Sunday, March 8, 2026

অবশেষে



অবশেষে
অন্ধকার কেটেছে, ঝড় থেমেছে।

ঝগড়াবিবাদ মিটিয়ে নিয়ে সাদাসিধে মানুষের দল যে যার বাড়ি ফিরেছে।
পুড়ে যাওয়া ট্রান্সফর্মার সারাই হওয়ায় তিনদিনের লোডশেডিং পর্বে ইতি টানা গেছে।

বৃষ্টি থামায় পিচ থেকে কভার সরিয়ে ডাকওয়ার্থ ল্যুইসের অঙ্কে মন দেওয়া গেছে।

সাতটা পোস্টকার্ডের খোঁচা দিয়ে একটা পেল্লায় ইনল্যান্ড লেটারি উত্তর আদায় করা গেছে।

অবশেষে
বম্বের পাড়ায় পাতে দেওয়ার মত ডিমতড়কার সন্ধান পাওয়া গেছে।

মহেন্দ্রনাথ ও নজরুল

ভাঙা আসরে একলা পড়ে রইলেন বাবু মহেন্দ্রনাথ। মঞ্চ থেকে গায়ক বিদেয় নিয়েছেন, বাজিয়েরা সরে পড়েছেন। দর্শকরা শতরঞ্চি এলোমেলো করে গায়েব। সুর কানে একা রয়ে গেছেন মহেন্দ্রনাথ। তাঁর চোখ ছলছল, আর বুকপকেটে শালপাতায় মোড়া জর্দাবিহীন সাদা পান। আজকাল বড় একলা হয়ে পড়েছেন তিনি। এই ফুরিয়ে যাওয়া জলসায় সে একাকিত্ব ইয়াব্বড় হয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। মহেন্দ্রনাথ বাধ্য হয়ে গান ধরলেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠে সুর নেই, তবে প্রাণে আছে। নজরুলগীতিতে প্রাণ ঢাললেই তা জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে, ফিজিক্সের নিয়ম প্রায়।

নজরুল ছুঁয়ে ভেসে চলেছেন মহেন্দ্রনাথ।
গান ভাসছে হাওয়ায়। প্রবল একলা মহেন্দ্রনাথ তখন একাই গানের আসর হয়ে নিজেকে মাত করছেন। একা মানুষের লজ্জা পেতে নেই, মিইয়ে যেতে নেই। জগতসংসারে যে যত একা, তার তত গানের প্রয়োজন, তার তত হাউহাউয়ের প্রয়োজন।

দু'টো নজরুল পেরিয়ে সবে একটা দরদী বাউলে এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় বাবু মহেন্দ্রর রসভঙ্গ হলো।
"মহিন্দর সাহাব, ডু ইউ ওয়ান্ট আ বিয়ার"?
দড়াম করে ক্লাবের বিলিয়ার্ড রুমে এসে পড়লেন বাবু মহেন্দ্রকুমার।

একটা পালিশ দেওয়া "অফ কৌর্স" বলে তড়িঘড়ি সেই বাউল পরিস্থিতি ধামাচাপা দিয়ে লিলির হাতটা নিজের দিকে টেনে নিলেন ভদ্রলোক।

ও'দিকে

এ'দিককার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বপনবাবুর বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। লাউঞ্জে আসা মাত্রই একজন বেশ সুন্দরী রিসেপশনিস্ট এসে মিহি সুরে "ওয়েলকাম" বলে দু'টো ফর্ম ধরিয়ে দিলে। বেশ সাদাসিধে ফর্ম, মিনিট চারেকের মধ্যেই 'ফিল আপ' হয়ে গেলো। প্রম্পটনেস ব্যাপারটা স্বপনবাবু বরাবরই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। কাজেই ফর্ম জমা দেওয়া মাত্রই যখন অন্য আর এক রিসেপশনিস্ট এসে তাঁকে রুম নম্বর সেভেন-বি'তে রিপোর্ট করতে বললো, ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন।
সেভেন-বি'তে নক করতেই একটা বেশ চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "ভিতরে আসুন"। দেখা হলো এক ভারিক্কি মেজাজের মাঝবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে। ইশারায় স্বপনবাবুকে বসতে বলে একটা পেল্লায় ফাইলে মুখ গুঁজলেন ভদ্রলোক। বলাই বাহুল্য ফাইলের ওপর লেখা, স্বপন চট্টরাজ, (জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১, ১২:৩২ / মৃত্যু ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৩)। চেয়ারে জুত করে বসতে ভারিক্কি ভদ্রলোকই কথা পাড়লেন,
"স্বপনবাবু, আমিই এই স্টেশনের ম্যানেজার, সভ্রহেজ্বজা"।
"নমস্কার..সভ্র..হে..ইয়ে"।
"সভ্রহেজ্বজা। এই স্টেশনের ম্যানেজার"।
"এ'রকম স্টেশন আরো আছে নাকি"?
"ন্যাচেরালি। সমস্ত এক্সপায়ারি তো একটা স্টেশনের পক্ষে হ্যান্ডল করা সম্ভব নয়"।
"তা, আমার এখন কী.."।
"আপনার ভেহিকল তৈরি আছে। তা'তে করে সোজা কোয়ার্টার্সে"।
"কোয়ার্টার্স"?
"হ্যাঁ। সে'খানেই ব্যবস্থা। আমি একটা ব্রশার আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি.."।
"না মানে, সভ্রবাবু.."।
"সভ্রহেজ্বজা"।
"বলছিলাম,সে কোয়ার্টার কি স্বর্গ না মানে.. ন..নরক"।
"আজ্ঞে"?
"মানে, স্বর্গ না নরক"?
"ও'সব ছেলেমানুষি কনসেপ্ট আপনাদের মুখে প্রায়ই শুনি। কিন্তু এ'খানে মশাই সবার জন্য পাইকারি হারে একই ব্যবস্থা"।
"সর্বনাশ। এত পুণ্য অর্জন করলাম, সব কি জলে গেল"?
"ওয়ান ম্যানস পুণ্য ইজ আনাদার ম্যানস সিন। আর মানুষ মাত্রই ঢ্যাঁটা, তাদের পলিটিক্সে আমরা মাথা ঘামাইনা। আপনি যা অর্জন করেছেন, তা হিউম্যান কারেন্সি। ও দিয়ে এখানে ফুটুরডুম হবে"।
"আর ইয়ে, রিবার্থের ব্যাপারটা"?
"মানুষের শখ যত দেখি তত অবাক হই বুঝলেন"।
"ওই ব্যাপারটাও তা'হলে.."।
"অবাক। অবাক হই। আপনাদের দেখে। একটা গোটা জীবন ঘ্যানঘ্যান করে কাটিয়ে দিলেন অথচ এ'দিকে আসা মাত্রই রিবার্থ রিলেটেড এনকোয়্যারি"।
"লাস্ট কোশ্চেন। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড স্যার। ভেহিকল যে'টা দিচ্ছেন, সে'টার উইন্ডো সীট পাবো কি? আসলে নতুন এলাকা তো তাই.."।

ভীতুর উল্লাস

আমি খুব ভীতু মানুষ। এবং আর পাঁচটা ভীতু মানুষের মত চাকরীর আশ্রয়টা আমার খুব দরকারি। সে অর্থে অ্যাম্বিশন নেই কিন্তু ভয় বিস্তর; হাতের পাঁচ যে'টুকু আছে সে'টুকুও যেন কোনোদিন কোনোভাবে ফসকে না যায়। বলাই বাহুল্য প্রিভিলেজড দুনিয়ায় আমার বসবাস। অতএব সত্যিই যারা অসহায় ও সম্বলহীন, তাঁদের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। আমার সেভিংস আছে, ইনস্যুরেন্স আছে, আগামী মাসে মাইনে না ঢুকলেও চাল-সবজি কেনার উপায় রয়েছে। তবুও আমার একটা বড় ভয়ের জায়গা হচ্ছে 'হঠাৎ কোনও একটা ভুলে, বা সামান্য অসতর্কতায় চাকরী খোয়ানো'। বয়স যত বাড়ছে সে দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে; এই যে খেটেখুটে কাজের জায়গায় যে সামান্য সুনাম অর্জন করেছি, তা যে কতটা ভঙ্গুর তা প্রতি মূহুর্তে টের পাই।

কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি ক্ষমার অযোগ্য। বারবার ভুল করে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাই। সে সব ইনএফিশিয়েন্সি মকুব করার দাবী আমার নেই। কিন্তু মূহুর্তের অসতর্কতায় জীবন এস্পারওস্পার হয়ে যাওয়া, ভয় সে'খানে। আর একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, যারা কাজ করে তাঁদের প্রত্যেকের ভুল হয়। ব্যাঙ্কের কর্মী, ক্রিকেটার, লেখক, ইনফ্লুয়েন্সার, এমএলএ, শিকারি, জাদুকর; সবার হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে "টু বি ইন দ্য রং প্লেস অ্যাট দ্য রং টাইম"। অনেক সময় হয় কী আপাত দৃষ্টিতে যে ভুল নিতান্তই ছোটখাটো, সে'টা এমন সময়ে ঘটে যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তেমনও ঘটে বটে অনেকসময়।

একটা ব্যাপার বড় অদ্ভুত। নিজের কাজে সবাই দৈনন্দিন কত ভুলচুক করছি, অথচ অন্যের একটা সে'রকমই ভুল ধরতে পারলে যে মব-উল্লাস দেখা যায়, বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায়, তা দেখে গলা শুকিয়ে যায়। এ ওই গণধোলাই দেওয়ার প্রবণতা, এই যা "দে শালাকে দু'ঘা" বলে নাচতে পারা; ব্যাপারটা যত দেখি তত বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বিশেষত খেটে-খাওয়া কর্মীদের ভুলের প্রতি আখের-গুছিয়ে-রাখা মানুষদের যে সমবেত আক্রোশ, তা দেখে অসহায় বোধ হয়। ভয় হয়। এত রাগ আমাদের মধ্যে, এত প্রবল তলপেটে লাথি কষানোর ইচ্ছে; একটা দুর্বল এলেবেলে টার্গেট পেলেই হলো। হয়তো নিজেদের যন্ত্রণাকে সামাল দিতে না পারার ফলে অন্যের কলার টেনে ধরার ইচ্ছেটা সবার মধ্যেই প্রবল (নিজেকেও বাদ দিচ্ছি না সে খুনে হায়েনার দল থেকে)। একজন অসহায় মানুষকে রগড়ে নিজেদের বিপ্লবী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে আমাদের সার্থকতা। তা'তে কার চাকরী গেলো, কার জীবন জলে গেলো; সে'সব নিয়ে ভাবতে বসলে আমাদের রাগ নেতিয়ে যাবে, কাব্য শুকিয়ে যাবে। তাই এ'ভাবেই এগিয়ে চলা ছাড়া কোনও গতি দেখি না। যদ্দিন সোশ্যাল-মবের ইনফ্লুয়েন্সিং লাথিটা নিজের পেটের দিকে ধেয়ে না আসছে, তদ্দিন 'অল ইজ ওয়েল' বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই আমাদের কাজ।

মেজোপিসের কমেন্ট্রি

মেজোপিসের সঙ্গে খেলা দেখতে বসলে শুভর খেলাটা আর দেখা হয় না, পিসের কমেন্ট্রিতে কান রেখেই সময় কেটে যায়। সমস্যা হলো পিসেমশাইয়ের ব্যক্তিত্ব যতটা তীক্ষ্ণ, অবজার্ভেশনগুলো ততটাই মোটা-দাগের। কাজেই চট করে "আরে থামো না পিসে" বলাও যায় না, আবার অযথা গালগল্পও সহ্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

ব্যাটার মিস করলে, পিসে বললে, "উইকেটে লাগলেই আউট ছিলো"। আরে বাবা, উইকেটে লাগলে আউট যে হবে সে'টা বলার কী দরকার।

স্টেপ করে কেউ ছক্কা হাঁকালে। পিসে; "স্টেপ আউট না করলে এই শটটা মারতে পারতো না বুঝলি। স্টেপ আউট করেছে তাই পারলে"। এ কথার প্রতিবাদ হয় না, মেনে নেওয়াও যায় না।

বোলার ওয়াইড বল করলে। মেজোপিসে জানালে যে বোলার রানআপ শুরু করার আগেই নাকি তাঁর মন বলছিল যে এ'বারে ওয়াইড দেবে। পরের বলে কী হবে মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলবে "পরের বলের ব্যাপারে ঠিক ফিলিংটা আসছে না। ইনস্টিঙ্কট সবসময় কাজ করে না রে"।

কেউ ছয় মারলে। "আরে তোর রোল ধরে খেলার"। ঠিক আছে, মেনে নিলাম। পরের বলেই ব্লক করলে। "আরে ধরে খেলবি মানে কি রানই নিবি না"?

শুভ ভাবছে হয় ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দেবে অথবা পরিবার-সহ পিসির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে। কিন্তু দিনের পর দিন এই "ভালো না খেললে জেতা মুশকিল" ধরণের মন্তব্য শুনে আর খেলা হজম হচ্ছে না।