Wednesday, December 31, 2025

কুমড়োর স্যুপ


কুমড়োর একটা স্পেসিফিক জাতের ছক্কা আছে যে'টা লুচির সঙ্গে বিউটিফুলি খাপ খায়। ওই একটি পদ বাদে রান্নায় কুমড়ো দেখলে আমি মুখ ভেটকে দিতে অভ্যস্ত। অতএব এই পরিস্থিতিতে যখন ওয়েটারভাইটি বললে যে মেনুতে লেমন-গার্লিক স্যুপের পাশাপাশি পাম্পকিন ক্রীম স্যুপ রয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাঁকে বিব্রত করতে চাইলাম। কিন্তু সে বেশ জোর গলায় দাবী করলে যে এই কুমড়োর স্যুপ খেলে আমায় ঘায়েল হতেই হবে।

ভাইটির দাবীটা পত্রপাঠ উড়িয়ে দিলে তাঁর মনে আঁচড় কাটা হহবে। অতএব বললাম, "বেশ তো, লাইয়ে কুমড়া কা স্যুপ"। কুমড়া কা স্যুপ শুনে সে সাহেবি ওয়েটারটি সামান্য কেঁপে উঠলে; নরম সুরে শুধরে দিয়ে ঘোষণা করলে "পাম্পকিন ক্রীম স্যুপ, উইল সার্ভ স্যর"।

স্যুপ এলো।
স্যুপ-চামচে চুমুক হলো।
বিশ্বাস করুন, মিনিট চারেকের মাথায় ওয়েটারভাইটিকে বলতে হলো, "আউর এক বাউল কুমড়া কা স্যুউপ প্লীজ"।
ভাইটির মুখে তখন যুদ্ধজয়ের হাসি।
কুমড়োর প্রতি; অহো।

বড় হয়ে



সবার সঙ্গে সহজে মিশবো;
চটুল চুটকিতে থাকবো,
দু'লাইন পদ্যে থাকবো,
গুনগুন গানেও ঝুলে পড়বো।

সমস্ত আসর আলো আলো ভবে জমিয়ে দেবো;
হাহাহোহোতে মিলেমিশে হন্যে হবো,
হাহাকারে জুড়ে গিয়ে গজল হবো।
ভাঙা প্রেমে বোরোলিন হবো,
ক্লান্তি ওড়ানো আড্ডায় রফি।

বড় হয়ে চিলি চিকেন ড্রাই হবো।
কেমন?

ইউএসপি



- তা, কী করা হয়?

- ক...কী...মানে...।

- তুমি যে ফুলিকে বিয়ে করতে চাইছো, বলি ইনকামের সোর্সটা কী...।

- শুধু আমিই যে ফুলিকে বিয়ে করতে চাইছি এ কথাটা তো ঠিক পূর্ণসত্য হলো না কাকু, ফুলিও আমায় বিয়ে করতে চাইছে। একেবারে ইকুয়াল ইন্টেনসিটি নিয়ে! কই, আমার বাবা তো ফুলির স্কুলমাস্টারি নিয়ে বেশি প্রশ্নট্রশ্ন করেনি।

- উনি প্রশ্ন করেননি কারণ ফুলি ওয়েল-এস্টাব্লিশড। খেটেখুটে পড়াশোনা করেছে, তারপর নিজের যোগ্যতায় চাকরি জুটিয়েছে। তোমার খবরটা তো জানা দরকার বাবা...।

- ইয়ে মানে, আমিও খুব খেটেখুটে পড়াশোনা করেছি। বলতে পারেন, ফুলির চেয়েও আমায় অনেক বেশি খাটতে হয়েছে। বিশ্বাস করুন, অঙ্ক কেমিস্ট্রি এ'সব আমার মাথায় কোনোদিনও ঢুকত না। ফুলি শুনেছি কথায় কথায় টপাটপ ইকুয়েশন ব্যালেন্স করে ফেলতো। কাজেই ফার্স্টক্লাস পেতে ফুলিকে যতটা খাটনি করতে হয়েছে, আমার পাশ করতে তার ডবল খাটতে হয়েছে। এ কথাটা ধ্রুবসত্য।

- বটে। তা গ্র্যাজুয়েশনটা পাশ করতে পেরেছো তো?

- নিশ্চয়ই! অনার্সটা পাইনি, কিন্তু পাশটা দিতে পেরেছি। ওই যে বললাম, মারাত্মক খাটনির ব্যাপার কিন্তু।

- তা, পাশ করে এখন কী করা হচ্ছে। সে'টাই তো তখন থেকে শুধোচ্ছি।

- আজ্ঞে, বিজনেস করছি।

- কীসের? 

- মুদীর দোকান দিয়েছি। দোকানটা অবশ্য বাবার থেকে ধার নিয়ে দেওয়া। তা ছিন্নমস্তার কৃপায় বাবার সে ধার আমি শোধ করেছি। দোকানটা দিয়েছি ধরুন ওই সেকেন্ড ইয়ারে থাকতেই। আগামী সতেরোই শ্রাবণ আমার মাধবীলতা ভ্যারাইটি স্টোরের সাত বছর পূর্ণ হবে। 

- মুদীর দোকান?

- আপনি ভাবছেন মাধবীলতা কে। আমার ঠাকুমা। দোকানঘরটা ঠাকুমারই ডোনেট করা তো...তাই...। গত বছর তিন দিনের জ্বরে চলে গেলেন। গ্রেট উয়োম্যান।

- মুদীর দোকান? 

- আমার ফিলসফি হচ্ছে সঠিক দাম, সঠিক মান, সঠিক পরিমাণ। বুঝলেন, অনেস্টি না থাকলে ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি মুশকিল...।

- তুমি বড় বেশি কথা বলো।

- আমি কি মশলা-ডাল-চানাচুর বেচি ভেবেছেন? সে'সব তো নিমিত্ত মাত্র। আমি বেচি কথা। ওয়ার্ডস! কত খদ্দের তো স্রেফ সন্ধেবেলা দু'দশ মিনিট প্রাণখোলা  গপ্প করতে চেয়ে এসে হাফ-কিলো গোবিন্দভোগ বা একশো গ্রাম পোস্ত কিনে ফিরে যায়। মেয়ের অ্যাডমিশনের অসুবিধে হচ্ছে বা অফিসের প্রমোশন ঝুলে রয়েছে, আমি মুদীর দোকানি কি ছাই বুঝি সে'সবের। কিন্তু তাঁরা গল্প করেন, আমি মন দিয়ে শুনতে শুনতে ফর্দ ঝালিয়ে নিই, আর আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট সহদেব ডাল, বড়ি ওজন করে চলে। জেপ্টো বলে সাত মিনিটে মালপত্তর পোঁছে দেবো, আমি বলি তাড়া কী মশাই। আসুন, বসুন। দু'টো কথা বলি, দু'টো কথা শুনি। তবে না জমবে...।

- মুদীর দোকান চালিয়ে হাতে কত আসে প্রতি মাসে?

- তা আপনার আশীর্বাদে...।

- আমার আশীর্বাদ ফাশীর্বাদ কিস্যু নেই। সোজা কথা বলো দেখি, হাতে কত আসে প্রতি মাসে?

- মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স আছে। বর্ষায় হপ্তায় একবার ইলিশ পাতে আসে। গতবছর একবার নর্থ বেঙ্গল আর একবার রাজস্থান ঘুরে এলাম। তবেই বুঝুন কতটা ঘ্যামে রয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী এর বেশি পয়সাকড়ি হাতে এলে বখে যাওয়ার একটা চান্স আছে।

- ফুলি এত স্টাবর্ন না হলে তোমায় আমি রিজেক্ট করতাম।

- আমার দোকানের চানাচুর আড়াইশো গ্রাম এনেছি আপনার জন্য। বড়জোড়া থেকে সোর্স করি বুঝলেন? বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট। চেখে দেখে বলুন যে আমার এক্সেলেন্সের প্রতি নজর আছে কিনা। আপনি ঠকছেন না, সে কথা আমি হলফ করে বলতে পারি। যাক গে, এই সেই ঠোঙা। মাসীমাকে একটা বাটি দিতে বলুন না, চানাচুরটা ঢালি! 

- তুমি কি বিয়ের পরেও এত বকবক করে চলবে?

- ও'টাই তো আমার ইউএসপি। মূলধন! এই গপ্পের শখ না থাকলে তো বছর চারেক আগে ফুলি এসে লাক্স সাবান চাইতো, আমি সে জিনিস হাতে তুলে নিয়ে দাম আদায় করে খালাস হতাম। কিন্তু তা তো হলো না বলুন! আমি বললাম, এই শীতে লাক্সের ভরসায় আটকে থাকলে তো চলবে না। এ'টা গ্লিসারিন সাবানের সময়। স্কিনকে বেপরোয়া ভাবে ট্রীট করলে চলবে কেন? আপনিই বলুন! ব্যাস, সেই এক কথা থেকে দু'কথা। ফুলি দেমাক নিয়ে শুধোলে আপনি কি ডার্মাটোলজিস্ট? আপনার লাক্স না পিয়ার্স সে তর্কে যাওয়ার দরকারটা কী? আমি ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, ডিসেম্বরের ছ'তারিখ পেরোলেই আমার মা গ্লিসারিন সাবান ছাড়া কিচ্ছুটি বরদাস্ত করতেন না। আবার সেই মার্চ পড়লে তবে মার্গোতে ফেরত। ফুলি জানতে চাইলে আমার মা আছে কিনা! ফলত একপ্রকার বাধ্য হয়ে আমার বলতে হলো যে আমি যখন ক্লাস সেভেনে তখনই হঠাৎ দিন তিনেকের জ্বরে...। 

- এত বাজে কথা যে একজন মানুষ বলতে পারে...।

- রবীন্দ্রনাথ বলেছেন জানেন, কাজের কথার থেকে নাকি বাজে কথাতেই মানুষকে চিনতে সুবিধে হয়। এই ধরুন আমাদের পাড়ার ডাক্তার দত্ত; সোম থেকে বিস্যুদ সকালে আমার দোকানে এসে আধঘণ্টা বাজে-গল্প না করলে ওঁর মন বসে না। রাশিয়ার তেল, বলিভিয়ার চিকেন রোস্ট, তিব্বতের কালীমন্দির; এমন কত কী! নেহাত শুক্কুর শনি রবি উনি প্রাণায়ামের ক্লাস করতে যান তাই...। 

- নাহ্‌। এ বিয়েতে আপত্তি করার দুঃসাহস অন্তত আমার নেই। ভাইটি, শোনো! ফুলি ছাতে আছে। তুমি বরং ওর সঙ্গে গিয়ে গল্প করো। বিয়ের আগে হবু-শ্বশুরের সঙ্গে এত খেজুরে আলাপ ভালো দেখায় না, কেমন?

Wednesday, December 17, 2025

রিডেম্পশন

মনখারাপের খুব জটিল কোণে পৌঁছে গেছি। নিজেই অবশ্য নিজেকে বারবার বলছি "তা বাপধন, কবর যখন নিজেই খুঁড়েছ তখন কবরে নরম তোষকের অভাব নিয়ে কান্নাকাটি করলে চলবে কেন"? দুঃখ আছে, হেরে ভূত হওয়া আছে, পাপের কড়াইতে ডীপ-ফ্রাই হওয়া আছে। কিন্তু তবুও বার বার মনে হচ্ছে যে সেই গ্লানিটাকে আমি আমার শেষ ডেফিনিশন হতে দিতে পারি না।

পাপী মানুষের সমস্যা হলো তাদের দুঃখ সাজিয়ে উপন্যাস খাঁড়া করা সম্ভব নয়। একটা ট্র্যাজিক পটভূমি না থাকলে ট্র্যাজিক হিরোর চরিত্র বোনা সম্ভব নয়। ধরুন শোলের জয় চোর-বাটপাড় মানুষ, আজ একে ঠকাচ্ছে তো কাল ওর ঠ্যাঙ ভাঙছে। কিন্তু তবুও তাঁর মধ্যে কোথায় একটা নিরেট ভালোমানুষি আছে; যে ভালোমানুষ বন্ধুর জন্য জানকবুল করতে সদাপ্রস্তুত, যে ভালোমানুষ নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে, প্রেমেও পড়তে পারে। এই ভালোমানুষিগুলোর ফিল্টার দিয়ে অমিতাভস্থ জয়কে যাচাই করলে দেখা যাবে যে তাঁর অখারাপ দিকগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত অপু-সুলভ রোম্যান্স আছে, সে গল্প ছলছলে চোখে বলা যায়। সে বন্ধু, সে প্রেমিক, সে নির্ভীক, পাপে গলা পর্যন্ত ডুবে থেকেও তাই সে নায়ক।

অন্যদিকে গব্বর সিং। তার খারাপমানুষি নিরেট, তার অন্ধকারে বিন্দুমাত্র আলোর বালি মিশে নেই। সে অবলীলায় খুন করছে, অভব্যতা করছে, গরীবদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। সে ভিলেনের গল্পের ফাঁকে কোনো অসতর্ক মুহূর্তেও কোনো হারানো বন্ধুর জন্য মনকেমন অথবা ফুলের সুবাস ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। গব্বরের রিডেম্পশন নেই।

দু:খকে পাশ কাটিয়ে যেতে মন চায় না, যে গ্লানির কথা বলছিলাম, সে'টাও তো জরুরী ডিসইনফেক্ট্যান্ট। ভয় হয় রিডেম্পশন না থাকায়। যে'দিন নিজের গল্পে নিজের চরিত্রকে বিভূতিভূষণের লাইন দিতে দ্বিধাবোধ হবে, সে'দিন থেকেই বোধহয় রিডেম্পশনের আশাটুকু শেষ।

Thursday, December 4, 2025

মদনমোহন


চৌকির ওপর বসে বাবু মোহনদাস অসীম তৃপ্তিসহ একশো টাকার নোটের একটা ঢাউস বান্ডিল গুনছিলেন। স্যাঙাৎ মদন মেঝেয় বসে লুডোর বোর্ড পেতে লাল-হলুদে নিজের হয়ে চাল দিয়ে নীল-সবুজের নিজেকে পর্যুদস্ত করতে ব্যস্ত। রাত এখন পৌনে ন'টা। অজ গাঁ, এখানের রাত ন'টা প্রায় রাত দেড়টার সমান। তায় আবার ভরা-ডিসেম্বর, টিনের চাল ফাঁকি দিয়ে কনকনে হাওয়া মোহনদাসের গায়ের শাল ভেদ করে যেন বরফকুচি ছড়িয়ে দিচ্ছে। নেহাত সস্তা টাকায় বিস্তর গরম, তাই এই অচেনা গাঁয়ের দাপুটে শীতকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছিলেন না মোহনদাস। মদনের অবশ্য শীত, টাকা, চোরাইমাল এ'সবে কিছু এসে যায় না। সে লুডো-সাধক, দু'ছক্কা তিন কী'ভাবে সাজালে মুক্তিলাভ হবে, এ ধরণের চিন্তাতেই তাঁর রাতভোর হয়ে যাবে।

হুগলির অন্যতম সেরা ওয়্যাগন-ব্রেকার মোহনদাসের লেজুড় হয়ে ঘুরে সুখেই আছে বর্ধমানের মদন সাহা। এই ভবঘুরে জীবনের জন্যই যেন তার জন্ম। মোহনদাস চাইলে সে চলতি মালগাড়ি থেকে অবলীলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ওজনদার বস্তা কাঁধে। মোহনদাস চাইলে সে নির্দ্বিধায় পুলিশের লাঠি বা অন্য মস্তানদের লাথি পিঠ পেতে নিয়ে ফাঁকতালে নিজের কাজ হাসিল করে বেরিয়ে যায়। মোহনদাস চাইলে সে আলুপোস্ত কি মেটেচচ্চড়ি রেঁধে দুনিয়া গুলজার করে দেয়। মোহনদাসের ঠিকভুল নিয়ে মাথা ঘামানোর বান্দা মদন নয়, সে লুডো-বাউল; তাঁর আনন্দ দিনের শেষে দু'তিন দান লুডো খেলতে খেলতে কিশোরকুমারের হিন্দি গান গুনগুন করায়।

- হ্যাঁ রে মদনা, বিড়ি দে দেখি।
- এই যে...।
- এ'বারের দাঁওটা বুঝলি, ভালোই মেরেছি।
- কেয়া বাত।
- ভাবছি তোকে এ'বারে একটা নতুন শার্ট কিনে দেবো। যে'ভাবে আজ জানের ওপর খেলে তুই...।
- একটা ভালো প্রিন্ট দেখে দিও বুঝলে। ফুলফুল হলে বেশ হয়।
- মদনা। এই যে আমার হয়ে ভূতের মত খাটিস, লুটের মাল ভাগ বসাতে ইচ্ছে হয় না? শয়ে পাঁচ কি দশ তুই চাইলেই আমি কিন্তু..।
- আমি বেতন নিয়ে খাটা মানুষ গো দাদা। চুরির কয়লায় ভাগ বসালে লুডোর চাল যাবে ভেস্তে। তুমি আমায় শয়ে পাঁচ গছালে আমার রান্না আলুপোস্তের অমৃতস্বাদ আর থাকবে ভেবেছ?
- মদনা রে। তুই বড়ই হারামি।
- তোমারই আশীর্বাদ গুরু।
- বড় শীতে পেয়েছে রে মদনা। আগুনটাগুন জ্বাল। আর টাকার থলেটা সরা মাইরি। যত আপদ।
- এখুনি..। দু'মিনিটে..।
- মদনা রে, একদান লুডো খেলবি আমায় নিয়ে?
- দাদা গো, এ জিনিস তোমার সইবে না।
- আমায় কুত্তা বলছিস?
- আগুনের ব্যবস্থা করি আগে। তুমি ততক্ষণ আর একটা বিড়ি ধরাও।