Tuesday, July 16, 2024

পুরনো



টাই-ঠাই আমি ছাই বাঁধতে পারি না। তার চেয়ে এই খালি গলাই ভালো। বছর পাঁচেক আগে নিউ মার্কেট থেকে কেনা দেড়-হাজার টাকার ব্লেজার, তখনও আমাদের বিয়ে হয়নি। এই কালো-সাদা চেক শার্টটা গত পুজোয় মিতুল দিয়েছিল। এমন কি এই কালচে-নীল ট্রাউজারটাও ওরই দেওয়া। গোটা আলমারি ঘেঁটে যা বুঝলাম, আমার যে ক’টা ভদ্রস্থ জামা-কাপড় তা সবই মিতুলের দেওয়া। আচমকা মনে একটা খটকা লাগলো; আরে! এ’বার পুজোয় কি মিতুল আমায় নতুন শার্ট প্যান্ট দেবে? নাকি ডিভোর্সের পর পুজোর জামা-কাপড়ও বন্ধ হয়ে যাবে? কে জানে।

ব্যাপারটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ গাল চুলকে নিলাম। যা হোক, এ নিয়ে বেশি ভেবে লাভ নেই। ড্রেসিংটেবিল থেকে আফটার শেভ লোশনের শিশিটা তুলে নিয়ে হাতের তালুতে কয়েক ফোঁটা ঢেলে নিয়ে গালে হাত ঠেকাতেই মেজাজ ফুরফুরে হয়ে গেলো, এমন সুবাস; সুমিষ্ট অথচ গায়ে-পড়া নয়। শিশির গায়ে দামটা দেখলাম, বাপ রে। মিতুল যে কত বাজে খরচ করত, উফ্‌। এ’বার আমি নিশ্চিন্তে ফটকিরিতে ফিরে যাব। অবশ্য এ শিশিতে যে’টুকু আছে, তা দিয়ে আমার আগামী মাস-খানেক দিব্যি চলে যাবে। যা হোক, পৌনে আটটা বেজে গেছে। এ’বার চটপট বেরোতে হবে। এই ইন্টারভিউটায় এস্পারওস্পার না করলেই নয়। হাতে অবশ্য এখনও দশ মিনিট আছে। ততক্ষণে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া যায়। বাসি পাউরুটি টোস্ট করে নিলে তার বাসিত্ব চলে যায়, এ’টা একটা ভালো ব্যাপার।

**

সন্ধে পৌনে ছ’টা, মিতুল বোধ হয় এখনও অফিস থেকে বেরোয়নি। নির্ঘাত কোনও জরুরী মিটিংয়ে ব্যস্ত। নয়তো এতবার রিং হওয়ার পর নিশ্চয়ই রিসিভ করত। যাক গে, সে বেরিয়েই কল ব্যাক করবে। এখন একটু সেলিব্রেট করা দরকার। চাকরীটা শেষমেশ জুটেই গেল। উফ, তিন মাস বড্ড দুশ্চিন্তা গেছে। কপালের জোরে এ’বার বেতনটাও একটু বেড়ে গেল বটে। তবে চাকরী পাওয়া আর মাইনে পাওয়ার মধ্যে মাস-খানেকের তফাৎ রয়েছে, কাজেই পকেটের শোচনীয় অবস্থাটা এখনই পালটায়নি। এ অবস্থায় মনের মধ্যে যতই পুলক থাক, দামী রেস্টুরেন্ট বা বারে ঢুকে পড়ার কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে বরং সস্তা মদ কিনে বাড়ি ফেরা যাক, সঙ্গে রুটি আর মুর্গি কষা। মিতুল নেই যখন তখন সস্তা মদের বোতল দেখে আঁতকে ওঠার কেউ নেই। একদিন থেকে উপকারই হল, মিতুলের রুচিকে তোল্লা দিতে গিয়ে বিস্তর বাজে খরচ করতে হত। এখন সে’সব চিন্তা নেই।

কিন্তু সামনের মাসে প্রথম মাইনে পেয়েই একটা পেল্লায় রেস্টুরেন্টে ঢুকে ইয়াব্বড় মেনু ঘেঁটে; কঠিন উচ্চারণের আগুনে তপ্ত কোনও পদ চেয়ে নেব। আর তার সঙ্গে দামি হুইস্কি। প্রথম মাইনে পেয়ে কি মিতুলকে একটা কিছু কিনে দেওয়া দরকার? শাড়ি বা দামী পারফিউম গোছের কিছু? নাকি ডিভোর্সের পর এ’সব গায়ে পড়া উপহারে মিতুল খানিকটা উত্ত্যক্ত বোধ করবে? নাহ্‌। এ’সব ভেবে পিছিয়ে গেলে চলবে না। শাড়িই একটা দেওয়া হবে’খন। বিশ্ববাংলা শোরুমের ওই ম্যাড়ম্যাড়ে অথচ মারাত্মক দামী সুতির শাড়িগুলো মিতুলের ভারী পছন্দ ছিল, সে’টাই একটা দিয়ে দেওয়া যাবে। টের পেলাম, একটা ধূর্ত হাসি নিজের মুখে আপনা থেকেই চলে এলো। সামনের মাসের শেষে মাইনে পেয়ে যদি মিতুলকে শাড়ি কিনে দিই, তা’হলে তার ক’দিন পরেই তো পুজো। চক্ষুলজ্জার খাতিরে কি তখন ও বাধ্য হবে না আমায় পুজোর জন্য একটা শার্ট-প্যান্ট কিনে দিতে? এ’সব ব্যাপারে ওর পছন্দগুলো কিন্তু সত্যিই ঘ্যাম, অথচ জামার রঙ পছন্দ করার কথা মনে এলেই আমার গায়ে জ্বর আসে। আর একবার যদি পুজোয় জামা-কাপড় দেওয়া শুরু হয়, তা’হলে সে’টা বছরে পর বছর চলতে বাধ্য। ওই ব্যাপারে তা’হলে আমার একটা বাৎসরিক হিল্লে হয় যায়।

**

পৌনে ন’টা পর্যন্ত যখন মিতুল কল ব্যাক করলো না, তখন অগত্যা মৃণালকে ফোন করলাম। এত বড় খবর, কাউনে জানাতে না পেরে পেট ফেটে যাচ্ছে।

- হ্যালো মৃণাল, একটা গুড নিউজ আছে।
- আবার বিয়ে-টিয়ে করিসনি তো?
- আরে ধুর। একটা চাকরী জুটিয়ে নিয়েছি।
- ভাই! খাওয়া!
মিনিট দশেক হাবিজাবি কত গল্প হল।
মৃণালের পর ফোন করলেম অভিষেককে। ঘুরে ফিরে সেই, “ভাই, খাওয়া”। তাকেও আশ্বস্ত করে আরও মিনিট পনেরো গালগল্প করলাম।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে ন’টা বাজলো। রুটি মাংসের প্যাকেটটা খুলতে ইচ্ছে করলো না, চালান হল ফ্রিজে (পরের দিন সকালে টের পেয়েছিলাম যে রুটিটা প্যাকেট থেকে বের করে ফ্রিজের বাইরে রাখতে হত)। দুধ-মুড়ি জিন্দাবাদ। ওল্ডমঙ্কের বোতলটা স্টিলের আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখলাম, এখন আলমারিতে স্পেস অনেক – চাইলে সেখানে বইখাতাও রাখা যায়।

নিজের জামা-কাপড় নিজে পছন্দ করে কিনতে হবে ভেবে গা-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। নাহ্‌, ডিভোর্স-পেপারে ফস করে সই করে দেওয়াটা ঠিক হয়নি, এই ধরণের জরুরী ব্যাপারগুলোর একটা মাইডিয়ার গোছের ফয়সালা কাগজে-কলমে ছকে রাখা উচিৎ ছিল। দেখি, সামনের মাসের শেষে দামী সুতির শাড়ি গছিয়ে কোনও কাজ হয় কিনা। নয়তো অন্য ফন্দি আঁটতে হবে।

শক্তিগড়ের ডিমপাউরুটি



এ'টা বছর আট-নয় আগে তোলা ছবি৷ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ওপর, শক্তিগড়ে৷ ল্যাংচার পীঠস্থান হলেও, ওই এলাকায় আমি গাড়ি দাঁড় করাতাম এক প্লেট ডিমরুটি আর কফির জন্য৷ অবশ্য মাঝেমধ্যে যে শিঙাড়া নেওয়া হত না তা নয়।

ডিম-পাউরুটি খাওয়ার সবচেয়ে উপাদেয় অংশটা হলো সে'টা বানাতে দেখা৷

১। ডিম ফাটিয়ে ছোট স্টিলের মগে নিয়ে নেওয়া।

২। তারপর পেঁয়াজকুচি লঙ্কাকুচি তুলে সেই গেলাসে ফেলে ঘুটঘুট করে নেড়া নেওয়া। এই পর্যায় অব্যর্থ ভাবে আমি একটু আব্দারের সুরে সামান্য বাড়তি পেঁয়াজকুচি দিতে বলব৷

৩। ও'দিকে বহু-ব্যবহারে খানিকটা জীর্ণ এবং সামান্য ত্যাড়াব্যাঁকা চাটুতে ততক্ষণে স্প্রাইটের বোতল থেকে ঢেলে নেওয়া সর্ষের তেল গরম হচ্ছে।

৪। তেল গরম হয়ে গেলেই ফেটানো ডিম ডাইরেক্ট চাটুতে পড়বে; সেই চড়চড়াৎ শব্দ যে কী মোহময়।
৫। এরপর হলুদ কাগজের মলাট খুলে বেরিয়ে আসবে লম্বাটে পাউরুটি৷ ছুরি দিয়ে মাথার দিকে কালো অংশটা ছেঁটে দেওয়া হবে৷

৬৷ তারপর দু'ফালি পাউরুটিকে চাটুতে ভাজা হতে থাকা ডিমের ওপর রাখা হবে৷

৭৷ মিনিট খানেক পর কাগজের প্লেটে সে ডিম পাউরুটি নামিয়ে নেওয়া হবে৷

৮। এরপর ছড়ানো হবে মশলা; এ'টা সাধারণত হত ওই চাটমশলা আর গোলমরিচ মেশানো একটা ব্যাপার।

৯। সবার শেষে একটা মারাত্মক স্ক্যান্ডালাস ব্যাপার ঘটবে। কুমড়ো গোলা লাল রঙ মেশানো সসকে টমেটো সস বলে চালানো হয়, সে কথা ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি৷ সে'টার স্বাদ আমার খুব একটা পছন্দসইও নয়৷ তবে কী অদ্ভুত ব্যাপার, ডিমপাউরুটির ওপর সেই সস ছড়িয়ে খেতে দিব্যি ভালো লাগে৷ ডিম পাউরুটির ওপর 'টমেটো সসে'র বোতল ঝাঁকিয়ে কয়েক ফোঁটা লাল ফেলে দেওয়া; মাস্টারস্ট্রোক।

১০। এরপর হাতের ওপর কাগজের প্লেটের উষ্ণতা অনুভব করা আর নাকে সর্ষের তেলে ভাজা ডিম আর সেঁকা পাউরুটির সুবাস৷

খাওয়া তো ছোটখাটো ব্যাপার, খাওয়ার আগের এই যে 'প্রসেস'; ও'টাই মূল উৎসব৷

ইতিহাস আর ডিমের বড়ার ঝোল



ইতিহাস ব্যাপারটা তো শুধু রাজা-রাজড়া, নেতা-নেত্রী, যুদ্ধ-বিগ্রহ বা কেল্লা-প্রাসাদে আটকে রাখলে চলবে না৷ আমাদের মত আতিপাতি মানুষের আশেপাশেই কত জরুরী ইতিহাসের মলিকিউল ভাসছে; অথচ সে'গুলোর ওপর মাইক্রোস্কোপ ধরার কেউ নেই।

এই যেমন ধরুন এই ডিমের বড়ার কষানো ঝোলের রেসিপি। এ জিনিস রান্না করে বহু খাইয়ে-মানুষের মন জয় করেছে মা৷ আমরাও মাঝেমধ্যেই আবদার করি মায়ের কাছে, "আজ ওই ডিমের বড়ার ঝোলটা রাঁধবে মা প্লীজ"?

এই রেসিপিটা মা আয়ত্ত করেছে দিদার থেকে। দিদার চার ছেলেমেয়ে, মা সবার বড় আর মায়ের তিন ভাই৷ দাদু অল্প মাইনের স্কুল-মাস্টার, অতএব ছেলেবেলায় মায়েরা দেখেছে নিদারুণ অভাব-অনটনের সংসার। দাদু স্কুলের কাজে গোটাদিন পরিশ্রম করছেন, সন্ধেবেলা গুটিকয় টিউশনি। ও'দিকে সংসারের যাবতীয় কাজকর্মের দায় ঠেলে চারজন পিঠোপিঠি ছেলেমেয়েকে সামাল দেওয়ার দায় সমস্তই দিদার কাঁধে৷ অতএব দিদার কাছে সময় ও অর্থ; দু'টোরই বিস্তর অভাব ছিল।

এ অবস্থায় এই ডিমের বড়ার কষানো ঝোল ছিল দিদার হেঁসেলের তুরুপের তাস। তিনটে ডিম ভেঙে, আলুসেদ্ধর সঙ্গে মিশিয়ে মেখে যে পরিমাণ বড়া ভাজা যেত; তা দিয়ে অনায়াসে ছ'জনের একবেলার খাওয়া হয়ে যেত৷ পাতে আমিষও পড়লো, আবার কষানো ঝোলের স্বাদের চোটে অনায়াসে থালা-থালা ভাতও উড়িয়ে দেওয়া গেল৷ সবচেয়ে বড় কথা, মাছের ঝোলের তুলনায় এ ঝোল রাঁধতে-বাড়তে সময়ও অনেক কম লাগে৷

দিদা নেই৷ অভাব-সামাল দেওয়ার ফর্মুলা হিসেবে এই রেসিপির পরিচয়টা আমাদের চোখে এখন ফিকে হয়ে গেছে৷ এ'টা এখন আমাদের খাওয়ার টেবিলে মাঝেমধ্যে উঁকি মারে 'ডেলিকেসি' হিসেবে। কিন্তু এই পদটার সুবাস রীতিমত এক টুকরো ইতিহাস; সে'খানে মধ্যবিত্তের গ্রাসাচ্ছদনের জন্য সংগ্রাম আছে, ষাটের দশকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির রেশ আছে। আর আছে আমার দিদা - আমার ঝাপসা ইতিহাস-বোধে যে মানুষটার গুরুত্ব কোনো দিগ্বিজয়ীর চেয়ে কম নয়৷

স্নাইপার



- ভালো করে সিচুয়েশনটা বুঝে নাও ভোম্বলকুমার৷ ওই দেখছ, রাস্তার ওপারে, আরে ওই যে সোজা; পেল্লায় একটা অ্যাপার্টমেন্ট, তাই তো? ওইয্যে, গোলাপি দেওয়াল?

- ও'টা গোলাপি নয়৷

- মানে? হলদে নাকি?

- ওই রঙটাকে ইংরেজিতে বলে পীচ।

- বাঙলায় কী বলে?

- জানি না বগলাদা৷

- জানো যখন কাঁচকলা তখন কথার মধ্যে খামোখা ফুট কাটার কী দরকার? ওই গোলাপি বহুতল, ও'টার বারো তলায় দ্যাখো...।

- ওপরের দিক থেকে বারো না নীচের দিক থেকে?

- এ বুদ্ধি নিয়ে যে কী'ভাবে স্নাইপার হয়েছ কে জানে। নীচ থেকে গুনতে থাকো৷ এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ এগারো; তারপর ওই বারো..। এই, এই আমার তর্জনী বরাবর চোখ রাখো, রেখেছো?

- রেখেছি। দেখছি।

- গুড৷ ওই ফ্লোরে ক'টা ব্যালকনি দেখছে?

- সাতটা ব্যালকনি, বগলাদা।

- ভেরি গুড৷ এ'বার একদম মধ্যিখানের ব্যালকনিটায় ফোকাস করো৷ করেছ?

- টোটালি।

- ওই ব্যালনিটার ডান দিকে একটা জানালা দেখতে পাচ্ছ? ওই যেটার গায়ে একটা ফুলের টব রাখা আছে?

- হলুদ জবা।

- ভেরি ভেরি ভেরি গুড৷ আর মিনিট দশেকের মধ্যেই টার্গেট ও'খানে এসে দাঁড়াবেন৷

- ক্লীয়ার৷

- এলোপাথাড়ি ছুঁড়ো না যেন। একটা বুলেট চালিয়ে কাজ সেরে নীচে নেমে আসবে৷ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।

- একদম স্পষ্ট।

- বাহ্, বেশ চটপটে তো তুমি ভাই ভোম্বল৷ তবে আমি এখন আসি, কেমন? নীচে অপেক্ষা করছি৷ নীল মারুতি অলটো৷ ফোর থ্রি সেভেন সিক্স।

***

- হ্যালো! কী ব্যাপার ভায়া! তুমি অতক্ষণ আগে টেক্স করলে কাজ হাসিল এখনও এলে না কেন, আমি যে নার্ভাস হয়ে বসে আছি গাড়িতে..। বাধ্য হয়ে ফোন করে ফেললাম৷

- আপনার বাইনোকুলারটা আছে হাতের আছে?

- আছে।

- গাড়ির জানালা থেকে গোলাপি বাড়ির বারোতলার মাঝের ব্যালকনির পাশের জানালার ভ্যিউ পাওয়া যাচ্ছে কি?

- তা চেষ্টা করলে দেখতে পাবো হয়ত..কেন বলো দেখি ভোম্বল? কোনো গোলমাল হলো নাকি? পুলিশ ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে? তুমি যে বলেছিলে সাইলেন্ট এক্সেকিউশন হবে!

- আরে পুলিশ টের পেতে এখনও ঢের দেরী৷ কিন্তু অবজার্ভ করুন জানালাটা আগে৷ ক্যুইকলি।

- দাঁড়াও দেখি...কই...কিছুই তো..পিছনের দেওয়ালে রক্তের ছিঁটে কি? মনে হচ্ছে...লাশ নিশ্চয়ই মেঝেতে পড়ে তাই আউট অফ ভ্যিউ...কিন্তু আর তো কিছুই..।

- আরে। ভালো করে দেখুন বগলাদা।

- এই..এই ভোম্বল, ওই হলুদ জবার ফুলটা মিসিং কেন? টবটা তো আছে দেখছি৷ তবে কী...।

- হে হে হে৷ সে'খানে গেছিলাম৷ চিন্তা করবেন না৷ কোনো চিহ্ন ফেলে আসিনি। সে দায় আমার৷

- তুমি শালা দূর থেকে গুলি চালিয়ে তারপর সে বিল্ডিংয়ে ঢুকলে ফুল তুলতে? তুমি কি উন্মাদ?

- দূর থেকে স্নাইপিংটা বিজনেস৷ কিন্তু ও বাড়িতে ঢুঁ মারতে হলো অন্য কারণে। আমার সাত বছরের ছেলের খুব জ্বর বুঝলেন৷ সে আজ বেরোবার আগে আমায় বলে দিয়েছিল অফিস থেকে কিছু একটা ওর জন্য নিয়ে যেতে৷ ওর বন্ধুদের বাবারা বা মায়েরা নাকি প্রায়সই নিজেদের অফিস থেকে ওদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যায়; সস্তা স্টেশনারি, মিটিংয়ে পাওয়া রাইটিং প্যাড বা অফিস ক্যান্টিনের কচুরি। তা আমার পুত্রটি আমার অফিস সম্বন্ধে ঠিক ওয়াকিবহাল নয়৷ তা'বলে তার এ শখ অপূর্ণ রাখি কী করে বলুন, বগলাদা।

- তুমি ডোবাবে ভাই ভোম্বল। স্টেশনারি দোকান থেকে ডটপেন কিনে বাড়ি ফিরলেই ল্যাঠা চুকে যেত..।

- না। খোকার সঙ্গে ধোঁকা নয়৷ ম্যাটার অফ প্রিন্সিপল। আপনি এগিয়ে যান এ'বারে৷ আপনার অল্টোর দরকার আমার আপাতত নেই৷ ক্যাশটা আমি কাল তুলে নেব আপনার অফিস থেকে৷ আজ আসি।

স্ক্যান্ড্যাল



এক ভদ্রলোক খাটের ওপর গম্ভীর হয়ে ক্যালকুলেটরে মুখ গুঁজে বসে৷ ভদ্রমহিলা আনমনে ডটপেনের মাথা চিবুচ্ছেন, সামনে রাখা একটা রাইটিং প্যাডের পাতা ফ্যানের হাওয়ায় ফটরফটর করছে। মিনিট দুয়েক খুটুরখুটুর করে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ক্যালকুলেটরটা সরিয়ে রাখলেন ভদ্রলোক; ঘোষণা করলেন:
"কী কুক্ষণেই যে এত ভারিক্কি ইন্স্যুরেন্স করাতে গেছিলাম। এখন প্রিমিয়াম জমা করতে গিয়ে অক্কা পাওয়ার উপক্রম"৷

ভদ্রমহিলার অস্ফুটে ফুট কাটলেন, "কেন যে ছাই দু'জনে এত কম মাইনের চাকরি করি"।

ভদ্রলোক সে বেদনার প্রতি সমর্থন জানালেন, "বটেই তো৷ কোথায় ইয়াব্বড় ব্যবসা সামলাবো, স্টেশনবাজারে প্লাইউডের বড় দোকান হবে৷ তুমি হবে রাশভারী প্রফেসর, মাঝেমধ্যেই হিল্লিদিল্লী গিয়ে টেডটক-ফেডটক দেবে। তা না, দু'জনেরই তস্য পাতি চাকরি। সামান্য ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম জোগাড় করতে ল্যাজেগোবরে"।

"শেম", মাথা নাড়লেন ভদ্রমহিলা। তারপর খানিকক্ষণ মাথা চুলকে জানালানে, "দ্যাখো, আমাদের লাক্সারিগুলো একটু চেক করতে হবে"।

"লাক্সারি"?, ভদ্রলোক এ'বার কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ, "কীসের লাক্সারি? কী লাক্সারি? সমরদার দোকানের রুটি-টিকিয়া? উবারের হিসেব দেখে চোখ কপালে তুলে অটোর লাইনে দাঁড়ানো"?

"ফোকাস সরে গেলে চলবে না, প্রিমিয়ামের টাকার কী হবে"?, ভদ্রমহিলার সুর উদাসীন৷

"কী হবে ইন্স্যুরেন্স দিয়ে"?, ভদ্রলোক এ'বার মরিয়া, "লেট আস বি ব্রেভ। টু হেল উইথ ইনস্যুরেন্স"।

"কয়েকটা লাক্সারি ম্যানেজ দেওয়া যায় কিন্তু জানো", ভদ্রমহিলার চোখে এ'বার সলিউশনের ঝিলিক৷

"প্রিমিয়াম জমা দিতে হবে পরশুর মধ্যে"!

"প্রতি হপ্তার সবজি তুমি কেনো, আমি মাছ৷ তাই তো"? ভদ্রমহিলার ভুরু সামান্য দুলে উঠলো।

"অসময়ে কী সব বাজে কথা বলছো বলো দেখি, তোমার ফোকাসের কী হলো"।

"শোনোই না। আমাদের কমন ফান্ড থেকে টাকা নিয়ে তুমি সবজি বাজার সারো, আমি আনি মাছ-মুর্গি, এ'টাই সিস্টেম তো"?

"সে'টাই তো এগ্রিমেন্ট"।

"আদতে একটা বিরাট স্ক্যাম। স্ক্যাম"! ভদ্রমহিলা প্রায় হাততালি দিয়ে উঠলেন।

"স্ক্যাম"? ভদ্রলোক তিতিবিরক্ত।

"কমন ফান্ড থেকে টাকা নিলাম। বললাম এক কিলো কাতলা এনেছি৷ আসলে কত এনেছি? সাড়ে সাতশো গ্রাম। বড়জোর আটশো। আটশো গ্রামের ইলিশ রিপোর্ট করলাম, আদতে ওজন কত? সোয়া সাতশো। মুর্গি হামেশাই সাড়ে সাতশো গ্রাম আনি, কন্সট্যান্ট রিপোর্ট করি এক কিলো আর কমন ফান্ড থেকে এক কিলোর দাম সরাই। অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। হপ্তার পর হপ্তা। মাসের পর মাস। গত দু'বছর ধরে"।

"ওহ মাই গড! স্ক্যান্ডালাস! এ যে এনরন ফেল"! ভদ্রলোক অসাড় বোধ করছিলেন।

"স্ক্যান্ড্যাল তো বটেই৷ দু'বছর আগে যখন পলিসিটা নিলে, দিব্যি বুঝেছিলাম এর প্রিমিয়াম টানা তোমার কম্ম নয়৷ অতএব আমাকেই জালিয়াতি করতে হলো"।

" কিন্তু...কিন্তু..এতে আর কতো জমেছে গো"...ভদ্রলোক তখন উত্তেজনায় কাঁপছেন।

"ওই নিভিয়া ক্রিমের যে ঢাউস কৌটোটা ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ারে জ্বলজ্বল করছে৷ বোরোলিন প্রেমে যে'টাকে তুমি এদ্দিন হেলাফেলা করে এসেছ, সে'টা খুললে টের পাবে যে আগামী তিনবছর আমাদের ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম নিয়ে চিন্তাটিন্তা করতে হবে না", ভদ্রমহিলা তখন কেল্লাফতে হাসি হেসে বিছিনায় গা এলিয়ে দিয়েছেন৷

ভদ্রলোক তখন সামান্য হতবাক, প্রচণ্ড বিব্রত। ভদ্রমহিলার পাশ ঘেঁষে এসে বসলেন৷ লালচে নেলপালিশ রাঙানো একটা আঙুল নিজের আঙুলে জড়িয়ে বললেন, "খুব লজ্জা করছে বলতে, তাও বলি৷ সবজি ফান্ড অল্পস্বল্প আমিও তছরুপ করেছি৷ তবে সে' কেসটা গোটাটাই ক্রিমিনাল। যে'টুকু যা সরিয়েছি, সবই গেছে গোপন সিগারেটে বা..বা...তুমি কখনও বাইরে গেলে...ওল্ড মঙ্কে"।

ভদ্রলোকের গলা জড়িয়ে কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিসিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, "তুমি ভেবেছ তোমার বইয়ের তাকে আড়াল করে রাখা চমনবাহারের কৌটোয় যে কোনোও পানমশলা নেই, তা আমি জানি না"?