Monday, March 7, 2022

মনু আর মাস্টারজ্যেঠুর ফন্দি



- এই যে৷ মাস্টারজ্যেঠু৷ চট করে মুড়ি মেখে আনো দেখি৷ আমি হাত-পা ধুয়ে আসি৷ তারপর জমিয়ে গপ্প করা যাবে৷ 

- আরে৷ বলা নেই কওয়া নেই বাড়ি এসে হুজ্জুতি করলেই হল নাকি মনু। তোর এ'সব অন্যায় আবদার আর চলবে না।  আমি নিরিবিলি পছন্দ করি৷ বুড়োমানুষ, সন্ধেবেলার এই সময়টা একটু বই পড়ে গান শুনে কাটাই৷ এই তুই মাঝেমধ্যেই দুমদাম করে উড়ে এসে জুড়ে বসবি, সে'টা কিছুতেই বরদাস্ত করা যায়না। 

- আরে চটছ কেন৷ আচ্ছা আমিই না হয় মেখে নেব৷ বলি আমের আচারটা আছে কি মাস্টারজ্যেঠু? একটু তেল দিয়ে কষে মাখতে পারলে...।

- আচার নেই৷ মুড়ি নেই৷ চানাচুর নেই৷ কিস্যু নেই। বেরো দেখি তুই।

- তা'হলে আর কী৷ অগত্যা, আপাতত  চা বিস্কুট৷ রাতে ভাতেভাত৷

- আজ রাতে আমার উপোস৷

- তা'হলে একার জন্যই বসিয়ে নেব। ও তোমায় ভাবতে হবেনা জ্যেঠু। 

- আচ্ছা জ্বালাতন। এমন গায়ে পড়ে কী পাস মনু?

- তোমার এই লোনলিনেস আমায় ভাবায় মাস্টার জ্যাঠা৷ ছেলেবেলায় তোমার কাছে এলসিএম জিসিএম শিখেছি৷ এই নিরেট মাথায় ঠেলেঠুলে বিভিন্ন কনসেপ্ট ঢুকিয়েছ। সামান্য গ্র‍্যাটিচিউড না থাকলে চলবে কেন? তাই, চলে আসি। 

- আদ্দামড়ার গদগদে গপ্প শুনলে গা জ্বলে যায়৷ যাক গে। গিজার চালিয়ে দিচ্ছি৷ দশ মিনিট পর বাথরুমে ঢোক৷ মুড়িফুড়ি নেই। রেডিমেড চালভাজার প্যাকেট আছে, দ্যাখ ওই রান্নাঘরের তাকে রাখা আছে৷ আর সেদ্ধভাতফাত আমি খেতে পারবনা৷ লুচি ভেজে নেওয়া যাবে৷আলু তুই ভাজবি মনু। বলে রাখলাম। 

- জো হুকুম। তা, মাস্টারজ্যাঠা। আজ কেন এলাম, সে'টা নিশ্চয়ই তোমার বুঝতে বাকি নেই৷ 

- কাগজে বেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে? 

- দৈনিক যুগের হাওয়া, তিন নম্বর পাতায় জ্বলজ্বল করছে৷ উত্তরপাড়ার হালুয়া ব্যবসায়ী মনু সামন্ত ফের কিডন্যাপড৷ 

- র‍্যানসমের কথা কিছু লেখা নেই?

- সে খবর জেনারেট করতেই তো তোমার কাছে আসা।

- ফের হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করতে হবে?

- ফের। তবে বুড়ি বেশ গালিবল, বুঝলে৷  নয়ত এত কাঁচা প্লট সহজেই ঘেটে ঘ ত। আর হ্যাঁ, মাসি হাড় কিপটে হতে পারে, কিন্তু ভাইপোকে সে সত্যিই ভালোবাসে। 

- এ'বার কত চাইতে হবে?

- সত্তর হাজার দরকার৷ তুমি ওই আশিই চেয়ে নাও৷ একটু ডিসপোজেবল ক্যাশ হাতে থাকা ভালো।

- আজ থাক৷ কাল শনিবার, কালই বরং তোর মাসির সঙ্গে কনট্যাক্ট করব৷

- মাস্টারজ্যাঠা, পাঁচ হাজার কিন্তু এ'বার তোমায় রাখতেই হবে৷ লুচির ফিজ৷

- পিঠের চামড়া তুলে নেব রাস্কেল৷ সাধনার জন্য টাকা নেব?

**

- এসেছ লালি? শুনতে পারছ কি?

- হুঁ।

- আজ আসতে বড় দেরী হল তোমার৷

- কী করি বলো মাস্টারদাদা৷ বাতাসে এত ধুলোবালি, স্ট্রিটলাইটের আলো৷ আজকাল সে'সব ভেদ করে সাড়া দিতে কষ্ট হয়৷ তা, মনু এসেছে নাকি গো?

- এসেছে৷ ব্যাটাকে ভরপেট লুচি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছি৷ সে খেতেও পারে বটে, দেড় ডজন লুচি হেলায় উড়য়ে দিল।

- বালাইষাট মাস্টারদাদা৷ ওর খাওয়ার দিকে অন্তত তুমি নজর দিওনা। বছর পঁচিশের জোয়ান ছোকরা৷ এ বয়সে ওর ইট-লোহা হজম করে ফেলা উচিৎ। 

- কী যে ভালো লাগে মনুর ঘুমিয়ে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে৷ চোখে জল আসে জানো লালি৷ তাই ভাবলাম, তোমায় এখনই ডাকি৷ আচ্ছা লালি, মনু তোমায় বেশি গালিবল ভাবে, জানো৷ তবে ওর ভালোবাসায় কমতি নেই। 

- ভাবুক গিয়ে। তা বলে আমার প্রাণেধরা মাণিকটাকে তো টাকার অভাবে শুকোতে দিতে পারিনা৷ আর একসঙ্গে সবটাকাও ওর হাতে তুলে দিতে ভয় লাগে৷ যা ভুলোমন, সব টাকা ভাসিয়ে দিয়ে পথে বসবে৷ তাই ও' দরকার মত আছিলা সাজিয়ে নিক, আমিও যতটুকু দরকার ততটুকুই আমার গোপন কুঠুরি থেকে বের করে এনে দেব। যদ্দিন পারি৷ আর টাকা ফুরোলে আমিও ফুরোব।

- এই শুধু তোমার জন্য এই অঙ্কের মাস্টারকে তান্ত্রিক সাজতে হয় লালি৷ মহাযন্ত্রণা৷ মনু ভাবে আমি ইচ্ছেমত ভূত নামাতে পারি৷ এ'দিকে তুমি ছাড়া কোনও ভূত আমায় পাত্তা দেয় না৷ হেহ্। 

- মাস্টারদাদা, বলেই দাও না ওকে৷ যে তুমিই ওর বাপ৷ স্রেফ ভাগ্যের ফেরে ও আজ তোমার সঙ্গে নেই৷ 

- সময় থাকতে ওর কদর করিনি।  তোমার হাতে তুলে দিয়ে সরে পড়েছিলাম৷ লাইক আ ডিসগাস্টিং কাওয়ার্ড৷ আজ কোন অধিকারে ওর মনের ভিতরটায় গোলমাল পাকাবো আমি লালি? তবে ইয়ে, তুমিই বা কদ্দিন এমন যক্ষের মত ওই অতগুলো ক্যাশটাকা আগলে বসে থাকবে।

- মনু যদ্দিন এমনই আলাভোলা আছে, ওর ব্যবসা তো দাঁড়াবে না। কাজেই অল্প অল্প করেই টাকাটা দিয়ে ওকে টিকিয়ে রাখতে হবে৷ যদ্দিন পারি আর কী, আমি আর তুমি মিলে৷ ও কিডন্যাপ হওয়ার নাটক করে মাসির ভূতকে ঠকিয়ে টাকা বাগানোর চেষ্টা করবে৷ আর তুমি প্ল্যানচেটে আমায় হুকুম করবে, লাও পয়সা। যদ্দিন তদ্দিন৷ তবে ওকে নিয়ে হতাশ হতে মন চায়না৷ একদিন ও ঠিক দাঁড়াবে দশজনের মধ্যে একজন হয়ে, চারদিক আলো করে। 

- তুমি আমায় ক্ষমা করতে পেরেছ লালি?

- তুমি আমার একাবোকা মনুকে মাঝেমধ্যে ডেকে মুড়িমাখা খাওয়াও৷ লুচি ভেজে দাও৷ ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলো৷ তোমার যে সাতখুন মাফ গো মাস্টারদাদা।

বোমা



- বড়দা!

- কী ব্যাপার সুমন, এত নার্ভাস কেন?

- ইয়ে, এই যে। পার্সেল।

- বলিস কী! এই মাত্র এলো?

- এই মাত্তর।

- দাঁড়া৷ নার্ভাস হোস না৷

- নার্ভাস হব না? এ পার্সেল যে অনিলদারই পাঠানো তা নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই৷

- তা অবশ্য নেই..। কিন্ত..।

- কিন্তু আবার কী..। গতকালই হুমকি দিয়েছিল না..আমাদের উড়িয়ে দেবে? আজকেই উড়ো পার্সেল৷ আর ইয়ে, বাক্সের গায়ে কান লাগিয়ে দেখো৷ খুব সূক্ষ্ম একটা শব্দ আছে৷

- দেখি..।

- শুনলে?

- টিক টিক টিক৷ সাংঘাতিক৷ 

- ফাটল বলে।

- তুই শালা এ'টা নিয়ে ঘরে ঢুকলি কেন?

- কী করবটা কী! ছুঁড়ে ফেলবটাই বা কোথায়?

- পুলিশ ডাকব? বম্ব স্কোয়্যাড?

- আমরা অনিলদার রাইভাল গ্যাং৷ নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি পাবলিক নই৷ পুলিশ এ আড্ডায় এলে আরও বড় ক্ষতি৷ এ'খানে যা মালপত্তর, মিনিমাম বত্রিশবার ফাঁসি হবে।

- অনিলের বোমায় উড়ে যাওয়ার চেয়ে পুলিশের ফাঁস ভালো৷ 

- বড়দা৷ পার্সেল নিয়ে আসা মেসেঞ্জারটিকে পাকড়াও করতে পেরেছি৷

- মেসেঞ্জার?

- দরজার সামনে বোমা পার্সেলটা রেখে দিয়ে কেটে পড়ার তাল করছিল৷ ক্যাঁক করে ধরেছি৷

- বলিস কী৷ 

- বোমা রাখতে কে এসেছিল জানো? ওই বোবা হুলো।

- বোবা হুলো? ও তো আমাদের স্পাই ছিল৷ মাসে মাসে মাইনে দিতাম যে অনিলদার গ্যাংয়ের খবর আমাদের চালান করার জন্য৷ 

- দু'দিকেরই খাচ্ছিল রাস্কেলটা৷ কিন্তু আমাদেরই বিট্রে করল৷ অনিলদার বোমা নিজে বয়ে আনল৷ 

- শোন সুমন৷ এক কাজ করি৷ এ পার্সেল এখানে রেখে, বোবাহুলোকে বগলদাবা করে আমরা কেটে পড়ি বরং৷ 

- বাহ্৷ এ পার্সেলের বোমা ফেটে তারপর সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাবে তো৷ অন্তত দু'শো কোটির মাল এ আড্ডায় রয়েছে বড়দা৷ 

- আরে আপনি বাঁচলে বাপের নাম৷ আর তাছাড়া,  এত টাকার মাল অনিলদার দলের হাতে অন্তত পড়বে না৷ সে'টা একটা বাঁচোয়া।  

- ওই হুলোটাকেও ফেলে যাই না৷ বোমায় সে ব্যাটাও উড়ে যাক৷

- না। ওকে দরকার৷ পরে অনিলদার সঙ্গে বোঝাপড়ায় সুবিধে হবে৷ আর সময় নষ্ট নয়৷ বাক্সটা এখানেই থাক৷ আমি গাড়ি বের করছি৷ তুই ওই হুলো ব্যাটাকে বস্তায় পুরে নিয়ে আয়৷ জলদি সুমন, বাক্সের টিকটিক আওয়াজটা বেড়েছে মনে হয়৷

***

- অনিলদা৷ গোটা বাড়ি তন্নতন্ন করে দেখেছি৷ কেউ নেই৷

- মালপত্র? 

- সবই আছে৷ দেড়শো কোটির মাল, কম সে কম৷ বেশিও হতে পারে৷ 

- সব ভালো করে দেখে নিয়েছিস তো অপু?

- হ্যাঁ। সুমন আর বড়দা কেটে পড়েছে নির্ঘাৎ৷ তবে ইয়ে অনিলদা, হুলোকেও বোধ হয় নিয়ে গেছে উঠিয়ে৷ হুলোকে কোথাও দেখছি না৷

- গুড।

- গুড? হুলো আমাদের ভালো হ্যান্ড ছিল৷ 

- ইনএফিশিয়েন্সি বরদাস্ত করা যায় রে অপু৷ চোরাগোপ্তা বাটপারি নয়৷ হুলো মানুষটা বেশ গোলমেলে৷

- বম্ব পার্সেলটা ভিতরের ঘরে থেকে নিয়ে এসেছি৷ এই যে। ডিঅ্যাক্টিভেট করে ফেলি?

- বম্ব পার্সেল? 

- বোবাহুলোকে দিয়ে যে'টা পাঠালে অনিলদা। ডিটোনেটরটা কোথায় বলো। সে'টাও দরকার।

- ও বাক্সে বোমা নেই অপু৷ নিশ্চিন্তে খুলে দেখ৷

- সে কী! বোমা নেই এ'তে?

- খুলে দেখ না৷ 

- বেশ...এ কী৷ এ তো তোমার সেই আদ্দিকালের দম দেওয়া অ্যালার্ম ঘড়ি৷ 

- আমার বড় প্রিয়৷ ফিরে পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। 

- ওহ, তুমি বোমা পাঠাওনি? আমি ভাবলাম..।

- বড়দা আর সুমনের গ্যাং আজকাল বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল৷ ওদের না সরালে চলছিল না৷ আমাদের লাইনেও তো মার্কেট শেয়ার বলে একটা ব্যাপার আছে নাকি৷ 

- কিছুই বুঝছি না অনিলদা।

- বোমা পাঠিয়েছি৷ ডিটোনেটও করেছি৷ বড়দা আর সুমন দু'জনেই এতক্ষণে শতটুকরো হয়ে মাটিতে মিশে গেছে৷ নির্ঘাৎ৷ বাক্সে বোমা রাখিনি, নয়ত এত টাকার চোরাইমাল হাতে না এসে উড়ে যেত৷ বোবাহুলোকে দিয়ে আমি পার্সেল বোমা পাঠাইনি রে৷ পার্সেল দিয়ে বোবাহুলো-বোমা পাঠাতে হল, ফর বেস্ট রেজাল্টস যাকে বলে। যাকগে, ঘড়িটা আমার অফিসে পৌঁছে দিস, কেমন?

আমার নরম মন

১।

দেখুন মশাই। আমি বড় জোর বারচারেক 'ধুর্বা* বলেছি৷ কয়েকবার 'ঢ্যা*না' বলেছি৷ খানকয়েক বোকা**'ও যে বলিনি তা নয়। তবে, খিস্তি দিইনি৷ বাজে কথায় কান দেবেন না! শুনে রাখুন; খিস্তি আমি দিইনি৷ দিতেই পারিনা।

২।

আরে! সে মিথ্যেবাদী রাস্কেলের কী দুঃসাহস!  বলে কিনা আমি নাকি পোস্টকার্ডে খিস্তি লিখে পাঠিয়েছি! ডাহা মিথ্যে মশাই৷ ডাহা মিথ্যে! এক্কেবারে আড়াই কিলো সাইজের গুল৷ আমার সাদা মনে কাদা নেই মাইরি, স্রেফ দু'তিনটে ইনল্যান্ড লেটার পাঠিয়েছিলাম কিছু গালাগাল লিখে৷ সেই তিলকে তাল করা? এত বিষ মনে?

৩।

আরে, শুনুন৷ শুনুন। আমি মানুষটা একটু মাইডিয়ার গোছের, বুঝলেন। তা একদিন আমি 'এসো বাবুসোনা' বলে কোলাকুলি করতে গেলাম! ও মা! ব্যাটার কী মাতব্বরি ভাবুন; কোলাকুলি রিফিউজ করে সে কিনা আমায় হাইফাইভ অফার করলে? কী মারাত্মক ইনসাল্ট! কী ইনসেনসিটিভ জুতোপেটা! আমি ওর নামে মামলা করব! ওর ভিটেয় ঘুঘু চরাব! এই বলে রাখলাম! দ্যাখ শালা কত ধানে কত চাল!

নিখুঁত




- কাজ হয়ে গেছে অনিলদা৷ 

- বডি?

- সাফ৷

- সাফ হলেই ভালো। দু'দিন পর কাগজে কোনও ময়লা খবরটবর যেন না দেখি।

- একটা কেসে সামান্য ভুলচুক হয়ে গেছিল..তা'নিয়ে বারবার খোঁটা দেবে?

- সামান্য ভুল৷ সামান্য ভুলের কনসিকুয়েন্স বোঝার বয়স তো তোর হয়েছে অর্ণব৷ 

- আসলে কী জানো অনিলদা, সে'বার হল কী..।

- পার্ফেকশনে বিশ্বাস না থাকলে এ লাইনে এত বছর টিকে থাকতে পারতাম না। আর তুই হাজারটা কাজ নিখুঁতভাবে করলেও,  এই একটা ভুলের জন্যই তোর হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্ট্রাইক রেট আর রইলনা। ইট উইল নেভার বি আ কম্পলিট হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

- অত অবিশ্বাস থাকলে, আমায় দলে রেখেছ কেন অনিলদা?

- বিশ্বাস করলে তোকে ছেড়ে দেওয়াটা সহজ হত অর্ণব।

- তোমার কথাবার্তা সবসময় বোঝাও যায় না..।

- টাকাটা রাখ। আর কাল রাতের দিকে উইনস্টন ক্লাবে আসিস৷ 

- ক্লাবে?

- বাইরে অপেক্ষা করিস৷ একটা গাড়ি তোকে পিক করে নেবে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ৷ আধঘণ্টা আগে ডিটেলস পেয়ে যাবি৷

- রিভলভার সঙ্গে রাখব?

- তোকে ইন্স্যুরেন্স তো বেচতে ডাকছি না৷ ও'টা ছাড়া আসবিই বা কেন। 

- টার্গেট?

- সুকুমার হালদার। ক্লাব থেকে বেরোবে ডিনার সেরে। ওর ড্রাইভারকে হাত করা আছে৷ মিনিটে তিনেকের একটা উইন্ডো পাবি৷ 

- সুকুমার..সুকুমার হালদার..। পুলিশের বড়কর্তা সুকুমার হালদার? 

- হুম৷

- ওর সঙ্গে খান দুই কনস্টেবল তো থাকবেই..।

- মিনিট তিনেকের উইন্ডো পাবি৷ বললাম তো। সে দায়িত্ব আমার।

- একটু বেশি রিস্ক হয়ে যাচ্ছে না অনিলদা?

- ভুলচুক করছিস৷ নার্ভাস হচ্ছিস৷ আজকাল নতুন টিউশনির ব্যাচ ধরেছিস নাকি?

- শোনো অনিলদা..। হালদার তো আর ওই আগরওয়াল বা দত্তর মত এলেবেলে টার্গেট নয়৷ 

- তোর ফিজ তিনগুণ৷ 

- যদি কাজটা না নিই?

- টিউশনিগুলোও আর করা হবে না তোর৷ তুই মাস্টার নোস অর্ণব।

- তুমি হুমকি দিচ্ছ অনিলদা?

- অর্ণব৷ হুমকি আদানপ্রদান হয় সমানে-সমানে৷ বিটউইন ইকুয়ালস৷ আমি তোর সঙ্গে ট্র‍্যান্সপ্যারেন্টলি ইনফর্মেশন শেয়ার করছি৷ তুই কাজটা করবি? 

- গাড়ি পাঠিও৷ কাল উইনস্টন ক্লাবে পৌঁছে যাব। 

- চিয়ার আপ অর্ণব৷ কাল কড়কড়ে টাকাগুলো পকেটে ঢুকলে দেখবি নার্ভাসনেস ফুসমন্তর। আর হ্যাঁ, পুরো টাকাটাই আগাম দেব৷ ওই গাড়িতেই রাখা থাকবে, পিছনের সীটে, একটা চামড়ার পাউচে৷ 

**

- হ্যালো, অনিলদা? 

- বলো।

- কাজ হয়ে গেছে৷ 

- গুড৷ ভেরি গুড৷

- টাকাটা?

- একটা চামড়ার পাউচ দেখতে পারছ? টার্গেট যে গাড়িতে, সে'টার ব্যাকসীটেই থাকা উচিৎ৷

- উম..দেখি..এই যে..আছে৷ 

- খুলে দেখো।

- আরে, এ তো অনেক বেশি..।

- পাক্কা তিনগুণ। পকেটস্থ করে ফেলো৷ 

- কিন্তু এই সামান্য কাজের জন্য এতগুলো টাকা..।

- তুমি এদ্দিন আমার হয়ে কাজ করছ সুকুমার৷ অজস্র কাজ সেরেছ; লাশ সরিয়ে দেওয়ায় কোনওদিনও গোলমাল হয়নি৷ অথচ ওই টিউশনি মাস্টার কী হ্যাপাটাই না দিলে সে'বার৷ তোমারই হেল্প নিতে হল স্ক্যান্ডালটা ধামাচাপা দিতে৷ ব্যাপারটা ঠিক অভিপ্রেত নয়৷

- ওহ, এও আমাদের দলেই ছিল?

- কী জানো মিস্টার সুকুমার হালদার, পার্ফেকশন ছাড়া আমার ব্যবসা অচল৷ কাজেই পেস্টকন্ট্রোল না করলে চলছিল না৷ আর তোমার ফিজের ওপর বাড়তি টাকাটা ধরে নাও বোনাস, ফর মেন্টেনিং আ হান্ড্রেড পার্সেন্ট রেকর্ড৷ তাছাড়া অত জমজমাট এলাকায় তিন মিনিটের মধ্যে গোটা ব্যাপারটা সেরে ফেলা সহজ নয়৷ যাকগে, তোমার হাতের কাজ ভালো; বডিটার খবর কাগজে পড়তে হবে না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত৷

Wednesday, March 2, 2022

লেবুজল



- আচ্ছা অভ্র, আপনি কবিতা পড়েন?

- ক..কবিতা? পোয়েট্রি?

- ভূতের নাম শুনলেন? নাকি ভল্ডেমর্ট?

- ভূত বা ভল্ডেমর্ট শুনলে ঠিক গলা শুকিয়ে যায়না, হাতের তালু ঘামতে শুরু করেনা, হাড়-কাঁপানো পরীক্ষার হলের গন্ধ নাকে আসে না, সামান্য লেবুজলের জন্য মন আঁকুপাঁকু করে না, জুনের দুপুরে কলকাতায় বসে গায়ে শাল জড়াতে ইচ্ছে করে না৷ কিন্তু কবিতা পড়লে হয়। বুঝতেই পারছেন, আদা-কাঁচকলা ইকুয়েশনে রয়েছে আমার মাথা আর কবিতা৷ 

- চীনেবাদামের ভাঙা খোসার সঙ্গে আপনার তুলনা চলতে পারে৷

- কী জানেন রুবি, কবিতার লাইনগুলো কেমন কপালে গোঁত্তা খেয়ে ছিটকে যায়। গদ্যফদ্য দিব্যি সুটসাট ব্রেনে ঢুকে জাঁকিয়ে বসে পড়ে৷ কিন্তু পদ্য হলেই মগজের ইলেক্ট্রিক ফেন্সে শক খেয়ে এলোমেলো হয়ে যায়।

- একটা গোটা জীবন কবিতা অ্যাপ্রিশিয়েট না করে কাটিয়ে দেবেন?

- রুবি, আমি কিন্তু চেষ্টা করেছি অনেক৷ বিশ্বাস করুন৷ গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে প্রচুর বইও কিনেছি একসময়৷ সে'গুলোকে সে'গুলোকে কোস্টার হিসেবে ব্যবহার করি৷ 

- আপনি ক্রিমিনাল অভ্র। 

- কবিতার বইকে ডিসরেস্পেক্ট করেছি বলে? 

- না৷ নিজের কবিতা বোঝার ক্ষমতাটাকে অগ্রাহ্য করছেন বলে।

- যাহ শালা৷ ওহ, সরি৷ আই মীন...।

- নিজেকেই বরং কড়াভাবে শালা বলে একটা মজবুত গাঁট্টা মারুন অভ্র। 

- আমি শালা কবিতা বুঝি?

- কবিতা পড়ে আপনার গলা শুকোয়, হাতের তালু ঘামে, ছেলেবেলার পরীক্ষার হলের সুবাস নাকে আসে, বুকভরা হাঁসফাঁস টের পান লেবুজলের জন্য, জুন মাসের গরম উড়িয়ে দিয়ে গা-কাঁপুনি টের পান৷ এ সমস্তই কবিতা অ্যাবজর্ব করে  ফেলতে পারার সিম্পটম৷ ওই ইলেক্ট্রিক ফেন্স আপনার মনের ভাঁওতা৷ আপনি এস্কেপিস্ট অভ্র৷ 

- এই যে, আপনার কফি শেষ হয়েছে? তা'হলে এ'বার ওঠা যাক৷

- আপনি এস্কেপিস্ট?  অভ্র?

***

রুবির ট্যাক্সিটা চোখের আড়াল হওয়ার পরেও খানিকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অভ্র৷ অটোওলা ধমক না দিলে হয়ত আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত৷ এই রুবি মেয়েটা ভারী অদ্ভুত৷ গত বছর দেড়েকে অন্তত আড়াইশো কাপ কফি খাওয়া হয়ে গেছে একসঙ্গে। অথচ এদ্দিনেও সম্পর্কটাকে 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে টেনে তোলা গেলনা। 

রুবি যে ঠিক কী চায়, সেটা বুঝে ওঠার আশাই ছেড়ে দিয়েছে অভ্র৷ শুধু কেমন একটা বিচ্ছিরি মায়া, আর খানিকটা স্নেহ৷ তাছাড়া ওই যে, রেস্টুরেন্টের টেবিলের ওপর রাখা নুনের ডিবেটা টেনে নিতে গিয়ে নিজের আঙুলের ডগায় রুবির আঙুলের স্পর্শ৷ ব্যাপারটা ঈষৎ গোলমেলে। রুবির ট্যাক্সি এতক্ষণে নির্ঘাৎ দেড়দুই কিলোমিটার দূরে, তবু আঙুলের ডগার ছ্যাঁতটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না৷ 

"যাহ্ শালা", অস্ফুটে বলে উঠল অভ্র৷ পকেট থেকে রুমাল বের করতে হল হাতের ঘাম মুছতে৷ অথচ এই চিটচিটে গরমের মধ্যেও যেন একটা কনকন গায়ে এসে ঠেকছে৷ কী আশ্চর্য!  নাহ্, বেশ বিরক্তই বোধ করছিল সে৷ দু'কাপ কফি খেয়েছে আধঘণ্টা আগেই, তবুও যেন গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে৷ সামনের ফুটপাথে একটা লেবু জলের দোকান দেখতে পেয়ে সামান্য স্বস্তি পেল অভ্র৷ এ'বার মিনিমাম দু'গেলাস ঢকঢক করে না খেলেই নয়৷