত, বিজ্ঞানীদের হিসেব তেমনটাই আভাস দিয়েছিল বটে। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়, আজকাল গোল্ডিলক কন্ডিশনস সমেত প্রচুর গ্রহেই পৃথিবীর মানুষ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। বহু এলিয়েন প্রজাতির চোখ ধাঁধানো সভ্যতা সম্বন্ধে পৃথিবীর মানুষ এখন সবিশেষ ওয়াকিবহাল। এই উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে যে কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে আছে তা অরবিন্দবাবুর জানা নেই; তবে মনিটরের দিকে তাকিয়ে গ্রহের এ অঞ্চলের পলিউশন কাউন্ট দেখে চমকে যেতেই হলও; যেন অবিকল পৃথিবী।

তবে কি এই প্রথম মানবসভ্যতার কাছাকাছি কিছু নজরে পড়তে চলেছে? উফ্‌, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

পিলে চমকানো কিছু আবিষ্কার করতে পারলে কালীঘাটে জোড়া পাঁঠা বলি দেবেন ফিরে গিয়ে, এমন প্রার্থনা করেই স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুললেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। 

***

মিনিট দুয়েকের মধ্যে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। একের পর এক চমক। আর এক বিশ্রী আতঙ্ক যা বর্ণনা করার ভাষা অরবিন্দবাবুর জানা নেই।

স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুলতেই অদ্ভুত কতগুলো জিনিস ধাক্কা দিল ভদ্রলোককে।

প্রথমত, গন্ধ। আলুর চপ, এগরোল, ঘাম, পারফিউম, আর ডিজেল পোড়া ধোঁয়ার ককটেল। এ ককটেল তার সুপরিচিত।

দ্বিতীয়ত, শব্দ। এ'খানেও রকমারি ব্যাপারস্যাপার; হাজার-হাজার মানুষের হইহই আর সে হইহইয়ের সিংহভাগই যে মোটা-দরের কলকাতাইয়া বাংলা, তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। এমন কি মাইকে দু'বার ঘোষণাও শুনতে পেলেন; "বজবজ থেকে চোদ্দ বছরের বাপটু সান্যাল মেলায় এসেছেন ছোটদাদু হরিহর সান্যালের সঙ্গে। বাপটু হারিয়ে গেছে, ছোটদাদুর ধারণা বাপটু ছোটদাদুকে ফাঁকি দিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। বাপ্টু তুমি যে'খানেই থাকো আমাদের কমিট অফিসের সামনে চলে এসো। তোমার ছোটদাদু রেগে বোম হয়ে এ'খানে পায়চারি করছেন"। দূরে ফাটা মাইকে কুমার শানুর গান ভেসে আসছে - "অমর শিল্পী তুমি কিশোরকুমার, তোমাকে জানাই প্রণাম"।  আর সব ছাপিয়ে; স্পেস-ক্রাফটের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের করতালি আর উল্লাস। পিলে চমকে কানে তালা লেগে অরবিন্দবাবুর সে এক বিশ্রী অবস্থা।

তৃতীয়ত, একটা হাড়-হিম করে দেওয়া দৃশ্য। অরবিন্দবাবু নিশ্চিত যে তার স্পেস-ক্র্যাফট এসে নেমেছে কলকাতার মিলন-মেলা প্রাঙ্গণে। নির্ঘাত মরশুমি আনন্দমেলা বসেছে। 

এত বড় ভুল হলটা কী করে? পকেট থেকে ইন্টার-গ্যালাক্টিক নেভিগেশনট্র্যাকার বের করে দেখলেন - কী আশ্চর্য, হিসেবে কোনও ভুল নেই। তিনি রয়েছেন উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে। কিন্তু, এ'সব তবে কী?

ঠাহর করার আগেই অরবিন্দবাবু বুঝতে পারলেন যে মেলার ঠিক মাঝখানে এসে নেমেছেন তাঁর স্পেস-ক্র্যাফট। আর মেলা-কমিটির করিতকর্মা লোকজন একটা টিকিট কাউন্টার বসিয়েছে।  সর্বনাশ, লোকে লাইনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকবে বলে। চারজন ছোকরা ছেলে চোঙা হাতে ক্রমাগত চিল্লিয়ে যাচ্ছে; "আপনার ঠেলাঠেলি করবেন না। হাত টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন। শিগগিরি স্পেস-ক্র্যাফট ভ্রমণ শুরু হবে। লাইন ভাঙবেন না, লাইন ভাঙলেই টিকিট ক্যান্সেল। আর হ্যাঁ, দয়া করে মুড়ি বেগুনির ঠোঙা বা এগরোল হাতে স্পেস-ক্র্যাফটে প্রবেশ করবেন না। সেলফি নিতে গিয়ে অযথা ভিড় বাড়াবেন না"। 

গলা শুকিয়ে এলো অরবিন্দবাবুর। এ কী কাণ্ড! কিন্তু চট করে যে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকে দরজা বন্ধ করবেন সে উপায়ও নেই, পা'দুটো একতাল লোহার মত ভারি। এমন সময় স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন এক মধ্যবয়স্ক হেডমাস্টার-গোছের এক ভদ্রলোক, বুকপকেটে ব্যাজ আঁটা, তা'তে লেখা, "অলোক হালদার, সভাপতি, কলকাতা আন্তর্জাতিক মেলা কমিটি। 

***

- আ...আ...আমি...।
- আপনি অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। ওয়েলকাম টু মিলন-মেলা প্রাঙ্গণ ইন কলকাতা, প্ল্যানেট পৃথিবীজ গ্রেটেস্ট সিটি।

- ইয়ে, আপনার কিছু ভুল হচ্ছে...অলোকবাবু। আমি এসেছি পৃথিবী নামক গ্রহের কলকাতা নামক শহর থেকে।

- হে হে। আপনি তেমনটা ভাবতেই পারেন। কিন্তু আমাদের কাছে আপনি এসেছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ থেকে।

- না না, সে'টা আপনাদের গ্রহের পোজিশন। আমাদের গ্রহ পৃথিবীর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে।

- হে হে হে...আপনার কাছে যা সোজা, আমাদের কাছে তাই উলটো। অসুবিধে কীসের। তবে আপনার অনেক ধকল গেছে। আসুন, মেলা কমিটির অফিসে বসে বিশ্রাম নেবেন। আপনার জন্য ফাইভ স্টার অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সে'খানে। আর ইয়ে, আমাদের এমএলএ বিপিনবাবু আসছেন স্পেস-ক্র্যাফট বিলাসভ্রমণ উদ্বোধন করতে। তিনি খুব আগ্রহী আপনার সঙ্গে আলাপ করতে।

- আমার মাথাটা কেমন গুলোচ্ছে অলোকবাবু। আমি অ্যাস্ট্রনট। আমার অনেক কাজ। আর স্পেস-ক্র্যাফটে এত লোক ঢোকানোটা কি ঠিক হবে?

- ও মা! যে'দিন আপনি যাত্রা শুরু করলেন, সে'দিনই গোটা শহর জুড়ে পোস্টার পড়ে গেল। এ'সব ইন্টার-গ্যালাক্টিক মুভমেন্ট আমরা ট্র্যাক করে থাকি কিনা। আপনি এ পাড়ায় পায়ের ধুলো দেবেন খবর পাওয়ায় মেলা বসার পারমিশন হয়ে গেল। ইকনোমি বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল। আপনি সময়মত এসে পৌঁছনোয় আমরা খুব খুশি।

- আমার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে যে।

- ডোন্ট ওরি। মেলা তো ক'দিন মাত্র। ক'দিন না হয় রিয়েল কলকাতা উপভোগ করে যান।

- রিয়েল কলকাতা যে রিয়েল পৃথিবীতে রয়েছে অলোকবাবু।

- রিয়েল এ'টাই স্যার।

- এ তর্কের কোনও মানে হয়? এ'সব বাদ দিন। আমায় ফেরত যেতে হবে।

- আপনি ভয় পাচ্ছেন অরবিন্দবাবু। ভয় পাচ্ছেন সেই ভয়াবহ আবিষ্কারের। আপনার পৃথিবী আদত পৃথিবী নয়, আপনাদের কলকাতা আদত কলকাতা নয়; এ ধাক্কা যে মারাত্মক ধাক্কা। তবে মনখারাপ করবেন না। অলটারনেট কলকাতা তো এ দুনিয়ায় কম নেই। গত বারো বছেরো আপনি এ নিয়ে সাত নম্বর মক্কেল। এর আগের ছ'জন নাকে খত দিয়ে স্বীকার করে গেছেন যে আসল কলকাতা এ'খানেই। 


***

মেলা-কমিটির অফিসের সোফায় গা এলিয়ে পড়েছিলেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। তাঁর চোখমুখ পরিতৃপ্ত, ঠোঁটে এক রোমান্টিক হাসি। আনন্দমেলা দু'দিন আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু মেলা কমিটির আতিথ্যে কোনও ঘাটতি পড়েনি। অলোক হালদার নিজে এ'বেলা ও'বেলা তাঁর খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছেন। ফিরতে হবেই, কিন্তু অরবিন্দবাবুর বিশেষ তাড়া নেই। এ'খানকার ক্যালেন্ডারে এখন মার্চের সতেরো তারিখ। আর অরবিন্দবাবুর সামনের টেবিলে থরে থরে সাজানো খাঁটি হাইকোয়ালিটি এবং টাটকা নলেন গুড়ের সন্দেশ। যে পৃথিবীর কলকাতায় নির্ভেজাল নলেনের বাস বছরে সাড়ে চার মাস, তার পৃথিবীত্ব ও কলকাতাত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা মুর্খামি; এ সত্য অস্বীকার করার ক্ষমতা অরবিন্দবাবুর নেই। হপ্তা-খানেক পর অরবিন্দবাবু ফিরে যাবেন গ্রহ ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, যে'খানে সুতপা তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। স্পেস-ক্র্যাফটের কন্ট্রোলড পরিবেশে আদত কলকাতার কিলো দশেক টপ-ক্লাস নলেন সন্দেশ নিয়ে ফিরতে কোনও অসুবিধেই হবে না। বিবাহবার্ষিকীতে গিন্নীর জন্য এর চেয়ে ভালো উপহার আর কীই বা হতে পারে। 


(ছবিটা রেয়া আহমেদের আঁকা। বংপেন ৭৫-য়ের জন্য এ'টা আর আরো জমজমাট কিছু স্কেচ এঁকেছিল সে) 

Sunday, December 10, 2023

ডিমসিদ্ধ



আমার ডিমসেদ্ধ ভালোই লাগে৷

তবে ডিমসেদ্ধ আমি বাইরে গিয়ে খেলে একটু বেশি ভালো খাই৷ আমার সবচেয়ে প্রিয় তিনটে ডিমসেদ্ধ-ব্যাকগ্রাউন্ড বলি। 

১। ট্রেনে বা রেলস্টেশনে; কাগজের ওপর ফালি করে বিটনুন ছড়িয়ে দেওয়া৷
হ্যাট টিপ: বারাউনি স্টেশনের ডিমসেদ্ধদাদারা ডিম দিতেন নুনের পাশাপাশি অল্প পেঁয়াজ-লঙ্কা কুচি ছড়িয়ে। ও জিনিস এককালে ফুচকার মত টপাটপ খাওয়ার ধক আর ক্ষমতা ছিল। 'সেই আমি'র কথা ভাবলে এখন মনে মনে স্যালুট ঠুকতে ইচ্ছে করে।

২। গঙ্গার ঘাটে; লেবুচায়ের আগে শালপাতার বাটিতে সার্ভ করা জোড়া ডিমসেদ্ধ৷ সন্ধে আর নদীর হাওয়া মিলে যার স্বাদ দশগুণ বেড়ে যায়৷
হ্যাট টিপ: বাবুঘাটের সামনে একটা দোকানে পোলট্রির মুর্গির ডিমের পাশাপাশি দেশি হাঁসের ডিমও থাকত, টকটকে লাল কুসুম৷ নমস্য।

৩। গরম ঘুগনিতে ফেলে। ছোট কাঠের চামচে (যে ধরণের চামচ দিয়ে এককালে আমরা আইসক্রিম খেতাম) সেদ্ধ ডিমের কুসুম ঘুগনিতে ভালো করে মিশিয়ে তারপর মুখে তোলা৷ ডিমের স্পর্শে ঘুগনি চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠে না ঘুগনিতে ডিমের স্বর্গলাভ; কে জানে। 
হ্যাটটিপ: বালিগঞ্জ স্টেশন সংলগ্ন যে সবজি বাজার, সে'খানে এক দাদাভাই ঘুগনি-ডিমসেদ্ধ বিক্রি করতেন। বিটনুন-পেঁয়াজ-লঙ্কার পাশাপাশি তিনি সে কম্বিনেশনে জুড়ে দিতেন সামান্য তেঁতুলজল৷ দু'চামচ মুখে দিলে জ্বরে কাবু জিভও তড়াং করে লাফিয়ে উঠত৷ ভাবলেই মনটা উদাস হয়ে পড়ে।

সমস্যা হল, বাড়িতে সেই ডিমসেদ্ধর কদরই সামান্য কমে যায়। মনে হয় ও জিনিস সোজাসাপটা না খেয়ে ঝোলে ফেলে খাই৷ বা সেদ্ধ না করে ডিম ফাটিয়ে সোজা নির্ভেজাল অমলেট করে নিই। তা গত পরশু রাত্রে যখন ঠিক হল রাত্রে শুধুই ডিমসেদ্ধ-ভাত, তখন সামান্য ছটফটিয়ে উঠতে হল। ভ্যানিলা ডিমসেদ্ধকে রোম্যান্টিক-স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার ট্রেন, গঙ্গা বা ঘুগনি৷ সে'সব জিনিস তো চাইলেই পাওয়া যায়না৷

সেই সিচুয়েশনে আমাদের ভরসা হলো ডিমমাখা বা ডিমভর্তা। আমরা দু'টো ফর্ম্যাটে খেলি৷ প্রথমটা সোজাসাপটা; অনেকটা সর্ষের তেল আর কাঁচালঙ্কা কুচি দিয়ে কষে মেখে নেওয়া। দ্বিতীয়টা সামান্য দরদী, যে'টা গত শুক্রুবার করেছিলাম। আগে পেঁয়াজ, রসুনকুচি, আর শুকনো লঙ্কা ভেজে; তারপর সেই ভাজাগুলোকে সেদ্ধ ডিমে ফেলে, তা'তে কড়াইয়ের গরম তেল ফেলে, স্বাদমত নুন দিয়ে মেখে নেওয়া। এই প্রসেসের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক পর্বটা হচ্ছে ভর্তাটা মাখার পর নিজের আঙুল চেটে সাফ করা।

ঘ্যাম শব্দটা মেপে ব্যবহার করে উচিৎ, কারণ অতিরিক্ত ব্যবহারে ঘ্যামের ওজন কমে আয়৷ কিন্তু এই ডিমভর্তার ক্ষেত্রে ঘ্যাম শব্দটা নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।

Wednesday, December 6, 2023

বাহাত্তর নম্বর গড়িয়াহাট যুদ্ধ


- অ্যাই শোনো অভিরূপ, তোমার এই ক্যালাস অ্যাটিচিউড আমার আর সহ্য হচ্ছে না!

- কে মাথার দিব্যি দিয়ে বলেছে যে সহ্য করতে হবে?

- ভুল স্বীকার করার নাম নেই, শুধু গাজোয়ারি রাগ..।

- আমি? একা আমি রাগ করি মিতুল? তোমার রাগ নেই?

- আছে, আমার রাগ আছে৷ কিন্তু তোমার মত আনরিসনেবল আনকুথ বদমেজাজ নেই৷

-  আমি? আমি আনরিসেনবল? তোমার পিসেমশাই পর্যন্ত আমায় সে'দিন সুইট বয় বলে পিঠ চাপড়ে দিলে আর আজ তুমি কিনা..প্লীজ উইথড্র! এখুনি! নয়ত..।

- নয়ত কী? মাঝরাস্তায় নাচনকোঁদন করবে? শোনো, কাল থেকে বরং তুমি পিসেমশাইয়ের হাত ধরেই কলেজ স্কোয়্যারে বসে থেকো! এই প্রেম আমার আর পোষাচ্ছে না।

- না পোষালে সরে পড়ো দেখি! আমি কেয়ার করি না। প্রেমের চেয়ে সেল্ফ-এস্টিম অনেক ওপরে..।

- যাক বাবা৷ বাঁচা গেল।

- হ্যাঁ, এখন আমি ঝাড়া-হাত পা৷ প্রেমিকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বড্ড প্রেশার। আমি এখন মুক্ত বিহঙ্গ! নদী আপন বেগে পাগল পারা..ইত্যাদি।

(আড়াই মিনিট পর)

-  মিতুল, আমাদের প্রেমটা আবার ভেঙে গ্যালো যে।

- লাভ কী? এতবার প্রেম ভাঙছে কিন্তু তা'তে বিয়েটা তো ভাঙছে না৷ 


- সেই তো। বিয়েটা যখন টিকে আছে, আমাদের প্রেমটাকে রিভাইভ করার চেষ্টা তো করতেই হবে। জনস্বার্থে আর কী, অন্তত তোমার পিসেমশাইয়ের জন্য। চলো বাবু, দু'জনে মিলে এ'বার সেন্টার ফর প্রেম রিভাইভালে ঢুলে পড়ি৷ 

- অগত্যা৷ আর তো কোনও উপায় নেই৷ নেহাত বাধ্য হয়েই..ওই তো..ওই যে..।

- ওই যে। সেন্টার ফর প্রেম রিভাইভাল৷

মিতুলের হাত ধরে দাস কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলেন অভিরূপ।

Saturday, December 31, 2022

বাহ্‌



কলকাতায় আমরা মাঝেমধ্যে গভীর রাতের দিকে ঘুরতে বেরোতাম। অকারণে বেরোনো বলে সে ঘুরতে যাওয়ায় প্ল্যানিংয়ের ধকল থাকত না৷ ধাবার চা, বা কোনও আধ-চেনা দোকানের ম্যাগি; এ'সব দু'একটা স্টপেজ ছাড়া গোটাটাই শুধু ঢিমেতালে ড্রাইভ৷

ডিসেম্বরের কোনও একটা সময়, মাঝরাতের পর হুট করে পার্ক স্ট্রিটের দিকে ঢুকে পড়ে টের পেতাম; এইত্তো, ক্রিসমাসের আলো লেগে গেছে৷

কয়েকটা অস্ফুট "বাহ্" বেরিয়ে আসত৷ প্রতিবার। আরে, অজস্র টুনির ঝলমলে যদি "বাহ্"টুকু নাই বলতে পারি, তা'হলে আর এ জীবনে রইলটা কী।
সেই মিঠে "বাহ্" টুকু সামান্য মিস করছি বটে।

Sunday, November 6, 2022

কলেজস্ট্রিট ও চলে যাওয়া



"দাদা, একটা ডিমরুটি৷ ডবল ডিম৷ একটু বাড়তি পেঁয়াজকুচি দেবেন প্লীজ?রুটির মাথাটা একটু বেশি বাদ দেবেন৷ হ্যাঁ, অতটাই৷ আর খুব কড়া ভাজবেন না, কেমন"?

দু'পাশ দিয়ে তরতরিয়ে বয়ে চলছে শশব্যস্ত কলেজ স্ট্রীট৷ হাতে সদ্য কেনা সাতপুরনো বই খানতিনেক, সেই হলদ ঝুরঝুরে কাগজের গন্ধ আর দরদামের ক্লান্তি মিলেমিশে বিকেলটা বড় মায়ার৷ স্টিলের ছোট গেলাসে চামচ দিয়ে ডিম ফেটানোর শব্দ হুট করে বুকে এসে ঠেকে৷
যাহ্, এইবার চলে যাওয়া৷

অবশ্য খানিকটা গড়িমসি করাই যায়৷ ইউনিভার্সিটির দিক থেকে হাঁটা শুরু করে কফিহাউসের সামনে পৌঁছোলে একটা পছন্দসই লেবু সরবতওলা পাওয়া যাবে৷ সে সরবতের গেলাস হাতে আরও মিনিট দশেক আদায় করে নেওয়াই যায়।

পুরনো পাড়ার গন্ধ, চেনা হইহট্টগোল, আর সে'সব ছাপিয়ে মনের মধ্যে "আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই" মার্কা বিহ্বলতা; মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে৷ লেবুর সরবতের গেলাসটা অত শক্ত করে না ধরলেও চলত বটে; কিন্তু ওই৷ ও'ভাবেই যদি অন্তত শেষের দশটি মিনিটকে টেনেহিঁচড়ে নিলডাউন করিয়ে রাখা যায়৷

চাউমিনের দিল্লী কলকাতা



দিল্লী আসার পর থেকে রকমারি চাউমিন 'ট্রাই' করে চলেছি৷

কলকাতার মত চাউমিন৷
আদৌ কলকাতার মত নয়; তেমন চাউমিন।
কলকাতার মত বানাতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেছে; সে'রকম চাউমিন।
কলকাতার মত কোনও মতেই নয় তবু কোথাও যেন একটা চেনা স্বাদ মিশে আছে; ও'রকম চাউমিন।
হাফ-কলকাতা হাফ-দিল্লী গুবলেট চাউমিন।
কলকাতা হতে হতেও হল না চাউমিন৷
দিল্লীর বুকে আলতো-বেহালা চাউমিন৷

এমন অন্তত সতেরো রকমের ভ্যারাইটি৷ ভেবেটেবে দেখলাম, কোনওটাই জিভে তেমন আপত্তিকর ঠেকেনি৷ বরাতজোরে যে'দিন কলকাতা ফিরে যাব, সে'দিন হয়ত আবার দিল্লীর ফিল্টারে বসিয়ে কলকাতার চাউমিনদের নতুন করে চেখে দেখা শুরু করব।

Thursday, September 15, 2022

ডিয়ার বেহালা মেট্রো



আজ বেহালা মেট্রোর ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে৷ এ'খবরটা কী ভাবে আত্মস্থ করব সে'টা বুঝে উঠতে পারছিনা৷ গত বেশ কিছু বছর ধরে মনের মধ্যে মেট্রো-পিলারগুলো সম্বন্ধে একটা শ্যামনগরের মেজোপিসেমশাই গোছের রেস্পেক্ট তৈরি হয়েছিল। গোটা সন্ধ্যে ড্রয়িংরুমের সোফা আলো করে বসে থাকা আর মাঝেমধ্যে ঝিমোনা ছাড়া ছাড়া সে পিসের তেমন কোনও কাজ নেই। তাঁর নিশ্চুপ উপস্থিতিটাই সে ড্রয়িং রুমের লক্ষ্মীশ্রী৷   

যা হোক, বেহালা মেট্রোপিলারের উপকারিতা সম্বন্ধে স্কুলের ছেলেমেয়েরা সবে এস্যে লিখতে শুরু করেছিল৷ বেহালায় যা ভীড়, সুট করে চাইলেই তো আর পিরামিড বানানো সম্ভব নয়৷ কাজেই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যে আজ থেকে হাজার বছর পর যখন অদরকারি পিলারই বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ড করবে, তখন সবাই "বেহালা স্টাইল অফ আর্কিটেকচার" নিয়ে দুর্বোধ্য সব বইটই লিখে ফেলবে৷ তারপর ধরুন মেট্রো ট্রেন চালানোর মত অদরকারী ব্যাপার নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামিয়ে দিব্যি সে মেট্রোলাইনের তলে তলে বাগান তৈরি হচ্ছিল, হাইলি কালচারাল মুর্তিটুর্তি বসছিল৷ ট্র‍্যাফিক জ্যামে গলদঘর্ম হতে হতে সে'সব ডিজাইনার পিলারদের দিকে তাকিয়ে থাকার যে মেডিটেটিভ এফেক্ট; সে'টা সত্যিই তুরীয়। তারপর ধরুন ওই দুর্গাপুজো কালীপুজো এলে সেই পিলারের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া টুনিবাল্বের চাদর; স্পেক্টাকুলার। এ'সবের মধ্যিখানে মেট্রোফেট্রো চালানোর যে কোনও দরকার থাকতে পারে, সে'টা আর মনেই ছিলনা৷ 

সবচেয়ে যে'টা বড় ব্যাপার, বাঙালির রিয়েলএস্টেট সেন্টিমেন্টের জন্য এ'টা একটা বড় ধাক্কা৷ কতগুলো প্রজন্ম "আজ ইনভেস্ট কর, কাল মেট্রো হবে, ইনভেস্টমেন্ট সতেরোশো গুণ হবে" বলে ঝালমুড়ি বা হজমোলা লজেন্সের মত ফ্ল্যাটবাড়ি বেচে গেল৷ কত হাজার মানুষকে সামান্য সুড়সুড়ি দিলেই মন্ত্রের মত শুনতে পাওয়া যাবে "পিপিএফে রাখা মানে তো পুওর রিটার্ন৷ তাই সব তুলে লাগিয়ে দিয়েছি বেহালা মেট্রো ঘেঁষা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্টে৷ এরপর ইএমআই৷ আজ থেকে বাহাত্তর বছর যখন মেট্রো চলবে, তখন ম্যানহ্যাটন লেভেলের দাম পাব"।

এই মেট্রো-হবে-হবে-হবে-হবে মার্কা ইমোশনাল ইকুলিব্রিয়াম; এর তুলনা হয়না৷ ওই, পুজো আসছে আসছেই ভালো৷ পুজো এসে পড়লেই সোজা জ্ঞান ফেরে ওই দশমীর সন্ধ্যের "যাহ শাল"য়৷ এই বেহালা মেট্রোর ট্রায়াল রানের মধ্যেও কেমন যেন সেই দশমীর সন্ধ্যের ফ্লেভার। 

ভালো ঠেকছে না, বুঝলেন৷ আজ বাদে কাল মেট্রো চালু হবে, পরশু রাস্তা চওড়া হবে, তরশু কেউ বলবে পার্কে চুমু খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না৷ কিছুই বলা যাচ্ছেনা৷ যাকগে৷ একদিন জোকা টু পার্ক স্ট্রীটও জুড়ে যাবে, এই আশ্বাসটা চাগিয়ে এ'বার আর এক রাউন্ড ফ্ল্যাট বেচাকেনায় মন দেওয়া যাক৷ 

মনে রাখবেন, হবে-হবে ব্যাপারটাই ভালো৷ হয়ে গেলেই সব শেষ।

Saturday, April 9, 2022

ভোগ ও ভোগান্তি



- দেখেছিস?

- দেখছি।

- ঢালবে৷

- নির্ঘাত।

- ভোগান্তি।

- হবেই।

- জ্যাম।

- কাদা।

- প্যাচপ্যাচ।

- ম্যাজম্যাজ।

- তবে..।

- তবে?

- ভাল্লাগবে।

- জলকাদা?

- হাঁটব।

- বৃষ্টিতে?

- আলবাত।

- জ্বরকাশি?

- নেকু।

- হাত?

- ধরিস।

- ইয়ে।

- বাধা?

- না।

- তবে..।

- ঠোঙা।

- ঠোঙা?

- হাতে।

- কীসের?

- চপের।

Saturday, March 12, 2022

অপড়ুয়ার বইমেলা



আরে! কাল বইমেলা শেষ৷ ফেসবুক ট্যুইটারের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, অজস্র 'বইমেলার সেল্ফি'র বদান্যতায় এদ্দূরে বসেও সে মেলার গমগম দিব্যি উপভোগ করলাম৷ 

চেনামানুষের হাতে অচেনা বই৷
অচেনা মানুষের হাতে চেনা বই৷
খাবারের স্টলে হুমড়ি খেয়ে পড়া বইপ্রেমি৷
আড়ালে থাকা ছোট স্টলের কাউন্টারে বসা দোকানির দমে না যাওয়া হাসি৷
বড় প্রকাশনার সামনে উৎসাহী লাইন।
নতুন প্রকাশকদের ঘিরে আশাবাদী মানুষের উচ্ছ্বাস।
আর সমস্ত কিছুর ওপর রয়েছে বড়দের হাত ধরে ঘুরঘুর করা ছোট্ট ছেলেমেয়েরা৷
আসলে, বইয়ের জমায়েত মানেই লাইব্রেরির নিঝুম নয়, চশমা ডাঁটি চেবানো গম্ভীর আলোচনা নয়; বই উৎসবও বটে। 


মেলা আলো করা এত মানুষের মধ্যে সবাই কি বইয়ের পোকা? নিশ্চয়ই নয়৷ কিন্তু কী এসে যায় তা'তে৷ স্রেফ বই পড়ে কে কবে নিখুঁত মানুষ হয়েছে, বই পড়ার নেশা না থাকাতেই বা কার ভালোমানুষি নষ্ট হয়েছে৷ আর বইয়ের পড়ার সময় বা সুযোগ; সবার সমান নয় মোটেও৷ কাজেই, বইহুল্লোড় পাঠক-পাঠিকাদের মনোপলি নয় মোটেও৷ 

এই ধরুন, বই-নিরেট কোনও মানুষ বইমেলার কোনও স্টলে ঢুকে টুক করে একটা বই হাতে নিয়ে দু'প্যারাগ্রাফ পড়লেন৷ সে পড়া জলে গেল ভেবেছেন? আদৌ না৷

অপাঠক-প্রেমিক তার একনিষ্ঠ-পাঠিকা-প্রেমিকার কেনা অজস্র বইয়ের অর্ধেকভার কাঁধে নিয়ে বইমেলার  সাতপাক ঘুরলে আর ধুলো খেয়ে হদ্দ হলে। তা কি সাহিত্যের বাইরে? নেভার!

খবরের কাগজের বাইরে একটা শব্দও না পড়া কোনও বাবা পাশের অচেনা মানুষটার কাছে সাজেশন চাইছেন নিজের স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়ের জন্য কোন গল্পের বইগুলো কিনলে তারা সাগ্রহে পড়বে৷ সেই গায়ে পড়া বইপ্রশ্নের গুরুত্ব কোনও গুরুগম্ভীর লিটফেস্ট প্যানেল ডিসকাশনের তুলনায় খেলো? হতেই পারেনা।

কিছুতেই দু'পাতার বেশি পড়ার ধৈর্য কুলিয়ে উঠতে না পারা কেউ 'এ'বারে ঠিক পড়বই' মার্কা দুঃসাহস নিয়ে মাইনের অনেকটা ঘ্যাচাং করে উড়িয়ে দিলেন  বইমেলার হুজুগে গা ভাসিয়ে৷ হয়ত সেই বইগুলোও পড়া হবে না৷ তা বলে সে দুঃসাহসটুকু কি এক্কেবারেই ফেলনা? অবশ্যই না৷ 

গপগপিয়ে বইগেলা মানুষরাই বই নিয়ে শেষ কথা বলবেন না৷ বইমেলার আনন্দোৎসব সে ভরসাটুকু জোগায় বটে।

**

ইয়ে। বিজ্ঞাপনটা ঠেকিয়ে রাখা গেল না৷ এ'বার বইমেলায় আমার যাওয়াটাওয়া হল না৷ তবে ওই মেলারই এক কোণে, পত্রভারতীর স্টলে আমার লেখা খানদুই বই রয়েছে৷ 'বংপেন-৭৫' আর 'বংপেন-আরও ৭৫'। নেড়েচেড়ে দেখতে পারেন, বেশ মজবুত; ডেঁপো ভাইবোন বা হাড়জ্বালানো ইয়ারদোস্তকে শায়েস্তা করতে হলে ও বইয়ের একটা গুঁতোই যথেষ্ট৷

Monday, January 31, 2022

পল্টু-সুমির বইমেলা



- হ্যাঁ রে পল্টু, এ'টা আনন্দেরই লাইন তো?

- ভেরিফাই করে নিয়েছি সুমি৷ এই দাদা কনফার্ম করেছেন৷

- লাইনের যা বহর, সন্ধ্যে নামার আগে স্টলের গেট দেখতে পাব বলে মনে হচ্ছে না৷ যা ভীড়৷ উফ্! এত মানুষ বই পড়ে?

- দেখ, আমি অত পড়িনা৷ তবে ঘাটাঘাটি করি৷ হেবি লাগে৷

- অবশ্য আনন্দর বইটইগুলোর যা দাম৷ ইএমআই ফেসিলিটি না থাকলে উল্টেপাল্টে দেখেশুনে বেরিয়ে আসা ছাড়া উপায় থাকেনা৷

- তোদের মত পাবলিকের জন্যই যত সমস্যা৷ বাপের বাড়ির দলিল বন্ধক রেখে সিনেমাহলের পপকর্ন কিনবি কিন্তু বইয়ের দাম দেখলেই গলা শুকোনো৷

- বাজে না বকে লাইনে ফোকাস কর পল্টু৷ সুট করে কেউ ঢুকে না পড়ে৷

**

লাইন মন্থর গতিতে এগোতে থাকে৷ সুমি আর পল্টুর খোশগল্প জমে ওঠে৷ পড়ন্ত বিকেলের আকাশ লালচে, মেলার মাঠ সরগরম। গল্পের আগুনের ঘি হয়ে ওঠে সুমির হাতে ধরা বাদামের ঠোঙা আর পল্টুর হাতের নুনের প্যাকেট৷

**

- সুমি! বেগুনি খাবি?

- লাইনের কী হবে?

- আগেও লম্বা লাইন৷ তুই দাঁড়া! আমি চট করে নিয়ে আসি!

- ক্যুইক কমরেড! ক্যুইক!

- লাইন সামলে।

- জান কবুল। তুই আয় বেগুনি নিয়ে৷

**

বেগুনির গুনেই বোধ হয়, লাইন সামান্য গতি পেয়েছে।

বেগুনি সাবাড় করে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ হাতড়ে এক ডিবে মিঠেমৌরি বের করে আনলো সুমি। পল্টু নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে আনলো নন্টেফন্টে। আনন্দর লাইনে একটানা দাঁড়িয়ে হদ্দ হওয়ার পর মোক্ষম অ্যান্টিডোট; দেবসাহিত্য কুটীরের স্টল থেকে সংগ্রহ করা কমিক্স সুর করে পড়া৷

পল্টুর পড়া শুনে গজল ভালোবাসার মেজাজে "ওয়াহ ওয়াহ" বা "নাজুক" বলে সেলাম ছুঁড়ে দেবে সুমি৷

**

- পল্টু..! এই পল্টু! থাম৷ পড়া থামা৷ ওই দ্যাখ..।

- কী দেখব?

- স্টলের গেট দেখা গেছে৷ দিল্লী দূর নহি!

- আরে! ওইত্তো আনন্দ! মার দিয়া কেল্লা।

- পল্টু৷ শোন..।

- কী..।

- চ', লাইন ছেড়ে দিই।

- খেপেছিস সুমি?

- আরে বই কেনাটাই কি শেষ কথা? শোন না রে পল্টু, চ' এ'বার দে'জ পাবলিকেশনের লাইনে গিয়ে হত্যে দিই। এ লাইন থেকে ও লাইন..।

- সুমি তুই একটা আস্ত...।

- এই লাইন ছাড়তে রাজি হলে, সামনের শনিবার; টিউশনির পর হাত ধরে রেল ব্রিজ পেরোনো অ্যালাউ করব৷

- শুধু আঙুলের ডগা নয়৷ পুরো হাত৷

- পুরো হাত৷

- চলুন সুমিদেবী৷ এ'বার তা'হলে দে'জ।

**

- পল্টু৷ এ'বার আমায় ফোন রাখতে হবে৷

- এখুনি?

- হ্যাঁ৷ একটা জরুরী কাজ।

- ধুস৷ লংডিস্ট্যান্স প্রেম আর সইছে না রে সুমি৷ কী ছাই দু'জনে দুই মুলুকে চাকরী নিলাম৷ মুখোমুখি প্রেম আর কলকাতা; দুইই জলে৷

- আমাদের বইমেলার টেলিফোনিক রোলপ্লেগুলো খুব ইন্টেন্স হচ্ছে কিন্তু।

- তা ঠিক৷ এক্কেবারে রগরগে৷ কোথায় লাগে সেক্সটিং৷

- তুই একটা যাতা৷ এ'বার আসি?

- ধুস৷ যা ভাগ!

**

কল্পনার বইমেলা, তার গা-কাঁপানো কাল্পনিক ভিড়। আনন্দের স্টলের সামনের মাইলখানেক লম্বা কাল্পনিক লাইনে বহুক্ষণ দাঁড়ানোর পর,
দুম করে সে লাইনের মায়া উড়িয়ে স্টলের পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া;

এ'টাই সুমি আর পল্টুর আনন্দ৷
তাদের গোপন রোলপ্লে৷