Sunday, September 16, 2018

যুধিষ্ঠির ও কলকাতা

- অ্যাই অ্যাই অ্যাই...যুধিদা তিন ছক্কা পুট চেলেছে। গোহারা গোহারা। আমরা জিতে গেছি যুধিদা। ভদ্দরলোকের এক কথা। এ'বার তোমাদের বারো বছরের বনবাস, আমাদের ইন্দ্রপ্রস্থে ফুর্তি।

- ব্রাদার দুর্যো, বলছিলাম কী...ইয়ে...।

- না না না...আপনি ধর্মরাজ, কথার খেলাপ করলে দেবতাদের মনখারাপ হবে। নীতিকথার লিস্টি সব নতুন করে নোটারাইজ করতে হবে। সে কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না। না না না।

- আহ দুর্যো, তোমার সবেতেই বাড়াবাড়ি। কতবার বলেছি, অর্জুন ভীমের রক্তের শেষ বিন্দু খরচ না করে আমি মচকাব না। শুধু বলছিলাম কী..ডেঙ্গুর সিজন চলছে ভাই। জঙ্গলটা অ্যাভয়েড করলে হয়না? ইন্দ্রপ্রস্থ তুমিই দেখভাল করো না, আমরা বরং একটু ঘুরেই আসি। কিন্তু জঙ্গল না, জঙ্গলে উইকেন্ড শুনেছি বড্ড বোরিং। স্রেফ  মুর্গীর রোস্ট আর হরিণ কষা খেয়ে কদ্দিন থাকা যায় বলো। তাই বলছিলাম একটা অলটারনেট অপশন ভাবো দেখি, শহর ঘেঁষা কিছু একটা। এই নকুলের দিব্যি, আমি এই অপশন না মানলে নকুলকে ছারপোকায় ছারখার করবে।

- (শকুনির সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলার পর) আচ্ছা বেশ। বলছেন যখন, ছোট ভাই হয়ে এই রিকুয়েস্ট নাকচ করি কী করে। বনবাস ক্যান্সেল।

- ক্যান্সেল দুর্যো? মাইরি?

- রিয়েলি। শুধু তাই নয়, বারো বছরটাও বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছিল। এক বছর থাকলেই হবে। তারপরেই ইন্দ্রপ্রস্থ ওয়াপিস আপনার।

- অনলি বারো মাস? শুনলি ভাই সহদেব? শুনলি? দুর্যো বড্ড মাইডিয়ার। ভীমটা মাথামোটা তাই অকারণ গালমন্দ করে। তা ব্রাদার দুর্যো, এই একবছর কোথায় থাকতে হবে?

- শহরেই।

- শহর? বুকে আয় ভাই।

- কলকাতায়। যে কোনো ফ্লাইওভারের নীচে। একটি বছর। ও কী যুধিদাদা, শরীর আনচান করছে নাকি? গা গুলোচ্ছে?

- না মানে, যদি তলিয়ে দেখিস দুর্যো; বনজঙ্গল ব্যাপারটা নেহাত মন্দ নয়। ইনফ্যাক্ট কবিই তো বলেছেন; দাও ফিরে সে অরণ্য লহ এ ফ্লাইওভার। আর জঙ্গল গেলে কি এক বছরের মধ্যে ফিরতে ইচ্ছে করবে ভাই? অমন অক্সিজেনের গুদাম ছেড়ে আসতে কার ভালো লাগে বলো। ডেঙ্গু হলে হবে, আমাদের ওই বারো বছরের বনবাসই ভালো। কী বলো পাঞ্চালী?

- সরি যুধোদা। বারো বছরের বনবাসের অপশন ক্যান্সেল। একবছর ফ্লাইওভারের তলে থাকো। তা'লেই হবে।

- আহ্ দুর্যো, তোমার এখনও ছেলেমানুষের মত জেদ। বেশ। শোন, বারো বছরের বনবাস শুধু নয়, তারপর এক বছর অজ্ঞাতবাসেও থাকব। তোর জন্য বোনাস অফার৷ কিন্তু ভাইটি, কলকাতার ফ্লাইওভারের নীচে থাকতে বোলো না। প্লীজ। প্লীজ।

- দাদার কথা ফেলি কী করে। বেশ। তাই হোক।

ময়ূখের মাস্টারমশাই

- আরে! মাস্টারমশাই?
- কে?
- আগে প্রণামটা সেরে নিই।
- আরে এ'সব আবার কেন...। দীর্ঘজীবী হও।
- চিনতে পারেননি?
- অভ্র? স্কুলের লেফট ব্যাক?
- না, আমি অভ্রদার একবছরের জুনিয়র। ময়ূখ।
- ময়ূখ,  হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। তুমিই তো বরাবর কেমিস্ট্রিতে হাইয়েস্ট পেতে। আটানব্বইয়ের ব্যাচ।
- ব্যাচটা ঠিক ধরেছেন তবে কেমিস্ট্রিটা ঠিক...ইয়ে...মাস্টারমশাই আমি আপনার অযোগ্য ছাত্র৷ কোনোরকমে টেনেটুনে পাশ করতাম। আপনি বোধ হয় মৃণালের কথা বলছেন, সে বরাবর কেমিস্ট্রিতে টপ করত।
- রাইট! মৃণাল। তাই তো। আসলে বয়স বাড়লে যা হয় আর কী। স্মৃতিশক্তি মিইয়ে এসেছে৷ তা এখন আছ কোথায়?
- বম্বেতে, নিজের একটা ছোটখাট ব্যবসা শুরু করেছি। পাড়ায় এলাম প্রায় বছর দশেক পর।
- বাহ্, বাহ্। এই তো চাই, নিজের মত করে কিছু একটা করছ। এ'টাই তো দরকার।
- আসলে চাকরীর যা বাজার...।
- তা ঠিক..উমম...মনে পড়েছে।
- আজ্ঞে?
- ময়ূখ সান্যাল। রাইট? অফস্পিন বল করতে? স্কুল লিগের সেমিফাইনালে শেষ ওভারে চারটে উইকেট নিয়ে জিতিয়েছিল?
- আপনার মনে আছে মাস্টারমশাই?
- সো গুড টু সী ইউ এগেইন ময়ূখ। আমার উচিৎ ছিল তোমায় আগেই চিনতে পারা৷ এমন ভুল আমার সচরাচর হয় না।
- আপনার দোষ নেই৷ এমন মেদবহুল চেহারা তো আগে ছিল না। তা, আপনি কেমন আছেন মাস্টারমশাই? আপনার বাগানের শখ এখনও আছে?
- এখন আমার বাড়িতে এলে অন্তত বাইশ রকমের গোলাপ দেখতে পারবে।
- বাহ্। দারুণ তো।
- তা এসো না একদিন, আজকেই এসো।
- নিশ্চয়ই আসব।
- তোমার বাড়ির সবাই ভালো আছেন ময়ূখ?
- বাবা আর নেই। মা আমার সঙ্গেই থাকেন।
- বিয়েথা করেছ?
- হ্যাঁ।
- ছেলেপিলে?
- ছেলে নেই। একটি পিলে। পারলে আজ তাকে আপনার বাড়ি নিয়ে যাব'খন।
- এনো, অবশ্যই এনো। ওকে তোমাদের কানমলার গল্প করব। আর তোমরা আজ বিকেলেই এসো, ওই সময় আমি আমার গোলাপ গাছগুলোর দেখভাল করি৷ রিটায়ার করেছি বেশ কিছু বছর হল, এখন ওগুলোই আমার ছাত্র। তা ময়ূখ, তোমার ব্যবসাটা কীসের?
- হুঁ?
- ওই যে বললে বিজনেসে ঢুকেছ। কী বিজনেস?
-  বড্ড বেলা হয়ে গেছে মাস্টারমশাই। আমি বরং এখন এগোই।
- বেশ। এসো কিন্তু। আমার হাতের কানমলা যতটা তেতো ছিল, আমার হাতের চা ততটাই চমৎকার। কোয়ালিটি দার্জিলিং লিভস। ওই একটা লাটসাহেবি কিছুতেই ছাড়তে পারিনি।

ফেরার সময়ই ময়ূখ ঠিক করে নিয়েছিল যে মাস্টারমশাইকে এক টিন দামী চা পাতা উপহার দেবে। মানুষটা বড্ড ভালো। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন ছাত্রদের জন্য, খেলাপাগলও বটে। তবে চায়ের টিন হাতে করে তাঁর বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না, পোস্টে পাঠাতে হবে। বিকেলের প্ল্যানও ক্যান্সেল। না গেলে সামান্য দুঃখ পাবেন বটে, কিন্তু ফের যদি মাস্টারমশাই 'তোমার ব্যবসাটা কীসের' জিজ্ঞেস করেন তা'হলে বড্ড ফাঁপরে পড়তে হবে। বৃদ্ধ কেমিস্ট্রির মাস্টারকে সে কী করে বোঝাবে যে তার ফুলেফেঁপে ওঠা ব্যবসাটা আদতে ইস্কুলের ব্যবসা আর ছাত্রদের আনাগোনাকে সে স্রেফ টার্নওভার বলে চেনে।

প্রগ্রেস

- মাস্টার, ছেলের প্রগ্রেস কেমন বুঝছ?

- বাপকা ব্যাটা। সিপাহী কা ঘোড়া।

- কমপ্লিমেন্ট না কানমলা?

- আপনার ছেলে কম্পাস দিয়ে চাউমিন খায় সাহাবাবু। প্রগ্রেস প্রগ্রেস করে নিজেকে এম্ব্যারেস করবেন না।

- সিগারেট খাবে মাস্টার?

- কোনোদিন মাংস পোলাও বা রাবড়ি তো অফার করতে শুনলাম না। যাক, তাই দিন। গাধা পেটানোর কাজ, বাড়তি বেঁচে আর কী হবে।

- তা তোমার ইংরেজি খবরের কাগজ কী বলছে?

- ইকনমি ধসছে। নেতাদের লারেলাপ্পাগিরি বাড়ছে। সরকার অপোজিশন সব মিলেমিশে গোল্লায় যাচ্ছে।

- চিন্তার ব্যাপার নাকি?

- চিন্তা দেশের ও দশের। আপনি চালের আড়তদারি করছেন, পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকুন। ইকনোমি যত ঝুলবে তত আপনার পোয়াবারো।

- বলছ?

- অফকোউর্স। তবে ছেলেটাকে বলুন সামান্য ম্যাথেম্যাটিক্স না শিখলেই নয়৷ শেষে আপনার উৎপাতের ধন ও চিৎপাতে বিলোবে।

- মায়ের আদরে ছেলেটা বাঁদর হয়ে পড়ল মাস্টার। আমি কি আর চেষ্টার কমতি রেখেছি? ক্লাস সিক্সে ফেল করল, দিলাম স্কুলের দালান বাঁধিয়ে। টেনে ক্লাস সেভেনে গেলো, ফের ফেল। সে'বার স্টাফরুমের জন্য ফ্রিজ আর চারটে কম্পিউটার কিনে দিলাম। এ'বারে কিছু একটা করো, নয়ত হেডমাস্টার বলে রেখেছে; ছেলেকে ক্লাসে এইটে তুলতে ছাতে দু'টো ঘর তুলে দিতে হবে। তোমার ওপর আমার বড় ভরসা মাস্টার।

- স্বয়ং বীণাপাণি আপনার ছেলেকে টিউশানি পড়ালেও বিশেষ লাভ করতে পারতেন না৷ যা হোক।

- বীণাপাণি কে? ওই নতুন ইতিহাসের দিদিমনি?

- সাহাবাবু। আপনি চালের ব্যবসায় ফোকাস করুন। যা বর্ষার সিচুয়েশন, কালোবাজারির স্কোপ কিন্তু দিব্যি বাড়বে।

- বাড়বে? বলছ? স্টক ধরে রাখব? দেখো মাস্টার, ইকনমির হালহকিকত তোমার থেকেই জানতে পারি।

- এ'বার পাঁচ কিলো দুধেরসর ওজন করিয়ে দিন দেখি।

- পল্টে। মাস্টারকে পাঁচকিলো চাল দিয়ে যা। তা মাস্টার, খাতায় লিখব না নগদ দেবে?

- খাতা?

- নগদ?

- নগদ?

- নয়? দ্যাখো মাস্টার। আমি কম্পাসে চাউমিন তুলি না।  হাত দিয়ে কষে ঝোলভাত মাখি। ব্যাবসায় ওয়ান পাইস ফাদার মাদার মাস্টার। তোমার আগের তিনশো বাহাত্তর টাকা বাকি আছে।

- পাঁচ নয়। দেড় কিলো দিতে বলুন৷ নগদে নেব।

- পল্টে। মাস্টারকে দেড় কিলো দিবি। আর দেখিস, মাস্টার মানুষ, ওজনে মারিস না বাবা।

- আপনি একটা যন্তর।

- আমি তো তাই বলি মাস্টার, আমি যন্তর তিনি যন্ত্রী। যেমন চালাচ্ছেন তেমন চলছি। যাক গে,ছেলেটাকে দেখো। আর দেশের হালহকিকত জানিওটানিও। আর একটা সিগারেট খাবে নাকি হে?

চাঁদা

মাঝরাত বড় খতরনাক।

ঝালমিষ্টি চানাচুর ফুরিয়ে যাওয়ার আফশোষ ঘাড়ে চেপে বসে।

হাফ পাতা শিব্রাম পড়ে চার পাতা শৈলেন ভাবতে ইচ্ছে করে।

রেনল্ডস পেনের নীল ঢাকনা চিবিয়ে চিবিয়ে হদ্দ হয়েও ক্রসওয়ার্ড পাজলে নড়চড় দেখা যায়না।

বেদম খেপচুরিয়াস এসএমেস টাইপ করেও মুছে ফেলাটাই রুল অফ দ্য গেম, গজরগজরের জন্য নম্বর টাইপ করেও তা ডায়াল করার আগে মুছে ফেলাটাই সমিচীন।

নেহাত গান ছিল,
তাই টিকে থাকা।
না'হলে প্রতিদিন শেষ রাতে অন্তত লাখখানেক মানুষ রাণাঘাটের টিকিট কাউন্টারে পৌঁছে তিব্বতের টিকিট চাইতেন।

রাগ ও বিরক্তি

প্রচণ্ড রাগ আর প্রবল বিরক্তি নিয়ে একটা আগুন ফেসবুক স্টেটাস লিখতে বসেছিলাম। চারদিকে এত গাম্বাটগিরি আর ভালো লাগে না, ফেসবুকে কিছু একটা না লেখা পর্যন্ত সোয়াস্তি পাচ্ছিলাম না। বেশ যুৎসই দু'একটা সারকাস্টিক রেফারেন্সও তৈরি রেখেছিলাম। সমস্যা বাঁধল আচমকা ছোটমামা এসে পড়ায়।

- কী রে! দিনরাত মোবাইলে মুখ গুঁজে কী করছিস বাবু?
- আহ মামা। ডিস্টার্ব কোরো না।
- দিদি আজ লুচির সঙ্গের এই তরকারিটা বড় যত্ন করে বানিয়েছে। এ'সব একটু শেখ না রে। এখনও সময় আছে।
- ধ্যাত্তেরি মামা। একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছি।
- কাজ? কেন? কাজ করছিস কেন?
- বাহ্, আমি কাজ করিনা?
- আমার পোস্ট অফিসের কাজটা করেছিস? করেছিস?
- আহ্ মামা। এ'সব মিনিয়াল কাজে আমায় যে কেন জড়াও। আর বলেছি যখন করে দেব৷ তাড়া দিও না৷ এখন জরুরী কাজটা সেরে নিই।
- পোস্ট অফিসের কাজ জরুরী নয়?
- সোসাইটির ব্যাপারে কোনো খবর রাখ?
- সোসাইটির পুজো কমিটির সেক্রেটারি রে আমি। এ'বারে ধামাকা প্ল্যান আছে...।
- আরে ধুর। খালি মাইক্রো লেভেলের ধান্দাবাজ চিন্তা। বলি সমাজে কী ঘটছে সে ব্যাপারে কোনো আইডিয়া আছে? একটা বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক সচেতন মানুষ হিসেবে তোমার উচিৎ প্রতি মুহূর্তে আঁতকে ওঠা। উঠছ কী?
- কাঁচালঙ্কা চিবিয়েছি৷ উফ!
- ওই। ও'টাই তোমাদের আঁতকে ওঠার লিমিট। কাঁচালঙ্কা।
- তোর বাতেলা শুনতে শুনতে মগ্ন হয়ে গেছিলাম বাবু, লঙ্কাটা ফিল্টার করতে পারিনি।
- বাতেলা?
- সরি। ইনসাইটস।
- তুমি লুচিই খাও। এ'দিকে দেশ গোল্লায় যাচ্ছে...।
- ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন জমা করেছিস?
- ইয়ে। এ'টা কোথা থেকে এলো?
- করেছিস?
- করব..মানে...।
- লাস্ট ডেটের অপেক্ষা করছিস? বা আর একটা এক্সটেনশনের?
- হ্যাঁ মানে...দিয়ে দেব।
- আমি গতমাসে জমা দিয়েছি, এক্সটেনশনের অপেক্ষা না করে। আর শোন, যতক্ষণ না তুই রিটার্ন জমা করছিস আমায় খামোখা কলার টেনে জ্ঞান দিবিনা। ফের মুখে লঙ্কা পড়ল। অত্যন্ত পেছন-ইয়ে ছেলে হয়েছ।

অরিজিনাল রাগ আর বিরক্তিতে জল পড়ে গেল৷ ফেসবুক স্টেটাস গেল ঝুলে। এখন জলখাবারের লুচি আর সাদা তরকারিতে যদি পোস্টঅফিস যাওয়ার দুঃখ খানিকটা লাঘব হয়।