Sunday, February 19, 2023

ফিরোজ শাহ কোটলায় ক্রিকেট-হুজুগিস্ট



আমরা যারা ক্রিকেট-হুজুগিস্ট, তাদের চোখ দিয়ে খেলাটাকে বিশ্লেষণ করতে চাওয়া আর শালপাতার দোনায় ইলিশের ঝোলভাত খাওয়া একই ব্যাপার। আমাদের ক্রিকেট-আড্ডায় ক্রিকেটটাই ভেসে যায় বিকট হ্যা-হ্যা-হো-হো অথবা অযথা গলাবাজিতে; তবে সেই ভেসে যাওয়াটা বোধ হয় নেহাৎ অক্রিকেটিয় নয়৷ ক্রিকেট গ্যালারির 'লক্ষ্মী' হল এই হুজুগিস্টরাই (নিজেদের গান নিজেরাই গাইব, তা'তে আর আশ্চর্য কী)। তাদের পাগলামিতেই মেক্সিকান ওয়েভ উত্তাল হয়, স্টেডিয়ামের গেটের বাইরে শস্তা জার্সির হাজারে হাজারে বিক্রি হয়, আধমাইল দূরে দাঁড়ানো প্লেয়ারদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে চেল্লামেল্লি জুড়ে দেওয়া হয় যেন সে কোহলি-রোহিত নয়; পাড়ার বাপ্পাদা, আমাদের ডাক শুনলেই এগিয়ে এসে সিগারেটের কাউন্টার দেবে বা চা-মামলেট কিনে খাওয়াবে৷

যা হোক, সেই ক্রিকেট-হুজুগিস্ট-অ্যাসোসিশিয়েনের অন্যতম সভ্য হিসেবে আজ গেছিলাম ফিরোজ শাহ কোটলায়, ভারত-অস্ট্রেলিয়া সেকেন্ড টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা দেখতে৷ একটামাত্র টিকিট জুটেছিল, কাজেই পরিব্রাজকের মত একাই সক্কাল-সক্কাল পৌঁছে গেলাম৷ কোভিডের পর এই প্রথম মাঠে যাওয়ার সুযোগ, একা-দোকা ভাবলে চলবে কেন? তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢোকার কথা। ঢোকার মুখে প্রতিবার যা করি, এ'বারও করলাম৷ জার্সি দরদাম; কখনও কিনি, কখনও কিনি না৷ কিন্তু জার্সি বিক্রিবাটা যে'খানে হচ্ছে, সে'খানে গিয়ে খানিকক্ষণ না দাঁড়ালেই নয়৷ আজ খানিক্ষণ বেশ কয়েকটা জার্সি কেনাকাটির জটলায় দাঁড়িয়ে মনে হল কোহলির পর, সবচেয়ে বেশি চাহিদা হল সূর্যকুমারের জার্সির। তারপর রোহিত এবং ধোনি৷ যা হোক, আমি খোকার জন্য সুভ্যেনির হিসেবে একটা জার্সি কিনে নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়লাম।

ভিটামিন-ডি-য়ের হয়ে বেশ জোরালো সওয়াল রাখে ফিরোজ শাহ কাটলা৷ বেশির ভাগ দর্শকদের মাথার ওপর ছাত নেই৷ তবে আমি যে অঞ্চলে ছিলাম, সে'খান থেকে পিচের ভ্যিউ চমৎকার। কাজেই খুঁতখুঁত ছিল না মনে৷ ইনিংস শুরুর মিনিট কুড়ি আগেই পৌঁছে গেছি৷ এ মাঠে এই আমার প্রথমবার, তাই সবার আগে টয়লেটের খোঁজটা নিয়ে রাখা দরকার। ইডেনের মতই; সে ব্যবস্থা আর যাই হোক, ঝাঁচকচকে নয়৷ তবে ব্যবহারযোগ্য৷ এরপর গেলাম খাওয়ার জলের ব্যবস্থা দেখতে৷ দুর্ভাগা দেশের ক্রিকেট দর্শক আমরা, ব্যাগ-জলের বোতল ইত্যাদি নিয়ে ঢোকা বারণ (সে দায়ভার অবশ্য আমাদেরই)৷ কাজেই স্টেডিয়ামের ভিতর জলের ব্যবস্থাটা ভালো মত জেনে না রাখলে সমস্যার পড়তে হবে।  আমি যে'খানে ছিলাম, সে'খানে কাগজের গেলাসে জল বিক্রি হচ্ছিল, দশ টাকার এক গেলাস৷ ইয়ে, এক বিক্রেতা অবশ্য আধো-গোপন ব্যবস্থাপনায় জলের বোতলও বিক্রি করছিলেন, কুড়ি টাকার বোতল পঞ্চাশে৷ কিন্তু বার বার সীট ছেড়ে উঠে গিয়ে এক গেলাস জল কিনে খেতে হলে ক্রিকেটটা জলে যাবে৷ অগত্যা সেই বোতলই কিনতে হল। খাবারদাবারের মধ্যে আমাদের এলাকায় ছিল তেল চুপচুপে ঠাণ্ডা কচুরি ও শিঙাড়া, রাজমা বা ছোলেসহ ভাত, রকমারি চিপ্স, পপকর্ন, আর কোল্ডড্রিঙ্কস৷ খান চারেক স্টল, তারা মোটামুটি হিমশিম খাচ্ছে। ও'সব বিস্বাদ আইটেমগুলোরও যে কী চাহিদা মাঠের মধ্যে; ক্যাপ্টিভ অডিয়েন্স, তাদের পেটে খিদে, গলায় তেষ্টা, প্রাণে ক্রিকেট৷ এই অদরকারী ক্যাপ্টিভ অডিয়েন্সের জন্য বিসিসিআই যদি একটু মায়াদয়া বাড়াত, তবে বর্তে যেত কত হাজার হাজার ক্রিকেট হুজুগিস্ট৷ তারা সকলে ক্রিকেট বোদ্ধা নয়, অথচ এই অব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে দিনের পর দিন তারা মাঠ ভরিয়ে দিচ্ছে, "ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া" বলে চিল্লিয়ে কানঝালাপালা করে দিচ্ছে৷ ভালোবাসার যে কী টান।  সামান্য পানীয় জলের আশ্বাস, পরিষ্কার খাবারদাবারের ব্যবস্থা, সাফসুতরো বাথরুম আর ছ'সাত ঘণ্টা বসার জন্য আরামদায়ক ব্যবস্থা; এগুলো ব্যবস্থা করা কি খুবই কষ্টকর? কে জানে! হয়ত আমাদেরই দাবীর শেষ নেই। কিন্তু ভারতীয় বোর্ড যেহেতু ব্যবসাটা ভালো বোঝে (এ'টা তীর্যক মন্তব্য নয়, আন্তরিক সেলুট), কাস্টোমার ডিলাইট নিয়ে তাদের কি কোনও মাথাব্যথা থাকবে না? বিশেষত, যখন হোর্ডিংয়ের কদর্যতায় স্টেডিয়ামগুলো দুর্গাপুজোয় কলকাতার রাস্তাঘাটকেও দশ গোল দেবে। না হয় আরও দু'চারটে ব্যানার-ফেস্টুন বাড়লো, কিন্তু দু'দণ্ড আয়েস করে যেন মানুষ খেলাটাকে উপভোগ করতে পারে৷

যা হোক, এ'সব অদরকারী গপ্প থাক৷ হুজুগে ফেরত আসি৷ তবে ইয়ে, ক্রিকেট নিয়ে লিখতে বসিনি৷ গ্যালারির হয়েই লিখছি৷ টিভির ক্রিকেট টেলিকাস্ট দুরন্ত (এবং অপরিহার্য) কারণ ক্রিকেটে অ্যানালিটিকাল অ্যাপ্রিশিয়েশনের প্রচুর সুযোগ রয়েছে, আর আর সে'টার আইডিয়াল মিডিয়াম হচ্ছে টেলিভিশন (বা যে কোনও স্ক্রিন)। তা'হলে মাঠের ম্যাজিক কোথায়? শুধুই গ্যালারির আবেদনে? হই-হল্লা ফুর্তিতে? হুজুগের চোখ দিয়েই বলি, ক্রিকেটও আছে তো৷ ব্যাটার যখন নিখুঁত টাইমিংয়ে মিডঅনের দিকে বল ঠেলে দিয়ে এক রান নিচ্ছেন, টেলিভিশনের অত্যাধুনিক টেকনলোজিও কিন্তু দর্শকের কাছে মাঠে-শুনতে পাওয়া বল-ব্যাটে-পড়ার ঠকাস্ জাদু-শব্দের ইকো পৌঁছে দিতে পারছে না৷ অর্থাৎ বাড়ির সোফায় বসা 'আমি'র কাছে যে'টা স্রেফ 'রোহিত এক রান নিয়ে স্ট্রাইক রোটেট করল' মার্কা নিরামিষ একটা ব্যাপার, মাঠে বসা 'আমি'টি কিন্তু প্রায় লাফিয়ে উঠছি "কী মারাত্মক কন্ট্রোল রেখে খেললো, কী মাপা টাইমিং" বলে৷ আমার পাশের হাজার হাজার মানুষও প্রতিটা ছোটখাটো ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, সেই উচ্ছ্বাস আমায় স্পর্শ করছে, উজ্জীবিত করছে, ইন্সপায়্যার করছে। আবারও বলি, মাঠে বসে ব্যাট-বলের (বা স্টাম্পে-বলের) যে খটাস শব্দ, সে ম্যাজিক টিভিতে ট্রান্সফার করা বোধ হয় সম্ভব নয়৷ 




আর একটা ব্যাপার৷ রান জমে ওঠার ব্যাপারটা মাঠে বসে যেন আরও একটু গভীর ভাবে অনুভব করা যায়৷ সে'খানে বিজ্ঞাপন বিরতি নেই, পাশের ঘর থেকে হেঁটে আসা নেই, চ্যানেল পালটানো নেই, রেগে টিভি বন্ধ করে দেওয়াও নেই। আছে শুধু ক্রিকেটের অমোঘ সব সংখ্যা। কয়েক হাজার মানুষ সেই সংখ্যাগুলোকে এস্কেপ করতে পারছেন না৷ এই যেমন আজ। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের রান ২৬৩৷ আজ গোটা দিন এই সংখ্যাটাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে৷ একটানা হিসেব করে চলেছি 'ডেফিসিট' আর কত৷ বাড়িতে খেলা দেখতে বসেও তাইই করি, কিন্তু মাঠের উত্তাপের সঙ্গে তুলনা চলে না৷ আজ খেলা দেখে এলাম, আগামী হপ্তাখানেক মনের মধ্যে এই ২৬৩ সংখ্যাটা ভাইব্রেট করে চলবে। এখানে ওভার শেষে বিজ্ঞাপন হচ্ছে না, আছে শুধু ঢাউস স্কোরবোর্ড। মেক্সিকান ওয়েভের ভিড় থেকে উঁকি মেরে দেখছি; স্কোরবোর্ড৷ লাঞ্চ কেনার সময়ও চোখ চলে যাচ্ছে স্কোরবোর্ডের দিকে। প্রতিটা রান যেন ইলিশের দামে কেনা হচ্ছে, বিশেষত কোহলি আউট হওয়ার পর থেকে। প্রায় প্রতিটা রান, প্রতিটা উইকেট এক একটা গল্পের মত মনের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। হাতের ফিটনেস ওয়াচ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে হার্টরেট এক্কেবারে চালিয়ে খেলছে, বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে এই ম্যাচটাই যদি দেখতাম, ধুকপুকানিটা এমন জমাট বাঁধত না৷ অশ্বিন আর অক্ষরের (অক্সর লিখব?) পার্টনারশিপ যখন একশো ছুঁল, মনে হল গোটা দিন বাগানের মাটি কোপানোর পর এ'বার চারাগাছ লাগানোর সময় এসেছে৷ কাজেই হা-হা শব্দে লাফালাফি যে শুরু করবই, এ'তে আর আশ্চর্য কী। কারণ স্টেডিয়ামে থাকা মানে, আমিও যে ওই স্কোরবোর্ডেরই অংশ। স্কোরবোর্ডে গ্যালারির উপস্থিতি নামহীন হতে পারে, তবে অদরকারী নয় কোনও মতেই। তা, এই গ্যালারির খ্যাপাটে মানুষজনদের কথা কি বিসিসিআই আর একটু দরদ দিয়ে ভাববে না? ভাবলে তেমন ক্ষতি হবে না কিন্তু, মাইরি।

Thursday, February 16, 2023

শিঙাড়া থেরাপি



অফিস টেবিলে কাগজপত্তর আর ফাইলের স্তুপ? সে'দিকে তাকালেই বুক-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে পড়ছে? জানপ্রাণ লড়িয়ে দিয়েও মেমো-প্রপোজাল-হিজবিজবিজের গুরুভার লাঘব হচ্ছে না?একটা ফাইল ক্লীয়ার করলে চারটে আপদ এসে জুটছে? এই ক্রাইসিস চলতে দেওয়া যায়না৷
টেবিলের চেহারা যদি ভয়াবহ হয়, তবে বুকের ধুকপুকও বাড়তে থাকে। তা'তে মেজাজের ক্ষতি, মনের ক্ষয়। মনের রাখবেন, অফিস-টেবিলকে পোষ মানাতে না পারলে দুনিয়ার সমস্ত মোটিভেশনাল বই আর সুড়সুড়ি দেওয়া পাওয়ারপয়েন্ট জলে৷
তা, আপিসের টেবিলের পেন্ডিং-পাহাড় পাশ কাটিয়ে ভোরের নরম রোদ্দুর এনে ফেলবেন কী করে? ডাঁই করা ফাইলের ঘুপচি অন্ধকার সাফ করে প্রাণের তুলসীমঞ্চে প্রদীপ জ্বালবেন কী করে? খানিকক্ষণের জন্য যাবতীয় ডেডলাইনের ঝড়-ঝঞ্ঝা ভুলে টেবিলে বসন্ত টেনে আনবেন কী করে?
শুনুন, মন দিয়ে৷ পারলে টুকে রাখুন৷
একটা শিঙাড়াকে হীরের যত্নে টেবিলের ওপর রাখতে হবে৷ রেখেই তার ওপর হামলে পড়বেন না যেন; তা'তে উত্তম-হাসিতে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের "ব্লিস্টারিং বার্নাকলস" মিশিয়ে দেওয়া হবে৷ অপেক্ষা করুন। সে দৃশ্য উপভোগ করুন৷ সে সুবাসকে টেবিলের চারপাশের বাতাসে মিশে যেতে দিন৷ সেই অপার্থিব দৃশ্যকল্প আর জাদু-সুবাসের মেট্রিক্স খানিকটা সময় জুড়ে স্টেডি না হলে চারপাশের নেগেটেভিটি শুষে নেওয়া হবে কী করে?
সেই হাইক্লাস সিচুয়েশনটাকে স্টেডি হতে দিন৷ মেডিটেট করুন, কীবোর্ডের খটখটটুকু মন দিয়ে শুনুন, আঙুলের ডগায় প্রতিটা কীবোর্ড-স্পর্শ যত্ন করে অনুভব করুন৷ শিঙাড়ার দিকে তাকিয়ে শ্বাস নিন, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছাড়ুন৷ ব্রীদ ইন, ব্রীদ আউট৷ ব্রীদ ইন, ব্রীদ আউট৷ খানিকক্ষণের মধ্যেই দেখবেন মনের মধ্যে ফুরফুরে হাওয়া, কুঁচকে থাকা ভুরু নেতিয়ে পড়েছে, খিঁচিয়ে থাকা মুখে "সদ্য কবিতা লিখেছি" মার্কা হাসি৷
এরপর মিনিট পাঁচেকের জন্য স্ক্রিন স্লীপ-মোডে রেখে, কীবোর্ড সরিয়ে দিয়ে, ফোকাস করুন শিঙাড়ার ওপর৷ শিঙাড়া উড়িয়ে দিয়ে, স্ফুলিঙ্গের মত, বিপ্লবীর মেজাজে; ফিরে আসুন কাগজপত্রের দেশে৷ খুনে-অফিসটেবিল ততক্ষণে আপনার নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি স্যুইটহার্টটি৷ গ্যারেন্টি রইল।

ইউফোরিয়া



~~খিলখিলাতি হ্যায় উয়ো নদীয়া, নদীয়া মে হ্যায় এক নইয়া~~

জমজমাট সূর্যকুণ্ডের মেলা (সুরজকুণ্ড্‌ বলা উচিৎ নাকি?)। অফিসের পর সন্ধেবেলা বিস্তর ট্র্যাফিক ঠেলে সে মেলায় গেছি রকমারি জিনিসপত্র দেখতে, খাবারদাবারের দোকানগুলোয় পেট ভরাতে, আর সর্বোপরি ভিড়ে নাকানিচোবানি খেতে। মেলায় গিয়ে মানুষে যা করে আর কী। ও মা, গিয়ে শুনি সে'খানে পলাশ সেন গান গাইবেন, ইউফোরিয়ার শো শুরু হবে খোলা অ্যাম্পিথিয়েটারে, অবাধ প্রবেশ। "ধুম পিচক ধুম" ফেনোমেনাটা একসময় মজ্জায় এসে মিশেছিল। নিজেকে সঙ্গীত-বোদ্ধা বলে লোক হাসানোর মানে হয়না। তবে গানের প্রতি ভালোবাসায় খানিকটা অবুঝ না হলেও চলে না বোধ হয়। আমার ডানা গজানোর বয়সে সেই গান আবিষ্কার করি। এখনও মনে আছে, আমাদের স্কুলের একটা অনুষ্ঠানে আমার কিছু ক্লাসমেট সে গান গেয়ে আসর জমিয়ে দিয়েছিল। সে বয়সে প্রথম প্রেমের হুহু, সেই হুহুর সঙ্গে যে'সব গান এসে মিশে গেছিল, তাদের মধ্যে এই ধুম-পিচক-ধুম অন্যতম। এ অভিজ্ঞতা আদৌ অভিনব নয়, আমার বয়সী অনেকেই এ ব্যাপারটা ধরতে পারবেন। চন্দননগরের অলিগলি দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি দুই বন্ধু, আর দু'জনে বিশ্রী বেসুরো গলায় চিল্লিয়ে গাইছি 'মায়েরি' বা 'ক্যায়সে ভুলেগি মেরা নাম'। স্বস্তির ব্যাপার হল যে নিজের বেসুর নিজের কানে বাজে না। যা হোক, এহেন ইউফোরিয়ার গানের আসর, সে নিশির ডাক উপেক্ষা করি কী করে। কাজেই আমরা দ্যাবা-দেবী সেই খোলা মঞ্চের সামনে চলে গেলাম। ভিড় সত্ত্বেও জায়গা বাগিয়ে নিতে অসুবিধে হল না।




~~কেহতা হ্যায় যো কহে জমানা, তেরা মেরা পেয়ার পুরানা~~

আমাদের আশেপাশে যারা বসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগের বয়সই মনে হল আমাদের চেয়ে হয়ে বেশি খানিকটা কম অথবা বেশ খানিকটা বেশি। মোদ্দা কথা টীম 'নাইনটিজ'কে মাইনরিটিই মনে হল। যা হোক, একসময় স্টেজে একটা স্ফুলিঙ্গের মত উদয় হলেন পলাশ সেন, অকারণ সময় নষ্ট না করে গান ধরলেন। অমনি সেই ছোটবেলার গন্ধ-দৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। তেমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ওই সূরজকুণ্ডের হৈহল্লার মধ্যে কেউ বাংলার মফস্বলের বিকেল আর টিউশনি-ফেরত সাইকেলের ক্যাঁচরম্যাচর মিশিয়ে দিল যেন। আমরাও দিব্যি গালে হাত রাখে শুনতে আরম্ভ করেছিলাম। আচমকা মেজাজের সুতো ছিঁড়ে দিলেন পলাশ সেন নিজেই, বললেন "এই যে দাদা-বোনেরা, আপনারা কি গা এলিয়ে শুয়ে বসে গান শুনতে এসেছেন নাকি? রামোহ্‌ রামোহ্‌! আরে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ান দিকি। লম্ফঝম্প করতে হবে তো। আমি তো আর ভজন-গজল গাইতে আসিনি, চেল্লাতে এসেছি। কাজেই নেহাত আর্থ্রাইটিসের ঝামেলা না থাকলে, দাঁড়িয়ে পড়ুন, গর্জে উঠুন"। কী বলি, আমি ছাই গানটান বুঝি না। আমার ছেলেবেলার হিরো আওয়াজ দিচ্ছে, আমি সেলাম ঠুকবো; আমার কাছে ও'টাই হল গিয়ে মূল এন্টারটেইনমেন্ট। কাজেই ডাক্তার সেনের দাবীমত নির্দ্বিধায় সেই বাঁধানো সিমেন্টের বসার জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে টের পেলাম, ইতিউতি দু'চারজন দাঁড়িয়েছেন বড়জোর, পাবলিকের গড়িমসি তখনও কাটেনি। মনেমনে চিৎকার করে উঠলাম, "এ কী! ক্লাসরুমের মধ্যে স্যার দাঁড়াতে বলেছেন! এর পরেও বসে থাকাটা কেমন বেয়াদপি"! যাকগে, সে বেরসিকদের পাত্তা না দিয়ে বেখাপ্পা ভাবে পলাশবাবুর গানের তালে ড্যাংড্যাং করে দু'হাত হাওয়ায় ছুঁড়তে শুরু করলাম।




~~যতন করে রাখিব তোরে মোর বুকের মধ্যে মাঝি রে~~

পলাশ সেন ধরলেন "ধুম পিচক ধুম"। আমরা যারা 'নব্বুইয়ের মাল' সে এলাকায় ছিলাম, তাঁরা সবাই খ্যাপা বাউলের মত দুলে চলেছি। আমরা সংখ্যালঘু হতে পারি, মধ্যবয়সী ভারে সামান্য ন্যুব্জ হতে পারি। তা বলে ইউফোরিয়ার গানে বিসর্জন-নাচের মোডে ঢুকে যাব না? আরে! পলাশ সেন চেঁচিয়ে বলছেন "আ রে মেরি ধড়কন আ রে"। এ ডাক শুনে কে না লাফিয়ে থাকতে পারে? অবাক হয়ে দেখলাম অনেকেই পারেন। পলাশ সেনও মহাঢিঁট মানুষ দেখলাম। বেশিরভাগ জনতা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াবেন না, পলাশবাবুও তাঁদের স্বস্তি দেবেন না। খুব হিসেব কষে, 'ধুম পিচক ধুম' গানের শেষে সামান্য ব্যাকফুটে গেলেন পলাশবাবু। ততক্ষণে ভদ্রলোকের রোখ চেপে গেছিল বোধ হয়। আচমকা একের পর এক নতুন হিট গান গাওয়া শুরু করলেন, ধরলেন হিট সব পাঞ্জাবি গান; এমন কি "কালা চশমা"ও বাদ গেল না। মাইরি, অমন মারাত্মক লাফঝাঁপ করে গেয়ে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক, অথচ গলায় ক্লান্তি নেই, সুরে দুলকির অভাব নেই। এই অ-ইউফোরিও ডিস্কোঝড়ে গলল পাথর। জমে উঠল আসর, মানুষজন সত্যিই মেতে উঠল, জমে উঠল গানের মেলা।


~~ Crescendo /krɪˈʃɛndəʊ/
the highest point reached in a progressive increase of intensity ~~

এরপরেই তুরুপের তাসটা বের করে আনলেন পলাশবাবু; ধারালো জাদুতে শ'পাঁচেক মানুষের পায়ের তলা থেকে কার্পেট উড়িয়ে দিলেন। গাইতে শুরু করলেন "মায়েরি"। আর এমন গাইলেন, যে স্রেফ ওই একটা গান শোনার জন্য শ'খানেক মাইল পথ হেঁটে যাওয়াই যায়। আর সে গানটাই গোটা সন্ধেটাকে অন্য স্তরে নিয়ে চলে গেল, সে'খান থেকে আর ফিরে তাকানোর উপায় নেই। গা ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। পরের একটা ঘণ্টা পলাশবাবু যদি খবরের কাগজ পড়েও শোনাতেন, তা'হলে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনে যেত। সবচেয়ে বড় কথা, ঠিক ওই মায়েরি পার্ফর্ম্যান্স থেকে নব্বুই-অনব্বুইয়ের তফাৎটা ধুয়ে-মুছে গেল। দর্শকাসনের প্রতিটা মানুষ তখন ইউফোরিয়ার সামনে নতজানু, এবং খানিকটা 'ইউফোরিক'ও বটে। আর সে গান শুনলে যেমনটা হওয়ার কথা আর কী, পলাশবাবুর গলার দাপট আর সে সুরের মায়া টেনে নিয়ে গেল কৈশোরের প্রেমে। এবং ভেবে অবাক হলাম, সেই ছেলেবেলার প্রেম আর ভালোবাসার মানুষে আটকে নেই। পাড়ার চেনা গলির ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দেওয়া হিরো ইম্প্যাক্ট সাইকেল, চেনা চায়ের দোকানের বেঞ্চি, পিঠে ঝোলানো পড়ার বইয়ের ব্যাগের মধ্যে রাখা টেনিসবল; সমস্তই বড় অনাবিলভাবে ফেরত এলো। পলাশ সেন ততক্ষণে শ্রোতাদের মনঃপ্রাণ দখল করে ফেলেছেন। আর নব্বুই ব্র্যান্ডের আমরা যেক'টি প্রডাক্ট ইতিউতি ছড়িয়ে ছিলাম, তাঁরা সবাই অন্যান্য মুগ্ধ শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে চলেছি, "কেমন দিলাম"? আসলে, আমরাই তো তখন ইউফোরিয়া।

Tuesday, February 14, 2023

ভ্যালেন্টাইন বিরিয়ানি




ডিয়ার বিরিয়ানি,

আশা একটাই, যেন প্রাণপণ ভালোবাসতে পারি।

দেখো, যেন নাক উঁচু তর্কাতর্কিতে আটকে না পড়ি। কলকাতাইয়া -মোরাদাবাদি জাতপাত নিয়ে বেফালতু খামচা-খামচি শুরু না করি।
যেন, স্রেফ ভালোবাসায় "এইত্তো আমি" বলে আত্মসমর্পণ করার সৎ সাহসটুকু রাখতে পারি। বাতেলায় ভেসে না গিয়ে কবজি ডুবিয়ে কেল্লা ফতে করতে পারি।

পার্থিব গল্প-আড্ডা-গুলতানিতে আটকে পড়ে যেন তোমায় ঠাণ্ডা না করে ফেলি। ইয়ারদোস্ত আর তাঁদের খাওয়ার পাতের খেজুরালাপ; ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু বিরিয়ানি চাল-মাংস থেকে উঠে আসে ধোঁয়া যদি সময়মত জিভে-নাকে চালান না করতে পারি, তা'হলে ব্যর্থ আমার সঞ্জীব পড়ে চোখ-ছলছল, ব্যর্থ আমার সমুদ্র বা পাহাড় দেখে অস্ফুটে বলা; "আহা"।

তোমার প্লেটের পাশে খিটখিটে মুখে এসে যেন কোনোদিনও না বসি। যেন মনে রাখতে পারি যে সাচ্চা কমরেডের মত; তুমি সবসময়ই ছিলে, আছো, থাকবে।

আর হ্যাঁ, যেন তোমার প্লেটের ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ি, হামলে না পড়ি। প্রেম-ভালোবাসায় গাম্বাটপনা যেন মিশিয়ে না ফেলি। ধীরে-সুস্থে, স্মিত হেসে, যেন গা ঘেঁষে বসতে পারি। দু'দিন বইতো নয়। 

হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে, বিরিয়ানি। ভালো থেকো।

ইতি, বংপেন। 

Sunday, February 12, 2023

এঁটো-হাতের আড্ডা



রোববারের লাঞ্চটা ধীরেসুস্থে সেরে ফেলাই মঙ্গল, নবেন্দু সান্যালের ফোকাসটা সে'দিকেই৷ গুরুপাক হলে ভালো, না হলেও ক্ষতি নেই, বরং তা'তে খেতে বসে গল্পটা জমে ভালো৷ মাংসের হাড়ে, মাছের কাঁটায় কনসেনট্রেট করতে গিয়ে রোব্বারিয়ান আড্ডার ফ্লো নষ্ট-হয়না৷

তবে সে ক্ষেত্রে আলুভাজাটা দরকারি, সে'টা ব্যবহার হবে ডাল-ভাত সাফ হয়ে যাওয়ার পর৷ থালা-টেবিলের বাহার যেমনই হোক, নবেন্দুবাবু নিজের আলুভাজাকে সাতপুরনো অল্প তোবড়ানো স্টিলের বাটিতেই পছন্দ করেন৷ খানিকটা কন্ডিশনিং বোধ হয়; আলুভাজাকে বাহারি চীনামাটির প্লেটে দেখলেই মনটা সামান্য আড়ষ্ট হয়ে পড়ে৷ সর্বোপরি, নবেন্দুবাবু আলুগুলো খানিকটা মোটাদাগে কুচিয়ে নরম করে ভাজতে পছন্দ করেন; বিশেষত শেষ পাতে খাওয়ার জন্য৷

ডাল-ভাত সাপটে খেয়ে, চেয়ারে গা এলিয়ে, আলুভাজার বাটিটা টেনে নেওয়া৷ তারপর অতি ধীরেসুস্থে, একটা একটা আলুভাজার টুকরো টেনে নিয়ে, ছোটখাটো কামড়ে এগিয়ে যাওয়া৷ পাশে বসা মানুষজনের সঙ্গে গল্প জমে উঠবে৷ আঙুলে লেগে থাকা ডাল শুকিয়ে যত খটখটে হয়ে উঠবে, আড্ডা তত জমাট হবে। গোটা হপ্তা জিভ-পেটের দেখভাল হয় বটে, তবে মনের চুলে বিলি এই রোব্বারের লাঞ্চ শেষের এঁটো হাতের আড্ডায়৷

**

- নবেন্দুদা! কী হল, এ'বার উঠতে হবে তো।

- তিনটে বেজে গেছে নাকি পটা?

- সাড়ে তিনটে। ম্যানেজার চিল্লিয়ে উঠলো বলে৷ চারটে বাজলেই তো ভিড় বাড়বে আবার।

- আহ্৷ আড্ডার মেজাজটা সবে দানা বাঁধছিল রে..।

- চলো নবেন্দুদা, সামনের হপ্তায় ঘুরেই আসি দু'দিন। আমি আর তুমি৷ মায়াপুর বা পুরুলিয়া। সে'খানে দুপুরের খাওয়ার পর এঁটো হাতে দু'জনে বসে এক্কেরে সন্ধ্যে পর্যন্ত গল্প করব৷ এই মহাদেব হোটেলের রাঁধুনি হয়ে আর রোব্বারে খাওয়ার পাতের আড্ডা জমবে না৷

- চ' চ'। খদ্দেরদের হাঁকডাক শুরু হয়ে গেছে৷ সুকুমার একা হেঁসেল ম্যানেজ করতে পারবে না৷