Saturday, July 1, 2023

নারদ নারদ



আকাশে মেঘ।

বিরাট: বৃষ্টি হবে না৷ এই আমি লিখে দিলাম।
গম্ভীর: বন্যায় সব ভেসে যাবে৷ কই রে, কে কোথায় আছিস, স্টাম্পপেপার আন৷ আমি হলফনামাটা দিয়ে রাখি।
বিরাট: কোথাকার মাকাল ফল হে তুমি? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এ মেঘ উড়ে যাবে৷ হাওয়ার তেজ দেখেছ?
গম্ভীর: হাওয়া কই? হদ্দ গুমোট চাদ্দিক। তুমি কি গবেট না সেফটিপিন?
বিরাট: মুখ সামলে৷ ইনসাল্ট হজম করব না! আমি গবেট? থোঁতামুখ এক্কেবারে...।
গম্ভীর: আর আমায় মাকালফল কে বলেছে? তোমার মেজপিসে?
বিরাট: তবে রে রাস্কেল? আমার মেজপিসে তুলে এত বড় কথা? দেব দু'ঘা?
গম্ভীর: কী? তুইতোকারি? তবে রে..এই কেউ ফুলঝাড়ুটা আন দেখি..।
বিরাট: শুধু তুইতোকারি কেন রে ব্যাটা৷ কে রাস্কেলও বলেছি।
গম্ভীর: দাঁড়া শালা৷ আমি তোর নামে মামলা ঠুকব।
বিরাট: আমি তোর পিছনে গুণ্ডা লেলিয়ে দেব!
গম্ভীর: থাম থাম৷ পিছনে নেই চাম, রাধাকেষ্টর নাম!
বিরাট: চল ব্যাটাচ্ছেলে৷ রাস্তায় চ'৷ এস্পারওস্পার করে দিচ্ছি।
গম্ভীর: হয়েই যাক। দেখিয়েই দি, কত ধানে কত চাল!
বিরাট: ইয়ে..। বলছিলাম যে..।
গম্ভীর: বলেই ফেল না বে।
বিরাট: বৃষ্টি তো নামবে না৷ খানিক পরেই খটখটে রোদ্দুর উঠবে৷ একটা স্কিন অ্যালার্জি ট্রাবল দিচ্ছে তো৷ ডাইরেক্ট রোদ্দুরটা ঝ্যামেলায় ফেলতে পারে।
গম্ভীর: বৃষ্টি? ঢালবে। ঢেলে মাত করে দেবে৷ তবে আমার আবার বৃষ্টিতে ভিজলেই টনসিলটা টনটন করে ওঠে। এ'সময় রাস্তায় না গেলেই ভালো।
বিরাট: যাক, আজ তা'হলে ছেড়ে দিলাম তোমায়।
গম্ভীর: হ্যাঁ৷ আজ তোর বরাত ভালো৷ লটারি কেন৷ আমি যাই, একটু গড়িয়ে নিই গিয়ে৷

(আইপিএল ২০২৩-য়ের সময় লেখা)

দেশ ও দশ

জর্জ কার্লিনকে বলতে শুনেছিলাম, "মানুষের কনফিডেন্সের বলিহারি- একে অপরকে ভারিক্কি চালে বলে চলেছে যে এইবেলা প্লাস্টিক থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। আরে ইস্টুপিডের দল, পারলে নিজেদের প্লাস্টিকের থেকে বাঁচা। তোরা মরে হেজে যেতে পারিস, তা'তে পৃথিবীর কিছু এসে যাবে না। পেল্লায় একটা গ্রহ, টুক করে নিজেকে রিসেট করে নেবে। মানুষের মত কত এলেবেলে চিজ এলো গেলো, তা'তে পৃথিবীর হেলদোল থাকবেই বা কেন? পৃথিবী হাজার হাজার বছর আগেও ছিল, হাজার হাজার বছর পরেও থাকবে"। অবশ্যই কার্লিন অবিকল এই ভাষায় বলেননি, তাঁর ভাষার ধার ও মেধার গভীরতা আমার অনুবাদ-ক্ষমতায় আঁটবে না।

কথায় কথায় যারা "দেশের সম্মানের কী হবে" যুক্তি ভাসিয়ে দিয়ে জরুরী তর্ক পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন - তাঁদেরকেও বোধ হয় কার্লিনের টেমপ্লেটে প্রশ্ন করতে উচিৎ। ভারতবর্ষ কি কাটোয়ার ন'পিসি? তাঁর প্রেস্টিজ কি অতই ঠুনকো যে ভাইপো ঝ্যাম্পারাপার মার্কা বলিউডি সুর গুনগুন করলে ইজ্জত জলে যাবে?

মানুষের প্রতিবাদকে এড়িয়ে না যাওয়াটাই দশের মঙ্গল। দেশের লেগপুল করা অত মামুলি ব্যাপার নয়। কথায় কথায় বেফালতু যুক্তি দিয়ে ইস্যু গুলিয়ে বেশিদিন চলবে কী করে? ইতিহাসের মত মারত্মক একজন হেডমাস্টার সবার ওপর নজর রাখছে আর ইজিচেয়ারে বসে মিটিমিটি হাসতে থাকা দেশের দিকে তাকিয়ে বলছে, "দ্যাখো কাণ্ড, তোমার ইনসাল্ট হল কি হল না তা নিয়ে এরা মারামারি করছে। আচ্ছা গাম্বাটের দল তো"!

এমপ্যাথির জয়যাত্রা

মাঝেমধ্যে মানুষকে সাহায্য না করতে পারলে ভালো লাগেনা। এই আমার একটা রোগ। দিনে দু'একবার পরোপকার না করলে আমার চলেনা। কী করব, পার্সোনালিটিটাই ও'রকম। এই যেমন এই মাত্র অফিসের সীট ছেড়ে উঠে পায়চারি শুরু করলাম। চারপাশটা জরীপ করে দেখলাম কোন অভাগার সামান্য এমপ্যাথির প্রয়োজন। এই প্রসেসটাকে আমি বলি 'দ্য ওয়াক অফ এমপ্যাথি'।
আজ দেখলাম অ্যাকাউন্টসের গোকুলবাবু চেয়ারে বসে ছটফট করছেন আর কপাল চাপড়াচ্ছেন। এসি রুমে বসেও কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম। দুশ্চিন্তা মাখানো মুখটা তোবড়ানো টিফিন বাক্সর মত হয়ে আছে। দুম করে ঝাঁপিয়ে পড়লাম না, শরীর-টরীর খারাপ হলে একটু দূর থেকে দেখাই ভালো। হঠাৎ হাসপাতাল-টাসপাতাল ছোটাছুটি করতে হলে সে এক অন্য হ্যাপা। আমার আবার ঘণ্টাখানেক পর একটা জরুরী মিটিং আছে। কিন্তু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিন্ত হলাম যে গোকুলবাবুর হার্টঅ্যাটাক গোছের কিছু হয়নি। ভদ্রলোক স্রেফ ঘাবড়ে আছেন। দূর থেকে কান পেতে যা শুনলাম তাতে মনে হল অফিসের কোনও গোলমাল৷ কিছু ফাইলটাইল হারিয়েছে, জরুরী ডেডলাইন ফস্কে যাওয়ার উপক্রম৷ বুঝলাম, এ'খানে আমার কিছু একটা করার দরকার। ওই যে বললাম, সাহায্য করার সুযোগ পেলে আমার আর কিছু মাথায় থাকে না৷
"এই যে গোকুলবাবু" বলে স্মার্টলি এগিয়ে গেলাম। আমার মুখে তখন একটা মাখন হাসি, যে'টা দিয়ে বহু জটিল সমস্যার আমি করেছি৷ গোকুলবাবু মানুষটা সরল, বুঝতে পারলাম যে আমার উপস্থিতিতে বুকে বল পেয়েছেন।
"কী যে বলি দাদা..." বলে গোকুলবাবু নিজের সমস্যার বাক্সপেটরা খুলে বসলেন৷ এই এক গেরো, পরোপকার করতে এসেছি বলে কি আমার সময়ের কোনও দাম নেই? দু'কাপ কফি শেষ হয়ে গেল কিন্তু গোকুলবাবুর হাহাকার থামার কোনও নাম নেই৷ দামড়া লোক, ফাইল হারালি কোন আহ্লাদে৷ আর ডেডলাইন মিস হতেই পারে, বসকে অত ডরানোরই বা কী আছে।
একটা সময় বাধ্য হয়ে বলতে হল, "বুঝেছি গোকুলবাবু, বুঝেছি। বাকিটা না বললেও চলবে"। গোকুলবাবু থামতেই ঝুলি থেকে বের করে আনলাম ব্রহ্মাস্ত্রটি৷ সেই এক অমোঘ বাণী যা দিয়ে কত মানুষের সমস্যা আমি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছি৷ কত উদ্ভ্রান্ত মানু্ষের মুখ থেকে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ মুছে দিয়ে সহস্র চাইনিজ টুনিবাতি জ্বেলে দিয়েছি৷
আমি গলাটা একটু নামিয়ে আর খানিকটা ব্যারিটোন ইয়ে এনে বললাম, "গোকুলবাবু৷ সমস্যাটা সিরিয়াস৷ তবে সামাল দেওয়া যাবে৷ ইজি, ইজি৷ শুধু আমার দেওয়া গুরুমন্ত্রটা মনে রাখবেন"।
গোকুলবাবুর চোখ গোল গোল, মুখে আশার ঝিলিক।
স্মিত হেসে বললাম, "ক্রাইসিস ম্যানেজ দেওয়ার ফর্মুলা একটাই৷ টেনশন নেবেন না৷ একদম টেনশন নেবেন না৷ ব্যাস, তা'তেই সবকিছু জলবৎ তরলং৷ দেখবেন ট্রাই করে৷ অব্যর্থ"।
কিছু একটা উত্তর দিতে চেয়েও থমকে গেলেন গোকুলবাবু, "টেনশন নেব না"?
" না৷ টেনশন নেবেন না৷ কেমন"?
গোকুলবাবুর মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না৷ বুঝতে পারলাম, মুগ্ধ হয়ে কথা আটকে গেছে। এত সহজ সমাধান, অথচ এ'টাই এতক্ষণ ওর মাথায় আসেনি। টেনশন না নিলেই তো মিটে গেল।
বত্রিশ সেকেন্ড পর্যন্ত গোকুলবাবু যখন একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না, তখন আমি বাধ্য হয়ে উঠে পড়লাম৷ একা গোকুলবাবুতে আটকে থাকলে তো চলবে না৷ ঘুরেফিরে দেখি আর কার উপকার করতে পারি।

ওট্টো



কাচের শিশিতে চিরকুট পুরে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে পারাটাই বোধ হয় থেইজম। আস্তিকতা।

হয়ত যত্ন করে লেখা চিরকুটটা সত্যিই জলে যাবে৷ আর বরাতজোরে যদি কোনও এক অপরিচিতর নাগালে সে শিশি ভেসেও আসে, সে হয়ত চিরকুটটা পড়ে ভাববে, "আরে, এ তো নেহাতই বেফালতু ছেলেমানুষি"৷ চিরকুটের লেখাটা যে অত্যন্ত খাজা হয়েছে, সে চিন্তায় হয়রান হয়ে হয়ত মানুষটি শিশির সমুদ্রযাত্রা ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে যাবেন৷ কিন্তু আদত প্রাপ্তি তো চিরকুটটা নয়। ভাসিয়ে দেওয়া শিশির ছিপি খোলবার মানুষ যে কোথাও কোনও প্রান্তে রয়েছেন এবং সমুদ্রের ঢেউ সে মানুষকে খুঁজেপেতে ঠিক বের করবে; শিশির মধ্যে সেই আশাটুকু পুরে দেওয়ার সাহস একজন মানুষ করেছেন। সেই বোকামোটুকু পুষে রাখার মানুষ এখনও আছেন৷ সে'টুকুই ম্যাজিক৷
সেই সমুদ্রে শিশি ভাসিয়ে দেওয়া ম্যাজিকের ভরসাতেই এই পেল্লায় ভূমিকা লেখা৷ বিভিন্ন কারণে গোট দিনটা বড় বিরক্তিতে কেটেছে। মুখে ও মেজাজে একটা তিতকুটে ভাব৷ ভাগ্যের পান থেকে যেন চুন-খয়ের-সুপুরি-চমনবাহার-জর্দা সবই খসে পড়ছে আর দুনিয়াটা রসাতলে যাচ্ছে, এই ধরণের একটা খ্যাপাটে ভয় মাঝেমধ্যে মনের মধ্যে উঁকি মারে বটে৷ সেই বিরক্তিটা কাটাতে গিয়ে ডিনার সেরেই গেস্টহাউসের খাটে লম্বা হলাম; ঘুম ব্যাপারটা খুব কাজে দেয় এই ধরণের পরিস্থিতিতে। কিন্তু ঘুম তো আর চ্যাটজিপিটির মত আজ্ঞাবহ নয় যে "এসো ভাইটি" বলে হাঁক পাড়লেই পাশে এসে বসে দিব্যি বাহারে কোড লিখতে শুরু করবে৷
অগত্যা; অগতির গতি; নেটফ্লিক্স।
"আ ম্যান কলড ওট্টো"।
সিনেমা নিয়ে দু'টো ভালোমন্দ কথা বলব, সে গুণ আমার নেই৷ তবে একটা কাল্পনিক-শিশিতে একটা কাল্পনিক-চিরকুট কাল্পনিক কালি দিয়ে লিখে রাখলাম,
"
বন্ধু,
ওট্টোর গল্পটা রইল।
দেখো৷ কেমন? এখনই৷ অপেক্ষা-টপেক্ষা করে লাভ নেই৷ ওট্টো অ্যান্ডারসন।
যা কিছু খোকার আঁকা ছবি মত সুন্দর,
যা কিছু ছেলেবেলার শীতের বিকেলের স্মৃতির মত নরম,
যা কিছু বাড়ি ফেরার টিকিট কাটার মত মিষ্টি; সেই সমস্ত কিছু মিলিয়ে-মিশিয়ে এই ওট্টোবাবুর গল্প।
দেখো কিন্তু, হ্যাঁ?
একদম শুরু থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত৷ কেমন?
ওই যে রামকৃষ্ণ বলে গেছেন, স্টীমারে সবার আগে উঠতে আর নামতে হবে সবার শেষে। পুরোটা দেখো৷ প্রাণভরে দেখলে প্রাণ ভরবেই
ইতি,
......."।
এই চিরকুটটা লিখে,
ব্লগের শিশিতে ভরে;
আমি এই রাত প্রায় পৌনে দু'টোয় ইন্টারনেট সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলাম।
এই শিশি হয়ত কারুর কাছে পৌঁছলই না৷ হয়ত দু'চারজন এ চিরকুট পড়লে৷ কে জানে, কেউ হয়ত ওট্টোবাবুর গল্প এই রাতবিরেতেই দেখতে শুরু করলেন৷ খানিকটা দেখে কেউ হাল ছাড়লেন, আবার কেউ ভাবলেন- "চলনসই। বংপেনের আবার সব কিছুতেই আদেখলাপনা"।
কিন্তু আস্তিকতা কোথায়? বিশ্বাসের খেল কোথায়? ওই যে৷ কেউ একজন কোথাও হয়ত আছেন, যার এই রাতবিরেরে ওট্টোবাবুর গল্পটা শোনা বড্ড জরুরি ছিল।
'হয়ত', একটা প্রকাণ্ড রূপকথার মত "হয়ত"।

বম্বেতুতো ব্যালকনি



বম্বে শহরে একটা ব্যালকনি ভাড়া খুঁজছি।

সী-ফেসিং হতে হবে, সমুদ্র থেকে বড়জোড় দু'শো মিটার।
মোজায়েক মেঝে, হালকা সবুজ রঙের গ্রিল (রঙের ব্যাপারটায় একটু ফ্লেক্সিবল থাকব)৷
দেওয়ালে একটা বাড়তি পেরেক ঠোকার ব্যাপারে বাড়িওলা/বাড়িওয়ালির অনুমতি চাই। বুড়োরাজ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের একটা ক্যালেন্ডার না ঝোলাতে পারলে গোটা ব্যাপারটা সামান্য ফিকে থেকে যাবে৷
একটা ইজিচেয়ার, দু'টো মোড়া আর ছোট টেবিল পাতার জায়গা থাকতে হবে৷ আর যদি একটা মিডিয়াম সাইজের ক্যারমবোর্ড পাতার জায়গা থাকে, তবে তো তোফা (এ'টা হলে ভালো, না হলে দুনিয়া রসাতলে যাবে না)।
সামনের ফুটপাথে কোনও চা-ডিমভাজার দোকান থাকলে সবিশেষ আপত্তি নেই। ও ব্যাপারটা অনেকটা গেরস্তের উঠোনে তুলসীমঞ্চের মত৷ সন্ধের দিকে ও'দিকে ঢুঁ মারলে সামান্য পুণ্য সঞ্চয়ের সম্ভাবনা৷
ইয়ে।
মাসেমাসে নগদ লেনদেনের ব্যাপারটা বাদ রাখব ভাবছি। ব্যালকনির মালিক বা মালকিনের ছেলেমেয়েদের টিউশনি পড়িয়ে, গায়ে-গতরে খেটে; ভাড়ার ব্যাপারটা মিটিয়ে দেব৷
খোঁজ থাকলে জানাবেন৷
ধন্যবাদ।