Saturday, May 30, 2020

"দ্য লোল্যান্ড" প্রসঙ্গে


যিনি "দ্য লোল্যান্ড" রেকমেন্ড করেছিলেন তিনি এককথায় এ উপন্যাস সম্বন্ধে বলেছিলেন; "বিষাদসিন্ধু"।

বিষাদসিন্ধুতে যে মিঠে রোদ্দুর এসে মিশেছে, সে'টা টের পেতে হল বইটা পুরো পড়ে। ঝুম্পা লাহিড়ীর লেখা আমি সদ্য পড়েছি। কিছুদিন আগে পড়েছিলাম 'নেমসেক' আর দু'তিনদিন আগে শেষ করলাম নেমসেক। সে বই সম্বন্ধে চারটে মনের কথা।

১।

কলকাতা সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে ক্লিশেয় মাখামাখি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মনে রাখতে হবে যে লাহিড়ীর পাঠক আন্তর্জাতিক; তাঁদের কাছে যে ধরণের কলকাতা বিষয়ক ডিটেলিং চমৎকার  ঠেকবে, বাংলার (এবং কলকাতার) বাঙালির কাছে সেই ডিটেলিংই ক্লিশে ভারে ক্লিষ্ট মনে হতে পারে৷ কিন্তু লাহিড়ীর গুণ সে'খানেই। তাঁর বর্ণনা প্রায় নিখুঁত, বাহুল্যবর্জিত আর তাঁর ভাষা প্রাণবন্ত।  কলকাতার যে'টুকু তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে, সে'টুকু পড়লে আজীবন কলকাতায় বন্দী কোনও মানুষেরও দিব্যি ভালো লাগবে বলে আমার মনে হয়। অফিস যাওয়ার পথে রোজ টালিগঞ্জ পেরিয়ে যাই, এ বইতে টালিগঞ্জ একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক'দিন ধরে যখনই টালিগঞ্জ পেরোতে হয়, 'দ্য লোল্যান্ড'য়ের সুভাষ, উদয়ন আর গৌরীর কথা মনে পড়ে। বেলা নামের এক কিশোরীর কথা মনে পড়ে যার টালিগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ মাত্র কয়েকদিনের। আর হ্যাঁ, নেমসেকের কলকাতার তুলনায় লোল্যান্ডের কলকাতার ব্যপ্তি অনেকটা বেশি। 

 ২। 

বিষাদে মিঠে রোদ্দুরের ব্যাপারটা সামান্য খোলসা না করলেই নয়। লোল্যান্ডে আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র গৌরী। সে আদর্শ বলে নয়। বরং তাঁর ভুলভ্রান্তিগুলোই এ উপন্যাসের মূল রসদ। সত্যি কথা বলতে কী উপন্যাসের মূলে রয়েছে একটা অস্থির সময় আর ক্যাটালিস্ট হয়ে উঠেছে গৌরীর অন্ধকারটুকু। কত মানুষের ঘেন্না, রাগ আর বিরক্তি সামাল দিয়ে গৌরী পথ হেঁটেছেন। একদিকে যেমন ভালোবেসেছেন, অন্যদিকে প্রকাণ্ড সব ভুলও করেছেন৷  হলফ করে বলতে পারি যে একসময় পাঠকের সমস্ত রাগ এসে পড়বে গৌরীর ওপর। কিন্তু সেই উপন্যাসের এই কাল্পনিক চরিত্রটি যেন ভালো থাকে, যেন সামান্য স্বস্তি খুঁজে পায়; এ আশাটুকুও পাঠকের বুকের মধ্যে আনচান তৈরি করবেই। লাহিড়ীর লেখায় যে অসাধারণ 'এমপ্যাথি' রয়েছে, তার মাধ্যমেই গৌরীকে ভালোওবাসবেন কিছু (বা বেশিরভাগ) পাঠক। 

৩। 

বাপ-ছেলের সম্পর্ক নিয়ে কত লেখা পড়ি। বাপ মেয়ের ভালোবাসাটুকুর ওম অনুভব করার জন্য এ বই হয়ত আবার পড়ব। সুভাষের বেলাকে আঁকড়ে রাখা আর বেলার ভেসে যেতে চেয়েও ভেসে না যাওয়া, এ'সবটুকুর মধ্যেই সুভাষের ভালোবাসা। হেঁয়ালি বা স্পয়লার নয়; তবু বলি যে সুভাষ সে অর্থে বেলার বাবা নন৷ আবার সুভাষ যে ভাবে বেলার পিতা হয়ে উঠতে পেরেছেন, বাপ-মা দু'জনের ভালোবাসা জুড়লেও বোধ হয় সুভাষের স্নেহের গভীরতার সঙ্গে তুলনা চলেনা।  হয়ত এমন একটা সময় আসে যখন বৃদ্ধ বাপ-মা সন্তানের স্নেহের মধ্যে আশ্রয় খোঁজেন৷ সুভাষকে সে আশ্রয় দিয়ে নিজের বুকে টেনে নিয়েছিল বেলা, মায়ের মতই। বুকে টেনে নিয়ে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সে বাপ কা বেটি আর কী। 

৪। 

গল্পের পরিসর চল্লিশের দশকের কলকাতা থেকে ইন্টারনেট সমৃদ্ধ আধুনিক দুনিয়া। এসেছে নক্সাল আন্দোলন প্রসঙ্গ৷ এসেছেন উদয়ন নামের এক উজ্জ্বল তরুণ, হারিয়েও গেছেন৷ খুন হন উদয়ন, নিজের বাবা মা ও স্ত্রীর চোখের সামনে। সে মৃত্যুর মেঘ আবছায়ায় ভরে দিয়েছে গোটা উপন্যাস। সে মৃত্যুর যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছেন উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র। উদয়নকে ভালোবাসা প্রতিটি মানুষ সে যন্ত্রণায় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রইলেন অথচ একে অপরের হাত ধরতে পারলেন না। সেই পাহাড়প্রমাণ মনখারাপের মধ্যেই এই ভালোবাসার উপন্যাস। বার বার ফিরে এসেছে উদয়নের মৃত্যু, উপন্যাস শেষও হয়েছে সেই মৃত্যু আর একটা ব্যর্থ আন্দোলনের যন্ত্রণায়৷ কিন্তু মৃত্যু আর যাবতীয় ব্যর্থতা পেরিয়ে এ উপন্যাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ভালোবাসা আর কলকাতার গল্প৷

Sunday, May 24, 2020

দাদার লাইব্রেরি

- দাদা।


- কী ব্যাপার পিলু? এত রাত্রে?


- মনে হল তুই হয়ত এখনও ঘুমোসনি। তাই ভাবলাম যাই একবার...।


- আয়। বস।


- কী পড়ছিস?


-  ইংরেজি নভেল পড়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ভাবলাম একটু শরদিন্দু ঝালিয়ে নিই। তোর ডিনার হয়েছে রে পিলু?


- দাদা। রাত ক'টা বাজে সে খেয়াল আছে? পৌনে একটা৷ আর নীলাকে তো জানোই, রাত ন'টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া না করলেই এক্কেবারে হুলুস্থুল শুরু করবে।


- নীলার শাসনে আছিস তাই কোলেস্টেরলে পিষে মারা যাসনি এখনও। 


- ছেলেবেলায় মায়ের শাসন। আর এখন বৌয়ের। তোর তো আর সে বালাই নেই, বেশ আছিস।


- বৌ না থাক। বই তো আছে। আর বইও শাসন করে, সোহাগও করে। এই লাইব্রেরি কত সাধ করে বানানো বল দেখি।


- তা বটে। টিকলিকে তো আমি বারবার বলি, জ্যেঠুর লাইব্রেরিতে যা৷ দু'টো বই উল্টেপাল্টে দেখ৷ তোর মত ভোরেশাস রীডার না হোক, মাঝেমধ্যে দু'একটা বই তো পড়তেই পারে বলো। কিন্তু না। সে দিনরাত শুধু ওই মোবাইলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। 


- দিনকাল পাল্টেছে। বইটাই তো আজকাল একমাত্র রিসোর্স নয়। তুই বরং ওকে জোর করিস না। 


- জোর করলেও সে মেয়ে পাত্তা দেবে নাকি৷ ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগ। তার ওপরে সদ্য কলেজে যাওয়া শুরু করেছে, তা'তে বাড়তি আর এক জোড়া ডানা গজিয়েছে। 


- পিলু। বুড়োদের মত খিটখিট করিসনা। নতুনদের সব খারাপ আর আমাদের সব ভালো, এ'সব ন্যাকাপনা আমার অসহ্য লাগে। বাড়িতে এত বড় লাইব্রেরি, তুইই বা ক'টা বই পড়েছিস গত দু'বছরে?


- ব্যবসাপত্তর সামলে আর পড়ার সময় কোথায় বল৷ আমার ওই ইকনমিক টাইমসই ভালো। তা দাদা, আর কতক্ষণ পড়বি? এত রাত হল...।


- পড়ার জন্য এই রাতটাই ভালো সময় বুঝলি। দিনের গোলমালে বরং ফোকাস নষ্ট হয়। তা হ্যাঁ রে পিলু, তোর চেহারাটা এত শুকনো লাগছে কেন?


- ও তেমন কিছু না।


- তুই আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট পিলু। কাস্টোমারদের ফাঁকি দিয়ে বাড়তি দু'পয়সা কামিয়ে নিচ্ছিস নে, আমার চোখ ফাঁকি দিতে পারবি না। 


- বাজারের যা অবস্থা। ডিপ্রেশন,  মিসগভার্নেন্স, শেয়ারমার্কেট রক্তারক্তি। তার ওপর কোরাপশন; গত বছরখানেক ধরে ব্যবসাটা যে কী'ভাবে চালাচ্ছি তা আমিই জানি। 


- পিলু, আমি দেখি তো তোর ব্যস্ততা।  আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি তুই উদয়াস্ত কী পরিশ্রম করিস। শোন, আমি তোর দাদা। এক বাড়িতে আমরা থাকি। আমি একতলায় তুই দোতলায়, অথচ দিনের পর দিন আমাদের দেখা হয়না৷ এই যে তুই আজ মাঝরাত্রে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলি, কী ভালোই যে লাগল। রোজ আসিস না কেন? নীলা বারণ করে? 


- সে'সব কথা থাক দাদা।


- যাকগে, ব্যবসার সমস্যা কথা কিছু বলছিলিস। 


- দাদা, বাড়তি কিছু টাকা ঢালতে না পারলে ব্যবসাটা ভেসে যাবে। টিকলি আর নীলাকে নিয়ে যে কী বিপদে পড়তে হবে আমায়..। আর দুম করে টাকাটা আমি কী করে জোগাড় করব বল।


- পিলু। তুই কি ফের বাড়ি বিক্রির কথা বলতে এসেছিস?


- গোটা বাড়িটা আমরা বিক্রি কেন করব দাদা? তুই কী ভাবিস, এ বাড়ির প্রতি আমার টান নেই? তোকে তো আগেও বলেছি কতবার; শুধু একতলার এই উত্তরের দিকটা বেচে দেব। লীগাল দিকটা অলরেডি দেখে নিয়েছি৷ আর দ্যাখ, এত বড় বাড়ি মেন্টেন করা এমনিতেও আমার পক্ষে..। তাছাড়া লাহাদের অফারটা লুক্রেটিভ। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলতে চায়। পোজিশন ভালো, মার্কেট রেটের আড়াইগুণ অফার করেছে। 


- পিলু..।


- প্লীজ দাদা..আমার কথাটা ভাব একবার...।  শুধু তো এই একতলার উত্তর দিকটা..।


- কিন্তু এই সে'খানেই তো আমার এই লাইব্রেরি পিলু...এই লাইব্রেরি ভাঙলে আমি কোথায় যাব...। এই বইগুলো ছাড়া তো আমার আর কিছুই নেই। 


- প্লীজ। আমার জন্য একটু ভেবে দেখবি?


- কথাটা তুই তো আগেও বলেছিস। বহুবার। আমার উত্তরও তো তুই জানিস। এ লাইব্রেরি আমি ছাড়তে পারব না। আর আমার জোর করিস না, ফল ভালো হবে না।


- তুই আমার কথাটা একবারও ভাববি না দাদা?


- আমি তোর চোখের দিকে তাকিয়ে তোর মনের কথা টের পাই পিলু। আজও আমি সে'টা পারি। এ লাইব্রেরি নষ্ট করতে তুইও চাস না, তা আমি বেশ বুঝি। আর শোন, নীলাকে বলে দিস। এ লাইব্রেরি আমি কিছুতেই ছাড়ব না।


- আমি আসি দাদা। অনেক রাত হল।


- পিলু।


- কিছু বলবি?


- তোকে সত্যিই বড় শুকনো দেখাচ্ছে রে। শরীরের অযত্ন এ'বার একটু কম কর। আর...আর মাঝেমধ্যে আসিস  আমার ঘরে, কেমন? না হয় রাত্রের দিকেই আসিস, নীলারা ঘুমোলে। কোনও বাড়ি বেচার মতলব ছাড়া আসিস কখনও। দুই ভাই মিলে না হয় একটু খোশগল্প করা যাবে। আসবি পিলু?


- গুডনাইট দাদা। 


***


- নাহ্। দাদার সেই একই গোঁ। লাইব্রেরি সে ছাড়বে না। 


- যত বাজে কথা। এ সব তোমারই বদমায়েশ।


- কী যাতা বলছ নীলা?


- আমি ঠিকই বলেছি। তুমিই ওই লাইব্রেরির মায়া ত্যাগ করতে না পেরে লাহাদের অফার রিফিউজ করছ। আর সে'টা চালাচ্ছ দাদার নামে।


- কতবার বলব, আমি দাদার লাইব্রেরি সহ বাড়ির ওই অংশটা বেচে দিতে চাই। কিন্তু দাদা অ্যালাউ না করলে..।এইতো, আজও দাদা বললে, লাইব্রেরি হাতছাড়া হলে তার ফল ভালো হবে না। 


-  যত্তসব বাজে কথা। 


- বাজে কথা?


- বাজে কথা নয়? দু'বছর আগে যে মানুষটা মারা গেছে তাকে নাকি তুমি শুধু দেখতে পাও। আর চাইলেই তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করে আসো। আর সে নাকি বাড়ি বিক্রি আটকাচ্ছে...। আমার মেজদা বললে হালিশহর থেকে ওঝা নিয়ে এসে হিল্লে করে দেবে। তা'তেও তোমার আপত্তি...তোমারই কোনও মতলব আছে..।


- শোনো নীলা। দাদা আজীবনের কমিউনিস্ট।  ধান্দাবাজ পলিটিকাল ফায়দা লোটা লোক নয়, মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট।  মরার আগে উকিল ডেকে এমন লিখিত ব্যবস্থা করে গেছিল যাতে কেউ ধর্মমতে ওঁর শ্রাদ্ধ না করে। সেই কম্যুইনস্ট দাদার আত্মাকে আমি ওঝা লাগিয়ে বাড়িছাড়া করব গো নীলা? ধর্মে সইবে?

Tuesday, May 19, 2020

বংঈটসের বিরিয়ানি রান্না প্রসঙ্গে

এই অসময়ে মনখারাপ হলেই সর্বকালের অন্যতম সেরা (এবং জরুরী) ভিডিও অর্থাৎ  বংঈটসের কলকাতা বিরিয়ানির রেসিপিটা লূপে চালিয়ে দিয়ে একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকছি আর "মার্তণ্ড মার্তণ্ড মার্তণ্ড" রিদমে "বিরিয়ানি বিরিয়ানি বিরিয়ানি" বিড়বিড় করছি।

এই রেসিপি ভিডিও সম্বন্ধে কয়েকটা মনের কথা না বললেই নয়। 

১। ভিডিওর গোড়াতে বিরিয়ানির হলদে আলু নরম সুরে ভাজা হচ্ছে, তারপর পেঁয়াজের 'বিরিস্তা'। মনে তখন শ্যামল মিত্তিরে ফুরফুর। 

২। তারপর বিরিয়ানি মশলা তৈরি। সে কী থ্রিল!  আর্কিমিডিস চৌবাচ্চা-স্নান যেন নিজের চোখের সামনে দেখতে পারছি। সামান্য তুকতাকে যে কী ঘ্যামগোত্রের বিগব্যাং ঘটতে পারে..আহা।

৩। এরপর পাঁয়তারা পক্ষের শেষ, অ্যাকশন পক্ষের শুরু। মাংসের ম্যারিনেশন। দই,মশলাপাতি দিয়ে মাংসমাখা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এইবেলা গভর্নমেন্টের উচিৎ আইন করা; যাতে নজরুলগীতি বা বাউল না গেয়ে কেউ যেন ম্যারিনেশনের মাংস না মাখে। 

৪। সরু লম্বা চালের ভাত দেখলে এমনিতেই মনে হয় পৃথিবীতে আজও কতটা গভীর রোম্যান্স জমে আছে। আর যে চাল বিরিয়ানিতে গিয়ে ঠেকবে, তা সেদ্ধ হতে দেখা তো মেডিটেশনের ঠাকুরদা। ভিডিওর এ জায়গায় আমি বুকে পাশবালিশ টেনে নিই।

৫। যথাযথ ম্যারিনেশন শেষে কষা হয় মাংস, বুকে নামেন কবীর সুমন আর উথাল-পাতাল প্লাস ভাবনা নেশায় চিন্তামাতাল। 

৬। বিরিয়ানি দমে বসানোর আগে মশলাপাতি, আতর, কেওড়ার জল, গোলাপজল, কেশর, ঘি মাখন, খোয়া ইত্যাদি নিয়ে যে জটিল অ্যালকেমিটা ঘটে, তা দেখে ভরসা পাই। নাহ্, রক্তচোষা শয়তানি বা নিরেট ধান্দাবাজিটুকুই মানুষের শেষ পরিচয় হয়ে থাকবে না। যারা বিরিয়ানি বানাতে পারে, তারা নেহাৎ ফেলনা নয়; ভালোবাসা তাদের মজ্জায়। 

৭। জাদুকর দর্শকের চোখের সামনে পর্দা টানবেনই৷ অথবা হয়ত কাউকে পুরে ফেলবেন একটা ঢাউস আলমারিতে। সেই আড়ালটাই ম্যাজিকের আত্মা৷ ঢাকা পাত্রের আড়ালে ভাত মাংসের অঙ্কমাপা মিলনে জেগে উঠবেন মহানায়ক। সবার অগোচরে বিরিয়ানি-অরিন্দম বলে উঠবেন "আই উইল গো টু দ্য টপ, টু দ্য টপ, টু দ্য টপ"! 

ভিডিওটা দেখে মনের মধ্যে থেকে স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে। মাংস ভাত মিলিয়েমিশিয়ে যা নয় তাই পোলাও গোছের কিছু করে আর বলার চেষ্টা করব না " আজ বাড়িতে বিরিয়ানি বানিয়েছি"। 
সাধনায় শর্টকাট আর কবিতায় গাইডবই; চলে না৷ 

মনখারাপ যতই জমাট হোক, এ ভিডিও একটানা বার দশেক দেখলেই মনে হয় কোনও পাহাড়ি গ্রামের ঝকঝকে রাত্রির আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছি। 

সাবাশ বংঈটস। 

আরসালানে সিরাজে বা আমিনিয়ায় যারা মেগাস্কেলে নিয়মিত এ ম্যাজিক হাঁকাচ্ছেন; তাঁদের সেলাম।

***

ভিডিওটা নতুন নয়। প্রায় বেশিরভাগ মানুষই আশা করি বহুবার দেখেছেন।  তবু লিঙ্কটা দিয়ে রাখলামঃ

https://youtu.be/SbWGXcZTYzg

Sunday, May 17, 2020

বসের প্ল্যান

- বস!

- বলে ফেলো দত্ত।

- বলছি, সেলসটীম খুব রেস্টলেস হয়ে উঠছে, মেমোটা এবার ইস্যু না করলেই নয়। 

- কীসের মেমো?

- ওই যে। সামনের কোয়ার্টারের সেলস টীমের টার্গেট। ছেলেরা হপ্তাখানেক ধরে ঘ্যানঘ্যান করছে কিনা...। 

- সেলসের ছেলেপিলে; প্রয়োজনে লোহাকুচির চচ্চড়ি দিয়ে ভাত মেখে খাবে, মনুমেন্টের মাথায় মশারি টাঙ্গাবে, জিরাফের গলায় নেকটাই পরাবে। মেমোটেমোর মত নেকু জিনিসে তাদের কাজ কী। 

-  বস, যাই বলুন। এত হাই টার্গেট সেট করা হচ্ছে আজকাল। আগাম টার্গেট মেমোটা পেলে ছেলেমেয়েগুলো একটু আগেভাগে প্ল্যান করে নিতে পারত। একটু প্রস্তুত হতে পারত। তাছাড়া এই মেমোতে শুধু যে টার্গেট আছে তা তো নয়। ইনসেন্টিভ পাল্টে যাচ্ছে। অনেকের চাকরীবাকরী নিয়েও টানাটানি হতে পারে, অন্তত মেমোর ড্রাফট পড়ে আমি তেমনই বুঝছি। 

- দত্ত, তোমার চাকরী নিয়ে তো টানাটানি পড়বে না। তুমি খামোখা অত মাথা ঘামাতে যাচ্ছ কেন?

- কিন্তু এই লুকোছাপাতে সেলসটীমের মনবল একটু...একটু...।

- সেলসটীমের মনোবল দিয়ে কোন কাঁচকলাটা হবে দত্ত? ইয়ার এন্ড রিভিউতে বাহাত্তর খানা স্লাইড জুড়ে দলের মনোবলের বাহার দেখাব? 

- বস। আপনি গুরু, আমিই গরু। তবে পারমিশন দিলে সামান্য হাম্বা করি। 

- বলে ফেলো। 

- সেলস টীমের মনোবল ইস ডাইরেক্টলি প্রপোরশনাল টু সেলস নাম্বার, তাই না?

- উইথ ডিউ রেস্পেক্ট টু ইয়োর হাম্বা, মাই ডিয়ার দত্ত। মনোবল মানেই পার্ফরমেন্স; ওই টেম্পারামেন্ট নিয়ে এইচআরে গিয়ে বাতেলা ঝাড়ো গিয়ে। সেলসটীম সামলানো তোমার কর্ম নয়। 

- মনোবলের সঙ্গে পার্ফরমেন্সের যোগাযোগ নেই বস ? 

- মনোবল দিয়ে টেডটক হয়, লাল নীল হাবিজাবি পোস্টার হয়। পার্ফরমেন্সের জন্য দরকারি হল ভয়। 

- ভয়?

- ইয়েস দত্ত। ফিয়ার জেনারেটস ফায়্যার। আর ওই আগুনটুকু না থাকলে সেলসটীম মাধুকরী করে বেড়াবে, বেচতে পারবে না। 

-  কথামৃত লেভেল বস। কিন্তু তবু... একটিবার ভেবে দেখুন...আগামীকাল থেকে নতুন কোয়ার্টার শুরু...এখনও যদি মেমোটা রিলিজ না করা হয়...।

- আগামীকাল। আগামীকাল শুরু হবে রাত বারোটার পর। আর আজ এখন সবে বেলা আড়াইটে। এখনও সাড়ে নয় ঘণ্টা হাতে। 

- হ্যাঁ...মানে ইয়ে...বস...মেমোটা তো তৈরি...। 

- তাতে কী হয়েছে? তৈরি হলেই বিলি করতে হবে? দাঁড়াও। আগে ব্যাটাচ্ছেলেদের তড়পাও সামান্য। পারফর্মেন্সের জন্য দরকার ভয়, ভয়ের জন্য কী দরকার?

- কী বস?

- মিস্ট্রি। অন্ধকার। ওরা যত অন্ধকারে থাকবে, তত ভয়ে ছটফট করবে। আর তত সহজে ওদের নাচানো যাবে। এবং ছটফটের অনুপাতে বাড়বে পারফর্মেন্স। শোনো দত্ত...ওই মেমো যেন রাত আটটার আগে সেলসটীমের কাছে না পৌঁছয়।

- কিন্তু মেমো এক্কেবারে তৈরি, আপনিও অ্যাপ্রুভ করেছেন। টীমের ছেলেমেয়েদের যে কী বলি...। 

- ওদের বলে দাও মেমো নিয়ে এখনও ম্যানেজমেন্ট ধন্দে আছে।  বিকেলবেলা ডিরেক্টররা মিটিং-য়ে বসবে। রাত আটটা নাগাদ ওই মেমো রিলিজ করে দিলেই হল। অকারণ  প্ল্যানিংয়ে অনেক সমস্যা হে। তাছাড়া আজকালকার ছেলেছোকরাদের প্রশ্নের আর শেষ নেই । সব কথাতেই এটা কে'ন, ও'টা কেন; অসহ্য। শেষ মুহূর্তে মেমো পাবে, আজেবাজে প্রশ্নের সময় সুযোগ কোনোটাই থাকবে না। এ মেমো দিব্যি বেরিয়ে যাবে। হেহ হেহ। 

- তা আপনি বলছেন যখন...কিন্তু বস...মেমো পড়ে যা বুঝেছি, অনেকের চাকরী নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে। 

- সে জন্যেই তো সাস্পেন্সটা খুব কাজের জিনিস ভাই দত্ত। বাবাবাছা বলে কি কাউকে ডারউইন শেখানো যায়? ও মহামন্ত্র ঠেকে না শিখে উপায় নেই। 

- বেশ। তা'হলে রাত আটটা নাগাদই না হয় মেমোটা সেলস টীমের কাছে পাঠাব। 

- গুডবয়। আর দত্ত, আমার হয়ে একটা মনোবলে সুড়সুড়ি দেওয়া মেসেজ তৈরি করো দেখি। এমন একটা কিছু যা পড়েই মনে হবে যাই এখুনি আড়াই কিলোমিটার দৌড়ে আসি। তোমার মেমোর সঙ্গে না হয় সেই মোটিভেশনাল মেসেজটাও বিলি করে দিও? উইথ লাভ ফ্রম ডিয়ার বস বলে? কেমন?

- ইয়েস বস।

Wednesday, May 13, 2020

ট্যুইটস অফ আইসোলেশন ১৩


ফের একদিন। 

ভীড়। ধরুন, ওই চৈত্র সেলে গড়িয়াহাট মার্কা ভীড়।

আর ভীড়ে হাঁসফাঁস অবস্থায় কেউ আমার পা মাড়িয়ে ফেলবেন। এবং তারপরেই চেনা স্ক্রিপ্ট ভেস্তে দিয়ে মারকাটারি মিরাকেল।  

"অন্ধ নাকি শালা" বলে আমি চিৎকার করে উঠব না।
"ভীড় ফুটপাথে অমন ট্যালার মত ল্যাম্পপোস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে অথচ সামান্য টোকা লাগলে ন্যাকাপনা। আচ্ছা গবেট মাল" মার্কা পাল্টা উত্তর ভেসে আসবে না। 

বরং পা মাড়িয়ে যাওয়া মানুষটি ঘুরে হন্তদন্ত হয়ে কাছে আসবেন। জিভ কেটে বলবেন; "ছিঃ ছিঃ,অমন ইস্টুপিডের মত কেউ হেঁটে যায়? আমি একটা অখাদ্য। বলি, পায়ে কি খুব লেগেছে দাদা"?

আমি তৎক্ষণাৎ লাজুক সুরে জানাব " আরে না না, ভীড়ের মধ্যে অমন অল্পস্বল্প হয়েই থাকে। আরে পা মাড়িয়েছেন, বুলডোজার তো আর চালাননি। আমিই বরং অকারণে থমকে দাঁড়িয়ে গেছিলাম। কোনও মানে হয়? হাতে অতগুলো ভারী ব্যাগ নিয়ে ছুটছেন আপনি, পায়ে পা লাগতেই পারে। ধুস, ও নিয়ে ভাববেন না"।

দু'টো দিলখোলা হাসির আদানপ্রদান হবে। পা মাড়িয়ে দেওয়ার ব্যথা বা পা মাড়িয়ে দেওয়ার লজ্জা;তিরিশ সেকেন্ডে গায়েব কিন্তু সে হাসির ওম তিরিশ দিন মন চনমনে রাখবে। 

হাল ছাড়িনি। এই করনো-ধ্যাষ্টামোর শেষে ভীড় ফিরে আসবে। সেই ফিরে আসা ভীড়ে আমাদের হাঁসফাঁসটুকুও দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকবে। কিন্তু সেই নতুন ভীড়ের পুরনো মানুষগুলো আগের চেয়ে সামান্য নরম হবে। হবেই। হতেই হবে।