Tuesday, February 8, 2022

বাতেলা রকেট



দড়াম করে মিথ্যে বলে দিলেই তো হল না৷

"হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা" কেত চাই৷ 
কথায় কথায় "আর একটু হলেই এস্পারওস্পার করে দিচ্ছিলাম" গোছের ঘ্যাম চাই৷ 
ভরদুপুরে 'এমন চাঁদের আলো, মরি যদি সেও ভালো' গাইবার ধক থাকা চাই৷ 

আর চাই একদল মানুষ, যারা কথায় কথায় বলবে "ওয়াহ তাজ"! 

গুলশ্রেষ্ঠ বলবেন, "এভারেস্টের মাথায় উঠেছিলাম ভিজে গামছা মেলতে"। অমনি জি-হুজুরের দল চিল্লিয়ে উঠবে, " উফ, কী দিয়েছেন৷ আপনার কাছে কী এভারেস্ট আর কীই বা বেহালা"।

ক্যাপ্টেন বারফাট্টাই বলবেন, "খেলতে নেমে চাইলেই বারো গোলে জিততে পারতাম। কিন্তু গোল না দিয়ে তিনটে খেলাম কেন? ওই৷ তুলোর মত মন৷  আমি গোল দিলে যদি কেউ দুঃখ পায়? তাই...চেপে গেলাম। দয়ার শরীর হলে যা হয় আর কী"৷ অমনি 'এইত্তো চাই' জনতা ফ্যাঁচফ্যেঁচিয়ে উঠবে, "কী ভাবে পারেন এমন ভাবে কাঁদাতে৷ কী ভাবে পারেন বুকের মধ্যে রাখা একদলা মাখনে এমন অবলীলায় স্নেহের ছুরি চালাতে"। 

বাতেলা-রকেট বলবেন, " মানছি আজ আপনাদের পকেট কেটেছি৷ মানছি আজ আপনাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙেছি৷ মানছি আজ আপনাদের পাতে বেড়ে রাখা ভাত ছাইপোস্ত দিয়ে মেখেছি৷ তবে শুনে রাখুন, এর ফলে আজ থেকে বাইশ হাজার বছর পর আপনার যা উপকার হবে না..তা জাস্ট ভাবাই যায়না৷ সে এক ফ্যান্টাসটিক ইয়ে৷ এক্কেবারে হাইক্লাস ঘ্যাম যাকে বলে৷ আজ একটুস এ'দিক ও'দিক করে ফেলছি বটে, কিন্তু সে তো আপনাদেরই মঙ্গলের জন্য"৷ এ আশ্বাসবাণী শোনা মাত্র 'টীম বহুত খুব' গেয়ে উঠবে, "আমাদের প্রাণ, মান, ইজ্জত এবং ভোট; শুধুই আপনার৷ শুধুই আপনার"।

Monday, February 7, 2022

আহ্! মিউজিক!



কী বিদঘুটে স্বপ্ন রে বাপ! শীতের রাতের জবরদস্ত ঘুম গেল বিশ্রীভাবে চটকে৷ তবে ঘুম ভাঙলই যখন, তখন লিখেই রাখি। কী দেখলাম স্বপ্নে?

একটা সুপরিচিত পেল্লায় হলঘর৷ অবিকল যেন কফিহাউসের মত, এমন কি রবীন্দ্রনাথের ঢাউস ছবিটাও দিব্যি দেওয়াল আলো করে রয়েছে৷ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে'ছবিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নেই, পায়চারি করছেন। ফ্রেম থেকে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে যাচ্ছেন আবার ফেরত আসছেন৷ যাচ্ছেন, আসছেন, যাচ্ছেন, আসছেন৷ আর মাঝেমধ্যেই ফ্রেমের বাইরে কার দিকে যেন তাকিয়ে স্মিত হাসছেন। 

চেয়ারগুলো টেবিলগুলো সবই ফাঁকা, খিটখিটে ওয়েটারদাদাদেরও দেখা নেই৷ শুধু বিদঘুটে জোব্বা গায়ে চাপিয়ে এক দাড়িয়াল সাহেবসুবো মানুষ রবীন্দ্রনাথের ফ্রেমের সামনে দাঁড়িয়ে, টেনিস ম্যাচ দেখার মত রবীন্দ্রনাথের পায়চারি দেখে চলছেন তিনি। ভদ্রলোকের মুখে একটা মিঠে আনন্দের ছাপ, আর চোখে একটা মজাদার ঝিলিক৷ রবীন্দ্রনাথও মাঝেমধ্যে পায়চারি থামিয়ে তাঁর দিকে চেয়েই হাসছেন।

বেশ খানিকক্ষণ পায়চারির পর ফ্রেমের মধ্যেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বসলেন৷ ফ্রেমের বাইরে হলঘরে দাঁড়ানো সেই সাহেব দাড়িয়ালও এ'বার একটা কফিহাউসিও চেয়ার টেনে বসে মুখে লেবুলজেন্সের মত কিছু একটা দিলেন৷ 

রবীন্দ্রনাথই কথা বলে উঠলেন।

- গরীব বাঙালির কথা বাসি করে মনে ধরালে ভাই ডাম্বলডোর?

- গুরুদেব, আপনার কথা আমি পাত্তা দেব না? আমার ঘাড়ে অতগুলো মাথা নেই, পায়ে অতগুলো মোজাও নেই৷ তবে আমাদের কিনা আঠারো মাসে বছ্র, তাই সিলেবাস পাল্টাতে কিছুটা দেরী হয়ে গেল৷ যাক গে, এখন ব্যবস্থা পাকা৷ আর তাই খবরটা আপনাকে দিতে আসা৷ 

- তুমি নিশ্চিত তো?

- হ্যাঁ। হগওয়ার্টসের ছেলেমেয়েরা এ জাদু না শিখলে সমস্তই মাটি৷ 

- যাক৷ তোমার স্কুলের সিলেবাসে এদ্দিনে তা'হলে সঙ্গীত ঠাঁই পেল৷ স্টাডি অফ মিউজিক..বাহ্ বাহ্। 

- গুরুদেব৷ নামটা একটু নিজেদের মত সাজিয়ে নিয়েছি৷ স্টাডি অফ মিউজিক নয়৷ স্টাডি অফ ব্রাইট আর্টস৷ 

- কিন্তু, সে কি আর পারবে সে তোমার স্কুলের ছেলেমেয়েদের পড়াতে? দেরী করে ফেললে ভাই আলবাস৷ 

- কাথবার্ট দিব্যি পেরেছে মরার পরেও ক্লাস নিতে। আর ম্যাজিকের হিসেবে লতা তো অনেক এগিয়ে৷ ও নিয়ে ভাববেন না৷ মাগলরা তাকে যতই ভালোবাসুক, তার আসল কদর কিন্তু হগওয়ার্টসেই হবে।

- বেশ৷ মঙ্গল হোক৷ তুমি নিশ্চিত হলেই হল। 

- গুরুদেব,হগওয়ার্টস আজ একধাপ এগিয়ে গেল৷ 

- এগোবেই তো৷ কতবছর আগে, হগওয়ার্টসে বসে সুরে ঘায়েল হয়ে তুমিই তো  বলেছিলে ভাই, "Ah Music, A Magic Beyond All We Do Here"।

Sunday, February 6, 2022

বিপজ্জনক



রোজ অফিস থেকে ফেরার পথে শ্যামলের দোকানে দাঁড়িয়ে এককাপ চা আর দু'টো বিস্কুট খাই৷ অফিস না থাকলেও সন্ধ্যের এই সময়টা এ'দিকে ঢুঁ মেরে যাই৷ কোনও যে ইয়ারদোস্তদের আড্ডার টানে আসি তাও নয়। আমি একা মানুষ, বেশি গল্পগুজবে সবিশেষ স্বস্তিও পাই না৷
শ্যামলের চা আহামরি না হলেও সে'টার মধ্যের কড়া ব্যাপারটা আমার পছন্দ, আর ওই অস্পষ্ট একটা কয়লামাখানো সুবাসটাও বেশ৷ আমার মতই, শ্যামলও বেশি কথার মানুষ নয়৷ তবে আমি অলস, শ্যামল কর্মঠ; সারাক্ষণ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে৷ চায়ের সসপ্যান বসাচ্ছে, মামলেট ভাজছে, হিসেব লিখছে, খদ্দেরের খেজুর সামাল দিচ্ছে - নিঃশব্দে, হাসিমুখে। এক মুহূর্তের জন্যও সে জিরোচ্ছে না৷
চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমি শ্যামলের দোকানের উলটো দিকের পেল্লায় আধভাঙ্গা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকি৷ প্রতিদিন, বহুবছর ধরে এ' নিয়মে আমি অভ্যস্ত৷ ব্যাপারটা অনেকটা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকার মত৷ বাড়িটা গায়ে একটা মার্বেল ফলক আছে; সে'টাও খানিকটা ভাঙা৷ তা'তে লেখা "স্থাপিত ঃ ১৮৬-"। ফলকের খানিকটা খসে পড়ায় শেষ সংখ্যাটা বোঝা যায় না৷ তবে ওই, অন্তত দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো৷ ফলকের পাশেই একটা বোর্ড লাগানো, সে'টা কর্পোরেশজ থেকে টাঙিয়ে গেছেঃ "বিপজ্জনক বাড়ি! সাবধান! নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন"৷ সেই বোর্ডটার বয়সও অন্তত বছর কুড়ি তো হবেই, রঙ চটেছে, টিন গেছে তুবড়ে৷ কী একটা বিশ্রী মামলার পাকে পড়ে থাকায় ও বাড়ি ভেঙে ফেলার ব্যবস্থাও হয়নি৷
বছর চল্লিশ আগে দুই যুযুধান পরিবার এখানে বাস করত। দিনের বেলা আদালতে গিয়ে দুই পরিবারের বাবুরা বচসা চালাতেন নিজেদের উকিল লেলিয়ে দিয়ে। দুপুরে গৃহিণীরা ঝগড়া জমাতেন ছাতে৷ সন্ধ্যেবেলা বাড়ির উঠোনে দুই পরিবারের বখাটে ছেলেপিলেরা অশ্রাব্য ভাষায় সে ঝগড়া টেনে নিয়ে যেত, মাঝেমধ্যে ব্যপারটা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াত৷ আর মাঝেরাত্রে, উঠোনে মাদুর পেতে দুই পরিবারের মাথা, অশীতিপর দু'ই বৃদ্ধ একসঙ্গে বসে নেশাভাং করতেন আর দাবা খেলতেন৷
এ'সব অবশ্য সবই আমার শোনা গল্প৷ চাকরির সুবাদে আমি এ পাড়ায় এসেছি বছর দশেক হল৷ আমি বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন শব্দ শোনার চেষ্টা করি৷ কতরকমের কণ্ঠস্বর, কান্না, ঝগড়া, আদর, উৎসবের কলরোল৷ ব্যাপারটা অনেকটা সমুদ্রের ঢেউ গোনার মত আরামদায়ক৷ মাঝেমধ্যে মনে হয়, এই বিশাল বাড়িটা যেন পাড়ার কারুরই আর চোখে পড়েনা৷ খানিকটা আমারই মত। চায়ের দাম আদায় না করতে হলে কি শ্যামলও আমায় দেখতে পেত? রাস্তায় যাতায়াতের পথে কেউই বাড়িটার দিকে তাকিয়েও দেখেনা বোধ হয়৷ অমন পাহাড়প্রমাণ একটা উপস্থিতিকেও অগ্রাহ্য করা যায় তা'হলে৷
কিন্তু আমি কিন্তু দেখি বাড়িটাকে। রোজ৷ অবাক হয়ে৷ মনে হয়, ভাগ্যিস মামলাটা মিটমাট হয়নি৷ নয়তো কবেই ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে যেত৷ অবশ্য ফ্ল্যাটবাড়িকে গালমন্দ করার মানুষ আমি নই, আমার নিজের আস্তানাটুকুও একটি ঘুপচি ফ্ল্যাটই৷ কিন্তু এই বিপজ্জনক বাড়িটা গায়েব না হলেই ভালো৷
প্রথম দিকে, যখন আমি পাড়ায় নতুন এসেছিলাম, এই শ্যামলের দোকানেই মাঝেমধ্যে কেউ কেউ যেচে আলাপ জমাতে আসতেন৷ ওই গতানুগতিক সব প্রশ্ন, "পাড়ায় নতুন নাকি", "কোন বাড়িতে উঠেছেন", " কী করা হয়" বা "ম্যারেড তো"। আমি ঠিক সে'সব আগ্রহ সামাল দিতে পারতাম না।
ভাঙাচোরা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাঝেমধ্যেই মনে হয়, আমিও যদি গলায় অমনই একটা জমকালো বোর্ড টাঙিয়ে রাখতে পারতাম;
"বিপজ্জনক! সাবধান! নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন"।

দাওয়াই



অফিস ফেরত ক্লান্তি উড়িয়ে দেওয়ার ওষুধ - গলা ছেড়ে গান আর জোরদার স্নান। 

'কদ্দিন বাড়ি যাওয়া হয়না' মার্কা মনখারাপের দাওয়াই - সঞ্জীবের পাতা উলটে চোখ ছলছলে হে-হে আর দেবনাথে সেঁধিয়ে আইকস।

'কিস্যু ভালো লাগছে না' কাটানোর টোটকা - ইয়ারদোস্তকে পাঠানো 'কী রে শালা' টেক্সট আর মামলেট ভাজার তোড়জোড়।

সব গোলমাল হয়ে যাওয়ার ভয় সামাল দেওয়ার মন্ত্র - ইলিশ আসছে, তারপর পুজোর ছুটি, তারপর নলেন। 

হাতের হারিকেন ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা চেপে দেওয়ার ফর্মুলা - মায়ের কানের কাছে অদরকারী ঘ্যানঘ্যান, বাবার পিছনপিছন ভিজে বেড়াল মার্কা ঘুরঘুর।



Tuesday, February 1, 2022

দেবু দত্তর মানিব্যাগ



শ্রদ্ধানন্দ পার্কের কাছাকাছি পরেশের রুটি-ঘুগনির স্টলে মৌজ করে পেটাই পরোটা পেটাবার তাল করে দোকানের বেঞ্চিতে এসে বসেছিলাম৷ এমন সময় সিরিয়াল কিলার দেবু দত্ত পাশে এসে বসে দু'স্লাইস পাউরুটি, চারটে ডিমসেদ্ধ আর দেড় বাটি ঘুগনির অর্ডার দিলে। আমার চোয়াল গেল ঝুলে, আরিব্বাস। আজ কার মুখ দেখে বেরিয়েছিলাম! 

যে' দেবু দত্তকে লালবাজার ইন্টারপোল সবাই হন্যে হয়ে খুঁজছে, সে কিনা আমার পাশে বসে ঘুগনিতে পাউরুটি ডুবিয়ে খাবে? অবিশ্বাস্য যে। সোজাসুজি তাকানোর আদেখলামোটা আমার না-পসন্দ, কিন্তু উত্তেজনা সামাল দেওয়া দায়৷ দেবু দত্তকে চিনতে পারা মামুলি ব্যাপার নয়। এই যেমন আজ খয়েরি প্যান্ট আর গোলাপি চেক হাফশার্ট পরে বসে আছে, থুতনিতে কাটা দাগ, কাঁচাপাকা পেল্লায় গোঁফ, নাদুস-নুদুস চেহারা, মাথা আলো করা টাক, গালে অমায়িক হাসি; হয়ত পরিচয়  জিজ্ঞেস করলেই জানান দেবে যে সে নাকি বঙ্কুবিহারি বয়েজ হাইস্কুলের ভূগোল শিক্ষক হরেন মল্লিক। অথচ আগামীকালই হয়ত ভদ্রলোককে দেখা যাবে হাইকোর্ট চত্ত্বরে; তালপাতার সেপাইয়ের মত হাড়গিলে চেহারা। স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে ডাব বিক্রি করছেন; শশব্যস্ত উকিল আর উদ্ভ্রান্ত মক্কেলরা তার খদ্দের৷ 

কিন্তু আমি তো আর পুলিশ বা গোয়েন্দা নই, দেবু দত্তের ফাঁকিতে নিয়মিত পা দিয়ে আমার মাইনে জোটেনা৷ আমি কলকাতার সেরা পকেটমার। বিরানব্বুইয়ে বারুইপুরে দ্য গ্রেট ভোলা সান্যাল ট্রেনে কাটা যাওয়ার পর পকেটকাটার শিল্পে সেরা আমিই৷ এখন বয়স হয়েছে বটে, তা'বলে চোখের ধার কমেনি। দেবু দত্তের ডান কবজির কাছে আড়াই ইঞ্চির কাটা ঘাটা আমি বিলক্ষণ চিনি, ভেক ধরে এ'শর্মাকে টুপি পরানো সম্ভব নয়।

এসো চাঁদু দেবু, এ'বার শখ পূর্ণ করি। কোন শখ? বলি৷ জীবনে কম পকেট কাটিনি বুঝলেন৷ পলিটিকাল নেতা, ফিল্মস্টার, ক্রিকেটার...সেরা মানুষজনের পকেট চিরেছি ব্লেডের পালক বুলিয়ে।  বলাই বাহুল্য, কখনও ধরা পড়িনি। আর বহুদিন এ লাইনে হল, আখের গুছিয়ে নেওয়া গেছে দিব্যি৷ এখন আর টাকাপয়সার জন্য পকেট কাটিনা৷ স্রেফ শিল্পের জন্যই শিল্পী শুধু। তা এই গোটা শহরে আর মাত্র একজনই শিল্পী আছে যে শুধু শিল্পের জন্য নিজের জীবন উজাড় করে দিয়েছেন; ওই সিরিয়াল কিলার দেবু দত্ত। বেয়াল্লিশটা হাড়হিম করা মার্ডার অথচ সমস্ত ফেলু-ব্যোমকেশ মিলে তার তল পেলো না৷ আমি ঠিক করেছি যে দেবু দত্তের পকেট মেরেই আমি পকেটমারির ব্র‍্যাডম্যানত্ব স্পর্শ করব।  

আজ হাতের কাছেই দেবু দত্তকে পেয়ে মন চলকে উঠেছে৷ চুলোয় যাক পেটাই পরোটা, দেবু দত্তের পকেট আজ ফাঁক না করলেই নয়৷ 

***

দেবুর পকেটস্থ মানিব্যাগ ছোট্ট একটুকরো মেঘের মত তুলে নিয়ে পরেশের দোকান থেকে নিঃশব্দে সরে পড়লাম৷ হাঁফ ছেড়েছিলাম এক্কেবারে শেয়ালদার কাছে এসে। স্টেশনের কাছে একটু ছায়া খুঁজে দাঁড়িয়ে নিজের পকেট থেকে বের করলাম দেবু দত্তর সেই মানিব্যাগ৷ কালো চামড়ার অতি সাদামাটা মানিব্যাগ৷ টাকাপয়সার দরকার আমার নেই, তবু ডিসিপ্লিনের খাতিরে সে মানিব্যাগ ঘেঁটে দেখা দরকার৷ 

কী আশ্চর্য৷ মানিব্যাগের ভিতরে একটাও টাকা নেই। কোনও প্রসাদী ফুল, পাসপোর্ট সাইজ ফটো, পুরনো বাসের টিকিট, বা কোনও ডেবিট কার্ডও নেই৷ আছে শুধু একটা চিরকুট৷ আর সে চিরকুট পড়া শুরু করার পর চারপাশে দুনিয়াটা কেমন বিশ্রী ঘোলাটে আর অস্পষ্ট হয়ে পড়ল।

**

ভাই রবি,

ঘাট হয়েছে তোমায় খুন করে। দু'একপিস আমার হাতে খুন হওয়া আত্মা যে আমায় আওয়াজ দিয়ে চমকায়নি তা নয়। কিন্তু তোমার মত এমন ঠ্যাঁটা পিস আর একটিও দেখিনি৷ আরে বাবা, তোমায় খুন করেছি স্রেফ শিল্পের খাতিরে৷ সেলিব্রেটি খুন করে করে হেঁদিয়ে গেছিলাম।  তাঁরা স্রেফ তারকা, টাকা আর চটকের টানে শিল্পকে ত্যাগ করেছেন বহুদিন৷ বড় নিষ্প্রাণ তাঁর৷ মড়াদের কুপিয়ে কী হবে৷ অথচ গোটা শহরে মনের মত শিল্পী পাচ্ছিলাম না আমার সিরিয়াল লিস্টে জুড়ে দেওয়ার জন্য৷ 

অবশেষে খোঁজ পেলাম তোমার৷ মুগ্ধও হলাম তোমার শিল্পীসত্তার পরিচয় পেয়ে৷ আর কী আশ্চর্য,  তুমিও চাইছিলে আমার পকেট মেরে আর্টিস্টিক কেল্লা ফতে করতে৷ ব্যাস, শুরু হল  সিরিয়াল কিলার দেবু দত্ত বনাম পকেটমার রবি মাইতির লড়াই৷ বছরের পর বছর দু'জনে দু'জনকে খুঁজে কাটিয়ে দিলাম। 

কিন্তু ভায়া, যখন দেখা পেলাম; তখন কিন্তু তোমাকেই হার মানতে হয়েছিল। এক চাক্কুতে এস্পারওস্পার; রবি পকেটমার৷ ইয়ে, তুমিও বাঘের বাচ্চা বটে, চুপচাপ খতম করা যায়নি তোমায়৷  আমার ডান হাতের কবজির ওপরে ওই যে লম্বা কাটা দাগটা, ও'টা যে তোমার ব্লেডেরই দান ভাই৷ মরার আগে তোমার শেষ কামড়।

কিন্তু তারপর ভূত হয়ে আমার পিছুপিছু ঘুরে এমন হয়রান করবে, সে'টা তো আগে ভেবে দেখিনি ভাই৷ যে'খানেই যাই তুমি ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে যাও৷ মহাঝ্যামেলা৷ 

শোনো, এই আমি তোমায় আমার মানিব্যাগ তোলার সুযোগ দিলাম। আর এ চিঠি পড়ছ মানে এ'বার তো তোমার শেষ ইচ্ছেটা পূর্ণ হয়েছে৷ আর কেন ভাই৷ এ'বার এসো৷ 

ভালো থেকো।

ইতি,

দেবু দত্ত৷