Saturday, August 5, 2023

হেঁসেল আয়ুর্বেদ



পরিস্থিতি:
গোটাদিন হাবিজাবি খাওয়া হয়েছে,
অসময়ে যা-নয়-তাই গেলা হয়েছে।

প্রাথমিক প্ল্যান:
আজ তবে ডিনারটা বাদ থাক৷

পরক্ষণেই দুশ্চিন্তা: এক্কেবারে বাদ যাবে?

মায়ের মজবুত উত্তর: "না"।

মায়ের সলিউশন:
দু'চামচ মাখন।
তার ওপর তিন হাতা ফেনাভাত, গোবিন্দভোগের।
পাশে; সর্ষের তেল-ভাজা শুকনোলঙ্কা দিয়ে কষে মাখা আলুসেদ্ধ।

তারপর যা হওয়ার তাই হয়; ঘণ্টাখানেক আগে রিলিজ করা ডিনার বাতিলের প্ল্যান বেমালুম চেপা যাওয়া হয়৷

এরপর।
ডাইনিং টেবিলে বসে চোখ, নাক, প্রাণ আগে জুড়োয়৷ তারপর জিভ। আর তারপর বাবু আত্মারাম মিউমিউ করে খাঁচায় ফেরত এসে ল্যাজ নাড়ে।

গোটা দিনের হুড়মুড়, ছোটাছুটি আর মেজাজ খটমটানোর ক্লান্তি; নিমেষে হাওয়া। এ'টাই বোধহয় হেঁসেল আয়ুর্বেদ। 

আলুভাজায়নম্‌

১। বুঝলি রে, এ'ভাবে কেউ আলু কাটে না৷ আনইভেন, ইনকসিস্ট্যান্ট৷ নাহ্, এদ্দিনেও কিছু শেখাতে পারলাম না।

২। আরে ধুর ধুর, এ'ভাবে কেউ আলু ভাজে না৷ আরও তেল, আরও ধৈর্য। দেখেও কি শিখতে পারিস না?

৩। এহ্ হে। আলুভাজাতে সত্যিই ডোবালি রে তুই ভাই। দেখেই ভক্তি আসছে না৷ যাক গে।দেখি ক্যালামিটিটা কতটা সিরিয়াস৷ প্লেটে অল্প দে ৷ ডিনারে আদৌ সার্ভ করা যাবে কিনা..চেখে দেখি৷ অতটা নয়, অল্প৷ আর একটু কমা৷ আর একটু। আর একটু কমা। আর একটু? কমা? গুড৷

৪। হুম। ওকে৷ ভেবে দেখি।

৫। আরও একটু দে দেখি৷ যত্ন করে চিবুতে হবে। আহ্। চামচে দিয়ে তুলিস না৷ কিপটেচন্দ্র চিপ্পুসদাস। একটা হাতা আন।

৬। আরও একটু দে বুঝলি৷ কোয়ান্টিটি চেপে দিলে আলুভাজা অ্যাপ্রিশিয়েট করা যায় না।

৬। আরে ধেচ্ছাইছাতারমাথা। ভালো করে দে না শালা!

৭। বলছি, রাতের জন্য কি খুব কম পড়বে? আর দু'টো দিবি? ও কী..হামানদিস্তা তো চাইনি, ও'টা নিয়ে কী করছিস?

সিনেমার চরিত্র এবং মুহূর্তরা



সিনেমার চরিত্র এবং মুহূর্তরা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে। তাদের স্ক্রিনে দেখছি না বলে তাদের সিনেমাত্ব কিছুমাত্র খর্ব হয় না৷ এই যেমন বাজারঘাটে খোশমেজাজি দরদামের দৃশ্যপট অবলীলায় কোনও বাসু চ্যাটার্জির সিনেমার অংশ হতে পারত। হয়নি। তবে সে না হওয়ায় তার 'সেলুলয়েড ভ্যালু' কম হয়না৷

যারা সিনেমা তৈরি করেন, তাদের কথা ভেবে সত্যিই মাথা নুইয়ে আসে। এ জীবনে শাহরুখ সৌমিত্র নাসিরের ধারেকাছে ঘেঁষা গেল না৷ কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি করা কত চরিত্র যে আমাদের অজান্তেই আমাদের পাশে এসে বসেছে; ট্রেনে-বাসে, বাজারঘাটে, বা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে; সে'সব ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

Wednesday, July 12, 2023

স্পাইন



- আর একটু ভাত দিই রন্টু?

- আর না বাবা।

- কাল থেকে এই বাড়ির ডালভাতই রাজভোগ মনে হবে৷ 

- হেহ্৷ আচ্ছা দাও আর দু'টো ভাত।

- তোর মা থাকলে আমার ওপর কী রাগটাই না করত৷ আজকের দিনটা অন্তত ঝোলভাত খাওয়াতে পারতাম। আসলে সময় এত কম..।

- হ্যাঁ। তুমি মাছ এনে ঝোল রেঁধে খাওয়ানোর তাল করলে ডুবতে হত৷ শেষে পাউরুটি চিবিয়ে বেরোতে হত।

- ওরা এলো বলে, তাই না রন্টু?

- খবর তো সে'রকমই।

- রন্টু। জেলে বোধ হয় লপসি দেয়, তাই তো?

- কাতলার ঝোল, গন্ধরাজ লেবুর টুকরো দিয়ে যে ভাত সার্ভ করবে না সে'টা নিশ্চিত। 

- তুই ঘাবড়ে যাস না রন্টু। সমরকাকু বলেছে বেইল পেতে অসুবিধে হবে না..আরে দেশে আইনকানুন তো এখনও উঠে যায়নি।

- সমরকাকুর সাধের লিগ্যাল প্র‍্যাক্টিস এ'বারে ডুবলো বোধ হয়।

- ওরা চাপ দেবে বুঝি? থ্রেট? চোটপাট? মাস্তানি?

- তোমার কী মনে হয়?

- সমরের স্পাইন আছে৷ ও নুইয়ে পড়বে না৷

- সমরকাকুর একটা সংসারও আছে। সব হারানোর ভয়ও আছে৷ একটা সিডিসাস ছেলের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে যদি ফ্যামিলি সেফটি বিঘ্নিত হয়..।

- হ্যাঁ রে রন্টু৷ তোর মা নেই৷ তাই আমার থাকাটাও ম্যাটার করে না, তাই না? তাই তোর  সংসার নেই? শুধুই স্পাইন আছে?

- স্পাইনটা তোমার থেকেই পাওয়া৷ অফিসে ঘুষ নেওয়ায় মদত দাওনি বলে মারধোর খাওনি তুমি? 

- অফিসের ওপরওলাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আর গোটা পলিটিকাল মেশিনারির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা কি এক হল রে? তোকে দেখে আমি যে কী ইন্সপায়্যারড হই রন্টে..।

- এই সেরেছে। মনে রেখো, মেরুদণ্ডের গল্প প্রবন্ধে লেখা এক জিনিস৷ কিন্তু বয়স হলে বোন ডেন্সিটি কমে যায়৷ এ বয়সে তোমার পুলিশের লাঠি সইবে না৷

- আমায় আন্ডারএস্টিমেট করিস না৷ তুই জানিস এককালে আমি মুগুর ভেজেছি?

- সে'তো ভালো কথা৷ তা'বলে বেগুনটা আজ এক্সট্রা ভেজে কালো করে ফেলবে?

- এহ্৷ মনে হচ্ছিল বটে যে ওভারডোজ হয়ে যাচ্ছে৷ তেতো লাগছে নাকি রে?

- না না। অতটাও খারাপ নয়৷

- রন্টু, এই শোন৷ জেলে ওরা তোকে..। মানে..তোকে যদি ফস করে..মানে।

- কী?

- না মানে..সমস্ত মেশিনারি ওদের হাতে৷ চাদ্দিকে কত কিছু শুনি। কিন্তু যদি..।

- যদি?

- না না৷ নেগেটিভ কিছু ভাবব না৷ অপটিমিজম ছাড়া রিভোলিউশন হয় না৷

- বাবা৷ আমার কপালে লপসি ফেস্টিভাল নাচছে৷ তুমি নার্ভাস হয়ো না।

- নার্ভাস? আমি? হেহ্৷ হাসালে ব্রাদার৷ এক কোপে পাঁচ কিলোর কাতলা দু'ফালি করে দিই এখনও৷ নার্ভস অফ স্টিল।

- ব্রাভো।

- ফিরে আসিস বাবু৷ কেমন?

- তোমায় বেশিদিন একা ছাড়লে মা দুশ্চিন্তার চোটে ওপর থেকে নেমে এসে চোটপাট শুরু করবে। সে রিস্ক নেওয়া যাবে না।

- কী গর্ব হচ্ছে আমার তোকে নিয়ে বাবু৷ কী গর্ব। তুই জয়েন্টে যেদিন ফস্কে গেলি, আমি তো রেগে ফায়্যার। তোর মা বারবার আমায় বলেছিল, রন্টুকে জয়েন্ট-মেডিকালের স্কোরে বাঁধা যাবে না৷ 

- উফ্! বাবা! এই নড়বড়ে মন নিয়েই বেগুনভাজা পুড়িয়ে ফেললে মাইরি।

- হেহ্। আর একটু ভাত নে না রন্টু। নে। আর একটু৷ এই একটু। এক চামচ মাত্র৷ এ'টুকুই তো৷

- দাও।

- যাকগে। লপসি মুখে দিয়ে বাপের রান্নার সুবাস মনের মধ্যে টেনে আনিস৷ দেখবি স্পাইন টনটনে থাকবে।

- বাবার রান্নার হাত; অমর রহে।

- জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ!

আসি



"এইবারে তোমাদের পৃথিবীর ঝড়ঝাপটায় টপাৎ করে ফেলে দেব৷ কেমন? বিটি, তুই একদিকে হন্যে হবি। আর এই যে বাবা মদনচন্দর..সে অন্যদিকে ন্যাজেগোবর হতেহতে তোর সামনে এসে দাঁড়াবে৷ ওয়েট, দাঁড়ালে চলবে না; নতজানু হবে৷ এরপর ন্যাবাকুমার দায়িত্ব নিয়ে সমস্তটা ডুবিয়ে দেবে৷ সে ডোবাবে, তুমি টেনে ভাসিয়ে রাখবে৷ এই ল্যুপেই চলবে। বানিয়ে বলছি না, এই দেখো দেখো; নোটবুকে লিখে রাখা আছে"।

***

"এইব্বারে। সিকুয়েন্স বুঝে নাও! ইম্যাজিন! চাদ্দিকে গোলাগুলি ছুটছে;সে এক ধুন্ধুমার ব্যাপার। বারুদের মোচ্ছব, দেদার রক্তারক্তি। এ ওর মাথায় কাঁঠাল ভাঙছে তো ও এর পিঠে ছুরি দিয়ে ছবি আঁকছে।

এ'সবের মধ্যে তোমরা দু'টিতে গল্প জুড়বে৷ ওটাই হোমটাস্ক।
দু'জনেই নয়নতারা ভালোবাসো জেনে লাফিয়ে উঠবে।
বাদাম শেষ হলে ঠোঙা দিয়ে বুকমার্ক বানাবে।

ভালোবাসবে।

কী..ভাবছো বানিয়ে বলছি? আরে না হে৷ নোটবুকের সতেরো নম্বর পাতাটা দেখো..এই যে..দাগিয়ে দিয়েছি। ঠিক হ্যায়? ভালোবাসবে "!

***

"কবিতা? এ কী ধরণের সিলি কোশ্চেন! পোয়েট্রি ভালো না বাসলে চলবে কেন? এই এখানে ইন্সট্রাকশন লিখে রাখছি; মনে থাকে যেন; মাসকাবারির ফর্দ তোমাদের কথোপকথন।

আর হ্যাঁ৷ তর্ক না থাকলে মুক্তি কোথায়? আচমকা বৃষ্টি নামলে তর্কের ঝড় উঠবে- জানালা বন্ধ করার দায়িত্ব কার, তা নিয়ে৷ ফয়সালা হওয়ার আগেই বিছানায় জল। তারপর দোষারোপ, অভিমান, তিল থেকে তাল, মুখ ফসকে ভুলভাল, চোখ চলকে টপাটপ। 

তারপর হাওয়া ঠাণ্ডা হলে খিচুড়ি, আলুভাজা আর 'শোনো না, ময়দান যাবে'?"

***

"এরপর। 
হঠাৎ একদিন৷
কিছু মনে কোরো না।
হঠাৎই একদিন।
ডিসেম্বরের সন্ধের মত ঝুপ করে নামবে;
'আসি'৷
ব্যাস, আর কী!
ক্যাবলাচরণের মত পড়ে রইবে কলকাতা"৷