Sunday, March 8, 2026

ভীতুর উল্লাস

আমি খুব ভীতু মানুষ। এবং আর পাঁচটা ভীতু মানুষের মত চাকরীর আশ্রয়টা আমার খুব দরকারি। সে অর্থে অ্যাম্বিশন নেই কিন্তু ভয় বিস্তর; হাতের পাঁচ যে'টুকু আছে সে'টুকুও যেন কোনোদিন কোনোভাবে ফসকে না যায়। বলাই বাহুল্য প্রিভিলেজড দুনিয়ায় আমার বসবাস। অতএব সত্যিই যারা অসহায় ও সম্বলহীন, তাঁদের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। আমার সেভিংস আছে, ইনস্যুরেন্স আছে, আগামী মাসে মাইনে না ঢুকলেও চাল-সবজি কেনার উপায় রয়েছে। তবুও আমার একটা বড় ভয়ের জায়গা হচ্ছে 'হঠাৎ কোনও একটা ভুলে, বা সামান্য অসতর্কতায় চাকরী খোয়ানো'। বয়স যত বাড়ছে সে দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে; এই যে খেটেখুটে কাজের জায়গায় যে সামান্য সুনাম অর্জন করেছি, তা যে কতটা ভঙ্গুর তা প্রতি মূহুর্তে টের পাই।

কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি ক্ষমার অযোগ্য। বারবার ভুল করে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাই। সে সব ইনএফিশিয়েন্সি মকুব করার দাবী আমার নেই। কিন্তু মূহুর্তের অসতর্কতায় জীবন এস্পারওস্পার হয়ে যাওয়া, ভয় সে'খানে। আর একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, যারা কাজ করে তাঁদের প্রত্যেকের ভুল হয়। ব্যাঙ্কের কর্মী, ক্রিকেটার, লেখক, ইনফ্লুয়েন্সার, এমএলএ, শিকারি, জাদুকর; সবার হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে "টু বি ইন দ্য রং প্লেস অ্যাট দ্য রং টাইম"। অনেক সময় হয় কী আপাত দৃষ্টিতে যে ভুল নিতান্তই ছোটখাটো, সে'টা এমন সময়ে ঘটে যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তেমনও ঘটে বটে অনেকসময়।

একটা ব্যাপার বড় অদ্ভুত। নিজের কাজে সবাই দৈনন্দিন কত ভুলচুক করছি, অথচ অন্যের একটা সে'রকমই ভুল ধরতে পারলে যে মব-উল্লাস দেখা যায়, বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায়, তা দেখে গলা শুকিয়ে যায়। এ ওই গণধোলাই দেওয়ার প্রবণতা, এই যা "দে শালাকে দু'ঘা" বলে নাচতে পারা; ব্যাপারটা যত দেখি তত বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বিশেষত খেটে-খাওয়া কর্মীদের ভুলের প্রতি আখের-গুছিয়ে-রাখা মানুষদের যে সমবেত আক্রোশ, তা দেখে অসহায় বোধ হয়। ভয় হয়। এত রাগ আমাদের মধ্যে, এত প্রবল তলপেটে লাথি কষানোর ইচ্ছে; একটা দুর্বল এলেবেলে টার্গেট পেলেই হলো। হয়তো নিজেদের যন্ত্রণাকে সামাল দিতে না পারার ফলে অন্যের কলার টেনে ধরার ইচ্ছেটা সবার মধ্যেই প্রবল (নিজেকেও বাদ দিচ্ছি না সে খুনে হায়েনার দল থেকে)। একজন অসহায় মানুষকে রগড়ে নিজেদের বিপ্লবী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে আমাদের সার্থকতা। তা'তে কার চাকরী গেলো, কার জীবন জলে গেলো; সে'সব নিয়ে ভাবতে বসলে আমাদের রাগ নেতিয়ে যাবে, কাব্য শুকিয়ে যাবে। তাই এ'ভাবেই এগিয়ে চলা ছাড়া কোনও গতি দেখি না। যদ্দিন সোশ্যাল-মবের ইনফ্লুয়েন্সিং লাথিটা নিজের পেটের দিকে ধেয়ে না আসছে, তদ্দিন 'অল ইজ ওয়েল' বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই আমাদের কাজ।

মেজোপিসের কমেন্ট্রি

মেজোপিসের সঙ্গে খেলা দেখতে বসলে শুভর খেলাটা আর দেখা হয় না, পিসের কমেন্ট্রিতে কান রেখেই সময় কেটে যায়। সমস্যা হলো পিসেমশাইয়ের ব্যক্তিত্ব যতটা তীক্ষ্ণ, অবজার্ভেশনগুলো ততটাই মোটা-দাগের। কাজেই চট করে "আরে থামো না পিসে" বলাও যায় না, আবার অযথা গালগল্পও সহ্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

ব্যাটার মিস করলে, পিসে বললে, "উইকেটে লাগলেই আউট ছিলো"। আরে বাবা, উইকেটে লাগলে আউট যে হবে সে'টা বলার কী দরকার।

স্টেপ করে কেউ ছক্কা হাঁকালে। পিসে; "স্টেপ আউট না করলে এই শটটা মারতে পারতো না বুঝলি। স্টেপ আউট করেছে তাই পারলে"। এ কথার প্রতিবাদ হয় না, মেনে নেওয়াও যায় না।

বোলার ওয়াইড বল করলে। মেজোপিসে জানালে যে বোলার রানআপ শুরু করার আগেই নাকি তাঁর মন বলছিল যে এ'বারে ওয়াইড দেবে। পরের বলে কী হবে মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলবে "পরের বলের ব্যাপারে ঠিক ফিলিংটা আসছে না। ইনস্টিঙ্কট সবসময় কাজ করে না রে"।

কেউ ছয় মারলে। "আরে তোর রোল ধরে খেলার"। ঠিক আছে, মেনে নিলাম। পরের বলেই ব্লক করলে। "আরে ধরে খেলবি মানে কি রানই নিবি না"?

শুভ ভাবছে হয় ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দেবে অথবা পরিবার-সহ পিসির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে। কিন্তু দিনের পর দিন এই "ভালো না খেললে জেতা মুশকিল" ধরণের মন্তব্য শুনে আর খেলা হজম হচ্ছে না।

Sunday, January 18, 2026

পান সে পানসে নয়


আমার পানের দোকান ভালো লাগে। সিগারেট খাই না, মশলাপাতির দিকেও ঝোঁক নেই। মাঝেমধ্যে ওই মিষ্টিপান। কিন্তু এই পানদোকানের ভিড়ে গিয়ে দাঁড়ানো বেশ তৃপ্তির। এ চাইছে কলকাত্তা সাদা, ও চাইছে ফ্লেক। এ ফলাও করে বলছে জর্দার কোড তো এ চাইছে মশলা এলাচ। ব্যাস্ত পানওলা, আত্মবিশ্বাসী খদ্দেরের দল। আর চমনবাহার, গুলকন্দ, পানমশলার বাহারে সুবাস মাখানো বাতাসে সিগারেটের কড়া গন্ধ এসে মিশছে।

আমি দেখেছি, দুঁদে পানওলাদের আঙুল চলে অসাধারণ দ্রুততায় অথচ তাঁদের মুখ শান্ত ও নিস্পৃহ। মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। এই মুগ্ধতার জেরে হপ্তায় খানদুয়েক মিষ্টিপান ঠেকানো যাচ্ছে না। পানদোকানের ভীড়ে আমারও যে একটা জরুরী ভূমিকা আছে, সে'টা বেশ টের পাচ্ছি।

Friday, January 16, 2026

ভালো কোয়ালিটির মনখারাপ

- বুঝলে ভাইটি , ভালো কোয়ালিটির মনখারাপ আজকাল আর সহজে দেখা যাচ্ছে না।
- মন খারাপের কোয়ালিটি? বিনোদবাবু, দু'পাত্তর চড়িয়েছি আমি, আর নেশাগ্রস্ত কথা বলছে আপনি।
- আহা, এই যে মুচমুছে বেগুনি, এর মধ্যে ইন্টক্সিক্যান্ট নেই বলছ? তবে আমারকথাটা তলিয়ে দেখো। যা দিনকাল পড়েছে, মনখারাপকে যে একটু নারচার করবে তার উপায় নেই।
- মনখারাপ, তার আবার নারচার। তার আবার কোয়ালিটি।
- ও মা। গামছা আর ন্যাতা কি এক হলো?
- মনখারাপ ব্যাপারটাই তো নেগেটিভ।
- এই যে সুরাপান করছ ভায়া, সবই জলে যাচ্ছে। মনখারাপ যদি অত নেগেটিভই হবে তবে সঙ্গীত সাহিত্য সবই মিছে। তবে ওই, মনখারাপ হাই কোয়ালিটির না হলে সবই মাটি। আর সে'খানেই বিস্তর সমস্যা বুঝলে। এত ভেজাল চাদ্দিকে।
- ভেজাল কী'রকম?
- এই ধরো একটা নধর মনখারাপের কারণ পাওয়া গেল। সে'টাকে খেলিয়ে খেলিয়ে চোখে ছলছল ভাব আনতে হবে। ভ্যাঁ ভ্যাঁ মার্কা বেহেড কান্না নয়, ভারি শ্যামল মিত্র লেভেলের ছলছল হতে হবে বুঝলে। দুঃখের ডিস্কো ব্যাপারটা বড্ড লাউড। আমার বুকে তা'তে চোট লাগে। ওই যা বলছিলাম, শ্যামল মিত্রয়েস্ক ছলছল দরকার। একটু আধো-অন্ধকারের খোঁজ করতে হবে। তা'ছাড়া, দেখবে মনখারাপের কোয়ালিটি ভালো হলে সঙ্গীতবোধ আপনা থেকেই ধারালো হয়ে যায়। সে'টাই নিয়ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, জেনুইন মনখারাপগ্রস্ত মানুষ কখনো ছেঁদো কথার দিকে ঘেঁষতে পারে না। যা কিছু গভীর, যা কিছু সুন্দর; সে'দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁর কোন উপায় নেই। তাই বলছিলাম, মনখারাপ টের পেলে সে মনখারাপের মাথায় হাত বুলিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। তাকে চাবকে সিধে করতে চাইলেই সমস্যা।
- কী'রকম সমস্যা?
- ওই, মনকেমনকে সামাল না দিতে পারলে ছলছলের বদলে বিরক্তি ও বিরক্তির পর জমাট রাগ। দুঃখকে ডিসিপ্লিন না করতে পারলে সে বাবাজি মাথায় উঠে নাচতে শুরু করে। সেই আগডুমবাগডুমে ছলছল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেখানে সঙ্গীত মিইয়ে যায়, সাহিত্য শুকিয়ে যায়। মনখারাপের সে এক বিশ্রী ওয়েস্টেজ।
- ওয়েস্টেজ ব্যাপারটা খুবই খারাপ।
- খুবই খারাপ ভায়া। খুবই খারাপ। ভালো একটু মনখারাপ যদি গ্রিপ করতে পারতাম ভাইটি, উতরে যেতাম।

ঝুনুর বাবা, মান্তুর বোন

- ঝুনু? এসেছিস?
- উফ! বাইরে কী বৃষ্টি পিসি।
- ভিজে গেছিস নিশ্চয়ই!
- ভিজে কাক। তোমার গামছাটা নিলাম।
- দেখতে পাই না তো কী, ঝমঝম শুনছি কখন থেকে আর ভাবছি আজ নির্ঘাত ঝুনু ভিজেটিজে আসবে।
- শ্যামলীর মাকে বলছিলে তো ওঁর সেই স্পেশ্যাল বাটিচচড়িটা করতে?
- দ্যাখ না, ঢাকা দেওয়া আছে টেবিলে। আর পাবদার ঝাল, তুই আসবি শুনে সে নিজেই নিয়ে এসেছিলো।
- বহুত খুব। তবে তুমি আবার উঠতে যেও না। আমিই বেড়ে নেবো।
- হ্যাঁ রে, মান্তু বলছিল তোর ছুটি বাতিল হয়ে গেছে?
- বাবা ইতিমধ্যেই সে কথা জানিয়ে দিয়েছে?
- মা মরা ছেলে, ঝুনু তোকে চোখে হারায়।
- সে সিম্পটম তো দেখি না। যখনই দেখা হয় কেমন একটা খ্যাঁকখ্যাঁকে মেজাজ।
- সে ওর ধাঁচই তেমন। তা হ্যাঁ রে, তোর ছুটি বাতিল কেন হল?
- বর্ডারে কিছু আনরেস্ট, তাই আর কী...।
- যুদ্ধটুদ্ধ লাগবে নাকি? খবরে তো রোজই দুঃসংবাদই শুনি।
- কেন দ্যাখো ও'সব। তার চেয়ে তোমার বাংলা সিরিয়ালগুলোই ভালো। বাহ্‌, চচ্চড়িতে আজ বেড়ে ঝাল দিয়েছে তো শ্যামলীর মা।
- নিশ্চয়ই হাত না ধুয়েই লেগে পড়েছিস।
- বৃষ্টিতে ভিজলাম তো।
- ঝুনু, বাবাকে ফোন করিস নিয়মিত। কেমন?
- তোমায় ফোন করতে বললে না তো?
- বাপটাকে একটু দেখিস, মান্তুর যত হেডমাস্টারি সব হাবেভাবে, তোর ব্যাপারে ও আদতে কিন্তু ভারি নার্ভাস।
- বাবা? নার্ভাস? হাসালে পিসি।
- ফোন করিস মান্তুকে। কেমন?
- বাবাকে তুমি প্যাম্পার করেছ চিরকাল। অথচ বাবা তোমার সেই স্নেহ-ফেহকে কখনই পাত্তা দেয়নি।
- ডেঁপোমি না করে আমি যা বলছি মনে রাখিস। হপ্তায় অন্তত দু'বার কল করিস বাবাকে। আমায় রোজ রোজ ফোন করে বাজে খেজুর না করলেও চলবে।
- তোমার কথা শুনলে মাঝেমধ্যে মনে হয় তুমি বাবার দিদি না, মা। এত বায়াসড যে কেউ হতে পারে মাইরি পিসি...।
- দেখতে পাই না, হাঁটাচলার শক্তিও প্রায় গেছে বললেই চলে। ওই যে বায়াস না কি বললি, ওটাই আমার শক্তি। ওঁর জন্যেই টিকে আছি। ওই বায়াসই আমার চোখের দৃষ্টি, আমার হাঁটুর জোর।
- তা এত যে চিন্তা তোমার ভাইয়ের জন্য, সে কতবার তোমার খোঁজ করতে আসে?
- সে হিসবে করলে কি আর বায়াসড হতাম রে ঝুনু? সে বায়াস না থাকলে টিকে থাকতাম কী নিয়ে?
- পাবদাটাও টেরিফিক।
- চারটে মাছ আছে। সবকটা খাবি।
- পিসি, তোমার টিফিন বাক্স একটা দিও। একটা বাবার জন্য নিয়ে যাব।
- যাস।
- পিসি, ফোন কিন্তু তোমাকেই বেশি করবো।
- সে কি আর আমি জানি না?