Tuesday, May 19, 2020

বংঈটসের বিরিয়ানি রান্না প্রসঙ্গে

এই অসময়ে মনখারাপ হলেই সর্বকালের অন্যতম সেরা (এবং জরুরী) ভিডিও অর্থাৎ  বংঈটসের কলকাতা বিরিয়ানির রেসিপিটা লূপে চালিয়ে দিয়ে একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকছি আর "মার্তণ্ড মার্তণ্ড মার্তণ্ড" রিদমে "বিরিয়ানি বিরিয়ানি বিরিয়ানি" বিড়বিড় করছি।

এই রেসিপি ভিডিও সম্বন্ধে কয়েকটা মনের কথা না বললেই নয়। 

১। ভিডিওর গোড়াতে বিরিয়ানির হলদে আলু নরম সুরে ভাজা হচ্ছে, তারপর পেঁয়াজের 'বিরিস্তা'। মনে তখন শ্যামল মিত্তিরে ফুরফুর। 

২। তারপর বিরিয়ানি মশলা তৈরি। সে কী থ্রিল!  আর্কিমিডিস চৌবাচ্চা-স্নান যেন নিজের চোখের সামনে দেখতে পারছি। সামান্য তুকতাকে যে কী ঘ্যামগোত্রের বিগব্যাং ঘটতে পারে..আহা।

৩। এরপর পাঁয়তারা পক্ষের শেষ, অ্যাকশন পক্ষের শুরু। মাংসের ম্যারিনেশন। দই,মশলাপাতি দিয়ে মাংসমাখা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এইবেলা গভর্নমেন্টের উচিৎ আইন করা; যাতে নজরুলগীতি বা বাউল না গেয়ে কেউ যেন ম্যারিনেশনের মাংস না মাখে। 

৪। সরু লম্বা চালের ভাত দেখলে এমনিতেই মনে হয় পৃথিবীতে আজও কতটা গভীর রোম্যান্স জমে আছে। আর যে চাল বিরিয়ানিতে গিয়ে ঠেকবে, তা সেদ্ধ হতে দেখা তো মেডিটেশনের ঠাকুরদা। ভিডিওর এ জায়গায় আমি বুকে পাশবালিশ টেনে নিই।

৫। যথাযথ ম্যারিনেশন শেষে কষা হয় মাংস, বুকে নামেন কবীর সুমন আর উথাল-পাতাল প্লাস ভাবনা নেশায় চিন্তামাতাল। 

৬। বিরিয়ানি দমে বসানোর আগে মশলাপাতি, আতর, কেওড়ার জল, গোলাপজল, কেশর, ঘি মাখন, খোয়া ইত্যাদি নিয়ে যে জটিল অ্যালকেমিটা ঘটে, তা দেখে ভরসা পাই। নাহ্, রক্তচোষা শয়তানি বা নিরেট ধান্দাবাজিটুকুই মানুষের শেষ পরিচয় হয়ে থাকবে না। যারা বিরিয়ানি বানাতে পারে, তারা নেহাৎ ফেলনা নয়; ভালোবাসা তাদের মজ্জায়। 

৭। জাদুকর দর্শকের চোখের সামনে পর্দা টানবেনই৷ অথবা হয়ত কাউকে পুরে ফেলবেন একটা ঢাউস আলমারিতে। সেই আড়ালটাই ম্যাজিকের আত্মা৷ ঢাকা পাত্রের আড়ালে ভাত মাংসের অঙ্কমাপা মিলনে জেগে উঠবেন মহানায়ক। সবার অগোচরে বিরিয়ানি-অরিন্দম বলে উঠবেন "আই উইল গো টু দ্য টপ, টু দ্য টপ, টু দ্য টপ"! 

ভিডিওটা দেখে মনের মধ্যে থেকে স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে। মাংস ভাত মিলিয়েমিশিয়ে যা নয় তাই পোলাও গোছের কিছু করে আর বলার চেষ্টা করব না " আজ বাড়িতে বিরিয়ানি বানিয়েছি"। 
সাধনায় শর্টকাট আর কবিতায় গাইডবই; চলে না৷ 

মনখারাপ যতই জমাট হোক, এ ভিডিও একটানা বার দশেক দেখলেই মনে হয় কোনও পাহাড়ি গ্রামের ঝকঝকে রাত্রির আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছি। 

সাবাশ বংঈটস। 

আরসালানে সিরাজে বা আমিনিয়ায় যারা মেগাস্কেলে নিয়মিত এ ম্যাজিক হাঁকাচ্ছেন; তাঁদের সেলাম।

***

ভিডিওটা নতুন নয়। প্রায় বেশিরভাগ মানুষই আশা করি বহুবার দেখেছেন।  তবু লিঙ্কটা দিয়ে রাখলামঃ

https://youtu.be/SbWGXcZTYzg

Sunday, May 17, 2020

বসের প্ল্যান

- বস!

- বলে ফেলো দত্ত।

- বলছি, সেলসটীম খুব রেস্টলেস হয়ে উঠছে, মেমোটা এবার ইস্যু না করলেই নয়। 

- কীসের মেমো?

- ওই যে। সামনের কোয়ার্টারের সেলস টীমের টার্গেট। ছেলেরা হপ্তাখানেক ধরে ঘ্যানঘ্যান করছে কিনা...। 

- সেলসের ছেলেপিলে; প্রয়োজনে লোহাকুচির চচ্চড়ি দিয়ে ভাত মেখে খাবে, মনুমেন্টের মাথায় মশারি টাঙ্গাবে, জিরাফের গলায় নেকটাই পরাবে। মেমোটেমোর মত নেকু জিনিসে তাদের কাজ কী। 

-  বস, যাই বলুন। এত হাই টার্গেট সেট করা হচ্ছে আজকাল। আগাম টার্গেট মেমোটা পেলে ছেলেমেয়েগুলো একটু আগেভাগে প্ল্যান করে নিতে পারত। একটু প্রস্তুত হতে পারত। তাছাড়া এই মেমোতে শুধু যে টার্গেট আছে তা তো নয়। ইনসেন্টিভ পাল্টে যাচ্ছে। অনেকের চাকরীবাকরী নিয়েও টানাটানি হতে পারে, অন্তত মেমোর ড্রাফট পড়ে আমি তেমনই বুঝছি। 

- দত্ত, তোমার চাকরী নিয়ে তো টানাটানি পড়বে না। তুমি খামোখা অত মাথা ঘামাতে যাচ্ছ কেন?

- কিন্তু এই লুকোছাপাতে সেলসটীমের মনবল একটু...একটু...।

- সেলসটীমের মনোবল দিয়ে কোন কাঁচকলাটা হবে দত্ত? ইয়ার এন্ড রিভিউতে বাহাত্তর খানা স্লাইড জুড়ে দলের মনোবলের বাহার দেখাব? 

- বস। আপনি গুরু, আমিই গরু। তবে পারমিশন দিলে সামান্য হাম্বা করি। 

- বলে ফেলো। 

- সেলস টীমের মনোবল ইস ডাইরেক্টলি প্রপোরশনাল টু সেলস নাম্বার, তাই না?

- উইথ ডিউ রেস্পেক্ট টু ইয়োর হাম্বা, মাই ডিয়ার দত্ত। মনোবল মানেই পার্ফরমেন্স; ওই টেম্পারামেন্ট নিয়ে এইচআরে গিয়ে বাতেলা ঝাড়ো গিয়ে। সেলসটীম সামলানো তোমার কর্ম নয়। 

- মনোবলের সঙ্গে পার্ফরমেন্সের যোগাযোগ নেই বস ? 

- মনোবল দিয়ে টেডটক হয়, লাল নীল হাবিজাবি পোস্টার হয়। পার্ফরমেন্সের জন্য দরকারি হল ভয়। 

- ভয়?

- ইয়েস দত্ত। ফিয়ার জেনারেটস ফায়্যার। আর ওই আগুনটুকু না থাকলে সেলসটীম মাধুকরী করে বেড়াবে, বেচতে পারবে না। 

-  কথামৃত লেভেল বস। কিন্তু তবু... একটিবার ভেবে দেখুন...আগামীকাল থেকে নতুন কোয়ার্টার শুরু...এখনও যদি মেমোটা রিলিজ না করা হয়...।

- আগামীকাল। আগামীকাল শুরু হবে রাত বারোটার পর। আর আজ এখন সবে বেলা আড়াইটে। এখনও সাড়ে নয় ঘণ্টা হাতে। 

- হ্যাঁ...মানে ইয়ে...বস...মেমোটা তো তৈরি...। 

- তাতে কী হয়েছে? তৈরি হলেই বিলি করতে হবে? দাঁড়াও। আগে ব্যাটাচ্ছেলেদের তড়পাও সামান্য। পারফর্মেন্সের জন্য দরকার ভয়, ভয়ের জন্য কী দরকার?

- কী বস?

- মিস্ট্রি। অন্ধকার। ওরা যত অন্ধকারে থাকবে, তত ভয়ে ছটফট করবে। আর তত সহজে ওদের নাচানো যাবে। এবং ছটফটের অনুপাতে বাড়বে পারফর্মেন্স। শোনো দত্ত...ওই মেমো যেন রাত আটটার আগে সেলসটীমের কাছে না পৌঁছয়।

- কিন্তু মেমো এক্কেবারে তৈরি, আপনিও অ্যাপ্রুভ করেছেন। টীমের ছেলেমেয়েদের যে কী বলি...। 

- ওদের বলে দাও মেমো নিয়ে এখনও ম্যানেজমেন্ট ধন্দে আছে।  বিকেলবেলা ডিরেক্টররা মিটিং-য়ে বসবে। রাত আটটা নাগাদ ওই মেমো রিলিজ করে দিলেই হল। অকারণ  প্ল্যানিংয়ে অনেক সমস্যা হে। তাছাড়া আজকালকার ছেলেছোকরাদের প্রশ্নের আর শেষ নেই । সব কথাতেই এটা কে'ন, ও'টা কেন; অসহ্য। শেষ মুহূর্তে মেমো পাবে, আজেবাজে প্রশ্নের সময় সুযোগ কোনোটাই থাকবে না। এ মেমো দিব্যি বেরিয়ে যাবে। হেহ হেহ। 

- তা আপনি বলছেন যখন...কিন্তু বস...মেমো পড়ে যা বুঝেছি, অনেকের চাকরী নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে। 

- সে জন্যেই তো সাস্পেন্সটা খুব কাজের জিনিস ভাই দত্ত। বাবাবাছা বলে কি কাউকে ডারউইন শেখানো যায়? ও মহামন্ত্র ঠেকে না শিখে উপায় নেই। 

- বেশ। তা'হলে রাত আটটা নাগাদই না হয় মেমোটা সেলস টীমের কাছে পাঠাব। 

- গুডবয়। আর দত্ত, আমার হয়ে একটা মনোবলে সুড়সুড়ি দেওয়া মেসেজ তৈরি করো দেখি। এমন একটা কিছু যা পড়েই মনে হবে যাই এখুনি আড়াই কিলোমিটার দৌড়ে আসি। তোমার মেমোর সঙ্গে না হয় সেই মোটিভেশনাল মেসেজটাও বিলি করে দিও? উইথ লাভ ফ্রম ডিয়ার বস বলে? কেমন?

- ইয়েস বস।

Wednesday, May 13, 2020

ট্যুইটস অফ আইসোলেশন ১৩


ফের একদিন। 

ভীড়। ধরুন, ওই চৈত্র সেলে গড়িয়াহাট মার্কা ভীড়।

আর ভীড়ে হাঁসফাঁস অবস্থায় কেউ আমার পা মাড়িয়ে ফেলবেন। এবং তারপরেই চেনা স্ক্রিপ্ট ভেস্তে দিয়ে মারকাটারি মিরাকেল।  

"অন্ধ নাকি শালা" বলে আমি চিৎকার করে উঠব না।
"ভীড় ফুটপাথে অমন ট্যালার মত ল্যাম্পপোস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে অথচ সামান্য টোকা লাগলে ন্যাকাপনা। আচ্ছা গবেট মাল" মার্কা পাল্টা উত্তর ভেসে আসবে না। 

বরং পা মাড়িয়ে যাওয়া মানুষটি ঘুরে হন্তদন্ত হয়ে কাছে আসবেন। জিভ কেটে বলবেন; "ছিঃ ছিঃ,অমন ইস্টুপিডের মত কেউ হেঁটে যায়? আমি একটা অখাদ্য। বলি, পায়ে কি খুব লেগেছে দাদা"?

আমি তৎক্ষণাৎ লাজুক সুরে জানাব " আরে না না, ভীড়ের মধ্যে অমন অল্পস্বল্প হয়েই থাকে। আরে পা মাড়িয়েছেন, বুলডোজার তো আর চালাননি। আমিই বরং অকারণে থমকে দাঁড়িয়ে গেছিলাম। কোনও মানে হয়? হাতে অতগুলো ভারী ব্যাগ নিয়ে ছুটছেন আপনি, পায়ে পা লাগতেই পারে। ধুস, ও নিয়ে ভাববেন না"।

দু'টো দিলখোলা হাসির আদানপ্রদান হবে। পা মাড়িয়ে দেওয়ার ব্যথা বা পা মাড়িয়ে দেওয়ার লজ্জা;তিরিশ সেকেন্ডে গায়েব কিন্তু সে হাসির ওম তিরিশ দিন মন চনমনে রাখবে। 

হাল ছাড়িনি। এই করনো-ধ্যাষ্টামোর শেষে ভীড় ফিরে আসবে। সেই ফিরে আসা ভীড়ে আমাদের হাঁসফাঁসটুকুও দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকবে। কিন্তু সেই নতুন ভীড়ের পুরনো মানুষগুলো আগের চেয়ে সামান্য নরম হবে। হবেই। হতেই হবে।

Tuesday, May 12, 2020

ব্যালেন্স

- সুমিতদা! 

- হাঁপাচ্ছিস কেন?

- মিস্টার লাহিড়ীর ব্যাপারটা শুনেছেন?

- বস আগে। এক গেলাস জল খা। তারপর না হয়...।

- সুমিতদা...বসার সময় কোথায়? লাহিড়ীর কেসটা তো অনন্তপুর থানার আন্ডারে।  এখন বেরোলেও পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। আপনার ড্রাইভার আজ এসেছে নাকি ট্যাক্সি ডাকব?

- অরিন্দম। বড্ড উত্তেজিত হয়ে আছিস। নিমাইদাকে বলেছি দু'টো চা দিতে৷ লাঞ্চ করেছিস তো?

- লাঞ্চের আর সময় পেলাম কই৷ অনলাইনে খবরটা ফ্ল্যাশ হতেই ছুট দিলাম..।

- আমারও লাঞ্চ করা হয়নি। চা'টা খেয়ে নে। তারপর নিমাইদাকে বলছি ছুটে গিয়ে দু'টো রোল নিয়ে আসবে।

- সুমিতদা..আমাদের হাতে অত সময় নেই...আপনি খবরটা শুনেছেন তো?

- পুলিশ লাহিড়ীর এগেন্সটে কেস নিয়েছে৷ বিভিন্ন পলিটিকাল কাঠি নেড়েও মাফিয়া লাহিড়ী পুলিশকে ঠুঁটোজগন্নাথ করে রাখতে পারেনি। আর হ্যাঁ, এই বয়সেও অবিনাশ মিত্তিরের পার্সিভারেন্সের জবাব নেই। ওই একটা সাতপুরনো আধভাঙা বাড়ি আঁকড়ে থেকে বুড়ো যা ফাইট দিল..ব্রাভো। থ্রেট, ইন্টিমিডেশনে থেমে না থেকে, নিজের গুণ্ডাও লেলিয়েছিল লাহিড়ী৷ কিন্তু তবুও বুড়োকে টলিয়ে বাড়িটা খালি করাতে পারল না।  ওই গুণ্ডাবাহিনীর জোরে লাহিড়ী তো কম পুকুর বোজালো না, অথচ এই অবিনাশ মিত্তির ব্যাটাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ল।

- খবরটা তা'হলে ঠিকঠাকই পৌঁছেছে আপনার কাছে৷ সুমিতদা... অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে গত বছর চারেক তো আপনি নিরন্তর ওই লাহিড়ীর মত জমিখেকো মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছেন৷ সুরজমল, মনোহর সিং, অজয় সান্যালদের মুখোশ খুলে ফেলার পিছনে আপনার ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে'টা গোটা শহর জানে। মিডিয়া বলুন, পুলিশ বলুন; আপনাকে সবাই যা ভক্তিশ্রদ্ধা করে...। লাহিড়ীর আগের কুকীর্তিগুলো সম্বন্ধে আপনার কাছে যা তথ্যপ্রমাণ, তা যদি এই সময় পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তা'হলে...।

- তা'হলে কী হবে অরিন্দম?

- বৃদ্ধ অবিনাশবাবুর অন্তত একটু উপকার হয়৷ তাছাড়া লাহিড়ী পুলিশের জাল থেকে বেরোনোর আপ্রাণ চেষ্টাটুকু তো করবেই। কিন্তু আপনার মত একজন অ্যাকটিভিস্ট যদি..। সুমিতদা, আমাদের কিন্তু আর দেরী না করে..।

- কিছুক্ষণ আগেই লাহিড়ী আমায় ফোন করেছিল।

- লাহিড়ী? আপনাকে?

- নিজের সব দোষ মোটামুটি স্বীকার করেছে। 

- আরিব্বাস। স্বীকার করেছে?

- সব। এও আশ্বাস দিয়েছে যে অবিনাশ মিত্রের বাড়ির ওপর ওর আর কোনও লোভ নেই। আমিও সে সুযোগে দু'টো কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছি। ওর এই গুণ্ডাদলের দৌরাত্ম্য যে সুস্থসমাজে অচল, সে'টা ওর মুখের ওপর বলাটা জরুরী ছিল। 

- স্বীকার যখন করেইছে তখন তো আর চিন্তার কিছুই নেই। এ'বার সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে...।

- অরিন্দম। আমি লাহিড়ীকে কথা দিয়েছি, এ ব্যাপারে আমি আর পুলিশের কাছে যাব না। আর ব্যাপারটা তো মিটেই গেছে।

- কথা দিয়েছেন সুমিতদা? লাহিড়ীকে?

- এই অবিনাশ মিত্তির ভদ্রলোকও খুব একটা সুবিধের নয় রে অরিন্দম। টাকাপয়সার ব্যাপারে ভদ্রলোক তেমন বিশ্বাসযোগ্য বোধ হয় নন। নেহাত বৃদ্ধ, একলা মানুষ...তাই সিমপ্যাথি ব্যাপারটা চলে আসছে..।

- সুমিতদা! অবিনাশ মিত্তিরের যতই দোষ থাক। লাহিড়ীর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।  গুণ্ডা লেলিয়ে যে মানুষ প্রমোটারি চালায়..।

- সে অপরাধের শাস্তি পাওয়া অবশ্যই উচিৎ।  কিন্তু অরিন্দম, আমি পুলিশও নই, গভর্নমেন্টও নই। শহরের সমস্ত বজ্জাত প্রমোটারকে শাস্তি দেওয়ার দায় শুধু আমি একা বয়ে বেড়াব, এর কোনও মানে নেই।

- সমস্ত জেনে হাত গুটিয়ে বসে থাকা মানে তো ওর গুণ্ডার দলেই নাম লেখানো সুমিতদা। আপনার থেকে তো এই শিক্ষা পাইনি।

- অবিনাশ মিত্তির দিব্যি প্রপার্টি বগলে ড্যাংড্যাং করে বেরিয়ে যাবে। আর আমি খামোখা লাহিড়ীর গুণ্ডাদের হাতে হ্যারাসড হব কেন বলতে পারিস? সমস্ত লড়াই ব্যক্তিগত হয়ে পড়লে মুশকিল। সততার ইগোই শেষ কথা নয়, মাঝেমধ্যে ব্যালেন্স খুঁজে নিতে হয় অরিন্দম। 

- ইগো? আইডিয়াল বলুন। 

- আমি আর তর্ক করতে চাইনা। তুই চাইলে যেতে পারিস।

- প্রয়োজনে তাই যাব সুমিতদা৷ কিন্তু আমার যাওয়া আর আপনার যাওয়ার মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। 

- আমাদের মধ্যে এই যে আকাশপাতাল ফারক, সে'টা শুধু বয়সের তফাৎ নয় অরিন্দম। ওই যে বললাম, আমার মধ্যে সততার ইগো নেই তাই আমি এদ্দূর আসতে পেরেছি। তাই লাহিড়ীর মত একটা রাস্কেলও আমায় ফোন করে কান্নাকাটি করে; কারণ ও জানে যে সুমিত দত্তর মতামতের একটা ওজন আছে। সুমিত দত্ত কিছু বললে সে'টা পুলিশ বা মিডিয়া সমীহ করবে। আইডিয়াল এক জিনিস, কিন্তু তা নিয়ে গোয়ার্তুমি আমি বরদাস্ত করতে পারিনা। নিজের এই ইগো ঝেড়ে ফেলতে যদি না পারিস, তা'হলে আমার মত কারুর সেক্রেটারি হয়েই জীবন কাটাতে হবে। যাকগে। আবারও বলছি, নিজেথানায় যেতে চাইলে যেতে পারিস।  তবে সে'খানে গেলে আর আমার অফিসে ফিরে আসবার কোনও প্রয়োজন নেই। কথাটা মনে রাখিস। 

****

- গুম মেরে আর কতক্ষণ বসে থাকবি অরিন্দম? চা'টা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর থানায় যেতে হলে বেরো এখন, দেরী করে লাভ কী। 

- নিমাইদাকে বরং রোলের বদলে চাউমিন আর চিলি চিকেন আনতে বলো সুমিতদা। সেই কোন সকালে দু'টো রুটি খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, খিদেয় পেটের নাড়িভুঁড়ি দলা পাকিয়ে যেতে বসেছে। 

Sunday, May 10, 2020

মা, এক নির্ভীক সৈনিক


"ভালোবাসার ছোট্ট হরিণ" আমার পড়া প্রথম শৈলেন ঘোষের লেখা, আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীতে৷ সে গল্প খুব ভালো লেগেছিল শুনে পাশের বাড়ির এক সহৃদয় কাকু আমায় পড়িয়েছিলেন "মা এক নির্ভীক সৈনিক"। ধার করা পূজাবার্ষিকীতে পড়েছিলাম, তাই পড়ার পর বুকে পাথর রেখে সে বই ফেরত দিতে হয়েছিল। অত ছোটবেলায় যে'টা সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল সে'টা হল 'স্তেপস'য়ের হিংস্র যাযাবর উপজাতিদের দৈনন্দিন জীবন। 'সাইথিয়ান' শব্দটা উল্লেখ উপন্যাসের শুরুর দিকেই ছিল আর আমার মনে মধ্যে শব্দটা গেঁথে গিয়েছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটা কারণে। সাঁইথিয়া নামে একটা রেলস্টেশন এ বাংলায় আছে, এই অকারণ মিল খুঁজে পেয়ে থ্রিলড হয়েছিলাম। বহুবছর পর ইন্টারনেট ঘেঁটে পড়েছিলাম সাইথিয়ানদের সম্বন্ধে;  আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইউরেশীয় অঞ্চলের স্তেপস দাপিয়ে বেড়াত এই যাযাবর উপজাতিরা। শৈলেনবাবু লিখেছিলেন সাইথিয়ান (Scythian)-দের মধ্যে বিভিন্ন জাত; তার একটি হলো আসগুজাই। উইকিপিডিয়া বলছে সাইথিয়ানদের বিভিন্ন নামে ডাকা হত যেমন সাকা, ইসকুজাই, ইত্যাদি। 

গল্পের মূলে রয়েছে আসগুজাই দলের সেনাপতি স্তানের পুত্র কোহেন এবং কোহেনের মা আনাতুরি। তবে যে নামটা মনের মধ্যে আজও সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে সে'টা হল আসগুজাই দলের নির্মম রাজা বুমবুজাং৷ বুমবুজাং নামটা বিড়বিড় করে খানতিরিশবার বললেই মনে হয় " এখুনি যুদ্ধে যাব"। শৈলেনবাবু এত সুন্দর সব নাম বাছতেন তাঁর রূপকথার গল্পের চরিত্রদের জন্য; আহা, তাতেই কেল্লা ফতেহ হয়ে যেত। আলা-ইজা, শিজুমন; এক একটা লাখটাকার নাম। 

আসগুজাইদের রক্তলোলুপতায় হাড়হিম করা বর্ণনা রয়েছে এই গল্পে। নির্মম হিমশীতল স্তেপসে ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়ানো মানুষ তাঁরা, গেরস্তবাড়ির নরম তাঁদের স্পর্শ করেনি কোনওদিন। এই দলের সঙ্গে ওই দলের খুনোখুনি সে'খানে নিত্যদিনের ব্যাপার। শত্রুর গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে গায়ের চাদর বানানো বা শত্রুর খুলি দিয়ে পানপাত্র তৈরি করাটাই তাঁদের একমাত্র ফ্যাশন। রক্তপাত ব্যাপারটা তাঁদের কাছে ছিনিমিনি৷ তা সেই খুনে শয়তান রাজা বুমবুজাংয়ের নেকনজর থেকে পড়ে যেতেই সেনাপতি স্তানকে নিকেশ হতে হয় খোদ রাজার হাতে৷ বুমবুজাং পারলে সে'দিনই খতম করে দিত শিশু কোহেন ও তাঁর মাকে। কিন্তু আনাতুরি কোনওক্রমে সেই কোলের শিশুকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচেন, আশ্রয় পান শত্রু শিবিরে। 

আনাতুরি কোহেনকে বড় করেন একটাই স্বপ্ন নিয়ে, কোহেন আর পাঁচটা খুনে যাযাবরদের মত রক্তলোলুপ হবেনা৷ কোহেন ভালোবাসতে শিখবে৷ মা কোহনেকে সর্বক্ষণ আগলে রাখেন; কোহেনকে বুঝতেই হবে এ রক্তারক্তি কতটা অর্থহীন। কিন্তু আনাতুরির স্নেহ কাটিয়ে একসময় কোহেন বেরিয়ে পড়ে রক্তের নেশায়, খুনখারাপির টানে৷ মায়ের কান্না,আদর ও শাসন; সমস্ত হেলায় ভাসিয়ে দেয় সে, কোহেনকে পেয়ে বসে যুদ্ধের নেশায়।

তরুণ কোহেনের হিংস্র হুঙ্কার আনাতুরিকে ভেঙেচুরে ফেলে কিন্তু নিজের দায়িত্বটা দিব্যি টের পায় সে। লতায় পাতায় এগোতে এগোতে এই অপূর্ব রূপকথায় একসময় হিংস্র সন্তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান মা নিজে; মায়ের হাতে তখন অস্ত্র৷ মা তখন এক সৈনিক। মায়ের যুদ্ধ ভালোবাসার জন্য, খোকার যুদ্ধে খুনির দাপট। খোকা নির্মম, মা নির্ভীক। 

ছেলেবেলায় ধার করা পূজাবার্ষিকীতে পড়া এই উপন্যাস। তারপর ঘটনাচক্রে সেই পূজাবার্ষিকীটা বহুদিন কিছুতেই জোটাতে পারিনি।  কলেজের সম্ভবত সেকেন্ড ইয়ারে, ক্যালক্যাটা ইউনিভার্সিটির লাগোয়া ফুটপাথের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে খুঁজে পেয়েছিলাম সেই পুরনো পূজাবার্ষিকীটা। হাতে পেয়েই ফের পড়ে শেষ করেছিলাম "মা এক নির্ভীক সৈনিক"। ছেলেবেলায় ভালো লাগা অনেক উপন্যাস এখন পড়লে মনে হয়;  আগে যেমন ভালো লেগেছিল বটে, এখন যেন তেমনটা মনে হল না। কিন্তু শৈলেনবাবুর বেশির ভাগ উপন্যাসের ক্ষেত্রেই এ দুশ্চিন্তা খাটেনা৷ আর "মা এক নির্ভীক সৈনিক" আমার পরে পড়ে যেন আরও বেশি ভালো লেগেছিল। এই ধেড়ে বয়সেও গল্পটা যখনই পড়ি, মনে হয় যেন আরও একটু বেশি ভালো লাগল। "জল নয়, আগুন"; এ কথা যেন এ উপন্যাসের ক্ষেত্রে আরও বেশি করে খাটে। 

শৈলেনবাবুকে আমরা যথেষ্ট সমাদর করতে পেরেছি কি? সে হিসেব করার যোগ্যটা আমার নেই। তবে যে রূপকথাগুলো উনি রেখে গেছেন, বয়স নির্বিশেষে বাঙালি পাঠকের জন্য সে'গুলো অত্যন্ত জরুরী।

আর হ্যাঁ, যদি এই গল্পটা আপনাদের বইয়ের তাকের কোনও কোণায় পড়ে থাকে; তবে আজকে পড়ে ফেলতে পারেন৷ আমি সোফায় মায়ের পাশে বসে একবার পড়ে ফেললাম; কোহেন ও তার মায়ের গল্প। 

হ্যাপি মাদার্স ডে।