Wednesday, September 9, 2026

সুমনবাবুর বিশ্বাস



সুমনবাবু একটা সিগারেট ধরালেন। ভাঙাচোরা বাড়িটার দিকে মুখ করে তৃপ্তির দু'চারটে সুখটানে দিব্যি উস্কে দেওয়া গেল স্মৃতিগুলো। ওই দোতলার বারান্দায় বসে মা শীতের দুপুরে উল বুনতেন। নীচের উঠোনে ওই পাঁচিলের গায়ে বাবার নীল-কালো হারকিউলিস সাইকেলটা থাকতো। রোব্বার বেলার দিকে খুব মন দিয়ে ঘণ্টাখাণেক ধরে সাইকেলটা পরিষ্কার করতেব বাবা। একটা স্যান্ডোগেঞ্জি আর সাদা পাজামা ছিল বাবার রবিবার সকালের ইউনিফর্ম। উঠোনের অন্যদিকে মায়ের গাঁদাফুল, গোলাপ আর ডালিয়ার বাগান। মা গাছপালা ভালোবাসতেন কিনা।

ফুলিয়া রান্না আর জলতোলার কাজের জন্য ছিলো। যদিও ফুলিয়ার রান্নায় মন ছিল না, সে ভালোবাসতো গল্প করতে। মা ভালোবাসতো ফুলিয়ার গল্প শুনতে। ফুলিয়ার বড় ভাগ্য যে মা বাবা দুজনেই রান্নায় পারদর্শী ছিলেন এবং দু'জনেই নিয়মিত রান্না করতেন। বাবা ফুলিয়াকে মেয়ের মত দেখতেন, আমি দেখতাম দিদির মত। আর মা দেখত বন্ধুর মত।

বাবা ভালোবাসতেন যন্ত্রপাতি। কলকব্জা, সার্কিট এ'সবের প্রতি যে কী আগ্রহ ছিল বাবার। ছুটি মানেই বাবা গেঞ্জিতে গ্রিজের দাগ, তেলা হাতে স্ক্রুড্রাইভার বা অন্য কোনো সরঞ্জাম। বাবার ওই ঢাউস স্ক্রুড্রাইভার সে'বার চুরি গেছিল। আর সে'টা গলায় বসে যাওয়ায় খুন হয়েছিল ফুলিয়ার বর। পুলিশ তুলে নিয়ে গেছিল ফুলিয়াকে। বাবা কোম্পানি থেকে লোন নিয়ে ফুলিয়ার হয়ে উকিল বহাল করেছিল ভোপাল শহরের মস্ত বড় অ্যাডভোকেট, আকাশছোঁয়া তার ফিজ। কিন্তু মামলা জমে ওঠার আগেই ফুলিয়া কী'ভাবে যেন জেল থেকে পালিয়ে যায়। আর তার খোঁজ মেলেনি। বাবার ধারণা ফুলিয়া নতুন একটা জগতে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল, অন্য পরিচয়ে নতুন মানুষদের সান্নিধ্যে নতুন উদ্যমে সে বেঁচে উঠেছিল। মা বলতেন ফুলিয়া আর নেই, দেবপাহাড়ির ঝর্ণার ও'দিকে কোথাও ঝাঁপটাঁপ দিয়ে সে মরে বেঁচেছে।

বাবা অপ্টিমিস্ট, মা পেসিমিস্ট। দু'জনে মিলে এ কোয়ার্টারের পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছিলেন ফুলিয়া নিখোঁজ হওয়ার দিন সাতেকের মধ্যেই। বাবা নতুন একটা চাকরি জুটিয়েছিলেন। মায়ের গালগল্প কমে গেছিল। কলকাতার ফ্ল্যাটে রোদহাওয়া কিঞ্চিৎ কম। বাবা বলতেন আমাদের খানিকটা রোদ আর খানিকটা হাওয়া ফুলিয়াটা চুরি করে কেটে পড়েছে। বাবার কলকাতার রবিবারগুলো হয়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ স্ক্রুড্রাইভার ও যন্ত্রপাতিহীন।

বছর চল্লিশ কেটেছে। ছত্তিসগড়ের ফেলে আসা সেই পুরনো অফিস কোয়ার্টার এখন জরাজীর্ণ, মানুষের বসবাসের অযোগ্য। অবশ্য সুমনবাবুর ধারণা বাবা মা আর ফুলিয়া তিনজনেই এখন এ'খানে ফিরে এসেছে আর দিব্যি আছে। একদিন সুমনবাবুও এ'খানে এসে জুড়বেন, ফের রোব্বারগুলো রঙিন হবে; এ বিশ্বাসটা আবার সুমনবাবুর মনের মধ্যে চাগাড় দিয়ে উঠলো।

No comments: