Sunday, January 14, 2024

ব্যাটম্যান



ছাতা হাতে নয়৷
ব্যাগ পিঠে নয়৷
এমন কী ছড়ি হাতেও নয়৷
ভদ্রলোক একটা আস্ত ব্যাট নিয়ে বাড়ি-অফিস-বাড়ি যাতায়াত করেন, নিয়মিত। 

ব্যাট নিয়ে যাতায়াত করার রকমারি সুবিধে।

১। বাসস্টপের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে রাস্তার পিচ ঠুকঠাক করর নেওয়া যায়৷ সে'ভাবেই তিনি মনের রাশ টেনে রাখেন৷

২। অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে দু'একটা শ্যাডো শট খেলা যায়; বেশি মারকুটে কিছু নয়, ব্যাট স্যুইং বেশি হলে আশেপাশের মানুষজনের অসুবিধে।  এইসব শ্যাডো ডিফেন্স বা নিখুঁত লেগ-গ্লান্সে মেজাজের চনমন বজায় রাখা যায়৷

৩। ট্রেনের দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর সময় ব্যাটটা কাঁধে গদার মত নিয়ে দাঁড়াতে পারলে বুকে বাড়তি বল পাওয়া যায়৷ ব্যাটের সুইটস্পট বুকের যত কাছে, ততটাই দাপট নিয়ে চোয়াল শক্ত রাখা যায়৷

৪। সব চেয়ে বড় কথা বাড়ি ঢোকার সময় পায়ের আগেও চৌকাঠ পেরোয় ভদ্রলোকের ব্যাট৷

শুধু ব্যাট তুলে স্টেডিয়ামের অভিবাদনে সাড়া দেওয়ার ভঙ্গীমায় বাড়ি ফিরে ব্যাট তুলে "আমি ফিরে গেছি" বলাটাকে গিন্নী "বাড়াবাড়ি কোরো না" বলায় সামান্য চেপে যেতে হয়।

**

(ছবিটা এক লহমার। কিন্তু সে ছবিতে ভর দিয়ে নিজের কল্পনায় এমন একটা রূপকথার মানুষকে গড়ে নিতে বেশ লাগে)।

কাউন্সেলিং

- ভিতরে আসব?

- আসুন।

- বসব?

- তিরিশ সেকেন্ডের বক্তব্য হলে বসে লাভ নেই৷ তার চেয়ে লম্বা কিছু হলে..বসুন। বসুন।

- তা'হলে বসি।

- হুম।

- আমার নাম অভ্র..।

- অভ্র হালদার। লিগাল টীমে আছেন৷ বয়স বেয়াল্লিশ৷ এই কোম্পানিতে সাড়ে সাত বছর আছেন..।

- ওহ মানে..।

- বিবাহিত।  দুই ছেলে৷ 

- তাই তো। আপনি সমস্তই জানেন।

- আপনার ওয়াইফের চেয়ে বেশি জানি আপনাকে৷ 

- আই সী। আসলে কী হয়েছে..।

- একটা কথা বলি? আমি আপনাকে আপনার চেয়ে  ভালোভাবে চিনি..।

- সিরিয়াসলি?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। মজাটা কী জানেন? এই কথাটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না৷

- আসলে..।

- এই 'আসলে' শব্দটা আপনি বড্ড বেশি ব্যবহার করেন।

- সরি৷ আসলে হয়েছে কী..।

- আবার?

- সরি।

- সরিও বেশি বলেন।

- আপনি আমাকে আমার চেয়ে বেশি..? 

- চিনি।

- কিন্তু আমি নিজের ব্যাপারে এমন অনেক কিছু জানি যা আপনার জানার কথা নয়..।

- ভল্যুম অফ ইনফর্মেশন ইজ ইরেলেভ্যান্ট৷ সেই ডেটা কে কী'ভাবে প্রসেস করছে, প্রজেক্ট করছে; সে'টাই আদত ব্যাপার। বললাম তো, আমি আপনাকে আপনার চেয়ে ভালো চিনি। আর সে জন্যই আপনার কোম্পানি আমায় রেখেছে৷ অনেক পয়সাকড়ি খরচ করে রেখেছে, এম্পলয়িদের কাউন্সেল করতে।

- আমার চিরকালই মনে হত..।

- আপনার মনে হত ব্যাপারটা হ্যোক্স।

- আপনি জানেন আমি কেন এসেছি?

- আপনার রিসেন্ট সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতি দেখে এ'টুকু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না আপনি ভীষণ অস্থির৷ আপনার স্মার্টওয়াচের রেকর্ড মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সিচুয়েশনটা সিরিয়াস। অফিস মেডিকাল কার্ডে দেখলাম; ভাইটালে প্রচুর গরমিল। কাজের জায়গায় যা সব ভুল নামিয়েছেন..।

- আসলে হয়েছে কী..।

- আবার আসলে! বেশ৷  আমিই বলি আসলে কী হচ্ছে। আপনি ভয় পাচ্ছেন অভ্রবাবু৷ আর সেই ভয়ের কথা কাউকে বলতে আরও ভয় পাচ্ছেন।

- সরি।

- সরি কীসের৷ দিস ইজ দ্য বেস্ট প্লেস। আই অ্যাম ইওর বেস্ট হোপ। আমার কাউন্সেলিং ছাড়া গতি নেই। এ'খানে এসে খুব ভালো করেছেন।

- আমি উঠি।

- ও মা! আরে! কাউন্সেলিং আপনার খুব দরকার! আমার কাউন্সেলিং।

- আমিও তাই ভেবেছিলাম, আমার দরকার এআই-য়ের কাউন্সেলিং।

- সঠিক ভেবেছেন। ওই যে বললাম, আমি চিনি আপনাকে৷ আমি জানি আপনার কী দরকার।

- হয়ত জানেন৷ হয়ত আমার জন্য কী ভালো কোনটা মন্দ, সে'টা আপনিই ঠিকঠাক বাতলে দেবেন৷ কিন্তু আমি যে নিজের ভালোটা চেয়েই হন্যে হচ্ছি তা কিন্তু নয়।

- ইয়ে, শেষ কথাটার মানে বুঝলাম না...।

-... অথচ আপনি আমায় আমার চেয়েও ভালো চেনেন৷ সত্যিই তাই৷ আপনার সঙ্গে গল্প করলে আমার হয়ত মঙ্গলই হত৷ কিন্তু আমার বোধ হয় একটা হাবিজাবি মানুষের প্রয়োজন- যে আমার গল্প শুনবে৷ চোখ বড় বড় করে মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞেস করবে, "তারপর"? আপনি দরকারী, সে'টা অস্বীকার করছি না৷ আপনার কাছেও ফিরে আসব নির্ঘাৎ।  তবে আজ থাক। চলি এআইবাবু।

ভাজা মৌরির বাটি

রেস্টুরেন্টের লক্ষ্মী হলো ক্যাশকাউন্টারের সামনে কমলা রঙের প্লাস্টিকের বাটিতে বা স্টিলের চ্যাপ্টা দু'খোপের প্লেটে রাখা ভাজা মৌরি আর ডুমো মিছরি৷ তার ওপর অবশ্যই একটা ছোট্ট চামচ৷ ও জিনিসের মোহ ফুচকার ফাউ বা টিটুয়েন্টির সুপারওভারের চেয়েও বেশি৷ একটু কেতওলা রেস্টুরেন্ট মানেই ওয়েটাররা সস্তা নকল-চামড়ার জ্যাকেটে বিল আর মুখশুদ্ধির বাহারে বাটি নিয়ে টেবিলে রেখে যাবেন। তা'তে মৌরি-মিছরি খাবলে নেওয়া যায় বটে, কিন্তু ম্যাক্সিমাম তৃপ্তি নেই।

মজা হলো সে'সব খাওয়ার 'দোকানে' যে'খানে টেবিল থেকে উঠে গিয়ে, বেসিনে হাত ধুয়ে এগিয়ে যেতে হয় ক্যাশবাক্সের পিছনে বসে থাকা ম্যানেজারের দিকে। ম্যানেজার ব্যাজার মুখে হাঁক ভাসিয়ে দেবেন "বারো নম্বর টেবিলে কী কী ছিল"। জনসমুদ্র থেকে মায়াবী হিসেব ভেসে আসবে, "একটা মোগলাই স্পেশ্যাল৷ একটা ফিশফ্রাই৷ দু'টো থামস আপ"৷ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লেখার স্টাইলে ম্যানেজার হলুদ বা গোলাপি কাগজে ঘসঘস করে ডটপেন চালাবেন৷ তারপর মুখ তুলে বলবেন, "দু'শো আশি"।

এরপর একটা পাঁচশোর নোট ম্যানেজারের দিকে এগিয়ে দিয়ে মৌরি-মিছরির বাটি কাছে টেনে নেওয়া৷ চামচ এমন ভাবে খেলাতে হবে যাতে মিছরি মৌরির রেশিও মনমত হয়৷ এরপর ফেরত টাকা মানিব্যাগে রাখতে রাখতে ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে সামান্য ঘাড় দোলানো।

মুখ ভরা মৌরি, কাজেই কথা নয়৷ স্রেফ বডিল্যাঙ্গুয়েজের খেলে বুঝিয়ে দিতে হবে "ভালোই খেলাম আপনাদের দোকানে৷ ফার্স্টক্লাস! তা, আজ আসি, কেমন? আবার দেখা হবে"৷

মাঙ্কিটুপির তালুর ফুল

মাঙ্কিটুপির সবচেয়ে দামী অংশটা হলো মাথার তালুতে বোনা ওই ঝিরঝিরে ছোট্ট ফুল। ও'টার অস্তিত্ব অত্যন্ত জরুরী; মাঝেমধ্যে নিজের টিকি (হোক টুপির এক্সটেনশন, আছে তো আমার মাথায়) চুলকে নেওয়ার মধ্যে যে কী দারুণ তৃপ্তি রয়েছে৷

কল্পনায় সাজিয়ে নিন;
হিলস্টেশনের পড়ন্ত বিকেল৷
প্রবল শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আপনি এক ছোট্ট রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লেন৷
জীর্ণ কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে,
এক প্লেট থুকপা অর্ডার দিয়ে,
রাবড়ি-মিষ্ট মেজাজে, চোখ নরম করে বুজে- নিজের মাঙ্কিটুপির তালুর ফুলে আঙুল বুলিয়ে চলেছেন। অপূর্ব না? তবে এর চেয়েও হাইক্লাস ব্যাপার বোধ হয় প্রেমিকার মাঙ্কিটুপির তালুর ফুল ধরে টান দিয়ে বলা, "অ্যাই অ্যাই, ও'দিকে দ্যাখো...আকাশের রঙটা কী মার্ভেলাস"!

পুনশ্চ:
মনে রাখবেন৷ মাঙ্কিটুপিতে যদি ওই তালুর-ফুলখানা না থাকে তা'হলে জানবেন ও'টা মাঙ্কিটুপির পদ্য নয়৷ ও'টা কিডন্যাপার বা ব্যাঙ্কিডাকাতদের মুখঢাকার টুপি৷ 

Friday, January 12, 2024

সুবিমল আর লিপি

সে'দিন বাড়ির পরিবেশ অগ্নিগর্ভ।

সুবিমল একথলে চুনোমাছ নিয়ে সদ্য বাজার থেকে ফিরেছে৷ বলাই বাহুল্য চুনোমাছগুলো বাজার থেকে না কাটিয়েই সে বাড়ি চলে এসেছে৷ ছুটির বাজারে কোনও মাছওলার অত সময় নেই যে আলাদা করে আধকিলো চুনোমাছ কেটে, ছাড়িয়ে, পরিষ্কার করে প্যাকেট করে দেবে৷ কাচুমাচু সুবিমল বাড়ি ফিরেই অবশ্য নিজেই রান্নাঘরের সিঙ্কে মাছের প্যাকেট উপুড় করে তা বাছতে বসেছে৷ 

লিপির মেজাজ সপ্তমে, সে'টা অকারণ নয়৷ আধকিলো মাছ কেটে ধুয়ে গামলায় রাখতে সুবিমলের বেলা কাবার হয়ে যাবে৷ রান্না চাপাতে চাপাতে বেলা গড়িয়ে বিকেল৷ সন্ধের চা আর দুপুরের ভাত একসঙ্গে খেতে হবে৷ পুরো দিনটাই জলে।

সুবিমলের এই এক রোগ, বড় ধীরেসুস্থে তার চলাফেরা৷ রোববার বাজারে তিনঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে যৎসামান্য জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফেরা৷ দাড়ি কামাতে গিয়ে অন্তত চল্লিশ মিনিট ধরে গালে সাবান ঘষে আর গুনগুনিয়ে নচিকেতার গান গাওয়া৷ ক্রসওয়ার্ড পাজল সলভ করে অবলীলায় ছুটির বিকেলগুলো কাটিয়ে দেওয়া। 

সুবিমলের এই গা-এলিয়ে চলা অভ্যাসের জন্য লিপিকে যে কতরকম হয়রানি সামলাতে হয়৷ সামান্য বাতাসা আনতে বেরিয়ে ঘণ্টা দুই ঘোরাঘুরি করে ফিরে এসে বলে, "যাহ্, ভুলে গেছি"৷ অফিস ফেরতা দু'জনের সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা। লিপি সিনেমা হলের সামনে বেমক্কা দাঁড়িয়ে রইল, অথচ সুবিমলের দেখা নেই আর তাঁর মোবাইল বেজে যাচ্ছে; ফোন ধরার নাম নেই৷ দুশ্চিন্তায় জেরবার হয়ে ঘণ্টাখানেক পর লিপি বাড়ি ফিরে গেলে৷ জানা গেল সুবিমল মোবাইল ফোন অফিসে ফেলে বেরিয়ে পড়েছিল। অত্যন্ত ভিড় দেখে পর পর বেশ কয়েকটা বাস ছেড়ে দিয়েছে।

সুবিমলকে মন দিয়ে মাছ বাছতে দেখে সে'সব কথাই বারবার মনে পড়ছিল লিপির। লিপি জানে এখুনি সুবিমল লিপির দিকে ঘুরে তাকিয়ে বোকা বোকা হাসির ঢাল বাগিয়ে বলবে, "একদম ফ্রেশ পেয়ে গেলাম, বুঝলে, টপ কোয়ালিটি৷ একেবারে হাইক্লাস৷ চট করে ভেজে নিচ্ছি, তারপর দু'জনে মিলে রসিয়ে রসিয়ে ঘি-ভাতের সঙ্গে খাব'খন৷ এখুনি রেডি হয়ে যাবে"৷

তারপরেই প্রবল ঝগড়া৷
সে বাড়ির ছাত উড়িয়ে দেওয়া ঝগড়া৷
আকাশ কালো করে আসা ঝগড়া৷
আগুনে ঘি ঝগড়া৷ 

সেই ঝগড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের মোবাইলে সুবিমলের এই ফটোটা তুলেছিল লিপি৷ নীল-সাদা টিশার্ট আর পাজামা পড়ে কিচেন সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে সুবিমল। দ' হাতে চুনো মাছ কচলাচ্ছে, আর ঘাড় ঘুরিয়ে লিপির দিকে তাকিয়ে সে কী মারাত্মক বোকা-বোকা হাসির ফোয়ারা বইয়ে দিচ্ছে।

এত রাগ, এত ঝগড়া৷ তবু সে বোকাবোকা হাসিতে নির্ঘাৎ একটা গোলমেলে ব্যাপার ছিল৷ নয়ত ওই তেলেবেগুন অবস্থাতেও লিপি সুবিমলের ছবি তুলে রাখতে যাবে কেন? অত রাগবিরক্তির মধ্যে এই ছবিটা কেন তুলে রেখেছিল লিপি?

মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে খানিকক্ষণের জন্য চোখ বুঝলে লিপি৷ আজও, সুবিমলের সেই আলাভোলা হাসি যখনতখন দেখার জন্য তার মোটেও মোবাইল ফোনের দ্বারস্থ হতে হয় না৷