Sunday, November 6, 2022

বেলিয়াতোড়ের লালুর মালাই-চা


আজ বিকেলের দিকে যখন বেলিয়াতোড় মোড় ক্রস করছিলাম; তখন পেটে খিদে তেমন ছিলনা, তার আগে বিষ্ণুপুরের মোনালিসা হোটেলের লাঞ্চটা ভালোই হয়েছিল৷ কিন্তু অমন সারিসারি মিষ্টির দোকানে থরে থরে সাজানো ম্যাচার গ্র্যাভিটেশনাল পুল ঠেকিয়ে রাখা গেল না৷ ম্যাচার প্রতি আমার তেমন টান নেই, কিন্তু জেনুইন হুজুগ ব্যাপারটাকে সমীহ না করে থাকা যায়না৷

"লালু মেচা" দোকানটার সামনে দাঁড়ালাম কারণ সে'খানে দেখলাম জনসমাগম অন্যান্য দোকানের তুলনায় বেশি৷ ম্যাচা খেলাম; ওই যে বললাম - আমার জিভে মন্দ ঠেকেনা, তবে তা নিয়ে পদ্য লেখাটা বাড়াবাড়ি৷ কিন্তু লালু মেচার দোকান জাস্ট জ্বালিয়ে দিল দু'টো আইটেমে;
প্রথমত, চপ৷
দ্বিতীয়ত, মালাই চা৷

ইয়াব্বড় চপ, ভেজিটেবল তবে ট্র্যাডিশনাল টেক্সচারের নয়৷ সে' চপের বেসনের পরতটা হাইক্লাস আলুর চপের মত৷ আর ভিতরের সবজির পুরটা বিটের লালে লাল নয়; পাঁচমেশালির হলুদ৷ স্বাদে সত্যিই অনন্য৷ দেদার বিটনুন ছড়িয়ে, শালপাতায় মুড়ে দোকানিদাদা এগিয়ে দিলে সেই ধোঁয়া ওঠা চপ। আমরা পত্রপাঠ উড়িয়ে দিয়ে দু'নম্বর চপখানা চেয়ে নিলাম৷

কিন্তু ওই চপের চেয়েও উচ্চমার্গের ব্যাপার হল গিয়ে ওই মালাই চা৷ আমি চা-প্রেমি আদৌ নই, কিন্তু ওই মাটির ভাঁড়ে সার্ভ করা ওই মালাই মেশানো অমৃতর জন্য মাইল তিনেক পথ দিব্যি হেঁটে যেতে পারি। চপের মতই, ওই চাও দু'বার চেয়ে খেতেই হল।

জয় বেলিয়াতোড়, জয় লালু।

রামলীলা আর মেলা


নয়ডা স্টেডিয়াম লাগোয়া ময়দানে রামলীলার জবরদস্ত মেলা দেখে এলাম আজ৷ সে'খানে পৌঁছনো মাত্রই বেগুসরাইয়ে মেলা ঘোরার সুখস্মৃতি দিব্যি মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে গেল। হাইক্লাস মেলার সমস্ত রসদই ছিল। বিভিন্ন সাইজের নাগরদোলা, রকমারী খাবারদাবারের ঝলমলে সব স্টল, কচিকাঁচাদের হইহল্লা, আধবুড়োদের মাতব্বরি, খতরনাক মউত কা কুয়া, ছোটখাটো একটা সার্কাস, বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানোর আয়োজন, জিলিপির দোকান; সাজসরঞ্জামের অভাব ছিলনা৷

যা বুঝলাম, নাগরদোলার টিকিটের দাম হুহু করে বেড়েছে৷ অবশ্য কোনও কিছুর দামই তো পড়তির দিকে নয়, নাগোরদোলাওলাদের আর কী দোষ। তবে খরচ বাড়লেও, তাতে মেলামুখো মানুষের আগ্রহ মিইয়ে যায়নি৷ আর যাই হোক, করোনায় দু'বছর দমবন্ধ করে বসে থাকার পর চলাফেরা জমায়েত হৈ-হুল্লোড় সবে শুরু হয়েছে যে।

গোড়াতেই বলেছি। এ মেলা খানিকটা বিহারের স্মৃতি উস্কে দিয়েছে৷ সেই উস্কানি পূর্ণতা পেল লিট্টির দোকানে এসে৷ লিট্টিদাদা ব্যস্ততাও চোখে পড়ার মত৷ ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজনের মেলায় লিট্টির এই সমাদর দেখে খানিকটা গর্বও হল বটে৷ বিহারের প্রতি আন্তরিক টানটা রয়ে গেছে দেখছি।

আমাদের ও'দিকে মফস্বলের মেলায় রোলের দোকানের যেমন দাপট, এ'দিকে সে দাপট বোধ হয় টিক্কিচাট গোছের স্টলগুলোর৷ দিল্লী, নয়ডার দিকে মানুষের চাটভক্তি চোখে পড়ার মত৷ আর শত-ব্যস্ততার মধ্যেও এই তরুণ চাট-আর্টিস্ট পোজ দিতে বা খেজুরে গল্প জুড়তে পিছপা হচ্ছেন না৷ সে উষ্ণতায় মনে হয়; কোভিডকে বোধ হয় আমরা সত্যিই খানিকটা দমিয়ে দিতে পেরেছি৷ খানিকটা অন্তত।
মিষ্টিমুখের আয়োজনও ছিল, গরম গুলাবজামুনের দেখলাম বেশ কদর৷ মিঠেপানের দোকানও জুটে গেল৷ বেশিরভাগ দোকানই সামাল দিচ্ছে অল্পবয়সী ছেলেপিলের দল; মেলার ভ্যাগাবন্ড দোকান বলে তাদের 'ফোকাস অন সার্ভিস এক্সেলেন্স' ফিকে হয়ে যায়নি৷ আর আজকাল একটা মস্তসুবিধে; ছোটখাটো দোকানেও ইউপিআই বা ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে টাকা দেওয়া যাচ্ছে। কাজেই পকেটে তেমন টাকাপয়সা না থাকলেও দিব্যি টপাটপ গোলাপজাম সাফ করে দেওয়াই যায়।

খাওয়াদাওয়া-নাগরদোলা; এ'সব তো হল৷ এ'খানে এসে রামলীলার যাত্রাপালা (অবশ্য যাত্রা কথাটা এ'দিকে অচল) দেখবনা তা কী'করে হয়৷ ইয়াব্বড় মাঠ, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত কালো মাথার গিজগিজ৷ আর পালার সে কী এনার্জি৷ ইমোশনের সে কী মার্ভেলাস টানাপোড়েন। আধমাইল দূরে দাঁড়িয়েও সে থ্রিল অনুভব করা যায়৷ আর জানা-প্লটে অভিনয় করেও যে এমন উত্তেজনা মাঠভর্তি দর্শকদের মধ্যিখানে ছড়িয়ে দেওয়া যায়; সে'টা ভেবে দু'একবার ব্রাভো বলতেই হয়। দূর থেকে দেখার একটা অসুবিধে হল খোকার হাইটের প্রবলেম। অগত্যা খোকাকে কাঁধে নিয়ে মিনিট পনেরো রামের বিয়ে দেখলাম৷ সীতার 'বিদাই'য়ের সময় জনকরাজার সে কী হৃদয়বিদারক বুক-চাপড়ানো কান্না; তা শুনে পাথুরে মানুষকেও নড়েচড়ে বসতেই হবে৷
শেষপাতে অত্যন্ত খারাপ (এবং পোড়া) তেলে ভাজা সুস্বাদু পাপড় চিবুতে চিবুতে বাড়ি ফিরলাম। অল ইজ ওয়েল দ্যাট এন্ডস ওয়েল৷

লীভ অ্যাপ্লিকেশন

কে কী'ভাবে লীভ অ্যাপ্লিকেশন ব্যাপারটাকে ম্যানেজ করে জানি না৷ কিন্তু অফিসে ছুটি চাইতে যাওয়াটা আমার কাছে একটা অতি-বিচ্ছিরি রকমের স্ক্যান্ড্যাল৷ বলে রাখি, যারা ছুটির দাবী অবলীলায় পেশ করতে পারেন, তাদের আমি অত্যন্ত সমীহ করি (সমীহটা রীতিমতো আন্তরিক)৷ কিন্তু কী'ভাবে যেন আমার কাছে ব্যাপারটা ভজকট কেমিক্যাল ইকুয়েশন ব্যালেন্স করার চেয়েও জটিল বলে মনে হয়।

ছুটি চাওয়ার আগেই যে'ভয়টা ঘাড়ে চেপে বসে সে'টা হল মার্ফির মারের আতঙ্ক৷ প্রথমেই আমি নিজের মনের মধ্যে একটা কুরুক্ষেত্র গোছের সেটিং তৈরি করে ফেলি৷ আমি ছুটি চাইতে গেলেই নির্ঘাৎ কোনও জরুরী মিটিং রিভিউ চলে আসবে৷ আমার ছুটি নেওয়ার দিনেই কোনও বড়কর্তা মারকাটারি লেভেলের ছক কষে বসবেন৷ হাজার রকমের দুশ্চিন্তা দানা বাঁধে; এই বুঝি অফিসে যুদ্ধ লেগে গেল৷ এই বুঝি বস রথে রিল্যাক্স করে বসা কেষ্টার মত জ্ঞান দেবেন, "বেশি ন্যাকাপনার কাজ নেই ভাই অর্জুন, তুমি ইন্টারভ্যাল চাইলেও যুদ্ধ তোমায় ফুরসৎ দেবে না"। আর মার্ফিদাদার বদান্যতায় দেখি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের বিটকেল আশঙ্কাগুলো টপাটপ ফলেও যায়৷ অথচ আড়াই দিন দিয়ে ভেবে চলেছি লটারিতে আড়াই লাখা টাকা পাওয়ার কথা, সে'সব ফলবার কোনো চান্স নেই।
এরপর রয়েছে কনফিডেন্সের অভাব৷ যেন ক্যাসুয়াল লীভ নয়, বসের থেকে দেড়খানা কিডনি চাইছি৷ ও মেজাজ নিয়ে নব্বুইয়ের দশকে ভারতীয় ক্রিকেট টীম অস্ট্রেলিয়ার পিচে ব্যাটিং করতে নামত৷

আর ওই ঘ্যানঘ্যানানির চোটে যদি ছুটি আদায় করে নেওয়াও যায়, তা'হলেও মনের মধ্যে একটা গোলমেলে বোধ উদয় হয়৷ ছুটিটা নিয়েই ফেললাম? (যেন ছুটি নয়, গঞ্জিকা-সেবনের অনুমতি হাতিয়েছি)৷ একটা অজানা অপরাধবোধ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়৷ আগবাড়িয়ে বাড়তি কাজ এবং অকাজ কাঁধে তুলে নেওয়া শুরু হয়; যেন ছুটিতে যাওয়ার আগে নিজেকে ড্যাংশপেটা না করলেই নয়৷ ছুটি (বিশেষত যদি লম্বা ছুটি হয়) যত এগিয়ে আসে, তত নার্ভ কাঁপতে থাকে; এই বুঝি সব গোল্লায় গেল৷

একসময় মনে হয়; ধ্যাত্তেরি ছাতারমাথা ছুটি৷ বয়ে গেছে৷ এর চেয়ে অফিসের রগড়ানি আর ট্র্যাফিকে পেষাই হওয়াই ভালো; নির্বাণ সে'খানেই৷ ছাপোষা চাকুরের ছুটির প্ল্যান মানে হল গিয়ে ওই গতজন্মের খুচরো পাপের হিসেবকিতেব।

চাউমিনের দিল্লী কলকাতা



দিল্লী আসার পর থেকে রকমারি চাউমিন 'ট্রাই' করে চলেছি৷

কলকাতার মত চাউমিন৷
আদৌ কলকাতার মত নয়; তেমন চাউমিন।
কলকাতার মত বানাতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেছে; সে'রকম চাউমিন।
কলকাতার মত কোনও মতেই নয় তবু কোথাও যেন একটা চেনা স্বাদ মিশে আছে; ও'রকম চাউমিন।
হাফ-কলকাতা হাফ-দিল্লী গুবলেট চাউমিন।
কলকাতা হতে হতেও হল না চাউমিন৷
দিল্লীর বুকে আলতো-বেহালা চাউমিন৷

এমন অন্তত সতেরো রকমের ভ্যারাইটি৷ ভেবেটেবে দেখলাম, কোনওটাই জিভে তেমন আপত্তিকর ঠেকেনি৷ বরাতজোরে যে'দিন কলকাতা ফিরে যাব, সে'দিন হয়ত আবার দিল্লীর ফিল্টারে বসিয়ে কলকাতার চাউমিনদের নতুন করে চেখে দেখা শুরু করব।

বার বার ফিরে যাওয়া



খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে যতই গালগল্প করি, ক্লাস এইট-নাইনের পর থেকে আমার টেস্টবাড আদৌ ইভলভ করেনি৷ কুইসিনটুইসিন নিয়ে বাছবিচারও কোনও কালেই ছিলনা৷ তেলঝাল টানটান, মশলাপাতি জমজমাট, ডুবো তেলে ভাজা বা তেড়ে কষানো; এ সমস্ত কিছুর প্রতিই আমার আগ্রহ অসীম৷ আর ওই গতানুগতিক সাতআটটা আইটেম আছে, যে'গুলোয় বারবার ফিরে যাই।

কম্বিনেশনের ব্যাপারেও আমার অত ধানাইপানাই নেই৷ এই যেমন বাটার নান দিয়ে বাটার চিকেন আর চিলি চিকেন৷ একগ্রাস বাটারচিকেন-নান আর তারপরেই চিলিচিকেন-নান৷ এই ভাবে একটানা..প্লেট সাফ না হওয়া পর্যন্ত। মাঝেমধ্যে কচাত কামড় ভিনিগারে চুবিয়ে রাখা ডুমোডুমো পেঁয়াজে। ও'টাই আমার কাছে অমৃত৷ চিত্তরঞ্জন পার্কের দিকে একটা ক্যালকেশিয়ান মেজাজের রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেয়েছি৷ ইয়ে, বাঙালি রেস্টুরেন্ট নয়, কিন্তু ওই আমাদের ও'দিকের শহরতলির নর্থ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের রান্নাবান্না খানিকটা এমনই৷ দিল্লীতে বসে কোথায় অথেন্টিক পাঞ্জাবি রেস্টুরেন্ট পাকড়াও করব, তা না৷ ছেলেবেলার ভালোলাগা স্বাদ খুঁজে হদ্দ হচ্ছি৷ ব্যাপারটা ভেবে মাঝেমধ্যে একটু দমে যাই বটে; জিভটা ম্যাচিওর করলনা৷

তবে, ভালোও লাগে।

মাইরি, বাটারচিকেন আর চিলিচিকেন যে কী সুন্দর আমে-দুধে মিশে যায় (মিশে যায় বলতে দু'টো ঝোল মিশিয়ে খাওয়া নয়৷ ওই, অলটারনেটলি)৷ আহা। নাক কুঁচকোবেন না প্লীজ৷ ওরকম কনট্রাস্টিং স্বাদের আসা-যাওয়ায় জিভ এক্কেবারে চাক্কুর মত ধারালো হয়ে ওঠে৷ চেখে দেখবেন৷