Sunday, December 31, 2023

শহরের ছ্যাঁত



- কী পেল্লায় শহর! বাপ রে বাপ!

- ভয় ভয় করে, তাই না?

- ভয় করবে না আবার! বুক ছ্যাঁত করে ওঠে।

- আমরা যদি টিকতে না পারি?

- দুই বন্ধু বাক্সপেটরা নিয়ে চলে যখন এসেছি; তখন একটা হিল্লে হয়েই যাবে।

- না হলে? হিল্লে না হলে?

- গাঁয়ে ফেরত৷

- গাঁয়ে কত বড়বড় বোলচাল ছড়িয়ে এলাম। ফিরে যাব? খালি হাতে?

- পেল্লায় শহর আর হিল্লে না হওয়ার গল্পগাছা নিয়ে ফিরব৷ সে'টাকে কি খালি হাতে ফেরা বলে নাকি রে পাগলা?

ভোলার হিল্লে



- উফ! এদ্দিন কম ভোগাওনি মাইরি..। তিন হপ্তা ধরে চুক্কি দিয়ে কেটে পড়ছো। এ'বারে পেয়েছি! খেল খতম...পয়সা হজম..।
- ট্রিগার সত্যিই টেনে দিবি ভোলা?
- অ্যাডভান্স দশ লাখ পকেটে। বাকি দশ তোমার লাশের ছবি হোয়্যটাস্যাপ করার পর আমার বাড়ি পৌঁছে যাবে।
- দ্যাখ ভোলা, ফিনান্সিয়াল ডিটেলস চট করে অমন খুলে বলতে নেই।
- শাটাপ!
- আর তুই সত্যিই দশলাখ পকেটে নিয়ে ঘুরছিস? ও'টা পকেট না থলে?
- আরে "পকেটে টাকা" তো কথার কথা৷ মালকড়ি হাতে পেয়ে গেছি৷ এই আর কী৷
- আমার যে বড় ইচ্ছে ছিল অনেকদিন বাঁচব।
- অমন ইচ্ছে সবারই থাকে৷ তবু কত লোকে টুপটাপ বাসচাপা পড়ছে, দু'দিনের জ্বরে টেঁসে যাচ্ছে..।
- তা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা ভোলা, আমি তো বিসনেসম্যান৷ আমি তোকে যদি কুড়ির বদলে তিরিশ লাখ দিই?
- এ লাইনে একবার টাকা নিয়ে কথার খেলাপ করলে আর দেখতে হবে না..।
- তা অবশ্য ঠিক৷ সেল্ফ রেস্পেক্ট আর বিসনেস এথিক্স জলাঞ্জলি দেওয়া চলে না৷
- চালিয়ে দিই বসন্তদা?
- চালাবি? দাঁড়া৷ একটা সিগারেট দে না তার আগে। ক্যান্সারের ভয়ে ওই নেশাটা বছরখানেক হল ছেড়ে দিয়েছিলাম৷ এখন অবশ্য সে ভয়টা অযৌক্তিক।
- বিড়ি চলবে?
- লাখ লাখ টাকা পকেটে রেখে বিড়ি ধরাস? শেম অন ইউ ভোলা৷ তুই যে এমন হাড়কিপটে সে'টা জানতাম না।
- দু'মিনিট দাঁড়াবে? এক প্যাকেট নিয়ে আসি।
- আনবি? আন।
- আচ্ছা। ইয়ে, এ'ভাবে বলতে চাইছি না। তবে লাইনের কাজ তো, বলতে হচ্ছে৷ তুমি আবার এই অন্ধকার গলি ছেড়ে সরে পড়ো না যেন৷ তা'হলে সোজা গিয়ে তোমার ফ্যামিলির ওপর হামলে পড়তে হবে আমায়..।
- তুই আমার জন্য সিগারেট আনতে যাবি, আর আমি ফাঁকি দেব ভোলা? চাপে পড়ে আমায় খুন করবি, তা'বলে এদ্দিনের পরিচয়ের কোনও মূল্য নেই? এই চিনলি তুই আমায়?
- কোন ব্র্যান্ড বসন্তদা?
- গোল্ডফ্লেক আন। আর দু'টো চ্যুয়িংগাম।
- সিগারেটের পরেই তো ঢিশুম৷ চ্যুয়িংগাম আবার কেন!
- প্লীজ ভোলা৷ সুমি যদি লাশের মুখে সিগারেটের গন্ধ পায় খুব রাগ করবে।
- বেশ৷ তিন মিনিটে আসছি।

***

- ভোলা৷ সুখটানের জন্য থ্যাঙ্কিউ। আর সেন্টরফ্রেশের জন্যও৷ স্ট্রবেরি ফ্লেভারটা ভারী সুন্দর। তৃপ্ত হয়ে চোয়াল চালিয়ে যাব৷
- সরি বসন্তদা।
- এ'টা তোর প্রফেশন তো। অত ভাবিস না।
- এইবারে৷ এই যে কপালে নল চাপলাম..এ'বারে চোখ বোজো..।
- আমাকে ভীতু ভেবেছিস?
- ইয়ে মানে..।
- ঠিক ভেবেছিস। ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ দেখলে ভির্মি খাই রে। এই নে, চোখ বুজলাম। বেয়ারা, চালাও ফোয়ারা।

***

- কাজ শেষ৷ এ'বার চ' বাড়ি যাই।
- এ..এ..এ..।
- সিগারেট খাওয়ানোটাই তোর কাল হল রে ভোলা। নেশার ঋণ নিয়ে মরেছি, তাই তোকে হুট করে ছাড়তে পারছি না৷ যাক, ক'দিন না হয় তোর সঙ্গে ঘুরঘুর করব।
- যাচ্চলে। রাম রাম রাম..।
- আরে ও'সব গল্প কথা৷ রামনামে মোটেও ভয় করছে না৷ প্রমাণ দেব? শোন৷ সুর করে গাইছি কিন্তু। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। কী, হোঁচট খেলাম? নার্ভাস হলাম? কাঁচকলা৷ বরং গেয়ে ভালোই লাগছে। আর ভক্তি ব্যাপারটা মানুষ ভূত সবার জন্যই উপকারী। আত্মা ইন এনি ফর্ম ইজ ভগবানের দাস৷ হরি হে দীনবন্ধু...হরি হরি।
- এ তো মহাবিপদে পড়া গেল৷ তোমার হয়ে পিণ্ডিফিণ্ডি দিতে হবে নাকি? গয়া যেতে হবে?
- মহানেকু তো তুই৷ আমি কী এমন ক্ষতি করছি তোর। শোন, আমি বিসনেসম্যান৷ কুড়িলাখ নিয়ে কী করবি সে'প্ল্যান ভাঁজতে হবে৷ নে, চট করে মোড়ের দিকে চ'৷ টোটো ধরে বাড়ি। অনেক ছক কষার আছে তারপর৷
- ভূতের আবার টোটো কীসের দরকার?
- তোর দরকার৷ এদ্দূর হেঁটে ফিরবি নাকি? কম ধকল যায়নি এই ক'হপ্তা। চোখ-মুখ বসে গেছে।
- এই তো মরলে বসন্তদা। বাড়ি যাবে না? বৌদি, ছেলেমেয়ে; তারা টানছে না?
- নাহ্৷ নিজেকে বেশ সন্ন্যাসীজসন্ন্যাসী মনে হচ্ছে। আপাতত তোর সঙ্গেই ঘোরাঘুরি করব কিছুদিন৷ তোর একটা হিল্লে হয়ে গেলে ভাবা যাবে অন্য কিছু।
- আমার হিল্লে?
- এ'খানে দাঁড়িয়েই তোর এত গল্প করতে হবে? গুলির যা আওয়াজ হল..বাপ রে বাপ৷ কানে এখনও তালা লেগে আছে মনে হচ্ছে৷ পুলিশ এলো বলে। ক্যুইক ক্যুইক।
- আগে বলো, আমার হিল্লে মানেটা কি?
- দিনরাত তো ক্রাইম করছিস আর টাকা কামাচ্ছিস। আর সে'সব গাদাগুচ্ছের টাকা বাড়ির আলমারিতে জমিয়ে রেখে পচাচ্ছিস৷ এই ইরেস্পন্সিবিলিটি সহ্য করা যায় না।
- তুমি কী করে জানলে আমার সব টাকা আলমারিতে?
- আলমারির নীচের মেঝে৷ সে'টা ফাঁপা। তার নীচে আর এক গোপন আলমারি। সে'খানে বান্ডিল বান্ডিল টাকা৷
- তুমি এ'সব জানি কী করে? কী সর্বনাশ।
- মরার আগে পর্যন্ত জানতাম না৷ মরে ওঠার পর দেখছি ত্রিকালদর্শী হয়ে উঠেছি৷ তাই বলছি, তোর আমার কাউন্সেলিং সবিশেষ দরকার। কিলো কিলো কালো টাকা জমিয়ে করবি কি? বিপদে আপদে ফ্যামিলি তো ভেসেই যাবে৷ মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স আছে?
- মে..মেডিকাল? না।
- টার্ম ইন্স্যুরেন্স?
- কী?
- এসআইপি?
- না।
- কী আশ্চর্য গাম্বাট দ্যাখো৷ সে'টাও নেই? ছেলেমেয়ের এডুকেশন ফান্ড?
- কিস্যু নেই।
- ওহ মাই গড৷ এত হাই ইনকাম তোর, অথচ কী ইরেস্পন্সিবল। বাড়ি চ'৷ অনেক প্ল্যানিং সামনে। আগে কালো টাকা সাদা। তারপর একে একে ইনভেস্টমেন্ট৷ চিন্তা নেই,আমি সামলে নেব। ইউ আর ইন সেফ হ্যান্ডস।
- মানে আমার সঙ্গেই থাকবে?
- ওই যে বললাম, যদ্দিন না তোর একটা হিল্লে হচ্ছে। সিগারেটের ঋণ ভাইটি। চ' চ'।
- তুমি সঙ্গে আছো যখন, তখন টোটোর বদলে ট্যাক্সিই হোক।
- অমন বাটপারি খরচের কী দরকার? ওরে আমার লর্ড ক্লাইভ এলেন হে, দু মাইল রাস্তা যাবেন ট্যাক্সি নিয়ে৷ নাহ্, তোকে টাকা আর ওয়েলথের তফাৎ না বোঝালেই নয়৷ এ'বার পা চালিয়ে এগো দেখি।

জয় বাবা লাভেনস্টাইন



ছ'মাসে ন'মাসে, আচমকা কোনও ফাঁকে;
মিনিট কুড়ি সময় আমি "ইনভেস্ট" করি মিস্টার লাভেনস্টাইনের পেজে। এ'টা হচ্ছে মনের মেঝে সাফ করার সহজ প্রসেস৷

কার্টুনগুলো পড়তে পড়তে প্রথমে খানিকক্ষণ হ্যা হ্যা করি৷ এই স্টেজে হিউমরের ঝাড়ুতে মনের ধুলো বিদেয় হয়।
তারপর কিছুক্ষণ "যাচ্চলে" বলে খাবি খাওয়া৷ "আমায় খোঁটা দিচ্ছে না তো"র সন্দেহটা ভিজে ন্যাতার কাজ করে, মেঝে এ'বার চকচকে হয়ে ওঠে৷

এরপর পরিস্থিতি গিয়ে ঠেকে হাই-ইন্টেন্সিটি "ধুশ্লা"য়। স্যাডিস্ট লাভেনস্টাইন; খটখটে কথাগুলো অমন খটখটেভাবে বলতে আছে? তবে একরাশ বিরক্তি সত্ত্বেও খিকখিক থামে না৷ মনের মেঝে এ'বারে হাপিত্যেশের ডেটল ছড়িয়ে ডিসইনফেক্ট করার পালা৷

নিউটন, বুদ্ধ বা মোহনদাস গোছের একজন অন্তত বলে যেতেই পারতেন যে কারুর কিছুই হওয়ার নয়৷ আর কিছু হলেও কারুর কিস্যু এসে যায় না৷ এই হাহাকারে যে কী গভীর আত্মতৃপ্তি।
থ্যাঙ্কিউ মিস্টার লাভেনস্টাইন।

ভজা-পঞ্চার সিনেমাদর্শন



- দ্যাখ পঞ্চা। দ্যাখ। ভালো করে দ্যাখ।

- কী দেখব ভজাদা?

- সিনেমা।

- সিনেমা?

- সিনেমা। এই যে, আমাদের চোখের সামনে..।

- ধুর৷ রাস্তা-ঘাট-লোকজন। ম্যাড়মেড়ে যত্তসব।

- রাস্তাটা তো সেট৷ হাইক্লাস প্রোডাকশন কোয়ালিটি। তার ওপর আবার আর্ট ফিল্ম; উঁচু দরের। আর গড়গড়িয়ে সিন এগোচ্ছে; এক শটে সব্বার ফাইনাল টেক।

- ছাতার মাথা, কোনও ডায়লগ কানে আসছে না।

- কিন্তু কী রিয়েলিস্টিক অভিনয় দ্যাখ৷ কী মারাত্মক ন্যাচুরাল এক্সপ্রেশন সবার।

- পথচলতি মানুষ যত; সবাই তো এক্সট্রা। হিরো কই? হিরোইন কই? ভিলেন কই?

- হয়ত ওই নীল হাফশার্ট নায়ক৷

- ওই পানদোকানের খদ্দের? তিরিশ সেকেন্ডের স্ক্রিন প্রেজেন্স?

- আরে হল কাঁপাতে ওই তিরিশ সেকেন্ডই যথেষ্ট। কেতটা দ্যাখ৷ কী হেলাফেলা-মার-দিয়া-কেল্লা স্টাইলে সিগারেট জ্বালালে৷

- কী গোবেচারা চেহারা দেখেছ? ও'দিয়ে দর্শকদের ঘায়েল করবে? তা'হলেই হয়েছে।

- আদত কেত থাকলে..বুঝলি পঞ্চা..ওই জিমে যাওয়া-মেকআপ নেওয়া দ্যাখনাইয়ের দরকার পরে না৷ আর আমার কী মনে হয় জানিস?

- কী মনে হয় ভজাদা?

- ওই ফুচকার দোকানের সামনে যে পিসিমা দাঁড়িয়ে...নির্ঘাৎ একজন ভিলেন৷ এক্কেবারে গব্বর সিংকে ডান হাতে কিনে বাঁ হাতে বেচে দেওয়া মানুষ৷

- মাইরি। তোমার মাথাটা জাস্ট গ্যাছে৷ অমন "এসো-বসো-লুচি-ভেজে-দিই" চেহারার রাঙাপিসিকে ভিলেন করে দেখছ..। ধুর..।

- অমন ভালোমানুষ চেহারাটাই তো পার্ফেক্ট ডিসগাইস। মোহনলাল ফুচকাওলা ওই স্পিডে খদ্দেরদের খাওয়াচ্ছে, অথচ পিসির কোনো হেলদোল নেই৷ ঠায় দাঁড়িয়ে কিন্তু ফুচকার দিকে ঘেঁষছে না৷ ব্যাপারটা কী মারাত্মক সাসপিশাস, সে'টা ভেবে দেখেছিস? নাহ্, মোগাম্বো ও পিসির পাল্লায় পড়লে জলমুড়ি খেয়ে ঘুমোতে যেত।

- বেশ৷ সামনের রাস্তাঘাট না হয় সিনেমাই হল। আমাদের এই স্ট্যান্ড করা স্কুটার না হয় সিনেমা হলের রিক্লাইনার সীটই হল৷ কিন্তু পপকর্ন? সে'টা ছাড়া চলবে কেন?

- শহরের বাতাসে যা ধুলোবালি মিশে আছে পঞ্চা, ইয়াব্বড় সিনেমা হলের ডাকাতে দামের পপকর্নের মতই গুরুপাক এ জিনিস। নিশ্চিন্তে হাওয়ার পপকর্ন চিবুতে চিবুতে সিনেমা এঞ্জয় কর। ভজহরি ফিল্মসের নিবেদন, "আজকের সন্ধ্যে"৷ আর কথা নয়, কেমন? সিনেমা দেখতে বসে বকবক আমি মোটেও বরদাস্ত করতে পারি না। 

পিছুডাক



পয়া-অপয়া ঠিক ঠাহর করতে পারি না৷ তবে পিছুডাকের মত আদুরে ব্যাপার খুবই কম আছে৷ ভরা ব্যস্ততায় হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় পিছু ডেকে থমকে দেওয়ার সোর্সগুলো যদ্দিন আছে, তদ্দিন ভেসে যাওয়ার ভয় নেই৷

শাস্ত্রে বলেছে যে পিছুডাক মজবুত হয় যদি তা'তে ইলিশের রেফারেন্স জুড়ে দেওয়া যায়৷ আর সে'টা যদি অসময়ের ইলিশ প্রসঙ্গে হয়, তা'হলে তো কথাই নেই।

এই যেমন ভরা ডিসেম্বরে বাড়ির দরজার বাইরে পা রাখার মুহূর্তে যদি শোনা যায়;
"সাবধানে যাস...আর শোন, আজ আর বাইরে হাবিজাবি খেয়ে ফিরিস না৷ রাতে ইলিশের ঝোল। কেমন? এ'বার আয়"।

অথবা
"এসো এ'বার..দেখেশুনে যেও৷ আর এই যে, শুনছো? এইয্যো! শোনো! ফেরার পথে ভালো দেখে বেগুন এনো তো৷ ইলিশের ঝোলে যাতা বেগুন দেওয়া চলে না"।

অথবা
"এই ব্যাটাচ্ছেলে রাস্কেল! রোক্কে৷ আরে অত হন্তদন্ত বেরিয়ে কোন অসাধ্য সাধন করবি রে? দু'দণ্ড বোস দেখি৷ দু'টো ভাত খেয়ে যা৷ ইলিশের ঝোলটা অলমোস্ট রেডি। অলমোস্ট"।

এ'টুকই৷ এ'টুকুতেই সমস্তটা।