Sunday, June 1, 2025

গুলজার

নিরলস তপস্যা করলে তবে মিথ্যেরা গুল হয়ে ফুটে উঠতে পারে।
মিথ্যেরা নির্মম, গুলেরা সাধক।
মিথ্যেরা তলোয়ার নিয়ে তম্বি করে, গুলেরা হরবোলা হয়ে অলিগলি সরগরম করে ঘুরে বেড়ায়।

সেই গুলবাবাজীই যখন ভালোবেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তখন সে হয়ে ওঠে গপ্প।
গুলে আতসবাজি, গপ্পে সুর।
গুলের হিং টিং ছট, গপ্পের পাশে এসে দু'দণ্ডের জন্য বসা।

আর গপ্পদাদার যখন ভালোবাসায় চোখ ছলছল,
তখন তার আদত মুক্তি; তখন সে আশ্বাস - "সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো"।

দ্য গ্রেট মুম্বই সিক্রেট



মুম্বই বড়াপাউরুটি নিয়ে উপন্যাস-কবিতা লিখবে, ট্রেনের ভিড় নিয়ে স্পিরিট বিষয়ক লেকচার দেবে, তবু নিজের তুরুপের তাসটা সচরাচর বের করবে না: একটা আস্ত সমুদ্র। রোব্বারে রাস্তায় জ্যাম নেই, মানুষ তাড়াহুড়ায় তালগোল পাকিয়ে হদ্দ হচ্ছে না, সেই সুযোগে সকালে গিয়ে যে কোনো বীচে গিয়ে দাঁড়ালেই মনে হয় দু'দণ্ড বসি, গুনগুনিয়ে গান গাই (ঢেউ ভাঙার শব্দের সে অ-সুর অন্য কারুর কানে পৌঁছবে না), ধীরে সুস্থে হাঁটাহাঁটি করি, সামান্য জিরিয়ে নিই।

অফিস-বাড়ির কাজে এ সমস্ত কিছুতে পেষাই হওয়ার ফাঁকে হপ্তায় একদিন আরবসাগর সুরসিক গপ্পিয়ে গাইয়ে মেজমামার মত মাদুর পেতে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে আছে। সেই শেল্টার ক'টা তাবড় শহরে মেলে? অথচ এই বিশাল ব্যাপারটাকে একটা তাবড় ট্রেডসিক্রেটের মত চেপেচুপে রাখাটাই এ শহরের 'রিলিজিয়ন'।

কাবাববন্ধুর প্রতি



কাবাবওলার সঙ্গে গলায়-গলায় দোস্তি নির্মলবাবু্র। কাবাবের দোকানটা নির্মলবাবুর বাড়ি থেকে হেঁটে বড়জোর দেড়-মিনিট, রাস্তার ধারের ছোট্ট ঠেলা বই তো নয়। কিন্তু কাবাবদাদাটি বড় দরদী। আগুনে নির্মমভাবে মাংস পুড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে গাম্বাটপনা আছে, কাবাব শিল্প নেই; সে'কথাটা নির্মলবাবুকে আত্মস্থ করিয়েছেন এই কাবাবকবিই।

সন্ধে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সে ঠেলার চারপাশে বড্ড ভিড়। ব্যাচেলর মধ্যবয়স্ক নির্মল সাহা হপ্তায় অন্তত বার দুয়েক সে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ান তবে রাত এগারোটা নাগাদ। বাড়াবাড়ি ভিড়ে কাবাবের কদর করতে পারেন না ভদ্রলোক। নির্মলবাবু এমনিতে রাত আটটায় ডিনার সেরে নেন, তবে কাবাবের ম্যাজিক বুঝতে মোটাদাগের পেটের খিদে নয়, দরকার রসিক মনের চনমন। এ সত্যটাও কাবাবিস্ট-ভাইটির থেকেই শেখা।

আজ বাতাসে মৃদু বৃষ্টির আভাস ছিলো। মাঝেমাঝে দু'চার ফোঁটা গায়ে এসে পড়ছিলোও বটে। তা'তে আগুন নেভার নয়, তবে হাওয়ায় সামান্য ছ্যাঁত যোগ হচ্ছিল বটে। নির্মলবাবু একটা ফ্লাস্কে চা নিয়ে আসেন, দু'টো প্লাস্টিকের কাপ। এক কাপ কাবাবনবাবকে ধরিয়ে নিজে এক কাপ ঢেলে দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসেন। এ'টাই নিয়মে দাঁড়িয়েছে।

- নির্মলবাবু, আজ চায়ের পাতা নতুন মনে হচ্ছে?
- ঠিক ধরেছ হে। নিউমার্কেট থেকে নতুন আমদানি।
- ভারি মোলায়েম। বহুত খুব।
- আকাশ দেখেছ? আজ রাতে ঢালবে, জানো।
- গরমটা একটু কমবে বটে তা'তে। আপনার শিক দু'টো রেডি। এক মিনিট দিন, ফ্রেশ পেঁয়াজ কুচিয়ে দিই।

নির্মলবাবুর স্নেহ অনুভব করেন। পোড়া কয়লার উষ্ণতা গায়ে এসে ঠেকে। কানে আসে কাবাবক্যাপ্টেনের পেঁয়াজ কুচোনোর মিহি শব্দ। নির্মলবাবুর বিশ্বাস প্রতিবার কাবাবগুরু তাঁর জন্য একটু বাড়তি ভালোবাসা নিয়ে মাংস ঝলসান, পেঁয়াজ কুচোন, আর প্লেট সাজিয়ে দেন। আসল স্বাদটুকু বোধ হয় সে বিশ্বাসেই। নির্মলবাবু টের পান যে এই ঘিঞ্জি শহরে তিনি একা নন।

কাবাববন্ধুর প্রতি মনে মনে বিগলিত সেলাম ঠুকে এই শনিবারের শেষ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিলেন নির্মলবাবু।

মেজোকাকা ও লাল



ফুলুদির বিয়ের সকালে পরার জন্য মেজোকাকা একটা লাল রঙের ফতুয়া কিনেছে। মিইয়ে যাওয়া লাল নেয়, একবারে যাকে বলে গনগনে লাল। ভোরবেলা উঠে, স্নান সেরে; সে ফতুয়া আর পাজামা চাপিয়ে গোটা বিয়েবাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মাঝেমাঝেই সলজ্জ হাসি নিয়ে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করছে "স্নোপাউডার ছাড়াই আমায় বোধহয় ফুলুর চেয়েও ব্রাইট লাগছে, তাই না"?

ব্রেকফাস্টে দু'টো বাড়তি কচুরি চেয়ে খেলে কারণ "রেড কালার এমনিতেই স্লিমিং"। ফুলুদির শ্বশুরবাড়ি থেকে এক ঝাঁক হবু দেওর এলো তত্ত্ব নিয়ে, মেজোকাকা তাদের ফলাও করে "রেড স্যালুট জেন্টলমেন, মাছ-মিষ্টির ডালাগুলো আমায় দাও। বাকি ট্রেগুলো ওই খাটে সাজিয়ে রাখো। চলো জওয়ান, লেফট রাইট লেফট.."।

দুপুরের দিকে ট্যুয়েন্টিনাইনের আসরে বসে বারবার বলে চললে যে "হাতে দু'তিনটে লাল কার্ড এলে কিন্তু কল আমিই ধরবো, কালারটা হেবি সুট করেছে"। সন্ধেবেলা আদ্দির পাঞ্জাবি পরার কথা ছিল, কিন্তু শেষে দরদী সুরে গান গেয়ে ঘোষণা করলে যে "ইয়ে লাল রঙ ম্যায় নহি ছোড়ুঙ্গা"। রাতের দিকে ফুলুদির বিয়ে মিটে গেলে মেজোকাকা আমাদের ছেলেছোকরাদের আসরে এসে বসে ভাটিয়ালি গাইলে আর বড়জ্যাঠার মাতব্বরি নিয়ে প্রাণখুলে নিন্দে করলে।

রাত দু'টো নাগাদ শুতে যাচ্ছি। মেজোকাকা পাশে এসে কাঁধে হাত রাখলে।

- ভটকাই, ইউ আর আ গুড বয়।
- মদ খেয়েছো কাকা?
- না। ওই একটিই লাল, মানে লাল জল, আমার সয় না। অম্বল হয়।
- তবে হঠাৎ প্রশংসা? ইডিয়ট হতচ্ছাড়া বাদে কোনোদিন কিছু বলতে শুনলাম না তো।
- একটা কথা কাউকে বলা হচ্ছে না। বলা দরকার।
- কী ব্যাপার কাকা?
- আমার বিজনেসে লালবাতি জ্বলে গেলো রে। গত পরশু থেকে শাটার ডাউন।
- সর্বনাশ। কাকী জানে?
- ফুলুর বৌভাতে পরবে বলে একটা গর্জাস লাল বেনারসি কিনেছিলো। সে'টা একদিন অন্তত আনন্দ করে পরে নিক।
- এরপর?
- প্রদীপ দত্ত এ'সব মাইনর সেটব্যাকে ঘাবড়ে যায় ভেবেছিস? গত তিরিশ বছরে চারটে ব্যবসা করেছি। সব কটাতেই লাল হয়েছি আবার ডুবেওছি। নতুন ব্যবসা খুঁজে নিয়েছি। ফুলুর মেয়ে বা ছেলের মুখেভাতে দেখিস আমার কী র্যালা।
- যাক। নিশ্চিন্ত হলাম।
- কাউকে বলতে না পেরে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এ'বার একটু স্বস্তি পেলাম।
- ক্যাটক্যাটে লাল জার্সিটা এ'বার ত্যাগ করবে কি?
- ওই রঙের কনফিডেন্সেই তো মার দেগা কেল্লা অ্যাটিটিউডটা ধরে রাখতে পেরেছি রে রাস্কেল।
- আবার রাস্কেল?
- ও'সবে মন খারাপ করতে নেই ইডিয়ট। ইউ আর আ গুডবয়। নে, একটা বিড়ি খাওয়া দেখি।

প্রেম-ফেল

ফার্স্ট ইয়ারের শেষ দিকে গজিয়ে ওঠা ভালোবাসা থার্ড ইয়ারের শুরুর দিকে ফেল পড়া মাত্র সুমন্ত নরম প্রেমের গান শোনা বন্ধ করেছে। বিকেলে পার্কের বেঞ্চে বসে আহা-উঁহু করার মত মনোরম হাওয়া গায়ে লাগলেই দাঁত খিঁচিয়ে গ্লোবালওয়ার্মিংয়ের কথা বলছে। গল্পের বই বাদ দিয়ে ধারালো সব সেল্ফডেভেলপমেন্ট মার্কা বই খুঁজছে। এমন কী শুরুর দিকে সিগারেট ধরার একটা মৃদু চেষ্টাও করেছিল, তবে অনেক কেশেও ধোঁয়া ব্যাপারটার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলা যায়নি। তার বদলে সর্বক্ষণ চুয়িংগাম চিবিয়ে গোটা দুনিয়াকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করে চলেছে সে। তবে এত কিছু করেও সুমন্ত নিজের অপ্রেমিক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের ঝাঁজ নিয়ে সন্তুষ্ট হচ্ছিল না। আরও রাগতে হবে, গর্জে উঠতে হবে, কথায় কথায় খেইমেই করে উঠতে হবে, তেমনটাই তার ইচ্ছে।

শেষে এক বর্ষার বিকেলে সব এলেমেলো হয়ে গেলো, যেমনটা হয় আর কী। যুগে যুগে তো ঠিক এ'ভাবেই বিপ্লব ভেসে গেছে, ফিকে হয়ে এসেছে প্রতিবাদের রঙ। বিকেলের দিকে রেলের মাঠের পাশে ফার্স্টইয়ারি ভালোবাসাকে ফুচকার ঝালে নাকানিচোবানি খেতে দেখে ইনকিলাব হলো টলোমলো। পড়ন্ত আলোয় ফেলে-আসা-"ও"কে ফুচকা সাঁটাতে দেখে সব কেমন যে্ন এলোমেলো হয়ে গেলো। সুমন্তর মনে পড়লো "আহা, ও যে আমার চেয়ে মাস চারেকের ছোটো। যেই ওর সঙ্গে থাকুক, ফুচকাওলাকে ঝালের ব্যাপারে সঠিক ইন্সট্রাকশন যেন দিতে পারে। ও যে ঝাল সইতে পারে না"।

এরপর "বম্ ভোলে" হুঙ্কার দিয়ে নচিকেতার প্রেমের গান গুনগুন করতে করতে বাড়ির দিকে এগোলো সুমন্ত, আজ নারায়ণ দেবনাথে ঝাঁপ না দিলেই নয়।