Sunday, March 8, 2026

পল্টুবাবুর দোকান

- আরে! কদ্দিন পর এলেন বলুন দেখি।
- কদ্দিন আর কই। এই তো সে'দিন তোমার দোকানে বসে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে গেলাম সমরদের সঙ্গে। চা আর মামলেট অর্ডার করলাম। জোরাজুরি করা সত্ত্বেও মামলেটের দাম নিলে না, সে'টা নাকি আমার জন্য অন দা হাউস।
- সে তো গেলো মাসে। যাক গে, বসুন। আজ পেঁয়াজি ভাজা হচ্ছে।
- বেশ বেশ। দিয়ো দুটো। তবে আগে চা দিতে বলো পল্টু। গলা না ভেজালেই নয়।
- আপনাকে বেশ ক্লান্ত লাগছে দত্তদা। রোদ্দুরে ঘোরাঘুরি হয়েছে বিস্তর কি?
- ওই সেই পেনসন আটকে যাওয়ার ব্যাপারটা। এই নিয়ে টাকাটা চার মাস জমা হয়নি। গতকাল জানলাম লাইফসার্টিফিকেটে কোনো সমস্যা আছে। তা নিয়ে আজ বিস্তর ছোটাছুটি হলো।
- তা সমস্যা মিটেছে কি?
- আশা করি। সামনের মাস পড়লে বুঝবো। বুড়োবুড়ির সংসার। বুঝতেই পারছো, তিনমাস ব্যাঙ্কে টাকা জমা না পড়লে...।
- বিলক্ষণ। আসুন, এই যে। আপনার স্পেশ্যাল আদা চা।
- আহ। তৃপ্তি। গিন্নীকে আমি বার বার বলি, পল্টুর হাতের চায়ে যে কী একটা ম্যাজিক রয়েছে...।
- আজ পেঁয়াজিটা কিন্তু ভজন ভাজছে। ওই মেদিনীপুর থেকে যে ছোকরাটা এসেছে আর কী। ভালো খারাপ; সব দায় সে ব্যাটার। পেঁয়াজিটা নতুন ইন্ট্রোডিউস করলাম আজ দোকানে, কাজেই ওটার দাম দিতে যাবেন না। আপনাকে টেস্ট করিয়ে শুভারম্ভ হবে'খন।
- আহ, রোজ রোজ এলেই যদি দামটাম না নিয়ে খাইয়ে যাও, তাহলে তো আসা মুশকিল।
- রোজ রোজ আর আপনাকে পাচ্ছি কই দত্তদা।
- বেড়ে গন্ধ ছড়িয়েছে তোমার পেঁয়াজির।
- ভজনা, চারটে পেঁয়াজি এ'দিকে দিয়ে যা বাবা।
- আবার চারটে কেন...।
- খান না, খান। আমি দেখি।
- পল্টু, আমি খেয়াল করেছি যে'দিন থেকে আমি সমরদের পেনসন আটকে যাওয়ার ব্যাপারটা বলেছি...তুমি...।
- আজ্ঞে, আমি একটু ও'দিকটা দেখে আসছি...খদ্দেররা বসে রয়েছে...দোকানের ছেলেগুলো এমন ফাঁকিবাজ হয়েছে বুঝলেন...আমি না কড়া হাতে সুপারভাইজ না করলে...।
- আমি কিন্তু একদম ব্যাঙ্করাপ্ট নই হে, পকেট একদম গড়ের মাঠ নয়...ওই দ্যাখো...চলে গেলো।...এই...এই যে...তুমিই ভজন? দেখি কেমন ভেজেছ পেঁয়াজি...। দাও...।
পল্টুবাবু খেয়াল করেছেন যে যে'দিন থেকে দত্তবাবুর থেকে তিনি টাকা নিতে ইতস্তত করছেন, সে'দিন থেকে ভদ্রলোক আসাযাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। যে বৃদ্ধ চারমাস হল পেনসন পাচ্ছেন না, তাঁর থেকে টাকা নিতে পল্টুবাবুর মন সরে না। অথচ দত্তবাবুকে নিরস্ত করাও চাট্টিখানি কথা নয়, ভারি ঢিঁট বুড়ো।
ও'দিকে অমন দুর্দান্ত পেঁয়াজিতে কামড় দিয়েও ঠিক সুবিধে করতে পারলেন না দত্তবাবু। ফ্রি মামলেট পেঁয়াজির ঠেলায় এমন সুন্দর আড্ডার জায়গায় আজকাল আর তাঁর নিয়মিত আসা হয় না। পল্টুটা আচ্ছা আহাম্মক।

সঙ্গী


"ওই যে, ওই দিকে। আর ধরুন..এই মাইল দেড়েক"।
"অদ্দূর যেতে পারবো নাকি মশাই। হাঁটুর সিচুয়েশন তো বলেইছি"।
"ক্ষতি নেই। এ'খানেই হাত পা ছড়িয়ে দিব্যি বসা যায়। কফির ফ্লাস্কটা আছে তো আপনার ঝোলাব্যাগে"?
"তা আছে, কিন্তু ভাই...আপনি অনায়াসে ঘুরে আসতে পারেন কিন্তু। এদ্দূর এসে ওই সাররিয়াল ওয়াটারফলটা আপনি আমার জন্য মিস করছেন ভাবলেই..না না..বড্ড খারাপ লাগছে"।
"রেস্টহাউস থেকে একসঙ্গে বেরোলাম। পৃথক ফল নিয়ে ফেরত গিয়ে কী লাভ বলুন"।
"বেশ। গপ্পই হোক"।
"আহা, গপ্প নয়। স্রেফ ছড়িয়ে বসা। ঝর্ণার যে শব্দ আসছে, সে'টাকে আমরা অনার করবো"।
"কফির চুমুকের শব্দটা চলবে তো"?
"সে'টা তো চেরি অন টপ"।
"বেশ। ফ্লাস্ক খুলছি আর মুখ বন্ধ করছি"।
"মিউজিক"।

অবশেষে



অবশেষে
অন্ধকার কেটেছে, ঝড় থেমেছে।

ঝগড়াবিবাদ মিটিয়ে নিয়ে সাদাসিধে মানুষের দল যে যার বাড়ি ফিরেছে।
পুড়ে যাওয়া ট্রান্সফর্মার সারাই হওয়ায় তিনদিনের লোডশেডিং পর্বে ইতি টানা গেছে।

বৃষ্টি থামায় পিচ থেকে কভার সরিয়ে ডাকওয়ার্থ ল্যুইসের অঙ্কে মন দেওয়া গেছে।

সাতটা পোস্টকার্ডের খোঁচা দিয়ে একটা পেল্লায় ইনল্যান্ড লেটারি উত্তর আদায় করা গেছে।

অবশেষে
বম্বের পাড়ায় পাতে দেওয়ার মত ডিমতড়কার সন্ধান পাওয়া গেছে।

মহেন্দ্রনাথ ও নজরুল

ভাঙা আসরে একলা পড়ে রইলেন বাবু মহেন্দ্রনাথ। মঞ্চ থেকে গায়ক বিদেয় নিয়েছেন, বাজিয়েরা সরে পড়েছেন। দর্শকরা শতরঞ্চি এলোমেলো করে গায়েব। সুর কানে একা রয়ে গেছেন মহেন্দ্রনাথ। তাঁর চোখ ছলছল, আর বুকপকেটে শালপাতায় মোড়া জর্দাবিহীন সাদা পান। আজকাল বড় একলা হয়ে পড়েছেন তিনি। এই ফুরিয়ে যাওয়া জলসায় সে একাকিত্ব ইয়াব্বড় হয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। মহেন্দ্রনাথ বাধ্য হয়ে গান ধরলেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠে সুর নেই, তবে প্রাণে আছে। নজরুলগীতিতে প্রাণ ঢাললেই তা জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে, ফিজিক্সের নিয়ম প্রায়।

নজরুল ছুঁয়ে ভেসে চলেছেন মহেন্দ্রনাথ।
গান ভাসছে হাওয়ায়। প্রবল একলা মহেন্দ্রনাথ তখন একাই গানের আসর হয়ে নিজেকে মাত করছেন। একা মানুষের লজ্জা পেতে নেই, মিইয়ে যেতে নেই। জগতসংসারে যে যত একা, তার তত গানের প্রয়োজন, তার তত হাউহাউয়ের প্রয়োজন।

দু'টো নজরুল পেরিয়ে সবে একটা দরদী বাউলে এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় বাবু মহেন্দ্রর রসভঙ্গ হলো।
"মহিন্দর সাহাব, ডু ইউ ওয়ান্ট আ বিয়ার"?
দড়াম করে ক্লাবের বিলিয়ার্ড রুমে এসে পড়লেন বাবু মহেন্দ্রকুমার।

একটা পালিশ দেওয়া "অফ কৌর্স" বলে তড়িঘড়ি সেই বাউল পরিস্থিতি ধামাচাপা দিয়ে লিলির হাতটা নিজের দিকে টেনে নিলেন ভদ্রলোক।

ও'দিকে

এ'দিককার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বপনবাবুর বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। লাউঞ্জে আসা মাত্রই একজন বেশ সুন্দরী রিসেপশনিস্ট এসে মিহি সুরে "ওয়েলকাম" বলে দু'টো ফর্ম ধরিয়ে দিলে। বেশ সাদাসিধে ফর্ম, মিনিট চারেকের মধ্যেই 'ফিল আপ' হয়ে গেলো। প্রম্পটনেস ব্যাপারটা স্বপনবাবু বরাবরই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। কাজেই ফর্ম জমা দেওয়া মাত্রই যখন অন্য আর এক রিসেপশনিস্ট এসে তাঁকে রুম নম্বর সেভেন-বি'তে রিপোর্ট করতে বললো, ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন।
সেভেন-বি'তে নক করতেই একটা বেশ চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "ভিতরে আসুন"। দেখা হলো এক ভারিক্কি মেজাজের মাঝবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে। ইশারায় স্বপনবাবুকে বসতে বলে একটা পেল্লায় ফাইলে মুখ গুঁজলেন ভদ্রলোক। বলাই বাহুল্য ফাইলের ওপর লেখা, স্বপন চট্টরাজ, (জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১, ১২:৩২ / মৃত্যু ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৩)। চেয়ারে জুত করে বসতে ভারিক্কি ভদ্রলোকই কথা পাড়লেন,
"স্বপনবাবু, আমিই এই স্টেশনের ম্যানেজার, সভ্রহেজ্বজা"।
"নমস্কার..সভ্র..হে..ইয়ে"।
"সভ্রহেজ্বজা। এই স্টেশনের ম্যানেজার"।
"এ'রকম স্টেশন আরো আছে নাকি"?
"ন্যাচেরালি। সমস্ত এক্সপায়ারি তো একটা স্টেশনের পক্ষে হ্যান্ডল করা সম্ভব নয়"।
"তা, আমার এখন কী.."।
"আপনার ভেহিকল তৈরি আছে। তা'তে করে সোজা কোয়ার্টার্সে"।
"কোয়ার্টার্স"?
"হ্যাঁ। সে'খানেই ব্যবস্থা। আমি একটা ব্রশার আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি.."।
"না মানে, সভ্রবাবু.."।
"সভ্রহেজ্বজা"।
"বলছিলাম,সে কোয়ার্টার কি স্বর্গ না মানে.. ন..নরক"।
"আজ্ঞে"?
"মানে, স্বর্গ না নরক"?
"ও'সব ছেলেমানুষি কনসেপ্ট আপনাদের মুখে প্রায়ই শুনি। কিন্তু এ'খানে মশাই সবার জন্য পাইকারি হারে একই ব্যবস্থা"।
"সর্বনাশ। এত পুণ্য অর্জন করলাম, সব কি জলে গেল"?
"ওয়ান ম্যানস পুণ্য ইজ আনাদার ম্যানস সিন। আর মানুষ মাত্রই ঢ্যাঁটা, তাদের পলিটিক্সে আমরা মাথা ঘামাইনা। আপনি যা অর্জন করেছেন, তা হিউম্যান কারেন্সি। ও দিয়ে এখানে ফুটুরডুম হবে"।
"আর ইয়ে, রিবার্থের ব্যাপারটা"?
"মানুষের শখ যত দেখি তত অবাক হই বুঝলেন"।
"ওই ব্যাপারটাও তা'হলে.."।
"অবাক। অবাক হই। আপনাদের দেখে। একটা গোটা জীবন ঘ্যানঘ্যান করে কাটিয়ে দিলেন অথচ এ'দিকে আসা মাত্রই রিবার্থ রিলেটেড এনকোয়্যারি"।
"লাস্ট কোশ্চেন। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড স্যার। ভেহিকল যে'টা দিচ্ছেন, সে'টার উইন্ডো সীট পাবো কি? আসলে নতুন এলাকা তো তাই.."।