Saturday, May 9, 2020

পঁচিশে বৈশাখ আর নৈবেদ্য


আজ সারাদিন ফেসবুক ও ট্যুইটার রবিপ্রণামে ভরপুর। আঁকা, পাঠ, গান, নাচ থেকে কার্টুন পর্যন্ত; যোগ দিয়েছেন সব বয়সের মানুষ৷ আর এ'সব কিছু আমার যে কী ভালো লাগল। কত চেনা মানুষ হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে বসেছেন বা খালি গলায় গান ধরছেন, কত খোকাখুকু কী অপূর্ব ভাবে কবিতা আবৃত্তি করছে, ঘরের মধ্যে বা ছাতের ওপর হয়ত কেউ নেচেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে। 

এক সময় মনে হত; আমাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে গেলানোর একটা প্রবণতা আছে। হয়তো আছেও বা৷ কিন্তু এখন মনে হয় এই যে এত মানুষ সাহস করে গান গেয়ে উঠছেন, কবিতা পড়ছেন, ছবি আঁকছেন; সে সাহসের মূল্য অসীম। এবং সেই গাওয়া গান বা পাঠ করা কবিতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; সে সাহস খানিকটা যুগিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে কেউ দড়াম করে গাইতে বললে অনেকেরই অস্বস্তি হয়; দুম করে ওই ভাবে গাওয়া যায় না নাচা যায়? কিন্তু এই স্মার্টফোন আর ফেসবুক/ট্যুইটার গোছের প্ল্যাটফর্ম মিলেমিশে; ব্যাক্তিগত স্পেস আর এক্সপোজার ব্যালেন্স করে একটা চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে।  

ফেসবুক জমানার আগে জানতাম পাড়ার স্টেজে বসে হারমোনিয়াম বাজাতে যে পারবে না তাঁর গান পাতে দেওয়া চলে না; রবিস্যারের গান হলে তো নয়ই। এখন সে ব্যাপারটা আমি একটু অন্যরকম ভাবে বুঝি। আমি ছাই গানবাজনার কিছুই তো বুঝি না। কিন্তু এ'টুকু বেশ টের পাই যে একজন মানুষ ভালোবেসে গান গাইছেন; এই গোটা ব্যাপারটা চাক্ষুষ করার মধ্যেও রয়েছে একটা দুর্দান্ত থ্রিল। নাচের ন'টুকুও  বুঝি না, কিন্তু এক ছোট্টখুকি তাঁর দিদিমার সঙ্গে ফুলে ফুলে ঢলে চলেছে; তার সৌন্দর্য বর্ণনা করার ক্ষমতা থাকলে আমি নভেলিস্ট হতাম।   এ দিনটা ফেসবুকে এমনভাবে ডালপালা বিস্তার না করলে জানতেই পারতাম না পাড়ার খিটখিটে জ্যেঠু হারমোনিয়ামের সামনে বসলে পান্তুয়া মেজাজের সলজ্জ মিঠে হাসি আবিষ্কার করে ফেলেন। 

মোদ্দা কথা হল, আজ গোটদিন ফেসবুক দারুণভাবে সরগরম ছিল। পরনিন্দায় নয়, গায়ে ফোস্কা ফেলা সারকাজমে নয়, 'তুমি রাস্কেল তোমার গুষ্ঠি রাস্কেল' গোছের ভার্চুয়াল কলারটানা ঝগড়ায় নয়; সে সরগরম নাচে, গানে আর কবিতায়। শিল্পীদের অনেকেই তুরীয়, তাঁদের তাক করে আমার মত নন-সমঝদারের ছুঁড়ে দেওয়া 'কেয়াবাত'টুকু প্রায় ধৃষ্টতা। কিন্তু এমন অনেকে আছেন যাদের হয়ত পাড়ার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় স্টেজে ওঠা হয়নি কিন্তু গান, কবিতা বা নাচের প্রতি তাঁদের অপত্য ভালোবাসাটুকু আছে। আর আছেন রবীন্দ্রনাথ৷ রবিস্যারের লেখা কতটা গুলে খেলে তাঁকে চেনা যায়? আমি রবীন্দ্রনাথ এতটাই কম পড়েছি যে সে ফর্মুলা নিয়ে দু'কথা বলার সাহস আমার নেই। তবে বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যে মানুষটা রবিস্যারের গান আনমনে গুনগুন করতে গিয়ে বুকে আরামবোধ করেন; রবীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর অধিকার কোনও কালচারজ্যেঠুর চেয়ে কম হওয়া উচিৎ নয়।

যে'টা আগেও বলেছি। সোশ্যাল মিডিয়ে মানুষকে প্রাইভেট স্পেস আর এক্সপোজার মিলিয়ে একটা চমৎকার 'আউটলেট' তৈরি করে দিয়েছে তা অনস্বীকার্য ( নয়ত আমার মত দড়কচা মারা মানুষ এতগুলো লাইন লেখার সাহস পেত কী করে)। আবার সেই সাহসে ভর দিয়েই কত পরিচিত আর অপরিচিত মানুষের গান, নাচ ও আবৃত্তি আজ আমার টাইমলাইনে ভেসে আসছে। এবং আমি বারবার মুগ্ধ হচ্ছি, স্যালুট করছি রবীন্দ্রনাথকে। আমার টাইমলাইনে যারা রবীন্দ্র-প্রণাম ভাসিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ;  চারদিকে এত মনখারাপ আর অন্ধকার সত্ত্বেও আপনারা আজ আমায় ভালো রেখেছেন।

Friday, May 8, 2020

মগজে নতুন চুটকি

কোনও জোক বা চুটকি যখন প্রথম মাথার মধ্যে এসে দাঁড়ায় তখন তাকে মনে হয় উত্তমকুমার। স্যুটবুট পরে, শর্মিলা ঝলসানো হাসি হেসে; সে কলম ঝাঁকিয়ে অটোগ্রাফ দেবে। অথবা মোটরবাইকে-সুচিত্রা-বইতে-পারা কনিফেডেন্স নিয়ে বিশ্বজয় করবে। মনে হয়; 
বাহ্, এই চুটকিটার জন্যই তো এদ্দিন বসেছিলাম। এই তো সেই জোক যা ইন্টেলেক্টে অঞ্জনবাবুর দাড়ি চুলকে দেবে,
অথচ শিব্রাম মার্কা ইম্প্যাক্টে চুটকি শুননে-ওয়ালারা হেসে গড়াগড়ি যাবে। এই তো সেই জোক যা শুনে একদিকে পাড়ার ফক্কর বন্ধু নিজের টিউশনির টাকা দিয়ে প্রেমিকাকে পারফিউম কিনে না দিয়ে আমায় ওল্ডমঙ্কের বোতল উপহার দেবে আর অন্যদিকে বাবা বাহবা জানিয়ে  বলবে "বারো ঘণ্টা পর যখন আমার হাসি থামবে, তখন বেরোব তোর জন্য মাটন আনতে"। সে চুটকি অ্যাইসা ভাইরাল হবে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকোকে বিবেকামুণ্ডম গোছের কিছু ধমক দেওয়ার আগে সে চুটকি 'ক্র‍্যাক' করবেন। আবার সে ঠাট্টা এতটাই লিটলম্যাগিও গভীর হবে যে তা নিয়ে ঝাড়া আড়াইমাস কফিহাউস সরগরম থাকবে। 

মোদ্দা কথা হল কোনও নতুন চুটকিটা যতক্ষণ নিজের মাথার ভিতর থাকে, মনে হয় " কেয়াবাত, গালিবদা! কেয়াবাত"।

কিন্তু মগজের মধ্য থেকে সে চুটকি যেই গুটিগুটি পায় বেরিয়ে আসে অমনি ফুলকো লুচির পেটে জলকামান। 

বুক হিম হয়ে আসে যখন বুঝতে পারি মাথার ভিতরে যে চুটকি উত্তমকুমারিও ঘ্যাম নিয়ে ঘুরছিল, আসরে নামার পর সে আদতে ঢ্যাঁড়সশ্রী। ইন্টেলেকচুয়ালরা সে চুটকি শুনলে মোগলাই পরোটায় ব্রকোলি মার্কা ওয়াক তুলবেন। আর সে চুটকি শুনে অনেকেই ফলিডল ফ্লেভারের লস্যি খুঁজে হন্যে হবেন; শিব্রামাইজড হাসি তো দূরের কথা। 

চুটকিটা বলার পর টের পাওয়া যায় মাখাসন্দেশ নামাতে গিয়ে ঝুলি থেকে এক ঠোঙা আরডিএক্স বের করে ফেলেছি; চারদিকে হাহাকার। বন্ধুরা সে জোক শুনলে যে ত্যাজ্যবন্ধু করতে পারে, সেই সম্ভাবনা জোকটা মুখ ফসকে বলে ফেলার পরেই মাথায় আসে, আগে নয়। আর সে চুটকি বাপের কানে উঠলে নিজের পিঠের চামড়া দিয়ে তৈরি ফোলিওব্যাগে নিজের প্রায়-ফেল-করা মার্কশিটগুলো ফাইল করে রাখতে হবে। 

মাথার ভিতরে উদয় হওয়া নতুন চুটকির হম্বিতম্বিতে সহজে বিশ্বাস করবেন না। জনসমক্ষে সে চুটকি আপনার নাকের কিমা-চচ্চড়ি তৈরি করবে না; এমন গ্যারেন্টি স্বয়ং ঈশ্বর কেন, গভর্নমেন্টও দিতে পারবেন না।

Monday, May 4, 2020

ভাড়া

- আরে শিবু নাকি?

- আজ্ঞে।

- আরে থাক থাক থাক, রাস্তাঘাটে আবার প্রণাম করা কেন।

- না করবেন নায়েবমশাই। না করবেন না। পায়ের ধুলোটুকু অন্তত নিতে দিন। আপনাকে যে আমি কী বলে...।

- আহা, আমায় কিছু বলতে যাবেই বা কেন। চলো, বেলা বাড়ছে। স্টীমারে উঠি চলো গিয়ে।

- নায়েবমশাই, আপনি আমাদের উদ্ধার না করলে আমরা ভেসে যেতাম। এই অসময়ে আপনি দেবদূতের মত আমাদের পাশে এসে না দাঁড়ালে...।

- দ্যাখো শিবু। আমি তো মাইনে করা চাকর মাত্র। তবে হ্যাঁ, পেন্নাম যদি ঠুকতেই হয়; তবে ঠোকো জমিদার মশাইয়ের নামে।

- জমিদারমশাইয়ের জন্য জান কবুল নায়েবমশাই। এদ্দিন আমরা ভাবতাম মানুষটা বড় কঠিন..কিন্তু তাঁর মধ্যে যে এত মায়া..।

- নারকেল দেখেছ তো শিবু? নারকেল? তার বাইরেটা কেমন।বিশ্রী  ছিবড়ে?  আমাদের জমিদারমশাইও ঠিক তেমনি। বাইরেটা যতই শুকনো হোক, তাকে একটু বাজিয়ে দেখলেই জলের নড়াচড়া টের পাবে। 

-  তা তো বটেই। নইলে গরীবমানুষের জন্য এতটা কেউ করে?

- যবে থেকে জমিদারবাবুর কানে উঠেছে যে নদীর ও'পারে হরিহরপুর গাঁয়ে মড়ক লেগেছে; অমনি তাঁর ঘুম হাওয়া। বারবার শুধু পায়চারি করছেন আর শুধোচ্ছেন "নায়েব, আমার ফুলপুর গাঁয়ের অনেক মানুষ ওই হরিহরপুরের ইটভাটায় কাজ করে না? সে গায়ে মড়ক লেগেছে, এই অসময়ে আমি উদ্ধার না করলে তাঁদের দেখবে কে বলো"।

- দেবতা, সাক্ষাৎ দেবতা।

- আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম; "জমিদারমশাই, আপনার দুশ্চিন্তা অমূলক নয়। কিন্তু এ গাঁয়ের অন্তত শ'খানেক লোক সে ইটভাটায় খাটে৷ এই ভরা বর্ষায়, ছোটখাটো ডিঙিনৌকার ভরসায় এতগুলো মানুষকে নদী পারাপার করাবেন কী করে"? তা শুনে জমিদার মশাই আমায় চোপা কী করে বললেন জান?

- কী বললেন তিনি আজ্ঞে?

- বললেন, "শোনো নায়েব, এ গাঁয়ের প্রতিটি মানুষ আমার সন্তান। আমার অতগুলো জোয়ান ছেলেপিলে ভীনগাঁয়ের মড়কে উজার হয়ে যাবে আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব? রাধামাধব আমায় ক্ষমা করবেন তা'হলে? তুমি শোনো, তুমি এখুনি স্টীমারের ব্যবস্থা করো। আমি তাদের স্টীমারে করে গাঁয়ে ফেরত আনব"।

- মাটির মানুষ আমাদের জমিদারবাবু। 

- কিন্তু আমি যে সেরেস্তার হিসেবকিতেব নিয়ে থাকা কেঠো মানুষ, ফের বুঝিয়ে বললাম; "আপনারএস্টেটের খান দুয়েক স্টিমার আছে বটে। কিন্তু তা দিয়ে রোজ জুটমিলে সাপ্লাই যায়। সে স্টিমার দিয়ে একটা গোটা দিন মানুষ বওয়ালে যে প্রচুর টাকা নষ্ট"৷ কিন্তু ওই, কে শোনে কার কথা। আমায় কী হুকুম করলেন জানো শিবু?

- কী বললেন তিনি কত্তা। 

- বললেন " নায়েব, আমার সন্তানরা কষ্টে আছে। এ সময় আমি জুটমিলের সাপ্লাই নিয়ে ভাবব? রাধামাধব রাধামাধব! শোনো, তুমি কাল ভোরে নিজে স্টিমার নিয়ে গিয়ে হরিহরপুরের ঘাটে গিয়ে দাঁড়াবে। আর হরিহরপুরের ইটভাটায় এ গাঁয়ের যত লোক কাজ করে, তাদের সব্বাইকে স্টিমারে তুলে, তবে ফিরবে"। 

- আর ক'দিন থাকলেই মড়ক আমাদেরও ছুঁয়ে ফেলত নায়েবমশাই। জমিদারমশাইয়ের অসীম কৃপা যে এ অসময়ে স্টিমার পাঠিয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচালেন। নয়ত আমাদের পরিবারগুলো নয়ত সবই ভেসে যেত৷ আমরা তো গাঁয়ে ফেরার জন্য কম চেষ্টা করিনি, কিন্তু  মড়কের গাঁয়ে আমাদের বাস বলে কোনও ফেরিনৌকাই আমাদের নিতে চায়না। আপনার মধুকে মনে পড়ে নায়েবমশাই?

- মধু...যার বাপ ঘরামী ছিল?

- আজ্ঞে। তা সে বেচারা দুশ্চিন্তায় পাগল হয়ে ভরা নদী সাঁতরে পেরোনোর তাল করলে। এই গেল হপ্তায়। যা হওয়ার হল,বেলা ফুরোনোর আগেই তাঁর দেহ ভেসে উঠল এই ঘাটের কাছেই।

- ইশ। দ্যাখো দেখি, গণ্ডমূর্খ আর কাকে বলে। জমিদারমশাই শুনলে ভারী ব্যথা পাবেন যে। যা হোক। যার যেমন কপাল। 

- তা ঠিকই বলেছেন নায়েব মশাই। আচ্ছা, স্টিমার বিকেলের মধ্যে ফুলপুর ঘাট পৌঁছে যাবে। তাই না?

- তা যাবে। কেন বল দেখি?

- আজ হাটবার, না? সন্ধ্যের আগে পৌঁছলে ঘাটের হাট থেকে খোকার জন্য দু'টো জামা কিনতাম। আর বৌটার জন্য হাঁড়ি খুন্তিও যদি..। 

- রস আর রসদ, তোমার দুইই আছে দেখছি শিবু

- হেহহে, ওই আর কী। আধপেটা খেয়ে টাকা জমাই, যাতে গাঁয়ে ফিরে চালডাল ছাড়াও সামান্য কিছু..। ছেলেবৌকে তো কিছুই তেমন দিতে পারিনা নায়েবমশাই। তবে হাতে ওই এ'বারে সতেরো টাকা মত জমেছে। হাট থেকে তাই..। আর তাছাড়া, একটা জরুরী ওষুধও এ'বারে নিয়ে নেব ভাবছি। ওই ঘাটের কাছের রস সাহেব ডিসপেনসারি থেকে এ'বার কিনে নেব'খন।

- ওষুধ?

- ওই, বেশ কিছুদিন হল আমার মাঝেমধ্যে শ্বাস আটকে আসে, চোখে অন্ধকার দেখি। আর বুকে সারাক্ষণ একটা বিচ্ছিরি জ্বালা জ্বালা ভাব। জ্বালাটা অম্বলের নয় তাও বুঝি, আরও গোলমেলে কিছু যেন। তা ছ'মাস আগে গঞ্জের এক ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন, যে ওষুধ মাস তিনেক খেলেই নাকি ও'সব অসুবিধে কেটে যাবে। 

- তা এদ্দিন সে ওষুধ খাওনি কেন?

- আজ্ঞে, এ ইটভাটা সর্বস্ব পাড়াগাঁয়ে রস সাহেবের ডিসপেনসারি কোথায় পাই বলুন। আর সে'সব যে দামী ওষুধ।  যখন দেখলাম টাকা কিছুটা জমেছে তখন থেকে আর ফুলপুরে ফেরাও হয়নি। তাই ভাবছি সুযোগ যখন পেয়েছি তখন হাটের থেকে কেনাকাটা করে চলে যাব রস সাহেবের ডিসপেনসারিতে।  সে'খান থেকে ওষুধ নিয়ে তারপর বাড়ি।

- বাহ্, মড়কে বাস করেও বাবুর শখে জং পড়েনি।

- হেহহেহহে।

- আর দেরী নয়, স্টীমারে উঠে একটু আয়েশ করে বসো তো দেখি শিবু।

- যেয়াজ্ঞে।

- আর শিবু, শোনো। ভাড়াটা আমায় দিয়ে তারপর স্টীমারে উঠো, কেমন?

- আজ্ঞে?

- ফ্যালফ্যাল করে দেখছ কী৷ ভাড়া! ভাড়া! ভাড়াটা আমায় দিয়ে তারপর স্টীমারে উঠো।

- কিন্তু নায়েবমশাই..ভাড়া? ভাড়া লাগবে?

- দ্যাখো কাণ্ড,ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য তুমিও ওই মধু পাগলার মত সাঁতরে ফেরার তাল করছ না তো? হা হা হা হা হা।

- কত?

- ভাড়া? ও সামান্যই। পাঁচ টাকা মাত্র।

- পাঁচ টাকা? কী বলছেন কী নায়েবমশাই৷ ফেরিনৌকা নেয় চার আনা।

- তা'হলে তুমি।ফেরিনৌকাই খুঁজে নিও শিবু৷ খামোখা স্টীমারে ওঠার শখ হয়েছে কেন? 

- পাঁচ টাকা ভাড়া দেব আমরা? অত টাকা দেওয়ার মুরোদ কি আমাদের আছে নায়েবমশাই?

- হাটে ঘুরে কেনাকাটি করার শখ আছে৷ জমিদারের স্টীমারে গা এলিয়ে নদীর হাওয়া খাওয়ার ধক আছে। কিন্তু সামান্য পাঁচ টাকা ভাড়ার কথা শুনলেই বাবুদের গলা শুকিয়ে কাঠ। বলি, জমিদারমশাই কি স্টীমারখামা মাগনা খাটাবেন? একদিন জুটমিলের সাপ্লাই বন্ধ মানে কতটাকার লোকসান জানো? তিনশো টাকা। চোখে দেখেছ অত টাকা কোনওদিন? দেখোনি। কিন্তু জমিদারমশাই সে'সব লোকসান গায়ে না মেখে স্টীমার পাঠিয়েছেন তোমাদের দুঃসময়ে উপকার করতে৷ আর এই তার প্রতিদান? ভাড়া দেওয়ার বেলায় গায়ে ফোস্কা?

- কিন্তু অতগুলো টাকা...।

- খোকার জন্য জোড়া জামা, বৌয়ের জন্য নতুন হাঁড়ি-কড়াই; বাহা। বাহ্ বাহ্ বাহ্। এ'দিকে জমিদারের বাড়িতে সিঁদ কাটার ইচ্ছে। তোমার লজ্জা করে না শিবু? কই, তোমার আগে এতজন যে স্টীমারে এসে বসলে; তাঁরা তো অকারণ চেল্লামেল্লি করেনি। বাজে কথায় নষ্ট করার মত সময় আমার নেই৷ স্টীমার ছাড়ার সময় হল৷ ভাড়া দিতে না চাইলে ওই মড়কের গাঁয়ে ফেরত যাওগে, আমার মাথা খেওনা।

***

- হ্যাঁ গো..।

- ঘুমোওনি বৌ?

- তুমিও তো ঘুমোওনি।

- কিছু বলবে?

- খোকার জন্য দু'টো জামা আনলে। আমার জন্য নতুন হাঁড়ি, হাতা,খুন্তি৷ আর এতগুলো চুড়ি। কত খরচ হল বলো..।

- ধুস, ইটভাটায় পয়সা উড়ছে গো বৌ৷ পয়সা উড়ছে। হাতে বেশ ক'পয়সা জমেছিল। তাই ভাবলাম...তা, খোকার বেশ মনে ধরেছে জামা দু'টো, তাই না?

- খুব। সেই যে দু'টো জামা একসঙ্গে গায়ে চাপালো, ঘুমের মধ্যেও খুলতে দিচ্ছে না। পাগল।

- চুড়িগুলো তোমার পছন্দ হয়েছে বৌ?

- খুউব। হ্যাঁগো, এত খরচ করলে...তোমার সেই ওষুধ আনলে না?

- ওষুধ?

- ওই যে গো..তুমি বলতে না। হঠাৎ করে শ্বাস আটকে আসে, বুক জ্বালা, চোখে অন্ধকার...। গঞ্জের হাসপাতালের ডাক্তার তোমার বুকে যন্তর দিয়ে দেখেশুনে কী'সব দামী ওষুধ লিখে দিলে। তুমি বললে টাকা জমলেই সে'সব ওষুধ কিনে আনবে...।

- ওহ হো, বাবাজীর ব্যাপারটা তোমায় বলাই হয়নি, তাই না?

- বাবাজী? কী ব্যাপার?

- হপ্তাখানেক আগের ঘটনা বুঝলে। আমাদের হরিহরপুরের ইটভাটার আস্তানায় এক বাবাজী এসে হাজির হলেন; এক্কেবারে সোজা হিমালয় থেকে পায়ে হেঁটে হরিহরপুর।

- সোজা হিমালয় থেকে?

- তবে আর বলছি কী বৌ। চেহারায় যেমন তেজ, চোখে তেমনি মায়া। তা সে বাবাজী তো একরাত আমার ঝুপড়িতেই কাটালেন। আমার বানানো রুটি আর ডাল খেয়ে খুব খুশি হলেন। রাতে গল্পের ছলে তাঁকে আমার অসুখের কথাটা বললাম৷ বাবাজী শুনেই নিজের ঝুলি থেকে কী একটা শিকড় বের করে বললেন সে'টাকে তুলসীপাতা সঙ্গে বেটে খেয়ে নিতে। 

- তারপর?

- আমি বাবাজীর কথা মত খেয়ে নিলাম। সত্যিই ধন্বন্তরি৷ ওই এক দাগেই আমার বুক জ্বালা, শ্বাসের কষ্ট এক্কেবারে গায়েব।

- এক্কেবারে? আমার গা ছুঁয়ে বলো।

- গা ছুঁয়েই তো আছি। তোমায় কি আমি কোনওদিন মিছে কথা বলেছি গো বৌ?

আ গোল্ডেন এজঃ রেহানার মুক্তি ও যুদ্ধ

থার্ড রাইখের ওপর শিরার সাহেবের পাহাড়প্রমাণ (এবং গুরুত্বপূর্ণ) বইটা পড়ার বেশ কিছুদিন পর পড়েছিলাম 'দ্য বুক থীফ'। প্রথম বইটা জরুরী ঐতিহাসিক দলিল। পরেরটা সে ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা কাল্পনিক উপন্যাস; এক বইচোর খুকির গল্প। ইতিহাস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু ইতিহাসের চাকা ঘোরে মূলত তারিখে,  সংখ্যায়, স্মৃতিফলকে এবং রাজনৈতিক মতবাদের হাওয়ায়। এ'টা ইতিহাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয় মোটেও; তথ্য ও যুক্তিনির্ভর না হয়ে ইতিহাসের উপায় নেই৷ কিন্তু মানুষের গল্প শুধু তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বাঁধা অসম্ভব। মানুষের খিদের গল্প শুধু মন্বন্তরে মৃতের সংখ্যা বা শাসকের শয়তানি বা প্রতিবাদি জনতার প্রতিঘাতের খবর জানিয়ে শেষ হয়ে যায়না। তবে সেই পুরো গল্পটা বলার দায় ইতিহাসের নয়, সম্ভবও নয়। নিজের পাতের খাবার পাশের বাড়ির অভুক্ত শিশুর জন্য সরিয়ে রাখা গৃহিণীর গল্প জমিয়ে রাখার পরিসর ইতিহাসের বইতে নেই৷ পকেটে পিস্তল নিয়ে ঘোরা কোনও অকুতোভয় তরুণ বিপ্লবী যখন  পুরনো চিঠির গন্ধ শুঁকে বারুদের গন্ধ ভুলতে চেষ্টা করে, সে ব্যাপারটা কোনও দস্তাবেজে লিখে রাখা চলেনা। গৃহযুদ্ধে বাপ হারানো ছোট্ট খোকার ফ্যালফ্যালে চোখে শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার গল্প নিয়ে পড়ে থাকলে ইতিহাসের এগোতে পারে না। 

আর সে'খানেই প্রয়োজন সেই ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা গল্প-উপন্যাসের। এমন গল্প যা ঐতিহাসিক সত্যের গণ্ডির মধ্যে দাঁড়িয়ে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর 'হেডকাউন্ট' ছাপিয়ে; গেরস্তের হেঁশেল থেকে ভেসে আসা ভাতেভাতের গন্ধ খুঁজে নেবে। লেখকের হিসেব-কষা কল্পনায় সেই গেরস্থালীর হিসেবকিতেব বোঝাটাও বোধ সামগ্রিকভাবে ইতিহাসকে চেনার জন্য জরুরী। 

আর সে'খানেই তাহমিমা আনমের লেখা "দ্য গোল্ডেন এজ" বইটা আমার মনে ধরেছে। লেখিকার একটা সাক্ষাৎকারে শুনলাম যে'খানে তিনি বলছেন যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নিজের রিসার্চের ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা প্রামাণ্য বই লেখার; অথচ লিখতে লিখতে সে বইয়ের মূল বিষয় হয়ে উঠল মুক্তিযুদ্ধের আবহে লালিত হওয়া কিছু মানুষ ও তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসার সম্পর্কগুলো। অথচ ইতিহাসের নিরিখে এ বইয়ের মোটেও গুরুত্বহীন নয়। 

উপন্যাসের শুরু সদ্য স্বাধীন হওয়া পূর্ব পাকিস্তানে, শেষ ১৯৭১য়ের ডিসেম্বরে; বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ দিয়ে। আর গোটা উপন্যাস দাঁড়িয়ে রেহানা হকের  পয়েন্ট অফ ভ্যিউতে৷ বাংলা ভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তান; এ দু'টোই রেহানা পেয়েছেন (এবং ক্রমশ জড়িয়ে ধরেছেন) বিয়ের সূত্রে। জন্মসূত্রে রেহানা উর্দুভাষী এবং কলকাতার মানুষ; কাজেই তাঁর বাংলাদেশকে জড়িয়ে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধে সামিল হওয়ার গল্পটা শুধু জন্মগতভাবে পাওয়া ইডিওলজি আউড়ে নয়। এবং সে'কারণেই; রেহানার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে মুক্তিযুদ্ধে সামিল হওয়ার গল্প শোনাটা পাঠকের কাছে একটা অনন্য অভিজ্ঞতা। 

স্বামীহারা রেহানার যাবতীয় মুক্তি ও যুদ্ধ তাঁর দুই সন্তানকে ঘিরে। তাঁদের আঁকড়ে ধরেই নিজেকে চিনেছেন রেহানা। প্রয়োজনে নিজেকে ভেঙেছেন, তারপরে আবার নতুন ভাবে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি; সবটুকুই তাঁর ছেলে সোহেল ও মেয়ে মায়াকে ঘিরে। নিজের দেশ কী ও কোথায়, এ প্রশ্নের উত্তরটুকুও রেহানা খুঁজে নিয়েছেন সোহেল ও মায়ার মধ্যে দিয়ে। "দেশ বা ভাষা মানেই মা আর সে মায়ের জন্য প্রাণপাত করা যায়"; এই চিরকালীন ফর্মুলাকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার করে এক অন্য ভালোবাসার গল্প বুনেছেন রেহানা। সন্তানের জন্য প্রাণপাত করা মা হিসেবে বাংলাদেশকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন তিনি; সে'টাই তাঁর মুক্তিযুদ্ধ৷ এবং রেহানার মত মানুষের ভালোবাসা যে দেশের জন্য কত জরুরী, সে'টাও এ উপন্যাসে বেশ টের পাওয়া যায়।  রেহানাদের আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প ইতিহাসের বইতে আঁটবে কেন? ঐতিহাসিক উপন্যাস ছাড়া গতি নেই।

আর একটা জায়গায় লেখিকার রিসার্চ এ বইকে সমৃদ্ধ করেছে; সে সময়ের ঢাকা ও সে শহরের বর্ণগন্ধকে সুন্দরভাবে নিজের লেখায় ধরেছেন তিনি। আমি ঢাকায় যাইনি কোনওদিন। তবে ধানমণ্ডি বা গুলশন গোছের নামগুলো মাঝেসাঝে পড়েছি বা শুনেছি। কিন্তু এই উপন্যাস পড়ে যেন মনে হচ্ছে যে জায়গাগুলো একবার ঘুরে না এলেই না। না না, ভৌগোলিক ডিটেলিং তেমন নেই এ লেখায়; তবে ওই জায়গাগুলোকে কেন্দ্র করে বহু ছোটছোট ঘটনার এমন সুন্দর করে গোটা বইতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে বইটা শেষ করার পর মনে হচ্ছে যেন জায়গাগুলো যেন আর পাঁচটা চেনা শহুরে পাড়ার মতই। তাছাড়া জবাকুসুম তেলের সুবাস থেকে  বিরিয়ানি হয়ে ইলিশ বা ডাল-বেগুনভাজার চনমন ও পাড়ার আড্ডার অত্যন্ত সুরসিক বর্ণনা এ বইতে রয়েছে। ডিটেলিংয়ে কিছু খুচরো খুঁত যে নেই তা হলফ করে বলতে পারি না৷ তবে পড়তে গিয়ে সুর কাটবে, তেমন কিছু গলদ আমার অন্তত নজরে পড়েনি।  

দু'টো কথা বলে শেষ করি। 

এক।
আমি এ বই অডিওবুক হিসেবে শুনলাম। মধুর জাফরির কণ্ঠে রেহানার গল্প শুনতে চমৎকার লাগল। বিশেষত এ উপন্যাসে এ'দিক ও'দিক ছড়িয়ে থাকা বাংলা শব্দগুলো দিব্যি উচ্চারণ করেছেন তিনি।

দুই।
কোনও গল্পের বই পড়ে ভালো লাগলে তা নিয়ে দু'চার কথা চট করে লিখে ফেলবার পিছমে একটা গুরুতর কারণ আছে। সে লেখা পড়ে দু'একজন যেমন সে বই উল্টেপাল্টে দেখতে চাইতে পারেন, তেমনই সহৃদয় কেউ সে লেখার সূত্র ধরেই হয়ত আমায় অন্য ভালো বইয়ের খবর দেবেন। ওই হল গিয়ে আমার আখেরে লাভ৷ 'নেমসেক' নিয়ে দু'দিন আগে সাহস করে দু'চার কথা লিখেছিলাম। সে'টা পড়ে এক দাদা বললেন "তাহমিমা আনমের দ্য গোল্ডেন এজ বইটা পড়েছ ভায়া"? 
পড়া ছিল না, পড়ে নিলাম; একেই বলে মুনাফা। 

পুনশ্চ: এই বইটি একটা ট্রিলোজির প্রথম অংশ।

Friday, May 1, 2020

অশোক ও অসীমা

১।

উপন্যাস থেকে তৈরি হওয়া সিনেমা।
এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত থাম্বরুল হল আগে উপন্যাসটা পড়ে তারপর সিনেমায় পৌঁছনো। উপন্যাসের 'ডিটেলিং' স্বাভাবিক ভাবেই সিনেমার স্ক্রিনে ঘণ্টা দুই-আড়াইয়ের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা সহজ নয়৷ তাছাড়া উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহকে কিছুটা কাটছাঁট না করে সিনেমার ফ্রেমে বসানো মুশকিল।  তার মানে এই নয় যে গুরুত্বের দিক দিয়ে সাহিত্য সবসময়ই সাহিত্য-নির্ভর সিনেমার ওপরে থাকবে। এডিটিং আর নির্দেশনার গুণে সিনেমা যে স্বতন্ত্র হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে তেমন উদাহরণ যে অজস্র আছে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।  সিনেফাইলরা সে বিষয়ে আরও বিশদে বলতে পারবেন৷ কিন্তু ওই, আমার বরাবরই মনে হয় যে ভালো লাগা বই থেকে তৈরি হওয়া সিনেমা যতটা সাগ্রহে দেখা যায়, সে সিনেমা আগে দেখে প্লটের নির্যাস বুঝে নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করা অনেক বেশি কঠিন।

ঝুম্পা লাহিড়ীর 'নেমসেক' বইটা আমি সংগ্রহ করি নেমসেক সিনেমার বিভিন্ন ছবি দেখে। দু'টো ছবি আমায় বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করে;
 
এক। যে'খানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে একগাল হাসি নিয়ে ইরফান দাঁড়িয়ে, পাশে টাবু। টাবুর মাথা ঝুঁকে পড়েছে ইরফানের কাঁধে।

দুই। টাবু আর ইরফান কোনও এক মার্কিন শহরের পটভূমিতে। টাবুর কোলে শিশু, ইরফানের হাতে ফুলের বোকে। আমেরিকা বাদ দিলে; এ ধরণের ছবি বোধ হয় একসময় প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাঙালির অ্যালবামে থাকত। 

বইটা পড়া বা সিনেমাটা দেখার আগেই বিভিন্ন রিভ্যিউয়ের মাধ্যমে জেনেছিলাম যে সিনেমায় টাবু রয়েছেন অসীমার চরিত্রে আর ইরফান হয়েছেন অশোক। কাজেই নেমসেক পড়তে শুরু করার আগেই আমার মনের মধ্যে স্পষ্ট ছিল যে এই বইয়ের মূল দু'টো চরিত্র ঠিক কেমন দেখতে বা তাঁদের কণ্ঠস্বর ঠিক কেমন। আমি সিনেমাটা দেখার আগেই, উপন্যাসের প্রতিটি পাতাকে অনুভব করেছি ইরফান খানের অশোক  আর টাবুর অসীমার মধ্যে দিয়ে। 
এবং আমি হলফ করে বলতে পারি; অশোক ইরফান গাঙ্গুলি আর অসীমা টাবু গাঙ্গুলির উষ্ণতায় ভর দিয়ে আমার উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতাটা আরও গভীর উঠেছে। 

বইটা পড়ার পর; সিনেমায় আমি যখন অশোক আর অসীমাকে স্ক্রিনে দেখেছি, চরিত্রেগুলোর পিছনে থাকা অভিনেতাদের নাম কিন্তু একবারও মাথায় আসেনি।

২।
'নেমসেক' উপন্যাসটি মন্থর কিন্তু ক্লান্তিকর নয়; বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে আলপনার মত সুন্দর।  প্রবাসী বাঙালি জীবনের খুঁটিনাটির আড়ালে অশোক আর অসীমা স্পষ্ট হয়ে উঠেছেন, ক্রমশ বেরিয়ে এসেছেন খোলসের মধ্যে থেকে। ষাট-সত্তরের দশক থেকে তুলে আনা মধ্যবিত্ত বাঙালির 'সিগনেচার ক্লিশে'গুলো ঝরঝরে ভাষার গুণে বড় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে; অশোক আর অসীমার নতুন সংসারের ছবি যেন আমাদের পুরোনো ছবির অ্যালবামের কোনও এক কোণে সহজেই সাঁটা থাকতে পারে। প্রবাসে থাকলে যে কোনও মানুষই নিজের দেশে থেকে বয়ে আনা ছোটোখাটো বর্ণগন্ধগুলোকেও যে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চাইবেন; সে'টাই স্বাভাবিক।  তাছাড়া ইন্টারনেটের যুগে আমরা অনেকেই দু'শো মাইল আর আড়াই হাজার মাইলের মধ্যে বিশেষ তফাৎ দেখতে পাইনি; ষাট-সত্তরের দশকে ব্যাপারটা ছিল অন্যরকম।

অসীমা আর অশোকের কোনও 'রীতিমতো নভেল' গোছের আঙুলে আঙুল ছোঁয়ানো ভালোবাসা আবিষ্কারের মুহূর্ত নেই৷ দৈনন্দিন জীবনের জট ছাড়াতে ছাড়াতে তাঁরা নিজেদের অজান্তেই একে অপরে জাপটে ধরেছেন। তাঁদের কাছে আসার প্রসেসটা হয়ত ঠিক সেই অর্থে সিনেম্যাটিক নয়। আমাদের স্মৃতিতে কিছু মুহূর্ত উজ্জ্বল হয়ে থাকে বটে কিন্তু যে অসংখ্য আটপৌরে সাদামাটা মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে গিয়ে দু'জন মানুষ একে অপরকে চিনতে শুরু করে, ভালোবেসে আপন করে নয়; সেই সাদামাটা দিনপঞ্জির মাধ্যমেই অশোক আর অসীমার কথা লিখেছেন ঝুম্পা। আর কী অপূর্ব সারল্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন এই দু'জন মানুষ ও তাঁদের স্নেহের সম্পর্ককে। 

আগেই বলেছি, সিনেমার পোস্টারে ইরফান আর টাবু আমায় এতটাই মুগ্ধ করেছিলেন যে অশোক আর অসীমার চরিত্র দু'টো আমার মনের মধ্যে একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছিল। 

আমার কাছে এই উপন্যাসের দু'টো ভাগ। এক, শুরু থেকে অশোক গাঙ্গুলির মৃত্যু পর্যন্ত। দুই, তারপরের অংশটুকু৷ আমার টান বেশি ওই প্রথম অংশটার প্রতি৷  

উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই রয়েছে অশোক অসীমার ছেলে গোগোল। কালপুরুষ সিনেমার শেষে দৃশ্যে বাবা আর ছেলের পাশাপাশি হাঁটার স্বপ্নালু দৃশ্যটা ভোলার নয়। 'নেমসেক' উপন্যাসের শেষে এসে গোগল নাগাল পেয়েছিল নিজের বাবা অশোক গাঙ্গুলি এবং অশোকের প্রিয় লেখক (এবং গোগলের 'নেমসেক') নিকোলাই গোগোলের।  কালপুরুষ সিনেমার সেই দৃশ্যটা বারবার মনে পড়ছিল এ উপন্যাসের শেষে। 

৩।
নেমসেক সিনেমাটা দেখায় আগেই উপন্যাসের অশোক ও অসীমা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ইরফান আর টাবু হয়ে। কাজেই সিনেমা দেখা শুরু করার পর ; উপন্যাসের চরিত্র আর সিনেমার অভিনেতাদের রিকনসাইল করতে আদৌ কোনও অসুবিধে হয়নি। সিনেমার একদম গোড়ার দিকে ইরফানের বাংলা উচ্চারণ কানে সামান্য খোঁচা দিয়েছিল বটে। কিন্তু সিনেমাটা শেষ করার পর ব্যক্তিগত ভাবে বলতে দ্বিধা নেই যে ইরফান ছাড়া অশোক গাঙ্গুলির কোনও অস্তিত্ব আমার মনে নেই৷ তাছাড়া সিনেমা চলাকালীন এক সময় মনে হয়েছিল উপন্যাসের যে অশোক, তাঁর তুলনায় সিনেমার অশোক যেন সামান্য বেশি প্রাণোচ্ছল, সে যেন একটু বেশি হাসতে পারে। সিনেমার শেষে দিব্যি টের পেয়েছিলাম যে অভিনেতা ইরফান আমার মত একজন মোটাদাগের পাঠককে বোঝতে পেরেছেন যে অশোক গাঙ্গুলির চাপা প্রাণোচ্ছলতাটুকুই তাঁর চরিত্রের মূলদিক৷ তারপর বইটার বিভিন্ন পাতায় ফেরত গিয়ে দেখেছি; প্রথমবার বইটা পড়ার সময় অশোককে যতটা চাপা মনে হয়েছিল, আদৌ সে ততটা নয়। সত্যিই, সিনেমাও পারে মূল উপন্যাসের পাঠককে সমৃদ্ধ করতে; ইরফানরা পারেন৷ 

অশোক গাঙ্গুলির অসময়ে চলে যাওয়াটুকু ওই ইরফানের মতই। প্রায় ইরফানেরই বয়সে। ভাগ্যিস ইরফান ছিলেন, নয়ত অশোক গাঙ্গুলিকে ভালো করে চেনাই হত না।

এবং শেষে যার কথা না বললেই নয়। টাবু। সিনেমায় পরিসর কম, উপন্যাসের মনকেমন করা অলস গতি সে'খানে চলে না। কোনও উপন্যাস ভালো লাগলে অনেক সময়ই মনে হয় যে সে উপন্যাস ভর দিয়ে বানানো সিনেমাটা যেন একটু হুটোপুটিতে কেটে গেল; কিছু জায়গায় 'নেমসেক'য়ের ক্ষেত্রেও সে'টাই মনে হয়েছে। সে'টাই স্বাভাবিক। 

কিন্তু টাবুর হাত ধরে অসীমা যে কী গভীর হয়ে উঠেছেন। অচেনা পাত্রের জুতোয় পা গলানো ছেলেমানুষি থেকে সদ্য পিতৃহারা ছেলেকে জাপটে বুকে টেনে নেওয়া সাহস; উপন্যাসের অসীমাকে ভালো করে চেনাও সেই টাবুর মাধ্যমে, ঠিক যেমনভাবে অশোককে পূর্ণতা দিয়েছেন ইরফান।