Wednesday, November 13, 2019

জ্যানেট রিজভির লাদাখ


ট্র্যাভেলার হিসেবে আমি একশোয় তেরো পাবো কিনা সন্দেহ। ঘুরতে গিয়ে বাড়ির আরাম খুঁজি, জিনিস হারাই, নেটফ্লিক্স/প্রাইমে ডাউনলোড করা সিনেমা সিরিয়াল দেখি, বই পড়ি; মোদ্দা কথা ছুটির দিনে বাড়িতে বসে অন্য কিছু করি বলে তো মনে হয়না।
তবু বছরে কি দেড়-বছরে একবার; প্রায় হপ্তাখানেকের জন্য সপরিবারে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই আর কয়েক হাজার বেকায়দা ভাবে তোলা ফটোতে মোবাইল বোঝাই করে বাড়ি ফিরি। এই যেমন এ'বারে গেছিলাম লাদাখে। শ্বেতার তত্ত্বাবধানে পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার একটা বড় সুবিধে হল যে সে "হোম-স্টে"গুলো জোগাড় করে বেশ দেখেশুনে। রহিসি না থাক, সে'সব জায়গায় আরাম আর উষ্ণতার অভাব থাকেনা।
তা এ'বারের ঘোরাঘুরির একদম শেষের দিকে দিন দেড়েকের জন্য আমরা ছিলাম পশ্চিম লাদাখের হেমিস-শুকপাচান বলে একটা গ্রামে। সে'খানে উঠেছিলাম শেরিং তোন্ডুপ নামগ্যালের বাড়িতে (বাংলা বানানে লিখতে গিয়ে ফোনেটিক্সে গোল পাকালাম কিনা কে জানে)। ভদ্রলোকের বয়স সত্তর বাহাত্তর; মিষ্টভাষী এবং সদালাপী, মামার ভাষায় "ভারী মাই ডিয়ার মানুষ"। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন, চাকরী থেকে অবসর নিলেও আশেপাশের মানুষকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়ার অভ্যাসটুকু ত্যাগ করেননি। সন্ধ্যে নাগাদ তাঁর ডাইনিং হলে বসিয়ে দিব্যি একটা ছোটখাটো লেকচার দিয়ে দিলেন লাদাখ অঞ্চলের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির ব্যাপারে। ভদ্রলোক এই বয়সেও 'কিউরিওসিটি'তে ভরপুর; কলকাতা নিয়ে তার পালটা প্রশ্নও কম প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু দেখা গেল ভদ্রলোক লাদাখ সম্বন্ধে যতটা জানেন, আমি বাংলা বা কলকাতা সম্বন্ধে তার সিকিভাগও জানিনা। গল্পগুজব শেষে ভদ্রলোক নিজের বইয়ের শেলফ থেকে আমায় একটা বই ধার দিলেন; লাদাখের ইতিহাসের ওপরই, পাতলা বই, একদিনের মধ্যে নিশ্চিন্তে পড়ে শেষ করে ফেলা যায়। লাদাখ (এবং ওই হেমিস শুকপাচান গ্রামটা) এতটাই সুন্দর যে আমার মত গাম্বাট মানুষও মাঝেমধ্যেই 'আহা কোথায় এসে পড়লাম' বলে গলে পড়ছি। তাছাড়া ঘোরার পথে বিভিন্ন গোম্পা দেখেটেখে স্বাভাবিক ভাবেই জায়গাটার ইতিহাস সম্বন্ধে একটু আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কাজেই তোন্ডুপ সাহেবের দেওয়া বই সাগ্রহে গ্রহণ করে জোড়া-কম্বলের তলায় সেঁধোলাম। বইটা যথাসময়ে শেষ করতে পেরেছিলাম।
জ্যানেট রিজভির লেখা "লাদাখ, ক্রসরোডস অফ হাই এশিয়া" সম্বন্ধে দু'চারটে কথা:
১। আমি বইটার ১৯৮৯ এডিশন পড়েছি। প্রথম প্রকাশ সম্ভবত তিরাশিতে। কিন্তু বইটার মূলে যেহেতু রয়েছে লাদাখের ইতিহাস এবং কালচার; সেহেতু পুরনো এডিশন বলে তেমন একটা হোঁচট খেতে হয়নি। লেখিকার ভাষার সারল্য মনে ধরেছে; স্যাম্পল হিসেবে প্রথম আট দশ পাতা পড়ে সহজেই ঠিক করে নিলাম যে এ বই টানা পড়ে শেষ করতেই হবে।
২। লাদাখের ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি; এ সমস্ত নিয়েই এই বই। প্রাইমার হিসেবে অতুলনীয় বলেই মনে হল। আজকাল গুগল সহজলভ্য ইনফরমেশনে ভরপুর; এ যুগে দাঁড়িয়ে ৩৫/৩৬ বছর আগে লেখা এমন বিষয়ের একটা বইকে "রেলেভ্যান্ট" আর "এনরিচিং" মনে হওয়াটাই একটা চমৎকার ব্যাপার।
৩। পাহাড়ে ঘেরা এই নিরিবিলি প্রান্তরে বসে রাজরাজড়ার ইতিহাস, পলিটিক্স, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে পড়তে পড়তে গোটা ব্যাপারটা বেশ সাররিয়াল ঠেকে। তিব্বতের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে ডোগরাদের আক্রমণ থেকে পশমিনা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া; এ সমস্ত মিলে তিব্বতি রাজাদের (ও তাঁদের প্রজাদের) কম হ্যাপার সামলাতে হয়নি। সে ইতিহাস ক্ষেত্র বিশেষে জটিলও বটে। লেখিকা সেই আপাত-জটিল ইতিহাস খুব সহজ ভাবে আর স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করেছেন, বলেছেন কাশ্মীর বা বাল্টিস্তানের সঙ্গে লাদাখের যোগাযোগ ও বিচ্ছেদের কথাও।
৪। বইয়ের অন্যতম জরুরী অংশ হল তিব্বতের সঙ্গে লাদাখের যে আত্মার যোগ; সেটুকুর ইতিহাস আর বর্তমানকে তুলে ধরা। আর সেই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে লাদাখি বৌদ্ধধর্মের প্রসঙ্গ, তিব্বতের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ এবং সূক্ষ্ম অমিলগুলো। চমৎকার ভাবে আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন গোম্পা, তাদের ইতিহাস ও স্থাপত্য।
৫। আমার মতে এ বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হল লাদাখের সাধারণ মানুষের জীবনধারা নিয়ে লেখা অধ্যায়গুলো। তাঁদের খাবারদাবার, কালচার, পোশাক, দৈনন্দিন জীবনের সারল্য, গ্রাসাচ্ছাদনের লড়াই এবং আধুনিকতার (ভালো ও মন্দ) প্রভাব; এই সমস্তই বড় চমৎকার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
লাদাখের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে এই বই পড়ার অভিজ্ঞতাটা সত্যিই অনন্য। বইটা লাদাখ সম্বন্ধে আমার আগ্রহ এতটা উস্কে দিয়েছিল যে ফেরার পথে লেহ্‌ শহরের একটা জমকালো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মেরেছিলাম লাদাখ সম্বন্ধে আরও ভালো কিছু বইয়ের খোঁজ করতে। লাদাখের ওপর সবচেয়ে ভালো বই কী আছে জিজ্ঞেস করাতে দোকানি-মশাই নির্দ্বিধায় জানালেন;
"সব সে পপুলার অউর সব সে অথেন্টিক বুক অন দিস এরিয়া; জ্যানেট রিজভি কা লাদাখ"।

থ্রিলিং


- কী রে!
- আরে সুশান্তদা যে..।
- কদ্দিন পর তোকে পাড়ায় দেখছি রে দীপু, ফিরলি কবে?
- আজ সকালেই।
- পুজোয় এলিনা এ'বারেও...।
- যথারীতি, ছুটিই পেলাম না।
- বাঙালিকে পুজোয় বাড়ি ফিরতে না দেওয়ার ব্যাপারটা কন্স্টিটিউশন অ্যালাউ করে?
- হেহ্।
- অবিশ্যি পুজোয় তোদের ব্যাচের কাউকেই দেখিনি এ'বার...সবাই আজকাল এক্কেবারে শশব্যস্ত..তাই না রে?
- তোমার খবর কী সুশান্তদা?
- আমি অঙ্কের টিউশনি করা মাস্টার। মাস্টারি করেই হেঁদিয়ে মরা ছাড়া আর গতি কী বল।
- মনে আছে সুশান্তদা, দামোদরের ও'দিকে যে'বার পিকনিক করতে গেছিলাম; মাংস রান্নার ফাঁকে তুমি প্রবাবিলিটি বুঝিয়েছিলে আমাদের?
- ব্যাপারটা যে তুই মনে রেখেছিস, সে'টাই বড় কথা। যাক, দেখা যখন হয়েই গেল; দু'পা এগোনো যাক। এখন রাত সাড়ে ন'টা, কাজেই রাজেনদার দোকান এখনও খোলা আছে। একটা করে রোল খাওয়া যাক বরং? নাকি মাংসের চপ?
- তোমার রোল। কিন্তু আমার রুটিনে কিন্তু হাফপ্লেট চাউমিনই পড়ে। ডিম দিয়ে। সঙ্গে এক্সট্রা লঙ্কাকুচি।
- তাই হবে।
- আর হ্যাঁ। একসময় তোমার ছাত্রদের কম রোল-চাউমিন খাওয়াওনি রাজেনদার স্টল থেকে। এখন আমরা কিছুটা হলেও লায়েক হয়েছি। আজ কিন্তু আমি খাওয়াব সুশান্তদা।
- বহুত খুব শাহজাদা দীপক, বহুত খুব।
***
সুশান্তদার এগরোল চেবানোর দৃশ্যটা দীপুর যে কী ভালো লাগছিল। লোকটা আগের চেয়ে অনেকটা বুড়িয়ে গেছে কিন্তু মেজাজটা আগের মতই দরাজ। নিজের হাফ প্লেট চাউমিন শেষ হতেই রাজেনকাকুকে খান চারেক মাংসের চপ ভাজতে বলে দিল দীপু।
বাতাসে মৃদু ঠাণ্ডার স্পর্শ এসে পড়েছে, সদ্য কড়াই থেকে তোলা মাংসের চপগুলো যখন রাজেনকাকু তাঁদের সামনে রেখে গেল তখন দীপু নিজের জিভের ডগার চনমনটা টের পেল। ছাতিমের গন্ধের সঙ্গে ওই রাজেনকাকুর স্পেশ্যাল মাংসের চপ ভাঙা ধোঁয়া মিলে তখন তার মাথার মধ্যে একটা ভালোলাগা রিমঝিমে ভাব।
সুশান্তদা ততক্ষণে সাহিত্য আর জ্যামিতির মেলবন্ধন নিয়ে কিছু একটা বলতে শুরু করেছিল; কিন্তু দীপু ব্যাপারটাকে ঠিক হৃদয়ঙ্গম করতে পারছিল না। যদিও সে সুশান্তদার কথাগুলো বেশ মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছিল, কথাগুলো শুনতেও খারাপ লাগছিল না। সুশান্তদার হাত নেড়ে, চোখ গোলগোল করে কথা বলার স্টাইলটাও পাল্টায়নি। দিব্যি লাগছিল দীপুর।
তবু সুশান্তদার কথার মাঝেই দীপুকে ফুট কাটতে হল।
- সুশান্তদা..।
- কী?
- একটা কথা বলার ছিল।
- বলে ফেল..। 
- তোমার কাছে পড়ার সময়..ইয়ে...মানে...মানে..আমি মাঝেমধ্যে তোমার মাসমাইনের টাকা থেকে তিরিশ বা চল্লিশ টাকা সরিয়ে নিতাম। তুমি কোনোদিন টাকা গুনে নিতেনা তাই...আমি, মন্টু, বিপুল, রণজিৎ; আমরা সবাই মাঝেমধ্যে টাকা সরাতাম...আর সেই সরানো টাকা গোটাটাই খরচ হত রাজেনকাকার রোল চাউমিনে।
- হা হা হা হা হা..।
সুশান্তদার অট্টহাসি বহুক্ষণ ধরে চলল। দীপুকেও সে হাসিতে যোগ দিতেই হল। বহুদিন ধরে এই খুচরো অপরাধবোধটা বয়ে বেড়াচ্ছিল সে; টিউশনির মাইনে থেকে টাকা সরানো তো এক ধরনের চুরিই। ছেলেবেলায় এ নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামালেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে মনের মধ্যে বেশ একটা খচখচ তৈরি হয়েছে। নেহাত সুশান্তদা নিপাট ভালোমানুষ, কিন্তু তাই বলে এমনভাবে তাঁকে ঠকানো? এত বছর পরেও সে অপরাধবোধটুকু উড়িয়ে দিতে পারেনি দীপু। কিন্তু আজ সুশান্তদার ওই প্রাণখোলা হাসির ঝাপটায় দীপুর বুকের ওপরে রাখা পাথরটা সরে গেল; সুশান্তদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেও হেসে উঠল।
আর তখনই ভেসে এলো রাজেনকাকার কণ্ঠস্বর। রাত তখন সোয়া দশ, দোকানের বেঞ্চি আর রাস্তা দু'টোই শুনশান।
- কী ব্যাপার রে দীপু, তখন থেকে দেখছি একাএকা বিড়বিড় করছিস, এখন আবার অকারণে হাসছিস। নেশাভাংটাং করেছিস নাকি?
- ধুস। না। জানো রাজেনকাকা, আচমকা বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করছি।
- নিশ্চিন্ত? কে জানে বাবা। তা, আর কিছু নিবি? এ'বার ঝাঁপ বন্ধ করব।
- না, কাজ হয়ে গেছে। আমিও উঠি। কত হল?
- হাফ ডিম চাউমিন, একটা ডবল এগরোল আর চারটে মাংসের চপ। সব মিলে একশো দশ।
- এই যে।
- বহুদিন পর পাড়ায় দেখলাম তোকে দীপু।
- ছুটিটুটি পাই কোথায় যে আসব। আচ্ছা রাজেনকাকা, তোমার সুশান্তদাকে মনে পড়ে?
- অঙ্ক মাস্টার? আহা, বড় ভালোমানুষ ছিল৷ সবই অদৃষ্ট। নইলে অমন জলজ্যান্ত লোকটা সাপের কামড়ে পট করে...। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই সে...। ইশ্। গতবছর পর্যন্ত রোজ সন্ধেবেলা এই বেঞ্চিতে এসে গ্যাঁট হয়ে বসে কত গল্প করেছে। রোজ। আর নিয়ম করে রোজ ডবল এগরোল। রোজ।
- তোমার এগরোলের টান যে অসীম রাজেনকাকা।
হেঁয়ালিপূর্ণ কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর ব্যাপারে রাজেনকাকার কোনোদিনই আগ্রহ নেই। কাজেই দীপুর কাছে সে জানতে চাইল না যে "এগরোলের অসীম টান" ব্যাপারটা কী। অবশ্য জানতে চাইলেও দীপু তাকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারত কিনা কে জানে।
রাজেনকাকার দোকান থেকে বেরিয়ে শুনশান অন্ধকার রাস্তায় এসে দাঁড়ালো দীপু। সুশান্তদার কাছে নিজের দোষ স্বীকার করতে পেরে সে সত্যিই নিশ্চিন্ত বোধ করছে আজ।
তাছাড়া; এর আগে নিশ্চয়ই কেউ কোনোদিনও এগরোলকে প্ল্যানচেটের মিডিয়াম হিসেবে ব্যবহার করে উঠতে পারেনি! প্ল্যানচেটের দুনিয়ায় একটা যুগান্তকারী ঘটনা আজ ঘটেছে তারই হাত ধরে; 'থ্রিলিং' শব্দটা বার তিনেক আউড়ে নিল সে।

দু'টুকরো

১। 
Image may contain: sky, cloud and outdoor
পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরী দু'টো টানঃ
বহুবার পড়া কোনো বই ফের তাক থেকে নামিয়ে দু'পাতা পড়ার ইচ্ছে।
আর

শত ব্যস্ততার মধ্যেও আচমকা ছাতে থেকে ঘুরে আসার হুজুগ।

২। 

Image may contain: food

একটা শুধু ডিমরুটির ফটোর অ্যালবাম তৈরি করার বড় ইচ্ছে। ফেসবুক বা গুগলফটোজের 'না ছুঁই পানি' গোছের ফটো অ্যালবাম নয়; রীতিমতো চামড়ায় বাঁধানো অ্যালবাম যা বইয়ের তাকে রাখা থাকবে।

ডিমপাউরুটির সঙ্গে যে কত পরিচিত জায়গা, মুহূর্ত আর মানুষ জড়িয়ে আছে;
সেই অ্যালবামের স্মৃতিসুবাস শিউলিকে হার মানাবে।

Monday, November 11, 2019

রাজেশ খন্নাঃ দি ফেনোমেনন



বলিউড বিষয়ক কোনো বই পড়তে হলে আমি সোজাসুজি দীপ্তকীর্তিদার লেখা বা ওঁর রেকমেন্ড করা বই/লেখা পড়ি আজকাল৷ ওঁর কথা শুনেই ইয়াসের উসমানের লেখা সঞ্জয় দত্তর জীবনীটা পড়ি, দিব্যি লেগেছিল৷ সদ্য শেষ করলাম উসমানেরই লেখা রাজেশ খান্নার বায়োগ্রাফি৷

বলিউডি তারকাদের বিষয়ে কিছু পড়ার ক্ষেত্রে একটা বড় অসুবিধে হচ্ছে যে মাঝেমধ্যে গসিপ আর ফ্যাক্ট গুলিয়ে ব্যাপারটা একটা প্রমাণ সাইজের চুটকি হয়ে দাঁড়ায়। কপাল ভালো যে উসমানের লেখায় চমৎকার 'ফ্লো' থাকলেও তা কখনই গসিপ কলমের মত মনে হয়না৷ এর একটা বড় কারণ হচ্ছে যে ভদ্রলোক প্রবল নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিটা ঘটনা এবং মন্তব্যের সোর্স কোট করে যান আর সে'টা করেন এমন মুন্সীয়ানার সঙ্গে যে পড়তে পড়তে হোঁচট খেতে হয়না; বরং কোন "সোর্সের" বিশ্বাসযোগ্যতা ঠিক কতটা সে'টা পাঠক হিসেবে নিজের বোধবুদ্ধি অনুযায়ী দিব্যি বিচার করে নেওয়া যায়৷ উসমানের রিসার্চে আলস্য নেই এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তার লজিক-বোধ এবং 'ইনফারেন্স'গুলোর সঙ্গে সহজেই একমত হওয়া যায়৷

এ'বার আসি এই বইয়ের প্রসঙ্গে৷

এক৷
রাজেশ খন্না; "দি ফেনোমেনন"৷ রাজেশ খন্নার ওপর যে কোনো বই তাঁর কেরিয়ারের এই দিকটাকে কতটা সার্থক ভাবে তুলে ধরছে তার ওপর সে বইয়ের গুরুত্ব অনেকটাই নির্ভরশীল৷ এ ক্ষেত্রে ইয়াসের উসমান চমৎকার ভাবে যতীন খন্নার " রাজেশ" হয়ে ওঠার থ্রিলিং গল্পটা বলেছেন৷

দুই৷ " দ্য এনিগমা"৷ রাজেশ খন্নার মত রীল আর রিয়েল গুলিয়ে ফেলতে বোধ খুব বেশি মানুষ পারেননি৷ আর অন্ধের হাতি চেনার মত বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে রাজেশকে দেখেছেন, সেই "দেখা" গুলোকে রিকনসাইল করতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়; তবে উসমান জবরদস্ত চেষ্টা করেছেন৷ সঞ্জীববাবুর একটা রম্যরচনায় পড়েছিলাম প্রত্যেক মানুষ ভাবে "আমায় কেউ চিনল না, কেউ বুঝল না"৷ রাজেশ খন্নার ক্ষেত্রে এই হাহাকারটা যতটা সুগভীর , ততটাই যন্ত্রণার৷ এই হাহাকারকে যতটা সম্ভব মেলোড্রামা এড়িয়ে তুলে ধরতে পেরেছেন উসমান৷

তিন৷ আগাসির বায়োগ্রাফিতে একটা চমৎকার ব্যাপার তুলে ধরা হয়েছে৷ যে 'এক নম্বর র‍্যাঙ্ক'কে জীবনের ধ্রুবতারা বলে মনে হয়েছিল আন্দ্রের, সে'খানে পৌঁছে আচমকা বড় অসহায় আর একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি৷ তাঁর আত্মজীবনীর একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সেই অসহায়তার গল্প৷ সেই অসহায় আগাসি বারবার অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছেন কিন্তু হারিয়ে যাননি৷ সে'দিন থেকে রাজেশ খন্নার কেরিয়ার কার্ভ বোধ হয় সম্পূর্ণ উলটো খাতে গড়িয়েছে৷ সাফল্য দড়াম করে এসেছে রাজেশের জীবনে আর সে সাফল্য এমন এভারেস্ট গোছের যে তা ছিল রাজেশেরও কল্পনাতীত; কারণ সেই স্তরে এর আগে কেউ কোনোদিনও পৌঁছতে পারেনি৷ এবং সেই সাফল্য ভাসিয়ে নিয়েছিল ভদ্রলোককে, সে ভেসে যাওয়া এতটাই নিদারুণ যে আর ফিরতে পারেননি তিনি৷ কিন্তু ভেসে যাওয়াটুকুই রাজেশের জীবনের শেষ কথা নয়; এ'টুকু স্বস্তির রেশ পাঠকের মনে রেখে যেতে পেরেছেন লেখক।

চার৷ যে কোনো বায়োগ্রাফিতে "অ্যানেকডোট কোয়ালিটি" খুব জরুরী৷ এ বই সে'দিক থেকে হতাশ করেনা৷ রাজেশবাবুর জীবনের যাবতীয় সম্পর্ক আর তাঁর একাকিত্ব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই জীবনীতে৷ রাজেশ খন্নার জীবনের বিভিন্ন সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে সিনেমা বিষয়ক খুব চমৎকার কিছু ট্রিভিয়া রয়েছে এ বইতে৷ কী ভাবে একটা ইন্ডিয়ান আইডল মার্কা ট্যালেন্ট হান্ট রাজেশের জীবন পালটে দিয়েছিল? শুটিং শুরুর আগেই আরাধনা ভেস্তে যেতে বসেছিল কী ভাবে? বাওয়ার্চি ছবির শুটিংয়ের সময় জয়া ভাদুড়ি রাজেশবাবুর প্রতি বিরক্ত বোধ করেছিলেন কেন? নমকহারাম সিনেমার ক্লাইম্যাক্স কীভাবে পাল্টাতে হয়েছিল রাজেশ খন্নার জেদের বশে আর তা কী ভাবে 'ব্যাকফায়্যার' করেছিল? অঞ্জু মহেন্দ্রু কেন সোবার্সকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন? বিভিন্ন ছোটছোট ঘটনা মিলিয়ে মিশিয়ে দিব্যি দাঁড় করানো হয়েছে এই বায়োগ্রাফি যা যে কোনো বলি-ফ্যানের উপাদেয় মনে হতে বাধ্য।

পাঁচ। বল্কির নির্দেশনায় একটা বিজ্ঞাপন তৈরী করে হ্যাভেলস, তাদের ফ্যানের জন্য; বিজ্ঞাপনটা খানিকটা বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। সে'টাই রাজেশবাবুর শেষ শুটিং। বইয়ের প্রায় শেষের দিকে এসে সেই বিজ্ঞাপন শুটিংয়ের ঘটনাটা বিশদভাবে বলা আছে। বইয়ের এই অংশটা পড়ে আমি ইউটিউবে বিজ্ঞাপনটা বার কয়েক দেখি আর ব্যক্তিগত ভাবে বলি; আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছে।

রাজেশ ভক্তরা চট করে এ বই পড়ে ফেলতেই পারেন।

আনএথিকাল

পুজোর আদত ক'টা দিন পাণ্ডববর্জিত এলাকায় কাটিয়ে সবে এসে পৌঁছেছি দিল্লীতে।
পাড়ার পুজো মণ্ডপে থেবড়ে বসার শখ অপূর্ণ থাকল বলে দেবীদর্শন করব না, তা কি হয়? মনস্থ করলাম এ'খানেই এ প্যান্ডেল সে প্যান্ডেল ঘুরে প্যারামাউন্টের ডাব-সরবতের স্বাদ গড়িয়াহাটের বরফলেবুজলে মেটাব।

সবে পুজো দেখতে বেরোব এমন সময় শ্বশুরমশাই গদগদ সুরে জানতে চাইলেন;
"ডিনারটা তো বাড়ি ফিরেই সারবে নাকি"?

এমন আনএথিকাল প্রশ্ন শুনে থমকে গেলাম। মুখের মধ্যে একটা বিশ্রী তিতকুটে স্বাদ ছড়িয়ে পড়ল। এই বয়সের একজন নিপাট ভালোমানুষ পুজোয় ঘুরতে বেরোনোর কন্সেপ্ট সম্বন্ধে অবহিত নন?
ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরে ডিনার করব?
এরপর কি আলুপোস্ত দিয়ে পাউরুটি খাব?
প্যারামাউন্টে গিয়ে মশলা দোসার খোঁজ করব?
বর্ষা কেটে গেলে আনন্দমেলা পুজোসংখ্যা পড়ব?
লর্ডসের ব্যালকনিতে জোব্বা পরা সৌরভকে দেখে বাহবা দেব?