Sunday, June 5, 2022

সাইকেলজিক

শেষে এক জ্যাঠতুতো দাদা ঠেলেঠুলে কোনওক্রমে শিখিয়ে ছেড়েছিল৷

কিন্তু দাদা হলে যা হয় আর কী। সামান্য ফুর্তির সুযোগ না থাকলে সে মহৎ কাজ করবে কেন? দু'চাকার ওপর ব্যালেন্সটা সবে খানিকটা ধরেছি। খোলা মাঠে টলমলিয়ে সাইকেলসহ এগিয়ে গেছি খানিকটা৷ অমনি সে দাদা চেঁচিয়ে বললে,  "দারুণ, ব্রাভো৷ এক্কেবারে হিরোর মত চালাচ্ছিস৷ এ'বারে শোন ভাই, আসল মজা টের পেতে হলে হ্যান্ডেল থেকে দু'হাত সরিয়ে প্যাডেলের স্পীড বাড়িয়ে দে৷ তারপর চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে, স্টাইল মেরে শিস দিতে দিতে চালা৷ দ্যাখ ঘ্যাম কাকে বলে"।

যদিও শিস দিতে পারতাম না (এখনও চেষ্টা করলে ওই পার্সেলমাউথ ফ্যাসফ্যাসের বেশি কিছু বেরোবে না)৷ কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বড় সেই দাদা আমায় হিরো বলেছে৷ সে'টা কদর না করলে চলবে কেন?

তখন যদিও মাথার চুলে কদমছাঁটে মুড়িয়ে কাটা৷ সে চুলে আঙুল চালানো অসম্ভব৷ তবু৷ অমন মোটরবাইক চালাতে পারা, সিগারেটের প্যাকেট পকেটে নিয়ে ঘোদা দাদা আমায় হিরো বলেছে৷ সে সম্মান তো ফেলনা নয়৷ 

কাজেই হিরোর মত ঘ্যামপ্রকাশ করতে হল। ইন্সট্রাকশন কানে আসা মাত্রই প্যাডেলে জোর দিয়ে হ্যান্ডেল থেকে হাত সরিয়ে নিলাম৷ আর সে অবাধ্য সাইকেলও নির্দ্বিধায় আমায় সরিয়ে দিলে৷ বলা ভালো, উড়িয়ে দিলে৷ মুখ দিয়ে উত্তম মার্কা শিসের বদলে একটা মারাত্মক নবদ্বীপ মার্কা আর্তনাদ বেরোল; ' বাবা গো'! আমি দু'বার বাউন্স খেয়ে চিৎপাত। হাঁটুফাঁটু কনুইটনুই ছড়েটড়ে একাকার কাণ্ড৷ বাপের ভাগ্যি হাড়গোড় ভাঙেনি৷ ও'দিকে সেই ট্রেটার হারকিউলিস সাইকেলটাও ফ্ল্যাট আমার ঠ্যাঙের ওপর৷ 

দাদাও মাটিতে লুটোপুটি, তবে পেট চেপে, হাসির চোটে৷ সেই থেকে বাড়াবাড়ি রকমের হেল্পফুল দাদাদের দেখলে একটু সমঝে চলাটাই আমি সমীচীন বলে মনে করি৷

গুপীর জামাইষষ্ঠী



সতেরো দিন পুরনো আনন্দবাজারটা ঘেঁটে নতুন খবর বের করার চেষ্টা করছিলেন মন্মথ হালদার। অকারণে রোজ রোজ কাগজ কিনে টাকা জলে দেওয়ার লোক তিনি নন। একবার কাগজ কিনে সে'টাই ধীরেসুস্থে হপ্তাতিনেক পড়ে থাকেন তিনি। জরুরী খবরগুলো বারচারেক পড়তে হয় রপ্ত করতে। ক্রসওয়ার্ড পাজলের ক্লুগুলো দিনে তিনটের বেশি নয়, নয়ত মগজকে অকারণ চাপ দেওয়া হয়। এমন সময় বিপিন এসে কনসেনট্রেশন দিল নষ্ট করে। সেই একই বাতিক ছেলেটার; নেই। আজ চিনি নেই। কাল তেল নেই। পরশু কাপড় কাচার সাবান নেই। শুধু নেই নেই আর নেই। মহাখচ্চর একটা কাজের লোক জুটেছে কপালে। কিন্তু বিপিনকে ছাড়া গতিই বা কী। মন্মথ হালদারের বাড়িতে বিপিন ছাড়া কেউ কোনোদিন টিকবে না, সে কথা মন্মথবাবু নিজেও জানেন।

"টীব্যাগ শেষ", সদর্পে ঘোষণা করল বিপিন।

খবরের কাগজটা সরিয়ে রেখে পকেটে রাখা নোটবইটা বের করে খানিকক্ষণ পাতা উলটেপালটে দেখলেন। মনে মনে খানিকক্ষণ হিসেব কষলেন। ভুরু কুঁচকে গেল ভদ্রলোকের, "বিপনে, হিসেব মত টীব্যাগের স্টক আরও আট দিন চলার কথা। শেষ হল কী করে সাততাড়াতাড়ি"?

"দেখুন কাকা, ওই আপনার মত এক টীব্যাগ ডুবিয়ে দু'বার করে চা খেতে পারব না। এক কাপে একটা টীব্যাগ না হলে আমার চলবে না"। 

"ওরে আমার লাটসাহেব এলেন রে। চলবে না। অত যদি নবাবী থাকে তা'হলে দিনে দু'বারের বদলে এককাপ চা খাবিগে যা"। 

"ও'সব পারব না। দু'কাপ চা মাস্ট। নয়ত গা ম্যাজম্যাজ করে। আর সন্ধের পর এককাপ কফি। কড়া করে"। 

"শালা রাস্কেল। তুই আমার বাজার করার পয়সা মেরে কফি খাচ্ছিস"?

"বাজে কথা বলবেন না। পয়সা কতই বা আর দেন বাজার করার। ও'দিয়ে ঝরতিপড়তি মাল ছাড়া কিছু জোটে নাকি। নিজের স্যালারি থেকে নিজের কফি আনি"।

"কুকিং গ্যাসটা তো আমার যায় রে হতভাগা। উফ, এরা আমায় পথে বসিয়ে ছাড়বে"। 

"তিনকুলে তো কেউ নেই। যা মালকড়ি এরপর তো চোদ্দভূতে লুটে নেবে। এ'বার একটু ভোগটোগ করুন না কাকা"।

"দূর হ। তোর জ্ঞান আমার না শুনলেও চলবে। চায়ের ব্যাগ শেষ হয়ে গেছে যাক। নেক্সট লট কেনার ডিউ ডেট মাসের বাইশ তারিখে। এখনও ঢের দেরী। তদ্দিন এ'বাড়িতে চা বন্ধ"। 

"ভালো কথা, আমি তা'হলে নিজের চাপাতার ব্যবস্থা করে নি'গে। দেখবেন, তখন আবার আমার থেকে দিনে এককাপ ধার চাইবেন না"। 

"তুই আমায় চায়ের খোঁটা দিচ্ছিস রে ব্যাটা? জানিস আমার জ্যাঠামশাইয় এক গোরার দার্জিলিং টী-এস্টেট থেকে ডাইরেক্ট চা-পাতা আনাত"?

"এই এক রোগ দেখছি মাইরি আজকাল। পৃথ্বীরাজ দারুণ যুদ্ধ করতেন তাই আমি চাকরী না করে পাড়ার রকে বসে গুটখা খাব আর শিস্‌ দিয়ে বলব মেরা ভারত মহান। লে হালুয়া। আপনার জ্যাঠা দার্জিলিং থেকে চা আনাতেন আর আপনি সকালের এঁটো টীব্যাগ চুবিয়ে বিকেলের চা খান। এই দুয়ে কীসের তুলনা? ধুর"। 

"বেরিয়ে যা আমার সামনে থেকে। আমার টাকায় খাবি, আমার টাকায় পরবি। আর আমায় স্ক্যান্ডালাইজ করবি"? মন্মথ আর দু'কথা শোনাতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় রিক্সার প্যাঁপোরপোঁ শুনে দু'জনেই ঘুরে গেটের দিকে তাকালে। 

রিক্সা থেকে যে নামলে তাকে দেখে মন্মথর মুখ আরও খানিকটা ভেটকে গেল। 

কিন্তু বিপিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সে চিৎকার করে উঠল, "আরে, গুপীদা"! এই বলে বিপিন ছুটে এগিয়ে গেল অতিথির দিকে। তার দু'হাতে ভারি দু'টো ব্যাগ আর পিঠে একটা ঢাউস ব্যাকপ্যাক। হাতের দু'টো ব্যাগ বিপিনের দিকে এগিয়ে দিল গুপী। 

"কদ্দিন পর এলে এ'বার গুপীদা", বিপিনের আনন্দ আর ধরছিল না। 

"কেমন আছিস বিপনে"? বিপিনের পিঠ চাপড়ে জিজ্ঞেস করলে গুপী। 

"কোনোক্রমে আছি। চাটনিতে বেশি চিনি দেওয়ার জন্য আমায় কৈফিয়ত দিতে হয়। আমার আবার থাকা"। 

তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মন্মথ, "তুই কত বড় ট্রেটার রে বিপনে? একটা স্ট্রেঞ্জারের কাছে গেরস্তের নিন্দে করতে তো লজ্জা করে না"?

মন্মথর কথাটা না শোনার ভান করে বিপিন গুপীকে শুধল, "হ্যাঁ গো গুপীদা, কী কী আনলে এ'বার"?

বারান্দার মোড়ায় বসে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে গুপী বললে, "একটা ব্যাগে আছে পাঁঠার মাংস, পাবদা, মৌরলা, দেশী মুর্গী আর হাঁসের ডিম। বুঝলি। আর অন্যটায় হিমসাগর, লিচু, আর সন্দেশের বাক্স"। 

"দই আনোনি"? সাগ্রহে খোঁজ নিল বিপিন। 

"মিত্তিরের দোকানে দাঁড়িয়েছিলাম শুধু তোর দইপ্রেম মনে করে। দু'কিলো এনেছি। এককিলো তোকেই সাফ করতে হবে কিন্তু"। 

প্রায় লাফিয়ে উঠল বিপিন। তারপর জিজ্ঞেস করল, "গুপীদা, বাড়িতে চা নেই। কফি খাবে"?

"খাবো। তবে ব্ল্যাক"। 

"হোয়াইট চাইলেও জুটত না। এ বাড়িতে দুধ ঢোকে না। বড় খরচ কিনা তা'তে", একটু বাঁকা সুরেই জানান দিলে বিপিন। 

"এখুনি বেরো রাস্কেল, বেরো তুই হারামজাদা", টেবিল চাপড়ে চিৎকার শুরু করলেন মন্মথ। কিন্তু সে চিৎকার থামাতে হল। গুপী এসে ঢিপ করে প্রণাম করেছে। 

একটু বিরক্তির সুরেই মন্মথ বললেন, "এ'ভাবে না বলে কয়ে দুমদাম এসে পড়াটা আমি মোটেও পছন্দ করিনা"। 

গুপী এ'সবে নার্ভাস হয় না। সপাটে বললে, "দুম করে কী। আজ তো আসার কথাই ছিল"।

"আজ? আজ কী ব্যাপার? কই, আজ তো তোমার আসার কোনও কথা ছিল না"? 

"আপনার মাথাটাথা গেছে। আজকের দিনটা  ভুলে মেরে দিয়েছেন তো"? 

"আজ কী"?

"যাব্বাবা। আজ জামাইষষ্ঠী। এমন দিনে শ্বশুরবাড়ি ঢুঁ মারব না"?

"এ'টা মোটেও তোমার শ্বশুরবাড়ি নয়"। 

"নাহ্‌, আপনার মাথাটা সত্যিই গেছে। এই বিপনে, তিন কাপ কফি করিস। শ্বশুরমশাইয়ের মাথার ব্যালেন্স ভালো ঠেকছে না"। 

"তোমার এই গায়ে পড়া অসভ্যতা আমার বরদাস্ত হয় না গুপী"।

"যাকগে, শুনুন। আমার সময় নষ্ট করলে চলবে না। আড়াই ঘণ্টা ধরে বাজার করেছি। বিপনের হাতে ছেড়ে দিলে সেই দায়সারা ঝোলভাতই গিলতে হবে। আমি ওপরের বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সোজা রান্নাঘরে যাচ্ছি। মৌরলার একটা নতুন রেসিপি শিখে এসেছি মেজপিসির থেকে। আপনাকে জাস্ট চমকে দেব শ্বশুরমশাই"। 

"দ্যাখো। এত বছর ধরে তোমায় বলে চলেছি। আজ আবারও বলছি। তুমি আমায় শ্বশুরমশাই ডাকবে না। গা জ্বলে যায়"। 

"ও হ্যাঁ, আপনার জন্য ভালো চা পাতা এনেছি। গোপালধারা। আপনার মাস দুয়েক চলে যাবে"। 

"আমার কোনও কথা কি তোমার কানে যাচ্ছে না গুপী"? 

"শুনুন, আমায় হেঁসেলে ঢুকতে হবে। দাঁড়িয়ে বকবক করলে চলবে না। ফ্রেশ হয়ে আসছি"। 


****

দুপুর দু'টো নাগাদ বিপিন মন্মথকে ডেকে খাওয়ার ঘরে নিয়ে গেল। গুপী খাবারদাবার বেড়ে রেডি রেখেছিল। ব্যাজারমুখেই চেয়ার টেনে নিয়েছিল মন্মথ। কিন্তু গুপীর রান্নার সামনে বসে মুখ ব্যাজার রাখা সম্ভব নয়। 

মিনিট দশেক চুপচাপ খাওয়াদাওয়ার পর মন্মথ জিজ্ঞেস করেই ফেলল, "বিকেলের ট্রেনেই ফিরছ তো"?

মাংসের হাড় চিবুতে চিবুতে সে প্রশ্নকে উড়িয়ে দিল গুপী, "রাতে হালকা রেখেছি ব্যাপারটাকে, বুঝলেন শ্বশুরমশাই। জামাইষষ্ঠীর লাঞ্চটা বেশ ভারী হল কিনা। ওই সোনামুগডাল, বেগুন ভাজা, আলু পোস্ত, ডিমের ডালনা, আর রাবড়ি। এ বয়সে দু'বেলাই নালেঝোলে খাওয়া আপনার চলবে না"। 

কথা না বাড়িয়ে খাওয়ায় মন দিলেন মন্মথ। গুপী গোঁয়ারগোবিন্দ হতে পারে, কিন্তু ওর রান্নার হাতটা সত্যিই বড় ভালো। 

***

রাত দু'টো নাগাদ ঘর থেকে বেরিয়ে ফ্রিজ খুলে একটা সন্দেশ মুখে দিয়েছিল গুপী। তখনই খেয়াল করল ব্যালকনিতে রাখা ইজিচেয়ারে মন্মথ বসে। 

"কী ব্যাপার শ্বশুরমশাই, ঘুমোননি"?

"ইনসমনিয়া ব্যাপারটা ইদানীং শুরু হয়েছে"। 

"ওহ্‌"। 

"তুমি ঘুমোওনি দেখছি"।

"ঘুমের মধ্যেই আমার মাঝেমধ্যে সন্দেশ পায়, তাই উঠতে হল"।

"এ'সব করে কী পাও গুপী"?

"কী'সব করে"? 

"কেন আস এ বাড়িতে বারবার"?

"আমার শ্বশুরবাড়ি। অবভিয়াস ক্লেম আছে"। 

"সুমিকে তুমি বিয়ে করনি"। 

"সুযোগটা পেলাম কই বলুন। তবে আমি কিন্তু ক্লাস টুয়েলভ থেকেই আপনাকে শ্বশুর বলেই চিনি। বিয়ের জন্য আটকে থাকতে হয়নি"। 

"কেন আস বারবার? কেন? সুমিই যখন থাকল না...তুমি কেন আস"?

"সুমির জন্যই আসি। ও না থাক, আমরা দু'জন তো আছি বলুন। আমরা যদ্দিন, তদ্দিন"। 

"তোমাদের বিয়ে হয়নি গুপী। আমার প্রতি তোমার কোনও দায় নেই"। 

"দায়? ও'সব ফালতু কথা ছাড়ুন। বিপনে ঠিকই বলে, আপনি মহাখিটকেল বুড়ো"।

"বিপনে আমার নামে এ'সব বলে"?

"আমি তো তাও অশ্রাব্য অংশগুলো চেপে গেলাম"।

"আমি কালই ওকে পুলিশে দেব"। 

"দেবেন'খন। শুধু দোহাই আপনাকে, এক টীব্যাগ দিয়ে দিনে দু'বার চা খেতে বলবেন না"। 

"ওহ্‌। ও তোমায় সে কম্পেলনও করেছে"।

"বিপিনের সঙ্গে আমার রোজ কথা হয়। ফোনে"। 

"সে আমার অজানা নেই"। 

"শ্বশুরমশাই, কিছু বলবেন"?

"তোমার ওই এনজিও আর ইস্কুলটা কেমন চলছে"? 

"মন্দ না"। 

"গুপী"। 

"বলুন।  

"গতমাসে সমর এসেছিল"।

"ওই, সুমির উকিলকাকু"?

"হ্যাঁ। আমার টাকাপয়সা যে'টুকু আছে, আর এই বাড়িটা। তোমার ওই এনজিওর নামে উইল করে দেওয়া গেছে। ভেবো না তোমায় এক পয়সাও দিয়েছি। শুধু সুমির নামে যদি একটা স্কলারশিপ আর একটা হোম তৈরি করা যায়...আমার তার ক'দিন"। 

"সে হবে নিশ্চয়ই"। 

"তুমি ঠিকই পারবে। সে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা নেই। তবে আমার একটা রিকুয়েস্ট ছিল"। 

"এনিথিং। বলুন না"। 

"আমি না থাকলে তুমি বিপনেটাকে দেখো কিন্তু। ও তোমায় খুব রেস্পেক্ট করে। আর ওর মুখেই বড় বড় কথা। আমি না থাকলে ওর ভেসে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে"। 

"ন্যাওটা কিন্তু আপনারও"।

"তাও ঠিক। নয়ত কি আর এঁটো টীব্যাগ হজম করে পড়ে থাকে"?

"সন্দেশ খাবেন শ্বশুরমশাই? লাঞ্চে তো রিফিউজ করলেন। এখন আনি দু'পিস? হাইকোয়ালিটি কিন্তু। আমি অ্যাসিওর করছি"। 

Thursday, June 2, 2022

ভাণু সমগ্র



ভানুবাবুর লেখালিখিগুলো(ওঁর নিজের লেখালিখি আর ওঁর সম্বন্ধে অন্যদের লেখালিখি) জড়ো করে একটা দুর্দান্ত কাজ করেছে পত্রভারতী। এই ভানু সমগ্রের অর্ধেক জুড়ে রয়েছে ভদ্রলোকের একটা জমজমাট আত্মকথা, বইয়ের মূল আকর্ষণ সে'টাই।
বড় শিল্পীদের আত্মকথা অনেকক্ষেত্রেই "গোস্ট রিটেন" হয়। তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়না বোধ হয়। কিন্তু ভানুবাবুর লেখার সোজাসাপটা স্টাইল,তাঁর কপিবুক ধারালো উইট এবং রসালো
আড্ডার যে মেজাজ প্রায় প্রতিটি লাইনে রয়েছে; তা'তে মনে হয় এ জিনিস এক্কেবারে "রাইট আউট অফ হর্সেস মাউথ" না হলেই নয়। সাহিত্যের নিয়মকানুন রুচির তোয়াক্কা তেমন করেননি। গোটাটাই একটা দিলখোলা গপ্পগুজব, ওঁর সেই "একপেশে স্টাইলে"। পাঠক হিসেবে বরাবরই মনে হয়ে ভালো আত্মকথায় স্রেফ "আমি,আমি,আমি" থাকলে সমস্তটাই মাটি। আমার অমুক, আমার তমুকে আটকা পড়ে বহু সম্ভাবনাময় বায়োগ্রাফি ভেসে গেছে। ভারতীয় ক্রিকেট তারকাদের কিছু জীবনে সে ব্যাপারে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ভানুবাবুর এই ছোটখাটো লেখার ক্ষেত্রে আর যাই হোক সে অভিযোগ আনা যায় না। ভদ্রলোক নিজের জীবনের একটা ফ্লো দিব্যি সাজিয়েছেন বটে। তবে তাঁর লেখায় দুর্দান্তভাবে স্পষ্ট হয়েছে সে সময়ের বাংলা সিনেমা জগতের বেশ কিছু জরুরী ব্যক্তিত্ব। সে'সময়ের বাংলা সিনেমার (বিশেষত বিয়ন্ড-সত্যজিৎ জগতের) লেজেন্ডদের বিষয়ে লেখালিখি ঠিক সহজলভ্য নয়। ভানুবাবুর এই গল্পগাছা সে আগ্রহকে খোঁচা দেয় বইকি। মাঝেমধ্যে সিনেমার বাইরেও গিয়ে পড়েছেন ভানু। তাঁর বর্ণময় জীবন তুলে ধরতে গিয়ে উঠে এসেছে দেশভাগ, কলকাতা, রাজনীতি আর আরও কত কী।
লেখাটা পড়তে গিয়ে বারবার মনে হইয়েছে বাংলা সিনেমার সে'যুগের মানুষজন সম্বন্ধে আমরা (অন্তত আমি) কত কম জানি। সিনেমার স্ক্রিনের বাইরেও তাঁদের সরেস উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব, রকমারি বাতিক; এ'সব আর এ'যুগের মানুষের দৃষ্টিগোচর হল কই। এই যেমন ক্যামেরা বা স্টেজের আড়ালেও ছবি বিশ্বাসের যে কী সাংঘাতিক একটা দুনিয়া-কাঁপানো স্টাইল ছিল! ছবিবাবুকে নিয়ে একটা পেল্লায় বই লেখা উচিৎ, তরতরে ঝরঝরে ভাষায়। সে কাজটা কে করবেন আমার জানা নেই। অভিনেতা ছবি বিশ্বাস সকলের অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তবে ভানু খোলসা করেছেন ওঁর ব্যক্তিগত স্টাইল আর হিউমরের দিকটা। আমার চোখে সে'টাই এ বইয়ের অন্যতম হাইপয়েন্ট। এই যেমন ধরুন স্টেজে সহঅভিনেতাদের কী'ভাবে ভড়কে দিতেন ছবিবাবু? বিকাশবাবুকে 'বেগুনপোড়া'র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন কেন? উত্তমকুমারকেই বা ছবিবাবু ঠিক কী'ভাবে ইন্সপ্যায়ার করেছিলেন? আর নিজের জমিদার মেজাজের ঘ্যাম কী'ভাবে 'ক্যারি' করতেন ভদ্রলোক? প্রাণখুলে লিখেছেন ভানুবাবু। তবে শুধু ছবি বিশ্বাস নয়। উত্তমের ফোকাস, সাবিত্রীর দুর্দান্ত প্রতিভা, বিকাশ রায়ের ইন্টেলিজেন্স, পাহাড়ি সান্যালের সারল্য; এমন আরও কত মানুষ সম্বন্ধে কত কিছু। তবে শুধু প্রশংসায় আটকে যাওয়ার মানুষ তো ভানু নন। কড়া কথা এবং অভিযোগগুলোও চেপে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি।
সেই সময়ের কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমা জগতের পরিবেশ, রাজনীতি, আর সম্পর্কগুলো সম্বন্ধে বেশ সোজাসাপটা ভাষায় লিখেছেন ভদ্রলোক। সে'দিক থেকে এ লেখা যাকে বলে বেশ জরুরী দলিল। সবচেয়ে বড় কথা, অভিনয় আর কমেডি সম্বন্ধে কিছু জরুরী অবজার্ভেশন শেয়ার করেছেন তিনি। রবি ঘোষও নিজের জীবনীতে অভিনয়ের টেকনিকালিটি নিয়ে মনোগ্রাহী স্টাইলে বেশ কিছু জরুরী কথা লিখেছেন। ভানুবাবুর লেখার মধ্যেও একই প্যাশন। রবিবাবু যেন একটু বেশি সেরেব্রাল,ভানু খানিকটা প্র্যাক্টিকাল। বাংলা সিনেমার অতিরিক্ত কান্না-প্রীতিতে দু'জনেই বিরক্ত এবং হতাশ। আর সিনেমায় রিলিফের খাতিরে কমেডির অপব্যবহারে দু'জনেই মর্মাহত।
ভানুবাবুর কেরিয়ার কার্ভটা বড্ড সিনেম্যাটিক। কমেডিতে আসর কাঁপানোর পাশাপাশি সিনেমার হিরো হয়েও বিভিন্ন সিনেমা হিট করিয়েছেন। বেশ নেতাগোছের মানুষ। সাঙ্ঘাতিক উইট এবং রসবোধ। সেই উইট ছাপিয়েই তিনি আবার দামাল, দুর্দান্ত। ঠাস ঠাস করে কড়া কথা শোনাতে পারেন। খানিকটা বেপরোয়া (নইলে অন্যদের ব্যাপারে অমন কামান দাগা সম্ভব নয়। নিজের ছেলেকেও রেয়াত করেননি অবশ্য)। সেই বেপরোয়া বিচ্ছু ভদ্রলোকই একটা সময় এসে নিজেকে ভাঁড় হিসবে সিনেমায় দাঁড় করাতে বাধ্য হয়েছেন; বারবার। ওই, প্রেম,ট্র্যাজেডি এ'সবের ফাঁকে দর্শকদের কমিক রিলীফ যোগাতে হবে। কমেডিয়ান এসে উঁচু মাত্রায় কিছু চুটকি মাঠে ফেলবেন। ওঁর মত ধারালো অভিনেতাকেও সেই টেমপ্লেটের বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছিল। আবার একটা বয়সের পর সে'সুযোগগুলোযও হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল। রাগ, বিরক্তি, অভিমান আর সর্বোপরি টাকার অভাব; সব মিলে বাধ্য হয়ে এগোলেন যাত্রাকে এক্সপ্লোর করতে। কিন্তু জাত শিল্পীদের ব্যাপারটাই আলাদা। আমরা কর্পোরেটে একটা বুলি খুব কপচাই; যাই করো, এক্সেলেন্স থেকে ফোকাস সরলে চলবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা বলি এক্সেলেন্স আর বানাই গাম্বাট পাওয়ারপয়েন্ট। ভানুবাবু তো কর্পোরেট স্টুজ নন, শিল্পি। যাত্রাতে লোক মাতালেন। আর্টফর্মটাকে ভালোবাসলেন। সিনেমাতেও দুর্দান্ত কিছু কামব্যাক পারফর্ম্যান্স দিলেন। কিন্তু কমেডিয়ান তকমাটা আর ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না। এই যে দুর্দান্ত একটা কার্ভ, যে'টা শুধুই 'রাইজিং' নয়, ভানুবাবুর প্রাণখোলা লেখার গুণে সে'টা একটা চমৎকার নভেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের বিরক্তির ওপর সাহিত্যের পালিশ চালাননি ভদ্রলোক, সে'টাই এই লেখার বড় ব্যাপার।
উত্তমের গালে চুমু খেতেন ভানু, সৌমিত্রর প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা- নিজের গার্জেন বলে মনে করতেন, সত্যজিৎকে সম্মান করতেন আবার সামান্য় অভিমানও পুষে রেখেছিলেন। ও'দিকে গুপী গাইন বাঘা বাইন রিলিজের সময় উত্তম আর ভানু একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। অবাক কাণ্ড, সত্যজিতের সিনেমায় চান্স না পাওয়া ভানু কিন্তু ছিলেন সত্যজিতেরই দলে। নিশ্চিন্তে থাকুন; এ'গুলো স্পয়লার নয়, খোঁচা। এইসব ইনফর্মেশনগুলো আড়ালে যে'সব রিয়েললাইফ গল্প লুকিয়ে আছে, সে'গুলোকে টেনে বের করে আনতে হলে এ লেখা পড়া ছাড়া উপায় নেই। বাংলা-সিনেমার ভক্তদের জন্য সে'সব অ্যানেকডোটের মূল্য অপরিসীম। তবে সেই সিনেমার জগতের পরিচয়টাই ভানুবাবুর বায়োডেটার শেষ কথা নয়। ওঁর শিক্ষকদের একটা ফর্দ করলে তাজ্জব বনে যেতে হয়। দীনেশ গুপ্ত থেকে সত্যেন বসু হয়ে আর কত দুর্দান্ত সব মানুষ। আর সবচেয়ে বড় কথা, দেশভাগের জ্বালাযন্ত্রণা তাঁর কমেডির সঙ্গে মিলেমিশে গেছিল।
ভানুবাবুকে নিয়ে একটা জবরদস্ত বায়পিক কে বানাবেন? স্নেহ-ভালোবাসা-ট্র্যাজেডি; মশলাপাতির তো অভাব নেই। শুভস্য শীঘ্রম!

ভোলার দাওয়াই



বড় কঠিন সময়৷ মানে, এই চল্লিশ-হল-বলে বয়সটা। মানুষজনের প্রতি নিষ্ফল রাগ বেড়েছে অথচ রাগপ্রকাশ করার সাহস কমেছে৷ মিডলাইফ ক্রাইসিসের কেমিক্যাল ইকুয়েশন বোধ হয় এ'টাই। তবে মাঝেমধ্যে মনকে শান্ত করতে বিভিন্ন দুঃসাহসী সিচুয়েশন কল্পনায় সাজিয়ে নিই৷
এই যেমন কখনও ভাবি ব্রেনের সুইটস্পট থেকে স্মার্ট সারকাজম তুলে এনে কোনও বাটপারকে চুপ করিয়ে দিচ্ছি৷ (আদতে অবশ্য স্মিত হেসে মাথা নেড়ে কথার পিঠে তাল দিয়ে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না)।
অথবা, হয়ত ভাবছি যে প্রচণ্ড ধারালো সব যুক্তি আর ইন্টলেকচুয়াল গাম্ভীর্য দিয়ে তর্কবাগীশদের জাস্ট শুইয়ে দিচ্ছি৷ তারপর রণেভঙ্গ দিয়ে সে'সব ডিবেট-ব্র্যাডম্যানরা আমায় স্যালুট ঠুকছে৷ (আদতে হয়ত বলতে হচ্ছে, "মার্ভেলাস কথা বলেছেন মশাই৷ এক্কেবারে একঘর)৷
কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় কাল্পনিক প্রত্যুত্তরে থাকে একটা ষাঁড়৷ সেই যমালয়ে জীবন্ত মানুষের ভোলা। যখন জ্ঞানগর্ভ কথার গদা দিয়ে কেউ এলোপাথাড়ি ঠোকাঠুকি করে চলে, মনে মনে ভাবি সেই ভোলা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ আর আমি আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ষাঁড়টাকে ইন্সট্রাক্ট করছি, "গুঁতো ভোলা, গুঁতো"!

অমল দারোগা আর ফুল



"শুঁকে দ্যাখ", অমল দারোগা বেশ গম্ভীরভাবেই বললেন৷
আমি অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে রিফিউজ করলাম। একজন নিষ্ঠাবান পকেটমার হয়ে দারোগার হাতের অচেনা ফুল শুঁকে দেখাটা সমীচীন হবে না৷ পুলিশের পেটে পেটে হাজার রকমের বদ মতলব ঘুরে বেড়ায়৷ গম্ভীর হয়ে বললাম,
"আমার ফুলে অ্যালার্জি আছে"।
"তোরই লোকসান", অমল দারোগা চুকচুক করে বললেন৷
"লোকসান কেন"?
"এই ফুল আগে দেখেছিস"?
" না দেখার কী আছে৷ ওই৷ গোলাপ জবা কুমড়ো কিছু একটা হবে"।
"শাটাপ৷ পকেট মারছিস তার পাপ অল্পই৷ পলিটিক্সে তো নামিসনি৷ কিন্তু এই পিকিউলিয়ার ফুলকে তুই জবা বলছি? ধর্মে সইবে"?
ভরদুপুরে বাইশ বাই বি বাস থেকে সাত নম্বর পকেট কাটার সময় ধরা পড়েছিলাম৷ কতবার বললাম পাবলিককে, এন্তার চড়থাপ্পড় কষিয়ে ছেড়ে দিন৷ আমার থানা পর্যন্ত যাওয়ার সময় নেই৷ খেটে খাওয়া মানুষ, থানায় এসে রিল্যাক্স করলে চলবে কেন? আগের দিনের মানুষ অত নেকু ছিল না, কথায় কথায় পুলিশ পুলিশ করে হন্যে হত না৷ হাতের সুখ করে একটা অন-দি-স্পট ফয়সালা করে মিটিয়ে নিত। কিন্তু ইয়ং জেনারেশন অত্যন্ত লালুভুলু৷ সোজা পুলিশের কাছে নিয়ে এলে৷ তাও এক্কেবারে অমল দারোগার থানায়৷ কোনও মানে হয়? দু'রাত্তির জেলের লপসি খেতে আপত্তি নেই৷ কিন্তু এখন এ'ভদ্রলোকের খোশগল্প থেকে গা বাঁচাবো কী করে? এর আগেও দেখেছি, ডায়েরি লেখার নাম নেই৷ থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার আগ্রহ নেই৷ লকাপে পোরার ব্যাপার মহাআলিস্যি৷ শুধুই বাজে গল্প। আজ পড়েছে কী এক ফালতু ফুল নিয়ে৷
বাধ্য হয়ে একটু গলা উঁচু করে বললাম, " স্যার, একটু লাঠিপেটা করে ছেড়ে দিন না। সাতটা বাইশের লোকালটা হ্যাইভ্যালু মার্কেট৷ ও'টা ছাড়তে চাইছি না"।
"আরে হরেন৷ তোর সব কথাতেই খালি ছটফট৷ এ'জন্যেই স্রেফ মোটামুটি লেভেলের ভালো পকেটমার হয়েই রয়ে গেলি৷ লেজেন্ডারি পিকপকেট আর হতে পারলি না৷ ফুলটা শুঁকে দ্যাখ। আমি তোর শত্তুর নই"।
বাধ্য হয়ে সেই অচেনা ফুলটার কাছে নাক নিয়ে গেলাম।
কী আশ্চর্য! ডাল-ভাতের গন্ধ এলো নাকে৷ ঠিক যেন কেউ পেঁয়াজ দেওয়া মুসুরডাল দিয়ে বাঁশকাঠি চালের ভাত মেখেছে, সামান্য লেবুও কচলে নিয়েছে। আর এস সঙ্গে মিশে যাছে ডিমসেদ্ধর গন্ধ। কোনও ভুল নেই, এ কম্বিনেশন আমার সুপরিচিত।
" কী! কেমন বুঝছিস হরেন"?
"কী অদ্ভুত দারোগাবাবু! ঠিক যেন, ঠিক যেন..."।
"ডাল, ভাত, ডিমসেদ্ধ৷ তাই তো"?
"নির্ঘাৎ। এ ফুল আপনি কোথায় পেলেন? আর সবাইকে আড়াল করে আমার মত চোরছ্যাঁচড়কে দেখাচ্ছেন কেন"?
" কারণ হরেন৷ ইউ আর আ গুড বয়৷ আগডুমবাগডুম কথাকে চট করে উড়িয়ে দিসনা৷ আর তদুপরি তুই হাড়বজ্জাত পকেটমার৷ লোকে তোর কথায় পাত্তা দেবেনা৷ তাই নিশ্চিন্তে বলা যায়৷ দু'দিন আগে বৌকে বলতে গেছিলাম এ'কথা৷ আমার ফোরটুয়েন্টি বলে এমন খেইমেই করে উঠল যে চেপে গেলাম৷ অডাসিটি ভাব, দারোগাকে ফোরটুয়েন্টি বলছে"।
আমি একটু নরম হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "এই ডালভাত ফুলের কথা বৌদিকে বলে খামোখা ঝামেলা বাড়ালেন৷ যাকগে৷ আপনি নিজের লোক৷ তাই বলেই দিই৷ এদ্দিন পকেটমারি করছি৷ মানিব্যাগের গন্ধ ছাড়া মনে তেমন কিছুই দাগ কাটে না৷ কিন্তু এমন বিটকেল কেস আগে শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না"।
" বিটকেল৷ মিস্টিরিয়াস। গতকাল ছিল আচার তেলে মুড়ি মাখার সুবাস৷ পরশু ছিল ঘি দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ আর পাঁপড়ভাজা৷ এ'দিকে ডাক্তারের তড়পানিতে আমার কপালে স্টু আর স্যালাড ছাড়া কিচ্ছুটি বরাদ্দ নেই৷ এ'সব গন্ধে যে আমার প্রাণপাত হওয়ার অবস্থা৷ আমার যে বড় লোভ হরেন৷ এ ফুল ব্যাটাচ্ছেলে আমায় এমন ক্রিমিনালের মত তাড়া করেছে কেন কে জানে"।
"কী কাণ্ড। তা এই মারাত্মক ফুল আপনি পাচ্ছেন কোথা থেকে"?
"সে'টাই তো সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস রে৷ আমি এ ফুল পাই না৷ এ ফুল আমায় পায়৷ আমার ইউনিফর্মের বুকপকেটে রোজ একটা করে ফুল উদয় হয় বুঝলি। ওই দুপুরনাগাদ। এই ফুলটা যেমন৷ রোজ একই ফুল। একই রঙ, একই সাইজ। শুধু গন্ধটা রোজই আলাদা। কিন্তু রোজই মনোরম। আর রাত হলেই শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে ধুলো হয়ে যাচ্ছে"।
" তা দারোগাবাবু, এই ভূতুড়ে ফুলটুল শোঁকালেন। গপ্পগুজব করলেন৷ এ'বারে এক কাপ চা খাওয়ান দেখি৷ গলাটা শুকিয়ে কাঠ"।
"খাওয়াব৷ কিন্তু খবরদার বাইরে গিয়ে কাউকে বলবি না যে অমল দারোগা তোকে ডেকে আদর করে চা বিস্কুট খাইয়েছে৷ আমার একটা রেপুটেশন আছে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী দারোগা বলে৷ পকেটমার এসে আমার সামনে খেজুর করে যাবে, সেই গপ্প ছড়ালে চলবে না"।
হেসে হাত কচলে বললাম, "চায়ের সঙ্গে আবার বিস্কুট কেন৷ চট করে একটা মামলেট ভেজে আনতে বলুন না৷ ফস করে খেয়ে আবার কাজে বেরোই"।
" সে বলে দিচ্ছি৷ কিন্তু তুই আমার প্রবলেমটাকে সিরিয়াসলি নিলি না হরেন"৷ দারোগাবাবু নরম সুরে অভিযোগ জানিয়ে ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজিয়ে নিজের আর্দালিকে ডাকলেন।
**
- আজ কী এঁকেছিস বুবলু?
- ফুল৷
- আবার ফুল?
- আবার। এই দ্যাখো বাবা।
- রোজ এই একই ফুল এঁকে কী আনন্দ পাস বল দেখি৷
- আমার ভালো লাগে৷
- এই ফুলটার নাম দিয়েছিস একটা?
- খাবার ফুল।
- সে কী৷ এমন বিটকেল নাম কেন?
- রোজ মা খাইয়ে দেওয়ার সময় আঁকি৷ তাই৷
- বড় অদ্ভুত অভ্যাস করেছিস৷ তা আজ কী খেলি দুপুরে?
- ডাল৷ ভাত৷ আর ডিমসেদ্ধ।