Wednesday, March 11, 2026

সাবজেক্ট



- এক্সকিউজ মি! আমিই শ্রী অনিকেত সামন্ত।

- অতএব?

- ইয়ে...মানে?

- আপনার নাম অনিকেত সামন্ত। অতএব আমায় কী করতে হবে?

- আমার যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল আপনার সঙ্গে! আজ সকাল সোয়া দশটায়! আমি কিন্তু সাত মিনিট আগেই চলে এসেছি। এই আপনার বারান্দায় ঘুরঘুর করছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম একদম সঠিক মুহূর্তে এন্ট্রি নেওয়ার...। যেই না সাড়ে দশটা বেজেছে...আসলে সময় ব্যাপারটা আমার কাছে...।

- বসুন।

- থ্যাঙ্কিউ। থ্যাঙ্কিউ মিস্টার চট্টরাজ। ইট ইজ সাচ অ্যান অনার ট মিট ইউ স্যার...।

- কাজের কথা বললে হয় না?

- কমপ্লিমেন্টটাও যে কাজের কথা স্যার। এই আপনার মত একজন পেল্লায় আর্টিস্টের সঙ্গে দেখা করতে পারাটা যে আমার জন্য কত বড় একটা ইয়ে...।

- সুমন আপনাকে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে আশা করি।

- সুমন? ও...সুমন দত্ত, আপনার সেক্রেটারি। নাইস ইয়ং চ্যাপ। ভারী সদালাপী বুঝলেন। ভারী মিশুকে। হ্যাঁ, উনি আমায় স্পষ্টভাবে সবকিছুই বুঝিয়ে দিয়েছেন।

- আর আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি?

- রীতিমত।

- তবে আর কী। কালকের মধ্যে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে চলে আসুন। সুমন আপনাকে দোতলার একটা ঘরে চালান করে দেবে'খন। বাড়ির নিয়মকানুনও সেই বুঝিয়ে দেবে।

- আমার আবার বাক্স আর প্যাঁটরা, কী যে বলেন মশাই। আমি আজ থেকেই এখানে তাঁবু ফেলতে পারি আর কী। তবে ইয়ে, আপনি আমায় একটু বাজিয়ে দেখবেন না?

- আমি আর্টিস্ট। আমি আপনার পোর্ট্রেট আঁকব। একটা নয়, অনেকগুলো। বছরখানেক ধরে। আপনি আমার কাছে একটা অন্যরকমের সাবজেক্ট। আপনার মধ্যে যা কিছু ইউনিক, সে'টা খুঁজে নেওয়ার দায়িত্বটা আমার। আর আপনাকে বাজিয়ে দেখার কাজ সুমনের ছিল। সে যে নিজের কাজটুকু ভালোভাবেই করেছে সে বিশ্বাস আমার আছে।

- ইয়ে, একটা কথা আপনি জানেন কিনা জানি না। আমি কিন্তু এককালে আঁকিয়ে ছিলাম।

- বটে? রিয়েলিস্ট? ইম্প্রেশনিস্ট...?

- আজ্ঞে, এককালে হিন্দি ছবির পোস্টার আঁকতাম। সিনেমা পাড়ায় কিঞ্চিৎ সুনামও অর্জন করেছিলাম এক কালে। তারপর ওই কালের ফেরে যা হয় আর কী। আজকাল তো সবকিছুই লারেলাপ্পা।

- কিছু মনে করবেন না। আমি একটু ঠোঁটকাটা মানুষ। সিনেমার পোস্টার ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা লারেলাপ্পা ব্যাপার। এগেইন, প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড।

- হেহ্‌। না না, বিন্দুমাত্র না। তা আপনার কাজ কবে শুরু হচ্ছে?

***

- আই অ্যাম রিয়েলি সরি সুমন। চট্টরাজবাবু আচমকা এভাবে চলে যাবেন...ওয়েল, আমরা কেউই ভাবিনি। হি ওয়াজ রিমার্কেবলি ফিট ফর হিজ এজ।

- হ্যাঁ। উনি বেঁচে থাকলে এই পোর্ট্রেট সিরিজটা কমার্শিয়ালি বাজার এস্পারওস্পার করে দিত। তাই না মিস্টার শাসমল?

- সে'টা ভেবেই তো ওঁকে কমিশন করা। এ'রকম অভিনব কাজ ভূভারতে এর আগে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যাক গে, সিরিজটা হল না বটে। তবে একটা পোর্ট্রেট যে'টা ভদ্রলোক এঁকে যেতে পেরেছেন, সে'টার দাম এখন দশগুণ হবে গ্যারেন্টি দিচ্ছি। সাবজেক্ট হিসেবে আপনার এই অনিকেত সামন্ত সত্যিই পাওয়ারফুল। ওঁর সঙ্গে একবার দেখা করা যায়? উনি কি অন্তত একবার একটা পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স দিতে রাজি হবেন?

- সম্ভবত না। চট্টরাজবাবু যে'দিন মারা গেলেন সে'দিন তিনিও বেশ উদাস ভাবি 'চলি' বলে সরে পড়লেন।

- স্যাড। ভেরি স্যাড। যা হোক, আমি আর্টিস্ট নই। তবে আর্টের ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই বিলক্ষণ বুঝি। তবে কথা দিচ্ছি এ ছবি অনেক দূর যাবে।

- ইয়ে। আর একটা পোর্ট্রেট আছে।

- এক্সকিউজ মি? চট্টরাজবাবু দু'টো ছবি এঁকে গেছেন? জ্যাকপট! আরে আগে বলবেন তো মশাই!

- তা ঠিক নয়। বুঝিয়ে বলছি। আপনি এদিকে আসুন।

- চলুন।

- এই যে মিস্টার শাসমল। এই হল দ্বিতীয় পেন্টিং। মিস্টার চট্টরাজ মারা যাওয়ার পর এ'টা আমি আবিষ্কার করি।

- মাই গুডনেস! মাই... গুডনেস!

- এই ছবিতে চট্টরাজবাবু নিজেই সাবজেক্ট।

- সুমনবাবু, আমি হলফ করে বলতে পারি যে আর্টের নিরিখে এ পোর্ট্রেটের স্থান চট্টরাজবাবুর শেষ পোট্রেটের চেয়ে অনেক উপরে। এ'টা কে এঁকেছে বলুন দেখি?

- ছবির নীচে অনিকেত সামন্তর সই আছে।

- ও মাই গড!

- আপনি চট্টরাজবাবুকে দিয়ে পৃথিবীর প্রথম ভূতের পোর্ট্রেট আঁকাতে চেয়েছিলেন। আমি অনেক খেটেখুটে সে ব্যবস্থা করেও দিয়েছিলাম। ভূতের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করে তাঁকে সাবজেক্ট হতে রাজি করানো যে কী হ্যাপা। নেহাত সামন্তবাবু এককালে নিজেই ছবি আঁকতেন, তাই এই আর্টের জন্য জ্যান্ত মানুষের সামনে বসতে আপত্তি করেননি। তা, এ ছবির দাম কেমন হবে?

- মিলিয়নস! ডলারে। মানুষকে দিয়ে আঁকানো ভূতের ছবির ভালো দাম পাবেই তা জানতাম। কিন্তু এ যে ভূতের হাতে আঁকা মানুষের ছবি! ওরেবাবা! এ তো অমূল্য। এ ছবি আপনার আমাকে দিতেই হবে, কমিশনে আমি আপনাকে লাল করে দেব সুমনবাবু।

***

অনিকেত সামন্তর রেখে যাওয়া চিরকুটের ব্যাপারটা শাসমলকে না জানানোটাই ঠিক মনে করলেন সুমন। শাসমল চলে যেতে বুকপকেট থেকে কাগজের টুকরোটা বের করে ফের একবার পড়লেন তিনিঃ

"সুমনবাবু।

চলি।

চট্টরাজবাবু ভালো শিল্পী, তবে অহঙ্কারি। ফিল্মের পোস্টার আঁকার ব্যাপারে তাঁর অবজ্ঞা আমার মোটে ভালো লাগেনি। তাই একটা হঠকারী কাজ করে ফেললাম আর কী।

আর হ্যাঁ, আমিও একটা ছবি এঁকেছি। বোদ্ধাদের দিয়ে যাচাই করিয়ে দেখবেন কার শিল্পবোধ বেশি গভীর; পদ্মশ্রী শিল্পী চট্টরাজের না এই এলেবেলে পোস্টার আঁকিয়ে সামন্তর।

ইতি,

ঁঅনিকেত।" (ছবিঃ চ্যাটজিপিটি)

5 comments:

Anonymous said...

দারুণ

bratati said...

চমৎকার

Arindam Ghosh said...

উফফফ !দারুণ ! এই লেখাগুলো দু-মলাটেও আসুক স্যার, কতকরে আপনাকে বলছি, আপনি তো রাজিই হচ্ছেন না স্যার

Anonymous said...

দারুন! খুব ভালো লাগলো।

"সম্ভবত না। চট্টরাজবাবু যে'দিন মারা গেলেন। ..." এই লাইনটায় একটা টাইপো আছে বোধহয়। একবার দেখো।

Subimal said...

দারুণ