Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts
Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts

Sunday, March 8, 2026

ভীতুর উল্লাস

আমি খুব ভীতু মানুষ। এবং আর পাঁচটা ভীতু মানুষের মত চাকরীর আশ্রয়টা আমার খুব দরকারি। সে অর্থে অ্যাম্বিশন নেই কিন্তু ভয় বিস্তর; হাতের পাঁচ যে'টুকু আছে সে'টুকুও যেন কোনোদিন কোনোভাবে ফসকে না যায়। বলাই বাহুল্য প্রিভিলেজড দুনিয়ায় আমার বসবাস। অতএব সত্যিই যারা অসহায় ও সম্বলহীন, তাঁদের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। আমার সেভিংস আছে, ইনস্যুরেন্স আছে, আগামী মাসে মাইনে না ঢুকলেও চাল-সবজি কেনার উপায় রয়েছে। তবুও আমার একটা বড় ভয়ের জায়গা হচ্ছে 'হঠাৎ কোনও একটা ভুলে, বা সামান্য অসতর্কতায় চাকরী খোয়ানো'। বয়স যত বাড়ছে সে দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে; এই যে খেটেখুটে কাজের জায়গায় যে সামান্য সুনাম অর্জন করেছি, তা যে কতটা ভঙ্গুর তা প্রতি মূহুর্তে টের পাই।

কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি ক্ষমার অযোগ্য। বারবার ভুল করে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাই। সে সব ইনএফিশিয়েন্সি মকুব করার দাবী আমার নেই। কিন্তু মূহুর্তের অসতর্কতায় জীবন এস্পারওস্পার হয়ে যাওয়া, ভয় সে'খানে। আর একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, যারা কাজ করে তাঁদের প্রত্যেকের ভুল হয়। ব্যাঙ্কের কর্মী, ক্রিকেটার, লেখক, ইনফ্লুয়েন্সার, এমএলএ, শিকারি, জাদুকর; সবার হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে "টু বি ইন দ্য রং প্লেস অ্যাট দ্য রং টাইম"। অনেক সময় হয় কী আপাত দৃষ্টিতে যে ভুল নিতান্তই ছোটখাটো, সে'টা এমন সময়ে ঘটে যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তেমনও ঘটে বটে অনেকসময়।

একটা ব্যাপার বড় অদ্ভুত। নিজের কাজে সবাই দৈনন্দিন কত ভুলচুক করছি, অথচ অন্যের একটা সে'রকমই ভুল ধরতে পারলে যে মব-উল্লাস দেখা যায়, বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায়, তা দেখে গলা শুকিয়ে যায়। এ ওই গণধোলাই দেওয়ার প্রবণতা, এই যা "দে শালাকে দু'ঘা" বলে নাচতে পারা; ব্যাপারটা যত দেখি তত বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বিশেষত খেটে-খাওয়া কর্মীদের ভুলের প্রতি আখের-গুছিয়ে-রাখা মানুষদের যে সমবেত আক্রোশ, তা দেখে অসহায় বোধ হয়। ভয় হয়। এত রাগ আমাদের মধ্যে, এত প্রবল তলপেটে লাথি কষানোর ইচ্ছে; একটা দুর্বল এলেবেলে টার্গেট পেলেই হলো। হয়তো নিজেদের যন্ত্রণাকে সামাল দিতে না পারার ফলে অন্যের কলার টেনে ধরার ইচ্ছেটা সবার মধ্যেই প্রবল (নিজেকেও বাদ দিচ্ছি না সে খুনে হায়েনার দল থেকে)। একজন অসহায় মানুষকে রগড়ে নিজেদের বিপ্লবী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে আমাদের সার্থকতা। তা'তে কার চাকরী গেলো, কার জীবন জলে গেলো; সে'সব নিয়ে ভাবতে বসলে আমাদের রাগ নেতিয়ে যাবে, কাব্য শুকিয়ে যাবে। তাই এ'ভাবেই এগিয়ে চলা ছাড়া কোনও গতি দেখি না। যদ্দিন সোশ্যাল-মবের ইনফ্লুয়েন্সিং লাথিটা নিজের পেটের দিকে ধেয়ে না আসছে, তদ্দিন 'অল ইজ ওয়েল' বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই আমাদের কাজ।

Friday, January 16, 2026

স্বপ্নরীল

স্বপ্নে দেখলাম আমাদের স্বপ্ন ডাইরেক্টলি টেনে নিয়ে রীল হিসেবে প্রকাশ করছে ফেসবুক। আর হয়েছে কী; আমার একটা মামলেট বানানোর স্বপ্ন রীল ট্রাম্পের সমস্ত রীলের চেয়ে বেশি লাইক পেয়েছে। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে, ট্রাম্প সোফাসমেত আমায় ওয়াশিংটনে তুলে নিয়ে গেছে।

"কী ব্যাপার ভাইটি, এমন রাষ্ট্রবিরোধী স্বপ্ন দেখার তুমি সাহস পেলে কী করে"? স্পষ্ট বাংলা। যা শুনে স্বপ্নের আমি তো থ, "চুপ করে থাকলে পার পাবে না। চটপট জবাব দাও"।

"আমি তো আমেরিকার সিটিজেন নই স্যার। কাজেই আমার স্বপ্ন আপনার রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে না"।

"ওই কে কোথায় আছিস এ ব্যাটার দেশকে আমাদের বাহাত্তর নম্বর রাজ্য হিসেবে জুড়ে দে। দিয়েছিস? দিয়েছিস তো? ভেরি গুড। হ্যাঁ, কী বলছিলে"?

"বলছিলাম মামলেট রাষ্ট্রবিরোধী কেন"?

"রবীন্দ্রনাথ কি মামলেট খেতেন"? স্পষ্ট উৎপল দত্তের কণ্ঠস্বর নকল করে বললেন, আমি রবি ঘোষের মত বিব্রত হলাম।

"রবীন্দ্রনাথকে তো আপনি গত পরশু ব্যান করেছিলেন আপনার থেকে একটা নোবেল বেশি পাওয়ার অপরাধে। অতএব তাঁর মামলেট খাওয়া না খাওয়ায় কী এসে যায় বলুন"।

"এই কে কোথায় আছিস। একে মিউট কর"। মার্কিন টেকনোলজির বহর দেখে আমি তো হতবাক, সত্যিই কথা বন্ধ হয়ে গেল আড়ালে কেউ কোনো সুইচ টেপায়।

"হ্যাঁ, যা বলছিলাম", ট্রাম্প বলা শুরু করলেন, "এই যে তুমি আমার হাতে-পায়ে ধরে এতক্ষণ কান্নাকাটি করলে তাতে আমার মন গলেছে"।

আমি প্রতিবাদে মাথা নাড়তে গেলাম। টের পেলাম মাথা-ঘাড়ও মিউট করে দিয়েছে। কোথায় লাগে চীনের টেকনোলজি।

"আর এই যে তুমি তোমার স্বপ্নগুলো আমায় সতেরোটাকায় বেচে দিতে চেয়ে অনুরোধ উপরোধ করছ, তা'তে আমি আর না বলতে পারছি না"।

আমি হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ করতে গেলাম। টের পেলাম গোটা শরীর অবশ।

"জানো", ট্রাম্প বেশ ইয়ারদোস্তির সুরে বললেন, "গতকাল আমি বাংলায় একটা গান লিখে পোস্ট করলাম। জীবনে কী পাব না, ভুলেছি সে ভাবনা। আড়াই কোটি লাইক এলো আড়াই সেকেন্ডে। বিউটিফুল না? যাক গে , শোনো। আমায় না বলে তুমি আর স্বপ্ন দেখো না, কেমন"?

বাহাত্তর বার না বলার চেষ্টা করলাম অথচ গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কিন্তু যেই বলতে চাইলাম "তাই হবে স্যার", আমার গলা বেয়ে বাহান্নটা অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো।

সন্দীপনের ভ্যান


সন্দীপন ভ্যান চালান। এ মাল ও মাল, এ'খান থেকে ও'খান। ভোর থেকে সন্ধে, হপ্তায় ছ'দিন। বাড়তি রেটে পয়সা দিলে রোববারও বেরিয়ে পড়তে আপত্তি নেই তাঁর। টাকা জিনিসটা দরকারি, দরকারকে উড়িয়ে দেওয়ার বিলাসিতা সন্দীপনের না-পসন্দ। তবে সে দরকারটার বাইরে গিয়ে সন্দীপন গান ভালোবাসেন, ভালোবাসেন গুনগুন করতে। কিশোরকুমারের একটা ছবি তাঁর বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো, সে ভালোবাসাটা নেহাত দেখনাই নয়।

ফুডডেলিভারি অ্যাপের দুনিয়ায় মাঝে একবার ঢুঁ দিয়েছিলেন। দু'পয়সা বেশি কামিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগ ছিল। এবং সেই প্রতিনিয়ত দশ মিনিটের যুদ্ধে কিশোরকুমার বিদেয় নিয়েছিলেন। বিদেয় নেওয়াটা বড় কথা নয়। সন্দীপন আজও ভেবে অবাক হয়ে পড়েন যে কিশোরকুমারের সেই চলে যাওয়াটাকে পাত্তা দেওয়ার সময়ও তখন তাঁর হাতে ছিলো না।

টের পেয়েছিলেন আচমকাই। দশ মিনিটের হুড়মুড়ে একদিন তাঁর স্কুটারের চাকা ফসকে সে একটা বিশ্রী ব্যাপার। ছ'মাসের কাজ না থাকার সময় কিশোর ফিরেছিলেন। পেটের খিদে সে ভদ্রলোকের গানগুলোকে তেমন ম্লান করতে পারেনি দেখে বেশ অবাক হয়েছিলেন সন্দীপন। বেশ একটা নিশ্চিন্দি ভাবও টের পেয়েছিলেন।

সন্দীপন ভ্যান নিয়ে দিব্যি আছেন। কিশোরে ফিরেছেন। আর আবিষ্কার করেছেন যে বোগানভেলিয়া তাঁর বড় প্রিয়।

Thursday, December 4, 2025

জব ওয়েল ডান


বড়সাহেব ভেবেচিন্তে আড়াই ঘণ্টার কাজ দিলেন।

মেনি জানে সে কাজ আড়াই মিনিটের। তবু লিঙ্কডইন এক্সেলেন্সের কথা মাথায় রেখে সে এক মস্ত পাওয়ারপয়েন্ট বানিয়ে প্রমাণ করলে যে এ কাজ অন্তত আড়াই দিনের।

বড়সাহেব নিজের "কেমন দিলাম" স্মিত হাসিটা মুখে ভাসিয়ে তুলে ঘোষণা করলেন যে "নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে না শিখলে রিয়েল প্রগ্রেস সম্ভবপর নয়। অতএব আড়াইদিনের কাজ আধবেলায় করে ফেলতেই হবে। ডু অর ডাই"।

অতএব মেনিশ্রেষ্ঠ আড়াই মিনিটের কাজ ঠেলেঠুলে সতেরো মিনিটে শেষ করে আধবেলা অফিসঘুম দিলে। তারপর মাছের ঝোল ভাতের ঢিপিতে টেনে নেওয়ার আগে কেল্লাফতে ইমেল পাঠিয়ে মিচকি হাসলে।

ও'দিকে বড়সাহেব মিচকিতর হাসি হেসে তস্যবড়সাহেবকে ফোন করে বললেন, "দেখলেন স্যর, কী ভাবে আড়াই মাসের কাজ আমি আধবেলায় করিয়ে নিলাম"?

ট্রাম্প দর্শন

আজকাল ট্রাম্পের মত ভাবার চেষ্টা করছি। সেই ঘ্যামটা আয়ত্ত করতে পারা সহজ নয়। তবে চেষ্টা ছাড়লে চলবে না।

এই যেমন কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে সোজাসুজি বলে দেওয়ার চেষ্টা করছি যে "তুই ভুল, তোর বাবা ভুল , তোর জ্যামিতির বাক্স ভুল, তোর ভাতের পাতে ভুল"। টুকরো টুকরো অবান্তর আক্রমণগুলো কেউ কাউন্ট রজারের গুপ্তধনের সঙ্কেত গোছের কিছু ভেবে সাজিয়ে গুছিয়ে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতে গেলে আরো উঁচু গলায় বলতে হবে "শুনছি লখনৌয়ের ভুলভুলাইয়া তোর কাছে টিউশনি পড়তো এক কালে"?

নিপাট এলেবেলে কেউ নিশ্চিন্তে ভাতঘুম দিচ্ছে দেখলেই তার নামে নিন্দে করছি। তার গ্যাঁটের বা গলার জোর যদি আমার চেয়ে কম হয় তা'হলে তার গায়ে পড়ে "এই তোর গায়ে এত ময়লা" বলে হল্লা করছি। ব্যাপারটায় দেখছি মারাত্মক তৃপ্তি।

সবচেয়ে বড় কথা মোটাকে ভোঁতকা, খোড়াকে ল্যাংচা বা গোবেচারাকে 'আস্ত পাঁঠা' গোছের যে কথাগুলো আগে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে চাপা গলায় বলতাম, সে'গুলো এখন বুক বাজিয়ে আঙুল নাচিয়ে বলছি। যত বলছি তত দেখছি কনফিডেন্সের পারদ হুহু বেগে উপরের দিকে ছুটছে। শুধু তাই নয়, আর পাঁচটা ইয়ারদোস্তও জুটে যাচ্ছে যারা পিঠ চাপড়ে বলছে "এইত্তো চাই, হাউ ব্রেভ"।

কেউ একটা সে'দিন বাড়ি এসে মিনিট দশেক বিস্তর গপ্প ফাঁদলে। মতলব হলো গরীব ছেলেমেয়েদের শিক্ষাফিক্ষার জন্য চাঁদা চাইতে। গাছহারামি মাল। দু'টো নকুলদানা খাইয়ে বললাম "মহাপ্রসাদ, বিশটাকা প্রণামি ছাড়ুন দেখি। ফ্রিতে প্রসাদ সাঁটাতে নেই"। কুড়িটি টাকা দিয়ে পত্রপাঠ বিদেয় হলে, শিগগিরই আর আমার ড্রয়িংরুমে তাকে দেখতে হবে বলে মনে হয়না।

মোট কথা ট্রাম্প-দর্শন আত্মবিশ্বাসে বেশ জমকালো পালিশ এনে দিয়েছে। ভাবছি এ'বার লিঙ্কডইনে মন দেবো। এইসব হাইক্লাস লীডারশিপ মার্কা আত্মোপলব্ধি সে'খানকার মার্কেট খাবে ভালো।

Sunday, June 1, 2025

হেমন্তবাবুর আশ্বাস



মিউজিক সিস্টেম থেকে ভেসে এলেও হেমন্তর কণ্ঠস্বর হেলাফেলা করা সম্ভব নয়। ভদ্রলোক "এই করেছ ভালো" বলেছেন মানে সে'টাই ফাইনাল ট্রুথ। এরপর আর 'এ'টা হচ্ছে না, সে'টা পাইনি' বলে দু:খ করার কোনো মানেই হয় না। 'ভালো', 'সুন্দর', 'দারুণ' এইসব বিশেষণ দিয়ে হেমন্তবাবুকে দাগিয়ে দেওয়ার দু:সাহস আমার মত সঙ্গীতহীন মানুষের অন্তত নেই। ওঁর গলায় কেমন একটা ব্যাপার আছে যাতে মনে হয় পাশে বসেই কেউ গাইছেন। আর তাঁর কণ্ঠে রয়েছে সুপারসিরিয়াস ইমপ্যাক্ট, গান-শুনিয়ের সামান্যতম ফিচলেমোও সে গানের ধবধবে সাদা চিকন-কাজের টেবিলক্লথে ঝোল ছিটিয়ে দিতে পারে। জনগনমন কানে এলেই যেমন দাঁড়িয়ে পড়া, হেমন্ত কানে এলেই তেমনই সজাগ ও শান্ত না হয়ে উপায় নেই।

সেই হেমন্ত যখন রবীন্দ্রনাথের লাইন তুলে বলছেন "এই করেছ ভালো, নিঠুর, এই করেছ ভালো। এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো" - তখন দুনিয়ার ভার মাথা নুইয়ে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। নয়তো যেন রবীন্দ্রনাথকে নয়, হেমন্তবাবুকে ইনসাল্ট করা হবে; আর সে'টা হলে পৃথিবী স্পিন ছেড়ে রিভার্সসুইংয়ের দিকে ঝুঁকবে। হেমন্তর গলা বুকের ভিতরের লিখে দিচ্ছে "আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে, আমার এ দীপ জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো"। আমি পুড়লে পোড়া থার্মোকলের গন্ধ ছাড়া কিছুই বেরোয় কিনা জানা নেই, তবে তা নিয়ে অভিযোগ জানানোর আমি কে। হেমন্তবাবু অমনভাবে বলছেন যখন এই ভালো। যা হচ্ছে বেশই হচ্ছে; খামোখা ঘ্যানঘ্যান বাড়িয়ে কী আর হবে।

রবীন্দ্রনাথকে বোঝার মত বোধবুদ্ধি নেই, হেমন্তকে অ্যাপ্রিশিয়েট করার মত সুর নেই। এলেবেলে মানুষ, তাঁর এলোমেলো দু:খ। নেহাৎ হেমন্ত অমন যত্ন করে পিঠে হাত রাখার আশ্বাসে গাইছেন, "বজ্রে তোলো আগুন করে আমার যত কালো, এই করেছ ভালো"। তাই আমারও নিশ্চিন্তে বলে দেওয়া: "ওউক্কে, ঠিক হ্যায়, এই ভালো, এই বেশ"।

ঘিবলি খগম

খগম টাইপ একটা পরিস্থিতি কল্পনা করছি।
লাইভ টিভি ডিবেট চলছে। স্যাম অল্টম্যান রসিয়ে রসিয়ে বোঝাচ্ছেন যে এ-আই'কে কেন রোখা যাবে না। মিয়াজাকি নির্বিবাদে মাথা নেড়ে যাচ্ছেন।
স্যাম আচমকা উত্তেজিত হয়ে বলে বসলেন "সায়েন্স এগোচ্ছে মশাই। অত আর্ট আর্ট করে চিল্লিয়ে নাকি কান্না কেঁদে লোক হাসাবেন না"!
ব্যাস! মিয়াজাকি খেপচুরিয়াস সাধুবাবার স্টাইলে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন! অমনি স্যাম অল্টম্যানের হাত-পা-মুখ পাল্টে যেতে লাগলো। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে জলজ্যান্ত মানুষটা্র আদত চেহারা স্টুডিও ঘিবলি কার্টুনের ধাঁচে পাল্টে গেল।
আর তাই না দেখে আমরা সবাই আঁতকে উঠে একে অপরকে জিজ্ঞেস করছি "দ্যাখ তো রে ভাই আমার গালটাল ফুলে উঠছে কিনা"!

Sunday, March 16, 2025

খবর

- স্টাম্পিডের খবরটা শুনলে মামা?
- না।
- সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার...গতকাল রাতের দিকে হয়েছে কী..।
- কী ব্যাপার, অত কথা বলছিস কেন?
- এই যে শোনোনি বললে! সিরিয়াস ব্যাপার মামা, হয়েছে কী..।
- বেশি ইনফর্মেশনে আমার ডাইজেশনে অসুবিধে হয়।
- এতগুলো মানুষ জাস্ট..।
- তোর যত ফড়ফড়ানি শুধু নেগেটিভ নিউজ নিয়ে। হ্যাঁ রে, এই যে সে'দিন পাড়ার পার্কে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো চালু হলো, সে'দিন তো সকাল সকাল গল্প ফাঁদতে আসিসনি।
- যা বাবা। কোথায় কী..।
- তবে হ্যাঁ। অল ইজ নট ওয়েল। শেয়ার মার্কেটের অবস্থাটা দেখছিস তো।
- কী হয়েছে?
- এই দ্যাখো। আসল ম্যাক্রো ইস্যুগুলো নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যত মাইক্রো সমস্যা নিয়ে সকাল সকাল গলা ফাটায়। শোন। হয়েছে কী, ট্রাম্প আসার পর থেকে যদি ইন্টারেস্ট রেটের ট্র্যাজেক্টরিটা ফলো করিস..।
- মামা, আজ আসি। আমার একটা জরুরী মাইক্রো লেভেলের কাজ আছে।

Thursday, November 21, 2024

লজ্জাঘেন্না

লজ্জাঘেন্না ত্যাগ না করলে সম্ভবত রাজনৈতিক ক্ষমতা আদায় করে নেওয়া যায় না৷ কাজেই তাঁদের আগডুমবাগডুম কথাবার্তায় আকাশ থেকে পড়ার কিছু হয়নি৷ কিন্তু এই "প্রতিবাদ করছেন তবুও মাইনে-বোনাস নেবেন?" গোছের প্রশ্ন যে যতবার করবেন, ততবার জোরালো গলায় "মিথ্যে বলছেন, মানুষকে টুপি পরাচ্ছেন" বলে সরব না হয়ে উপায় নেই৷

ন্যায্য প্রতিবাদকে ঠেকাতে গিয়ে এই সস্তা-মিথ্যে-বাজে যুক্তিটুকু অনেকেই চালিয়ে থাকেন৷ অনেকে আবার এ'টা বলে ভাবেন "বেশ দারুণ স্মার্ট একটা কথা বলে ফেললাম আর কী"। কিন্তু ক্ষমতাসীন মানুষ, বিশেষত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন মারাত্মক রকমের আত্মবিশ্বাস নিয়ে এ'সব গুল (আইনের দিক থেকে, নৈতিকতার দিক থেকে, কমনসেন্সের দিক থেকে) ফায়্যার করেন, তখন মনে হয়ে সত্যিই সব রসাতলে গেছে বটে।

এ'ক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিবাদীরা নিজেদের প্রতিবাদের পাশাপাশি নিরলস ভাবে মানুষের জন্য কাজও করে চলেছেন৷ তবে ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে অদ্দূর যাওয়ার দরকারটাই বা কী৷ ন্যায্য প্রতিবাদ রুখতে বেতন কাটা আর লেঠেল লেলিয়ে ঘরদোর ভেঙে শায়েস্তা করার মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। এই সহজ-সরল কথাটা না জেনেও জননেতা হওয়া যায়-সে লজ্জা তাঁর নয়, সে লজ্জা আমাদের৷

Tuesday, July 16, 2024

কম্ফর্টজোনস্থ

কম্ফর্টজোন সম্বন্ধে নানাবিধ অপপ্রচার ও কটুকথা শুনতে পাই, বিশেষত এই লিঙ্কডইন জমানায়৷ ঠিক করেছি সে'সব বক্তৃতাগুলোকে পাত্তা দেব না৷ কম্ফর্টজোনই জীবনের লক্ষ্য। দিনগুলো নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেওয়াটাই নির্বাণ (অন্যের মাছের ঝোলা মাখা ভাতে ছাই না ছড়িয়ে)।

কম্ফর্টজোনের বাইরে বেরিয়ে আসতে হয় বটে তবে সে'টা নেহাতই কম্ফর্টজোন বজায় রাখার স্বার্থে। দুধভাতের নিয়মিত সাপ্লাইয়ের আশ্বাস পেলে ঈশ্বরীকে নৌকা বেয়ে হদ্দ হতে না৷ যা হোক, সে নৌকা বাওয়ার জীবনই ক্রমশ তাঁর কম্ফর্টজোনস্থ হয়ে ওঠে; যে কম্ফর্টকে একতাল সোনার লোভে হাতছাড়া করতে সে নারাজ৷ সে অর্থে ঈশ্বরী পাটনীই বাঙালির প্রথম লাইফকোচ।

অতএব, ভালোথাকার গোলপোস্ট এ'দিক ও'দিক সরতে চাইলেই তার মাথায় গাঁট্টা মেরে শান্ত করব।

ইয়েস ইউ ক্যান!


একের পর এক ব্যর্থতায় পর্যুদস্ত হয়ে অফিসের বাবু বা বিবিটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক কোণে থেবড়ে বসে পড়েছেন। এমনটা তো আকছারই হচ্ছে। অফিস-কাছারির নিয়মই তাই, চারদিকে গোলা-গুলি-মিসাইল উড়ে বেড়াচ্ছে আর আকচার এই ব্যাটা বা ওই বেটি ঘায়েল হচ্ছে। কখনও নিজের দোষে, কখনও নেহাতই ভাগ্যের ফেরে।

সে ব্যক্তিটির দমে যাওয়া দেখে যারা আমোদ পাবেন, তাদের নিয়ে চিন্তা নেই। তারা সর্বত্র বিরাজমান ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। মনে রাখবেন, আমরা কেউই তেমন অ্যাকুয়াফিনায় ধোয়া তুলসীপাতাটি নই যে অন্যদের ব্যথায় কোনোদিনও মিচকি হাসিনি। অতএব অফিসের সেই পর্যুদস্ত বাবু বা বিবি অন্যদের মধ্যে চাপা আমোদ টের পেয়ে সামান্য ব্যথিত হবেন হয়তো, কিন্তু অক্কা পাবেন না।

চিন্তা হল তাদের নিয়ে যারা সেই বাবু বা বিবির মৃদু হাহুতাশ শোনা মাত্র স্বয়ং লিঙ্কডইন অবতার হয়ে ছুটে এসে মোটিভেশনাল আবৃত্তি শুরু করবেন। নিজের ব্যর্থতা বিষয়ক যন্ত্রণা ও লজ্জায় ছটফট করতে করতে সেই বাবু বা বিবি হয়ত ক্ষণিকের স্বস্তি আর একটু নিরিবিলির খোঁজ করছেন। কিন্তু লিঙ্কডইন দাদা-দিদিরা সে স্বস্তির আশা ছিন্নভিন্ন করে "ফেলিওর ইজ দ্য মাদার (না গ্র্যান্ডফাদার কে জানে) অফ অল সাকসেস" বলে জলসা বসাবেন। দরদ দিয়ে বলবেন কী'ভাবে স্টিভ জবসের মত জিনিয়াসকেও অ্যাপেল থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল কিন্তু তিনি দমে যাননি। "হি কেম ব্যাক স্ট্রঙ্গার, সো স্টে হাঙ্গ্রি, স্টে ফুলিস"। এ'সব কথা শুনে কারুরই পেটের জেনুইন খিদের কথা বলারও সাহস হবে না, অতএব ফুলিস সেজে চুপ থাকাটাই ভালো। কোনও অ্যাটিচিউড-মেসোমশাই হয়ত বের করে আনবেন স্বরচিত সব "ফাইট কোনি ফাইট" মার্কা সমস্ত কোটেশন আর সে'সব কলার-টানা-জ্ঞান চালিয়ে দেবেন লার্নিং ফ্রম উপনিষদ বলে। কেউ হয়ত এক ডিগ্রি এগিয়ে গিয়ে চোখের সামনে ইউটিউবে চালিয়ে দেবে; সে'খানে দেখা যাবে একজন সর্বহারা মানুষ স্রেফ মনের জোরে এভারেস্টের মাথায় উঠে ক্যাম্পখাটের ব্যবসা করে কোটিপতি হয়ে গেলো।

এইভাবে একসময় "বল বীর – বল উন্নত মম শির"য়ের ঠেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠবে। পর্যুদস্ত বাবু বা বিবিটি ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি মোডে ছটফট করবেন। অথচ লিঙ্কডইন-সহকর্মী কিছুতেই তার কলার ছাড়বেন না। শেষে "যোগব্যায়ামের ক্লাসে ভর্তি হবই হব" আশ্বাস দিয়ে মুক্তি পেতে হবে।

কাজেই, ব্যর্থতাকে ডরিয়ে লাভ নেই। পেল্লায় মানুষদের পেল্লায় হয়ে ওঠার গল্প আর দু'টো 'ইয়েস ইউ ক্যান' মার্কা মন্ত্রপাঠ করে ব্যর্থতা সারানো ওঝাদের এড়িয়ে চললেই দেখা যাবে যে যাবতীয় ব্যর্থতা সত্ত্বেও, এ জীবন স্বস্তিতে পরিপূর্ণ।

বাপের ব্লেড

যৌবনের উচ্ছ্বাসে এক সময় মনে হত, দাড়ি কামানোর ব্লেডের ব্যাপারে মেজাজটা চরম শৌখিন পর্যায়ে রাখা উচিৎ। চরম ধারালো ব্লেড, এক তাল মাখনের মত গাল বেয়ে ওঠা নামা করবে। দাড়ি কাটার পর গালে হাত বোলালে নিজের খসখসে আঙুলের ডগার প্রতি মৃদু তিরস্কার বেরিয়ে আসবে আপনা থেকেই। আজকের তাজা ব্লেড, কাল হবে ব্রাত্য; তবেই না ঘ্যাম। সেই রঙিন বয়সে দাঁড়িয়ে বাবার পুরনো ব্লেড আঁকড়ে থাকার স্বভাবটাকে কী বিরক্তি নিয়েই না দেখতাম৷

অথচ নিজে মাঝবয়সে এসে দেখলাম নিজের চরিত্রে জমে থাকা যত কিপটেমো আর গড়িমসি- সব এসে জমা হয়েছে নতুন ব্লেড ব্যবহারে৷ কতবার গালে রেজার ছুঁইয়ে মনে হয়ে, "এহ্, ব্লেডটা এ'বারের পরেই রিজেক্ট করতে হবে"। অথচ পরের দিন নতুন ব্লেডের প্যাকেট হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে সরিয়ে রাখা; "এই তো সে'দিনই ব্লেডটা নামালাম, আর একদিন চলুন না হয়"৷ এইভাবে আরও দিন কতক সেই পুরনো ব্লেডে মাটি কোপানো৷ ঘর্ঘর, ঘসঘস।

কিন্তু৷

সমস্ত গড়িমসি পেরিয়ে যেতিন নতুন ব্লেডখানা প্যাকেট ঝেড়ে ফেলে সত্যিই রেজারে এসে বসবে; সে'দিনের দাড়ি কামানকোর যে সুপার-মসৃণ নবাবী, আহা। নতুন ব্লেডে দাড়ি কামানোর দিনটা রেজার হাতে একটু বাড়তি সময় কাটে আয়নার সামনে৷ বার বার মনে হয়, "মধ্যবিত্তের বেতনটার এমন মখমলে ব্যবহার আর দু'টি নেই"। অন্যান্য দিনে দাড়ি কামানোর পর ওই আফটার শেভ লোশন লাগানোর কথা তেমন মনে পড়ে না৷ নতুন ব্লেডে দাড়ি কামানোর শুভদিনে তাকের কোণ থেকে ওল্ড স্পাইসের শিশিটা শিস দিয়ে ডাকে "এইয্যে, এ'দিকে দ্যাখো একবার ভাইটি"।

নতুন ব্লেড নামানোর দিনটায় মনের মধ্যে বেশ একটা ফুরফুর থাকে৷ আর থাকে epiphany; এইভাবেই খোকা থেকে বাবা হয়ে বাবা-er হতে হতে বাবা-est হয়ে যাওয়ার রুটখানাকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই।

Sunday, December 31, 2023

জয় বাবা লাভেনস্টাইন



ছ'মাসে ন'মাসে, আচমকা কোনও ফাঁকে;
মিনিট কুড়ি সময় আমি "ইনভেস্ট" করি মিস্টার লাভেনস্টাইনের পেজে। এ'টা হচ্ছে মনের মেঝে সাফ করার সহজ প্রসেস৷

কার্টুনগুলো পড়তে পড়তে প্রথমে খানিকক্ষণ হ্যা হ্যা করি৷ এই স্টেজে হিউমরের ঝাড়ুতে মনের ধুলো বিদেয় হয়।
তারপর কিছুক্ষণ "যাচ্চলে" বলে খাবি খাওয়া৷ "আমায় খোঁটা দিচ্ছে না তো"র সন্দেহটা ভিজে ন্যাতার কাজ করে, মেঝে এ'বার চকচকে হয়ে ওঠে৷

এরপর পরিস্থিতি গিয়ে ঠেকে হাই-ইন্টেন্সিটি "ধুশ্লা"য়। স্যাডিস্ট লাভেনস্টাইন; খটখটে কথাগুলো অমন খটখটেভাবে বলতে আছে? তবে একরাশ বিরক্তি সত্ত্বেও খিকখিক থামে না৷ মনের মেঝে এ'বারে হাপিত্যেশের ডেটল ছড়িয়ে ডিসইনফেক্ট করার পালা৷

নিউটন, বুদ্ধ বা মোহনদাস গোছের একজন অন্তত বলে যেতেই পারতেন যে কারুর কিছুই হওয়ার নয়৷ আর কিছু হলেও কারুর কিস্যু এসে যায় না৷ এই হাহাকারে যে কী গভীর আত্মতৃপ্তি।
থ্যাঙ্কিউ মিস্টার লাভেনস্টাইন।

Saturday, July 1, 2023

লিঙ্কডইন ও মুড়ি-বেগুনি

লিঙ্কডইন আমি: ভুলে যেওনা ব্রাদার, লাইফ ইজ নট আ বেড অফ রোজেস। স্ট্রাগল তো থাকবেই, সে'সব পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারাটাই হল এক্সেলেন্স।
মুড়ি-বেগুনি আমি: এই একটা দামী কথা বলেছ।
লিঙ্কডইন আমি: কথা দামী না হলে সে'সব মার্কেটে ছাড়বই বা কেন।
মুড়ি-বেগুনি আমি: মার্কেটে আমাদের মত মর্কটদের জায়গা নেই বলছ?
লিঙ্কডইন আমি: মার্কেটে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হবে৷ নিজেকে এস্টাব্লিশ করতে হবে৷ দাপট না দেখালে চলবে কেন? ওই যে বললাম, মনে রাখতে হবে যে লাইফ ইজ নট আ বেড অফ রোজেস।
মুড়ি-বেগুনি আমি: আহা! ভারী দামী কথা৷ লাখটাকা ভরি একএকটা শব্দ।
লিঙ্কডইন আমি: এই, ঠাট্টা করছ না তো?
মুড়ি-বেগুনি আমি: সিরিয়াসলি ভাই৷ সত্যিই তো, জীবনকে গোলাপ ছড়ানো বিছানা ভাবলেই গা কেমন ঘিনঘিন করছে। জীবন অত খেলো নয়৷ জীবন হল গিয়ে..! এই যে ভাইটি..শোনো না৷ এ'বার আমিও একটা দামী কথা বলব। বলি?
লিঙ্কডইন আমি: তুমিও দামী কথা বলবে? মার্কেটে অতিরিক্ত দামী কথা চালাচালি হলে কথার দাম পড়ে যাবে যে। বেসিক ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ইস্যু। তবে ইচ্ছে হয়েছে যখন বলো। শুনি।
মুড়ি-বেগুনি আমি: অর্জ কিয়া হ্যায়..।
লিঙ্কডইন আমি: এই আবার নাটুকেপনা শুরু হল..উফ!
মুড়ি-বেগুনি আমি: লাইফ ইজ নট আ বেড অফ রোসেস। বাট লাইফ ক্যান বি আ কাঁথা অফ নয়নতারাস৷ একটু চোখকান খোলা রাখলেই হল।
লিঙ্কডইন আমি: তুমি কান ধরে বাহাত্তরবার ওঠবস করো ব্রাদার।

বার্ডস আর নট রিয়েল

আমি সম্প্রতি একটা জরুরী ফেসবুক গ্রুপ জয়েন করেছি। বার্ডস আর নট রিয়েল।
প্রথম দু'দিন চরম বিরক্তিতে কেটেছে। মহাগুলবাজদের গ্রুপ। পাখি মানেই নাকি ড্রোন। পাখি আদতে আদিম বট। ইত্যাদি। ইত্যাদি। ঘ্যাচাং করে আনফলো করে দিলাম। কিন্তু কী মনে হলো, বেরিয়ে আসিনি গ্রুপ থেকে।
এরপর একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হলো। টাইমলাইনে আর সে গ্রুপ থেকে পোস্ট আসে না। কাজেই আমি সেই গ্রুপে যাতায়াত আরম্ভ করলাম। কেন করলাম? জানি না। দিন পাঁচেকের মাথায় আমার প্রাথমিক অবজ্ঞার মধ্যে সামান্য সন্দেহ এসে মিশলো। তলিয়ে ভেবে দেখলাম, পাখিরা আদতে কিন্তু মহাফেরেব্বাজ। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি। ডানাওলা জিনিস, সুটসাট উড়ে বেড়ায়। এত হাজার বছরে মানুষকে তারা কনভিন্স করতে পেরেছে যে তাদের মুখ দিয়ে বেরোনো চ্যাঁ-চোঁ চিকিরমিকির মার্কা হেজিপেজি শব্দ আসলে গান। গান না হাতির মাথা। এই জাতকে চোখ বুজে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কেমন?
মানছি, ৯৯% সম্ভাবনা যে তারা রিয়েল। কিন্তু ১% সন্দেহ ওদের প্রতি রাখতে পারলে মানুষের মঙ্গল। কাজেই আজকাল পায়রা দেখলেই বাঁকা চোখে দেখছি। পালকের আড়ালে স্ক্রু-পেরেক যদি কিছু নজরে পড়ে। একটা কাকের ইয়ে গায়ে পড়ল। ঘেন্নার মধ্যে সামান্য আতঙ্কের চোনা মিশে গেল; কোনও ঘ্যাম লেভেলের কেমিকাল এজেন্ট নয় তো?
দিনকাল ভালো না। উড়ুউড়ু বদখত জিনিসপত্র দেখলেই আদেখলাপনা করব না ঠিক করেছি।

রোব্বারের ডিসিপ্লিন

প্রতি রোব্বার সকালবেলা আমি একটা ওজনমাপার যন্ত্রের ওপর গিয়ে দাঁড়াই। ওই দাঁড়ানোটাই আমার ডিসিপ্লিন। এক প্রকার হুঙ্কারও বলা যেতে পারে; এই দ্যাখো। আমি নেহাৎ ন্যালাখ্যাপা নই। জাতে হাভাতে কিন্তু তালে "হেল্থ অ্যাওয়ারনেস" আছে।
সক্কাল সক্কাল ওজন মেপেই মনে হয় " নাহ্, মনের মধ্যে একটা ফোকাস দানা বাঁধছে"৷ ওজন বাড়তি না কমতি সে'সব বাজে প্রশ্নে নিজেকে বেঁধে ফেলার মানে হয়না৷ এই যে ওজন মাপছি, সে'টা ভেবেই নিজের প্রতি মারাত্মক রেস্পেক্ট তৈরি হয়৷ এ'বার একটা চাবুক সিস্টেমে নিজেকে ফেলতে পারলেই হল৷ আর সে'দিক থেকে রোব্বারের জবাব নেই৷ সকাল সাড়ে ন'টায় ঘুম ভাঙার পর এমনিতেই নিজেকে ভারী মজবুত বলে মনে হয়৷ সেই মজবুত মনোভাবটা লুচি-তরকারি চিবোতে চিবোতে বাড়তে থাকে৷
কিন্তু হুজুগে ঝাঁপ দিলেই তো চলে না৷ কাজেই সোফায় লম্বা হয়ে একটু মেডিটেট করতে হয়। এই যে একটা প্রবল ডিসিপ্লিন-বোধ, সে'টা একটা ইস্পাতের ফলা৷ সাবধানে ব্যবহার করলে প্রডাক্টিভ, নয়ত কচুকাটা হওয়ার সম্ভাবনা৷ তা সে'টাকে আমি ঠিক কী'ভাবে ব্যবহার করব, সে'টা নিয়ে একটু মাথা ঘামানোর প্রয়োজন। এ'খানে বলি, আমার একটা মারত্মক লেবু-সরবতের ফর্মুলা আছে৷ একটু বাড়তি মিষ্টি, সামান্য সোডা সহযোগে সে এক মারকাটারি জিনিস৷ ওই মুকুজ্জে-স্পেশাল-লেমোনেডে চুমুক দিলে মেডিটেশন জমে ভালো। এ'বার থেকে তবে দিনে বারো হাজার স্টেপ্স? ডিনারে জিরো কার্ব? হপ্তায় একদিন ফ্রুট ডিটক্স? এ'সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে দুর্দান্ত সব স্পার্ক তৈরি হয়ে শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে৷
সমস্যা হল, পোস্ট লুচি আর প্রি-মাংস মানসিক স্তরে একটা খুব রোমান্টিক ঝিমুনি আসে৷ ঘুম নয়, ঘুম নয়৷ বেশি ঘুম ভালো নয়। ও'টা একটা আলগা আমেজ বলা যেতে পারে৷ যে আমেজে যাবতীয় শব্দপ্রবাহ স্তিমিত হয়ে আসে, চারপাশের মানুষজন ঝাপসা হয়ে পড়ে। ইংরেজিতে যাকে বলে "ট্রান্স"। সে সমাধি ভাঙতে ভাঙতে স্বাস্থ্য-তপস্যা কিঞ্চিৎ বিঘ্নিত হয় বটে৷ কিন্তু এ অনাবিল জীবনে তো আর রোব্বারের অভাব নেই৷ এ রোব্বার হল না, পরের রোব্বার হবে'খন৷ দুনিয়া তো গোল্লায় যাচ্ছে না৷ এ'টা ভেবে একটা প্রবল তৃপ্তি অনুভব করি, আহ্ - সামনের রোববার থেকে দুনিয়াটা পালটে যাবে, ডিসিপ্লিনের গঙ্গায় মছলিবাবা স্টাইলে ডুবসাঁতার দিয়ে ঘুরে বেড়াব৷
স্নান করতে যাওয়ার আগে কী খেয়াল হল, খানিকক্ষণ বসে বাংলা খবরের চ্যানেল চালিয়ে দিলাম৷ রোব্বার তো, একটু ডেয়ারডেভিল কিছু করা দরকার৷ তিনটে পার্টির তিনজন মানুষ নাগাড়ে চিল্লিয়ে চলেছেন। অজস্র মিথ্যে খুনে-কনফিডেন্স নিয়ে বলছেন, যুক্তিফুক্তির মত ফালতু ব্যাপারকে তোয়াক্কা করছেন না৷ ওই, টিআরপির জগতে রাজনৈতিক আলোচনা যেমন হওয়া উচিৎ আর কী৷
বাইশ মিনিট শুনলাম। ব্রেনের ভিতর স্টিলের গেলাসে ডিম ফেটানোর খটরখটর শব্দ শুনতে পাওয়া মাত্র টিভি বন্ধ করতে হল৷ টের পেলাম, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে৷ গলা শুকিয়ে এসেছে৷ স্মার্টঘড়ি বলছে রেস্টিং হার্ট রেট স্যাট করে বেড়ে গেছে৷ ইন্টেরেস্টিং৷ সুট করে গিয়ে ফের ওজন মাপার যন্ত্রে দাঁড়ালাম৷ সকালের তুলনায় একশো গ্রাম কম।
ব্রাভো! ব্রাভো! ব্রাভো! আজ লাঞ্চে দু'পিস বাড়তি মাটন খাওয়া যাবে৷

Sunday, November 6, 2022

বাইজুবাওরা

বাইজুর দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা জানিয়েছেন তাঁরা মর্মাহত এতগুলো মানুষকে ছাঁটাই করতে হল বলে। আড়াই-হাজার মানুষকে বাদ দিতে হল নিতান্ত নিরুপায় হয়েই, "প্রফিটেবিলিটি টার্গেট" বাগে আনতে। ব্যাপারটা এই যুগে দাঁড়িয়ে খুব একটা অদ্ভুত নয়, এমনটা তো আকছারই হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা কিন্তু বাইজুপ্রধান যে মনভার করা "ওপেন লেটার"টি বাজারে ছেড়েছেন, সে'টিকে আলাদা করে স্যালুট না করে উপায় নেই। মুনাফা ম্যাক্সিমাইজ করতেই যুগেযুগে কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে, ব্যাপারটার এথিকাল দিকে যাওয়ার কোনও মানে হয়না। কিন্তু এমন বুক বাজিয়ে আহা-উঁহু দুঃখ প্রকাশ করে পি-আর পয়েন্ট আদায় করতে বুকের পাটা লাগে। বাইজুপ্রধান সত্যিই এর জন্যে প্রশংসার দাবী রাখেন।

আড়াই হাজার মানুষের চাকরী গেল। আড়াই হাজার। ইংরেজিতে বলি, কানে তা'তে 'সুইটলি' বাজবে হয়ত; ট্যু অ্যান্ড আ হাফ থাউজ্যান্ড চাকরীজ; জাস্ট ফুড়ুৎ। সেই ঘ্যাচাং খবরটা মোলায়েমভাবে পেশ করে বাইজুপ্রধান চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছেন, "কাজটা সহজ ছিল না মোটেও। আই অ্যাম সরি। কিন্তু কী করব বলুন, আমাদের এমন স্যাটাস্যাট গ্রোথ হবে সে'টা আগে থেকে ঠিক আঁচ করতে পারিনি। (যেহেতু আমারা আশাতীত ভাবে উন্নতি করেছি) কাজেই অতিরিক্ত 'ইনএফিশিয়েন্সি' আর 'রিডানডেন্সি' (লিঙ্কডইনকে আদরবাসা) আর নেওয়া যাচ্ছে না"।

এ'সব নিয়ে আলোচনার মানে হয়না। কিন্তু যেহেতু একটা মন-কেমনকরা "আহা, আমরা চাইনি, তবুও নিরুপায় হয়ে...সরি"-মার্কা চিঠি বাজারে (কাগজে-কাগজে) ছেড়েছেন, কাজেই দু'টো প্রশ্ন করাই যায়।

প্রথমত। ইনএফিশিয়েন্সি সম্বন্ধে। আড়াই হাজার ইনএফিশিয়েন্ট মানুষকে রিক্রুট করেছিলেন বাইজুবাবু? ট্যু অ্যান্ড আ হাফ থাউজ্যান্ড রিক্রুটমেন্ট ফেলিওরস? ভাবা যায়? এই যে তবে টেড-টকে শুনি, ভুল করা খারাপ। কিন্তু বারবার ভুল করাটা সাংঘাতিক লেভেলের পাপ। আড়াইহাজার ভুলভাল রিক্রুটমেন্ট? দলনেতার নাকের নীচ দিয়ে সে'টা এদ্দিন ঘটেছে? সে'টা কি এক ধরণের...ইয়ে...ইনএফিশিয়েন্সি? সে' ইনেফিশিয়েন্সির কোনও প্রতিকার আছে কি? কে জানে।

দ্বিতীয়ত। রিডানডেন্সি সম্বন্ধে। নিজের ব্যবসা কোনদিকে যাবে সে'টা ঠাহর করতে পারেননি? তাই এখন টুক করে সামান্য অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া "প্রফিটেবিলিটি টার্গেট" মিট করতে? অথচ দেখুন, লীঙ্কডইন বলছে লীডারদের দূরদর্শী হতে হবে। কাজেই এই যে ব্যবসার ভবিষ্যৎ সঠিক ভাবে আঁচ করতে না পারা; সে'টা কি...ওই...রিডানডেন্সি?

যাক গে, এই খোলা চিঠিটার ডাকনাম দেওয়া হোক "শেষের কবিতা"।

Thursday, June 16, 2022

তুচ্ছ ইতিহাস



আজকাল ইতিহাস সিলেবাসের ঠিক-ভুল উচিৎ-অনুচিত নিয়ে বেশ তোলপাড় চলছে। সে বিতর্কের মূলে রয়েছে রাজরাজড়াদের নিয়ে টানাটানি। কতটা মুসলমান বাদশাদের কথা পড়লাম, কতটা হিন্দু রাজরাজড়াদের ব্যাপারে জানলাম; সে রেশিও নিয়ে ধুন্ধুমার ব্যাপার। গুঁতোগুঁতি করে তর্ক করতে আমাদের যতটা আগ্রহ, ততটা আগ্রহ অবশ্য ইতিহাসের বই উল্টেপাল্টে দেখায় নেই। সে'টা একদিক থেকে বাঁচোয়া, ইনফরমেশন আর অবজেক্টিভিটির জ্বালায় রসালো খিস্তিখেউর নিষ্প্রভ হয়ে যায় না। যাক গে। এ'সবের মাঝে একজন চমৎকার ইতিহাস প্রিয় চরিত্রের কথা মনে পড়ে গেল; বিভূতিভূষণের অপু। অপু আইএ পাশ করে আর কলেজে ভর্তি হল না। প্রফেসররা ডেকে অপুকে বোঝাতে চাইলেন যে অপুর অনার্স পড়া উচিৎ। কিন্তু সদ্য মাতৃহারা, সহায়-সম্বলহীন অপুর তখন ক্লাস করার আগ্রহ ছিল না। নিদারুণ অভাবের মধ্যে থাকার ফলে অবশ্য ভর্তি না হওয়ার সিদ্ধান্তটা আরও সহজ হয়ে গেছিল। কিন্তু অপুর অনাগ্রহ ছিল মূলত সেই স্ট্রাকচার্ড সিস্টেমটার প্রতি, জানার ইচ্ছেটুকু পুরো দমে তাকে ঠেলে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। আর প্রচণ্ড মুখচোরা হওয়া সত্ত্বেও নিজের পড়াশোনার ফোকাস সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না অপুর। অপুর নিজের মনের ভাষায়; "দু'বছর (বিএ'র) মিছিমিছি নষ্ট না করে, লাইব্রেরিতে তার চেয়ে অনেক বেশি পড়ে ফেলতে পারব'খন"।

অপুর ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে বসে নিজের ইচ্ছেমত পড়াশোনা করার বর্ণনা 'অপরাজিত'র সামান্য কয়েকটা পাতার মধ্যেই সীমিত। কিন্তু ও'টুকু অংশ যে আমার কী প্রিয়। ডিগ্রি পাওয়ার জন্য নয়, 'কেরিয়ারে' এক্সেল' করতে হবে বলে নয়, এমন কী দু'দশজনের মাঝে দু'চারটে মজবুত কথা বলে চমকে দেওয়ার জন্যও নয়। সে গোগ্রাসে একের পর এক বই গিলেছে শুধুই জানার আগ্রহে। ওই আগ্রহে সিস্টেমের বালাই ছিল না, তবে অচেনা অজানাকে জানবার উচ্ছ্বাস ছিল ষোলো আনা। অপুর মধ্যে একটা দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস ছিল যে কলেজের সিলেবাসে বাঁধা পড়ার মধ্যে সার্থকতা নেই। (একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছিনা। আমার সৌভাগ্য যে আমি এমন একজনকে চিনি যে কলেজের সিলেবাসকে কাঁচকলা দেখিয়ে লাইব্রেরির শেল্টারে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। এবং এক্সলেন্সকে পোষা বেড়ালের মত মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে পেরেছিল। ওঁর থেকে অনুমতি আদায় করে একদিন সে'সব গল্প ফলাও করে বলতে হবে। তবে এ'বার অপুতে ফেরত যাওয়া যাক)। 

অপু দুপুর দু'টো থেকে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত লাইব্রেরীতে বসে পড়ত। রোজ। একটা ছোটখাটো অল্প মাইনের চাকরী যে'টা জোগাড় করেছিল সে'খানে ছিল রাতের শিফটে কাজ। বেলায় দেরী করে ঘুম থেকে উঠে সে ছুটত লাইব্রেরীর দিকে। এই যে নির্বিচার পড়াশোনা, তার অনেকটা জুড়েই ছিল ইতিহাস। কিন্তু সে ইতিহাস অপু যত পড়ছে, তত তার মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বারবার তার মনে হয়েছে এই যে রাজরাজড়ার হিসেবকিতেব, সে'টুকুই কি সম্পূর্ণ ইতিহাস? ইতিহাসের এসেন্স কি সে'টুকুই? না না, বিভূতিভূষণ কোট করে খামোখা নতুন তর্কে পড়তে চাইনা মোটেও। ইতিহাস যে রাজাগজাদের ফোকাসে রেখেই গড়ে উঠবে, সে'টাই স্বাভাবিক। এবং লজিকাল। ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে ইতিহাসের প্রাইম মুভার যে সে রাজাগজারাই। কিন্তু অপুর মনের মধ্যে যে উৎসুক রোম্যান্টিক মানুষটা রয়েছে, সে যে শুধু মাইলস্টোনের জাঁতাকলে আটকা পড়বে না, তা বলাই বাহুল্য। অপুর হয়ে বিভূতিবাবু বলছেন, "মানুষের সত্যকারের ইতিহাস কোথায় লেখা আছে? জগতের বড় ঐতিহাসিকদের অনেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজনৈতিক বিপ্লবের ঝাঁঝে; সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, মন্ত্রীদের সোনালি পোশাকের জাঁকজমকে; দরিদ্র গৃহস্থের কথা ভুলিয়া গিয়াছেন। পথের ধারের আমগাছে তাহাদের পুটুলিবাঁধা ছাতু কবে ফুরাইয়া গেল, সন্ধ্যায় ঘোড়ার হাট হইতে ঘোড়া কিনিয়া আনিয়া পল্লীর মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের ছেলে তাহার মায়ের মনে কোথায় আনন্দের ঢেউ তুলিয়াছিল - ছ'হাজার বৎসরের ইতিহাসে সে'সব কথা লেখা নাই।...কেবল মাঝেমাঝে এখানে ওখানে ঐতিহাসিকদের লেখার পাতায় সম্মিলিত সৈন্যব্যূহের এই আড়ালটা সরিয়া যায়, সারি বাঁধা বর্শার অরণ্যের ফাঁকে দূর অতীতের এক ক্ষুদ্র গৃহস্থের ছোট বাড়ি নজরে আসে। অজ্ঞাতনামা কোন লেখকের জীবন-কথা, কি কালের স্রোতে কূলে-লাগা এক টুকরো পত্র, প্রাচীন মিশরের কোন্‌ কৃষক পুত্রকে শস্য কাটিবার কী আয়োজন করিয়ে লিখিয়াছিল, - বহু হাজার বছর পর তাহাদের টুকরো ভূগর্ভে প্রোথিত মৃণ্ময়-পাত্রের মত দিনের আলোয় বাহির হইয়া আসে। কিন্তু আরও ঘনিষ্ঠ ধরণের, আরও তুচ্ছ জিনিসের ইতিহাস চায় সে। মানুষের বুকের কথা সে জানাতে চায়। আজ যাহা তুচ্ছ, হাজার বছর পরে তা মহাসম্পদ। ভবিষ্যতের সত্যকার ইতিহাস হইবে এই কাহিনী, মানুষের মনের ইতিহাস, তার প্রাণের ইতিহাস"। 

এই যে ইতিহাসের আড়ালে থাকা তুচ্ছ মুহূর্তদের নিবিড়ভাবে জানার লোভ, এ'টা কিন্তু কিছুতেই অপুর একার হতে পারে না। ঐতিহাসিকদের দোষ দিইনা, সমস্ত হরিদাস পালের গল্প বই বা স্টোনট্যাবলেটে বা প্যাপাইরাসে সাজিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু ওই 'খামোখা তুচ্ছের প্রতি আগ্রহে'র জন্যেই সুনীলবাবুর লেখা অর্ধেক জীবন আমার এত প্রিয়। অথচ মূল ইতিহাসের বই নিংড়ে সেই সাদামাটা মানুষের সাদামাটা গল্প বের করে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। যে কোনও ইতিহাসের বই হাতড়ালেই দেখব যে রাজারাজড়া, রাজনীতি আর ধর্ম - এই কনসেন্ট্রিক সার্কলগুলোর মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া ছাড়া গতি নেই। অবশ্য সে'ইতিহাসও সাংঘাতিক ভাবে গ্রিপিং। এবং জরুরী। তবে তা'তে ওই 'তুচ্ছকে জানার ঝোঁক' কমে না। এবং স্রেফ লাইব্রেরীতে বসে সে ইতিহাসের নাগাল পাওয়া অসম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, এই যে এক একটা সময়ের সাদামাটা মানুষদের আটপৌরে একঘেয়ে গতানুগতিক জীবনধারা, সে'টাকে রেকর্ড করে রাখতে গেলে তো সাহিত্যের ভাষা আর বইয়ের ডিসিপ্লিনে কাজ হবে না। হরিদাস পালের বায়োগ্রাফার আবুল-ফজল হলে চলবে কেন? হরিদাসের উঠোনে পাতা মাদুরের ওপর ভেজা গামছা, তার খোকা কাদায় ল্যাপ্টালেপ্টি করে খেলা করছে। তার বৌ এমনভাবে শাক ভাজছে যে তা দিয়ে ভাত মাখলে নবাবের হেঁসেলের পোলাও হার মানাবে। ধারালো ভাষা বা কাব্যের চাতুরী হরিদাস পালের সেই তুচ্ছ ইতিহাস ক্যাপচার করবে কী করে? 

আর এ'টা ভেবেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে হলে। ইউটিউবের জমানায়, এ যুগের হরিদাস পালদের তুচ্ছ ইতিহাস সাহিত্যে বা সিলেবাসে স্থান না পেলেও হারিয়ে যাবে না। আমাদের এ যুগের ইতিহাস স্রেফ ওই প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, যুদ্ধ, মিসাইলে আটকে থাকবে না। এলেবেলে যারা, যাদের জীবনগুলো এক্কেবারে স্কেল মেপে এবং ম্যাদামারা স্টাইলে চলে; তাদের দস্তাবেজও থেকে যাবে। উদাহরণ হিসেবে আমাদের অতি সহজ-সরল ফুড-ভ্লগগুলোই দেখুন। পাড়ার ইয়ারদোস্ত বা 'জুনিয়র' ছেলেমেয়েদের দল হাতে মোবাইল ক্যামেরা আর ইয়ারফোন নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। কেউ রানাঘাটের অনামা ভাতের হোটেলে বসে মাংসের ঝোল অর্ডার দিচ্ছে, এবং উপরি হিসেবে সে হোটেলের ম্যানেজার দাদার সঙ্গে জোর গপ্প জুড়ে ফেলছে। অথবা কেউ হরিদ্বারে পৌঁছে কোনও কচুরিওলার লম্বা ইন্টারভিউ রেকর্ড করছে। এই ভ্লগার, এই ভাতের হোটেলের ম্যানেজার, এই কচুরিওলা; এদের তো ইতিহাসের বইতে স্থান নেই। তবু এদের গল্প রয়ে যাচ্ছে অনন্তকালের পকেটে। মার্ক উইন্স সম্প্রতি বাংলাদেশ গেছিলেন, সে সাহেবের চোখ দিয়ে আমি চিনলাম সে দেশের এক চাকমা পরিবারকে। তাদের আমার চেনার কথা ছিল না। পাকিস্তানি ফুড ভ্লগার জিয়া তবারক ছিলেন তাই গুজরানওলার গুরুনানকপুরা স্ট্রিটের লস্যিবানিয়ে দাদা বা আরও কত সরলসিধে মানুষকে চিনে রাখি। 

আমার একটা  হঠকারী থিওরি হল, অপুর মত মানুষ পারত এই ইউটিউব নিংড়ে অতিপাতি মানুষের তুচ্ছ ইতিহাসে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে। আমরা অপূর্ব নই। তার রোম্যান্সের নাগাল পাওয়া আমাদের কম্ম নয়। কিন্তু আমরা সে তুচ্ছ ইতিহাসে ডুবতে না পারে, গোড়ালি ডোবানোর চেষ্টা করতেই পারি।

ডায়োজিনিস আর আলেকজান্ডার



বড় শখ জানেন। বড় সাধ। 

একদিন, ডায়োজিনিসের মত ঘ্যাম নিয়ে আমি লেতকে পড়ে থাকব। চারদিকে বিস্তর হৈহল্লা, তুমুল ফুর্তি, আনন্দের বন্যা। এ ওকে জড়িয়ে ধরছে, ও একে হাই-ফাইভ অফার করছে, টেবিল কাঁপানো আড্ডা বসেছে। ও'দিকে ডায়োজিনিস-ঘ্যামে, আমি সোফায় হাত পা ছড়িয়ে আধশোয়া।  মুখে গুনগুন, তৃপ্তিতে বুজে আসা চোখ। যাবতীয় চিৎকার চ্যাঁচামেচি গলাগলি আবদার আমার গায়ে বাউন্স করে ফিরে যাচ্ছে। বন্ধুরা গপ্প ফাঁদতে আসবে, আমি বলব "রোককে ভায়া রোককে। মেডিটেশন মোডে রয়েছি"। পড়শিরা গসিপ করতে আসবে, আমি আঙুলের ইশারায় বলে দেব, "বাদ মে আইয়ে জনাব"। সবাই সেই ডায়োজিনিস-আমিকে দেখে বলবে "কী জিনিস রে ভাই"। 

এমন সময় ঘ্যাম-শিরোমণি সম্রাট-শ্রেষ্ঠ শ্রী শ্রী আলেকজান্ডার উত্তমকুমারিও হাসি হেসে আমার সোফার দিকে এগিয়ে আসবেন। মেজপিসে যে মেজাজে বৃষ্টির দিনে ফুলুরি খাওয়ান, আলেকজান্ডারবাবু তার চেয়েও সহজে বখশিশ বিলিয়ে বেড়ানো মানুষ। রাজ্য চাইলে রাজ্য, রাজকন্যে চাইলে রাজকন্যে। তুষ্ট করতে পারলেই হল। আলেকজান্ডারবাবুকে এগিয়ে আসতে দেখে বন্ধুরা ভাববে, এ'বার এই ডায়োজিনিস ব্যাটার ঘ্যাম-ঘুম ভাঙবেই। প্রতিবেশীরা চিল্লিয়ে উঠবে, "এ'বারে বাবুটি সোফা ছেড়ে উঠবেই। আলেকজান্ডারের ঝিলিক দেখে যাবে গলে। এ'টা দাও ও'টা দাও বলে মারাত্মক দাঁও মারার তাল করবেই"।

গ্রেটস্য গ্রেট আলেকজান্ডার এসে দাঁড়াবেন সোফার সামনে। বিশ্বজয় করা আওয়াজ দিয়ে চমকাতে চাইবেন, "এই যে ব্রাদার, হিয়ার আই অ্যাম। কী চাই? মুখ ফুটে যাই চাইবে, পাবে। মাইরি। কী চাই, অ্যাঁ? কেরিয়ার পালটে দেওয়া সুযোগ? না লটারিতে পাওয়া মিক্সার গ্রাইন্ডার? নাকি পরশপাথর,? না গানের গলা? না মার্গো সাবানের সুপারসেভার প্যাক? নোবেল প্রাইজ চাই? তাও হবে। নাকি ভোটে জিততে মন চাইছে"? এ'সব প্রশ্ন ভাসিয়ে দিয়ে, নিজের আদ্দির পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াবেন আলেকজান্ডার। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিখুঁত রিং ছাড়তে ছাড়তে আমায় করুণা দৃষ্টি দিয়ে জরীপ করবেন। শিস দিয়ে ধরবেন সলিল চৌধুরী। 

তারপর ফের বলে উঠবেন, 
"ভাই ডায়োজিনিস, লজ্জা কীসের। এই তো বাম্পার সুযোগ। মন খুলে চেয়ে নাও দেখি। তোমার ন্যাতানো হাবভাব আমার পছন্দ হয়েছে। হৈহল্লায় হাঁপিয়ে উঠছিলাম কিনা। তাই বলছি। চিন্তার কিস্যু নেই। চেয়ে ফেলো। মনঃপ্রাণ খুলে"। 

সোফা-মগ্ন আমি ঘাড়ের অ্যাঙ্গেল সামান্য পালটে নিয়ে আলেকজান্ডারের দেবতার মত মত উজ্জ্বল চেহারাটার দিকে তাকাব। বলব, "চেয়ে ফেলব? চেয়ে ফেলব কী"?

সিগারেটে একটা মোক্ষম টান দিয়ে আলেকজান্ডার বলবেন "চেয়েই দেখো না। আলেকজান্ডারের কথা হেরফের হলে পৃথিবী রসাতলে যাবে"। এরপর পকেট থেকে একটা পান বের করে মুখে দেবেন, জর্দার মনমাতানো সুবাসে ঘর মাতোয়ারা হবে। 

আবারও বলব, "ভেবেই দেখুন, পরে আবার রিফিউজ করবেন না যেন"।

আলেকদাদার আশ্বাস; "আহ্‌। বললাম তো ডায়োজিনিস ভাইটি। চাও। ডিম্যান্ড করো। ক্যুইক"। 

এ'বার আমার পালা হাইভোল্টেজ উত্তম-হাসিতে নিজেকে মুড়ে নেওয়ার। ডায়োজিনিস-কেতায় আমি বলে উঠবো, "স্যার, ডিমান্ডটা ফেলবেন না প্লীজ। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাতির স্যুইচটা বন্ধ করে যাবেন। ইলেকট্রিকের বাতি আমেজে একটু খোঁচা দিচ্ছে বটে। আর পারলে তার আগে ওই ফ্রিজ থেকে একটা জলের বোতল  বের করে আমার হাতের কাছে দিয়ে যান। এ'বেলাটা তা'হলে আর না উঠলেও হবে। দ্যাট ইজ অল"। এই বলে আমি গা আরও খানিকটা এলিয়ে নিয়ে ফের চোখ বুজব। 

তালেবর আলেকজান্ডার ততক্ষণে থ। পান চিবুনো থেমে গেছে। এ যেন দক্ষিণপাড়ার বালক সঙ্ঘ ক্লাবের ক্যারমখোরদের কাছে তার সৈন্যদল ইনিংস ডিফীট খেয়েছে। দু'একবার আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবেন। কিন্তু সম্রাটের মুখ দিয়ে টু-শব্দটি বেরোবে না। খানিকক্ষণ অসহায় ভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারী করে, ফ্রিজ থেকে জলের বোতল বের করে আমার সোফার পাশে রেখে রণেভঙ্গ দেবেন রাজাধিরাজ। আমার প্রতি অন্তত বাহাত্তরটা সেলাম ঠুকবেন, তবে মনে মনে। রুম থেকে বেরোনোর আগে স্যুইচ বোর্ডে হাত রেখে আর একবার আমার দিকে তাকিয়ে সেই বিশ্বজয়ী বলবেন, " আলেকজান্ডার হয়ে ছাই করলামটা কী! এমন নির্লোভ হতে পারলাম না কেন?আমি ডায়োজিনিস হতে পারলাম না কেন"?

বড় শখ জানেন। বড় সাধ; জীবনে একটিবার অন্তত এমন ডায়োজিনিস-ঘ্যাম নিয়ে জীবনের কোনও একটি আলেকজান্ডারিও বখশিশের অফার উড়িয়ে দেব। একটিবার অন্তত সে ঘ্যাম যেন স্পর্শ করতে পারি।

(আলেকজান্ডার-ডায়োজিনিসের মোলাকাতের ওপর যে উইকিপিডিয়া এন্ট্রি, সে'টার লিঙ্ক কমেন্ট সেকশনে দেওয়া রইল। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন)