Sunday, August 21, 2022

স্যামপ্লিং



এই সাইজের স্টিলের প্লেট সাধারণত আড়ালে-আবডালে পড়ে থাকে৷ শৌখিন খাবারদাবার পরিবেশনের সময় এদের কদর বড় কম। তেমন কিন্তু এ'গুলো অবহেলার বস্তু নয় মোটেও৷ এ'দের মূলত দু'টো কাজ৷

এক, ব্যাকএন্ড৷ এ'গেলাস ও'পাত্রের টেম্পোরারি ঢাকনি হিসেবে৷

দুই, ফ্রন্ট এন্ড, আইকনিক ভূমিকা; স্যাম্পলিং প্লেট৷ রোব্বারের মাংসের ঝোলের কড়াই থেকে তুলে নেওয়া একটা সরেস পিস আর সামান্য ঝোল; সঙ্গে হাফ-হাতা পোলাও৷ স্যাম্পলিং চলে স্নানের আগে৷ স্নানের সময় গড়িয়ে যায়৷ নুন বেশি, ঝাল কম; এ'সব অভাব-অভিযোগের করেকশন চলে৷ অতএব প্লেট রিফিল হয়৷ রান্না নিখুঁত হলে রিফিলের গতি বেড়ে যায়৷ ফুচকা খাওয়ার স্ট্রাকচার আর ডিসিপ্লিন দিয়েই মাংস-পোলাও 'স্যাম্পলিং'। গুরুজনরা বলেছেন "সে'টাই হল Soul of Robbar"।

এরপর সে প্লেট চেটেপুটে সাফ করে, তেলতেলে আঙুল চাটতে চাটতে নিজের প্রিয় গামছার খোঁজে বারান্দায় ছুটে যাওয়া৷ লাঞ্চে দেরী করলে চলবে কেন?

আমার জানলা দিয়ে যায় না দেখা



- কী বুঝছ ভায়া৷

- অ..অদ্ভুত৷

- ভূতের মুখে অদ্ভুত শব্দটা কেমন লাগে যেন।

- বেঁচে থাকতেও আমি ভূতে বিশ্বাস করতাম বটে৷ কাজেই ফস্ করে মরে গিয়েও যখন দেখলাম পুরোপুরি হাপিস হয়ে যাইনি, তখন চমকে যাইনি৷ কিন্তু এই সারপ্রাইজটা তখনও এক্সপেক্ট করিনি অমলদা।

- আরে আমারও তো মরার পর সে' অবস্থাই হয়েছিল ভাই বিনোদ৷ ভূত হয়ে দেদার ঘুরব, টেনশন-ফেনশন থাকবে না ভেবে দিব্যি ছিলাম৷ ইচ্ছে ছিল মাঝেমধ্যে এর ওর পিলে চমকে দেওয়ার৷ অথচ দেখ কত হ্যাপা৷ এর চেয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা কম৷

- অনেক কম। এমন জানলে নিজের শরীরটার অনেক যত্ন নিতাম৷ হাবিজাবি খেতাম কম৷ নিয়মিত যোগব্যায়াম করতাম৷

- কিন্তু এ পাপ থেকে তো মুক্তি পেতে না৷ কয়েক বছর এ'দিক ও'দিক হত৷

- ব্যাপারটা এখনও কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছে অমলদা৷ সত্যিই কি তাই?

- নতুন ভূতদের পুরনো ভূতরা গাইড করে দেয়৷ তোমাকেও ভালো মনে আমি বুঝিয়েপড়িয়ে নিচ্ছি৷ ঠকাব কেন বলো৷

- ছিঃ ছিঃ, আমি তা বলতে চাইনি৷ কিন্তু মানুষ মারা যাওয়ার পর তাদের ভূত টাইম ট্র্যাভেল করে জন্মের সময়ে ফিরে যায়, এমনটা কেমন যেন...কেমন যেন..।

- বিদঘুটে৷ তাই না?

- তাই তো।

- জন্ম থেকে মৃত্যু লূপে দেখে যেতে হবে৷ হাজার হাজার বছর ধরে৷ যদ্দিন না ডিভাইন সাইকেল ভেঙে গিয়ে মুক্তি পাচ্ছ৷ আমি সতেরো বার নিজের লাইফ রিওয়াইন্ড করে দেখে ফেললাম ভাই৷ এমন ভূতদেরও চিনি যারা বাহান্ন হাজারবার দেখেছে৷ আবার কেউ নাকি দু'তিনবার দেখেই মায়া কাটিয়ে হাওয়া হয়ে যায়৷ তারা অবিশ্যি মহাপ্রাণ৷

- মায়া?

- মায়া নয়? নিজের জীবনের প্রতি মুহূর্ত বারবার দেখতে পাওয়া৷ নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা, চোট-আঘাত-প্রেম-ভালোবাসা, দুঃখ, হতাশা, যন্ত্রণা, স্নেহ৷

- অমলদা, আমার জীবন বেশ বোরিং ছিল কিন্তু৷ প্রাইভেট ফার্মের ক্লার্ক৷ গতে বাঁধা সব কিছু৷ শেষবয়সে রোগেভোগে যাচ্ছেতাই একটা ব্যাপার..।

- সেই ফেলে আসা রুটিনের মায়া এ'বারে টের পাবে৷ এ সিনেমা বার বার দেখেও সাধ মিটবে না৷ সবচেয়ে বড় কথা, এ সিনেমার নায়ক তুমি নিজেই৷ যা কিছু বোরিং মনে হয়েছে বেঁচে থাকতে, এখন দেখবে সে'গুলো কী দুরন্ত৷ যত দুঃখ বয়ে বেরিয়েছ, সে'গুলোকে এখন বারবার পোষা বেড়ালের মত আদর করতে ইচ্ছে করবে৷ দূর থেকে নিজের হতাশার মুহূর্তগুলোকে দেখে মনে হবে, "উফ, বাঁচার মত বেঁচে নিয়েছি বটে"৷ এ এক অদ্ভুত ম্যাজিক ভাই বিনোদ।

- মিস্টিরিয়াস৷ কিছুই তো ছাই বুঝছি না৷ আচ্ছা, এই মাঝরাত্তিরে আমরা এই জানালাটার সামনে এসে দোল খাচ্ছি কেন? আমি কই?

- এ'টা হাসপাতালের জানালা বিনোদ৷ জানালার ও'পাশে তোমার মা শুয়ে৷ পাশে তোমার বাবা৷ ডাক্তাররাও আছেন৷ নার্সের কোলে তুমি৷

- ও'টাই...আমার মা? বাবা? ওরা আছে? ওদের দেখতে পাব? উফ অমলদা..।

- মায়া৷ মায়া৷ মনে রেখো, দেখা ছাড়া তোমার আর কোনও ভূমিকা নেই৷ আর যে'দিন দেখার ইচ্ছেটুকু যাবে, সে'দিন মুক্তি৷

***

ডাক্তার যখন খোকাকে সুতপার কোলে দিল, এক মুহূর্তের জন্য সুতপার মনে হলে রাতের জানালার বাইরে যেন কেউ আছে৷ তবে অন্যমনস্ক ভাবটা এক ধাক্কায় কেটে গেল, খোকা চিলচিৎকার জুড়েছে৷ 

Sunday, July 24, 2022

জনসেবা



প্রিয় সুমি,

হাসপাতাল থেকে লিখছি। মন ভার৷ জিভ বিস্বাদ৷ গা-হাত-পা ব্যথা৷ যা হোক, নিজের দুঃখকে কোনওদিনই তেমন বড় করে দেখিনি, আজও দেখব না৷ মানুষের ভালো করতে চেয়ে এ বন্ধুর পথ আমি নিজেই বেছে নিয়েছি, সামান্য দু'একটা চোরকাঁটা বা সেফটিপিনের খোঁচায় দমে গেলে চলবে কেন?

যাক গে। যা বলতে কলম ধরলাম।আজকাল আর অসহায় মানুষদের কথা কেউ মন দিয়ে ভাবে না৷ কত সহায়সম্বলহীন মানুষ যে সহমর্মিতার অভাবে দুর্ভাগ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই৷

এই আমার কথাই ধরো৷ সাধারণ মানুষের জন্য তো কম করলাম না এ'কবছরে৷ এ'পাড়ায় টিউবওয়েল চাই, ও'পাড়ায় ডিসপেনসারিতে ভালো ডাক্তার চাই, অমুক অঞ্চলে রাস্তার মেরামতি দরকার, তমুক অঞ্চলে তেলেভাজার দোকান বসানো দরকার৷ নেতা মানুষের কাজ কি কম সুমি? অথচ দেখ, এত কিছু করিয়ে দেওয়াটা কেউ দেখল না৷

এরা দেখে শুধু কে আমায় জোর করে সামান্য কমিশন গছিয়েছে, কে ভালোবেসে ক্ষীরকদমের বাক্সে পুরে তোমার জন্য চোদ্দ ভরির হার দিয়েছে৷ চারদিকে নেগেটিভ মাইন্ডসেট৷ ওরে বাবা টিউবওয়েল সাপ্লায়ার আমার বাড়ির চারতলার ঘরের মেঝে মোজায়েক করে দিয়েছে কি দেয়নি; তা জেনে পাবলিকের কী লাভ? আরে টিউবওয়েল তো জায়গা মত বসেছে, নাকি! ঠিক আছে, সাত মাসের মধ্যে বার পাঁচেক সে টিউবওয়েল খারাপ হয়েছে বটে, কিন্তু তার ফলে টিউবওয়েল রিপেয়ার করনেওলা কন্ট্র‍্যাক্টর যে বাড়তি ব্যবসা পেল, তা'তে তো আখেরে ইকনমিরই উপকার; তাই নয় কি? লোকে সে'সব অ্যাপ্রিশয়েট করবে না, গণ্ডমূর্খের দল যত৷ শুধু খুঁত ধরবে। টিউবওয়েল সাপ্লাইয়ের কন্ট্র‍্যাক্টর আর টিউবওয়েল রিপেয়ার করার কন্ট্র‍্যাক্টর, তারা ভালোবেসে আমায় ছোটখাটো সামান্য কী'সব বাড়ি, গাড়ি দিয়েছে; তা'তে লোকের গাত্রদাহের শেষ নেই৷ কী জেলাসি ভাবতে পারো? এ জন্যেই বাঙালির আজ এই দুর্দশা। 

একটু মনপ্রাণ দিয়ে জনতা-জনার্দনের সেবা করব, সে'উপায় আর রইল না৷ অকারণ অদরকারী ব্যাপারস্যাপার নিয়ে টানাটানা করে, আমার পিছনে খামোখা টিকটিকি লাগিয়ে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার করল৷ আরে ঠিক আছে, জেরা করবি কর। সে ব্যাপারটায় একটা আলগা রোম্যান্স আছে বইকি। তা'বলে  স্যাট গ্রেপ্তার করার কী আছে? বাধ্য হয়ে বুকের ব্যথার রেফারেন্সটা দিতে হল৷

যাকগে, পার্টি ব্যাপারটা সামলে দেবে। আমায় নিয়ে তুমি ভেবোনা, ডাক্তার বলে গেছে আমার বুক চিনচিনটা সারাতে একমাত্র পথ্য হলো মাটনকষা আর বাসন্তী পোলাও৷ হাসপাতালে ক'দিন সে'সবই চলবে। সঙ্গে নেটফ্লিক্স।  জামিনের ব্যবস্থাটা হয়ে গেলেই  আবার ওই স্ট্যু আর ম্যানিফেস্টোতে ফিরে যাব'খন৷ আফটার অল ওয়েলথ ইজ হেলথ। 

তুমি সাবধানে থেকো। জনতার স্বার্থে, দেশের স্বার্থে; আমি শিগগিরই ফিরে আসছি৷ 

জয় হে। জয় হে। জয় হে।

ইতি,

সুমির আমি।

আড়াইশো গ্রাম দুঃখ



দু-আড়াই'শো গ্রাম দুঃখ পকেটে নিয়ে দিব্যি ঘুরছিলাম৷ আশেপাশে শোরগোল শুনলেই পকেট খামচে ধরছি৷ নিরিবিলি পেলেই পকেট থেকে সেই ড্যালাটা বের করে পোষা খরগোশের মত হাত বুলোচ্ছি৷ টো-টো করে দিব্যি কাটছিল।

হঠাৎ কী খেয়াল হলো, গিয়ে পৌঁছলাম রেলস্টেশনে।
তারপর ফের কী হল, দেখলাম একটা ট্রেন হেলতেদুলতে এসে দাঁড়ালে। ফাঁকা কামরা দেখে টুপ করে উঠে বসলাম ট্রেনের জানালার পাশে৷ ফুরফুরে হাওয়ায় চোখ লেগে এলো।

ওই হল গিয়ে কাল!

ভদ্দরলোকের তুলতুলে ব্যথা-ব্যথা আমেজের ঘুম; ভগবানের সহ্য হবে কেন?

ওই। তারপর যা হয় আর কী৷

কোন এক ব্যাটা বেআক্কালে বেয়াদপ রাস্কেল,
আমার পকেট মেরে 
অমন বাইশ ক্যারাটের দুঃখ সাফ করে,
"এতেও-ভেসে-যাব-না-ভাইটি" ব্র‍্যান্ডের সল্টেড বাদাম রেখে সরে পড়েছে৷

এক্কেবারে রাহাজানি, আর কী৷ ধেত্তেরি৷

ফান্ড



সকালের ঝকঝকে নীল আকাশ, ফুরফুরে শরতের হাওয়া। একটা জরাজীর্ণ চারতলা স্কুলবাড়ি। ছেলেপিলের দল নেই, বোঝাই যায় ছুটির দিন। তা বলে হইচইয়ের অভাব নেই। অন্তত জনা চল্লিশ লোক মিলে স্কুলবাড়ি আর তার সামনের মাঠটাকে সরগরম করে রেখেছে। চার-পাঁচজন মিলে মাঠের পশ্চিম কোণে স্টেজ বাঁধছে।  আর সাত-আটজন বাবু-গোছের লোকজন তাদের "হ্যান করো, ত্যান করো, জলদি জলদি করো" বলে তাড়া লাগিয়ে চলেছে। বাবুরা অবশ্য ভুলেও কাজে হাত লাগাচ্ছে না, পাছে কাজ সময়মত শেষ হয়ে যায়। একটা ঢাউস ফ্লেক্স ব্যানার টানাটানি করে দু'জন লোক হন্যে হচ্ছে, আর একজন মাতব্বর কন্ট্রাক্টর গোছের লোক তাদের ওপর তম্বি করে চলেছে। জনা-দশেক লোক স্টেজের সামনে ভাড়া করা প্লাস্টিকের চেয়ার সাজাতে ব্যস্ত। আর যথারীতি অন্য আর এক বাবুদের দল বিভিন্ন জরুরী ইন্সট্রাকশন দিয়ে ক্রমাগত তাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে চলেছে।

কিন্তু এই সমস্ত গোলমালকে বিন্দু মাত্র পাত্তা না দিয়ে এক বছর তিরিশের যুবক স্কুলের স্যাঁতস্যাঁতে বারান্দায় একটা ক্লাসরুম থেকে বের করে আনা নিচু বেঞ্চের ওপর বসে একটা মচমচে টেবিলের ওপর ঝুঁকে কিছু কাগজপত্তর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। ওঁর নাম অনুপ চ্যাটার্জী, পরনে চেক ফুলশার্ট, কালো প্যান্ট, ঝাঁচকচকে পালিশ মারা কালো জুতো। অনুপের পাশে দাঁড়িয়ে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক; উসকোখুসকো চুল, ময়লা হাফশার্টের পকেটে আধ-ঝোলা সস্তা সানগ্লাস, ঢলা প্যান্ট - যে'টাকে পাজামা বলে চালালেও আপত্তি করা উচিৎ নয়। হিসেব কষতে কষতে হঠাৎ সামান্য বিষম খেলেন সেই ধোপদুরস্ত যুবকটি। কাগজ থেকে মুখ তুলে সেই দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন;

- সামন্তবাবু,তিনশো চেয়ার দিয়েছেন কেন? আড়াইশোটা বলা ছিল!

- আসলে এত বড় ইভেন্ট। পঞ্চাশটা চেয়ার এক্সট্রা লাগতেই পারে।

- কাজের কন্ট্রাক্ট নিয়েছেন। কথামত জিনিস সাপ্লাই করবেন, সরে পড়বেন। মাথা খাটিয়ে পঞ্চাশটা বেশি চেয়ার দিতে কে বলেছে?

- আসলে আমি ভাবলাম...।

- সাপ্লাই করাটা আপনার কাজ। ভাবার কাজটা আমার। বিল থেকে পঞ্চাশটা চেয়ারের টাকা বাদ যাবে।

- না মানে, ব্যাপারটা ভেবে দেখুন....।

- খাবারের প্যাকেটগুলো কতক্ষণে আসবে?

- এই, আধঘণ্টার মধ্যেই চলে আসবে। আমার ম্যানেজার কমল নিজে হালদারপাড়ার দোকান থেকে ম্যাটাডোরে করে তুলে আনছে। এই খানিকক্ষণ আগেই ফোনে কথা হয়েছে।

- দেখবেন, বাড়তি শ'খানেক প্যাকেট আনিয়ে বসবেন না নিজের মাথা খাটিয়ে।

- আজ্ঞে না। ওই, এগজ্যাক্ট নাম্বারই আসছে।

- স্টেজ বাঁধা, ব্যানার, ফেস্টুন, ভিআইপি আপ্যায়ন, মাইক, জেনারেটর, পাবলিকের জন্য খাবারের প্যাকেট, ভলেন্টিয়ার, মানপত্র, উত্তরীয়...উঁ...প্লাস এইগুলো...উম...।

- হিসেবে কোনও ভুল নেই স্যার।

- যাকগে, শুনুন। বড়সাহেব আর একঘণ্টার মধ্যে এসে পৌঁছচ্ছেন। ওঁর সঙ্গে আর জনাচারেক সিনিয়র অফিসার আসবেন। কাজেই মিনিমাম খানচারেক গাড়ি থাকবে। সে'গুলোর পার্কিং আর ড্রাইভারদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে যেন আমায় ভাবতে না হয়...। আর তাছাড়া কলকাতা থেকে কুড়িজন মত রিপোর্টার আসবেন। তাদের যত্নআত্তির ব্যাপারটা আমিই দেখব। কিন্তু আপনি নিজে থাকবেন আমাকে অ্যাসিস্ট করতে।

- আরে সে'সবের জন্য তো আমরা আছি...।

- ভালোই তো কামাচ্ছেন এই ইভেন্টটা থেকে।

- শুধু তো ইনকামের জন্য নয় স্যার। আপনাদের কোম্পানি আমাদের গাঁয়ের স্কুলে এতগুলো টাকা দেবেন। সে টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন বেঞ্চি টেবিল ব্ল্যাকবোর্ড কেনা হবে। কত বড় উপকার বলুন।

- সে গাঁয়ের মানুষ হয়ে নিজের কন্ট্র্যাক্টরির টাকা থেকে বাড়তি কিছু ডিসকাউন্ট দিতে পারতেন তো।

- হে হে হে স্যার। আমরা সাধারণ ব্যবসায়ী। আপনাদের মত বড় কোম্পানি কর্পোরেট সোশ্যাল কাজকর্ম সারতে গ্রামে-গঞ্জে আসছেন। এতে তো আমাদের রুরাল ইকনমিরও ফায়দা, বলুন।

- বাব্বাহ্, গপ্প তো ভালোই জানেন। কিন্তু বলে রাখলাম, পঞ্চাশটা এক্সেস চেয়ারের টাকা আপনার বিল থেকে কেটে নেব।

- বেশ তো। বেশ তো।

- হ্যাঁ, আড়াই লাখটাকার বিল হাঁকছেন। সে'খান থেকে হাজারখানেক এলো কী গেলো তা নিয়ে আপনার ভাবার কথা নয়। শুনুন, আমি একটা সিগারেট খেয়ে আসছি। আপনি ততক্ষণে আমাদের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থাটা সেরে ফেলুন দেখি। লোকজন এসে পড়ার আগে সে ব্যাপারটা মিটে যাক।

**

স্কুলের পাশেই কেষ্টবাড়ি ঝিল। জায়গাটা নিরিবিলি, মনোরম। সে ঝিলের এককোণে বাঁধানো কয়েকটা সিঁড়ি। সে সিঁড়িতে বসে সিগারেটটা ধরালে অনুপ চ্যাটার্জী। ভারী মিঠে হাওয়া বইছে, চোখেমুখে সে হাওয়া লাগায় চোখ লেগে আসে। কাল রাত্রে যে লজে রাত কাটাতে হয়েছে সে'খানে মশার কামড়ের চোটে অর্ধেক রাত পায়চারী করে কাটাতে হয়েছে। ঝিমুনিটা ভাঙল একটা মিহি কণ্ঠস্বরে; "আপনিই কলকাতার হিউউইট কোম্পানির সিনিয়র অফিসার"?

অনুপ ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন এক বছর পঞ্চাশের লোক, পরনে হাফ পাঞ্জাবী আর পাজামা। সৌম্য চেহারা, মুখে স্মিত হাসি। উঠে দাঁড়ালেন অনুপ।

- আমিই হিউউইট কোম্পানির সিনিয়র অফিসার, অনুপ চ্যাটার্জী। আপনাকে তো ঠিক...।

- নমস্কার। আমি সমর মণ্ডল। দীননাথ ঠাকুর জুনিয়র হাই, যে'খানে আপনারা কিছু অনুদান দিতে সম্মত হয়েছেন, ও'খানে আমি অঙ্ক শেখাই।

- নমস্কার। বলুন।

- আমি জানি এমন দুম করে কিছু বলে বসাটা সমীচীন নয়। তবে আপনি ইয়ং কর্পোরেট লীডার। হয়ত ফর্ম্যালিটির তেমন প্রয়োজন নেই।

- বলুন না।

- আপনারা স্কুলে একলাখ টাকা দিচ্ছেন বেঞ্চি-ডেস্ক এই'সব কেনার জন্য। তা'তে আমাদের অনেক উপকার হবে। শুধু...।

- শুধু?

- আমাদের একটা লাইব্রেরী আছে, জানেন। রিসোর্সফুল নয়। সামান্য কয়েকটা বই। বেশিরভাগই ডোনেটেড। বেশিরভাগই পুরনো এডিশনের টেক্সটবুক। লাইব্রেরী নামেই আর কী। ছেলেপিলেরা বড় একটা ঘেঁষে না ও'দিকে। অবশ্য, যাবেই বা কেন। ওদের অ্যাট্রাক্ট করার মত ভালো কোনও গল্পের বইটই তো নেই। রঙিন এনসাইক্লোপিডিয়া গোছের কিছু বই হলেও না হয়...।

- ওহ আই সী।

- মিস্টার চ্যাটার্জী, আমরা কয়েকজন মিলে মাঝেমধ্যে চেষ্টা করি বটে এ বই সে বই জোগাড় করে আনার। কিন্তু তাতে আর কতটা হয় বলুন। আপনাদের তরফ থেকে যদি লাইব্রেরির জন্য একটা কর্পোরেট ডোনেশন পাওয়া যেত...।

- বেশ তো। একটা অ্যাপ্লিকেশন যদি স্কুলের থেকে দেওয়া হয়, তা'হলে আমাদের পরের বছরের বাজেট থেকে কিছু করা যায় কিনা, সে'টা না হয় আমরা কনসিডার করে দেখব...।

- না না, লাইব্রেরীর জন্য লাখটাকার দরকার নেই। হাজার কুড়ি হলেই অনেক জরুরী বই  আমরা কিনে ফেলতে পারি...।

- টাকার পরিমাণ যাই হোক, রিলিজ করার প্রসেসটা তো একই। তাছাড়া এই ধরণের কাজে গোটা টাকাটাই আসে আমাদের কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটির ফান্ড থেকে। সে'টা তো লিমিটেড।

- চ্যাটার্জীবাবু, একটু দেখুন না। এই যে এক গাঁ মানুষকে শিঙাড়া, মিষ্টি, কেক খাওয়াচ্ছেন; তার বদলে যদি...। বা এই যে অনুষ্ঠান করছেন, তার এত খাইখরচ...স্পেশ্যাল গেস্ট, মিডিয়া...। সে'সব থেকেই যদি সামান্য কিছু সরিয়ে...।

- সেই খরচ পি-আর ফান্ড থেকে আসে। সে ব্যাপারটা আলাদা।

- আজ্ঞে?

- সে খরচ আলাদা। কোম্পানি একটা স্কুলকে অনুদান দিচ্ছে, সে'টার পাবলিসিটি করতে হবে না?

- ওহ, তাই তো।

- মণ্ডলবাবু। আমি আসি। অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। আর, পারলে একটা অ্যাপ্লিকেশন দিন না কলকাতায় এসে। আপনাদের লাইব্রেরী ফান্ডের জন্য। আমি রেকমেন্ড করে দেব'খন।