Sunday, May 16, 2021

মিরাকিউরল



আমাদের সময়ে হস্টেলে-টস্টেলে বা মেসবাড়িতে মেডিকাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বেশ সরেস ছিল। রাতবিরেতে, সময়ে-অসময়ে; ফাঁপরে পড়ে ওষুধের ভাণ্ডার ঘাঁটলে পাওয়া যেত শুধু পুদিনহরার শিশি।
পেট চিনচিন? আধ ছিপি পুদিনহরা।
পেটে নিদারুণ ব্যথা? দেড় ছিপি পুদিনহরা।
বুকজ্বালা? সোয়া ছিপি পুদিনহরা।
জ্বর জ্বর ভাব? অন্যান্য ওষুধের অভাবে ধরে নেওয়া হত সে জ্বর পেট গরম থেকে হয়েছে। কাজেই; দু'চামচ পুদিনহরা।
প্রেম-ঘটিত চোট আঘাতের ক্ষেত্রে অন্য ওষুধের দরকার পড়ত বটে, তবে পকেটে ভ্যাকিউম পোষা মানুষের বহুবিধ যন্ত্রণা। পুদিনহারার শিশি থেকেই ডাইরেক্ট চুমুক দিয়ে ঘ্যানঘ্যান জুড়তে হত-
"উয়ো রাত আপুন দো'বজে তক পিয়া"।

নেতাগিরি

একদিন হয়েছি কী..
কী বলব রে ভাই...
সে এক হইহইরইরই ব্যাপার..
মাইরি..তুই জাস্ট ভাবতে পারবি না..
হয়েছিল কী জানিস?
আহা...তাড়া দিসনে..তাড়া দিসনে..
বলছি তো!
হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম..
একদিন হয়েছি কী..
সে এক মস্ত বড় ব্যাপার রে ভাই..
ভাবলে এখনও গা-হাত-পা থরথর করে..গলা শুকিয়ে আসে..
তুইও যদি শুনিস তাহলে..
উফ..এক্কেবারে মার্ভেলাস ইয়ে..
যাকগে, যা বলছিলাম..
তা, একদিন হয়েছে কী..
আরে ধেত্তেরি!
খোঁচা দিচ্ছিস কেন রে রাস্কেল?
সব গুছিয়েই তো বলছি!
মন দিয়ে শোন না কাঁচকলা..
বারবার বলার রিদমটাই ইয়ে করে দিচ্ছে..
একট ক্রিটিকাল সাবজেক্ট নিয়ে বলতে বসেছি..।
যত্তসব!
তা, কী বলছিলাম যেন?
ওই যে...হ্যাঁ...
একদিন হয়েছে কী..
সে এক ঘ্যাম ব্যাপার!
কী যে বলি ভাই..
এই দেখ..দেখ..দেখ! বলতে গিয়ে এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে..
সে দিনটাই তেমন ছিল যে। রোমহর্ষক!
যাকগে৷ যা বলছিলাম...
বলি?
উম..
ইয়ে৷ তুই বড় জ্বালাচ্ছিস!
আজ বরং থাক।
পরে একদিন বলব'খন।

তিনটে বত্রিশের ব্যান্ডেল লোকাল

স্পষ্ট কেউ ডাকলে৷
স্পষ্ট৷ কণ্ঠস্বরটা এখনও কানে বাজছে নির্মলবাবুর৷ গলাটা কি পরিচিত?
"নিমু, ও নিমু। আয়, একবার এ'দিকে আয়"।
ধুস৷ ও নামে অফিসে আবার কে ডাকবে৷ অফিসে তাঁকে নির্মল বলেই কেউ ডাকেনা; মিস্টার দত্ত বা দত্তবাবু বা দত্তদা বা দত্তসাহেব৷ অফিসের ঘানিটানাটানির মধ্যে নিমু ডাকটা ঠিক ওই স্যালাডের মধ্যে হাইক্লাস হিমসাগরের টুকরোর মত৷
নিশ্চয়ই ভুল শুনেছেন৷ নিশ্চয়ই৷
অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলে ফের কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে মন দিলেন নির্মলবাবু৷
একটা মস্তবড় স্প্রেডশিট৷ সে'টাকে দলাইমলাই করে মোক্ষম কিছু হিসেবনিকেশ দাঁড় করাতে হবে৷ এর জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন মনযোগ৷ আর..আর একটা ব্ল্যাককফি৷
" আহ, নিমু! এ'দিকে৷ এ'দিকে দেখ"।
এ'বারে একটু তড়াং হতে হলো৷ ফের কানে এলো, স্পষ্ট৷ কেউ ফচকেমো করছ না তো? উঁহু, তিনি নিজে বেশ ভারিক্কি মেজাজের মানুষ, অফিসে বেশ তালেবর পোজিশন বাগিয়ে বসে রয়েছেন৷ তাঁর সঙ্গে এ'সব ফাজলামো কেউ করবে না৷ ঢকঢক করে খানিকটা জল খেলেন৷ চেয়ার থেকে উঠে চেম্বারের মধ্যেই খানিকটা হাঁটাচলা করে নিলেন৷ তারপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ফিরলেন নিজের পেল্লায় অফিস-চেয়ারটায়৷
"নিমু! ফের বসে পড়লি? বেরো দেখি"৷
এ'বার নিজের চেম্বার থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলেন নির্মলবাবু৷ বুকের একটা অস্বস্তিকর ধড়ফড়৷ পিওন বিশু ছুটে এলো৷
- কিছু চাইছেন স্যার?
- উঁ...ইয়ে৷ হ্যাঁ রে বিশে, কোনও অচেনা কেউ কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে?
- কই! না তো।
- ঠিক আছে৷ আমি একটু নীচ থেকে ঘুরে আসছি৷
- ও মা৷ গোল্ডফ্লেক আনতে হবে নাকি স্যার? আমায় বলবেন তো! এখুনি এনে দিচ্ছি৷
- না না৷ দরকার নেই৷ আমিই বেরোচ্ছি৷ একটু হাওয়া খাওয়া যাবে'খন৷
অফিসের নীচেই মনোহরলালের পানের দোকান৷ সে'খান থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটাহাঁটির পর নির্মলবাবুর মনে হল, "নাহ্, সত্যিই এ এক বিশ্রী ভীমরতি"! সিগারেটটা কাছের ডাস্টবিনে ছুটে ফেলে অফিসের দিকে পা বাড়ালেন নির্মলবাবু।
" নিমু, ফের অফিস? তিন বত্রিশের ব্যান্ডেল লোকালটা ধরতেই হবে"।
ফুটপাতে দাঁড়িয়ে৷ ভীড়ের হইচই, বাসট্রামের গোলমাল ছাপিয়েও স্পষ্ট শুনতে পেলেন সেই মিহি পুরুষকণ্ঠ৷ গা শিরশির করে উঠল নির্মলবাবুর৷ ব্যান্ডেল লোকালে শেষ পা দিয়েছেন অন্তত বাইশ বছর আগে৷ শেষ যে'বার পাড়ায় ফিরেছিলেন৷ ছোটবেলার সে পাড়ার কথা মনে পড়তেই কেমন বুকটা চিনচিন করে উঠল৷ আহ্৷ কদ্দিন বাড়ি ফেরা হয়না৷ কলকাতার ফ্ল্যাটটাকে এখনও ঠিক বাড়ি হিসেবে আপন করে নেওয়া হলো না৷ কিন্তু এদ্দিন পর পাড়ায় ফিরে হবেই বা কি? সে'খানকার পাট তো কবেই চুকেবুকে গেছে৷
"নিমু৷ ট্রেনটা মিস করিস না"৷
আবার!
এ'বার ঝোঁক চেপে গেল। বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিলেন ফিরতে দেরী হবে৷ আর তৎক্ষণাৎ ট্যাক্সি ধরে সোজা হাওড়া স্টেশন৷ মাঝপথে সেই কণ্ঠস্বরটা আর একবার কানে ভেসে এসেছিল - "হাওড়ার মিনিটা ধরলেই পারতিস৷ খামোখা ট্যাক্সি ধরে বাড়তি কিছু টাকার জলাঞ্জলি"।
বৈদ্যবাটির টিকিট কেটে যখন নির্মলবাবু তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে পৌঁছলেন, তখন তাঁর বুকের মধ্যে একটা বিশ্রী ধড়াস ধড়াস৷ তিনটে বত্রিশের ব্যান্ডেল লোকাল তখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে৷ আর মিনিট পাঁচেকের মাথায় ছেড়ে দেবে৷।
ট্রেনে ভীড় ছিল না৷ পছন্দমত একটা জানালার সীট বেছে নিয়ে বসেছিলেন তিনি৷ যাত্রাপথে আরও দু'বার সেই কণ্ঠস্বর শুনতে হয়েছিল নির্মলবাবুকে৷
" নিমু, দু'প্যাকেট কাঠিভাজা কেন দেখি"।
"নিমু, দু'প্যাকেট বাদাম কিনে রাখ ভাই"৷
বৈদ্যবাটি স্টেশনে নেমেই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল নির্মলবাবুর৷ এ'টা আর যাই হোক দেজাভু নয়৷ এত বড় ব্যাপারটা তিনি ভুলে গেছিলেন কী করে? পকেট হাতড়ে মোবাইলফোনটা বের করে দেখলেন ফোনে সিগনাল নেই৷ স্বাভাবিক, যে'খানে তিনি এসে পড়েছেন সে'খানে মোবাইল ফোনটা থাকারই কথা নয়৷
***
- আমার কেমন নার্ভাস লাগছে বেবুলমামা।
- মাধ্যমিক দিয়ে ফেলেছিস৷ এখন তুই রীতিমতো অ্যাডাল্ট! কথায় কথায় এত নার্ভাস হওয়ার কী আছে? বি স্টেডি। আর মিনিট পাঁচেক। ট্রেন এলো বলে।
- ট্রেন এলে সত্যিই সে'টা ঘটবে?
- বেবুল সান্যালের অকাল্ট পাওয়ারকে পাড়ার লোকে পাত্তা না দিক৷ কিন্তু আমি হলফ করে বলছি নিমু; আমার তিব্বত সফর বৃথা যায়নি৷ আর সে'টা এ'বার আমি হাতেনাতে প্রমাণ করব!
- এই ট্রেন থেকে আমি নামব?
- ভবিষ্যতের তুই৷ মধ্যবয়স্ক তুই৷ ভবিষ্যৎ থেকে তোকে টেনে আনছি আমার মন্ত্রবলে৷ তিব্বতি তন্ত্র ব্যবহার করে সেই ভবিষ্যতের নিমুর সঙ্গে আমি যোগাযোগও স্থাপন করেছি৷
- যত আজেবাজে কথা৷ ধুস৷ আমি আসি৷
- আরে দাঁড়া না ইডিয়ট৷ ওই যে, ট্রেন ঢুকছে৷
- বাবা ঠিকই বলে৷ তুমি একটা ঢপবাজ৷
- তোর বাবা একটা অখাদ্য মানুষ৷ ব্যবসা করে করে স্রেফ বখে গেল। ওই যে৷ ট্রেন ঢুকে গেছে৷ এ'বার তুই নামবি৷ মানে ভবিষ্যতের তুই। রীতিমত কোট-টাই পরা সাহেবসুবো মানুষ৷ আমি মেডিটেট করতে বসে সে চেহারে আগেভাগেই দেখে রেখেছি।
- বাবা কি সাধে বলে বেবুলটা মহাফেরেব্বাজ!
- তোর বাবা একটা ইডিয়ট৷ থাম৷ ওই যে তুই। তুই আমাদের জন্য কাঠিভাজা আর বাদাম নিয়ে এসেছিস৷ আমি শিওর!
- ওই ধুমসো টেকো খিটখিটে চেহারার লোকটা আমি? ওই হাতের কী একটা খেলনার দিকে তাকিয়ে হাবার মত দাঁড়িয়ে আছে, ও'টা আমি? তাও ভবিষ্যৎ থেকে তোমার মন্ত্রবলে টেনে আনা? মামা, এ খবর জানলে বাবা তোমায় ছাতাপেটা করবে৷ ভুজুংভাজুংয়ের একটা লিমিট থাকবে না? তোমার শ্রীরামপুরের থিয়েটারের দলের কোনও লোককে সেট করেছ নিশ্চয়ই!
***
নির্মলবাবুর স্মৃতি হুড়মুড়িয়ে ফেরত এলো৷ তাই তো৷ তাই তো৷ যে বেঞ্চিটার কাছে দু'জনের দাঁড়িয়ে থাকার কথা সোজা সে'দিকে হাঁটা লাগালেন তিনি৷ ওইত্তো দাঁড়িয়ে বেবুলমামা৷ বেবুলমামার পাশে একমুখ বিরক্তি মেখে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর৷ সে ছেলেটা সম্ভবত সরে পড়তে চাইছে কিন্তু বেবুলমামা তার জামার আস্তিন টেনে ধরে আছে বলে ছুটে পালাতে পারছে না৷
হাওড়ামুখো একটা ট্রেন ঢুকছে৷ নির্মলবাবু বিলক্ষণ জানেন তাঁর কী করার কথা৷ একছুট্টে সেই দু'জনের কাছে পৌঁছে গেলেন তিনি৷ বেবুলমামাকে ঢিপ করে একটা প্রণাম করে, পাশে দাঁড়ানো ছেলেটির হাতে বাদাম আর কাঠিভাজার প্যাকেটগুলো গুঁজে দিয়েই ফের ছুট৷ হাওড়ামুখো ট্রেনটা কিছুতেই মিস করা চলবে না৷

সমর্থক

- এই যে, মন্টুদা! একটা জরুরী কথা ছিল।
- আরে তপেন যে৷ সব ভালো তো?
- ওই জরুরী ব্যাপারগুলো আপনাকে জানিয়েই...।
- শোনো, এখুনি আমায় একটা জরুরী মিটিংয়ে বসতে হবে যে৷ পার্টিঅফিস থেকে লোকজন এসে বসে আছে আমার চেম্বারে। সবে ইলেকশন জিতেছি, তাও এমন একটা ডিফিকাল্ট সীটে৷ বুঝতেই পারছ...হে হে হে!
- বেশ। মিটিং সেরে নিন৷ আমি বাইরের ঘরে বসছি৷
- না না তপেন৷ তুমি বরং সামনের শনিবার এসো৷ তোমার কথাও শোনা হবে, একসঙ্গে বসে চাও খাওয়া যাবে৷ কেমন?
- চায়ের ব্যাপারটা শনিবার হলে ক্ষতি নেই৷ কিন্তু জরুরী ব্যাপারগুলো নিয়ে আজ আলোচনা না করলেই নয়।
- আজ হবে না৷
- বললাম তো মন্টুদা৷ আমার অপেক্ষা করতে কোনও অসুবিধে নেই।
- জেদ? বটে? বাড়াবাড়ি হচ্ছে তপেন৷
- উপায় নেই মন্টুদা।
- যা বলার আমার সেক্রেটারিকে গিয়ে বলো।
- আপনার সেক্রেটারিকে তো ভোট দিইনি মন্টুদা৷
- তোমার সাহস তো কম নয়? পার্টির একজন সমর্থক বলে তোমায় এদ্দিন জানতাম৷
- সমর্থক শব্দটা বড় গোলমেলে মন্টুদা৷ আমি ভোটার৷ আর ভোট দিয়ে যখন জিতিয়েছি, তখন কাজকর্মের হিসেবনিকেশ তো আমাকেই বুঝে নিতে হবে।
- ভোট দিয়েছ বলে কি মাথা কিনে নিয়েছ নাকি?
- ডেমোক্রেসির যুগে মানুষ কিনে নেওয়ার কথা শুধু নেতারাই ভাবতে পারেন৷ ভোটার হিসেবে আমার কাজ শুধু কৈফিয়ৎ আদায় করা৷ পার্টি অফিসের ছেলেছোকরারা এসেছে, মজলিস বসবে আপনার চেম্বারে; সে'সব তো ভালো কথা৷ কিন্তু আমার প্রয়োজনের কথাগুলো না শুনে পার পাবেন না।
- ওই বিশু দত্ত এমএলএ হলে বুঝতে কত ধানে কত চাল৷ এত বড় বড় বোলচাল তার সামনে হাঁকলে বিশুর পোষা গুণ্ডারা পেঁদিয়ে তক্তা করে দিত৷
- বিশু দত্ত আর তার পোষা গুণ্ডাদের হিসেব আমরা নিজের মত করে বুঝে নিয়েছি দত্তদা৷ তাকে আমরা ভোট দিয়ে জেতাইনি, কাজেই তাকে নিয়ে এ মুহূর্তে কোনও মাথাব্যথাও নেই৷ কিন্তু আপনাকেও যে এই বেলা মেপে নিতে হবে মন্টুদা।
- তুমি আমায় থ্রেট দিচ্ছ তপেন? তুমি জানো আমি কী করতে পারি?
- অনেক কিছুই পারেন৷ গুণধর স্যাঙাৎসব আপনার পাশেও ঘুরঘুর করে, তাও জানি৷ কিন্তু আমি খুব ত্যাঁদড় ভোটার মন্টুদা৷ নিজের ভোটের হিসেব সুদেআসলে আদায় না করতে পারলে আমার স্বস্তি হয়না৷ বিশ্বাস না হলে বিশু দত্তকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন; গত ভোটে তাকেই সাপোর্ট করেছিলাম কিনা!
- তোমার মত সমর্থক যে কোনও পার্টির জন্য আপদ৷
- যাক, এ সত্য যদি ঠাহর করে থাকতে পারেন, তা'হলে দেশের অন্তত অমঙ্গলের সম্ভাবনা আর নেই৷ আমি অপেক্ষা করছি মন্টুদা৷ এই দেখুন, পাড়ার যাবতীয় সমস্যার লম্বা ফর্দ বানিয়ে এনেছি৷ আজ পয়েন্ট বাই পয়েন্ট বুঝিয়ে যাব৷ আর প্রতি শানিবার এসে কদ্দূর কী এগোল সে হিসেব নিয়ে যাব৷ তা, ইয়ে! শনিবারের চায়ের অফারটা কি জলে গেল মন্টুদা?

Saturday, May 15, 2021

নায়িকা বিদায়

প্রখর দারুণ অতি।
হাওয়ায় ধুপধুপ।
রেলস্টেশন ক্যাফেটেরিয়ার দেওয়ালে গাব্দা ঘড়ির বোমা-সুলভ টিকির টিকির। কথার লাটাই, গলা ওগরানো টেনিস বলের ঘুড়ির লেজে ঘুরঘুর।

টেবিল ডায়াগোনালের এক প্রান্তে  "কুছ পরোয়া নহি, ভালো জরুর থাকেগা" ফ্লেভারের নায়ক। সামনে মিয়ানো বিস্বাদের ফিশফ্রাই। ফ্যাঁকফ্যাঁকে হাসি গায়ে  বাবু হয়ে বসে ঠাণ্ডা কফির কাপ।

উয়ো চলি উয়ো চলি দেবীর পালিশ কালো নখের অদৃশ্য চক টেবিলের ধুলোয় বিকি কেটে লিখে যায় খুচখুচুর কথা...

"আমাদের কথা হয়েও হলো না শেষ..."।

পড়তেই নায়ক মাথা নেড়ে জানালেন;

- বড্ড। মেলো। ইয়ে ড্রামাটিক।
- সব শেষ।
- এবারের মত।
- এবারের আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার।
- সাংঘাতিক।  মেলো। সেই। ড্রামা।
- বেশ। কুড়ি নয়। তবু। তেরোটা বছর। তেরোটা বছর বাবু।
- এ'টা কোন কফি হলো?
- প্ল্যাটফর্মে যাবি না? অপু গেছিল। সেই শেষের বার।
- উফ। মেগা। মেলো।
- ড্রামা। তবু। যাবি না? ট্রেন নড়লে তুই পাথর হবি না?
- তুই কি বৌ?
- তোর সঙ্গে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে যাইনি বলে ভালো না বাসার ভান করবি? আইনে ফেলবি আমায়? তুইও?
- তোর ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে।
- জানি। যেতে হবে।
- যাস না। যাস না।
- বাবু।
- যাস না। সব সামলে নেবো। যাস না।
- যেতে হবে। যেতে হবে। ইউ নো যেতে হবেই।
- আই নো। আই নো।
- উঠি এবার।

দেবী উঠে দাঁড়ালেন। নায়ক ঝাপসায় গুটিয়ে গেলেন। বাতাসের তিরতির স্তিমিত হয়ে এলো।

ভেসে যাওয়ার আগে খড়কুটো আঁকড়ানোর অস্থির উচ্ছ্বাসে তেরো বছরের ভালোবাসার নামটাকে জড়িয়ে ধরলেন নায়ক;
- যাস না Torrentz! যাস না। যাস না Torrentz! আমি কী করব? যাস না।

স্নেহর বাষ্প লেপে দেবী নায়কের কাঁপা হাতের পাতা টেনে ধরলেন। বললেন;

- “Torrentz will always love you. Farewell.”