Thursday, November 14, 2019

ফারওয়ের চুরুট




দুম-দড়াম করে পড়ে গেলে চট করে সিরিজটা খতম হয়ে যাবে। কাজেই রয়েসয়ে পড়াটাই যুক্তিযুক্ত। তবু তর সয় না।

উজান বলেছে টিনটিনের ঘোরা জায়গাগুলোর একটা ফর্দ তৈরি করতে, দু'একটা জায়গায় যদি একসঙ্গে যাওয়াটাওয়া যায়। 'সিগারস অফ ফেরো' পড়ে ঠাহর হল এই প্ল্যানে একটা সমস্যা রয়েছে বটে; টিনটিনের অ্যাডভেঞ্চারগুলোয় রয়েছে প্রচুর কাল্পনিক সব জায়গার উল্লেখ। এই বইতে যেমন রয়েছে আরবের আবুদিন আর ভারতের সেথ্রু-জামজা রেলপথ বা গাইপাজামা নামের প্রিন্সলি-স্টেটের কথা।

তবে আদত শহরটহরের কথাও আছে; টিনটিন ইন আমেরিকায় শিকাগো বা এই বইতে পোর্ট সৈয়দ, কায়রো ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা হল; এই বইতে রয়েছে কলার খোসা ছড়ানো ভারতীয় রেল স্টেশনের ছবি; অমন 'রিয়েল', এবং গভীরভাবে 'নন-ফিকশনাল' জায়গার অভাব আমাদের দেশে আজও নেই। প্ল্যাটফর্মে কলার খোসা টিনটিন ছড়িয়েছিল দুশমনদের কাত করতে, আমরা ছড়াই যাতে ডাস্টবিনগুলো অকারণে ময়লা না হয়; ফারাক 'টুকুই।
টিনটিনের ক্যামিও-চরিত্রগুলোর মধ্যে আমার অন্যতম প্রিয় মানুষ; সেনর অলিভেইরা ডা ফিগুয়েউরা, এই বইতেই তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। 'আমাজন গ্রেট ইন্ডিয়ান সেল' তাঁর কাছে হপ্তায় দু'দিন টিউশনি পড়তে যায় আর 'ফ্লিপকার্ট বিগ বিলিয়ন ডে' তাঁর সামনে সহজ অঙ্ক ভুল করার জন্য নিয়মিত ওঠ-বস করে। প্রথম সাক্ষাতেই আড়াই গুদাম মাল টিনটিনের কাঁধে চাপিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। শুধু তাই নয়, টিনটিনও নিশ্চিন্ত হলে যে 'ভাগ্যিস 'সব বাতেলায় চমকে গিয়ে বেশি কিছু কিনে ফেলিনি'; অথচ টিনটিনের শপিং কার্ট তখন অজস্র অদরকারী জিনিসপত্রে উপচে পড়ছে। আমাজন ফ্লিপকার্ট গত একমাসের মধ্যে তিনটে 'সেল' অফার করেছে, আমিও নিশ্চিত যে আমি এদের বাতেলায় চমকে গিয়ে বেশি কিছু কিনে ফেলিনি; ট্র‍্যু পোয়েট্রি।

পুনশ্চঃ 

আজকাল মুজতবার পঞ্চতন্ত্র মাঝেমধ্যে র‍্যান্ডমলি পড়ে মন ফুরফুরে রাখছি। সে'খানেই রয়েছে; পোর্ট সৈয়দে জাহাজ থামলে কী ভাবে টুক করে কায়োরর কাছের পিরামিড দেখে ফের সেই জাহাজেই ফেরত আসা যায়। অ্যাডভেঞ্চারের টানে টিনটিনও জাহাজ থেকে নেমে ছুটে গেছিল কায়রোয় কাছাকাছি কিছু পিরামিডের আশেপাশে। মুজতবা সাহেব অবশ্য পিরামিড দেখে আপ্লুত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। টু কোট দ্য গ্রেট ম্যানঃ "এক গাদা পাথর দেখায় যে কী তত্ত্ব তা আমি পিরামিড দেখার আগে এবং পরে কোনো অবস্থাতেই ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারিনি

Wednesday, November 13, 2019

রাতের মেজাজ


রাত যত গভীর হয়, কিছু মানুষের মেজাজ তত খোলতাই হয়। মাঝরাত পেরোলেই তাঁরা আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠেন, তাঁদের ফাঁদা গল্পের ধার বেড়ে যায়, গলায় সুর এসে ঠেকে, ঠাট্টাগুলো পেরেকের ঠিক মাথায় এসে বসে; মোট কথা গভীর রাতের ছোঁয়াচ লাগলেই তাঁরা হঠাৎ মনে পড়া পদ্যের মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।

মনোময় মল্লিক তেমনই একজন। মেসের প্রতিটি রাত গড়িয়ে ভোর হওয়া আড্ডার মধ্যমণিও তিনি৷ চাকুরেদের মেস, কাজেই শনিবারের রাত ছাড়া এমন জমাটি রাতকাবার করা আড্ডা খুব বেশি বসে না। ট্যুয়েন্টি নাইন, দাবা; শুরুটা মাপা সুরে হলেও ক্রমশ এ জমায়েত রংবিরঙ্গি হয়ে ওঠে নির্ভেজাল আড্ডায়। রেলের ক্লার্ক মেহবুব আর উঠতি সাংবাদিক অখিলেশের সারাক্ষণ শুধু পলিটিকাল ডিবেট নিয়েই হদ্দ। প্রাইভেট ফার্মের চাকুরে দেবনাথ কথায় কথায় গান ধরেন, গলায় সুরও আছে বটে৷ সহদেব হালদার ক্রিকেট কোচিং করান কলকাতারই একটা ক্লাবে, খেলাধুলোর ব্যাপারে মতামত সকলেরই থাকে তবে সহদেবের টেবিল চাপড়ে বলা কথার ওপর সাধারণত কোনো তর্ক চলেনা। নির্মল হালদার আর অসীম মাইতি দু'জনেই একই ব্যাঙ্কে একই পদে বহাল; দু'জনেই শুধু খাইয়ে নন, ভালো খাবারদাবারের কন্যোসার, তাঁদের আলোচোনার সিংহভাগ জুড়ে শুধু খাবারদাবার আর খাওয়াদাওয়া। আর সবাইকে একই সূত্রে বেঁধে এইসব আড্ডার সুর রচনা করে থাকেন মনোময়।

মনোময় ছাড়া রাতের আড্ডা হল ঝালের আস্তরণ ছাড়া মেসের ঠাকুরের রান্নার মত; পাতে দেওয়া চলেনা। রাজনৈতিক তর্কাতর্কির গোলমাল কাটিয়ে টেনিদা-সম ডাম্বেল-মার্কা ফিচলেমো আড্ডাবাজদের দিকে ঠেলে দেন তিনি। শ্যামসঙ্গীত শুনে তাঁর চোখ ছলছলিয়ে ওঠে আর গজল শুনে তিনি ফেলে আসা প্রেমের স্মৃতিতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেন; গানের সুরের চেয়েও মধুময় হয়ে ওঠে তাঁর অন্তর থেকে বলে ওঠা 'বাহ্'। খেলাধুলোর প্রসঙ্গে তিনি খুব সহজে টেনে আনেন সাহিত্য; সহদেব হালদার আজহারউদ্দিন প্রসঙ্গে জোরালো কোনো মন্তব্য করলে তিনি অবলীলায় মতি নন্দী কোট করে আলোচনায় অন্য ডাইমেনশন জুড়ে দেন। খাবারদাবার নিয়ে রসালো আলোচনায় অবলীলায় সুকুমার রায়ের ছড়া বা জয় গোস্বামীর প্রেমের কবিতা মিশিয়ে দেওয়ার কলজে রাখেন মনোময়। মোদ্দা কথা হল রাতের এই মেসমাতানো-আড্ডাগুলোয় মনোময়ের উপস্থিতি হল শীতকালে দুপুরের রোদ খাওয়ানো লেপের ওমের মত। মনোময় না থাকলে আড্ডা রাত বারোটার-সাড়ে বারোটার বেশি গড়ায় না অথচ মনোময়পূর্ণ শনিবার রাত্রের কত আড্ডা ভেঙেছে ভোরের ফর্সা আকাশ দেখে।

দিনের বেলাগুলো অবশ্য মনোময় রীতিমতো ম্রিয়মাণ, গোটা সকালটা তার মুখে তেমন একটা বুলি ফোটেনা। বুলি ফোটানোর তেমন তাগিদও বোধ করেননা তিনি।

তাগিদটা আসে রাত বাড়লে। রাত যত গভীর হয় তত মানুষের সঙ্গলাভের জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েন মনোময়। বিশেষত শনিবার রাত্রিগুলোয় এমন আড্ডার কোকেন রক্তে গ্রহণ না করতে পারলে মনোময়ের বুকের ভিতরটা টনটন করে ওঠে; মনে হয় বাক্সে রাখা মায়ের চিঠিটা খুনে ছুরি হয়ে বুকে এসে বসবে।

"খোকা,
বড় কষ্টে এ চিঠি লিখছি। কিন্তু বুক ফেটে গেলেও এ চিঠি আমায় লিখতেই হবে।
তোকে কাছে টেনে রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তোর বাবা বলে এদ্দিন নাকি তোকে আগলে রেখে আমি অন্যায়ই করেছি। কিন্তু মায়ের মন; অত সহজে স্বস্তি পাই কী করে? বুকে পাথর রেখে তোকে বিদেয় করতে হয়েছে খোকা, কিন্তু বিশ্বাস কর এ অসহ্য যন্ত্রণা আমি আর সহ্য করতে পারিনা।
নিমু তান্ত্রিক খবর দিয়েছে তুই এখনও মায়া কাটিয়ে যেতে চাইছিস না। এ চিঠি আমি ওর মারফতই তোকে পাঠালাম, পোস্টঅফিসের সাধ্য কী এ চিঠি তোর কাছে পৌঁছে দেবে? বেঁচে থাকতে কোনোদিন তুই একটা মিছে কথাও বলিসনি, আজ তবে মানুষ সেজে অন্যদের ঠকানো কেন বাবা! আমি মা হয়ে জানি যে এতে কোনোমতেই তোর যন্ত্রণা কমছে না।

নিমু বলেছে যে যে কোনো শনিবার রাত্রে তুই ওর কাছে ফিরে এলেই ও তোর মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবে। আর নিজেকে ঠকাসনে, অন্য মানুষগুলোকেও এ'বার মুক্তি দে।

ইতি তোর মা"।

আমেরিকায় টিনটিন


সাধারণত টিনটিনের সে বইগুলোই বারবার পড়া হয় যে'গুলোতে ক্যাপ্টেন হ্যাডক আর প্রফেসর ক্যালকুলাসের জমজমাট উপস্থিতি রয়েছে৷ কাজেই বাদ পড়ে যায় শুরুর দিকের বইগুলো।
এ'বারে বেশ ডিসিপ্লিন নিয়েই শুরু করলাম 'টিনটিন ইন আমেরিকা' থেকে (ইন দ্য ল্যান্ড অফ সোভিয়েতসটাকে কিছুতেই যেন এই সিরিজের অংশ বলে মনে হয়না)। যেমনটা হয় আর কী; বরাতজোর আর দুঃসাহস মিশিয়ে জবরদস্ত টনিক। প্রতি দু'মাস অন্তর একবার করে পড়লেও 'আরিব্বাস' গোছের ব্যাপার মনে হবেই।
ভাবছি প্রতিটা বই পড়ে সেগুলোর নন-টিনটিন হাইলাইটগুলো (যা আমার মনে ধরেছে তা নোট করে রাখব)৷ এই বইতে যেমনঃ
১। তেলের খোঁজ আমেরিকান ব্যবসায়ীদের মাথা যে কী খতরনাক ভাবে ঘুরিয়ে দেয়, তার একটা absurd অথচ ট্র‍্যাজিক ছবি আঁকা আছে বইতে। তেলের খোঁজ পাওয়ার মিনিটখানেকের মধ্যে তেল কোম্পানির লোকজন ছুটে এলো, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁদের অফিস বসে গেল, বিদেয় হল ওখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা আর পরের দিন দেখা গেল সেখানেই রয়েছে এক মস্ত শশব্যস্ত শহর। হাইক্লাস ডিলাগ্র‍্যান্ডি, ডীপ পুঁদিচ্চচেরি।
২। শার্লক হোমসের 'ডিডাকশন'-ক্ষমতা অনুকরণ করে কম গোয়েন্দাকাহিনী লেখা হয়নি৷ হয়ত সে সমস্ত গোয়েন্দাদের নিয়ে মস্করা করেই হার্জ সাহেব এক দুর্দান্ত হোটেল-গোয়েন্দার ছবি এঁকেছেন৷ ভদ্রলোকের ডিডাকশনগুলো যেমন ভুলভাল, তাঁর কনফিডেন্স-লেভেল ততটাই আকাশ ছোঁয়া। সে গোয়েন্দার গপ্প পড়ে দমফাটানো হাসির খপ্পরে পড়তে হল বটে, কিন্তু নিজেদের ফেসবুক কমেন্ট্রির সঙ্গে ভদ্রলোকের ডিডাকশন প্রসেসের খানিকটা মিল আছে দেখে কিছুটা লজ্জাও পেলাম।
৩। বইয়ে এসেছে মব-লিঞ্চিং প্রসঙ্গ৷ তৌবা। আর ইয়ে, রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা এবং অটোমোবাইল সেক্টরের ফাঁপরে পড়ার গল্প। তৌবা তৌবা। না না, অ্যার্জে মোটেও কাউকে খোঁটা দিয়ে কিছু লিখতে চাননি, আমাদের মনই কুচুটে হয়ে গেছে। কিন্তু এ'সব পড়ে ফিকফিকিয়ে হাসা যায়, ফিচফিচিয়ে সামান্য কাঁদলেও কারুর কিছু বলার নেই।

পাহাড়ের দুই

১। 

- কেমন বুঝছ মামা?
- থ্রিলিং! চমৎকার! মনে হচ্ছে চট করে দু'লাইন কবিতা লিখে ফেলি।
- সেরেছে। দেখো, ভেসেটেসে যেও না।
- এখানেই যদি থেকে যেতে পারতাম রে...।
- রোব্বারে এ'খানে পাঁঠার দোকান পাবে বলে মনে হয়?
- সে'টা একটা ইয়ে বটে..কিন্তু তাই বলে..। বাদ দে..পোয়েটিক মুডে দিলি ঢেলে কেরোসিন। চ' ব্রেকফাস্টটা সেরে নিই।
- আজ জলখাবারে কী আছে জানো?
- লুচি? রিমোট জায়গায় বোধ হয় আলুরদম ডিমান্ড করাটা অনুচিত; তেমন ভাবে কষাতে পারবে না। ওই আলুভাজাতেই কাজ চালিয়ে নেব।
- লুচি? আলুভাজা?
- ভ্যাকেশন। ব্রেকফাস্ট। লুচি থাকবে না?
- হেহ্।
- লুচি নয়?
- ম্যাগি। সাবস্টিটিউট বলতে ছাতু।
- না রে, দিনদুয়েকের মধ্যে ফিরতে হবে দেখছি..।

২। 

- গাধাগুলোকে দেখে বড্ড হিংসে হচ্ছে রে।
- সে কী মামা!
- অবাক হওয়ার কী আছে। জীবনটা ওদেরও থোড়ে বড়িতে কাটছে, আমাদেরও। এ চক্র থেকে ওদেরও নিস্তার নেই নেই, আমাদেরও নেই। শুধু..।
- শুধু?
- শুধু এদের বাসে ট্রেনে ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করে হদ্দ হতে হয়না। অটোর লাইন নেই। গড়িয়াহাটে দরদাম করে হদ্দ হওয়া নেই..।

জ্যানেট রিজভির লাদাখ


ট্র্যাভেলার হিসেবে আমি একশোয় তেরো পাবো কিনা সন্দেহ। ঘুরতে গিয়ে বাড়ির আরাম খুঁজি, জিনিস হারাই, নেটফ্লিক্স/প্রাইমে ডাউনলোড করা সিনেমা সিরিয়াল দেখি, বই পড়ি; মোদ্দা কথা ছুটির দিনে বাড়িতে বসে অন্য কিছু করি বলে তো মনে হয়না।
তবু বছরে কি দেড়-বছরে একবার; প্রায় হপ্তাখানেকের জন্য সপরিবারে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই আর কয়েক হাজার বেকায়দা ভাবে তোলা ফটোতে মোবাইল বোঝাই করে বাড়ি ফিরি। এই যেমন এ'বারে গেছিলাম লাদাখে। শ্বেতার তত্ত্বাবধানে পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার একটা বড় সুবিধে হল যে সে "হোম-স্টে"গুলো জোগাড় করে বেশ দেখেশুনে। রহিসি না থাক, সে'সব জায়গায় আরাম আর উষ্ণতার অভাব থাকেনা।
তা এ'বারের ঘোরাঘুরির একদম শেষের দিকে দিন দেড়েকের জন্য আমরা ছিলাম পশ্চিম লাদাখের হেমিস-শুকপাচান বলে একটা গ্রামে। সে'খানে উঠেছিলাম শেরিং তোন্ডুপ নামগ্যালের বাড়িতে (বাংলা বানানে লিখতে গিয়ে ফোনেটিক্সে গোল পাকালাম কিনা কে জানে)। ভদ্রলোকের বয়স সত্তর বাহাত্তর; মিষ্টভাষী এবং সদালাপী, মামার ভাষায় "ভারী মাই ডিয়ার মানুষ"। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন, চাকরী থেকে অবসর নিলেও আশেপাশের মানুষকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়ার অভ্যাসটুকু ত্যাগ করেননি। সন্ধ্যে নাগাদ তাঁর ডাইনিং হলে বসিয়ে দিব্যি একটা ছোটখাটো লেকচার দিয়ে দিলেন লাদাখ অঞ্চলের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির ব্যাপারে। ভদ্রলোক এই বয়সেও 'কিউরিওসিটি'তে ভরপুর; কলকাতা নিয়ে তার পালটা প্রশ্নও কম প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু দেখা গেল ভদ্রলোক লাদাখ সম্বন্ধে যতটা জানেন, আমি বাংলা বা কলকাতা সম্বন্ধে তার সিকিভাগও জানিনা। গল্পগুজব শেষে ভদ্রলোক নিজের বইয়ের শেলফ থেকে আমায় একটা বই ধার দিলেন; লাদাখের ইতিহাসের ওপরই, পাতলা বই, একদিনের মধ্যে নিশ্চিন্তে পড়ে শেষ করে ফেলা যায়। লাদাখ (এবং ওই হেমিস শুকপাচান গ্রামটা) এতটাই সুন্দর যে আমার মত গাম্বাট মানুষও মাঝেমধ্যেই 'আহা কোথায় এসে পড়লাম' বলে গলে পড়ছি। তাছাড়া ঘোরার পথে বিভিন্ন গোম্পা দেখেটেখে স্বাভাবিক ভাবেই জায়গাটার ইতিহাস সম্বন্ধে একটু আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কাজেই তোন্ডুপ সাহেবের দেওয়া বই সাগ্রহে গ্রহণ করে জোড়া-কম্বলের তলায় সেঁধোলাম। বইটা যথাসময়ে শেষ করতে পেরেছিলাম।
জ্যানেট রিজভির লেখা "লাদাখ, ক্রসরোডস অফ হাই এশিয়া" সম্বন্ধে দু'চারটে কথা:
১। আমি বইটার ১৯৮৯ এডিশন পড়েছি। প্রথম প্রকাশ সম্ভবত তিরাশিতে। কিন্তু বইটার মূলে যেহেতু রয়েছে লাদাখের ইতিহাস এবং কালচার; সেহেতু পুরনো এডিশন বলে তেমন একটা হোঁচট খেতে হয়নি। লেখিকার ভাষার সারল্য মনে ধরেছে; স্যাম্পল হিসেবে প্রথম আট দশ পাতা পড়ে সহজেই ঠিক করে নিলাম যে এ বই টানা পড়ে শেষ করতেই হবে।
২। লাদাখের ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি; এ সমস্ত নিয়েই এই বই। প্রাইমার হিসেবে অতুলনীয় বলেই মনে হল। আজকাল গুগল সহজলভ্য ইনফরমেশনে ভরপুর; এ যুগে দাঁড়িয়ে ৩৫/৩৬ বছর আগে লেখা এমন বিষয়ের একটা বইকে "রেলেভ্যান্ট" আর "এনরিচিং" মনে হওয়াটাই একটা চমৎকার ব্যাপার।
৩। পাহাড়ে ঘেরা এই নিরিবিলি প্রান্তরে বসে রাজরাজড়ার ইতিহাস, পলিটিক্স, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে পড়তে পড়তে গোটা ব্যাপারটা বেশ সাররিয়াল ঠেকে। তিব্বতের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে ডোগরাদের আক্রমণ থেকে পশমিনা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া; এ সমস্ত মিলে তিব্বতি রাজাদের (ও তাঁদের প্রজাদের) কম হ্যাপার সামলাতে হয়নি। সে ইতিহাস ক্ষেত্র বিশেষে জটিলও বটে। লেখিকা সেই আপাত-জটিল ইতিহাস খুব সহজ ভাবে আর স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করেছেন, বলেছেন কাশ্মীর বা বাল্টিস্তানের সঙ্গে লাদাখের যোগাযোগ ও বিচ্ছেদের কথাও।
৪। বইয়ের অন্যতম জরুরী অংশ হল তিব্বতের সঙ্গে লাদাখের যে আত্মার যোগ; সেটুকুর ইতিহাস আর বর্তমানকে তুলে ধরা। আর সেই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে লাদাখি বৌদ্ধধর্মের প্রসঙ্গ, তিব্বতের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ এবং সূক্ষ্ম অমিলগুলো। চমৎকার ভাবে আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন গোম্পা, তাদের ইতিহাস ও স্থাপত্য।
৫। আমার মতে এ বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হল লাদাখের সাধারণ মানুষের জীবনধারা নিয়ে লেখা অধ্যায়গুলো। তাঁদের খাবারদাবার, কালচার, পোশাক, দৈনন্দিন জীবনের সারল্য, গ্রাসাচ্ছাদনের লড়াই এবং আধুনিকতার (ভালো ও মন্দ) প্রভাব; এই সমস্তই বড় চমৎকার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
লাদাখের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে এই বই পড়ার অভিজ্ঞতাটা সত্যিই অনন্য। বইটা লাদাখ সম্বন্ধে আমার আগ্রহ এতটা উস্কে দিয়েছিল যে ফেরার পথে লেহ্‌ শহরের একটা জমকালো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মেরেছিলাম লাদাখ সম্বন্ধে আরও ভালো কিছু বইয়ের খোঁজ করতে। লাদাখের ওপর সবচেয়ে ভালো বই কী আছে জিজ্ঞেস করাতে দোকানি-মশাই নির্দ্বিধায় জানালেন;
"সব সে পপুলার অউর সব সে অথেন্টিক বুক অন দিস এরিয়া; জ্যানেট রিজভি কা লাদাখ"।