Wednesday, September 9, 2026

হেস্টিটেস্টি


মুনিরকায় বছর দুই কেটেছে। সে দু'বছরের গুরুত্ব কুড়ির সমান। সে সময়ে জরুরী ইয়ারদোস্ত জুটেছে, রকমারি পাখনা গজিয়েছে এবং যথাযথ ভাবে ছাঁটা হয়েছে।

যা হোক, তখন ছাত্র। অতএব বারফট্টাই হতো হিসেব কষে। মাসে বারদুয়েক; বাড়তি দু'পয়সা জমলে আমরা যেতাম মুনিরকার ক্যাপিটল কোর্টের চাউমিন স্টল হেস্টিটেস্টিতে। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড অর্ডার ছিল হাফপ্লেট মিক্সড সিঙ্গাপুরি চাউমিন। সঙ্গে দিত অঢেল চিলি সস, টমেটো সস, ভিনিগার আর সোয়্যা সস। চাউমিনটা অবশ্য বেশ মশলাদার হত, দিল্লীর রাস্তার জমজমাট চাইনিজ ঠেলাগুলোয় যেমনটা পাওয়া যায় আর কী; তবে হেস্টিটেস্টির কোয়ালিটি তার এক দাগ ওপরেই থাকতো।

বছর কুড়ি পর মুনিরকা ফেরত গিয়ে সোজা গেছিলাম হেস্টিটেস্টিতে। আইন মেনে অর্ডার দিলাম হাফপ্লেট মিক্সড সিঙ্গাপুরি চাউমিন। চাকুরে বয়সের রোয়াব দেখিয়ে একটা কোকাকোলাও বলা হলো। কী অবাক কাণ্ড; এদ্দিনে গোটা দুনিয়া এস্পারওস্পার হয়ে যাওয়ার জোগাড় অথচ হেস্টিটেস্টির সিঙ্গাপুরি চাউয়ের স্বাদ সেই একই রয়ে গেছে, তার আদি জৌলুস এক ফোঁটাও কমেনি।

ইন্টারেস্টিং


- আপনি তেমন ইন্টারেস্টিং নন।
- দু'দিনের আলাপ। একটু ধৈর্য ধরুন ম্যাডাম। বলা যায় না, হঠাৎ জানতে পারলেন যে আমি আদতে ইন্টারগ্যালাকটিক স্পাই।
- ধুস। আপনার সেন্স অফ হিউমরও কেমন জানো।
- প্রথম আলাপেই আমার সেন্স অফ হিউমার ঠিক খোলতাই হয় না। ইনিশিয়াল ইনার্শিয়াটা একটু কাটতে দিন..।
- ইন্টারেস্টিং হতে আপনার সময় লাগবে। রসিক হতে আপনার সময় লাগবে। এত অপেক্ষা নিয়ে প্রেমের প্ল্যান করা যায় না।
- তা'হলে তো ভারি সমস্যায় পড়া গেলো। আড়াই মাস এই ডেটিং অ্যাপে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকে তবে এই ডেটের ব্যবস্থা করা গেছে। আপনি অমন উড়িয়ে দেবেন না প্লীজ।
- আপনি প্রেমিকসুলভ ঠিক কী কী করতে পারেন? কবিতা? গান? ফ্লার্ট?
- ফ্যান্টাস্টিক ডিম ভাজতে পারি জানেন। নেহাত আজ পর্যন্ত দুই পেরিয়ে তিন নম্বর ডেটে পৌঁছতে পারিনি। কাজেই বাড়ি ডেকে ডিমভাজাটা অফার করা হয়নি। ও জিনিস একবার চেখে দেখলে আপনি বুঝতেন কবিতা গান কতটা অদরকারি।

অমৃতের অফার


- বলছিলাম জ্যেঠু, আজ উঠি।
- উঠবি?
- হ্যাঁ, সোয়া বারোটা বাজে। এখনই না বেরোলে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সেই..।
- এই অবেলায় বেরোবিই বা কেন। বস না। দু'টো ভাত খেয়ে না হয়...।
- তোমার বিধুর হাতের ওই লপসি আমার রুচবে না জ্যেঠু। জাস্ট আড্ডা দিতেই এসেছিলাম। আর তোমার এই ওষুধগুলো পৌঁছে দিতে। আজ আবার বাড়িতে মা ফ্যান্টাস্টিক মেটে চচ্চড়ি রেঁধেছে, বুঝলে।
- গুপি, আমার লপসি তোকে খাওয়ালে তোর জ্যাঠাইমা স্বর্গ থেকে ঝ্যাঁটা হাতে নেমে এসে আমায় বেধড়ক পিটিয়ে স্ট্রেট নরকে যাবে। আমি তোকে অমৃত অফার করছি।
- মেটে চচ্চড়িকে টপকে?
- বিধুর হাতে মাখা আলুসেদ্ধ আর মাখনে চুপচুপ ফ্যানাভাত তোর মেটেচচ্চড়িককে কান ধরে ওঠবস করাবে।
বিকেলবেলা বেরোনোর আগে গুপি বিধুর পায়ের ধুলো নিয়ে বলেছিল, "গুরু, আমি ধন্য"।

সাত্ত্বিক


ওটস দিয়ে যে এত ভালো সোয়্যা বিরিয়ানি হয় তা এর আগে জানতাম না৷
আর রেওয়াজি সোয়্যা চাঙ্কসগুলোর ব্যাপারে কী বলি; স্বাদে টইটম্বুর এক্কেবারে।

একবার ভেবেছিলাম ডিম দেব। ভাগ্যিস তারপর মনে হলো যে তার চেয়ে ঢের বেশি জমবে কয়েক টুকরো জমাটি টোফু মিশিয়ে দিলে। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ।

উফ, যা হয়েছিল খেতে।
আজকের ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, টিফিন আর ডিনার সব বিরিয়ানি দিয়েই সেরে ফেললাম।

হাফ ডেকচি রেখে দিয়েছি, রোব্বারের লাঞ্চে কাজে লাগবে।
বাসি সোয়্যা বিরিয়ানি যে অমৃতসমান, এ কথা তো সবারই জানা।

বইমানুষ


কত মানুষ কত ভালো বই রেকমেন্ড করেছেন, ক্ষেত্রবিশেষে ঘাড় ধরে পড়িয়েছেন। কত ভালো বই অন্য ভালো বইয়ে নিয়ে গেছে। ভালো বইয়ের গল্পের মাধ্যমে নতুন আলাপ জমেছে; জুটেছে নতুন বন্ধু আর আরও নতুন বইয়ের গল্প। আর অল্পস্বল্প যতটা যা শেখা (এবং যতটুকু বখে যাওয়া) তার বেশিরভাগটুকুই গল্পের বইয়ে ভর দিয়ে।

যারা বই পড়িয়েছেন, বই উপহার দিয়েছেন, বইয়ের গল্প জুড়েছেন, এবং অমুক বই পড়িনি শুনে আঁতকে উঠে ধমক দিয়েছেন; তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সাজেশন/উপহার/আলোচনার মধ্যে দিয়ে কত সহৃদয় মানুষের মুখ কত প্রিয় বইয়ের মধ্যে চিরকালের জন্য মিশে গেছে। সে অর্থে, বুকশেল্ফ একটা মানুষের সংগ্রহও বটে।

বই-চেনানো মানুষজনকে তাই "হ্যাপি টীচার্স ডে" না বললেই নয়।
~~
ছবি: কলেজ স্ট্রিট অঞ্চল, ২০১০।

পুজো ও খেপচুরিয়াস

পুজো আসছে।
এ সময় "আর কি সে বয়স আছে রে ভাই" মার্কা হুহু বিচ্ছিরি ভাবে বেড়ে যায়৷
পুজোর বাজারে কচি ছেলেমেয়েরা ফুর্তি করছে দেখলেই খেঁকিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, "হ্যাঁ রে, তোদের পড়াশোনা নেই"?

এক-প্লেট-থেকে-বিরিয়ানি খাওয়া হাবুডুবু প্রেমিক-প্রেমিকা দেখলেই "বলি এসআইপি টেসআইপির ব্যাপারগুলো মাথায় আছে তো" বলে জ্ঞান দিতে মন চায়।

ইয়ারদোস্তের দল চপ-কাটলেট-বিরিয়ানির পুজো নির্ঘণ্ট তৈরি করছে দেখলেই মনে হয় দি এক ডোজ হেলদি লিভিং আর মিনিমালিজম নিয়ে একটা ছোটখাটো লেকচার।

চাদ্দিকে এত ফুর্তি জাস্ট সহ্য হয় না আর, বিশ্বাস করুন৷
নেহাৎই বাধ্য হয়ে পুরনো পূজাবার্ষিকীর দু'পাতা উলটে নিজের নার্ভ ঠাণ্ডা রাখতে হচ্ছে।

টিফিন


- হেহেখসখিউজ মি..। একটা অ্যাফিডাভিটটা টাইপ করানোর ছিলো..।
- এখন যে আমার টিফিন খাওয়ার সময়।
- টিফিন?
- বিকেলের জলখাবার। নাস্তা। যাই বলুন। অতএব মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতে হবে।
- ওহ। এ'দিকে ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট। লাঞ্চব্রেক হলে না হয় বুঝতাম কিন্তু টিফিনের ব্যাপারটা যদি..।
- মাত্র দু'টো কচুরি, অল্প আলুরদম। একটা দরবেশ। মিনিট কুড়িতেই..।
- না না। সে অনেকক্ষণ। আমি বরং আপনাকে কিছু বেশি টাকা দেব..।
- স্যার। এই টুয়েন্টি নাইনটিনে ঢাকুরিয়ার ফুটপাতে টাইপরাইটার নিয়ে বসে আছি। আপনার সত্যিই মনে হয়ে আমি বাড়তি টু-পাইসের দেমাকে দমে গিয়ে আমি কচুরিতে ঢিলেমো দেব? টিফিন যে বিকেল আর সন্ধের মধ্যের জরুরি ফালক্রাম মশাই! যাকগে, দু'পা এগোলেই মৌচাক, আপনি বরং দু'টো সন্দেশ খেয়ে আসুন গে। আমি ততক্ষণে টিফিনটা সেরে নিয়ে টেবিলে বসছি।

আপার বার্থ


- কিছুতেই লোয়ার বার্থটা পেলাম না। ধুর।
- আমার জন্য আপারই ভালো, প্রাইভেসি বেশি। তুমি খামোখা অত ভাবছ।
- সে তো তোমার কোনো কিছুতেই আপত্তি নেই মিনু৷ এতটা পথ একা যাবে..। দ্যাখো যদি কোনো প্যাসেঞ্জারকে বলেকয়ে...।
- উফ। জ্বালিয়ে মারলে। আচ্ছা শোনো, ফ্রিজে মাছ আছে। ঝোল বানাতে আলিস্যি লাগলে অন্তত ভাতের পাতে ভেজে নিও।
- এও কম জ্বালাতন নয়। শেষে অদ্দূরে বসে থেকে মাইক্রো ম্যানেজ করবে নাকি মিনু? আমি কালিয়া রেঁধে তোমায় ছবি পাঠাবো। যাক গে, খেয়াল রেখো; ফোনটোন আবার ডিসচার্জ যেন না হয়। এ ট্রেনের তো যা জানি সবই পুরনো কামরা, সকেটটকেট ঠিক মত চলছে কিনা..।
- দু'টো বাজে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
- চটপট বলে ফেলো। গাড়ি ঢুকছে৷
- এক, তোমার কান মুলে দেওয়া উচিৎ।
- দুই?
- আমায় তুমি কখনও একটা চিঠি লিখবে ভুতো?

চানাচুর কবি

"ভাগ্নে, আমায় তুই মাতাল ঠাউরেছিস নাকি? ভাবছিস টং হয়ে বেহেড হতে আমি অলিপাবে আসি? রাবিশ! তা'হলে বলবো এমন হাইক্লাস মামাকে তুই আদৌ চিনতে পারিসনি।

কেউ কি বানান শেখার জন্য কবিতার বই কেনে রে? লোকে কবিতার বই কেনে প্রেমের হাবুডুবু সামাল দেওয়ার জন্য; এলিভেটেড হওয়ার জন্য। মানছি, মানছি আমার সামনে ভডকার গেলাসটা জাস্ট জ্বলজ্বল করছে! মানছি আমি মুঠো মুঠো ফিসফিঙ্গার উড়িয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমার এখেনে আসার আদত টান কিন্তু এই চানাচুরের বাটিতে, বুইলি? ওই চানাচুরের বাটি ইকুয়ালটু প্রেম। আরে মদফদ তো জাস্ট চাখনা, মোটা দাগের ব্যাপার; ও'টা যাকে বলে ক্যানভাস, বুইলি কিনা! তুলির আঁচড় হলো এই চানাচুর।

কী, বুইলি"?

এগরোল উবাচ


- বলছিলাম, এগরোল খাবে নাকি মিতুল?
- না!
- অমন তিরিক্ষি 'না' বলার কী দরকার। এগরোল ব্যাপারটা খুব ভালোজিনিস কিন্তু...।
- রাগে আমার গা রিরি করছে জাস্ট।
- আমাদের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে জানি। কিন্তু তা'বলে সে রাগ এগরোলের ওপর আবার ঝাড়া কেন।
- এ'রকম একটা বেআক্কেলে মানুষের পাল্লায় পড়ে আমার জীবনটা জাস্ট...।
- আক্কেলের ব্যাপারটা ডিনাই করছি না। তবে এগরোলে শুনেছি নানা রকমের বিষ ডায়লুট হয়ে যায়।
- তবে আর কী। দু'জনে মিলে এগরোল গিলি আর তাতেই সমস্ত সমস্যা উবে যাক!
- না তা হবে না জানি। তবে আজ ঝগড়ায় এত ব্যস্ত থেকেছি দু'জনে যে লাঞ্চটাও ঠিক মত...।
- গিলতে হয় তুমি গেলো না! এগরোল চাউমিন মোগলাই চপ কাটলেট যা পারো গেলো।
- না না। এই অবেলায় অত কিছু খেলে আবার গোলমাল হয়ে যাবে। আমি বরং এগরোলই বলি দু'টো। সে'টা খাওয়া হয়ে গেলে না হয় আবার ঝগড়ায় ফেরা যাবে। কেমন? পেটে কিছু পড়লেই দেখবে ঝগড়ার মধ্যেও একটা অপটিমিজম খুঁজে পাওয়া যাবে।
- আমার জাস্ট তোমার কোনো কথা সহ্য হচ্ছে না।
- তাই তো বলছি। রোল বরং সইবে। তা, রোলদাদা, আপনি দু'টো এগরোল বানান। হ্যাঁ, দুটোই ডবল। একটা যেমন-তেমন হলেই হলো। কিন্তু অন্যটা একটু স্পেশ্যাল বানাবন, কেমন? মিতুলের ঝাল সহ্য হয় না, সো নো কাঁচালঙ্কা প্লীজ। তবে সামান্য একটু গোলমরিচ ছড়িয়ে দেবেন। শসাও দেবেন ওর রোলে, কেমন? তবে ওয়ান ইজ টু থ্রি রেশিওতে শসা-পেঁয়াজ। ও হ্যাঁ, কোনো সস নয়। বিটনুন এক দাগ বেশি। প্লাস লেবুর রস একটু; তবে প্লীজ - ফ্রেশ কাটা লেবু। বেচারির মারাত্মক ভোগান্তি গেছে গোটাদিন, মরা লেবু কচলে দেবেন না ওর রোলে। প্লীজ। আমারটা যেমন-তেমন হোক, আমি তো ঘাসও সস দিয়ে চিবিয়ে খেতে পারি। কিন্তু ওর রোলের ডিমটা যদি কাইন্ডলি একটু নরম আঁচে ভাজেন। কেমন? বাহ্। রোলদাদা, আপনার আশ্বাসে আমি একটু নিশ্চিন্ত বোধ করছি।
- বলছি..।
- কিছু বলছ মিতুল?
- তোমার তো আবার রক্তারক্তি ঝাল না হলে চলে না। ওঁকে বলো আমার শেয়ারের কাঁচালঙ্কা কুচিটুকু যেন তোমার রোলে এক্সট্রা ছড়িয়ে দেয়। আর সস যেন তোমারটাতেও না দেয়, ওই একটা জিনিসে ভেজাল মিশেলের চান্স খুব হাই।
- অফ কৌর্স অফ কৌর্স। তা রোলদাদা, শুনলেনই তো। মিতুল যেমনটা বলেছে, তেমনটাই আইডিয়াল। কেমন? ঠিক হ্যায়? ব্যাস, এই যে আপনি ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন; আর আমার কোনো চিন্তা রইল না।

ড্রেক


বিনোদবাবু অতশত কিছুই কোনোদিন বুঝতেন না। কেরানী মানুষ, পড়াশোনা বলতে বিকম পাস; অনার্সটুকুও ধরে রাখতে পারেননি। বাজারে ন্যালাক্যাবলা মার্কা একটা 'ইমেজ' চিরকাল রয়েই গেল। বিনোদবাবুর ধারণা সে'জন্যই বিয়েথা-সংসার ব্যাপারগুলো হয়ে উঠলো না কোনোদিন।

প্রতিবেশি অঙ্কের মাস্টার সুবল চ্যাটুজ্জ্যে মাঝেসাঝে এসে গপ্প জমাতেন, সম্ভবত বিনোদবাবুর মত ফ্যালফ্যাল চোখে গপ্পগেলা মানুষ খুব বেশি জোটে না বলেই আসতেন। সুবলবাবুর গপ্প বলার স্টাইল বিনোদবাবুরও বেশ লাগত। বিজ্ঞানের কত কিছু নিয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে পারতেন ভদ্রলোক। সে'সবের বারোআনা বিনোদবাবুর বোধগম্য হত না। বছরখানেক আগে বদলি হওয়া সুবলবাবু পরিবারসহ মুঙ্গেরে চলে যান। যাওয়ার আগের দিন বিকেলে মনোরম গপ্প জমিয়েছিলেন, বিনোদবাবু ভেজেছিলেন শিঙাড়া।

"আপনি ড্রেক ইকুয়েশনের খবর রাখেন বিনোদবাবু"?
"ড্রেক? কই না তো"।
"আমরা কি একা"?
"ইয়ে, আমি তো একাই"।
"আপনার একাকিত্বের কথা বলছি না। আমি বলছি এ পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কথা। মহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা? ব্রহ্মাণ্ডের কোনে কোণে কোথাও কি কোনো ইন্টলিজেন্ট এলিয়েন সিভিলাইজেশন নেই? তেমন ব্যাপার থাকার সম্ভাবনা ঠিক কতটা? সেই সম্ভাবনা অঙ্ক কষে বের করতে যে ফর্মুলা দরকার সে'টাই হলো ড্রেক ইকুয়েশন"।

বিনোদবাবুর ধোপার হিসেবের মলাট-ছেঁড়া ময়লা নোটবইটা টেনে নিয়ে খসখস করে একটা হিজিফর্মুলা লিখে দিয়েছিলেন সুবলবাবু।
N = R* × fp × ne × fl × fi × fc × L
(৩৬)
এন হলো গিয়ে কতগুলো মহাজাগতিক সভ্যতার অস্তিত্ব আছে। বাকিগুলো কোনটা কী সবই ভুলে মেরে দিয়েছেন। ব্র্যাকেটে লেখা ছত্রিশটা কী জিজ্ঞেস করায় সুবলবাবু বলেছিলেন তাঁর ধারণা এন ইজ ইকুয়াল টু ৩৬। কেন তাঁর এমনটা মনে হয় তার কোন সদুত্তর না দিয়ে শিঙাড়ায় মনোনিবেশ করেছিলেন ভদ্রলোক।

সুবলবাবুরা চলে যাওয়ার হপ্তাখানেক পর থেকে সেই নোটবুকের মলাট আপনা থেকে নতুন হয়ে উঠতে শুরু করে। ছেঁড়া মলাট গোটা হয়ে যায়, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া রঙ ফেরত আসে। পাতাগুলোর হলদেটে ভাব কেটে গিয়ে টাটকা সাদা রঙ লাগে। এমন কী ধোপার হিসেবের সমস্ত বানানভুলগুলো আপনা থেকে শুধরে যেতে শুরু করে। ব্যাপারটা ভারি মনোগ্রাহী মনে হওয়ার সে নোটবইটাকে টেবিল থেকে সরিয়ে বইয়ের তাকে কথামৃতের পাশে রাখেন।

বিনোদবাবু আরও একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন, সে ফর্মুলার নীচে ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা ৩৬ সংখ্যাটা আপনা থেকেই কমতে থাকে। দু'হপ্তা আগে প্রথম খেয়াল করেন সংখ্যাটা ৩৬ মুছে গিয়ে ৩৩য়ে দাঁড়িয়েছে। এইভাবে কমতে কমতে গতকাল ঠেকেছিল ৩-য়ে।

আজ সন্ধে সাতটা নাগাদ যখন কারেন্ট গ্যালো, অন্ধকারটা যেন একটু বেশি গাঢ় মনে হলো। এমনিত্ব রোজ কারেন্ট গেলে পাড়ার ছেলেছোকরাদের হইহই কানে আসে। আজ নিশ্চুপ। অস্বস্তিকর ভাবে নিশ্চুপ। শুধু বইয়ের তাকের একটা কোণা উজ্জ্বল হয়ে আছে, কারণ ধোপার হিসেব লেখা নোটবইটা ফসফরাসের মত জ্বলছে। নোটবইটা নামিয়ে পাতা উল্টে বেশ খানিকটা অবাক হতেই হলো; বিনোদবাবু দেখলেন খাতার সমস্ত লেখা উবে গিয়ে পড়ে রয়েছে শুধু ড্রেক ইকুয়েশনটা। আর নীচের ব্র্যাকেটের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটা চোখ ধাঁধানো ১। কারেন্ট এসেছিল মিনিট দুইয়ের মাথায়। কিন্তু সে'দিন থেকেই বিনোদবাবু কোথায় হারিয়ে গেলেন কেউ জানলো না। সে সম্বন্ধে পাড়ায় কম থিওরি কপচানো হয়নি। পুলিশও হতভম্ব।

সুযোগ থাকলে মুঙ্গেরে একটা পোস্টকার্ড অবশ্যই পাঠাতেন বিনোদবাবু, সুবলবাবুকে জানাতেন; "আমি আর একা নই"।

ফুলটুল



খুব ভুল বয়সে ফুল দেখে থমকে দাঁড়াতে শিখেছি। ফুল চেনার, বোঝার ও অ্যাপ্রিশিয়েট করার অর্গানিক বয়েস চলে গেছে। এখন এই বয়সে এসে শুধু, "কী সুন্দর, তাই না" বলে হাঁদার মত ড্যাবডেবিয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। এ'দিকে ধান্দাবাজিস্ট হয়েও; প্রবল অদরকারে দশ-বারো সেকেন্ডের জন্য দাঁড়িয়ে বোগেনভিলিয়া দেখছি, অচেনা ফুল দেখে "আইব্বাস" বলছি, সবচেয়ে বড় কথা ফুল দেখলেই সে জিনিস বেসনে ভেজে খাওয়া যায় কিনা ভেবে হদ্দ হচ্ছি না।

টু কোট রবি ঘোষ; "ভাবা যায়? ভাবা যায় না মাইরি"।
প্রিসেনিলিটি বলে কোনো ব্যামো আছে কি?

মধুময়ের খেল

চমৎকার ভাবে রাতটা জেগে কাটালেন মধুময়। রাত জাগার একটা মস্ত সুবিধে হলো ভোরের দিক থেকেই একটা টিপটিপ মাথা ব্যথা থাকে, তা'তে হয় কী শরীর নেতিয়ে পড়লেও মনের মধ্যে একটা মৃদু চনমন থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমানুপাতিক ভাবে মাথা ব্যথাটা চড়চড়িয়ে বাড়বে; টিপটিপ থেকে ঢিপঢিপ হতে দমাসদমাস শুরু হবে। ঠিক তখন দরকার হবে একটা কড়া কফি আর আড়াই মিনিটের পায়চারীর। এ'সব টোটকা সব মধুময়ের নখদর্পণে। আর কেউ না জানুক, মধুময় বিলক্ষণ জানেন যে দমাসদমাস মাথাব্যথাকে ডিঙিয়ে একের পর এক ফাইল ক্লীয়ার করার মধ্যে একটা মারাত্মক থ্রিল রয়েছে। আলেকজান্ডাররা সিন্ধুনদ দেখে 'ওরেব্বাবা, এ পেরোনোর উপায় নেই তার চে' চলো দেশে ফিরে যাই' বলে ফেরত যান না। সিন্ধু সমান মাথাব্যথা পেরিয়ে রেরে শব্দে ফাইলসাফ করাটা মধুময়বাবুর কাছে এক আলেকজান্ডারিও খেল।

এখন ভোর (প্রায়) ছ'টা। মধুবাবুর চোখ লাল, ভোরের সূর্যের সঙ্গে মানানসই। ঘণ্টাদুয়েক আগে পর্যন্ত চোখদুটো ঘুমের ভারে পর্যুদস্ত ছিল। এখন তারা চাঙ্গা। চট করে এক কামরার ঘরে ফিরে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডের নীল-কালো পোশাক ছেড়ে একটা জবরদস্ত স্নান, মার্গো সাবান আর প্যারাশুট নারকোল তেলসহ। তারপর দু'টো হাতরুটি বানিয়ে বাসি আলুভাজার সঙ্গে সাবড়ে দেওয়া। আর সবশেষে সেঁধিয়ে যাওয়া সাদ হাফ শার্টের কেরানী-কবচে।

সানশাইন কন্সট্রাকশন প্রোজেক্ট জানে না যে মন্ডল অ্যান্ড ডেভিডের পারচেজ ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ক্লার্কের নাম মধুময় সাহা। জানলে সাদা কলারের চাকুরেকে এ কাজ তারা দিত না। তেমনি, মন্ডল অ্যান্ড ডেভিডের কোনো শর্মাও কোনোদিনও জানবে না যে সানশাইন কন্সেন্ট্রেশনের সিকিউরিটির টীমের নাইট শিফটে যে নতুন বদলি গার্ড জয়েন করেছে তাঁর নামও মধুময় সাহা। জানলে মধুময়কে এই সাতবছরের ফাইলঠেলা চাকরিটা খোয়াতে হত। ও'দিকে ছ'শো মাইল দূরের বাড়ির লোকজন জানে যে আচমকা কোনো এক মন্ত্রবলে মধুময়বাবু মাসশেষে কিছু টাকা বাড়তি ট্রান্সফার করতে শুরু করেছেন। কোনো মাসে সাত হলে কোনো মাসে দশ হাজার।

সুপারম্যান না সুপারভিলেন?
ঠিক ঠাহর করতে পারেন না গোপন মুনলাইটার মধুময়।

গুল টিপস

প্লীজ। পইপই করে বলছি।
রিকুয়েস্ট করছি। প্লীড করছি।

ছোট গুল দেবেন না। আর হ্যাঁ, গুল শুধু আকাশছোঁয়া হলে হবে না, আকাশ ফুঁড়ে বেরোতে হবে। তার ভারে পৃথিবীকে টলে যেতে হবে।

"আসলে হয়েছে কী" বলে মিনমিন না করে "ট্রায়াসিক যুগের একটা ঘটনা বলি তবে" বলে শুরু করুন।

"কোহলি মনে হয় না ফর্মে আছে" কোন আপদে বলে? চশমার (নিজের না হলে অন্যেরটা ধার নিয়ে) ডাঁটি চিবিয়ে বলুন "সোর্সটা একটু হাইপ্রোফাইল তাই রিভীল করতে পারব না। তবে আদত খবর হচ্ছে যে বিরাটের মনে শান্তি নেই, ভিগান ডায়েটটা নাকি ওরা মেন্টাল স্পেসে বেশ বড় একটা ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে"।

গা ম্যাজম্যাজ তাই বেরোতে পারছেন না, সে'টা কোনো কাজের কথা নয়। পিডিএফে একটা স্ক্যান করা তিব্বতি পুঁথি পড়ে একটা "অ্যাডভান্সড তান্ত্রিক ইয়োগা প্রসিডিওর ট্রাই" করতে হবে তাই দু'দিন বেরোনো সম্ভব নয়।

রীলে দেখা জ্ঞান ঝাড়লে ঝাড়ুন কিন্তু প্রিফিক্স হিসেবে বলতেই হবে "এদ্দিন পড়শোনা তো কম করলাম না এই সাবজেক্টে। সতেরো বছর আগে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে এক পোর্তুগিজ রিসার্চারের বই ঘেঁটে কী জেনেছিলাম সে'টা আগে বলি.."।

আর মনে রাখবেন। বর্ধমান (বা মিরাট বা যশোর বা হলদিয়া) শহরটা আপনার দিব্যি লাগে সে'টা আদ্যোপান্ত নিরামিষ সেন্টিমেন্ট। স্টেপ আউট করুন। গলায় একদলা আবেগ নিয়ে শুধোন, "বার্ডওয়ানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি আজকের রে পাগলা"?

জলে


- বৃষ্টি থামছে না রে।
- থামছে না রে দাদা। জাস্ট থামছে না।
- ইন্টেনসিটিও কমার নাম নেই।
- নাম নেই। কমার নাম নেই।
- আলুপটল আনতেও ভিজেকাক হতে হচ্ছে। অফিস যাতায়াতের কথা আর কী বলব।
- কিছুই বলার নেই।
- খাটের ওপর দিয়ে নাইলের দড়ি, তার ওপরে ভেজা জামা। পাখা পাঁচে চালিয়েও শুকোনোর নাম নেই। ও'দিকে গেঞ্জিজাঙ্গিয়া ইস্তিরি দিয়ে শুকোতে হচ্ছে।
- মুকুট পড়িল পদতলে ইত্যাদি।
- হুঁ হুঁ তো করছিস। কিন্তু যথেষ্ট ভেঙে পড়ছিস না কেন? যৌবনের একটা মহামূল্যবান শনিবারের ছুটি খাটে শুয়ে নষ্ট করছিস। ক্লাবে গিয়ে ক্যারম খেলতে পারছিস না। বুবলার চায়ের দোকানে বসে পলিটিকাল পিএনপিসি করতে পারছিস না, এতে কি ইউথ ওয়েস্ট হচ্ছে না?
- তোমার ইউথ নি:সন্দেহে ওয়েস্ট হচ্ছে।
- ওহ তুই তো ক্যারেমে চায়ের দোকানে থাকিস না। তোর শনিবারের কী মূল্য।
- সুমি বৃষ্টি ভেজা নয়নতারার ডেসক্রিপশন মেসেজে টাইপে করে জানিয়েছে। মিসমিদের কবচ আবার পড়ছি। অতএব শনিবার গোটাটাই জলে গেল সে'টা বলা যাচ্ছে না।
- নয়নতারা? তাকে বেসনে চুবিয়ে ভাজা যায় রে শুভ?
- কথাটা সুমিকে জিজ্ঞেস করা গর্হিত হবে বোধ হয়। আন্দাজে বলতে পারি তেমনটা আজ পর্যন্ত কেউ চেষ্টা করেনি।
- তবে বৃথা। সুমির এসএমএস, তোর ধমনীর তাজাতরুণ রক্ত, সবই জলে।
- জলে। জলে। জলে।

চোরাইমাল


- কী চাই?
- হ্যাঁ?
- অবাক হচ্ছ কেন। তুমি মিনিট পনেরো ধরে সদর দরজার সামনে ঘুরঘুর করছো তো। কে তুমি? কী চাই?
- আমি..আমি শুভ..।
- বেশ। শুভ, কী চাই?
- আমার..আমার..চাই বলতে..।
- চাঁদা চাইতে এসেছ?
- চাঁদা? পুজোর তো অনেক দেরি।
- দেরি আর কই। আর তো এই ধরো..। যাক গে। তা তুমি কী দরকারে ঘুরঘুর করছ? আমার জানা দরকার।
- ওহ। হ্যাঁ। মানে। ভুলে।
- ভুলে তুমি আমাদের দরজার সামনে ছুঁকছুঁক করছিলে?
- আসলে হয়েছে কী..।
- গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলে। বাগান পেরিয়ে দরজা পর্যন্ত এলে। ভুলে?
- না তেমনটা ঠিক নয়। মানে ঠিক ভুল বলা ভুল হবে। আসলে আপনাদের দরজার পাল্লাটা মনে হলো আদত বার্মা টীকের। জিনিসটা আজকাল এত রেয়ার...।
- তুমি কি সুমির ক্লাসমেট?
- সুমি? কে সুমি?
- সুস্মিতার ক্লাসমেট তুমি? সে তার পিসির সঙ্গে বাজারে গেছে।
- সুস..সুস্মিতা..কই..কই না তো। আমি তাকে চিনি না। এই প্রথম ওই নামটা শুনলাম।
- আমি সেই অচেনা সুমির কাকা।
- ওহ। আচ্ছা। তা'হলে আমি আসি। বিউটিফুল দরজার পাল্লা আপনাদের। নাইস। আসি?
- তা শুভ, দরজার পাল্লা দেখে বেড়ানোটা কি তোমার হবি?
- না না। আসলে আজ হয়েছে কী..।
- যদিও তুমি সুমিকে চেনো না। তবু আমি মনের ভুলে তোমার জানিয়ে রাখি যে সে কিন্তু কিছুতেই যেতে চাইছিল না। কিন্তু তার পিসি এমন জোর করলে। বেচারি না করতে পারলে না। কোনো অজুহাতেই পিসিকে ঠেকাতে পারলে না। আমার দিদিটি বড্ড ঢিঁট।
- ওহ। আমি অবশ্য..।
- সুমিকে চেনো না।
- আমি এখন আসি স্যার...।
- এসো।
- আসি?
- এসো শুভ।
- না মানে, আপনি হাতটা না ছাড়লে..।
- ওহ। এসো।

***

- সুমি। শুভ বলে কাউকে চিনিস?
- শু..।
- শুভ।
- কই না! প্রথম শুনছি ও নামটা।
- আমারও তাই মনে হলো। নামটা এত রেয়ার। যাক গে। বাদ দে। এক কাপ চা বানাবি?
- বানাই। কিন্তু..হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞেস করার কী মানে?
- আমার পকেটমারি কেরিয়ারে দ্বিতীয় মক্কেল। এর আগে এদ্দিন শুধু দাদার পকেট থেকে সিগারেট মেরেছি। আজ শুভ বলে এক ছোকরার পকেটমেরে চিঠি হাতিয়েছি। তাই বেশ চনমনে বোধ করেছি।
- মানে..আমি..বুঝতে পারছি না..।
- এলাচ দিয়ে চা বানাস সুমি। এমন মিষ্টি বৃষ্টির বিকেলে ভাল চা না পেলেই নয়। আমি না হয় পেঁয়াজি ভাজবো।
- কোন চিঠি? না মানে আমি যদিও শুভটুভ কাউকে..।
- চিনিস না। জানি। তবে একজনের পকেটমারা চিঠি। চোরাইমাল এ'দিক ও'দিক তো ফেলে রাখা যায় না। তোর পড়ার টেবিলের তিন নম্বর ড্রয়ারে স্পেস ছিল। রেখে দিয়েছি। গোলাপি খাম।
- না মানে..।
- চিঠি হাতিয়েছি। পড়িনি। এথিক্স বিফোর এনিথিং। আর সুমি, এত কথা বলে তোর গলা শুকিয়ে এসেছে। চট করে চা বানিয়ে আন মা।