Sunday, September 16, 2018

চাঁদা

মাঝরাত বড় খতরনাক।

ঝালমিষ্টি চানাচুর ফুরিয়ে যাওয়ার আফশোষ ঘাড়ে চেপে বসে।

হাফ পাতা শিব্রাম পড়ে চার পাতা শৈলেন ভাবতে ইচ্ছে করে।

রেনল্ডস পেনের নীল ঢাকনা চিবিয়ে চিবিয়ে হদ্দ হয়েও ক্রসওয়ার্ড পাজলে নড়চড় দেখা যায়না।

বেদম খেপচুরিয়াস এসএমেস টাইপ করেও মুছে ফেলাটাই রুল অফ দ্য গেম, গজরগজরের জন্য নম্বর টাইপ করেও তা ডায়াল করার আগে মুছে ফেলাটাই সমিচীন।

নেহাত গান ছিল,
তাই টিকে থাকা।
না'হলে প্রতিদিন শেষ রাতে অন্তত লাখখানেক মানুষ রাণাঘাটের টিকিট কাউন্টারে পৌঁছে তিব্বতের টিকিট চাইতেন।

রাগ ও বিরক্তি

প্রচণ্ড রাগ আর প্রবল বিরক্তি নিয়ে একটা আগুন ফেসবুক স্টেটাস লিখতে বসেছিলাম। চারদিকে এত গাম্বাটগিরি আর ভালো লাগে না, ফেসবুকে কিছু একটা না লেখা পর্যন্ত সোয়াস্তি পাচ্ছিলাম না। বেশ যুৎসই দু'একটা সারকাস্টিক রেফারেন্সও তৈরি রেখেছিলাম। সমস্যা বাঁধল আচমকা ছোটমামা এসে পড়ায়।

- কী রে! দিনরাত মোবাইলে মুখ গুঁজে কী করছিস বাবু?
- আহ মামা। ডিস্টার্ব কোরো না।
- দিদি আজ লুচির সঙ্গের এই তরকারিটা বড় যত্ন করে বানিয়েছে। এ'সব একটু শেখ না রে। এখনও সময় আছে।
- ধ্যাত্তেরি মামা। একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছি।
- কাজ? কেন? কাজ করছিস কেন?
- বাহ্, আমি কাজ করিনা?
- আমার পোস্ট অফিসের কাজটা করেছিস? করেছিস?
- আহ্ মামা। এ'সব মিনিয়াল কাজে আমায় যে কেন জড়াও। আর বলেছি যখন করে দেব৷ তাড়া দিও না৷ এখন জরুরী কাজটা সেরে নিই।
- পোস্ট অফিসের কাজ জরুরী নয়?
- সোসাইটির ব্যাপারে কোনো খবর রাখ?
- সোসাইটির পুজো কমিটির সেক্রেটারি রে আমি। এ'বারে ধামাকা প্ল্যান আছে...।
- আরে ধুর। খালি মাইক্রো লেভেলের ধান্দাবাজ চিন্তা। বলি সমাজে কী ঘটছে সে ব্যাপারে কোনো আইডিয়া আছে? একটা বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক সচেতন মানুষ হিসেবে তোমার উচিৎ প্রতি মুহূর্তে আঁতকে ওঠা। উঠছ কী?
- কাঁচালঙ্কা চিবিয়েছি৷ উফ!
- ওই। ও'টাই তোমাদের আঁতকে ওঠার লিমিট। কাঁচালঙ্কা।
- তোর বাতেলা শুনতে শুনতে মগ্ন হয়ে গেছিলাম বাবু, লঙ্কাটা ফিল্টার করতে পারিনি।
- বাতেলা?
- সরি। ইনসাইটস।
- তুমি লুচিই খাও। এ'দিকে দেশ গোল্লায় যাচ্ছে...।
- ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন জমা করেছিস?
- ইয়ে। এ'টা কোথা থেকে এলো?
- করেছিস?
- করব..মানে...।
- লাস্ট ডেটের অপেক্ষা করছিস? বা আর একটা এক্সটেনশনের?
- হ্যাঁ মানে...দিয়ে দেব।
- আমি গতমাসে জমা দিয়েছি, এক্সটেনশনের অপেক্ষা না করে। আর শোন, যতক্ষণ না তুই রিটার্ন জমা করছিস আমায় খামোখা কলার টেনে জ্ঞান দিবিনা। ফের মুখে লঙ্কা পড়ল। অত্যন্ত পেছন-ইয়ে ছেলে হয়েছ।

অরিজিনাল রাগ আর বিরক্তিতে জল পড়ে গেল৷ ফেসবুক স্টেটাস গেল ঝুলে। এখন জলখাবারের লুচি আর সাদা তরকারিতে যদি পোস্টঅফিস যাওয়ার দুঃখ খানিকটা লাঘব হয়।

কুলাঙ্গার

স্টিলের প্লেটে সাজানো নিখুঁত দু'জোড়া লুচির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন ঘোর লেগে গেছিল সুভাষবাবুর। অমন ধবধবে, অমন গোল, অমন ফুলকো। যে কোনো একটা লুচির বুকে একটা তর্জনীর ডগা ছোঁয়ালেই মখমলে ফস্ শব্দে ধোঁয়া বেরোবে।
আর তার পাশে উপুর হয়ে শুয়ে একজোড়া লম্বাটে ডাঁটিওলা বেগুনভাজা। ডুবোতেলে যত্নে ভেজে তোলা হয়েছে। 

আহা।

সে এক অদ্ভুত ঘোর। রিমঝিমে, মনকেমনের সুর বুকের মধ্যে৷ নিজের অজান্তেই থালার দিকে এগোতে শুরু করেছিলেন তিনি। সম্বিত ফিরল খোকার চিৎকারে "মা! ফের চারটে লুচি দিয়েছ? কতবার বলেছি আমায় দু'টোর বেশি দেবে না৷ যত আনহেলদি ব্রেকফাস্ট। বরং একটা এগহোয়্যাইট অমলেট দিও প্লীজ"।

"কুলাঙ্গার" শব্দটা বার দশেক বিড়বিড় করে ফের ফটোফ্রেমে সেঁধোলেন সুভাষবাবু।

কফি

- বৃষ্টিটা কেমন হঠাৎ নামল দেখেছেন?

- যা গুমোট ভাব ছিল সন্ধে থেকে, সারপ্রাইজড হইনি।

- আপনিও কি ঝাঁঝা?

- ওই ট্রেনের জন্যেই বসে। তবে আমি কিউলে নামব।

- দেশলাই আছে? শেড পর্যন্ত ছুটে আসতে আসতে এক্কেবারে ভিজে কাক। পকেটের দেশলাইটা এক্কেরে ল্যাতপ্যাত করছে।

- আসুন। এই যে। শেষ কাঠি আছে। সাবধানে।

- থ্যাঙ্কস। কী বিশ্রী একটা স্টেশন বলুন দেখি। একটাও বাতি নেই। একটা চায়ের দোকান অন্তত পেলে...।

- হাতিদায় নতুন বুঝি?

- আসানসোল থেকে এসেছি। ব্যবসাপত্তরের কাজে যে কোথায় কোথায় ঘুরতে হয়। তবে এমন ধ্যাধ্ধেড়ে রেল জংশন মশায় আগে দেখিনি।

- ফ্লাস্কের কফি চলবে? যদি অচেনা অজানা লোকের ফ্লাস্ক থেকে কফি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে বাক্সপ্যাঁটরা খোয়া যাওয়ার ভয় না পান তবেই...।

- ভেজাগায়ে কফির অফার পায়ে ঠেলতে নেই। এই জনহীন প্ল্যাটফর্ম, তার ওপর অন্ধকার আর তার ওপরে এই বৃষ্টি। ও কফি ফেরালে পাপ হবে।

***

- বলেন কী? লোকে ট্রেনে-প্ল্যাটফর্মে চা-কফি খাইয়ে অজ্ঞান করে মালপত্তর হাপিস করেছে শুনেছি। আপনি কফি খাওয়াতে গিয়ে অজ্ঞান হলেন?

- হব না? আরে কঙ্কালের হাত! ধবধবে ফ্লুরোসেন্ট সাদা হাড়! বরফের মত ঠাণ্ডা! তাই বলে ভূতে যে সুটকেস চুরি করে পালাবে সে'টা ভাবতে কেমন অদ্ভুত লাগছে বুঝলেন।

***

- মামা গো! একটু পায়ের ধুলো দাও মামা। পকেটমারির চেষ্টা করে হন্যে হয়ে যাচ্ছি আর এ'দিকে তুমি টপাটপ সুটকেস সরিয়ে দিচ্ছ। হাতিদা স্টেশনে যা মাল সমেত বাক্স হাতালে তা দিয়ে দেখছি মাসখানেক কেটে যাবে।

- বোমা বাঁধতে গিয়ে হাত উড়ে যাওয়াটা একপ্রকার আশীর্বাদই হল, তাই না রে ভাগ্নে? অবিশ্যি ফলস কঙ্কালের হাত ফিট করতে ঝক্কি কম নয়, রীতিমত অধ্যাবসায় দরকার। ব্যবহারে ফোকাস দরকার। আর প্র‍্যাক্টিস। তবে হাতিদায় ভদ্রলোককে কাবু করতে বড় বেগ পেতে হয়েছিল রে। ব্যাটা দেশলাই দেওয়ার সময় আমার হাতের দিকে তাকালোই না। স্ট্রেঞ্জ। ভাগ্যিস ভদ্রলোক কফি অফার করেছিলেন। যাক গে...কফিটা বড় ভালো ছিল রে, ভিজেগায়ে কাঁপতে কাঁপতে সে উষ্ণ চুমুক ভোলার নয়।

অজাতশত্রু

রাজ-ডিনার বলে কথা৷ যে সে রাজা নয়, মগধ সুপ্রিমো বলে কথা। অজাতশত্রুর পাতে অন্তত বাইশ রকমের পদ যে ছিল তা অনুমান করেই নেওয়া যায়। তবু খাওয়ায় তাঁর বিশেষ মন ছিল না, থাকার কথাও নয়। বৃদ্ধ পিতা বিম্বিসারকে সেই কবে জেলে পুরেছেন। বিম্বিসারের খাওয়াদাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা হয়েছে, তার ওপর সমানে চলছে অকথ্য শারীরিক অত্যাচার। সোজাসুজি গুমখুন করলে ল্যাঠা চুকে যায় বটে কিন্তু তা'তে খেল গড়বড় হয়ে যেতে পারে। মগধবাসী এমনিতেই সে বুড়োর ফেউ। অজাতশত্রুর ভয়ে সবাই থরথর কিন্তু তাঁর কপালে সিংহাসনচ্যুত বিম্বিসারের মত ভালোবাসা জোটেনা। পালটা বিদ্রোহ শুরু হলে সে আর এক ঝামেলা। বন্দীদশায় পচিয়ে মেরে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু কী ঢ্যাঁটা প্রাণ বুড়োর, হপ্তার পর হপ্তা খেতে পেলে না, পায়ের পাতার চামড়া তুলে পালটা সেলাই করে দেওয়া হল; তবু। মরল না।

সে'সব দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে অজাতশত্রু খেয়ে চলেছেন। পাশে স্ত্রী ও মা। মায়ের মনখারাপ, বিম্বিসারের জন্য; তবে অন্তঃপুরের মনখারাপ নিয়ে পড়ে থাকলে রাজকাজ চালানো যাবে না। এমন সময় অজাতশত্রুর শিশুপুত্র তাঁর কোলে এসে বসল আর হিশি করে ফেলল। ডায়রেক্ট রাজার ভাতের থালায়। রাণী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, খানসামার দল ছোটাছুটি শুরু করে দিল, তুড়ি বাজার আগেই চলে এলো খাবার সাজানো নতুন থালা। কিন্তু অজাতশত্রু অবিচল, তার মুখে হাসি। কোলে বসে রইল রাজপুত্র;  রাজা খাওয়া থামালেন না, থালাও পাল্টালেন না। পাছে খোকার খারাপ লাগে।

তা দেখে রাজার মা বড়রাণীমার চোখে জল।

"খোকা, জানিস! তখন তোর বয়স দুই কি তিন। তোর আঙুলের মাথায় একটা বিশ্রী ফোঁড়া হল। তোর বাবা সে'খানে চুমু খেলেই তোর মনে হত ব্যথা কমে গেছে। তেমন চুমু খাওয়ার সময় একবার সেই ফোঁড়া গেল ফেটে। অমনি সেই আঙুল তিনি নিজের মুখে পুরে ফেলেন। আর যতক্ষণ না সমস্ত পুঁজ-রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হয়, ততক্ষণ তিনি মুখ থেকে সে আঙুল বের করেননি। পাছে তুই সে'সব দেখে ভয় পাস"।

সেই মুহূর্তে নাকি অজাতশত্রুর চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে যায়; তিনি ছুটে যান কারাগারের দিকে। তবে আর পাঁচটা গল্প যেমন হয় আর কী; অজাতশত্রু পৌঁছোনোর কয়েক মুহূর্ত আগে মারা যান বিম্বিসার। এরপর দাপটের সঙ্গে বহুদিন রাজপাট সামলাবেন অনুতাপে দগ্ধ সম্রাট। আর যে কোলের শিশুর হাসির জন্য অজাতশত্রু সে রাত্রে অখাদ্য খেতে দ্বিধা করেননি, ভবিষ্যতে তাঁর হাতেই অজাতশত্রু রাজ্য ও প্রাণ খোয়াবেন।

এত কিছুর মধ্যিখানেও ফোঁড়ায় চুমু আর খোকা কোলে বাবার রাতের খাওয়া সেরে নেওয়ার জ্বলজ্বলে মুহূর্তগুলো থাকবে। ইতিহাসের আড়ালে থাকা সে গল্পগুলোর জন্যেই গান, কবিতা আর পিপিএফে টাকা জমানো।

(গুগল পডকাস্টে যে কতরকমের গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। অজাতশত্রু আর বিম্বিসারের গল্প বেশ সবিস্তারে শুনলাম কিট প্যাট্রিকের 'হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া' পডকাস্টে)।