বিনোদবাবু অতশত কিছুই কোনোদিন বুঝতেন না। কেরানী মানুষ, পড়াশোনা বলতে বিকম পাস; অনার্সটুকুও ধরে রাখতে পারেননি। বাজারে ন্যালাক্যাবলা মার্কা একটা 'ইমেজ' চিরকাল রয়েই গেল। বিনোদবাবুর ধারণা সে'জন্যই বিয়েথা-সংসার ব্যাপারগুলো হয়ে উঠলো না কোনোদিন।
প্রতিবেশি অঙ্কের মাস্টার সুবল চ্যাটুজ্জ্যে মাঝেসাঝে এসে গপ্প জমাতেন, সম্ভবত বিনোদবাবুর মত ফ্যালফ্যাল চোখে গপ্পগেলা মানুষ খুব বেশি জোটে না বলেই আসতেন। সুবলবাবুর গপ্প বলার স্টাইল বিনোদবাবুরও বেশ লাগত। বিজ্ঞানের কত কিছু নিয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে পারতেন ভদ্রলোক। সে'সবের বারোআনা বিনোদবাবুর বোধগম্য হত না। বছরখানেক আগে বদলি হওয়া সুবলবাবু পরিবারসহ মুঙ্গেরে চলে যান। যাওয়ার আগের দিন বিকেলে মনোরম গপ্প জমিয়েছিলেন, বিনোদবাবু ভেজেছিলেন শিঙাড়া।
"আপনি ড্রেক ইকুয়েশনের খবর রাখেন বিনোদবাবু"?
"ড্রেক? কই না তো"।
"আমরা কি একা"?
"ইয়ে, আমি তো একাই"।
"আপনার একাকিত্বের কথা বলছি না। আমি বলছি এ পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কথা। মহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা? ব্রহ্মাণ্ডের কোনে কোণে কোথাও কি কোনো ইন্টলিজেন্ট এলিয়েন সিভিলাইজেশন নেই? তেমন ব্যাপার থাকার সম্ভাবনা ঠিক কতটা? সেই সম্ভাবনা অঙ্ক কষে বের করতে যে ফর্মুলা দরকার সে'টাই হলো ড্রেক ইকুয়েশন"।
বিনোদবাবুর ধোপার হিসেবের মলাট-ছেঁড়া ময়লা নোটবইটা টেনে নিয়ে খসখস করে একটা হিজিফর্মুলা লিখে দিয়েছিলেন সুবলবাবু।
N = R* × fp × ne × fl × fi × fc × L
(৩৬)
এন হলো গিয়ে কতগুলো মহাজাগতিক সভ্যতার অস্তিত্ব আছে। বাকিগুলো কোনটা কী সবই ভুলে মেরে দিয়েছেন। ব্র্যাকেটে লেখা ছত্রিশটা কী জিজ্ঞেস করায় সুবলবাবু বলেছিলেন তাঁর ধারণা এন ইজ ইকুয়াল টু ৩৬। কেন তাঁর এমনটা মনে হয় তার কোন সদুত্তর না দিয়ে শিঙাড়ায় মনোনিবেশ করেছিলেন ভদ্রলোক।
সুবলবাবুরা চলে যাওয়ার হপ্তাখানেক পর থেকে সেই নোটবুকের মলাট আপনা থেকে নতুন হয়ে উঠতে শুরু করে। ছেঁড়া মলাট গোটা হয়ে যায়, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া রঙ ফেরত আসে। পাতাগুলোর হলদেটে ভাব কেটে গিয়ে টাটকা সাদা রঙ লাগে। এমন কী ধোপার হিসেবের সমস্ত বানানভুলগুলো আপনা থেকে শুধরে যেতে শুরু করে। ব্যাপারটা ভারি মনোগ্রাহী মনে হওয়ার সে নোটবইটাকে টেবিল থেকে সরিয়ে বইয়ের তাকে কথামৃতের পাশে রাখেন।
বিনোদবাবু আরও একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন, সে ফর্মুলার নীচে ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা ৩৬ সংখ্যাটা আপনা থেকেই কমতে থাকে। দু'হপ্তা আগে প্রথম খেয়াল করেন সংখ্যাটা ৩৬ মুছে গিয়ে ৩৩য়ে দাঁড়িয়েছে। এইভাবে কমতে কমতে গতকাল ঠেকেছিল ৩-য়ে।
আজ সন্ধে সাতটা নাগাদ যখন কারেন্ট গ্যালো, অন্ধকারটা যেন একটু বেশি গাঢ় মনে হলো। এমনিত্ব রোজ কারেন্ট গেলে পাড়ার ছেলেছোকরাদের হইহই কানে আসে। আজ নিশ্চুপ। অস্বস্তিকর ভাবে নিশ্চুপ। শুধু বইয়ের তাকের একটা কোণা উজ্জ্বল হয়ে আছে, কারণ ধোপার হিসেব লেখা নোটবইটা ফসফরাসের মত জ্বলছে। নোটবইটা নামিয়ে পাতা উল্টে বেশ খানিকটা অবাক হতেই হলো; বিনোদবাবু দেখলেন খাতার সমস্ত লেখা উবে গিয়ে পড়ে রয়েছে শুধু ড্রেক ইকুয়েশনটা। আর নীচের ব্র্যাকেটের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটা চোখ ধাঁধানো ১। কারেন্ট এসেছিল মিনিট দুইয়ের মাথায়। কিন্তু সে'দিন থেকেই বিনোদবাবু কোথায় হারিয়ে গেলেন কেউ জানলো না। সে সম্বন্ধে পাড়ায় কম থিওরি কপচানো হয়নি। পুলিশও হতভম্ব।
সুযোগ থাকলে মুঙ্গেরে একটা পোস্টকার্ড অবশ্যই পাঠাতেন বিনোদবাবু, সুবলবাবুকে জানাতেন; "আমি আর একা নই"।
No comments:
Post a Comment