Wednesday, March 21, 2012

তেল দ্য সর্ষে



শুনেছি যে দুই মাস বয়েস থেকেই আমার দিদা আমায় সর্ষের তেলে দলাই-মলাই করে রোদে ফেলে রাখতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। তখন এমন প্যাকেট সর্ষের তেলের সময় আসেনি। পাড়ার ঘানীতে গিয়ে দাদু নাকি নিজে নিয়ে আসতেন আলট্রা-খাঁটি সে সর্ষের তেল। তার ঝাঁঝ নাকি এয়সা ক্ষতরনাক ছিল যে শিশির ছিপি খুলতেই চোখে জল চলে আসতো। সেই চাবুক সর্ষের তেলে দৈনিক প্রায় চুবিয়ে রোদ পোহানো হতো আমায়।শুনেছি বেদম চিত্‍কার করতাম সেই তেলের জ্বালায়। দাদু ভাবতেন নাতির গলায় সুর আসবে, ক্ল্যাসিকাল গাইয়ে হবে (সেই নাতি অবশেষে তেল বেচছে)। কিন্তু একটানা ওই তেল-রগরানিতেই নাকি আমার সর্দি-কাশির ধাত বিলকুল নেই। সে যাই হোক, ওই তৈল-মর্দন সেশনগুলো থেকেই আমার সর্ষের তেল প্রীতি শুরু।

শীতকালে ছাদে গিয়ে সর্ষের তেল মেখে স্নান তো অমোঘ-উত্‍সব ছিলো একসময়ে। মালকোচা মেরে পরা গামছা, পেতলের ছোট বাটির কানায় কানায় ভর্তি সর্ষের তেল

পাঁচ সেকেন্ডের কলকাতা

রাত দেড়টায় ঘর্ঘর করে শেষ ট্রাম চলে যায় হ্যারিসন রোডের ওপর দিয়ে। লাগোয়া গলির সাতপুরনো স্যাঁতস্যাঁতে দোতলার ঘরটা কেঁপে ওঠে সে শব্দে। বহু জীর্ণ মেস বাড়িটার তস্য-জীর্ণ কাঠের জানলাগুলো মচড়মচড় করে ওঠে। ট্রামটা যেতেই পাশের বাড়ির মেনিটা একবার ম্যাঁও করে ওঠে। উঠবেই। রোজ।  

নিচে সদর দরজার পাশে ঠ্যালা লাগিয়ে শুয়ে থাকে রামলোচন। ট্রাম যেতেই লহমার জন্যে তার ঘুম ভাঙ্গে, আর “সিয়ারাম” বলে এক পাড়াভোলানো দ্বীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। চিলেকোঠার পায়রাগুলো খলবল করে ওঠে কয়েক মুহূর্তের জন্যে। চৌকিতে শিরশিরে কাঁপুনি টের পাওয়া যায়। ট্রামের ঝুমঝুমির তালে পাশে দাঁড়ানো টেবিলের নড়বড়ে পায়ার কনকন অনুভূত হয় দিব্যি।

এই কয়েক মুহূর্তে শব্দ-মেশালিতে সেই মেসবাসী কিশোরের কলকাতা-যোগ। এই শব্দগুলোকে ঘিরেই তার কলকাতাকে ভালোবাসা, স্নেহ। জেগে থাকা হুটোপুটি-মার্কা কলকাতার আর অন্য কোনও শব্দ বা ডাক কিছুতেই নিজের মত করে ঠাহর করতে পারে না সে। বুঝতেও পারে না। 

সে মেস-কিশোর কবিতা বোঝে না, পড়ার ভানও না। শুধু রোজ রাতের ওই ট্রামের ডাকে সে নিয়মিত ভূতের ভয় পায়। জীবনানন্দকে সে ভূত বলে চেনে।

প্রতি রাতে মেসের জানালা বেয়ে ভেসে আসা ট্রামের ঝমঝমে সে কিশোরের রিফিউজি পালকগুলো একটা একটা করে ঝরে পড়ে। 
সব দেশ ছাড়ার গল্পে কাঁটাতার থাকে না।

Tuesday, March 20, 2012

বটেই তো

বস: ভারী গুমোট!
আমি: বটেই তো!
বস: ফেব্রুয়ারী তেই এই?
আমি: বটেই তো।
বস: ভাব তাহলে মার্চে কী হবে?
আমি: আগুন জ্বলবে।
বস: না না অত গরম পড়বে না চট করে।
আমি:সেটাও অবিশ্যি ঠিক। অত চট করে অত গরম পড়বে না
বস:তবে বলা তো যায় না..
আমি: ঠিক, বলা তো যায় না..
বস: ভাবছি আরও একটা এসি কিনবো এবার।
আমি: তবে আমিও একটা কুলার কিনবো ভাবছি।
বস:কেন ভাবছো?
আমি: সত্যি তো, কেন ভাবছি..
বস: ভেবো না বেশি
আমি: বটেই তো
বস: আজ কী বার যেনো?
আমি: বিষ্যুদ
বস: শনি হলে জমে যেত
আমি: ক্ষীর হয়ে যেত
বস: কেনো? ক্ষীর কেনো বলছো?
আমি: জমে যেত বললেন যে?
বস: আইস-ক্রিম কী জমে না?
আমি: বটেই তো, আইস-ক্রিম।
বস: ওই তোমার এক দোষ, খালি মুখে মুখে তক্ক
আমি: বটেই তো
বস: শুধরে ফেলো, চটপট
আমি:আলবাত, immediately!
বস: আজ কী তারিখ যেনো?
আমি: উনিশে মার্চ
বস: হুম, দ্যাখো, মার্চ শেষ হতে চললো, অথচ এখনো সন্ধ্যের হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা আমেজ আছে..
আমি: বটেই তো


ইত্যাদি, ইত্যাদি 

Tuesday, February 14, 2012

নব যুধিষ্ঠীর-উবাচ

পটভূমি : পাণ্ডবদের বনবাসের এক দিন

তৃষ্ণার্ত যুধিষ্ঠির-দ্রৌপদীর জন্যে জল আনতে গিয়ে একে একে সহদেব, নকুল, অর্জুন ও ভীম নিকেশ হলেন পুকুর-মালিক এক যক্ষয়ের হাতে

“দ্রৌপদীর সঙ্গে মন দিয়ে দুটি কথা কইবো তার উপায় নেই, চার চারটে ব্রাদার হাপিস সামান্য জল আনতে গিয়ে। ধুত্তুরী বিরত্ব” রাগে গজ গজ করতে করতে বাধ্য হয়ে যুধিষ্ঠিরবাবু চললেন ভাইদের খোঁজে এবং অবশেষে এসে পৌছোলেন যক্ষের পুকুরের কাছেপুকুরের কাছে গিয়েই যুধিষ্ঠিরবাবুর চক্ষু ছানাবড়া পাশাপাশি ভীম, অর্জুন, নকুল সহদেবের লাশ পড়ে আছেএ কী কেলো! ভীম-অর্জুন না থাকলে দুর্যোধন ঠেঙ্গিয়ে রাজ্য ওয়াপস আনবে কে? নকুল-সহদেব না থাকলে ফাইফরমাশ খাটবে কোন গাধায়?এ তো মহা-কেসতবে পিপাসা ভীষণ পেয়েছিলোযুধিষ্ঠির বাবু ভাবলেন চাপ নেওয়ার আগে জল-টল খেয়ে একটু ঠান্ডা হওয়া যাকএই ভেবে যেইনা পুকুরের দিকে পা বাড়িয়েছেন যুধিষ্ঠিরবাবু, অমনি বিকট পলিটিক্যাল গুণ্ডার মত চেহারা নিয়ে যক্ষ হাজির- “  এইয়ো, রোককে, পিছে হঠ! মাগনায় জল খাবি নাকি?”

-“কে ? কে?, থতমত হয়ে পড়লেন যুধিষ্ঠিরবাবু, “ কে মশায় আপনি?”
-“ পুকুরের মালিক আমি, এ পুকুরের জল খেতে হলে, আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে হবে, না পারলে জল খেতে পাবেনিকো, জোর-জুলুম করলে পাঁচ নম্বর লাশ ফেলে দেব”
-“আরে স্যার চটছেন কেনো? জল-টল না হয় পরে খেলেও চলবেঅফ কোর্স আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবো। তবে তারপর যদি দু ঢোক খেতে এলাউ করেন, মানে এই  বোশেখ মাসের গরমে সকাল থেকে হেঁটে চলেছি কি না...”
-“বেশ তবে প্রশ্নের উত্তর দাও, Rapid Fire ফরমাটে খেলেতে হবে, রাজি?”

Wednesday, February 8, 2012

পর্ণ-গেট ও স্বর্গ-দুয়ার


দুরু দুরু পায়ে গোমূত বাবু লাল গালিচা মারিয়ে হেঁটে এলেন। চারিদিকে কুয়াশা মাখা ক্লাসি ব্যাপার। কুয়াশা চিরে শুধু এই লাল গালিচার পথ গিয়ে ঠেকেছে একটা বেঢপ সেগুন কাঠের বার্নিশ করা দরজায়। আর কিস্যু নেই কোথাও। আকাশ-মাটি কিছু না। শুধু কুয়াশা, লাল গালিচা আর সেগুন কাঠের দরজা।
মরবার পর থেকে তেরোশো বছর ধরে ড্যাঙস-পিটুনি খেয়ে আসছেন গোমূত-বাবু। পোলিটিকাল কেরিয়ারের মাশুল । পরলোকে যে এমন ফ্যাসিবাদ চলছে তা জানলে কী আর এত সহজে মারা যেতেন? আরে বাবা স্ট্রেট পিটুনি, লোয়ার কোর্ট-হায়ার কোর্ট বলে কোনও বাফার নেইরাসকালা!অবশ্য আরও সাতশো বছর ডান্ডা-পেটা হওয়ার কথা ছিল গোমূত-বাবুর, তার অন্য সমস্ত রাজনৈতিক সঙ্গীদের মত । কিন্তু হটাত্‍ কোথা থেকে এক হুকুম-নামা এলো, যে নরক-ঠ্যাঙ্গানির মাঝে একটা ছোট্ট এক মাসের স্বর্গ-বিরাম তিনি পাবেন। অন্য কারুর কপালে এমন জ্যাকপট জোটেনিকিন্তু গোমূত-বাবুর বরাত এমন দরাজ হলো কেনো গোমূতবাবু শত ভেবেও কুল-কিনারা করতে পারছেন না

ওই বার্নিশ করা দরজার ওপারে রয়েছে স্বর্গরাজ্য। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে দরজার কাছে পৌছলেন গোমূতবাবু এবং নক করলেনস্যটাক করে খুলে গ্যালো দরজাখুললেন একজন সুদর্শন পুরুষ, ধুতি-মালা-মুকুট পরা, ঠিক যেন বি-আর-চোপড়ার সেট থেকে সদ্য উঠে আসা।

_ “ আপনিই ইন্দ্রদেব নাকি স্যার?” ভক্তি ভরে প্রণাম ঠুকলেন গোমূত-বাবু।