Wednesday, April 5, 2023

সুমনার বিয়ে

মেজদার বিয়ের দামী আদ্দির পাঞ্জাবিটা আজ ধার করতে হল। মেজদা অবশ্য না বলেছিল, একটা সেলফিশ জায়্যান্ট তৈরি হচ্ছে দিনদিন। মেজবৌদি ম্যানেজ করে দিয়েছে। ভেবে খারাপ লাগে যে অমন একজন ভালোমানুষের কপালে এমন বিটকেল একটা বর জুটেছে। যাকগে। এ'বারে মাংসের ঝোলের ছিটে না ফেলে পাঞ্জাবি ফেরত দিতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যায়। সেজদির ড্রেসিংটেবিল থেকে আতরের শিশিটা সরাতে হয়েছে। জয়ন্তদার সেলুনে গিয়ে দাড়ি কাটিয়ে এসেছি। বাবার অফিসের ফেয়ারওয়েলে পাওয়া সাদা কাশ্মীরি শালটাও আলমারি থেকে নামিয়ে নিয়েছি। শীত তেমন নেই, তবে ও জিনিস কাঁধে ফেলতে পারলে, একটা ইয়ে, ওই যাকে বলে গ্র্যাভিটি আসবে আর কী।

আজকের দিনটা হেলাফেলার নয়। সুমনার বিয়ে! ও ভেবেছেটা কী! ও বিয়ে করেছে বলে আমি সতেরো মাস বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদব? সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে বসে ফলমূল খেয়ে নেটফ্লিক্স না দেখে দিন গুজরান করব? বলিহারি। ভারী তো বছর চারেকের প্রেম। আর ওর অত ঘ্যাম কীসের? মাত্র সাতবার প্রপোজ করার পরেই তো সুড়সুড় করে "হ্যাঁ" বলে দিয়েছিল। হুহ্‌! সুমনা! আরে অমন কত সুমনা আসবে যাবে। এইত্তো সে'দিন, অফিস-ফেরতা বাসের ভিড়ে একজন স্মার্ট মেয়ে আমার কাছে খুচরো চাইলে। ওই চাওয়ার স্টাইলেই আমি বুঝতে পেরেছি যে আমায় ওঁর ভালো লাগছে। মানে, ওই। স্পেশাল ভালো লাগা যে'টাকে বলে। কিন্তু ঢলে পড়াটা আমার ধাতে নেই, আমি পাত্তা দিইনি। খুচরো দেওয়ার পরেই একবার স্রেফ ভদ্রতাবসত ওর নাম আর মোবাইল নম্বর জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম। ও বলেনি, মেকি রাগ দেখিয়ে অন্য দিকে সরে গেছিল। কিন্তু আমি জানি ওর মন পড়েছিল আমার দিকেই। লাজুক হলে যা হয় আর কী। আর দু'তিনবার জিজ্ঞেস করলেই নির্ঘাত ফোন নম্বর দিয়ে দিত, বলা যায়না; দু'কলি গানও শুনিয়ে দিতে পারত হয়ত। কিন্তু ও'সব আমার পোষায় না। কাজেই সুমনা যদি ভেবে থাকে যে ও চলে যাওয়ায় আমার জীবন ফাঁকা হয়ে গেছে, তার উত্তরে একটা মিচকি (কিন্তু মারাত্মক ধারালো) হাসি ছুঁড়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকবে না।

সুমনা ভেবেছিল, বিয়েতে দায়সারা একটা নেমন্তন্ন করে আমায় ইনসাল্ট করবে। বলে কিনা, "পারলে এসো"! আরে আমার নাম ভাস্কর বসু। দু'বছর শিবতলা সেভেন স্টার ক্লাবের শীতলাপুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলাম। রেলের অফিসের কনট্রাক্টরের হয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করছি। আমার দাদুর দাদু গোবরপুকুর গাঁয়ের তালুকদার ছিলেন। অমন জমকালো বিয়ের কার্ড ছাপালে, তার একটা আমায় দেওয়া যেত না? আর তা'ছাড়া, এ'টা কোনও বলার স্টাইল হলো,"পারলে এসো"! হুহ্‌! তা বলে সে যদি ভেবে থাকে, অমন দায়সারা ভাবে বললে আমি যাব না, সে'টা ভুল প্রমাণ করার দায়ও আমার। ও জানেনা আমার গ্রেপভাইন নেটওয়ার্ক কতটা মজবুত। ওর বিয়েতে যে রোগনজোশ আর বিরিয়ানি দু'টোই থাকছে, সে'খবর আমি পেয়েছি। কাজেই ওর "পারলে এসো"তে দমে না গিয়ে আমি যাব! ভালোই হবে, ওই ম্যাদামারা বরের পাশে আমায় দেখে ওর চোখ ঝলসে যাক। হাত কামড়াক। বুক হুহু করে উঠুক। চোখের জল আটকে রাখবে হয়ত। আহা, সামান্য একটা ভুলে; জমিদার বংশের সঙ্গে এমন সম্পর্ক কেটে গেল। সুমনার ওপর খানিকটা মায়াই হচ্ছে বটে। ভারি তো ইঞ্জিনিয়ার বর! ও'সব এলেবেলে ব্যাপার। সুমনার বর কি আমার মত কায়দা করে চাঁদা আদায় করতে পারবে? পারবে হাওড়ায় ঢোকা চলন্ত ট্রেনে সবার আগে উঠে পছন্দমত জানালা দখল করতে? সুমনার ফিউচার ভেবে সত্যিই খারাপ লাগছে।

যা হোক। একপ্রকার বাধ্য হয়েই ওর বিয়েতে আজ আসতে হল। সুমনা বোধ হয় এখনও সাজগোজ করছে। বরযাত্রী আসতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরী। আমি একটু আগেভাগেই চলে এসেছি। যাতে সুমনা না ভাবে যে আমি আসতে দ্বিধা করছি। সবে দু'চার রাউন্ড ফুচকা, তিন প্লেট চিকেন পকোড়া আর পাঁচ কাপ কফি খেয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি। এমন সময় সুমনার বাবার হাঁকে পিলে চমকে গেল। ভদ্রলোকের গলার স্বর দিয়ে তাঁবুর কাপড় ইস্তিরি করা সম্ভব বোধ হয়। 

"এই যে বাবা, ভাস্কর! পাড়ার ছেলে তোমরা, তোমাদের সাহায্য ছাড়া বিয়েবাড়ি উতরোবে কী করে। আমার তো এই একটিই মেয়ে। তাই তোমাদেরকেই বলতে হবে"। 

"কী ব্যাপার কাকু"?, সাবধানে জিজ্ঞেস করতে হল।

"একশোটা চেয়ার এসেছে। বরযাত্রীর জন্য। ওই ভ্যানে করে এসেছে। সে'গুলোকে ছাতে তুলে পাততে হবে। বরযাত্রীদের সে'খানেই বসানো হচ্ছে কিনা"। 

"তা ওই ভ্যানওলাকে বলে কয়ে যদি..."। 

"আর বলো কেন! ব্যাটা বলে ছাতে তুলতে বাড়তি পয়সা লাগবে। তা, তোমাদের মত ব্রাইট ছেলেপিলে থাকতে আবার বাড়তি খরচ করার কী দরকার বলো"। 

আমি যে ব্রাইট সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ কোনোকালেই আমার ছিলনা। এত বড় একটা সত্যি কথা স্বীকার করে নেওয়ার সৎ-সাহস ক'জনের থাকে। এই সুমনাই তো আমার পার্সোনালিটির ধারে জাস্ট কচুকাটা হয়ে গেল। কিন্তু মুখে স্বীকার করলে না। কাজেই সুমনার বাবা যখন অমন দরাজ গলায় স্বীকার করে নিলেন যে আমি ব্রাইট, চেয়ার ছাতে তোলার কাজটাকে না বলা গেলনা। সমস্যা হল, ভীষণ ব্রাইট হওয়া সত্ত্বেও দেখলাম একশো চেয়ারকে চারতলার ছাতে তোলার কাজটা ঠিক মামুলি নয়। দু'চারটে কচি-ছেলে ছোকরাকে বললাম একটু হাত লাগাতে, কিন্তু তারা বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিল না। অবক্ষয় আর কী। তা'ছাড়া, তারা হয়ত তেমন ব্রাইট নয়। যাকগে, মোটের ওপর বার পঁচিশ ওঠা নামা করতে হল। তার ফাঁকে চেয়ারের খোঁচায় মেজদার সাধের পাঞ্জাবিতে একটা ফুটো হয়ে গেল। একদিক থেকে বেশ হয়েছে। এ পাঞ্জাবি মেজদার গায়ে মানায় না। ওর সেই পার্সোনালিটিই নেই।

চেয়ারটেয়ারের ব্যাপারটা মিটে যাওয়ার পর দেখলাম হাঁফ ধরে গেছে। ঠ্যাং টনটন করছে। এ'বারে গিয়ে বিরিয়ানি-রোগনজোশের ব্যাপারটা সেরে নিতেই হয়। বরযাত্রী ঢুকে পড়লেই ভিড়-টিড় বেড়ে যাবে হয়ত। ছাত তখনও ফাঁকা। কিন্তু আচমকা মনে হল পা দু'টো লোহার মত ভারী। নাহ্‌, ওই বরযাত্রীদের চেয়ারেই খানিকক্ষণ না বসলেই নয়। একদু'জন ছাত সাজানোর কাজে ব্যস্ত ছিল, তাদের একজনের কাছে জল চাইলাম। পাত্তা দিলেনা। ওরা জানে না যে এককালে আমি শিবতলা সেভেন স্টার ক্লাবের শীতলাপুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলাম। জানলে ঝুঁকে সেলাম করত। যাকগে। হামবড়ামোর অভ্যাস আমার কোনোকালেই ছিল না। এমন সময় কাঁধে একটা টোকা পড়ায় চমকে উঠলাম।

সুমনা। নির্ঘাত ওই কোণের ছাতের ঘরে ছিল এতক্ষণ। সাজগোজ অর্ধেক হয়েছে। মুখে একগাদা স্নোপাউডার লেপা আছে, তবে তা সত্ত্বেও মোটের ওপর মন্দ লাগছিল না। একটু পালিশ-টালিশ করে নিলে আমার পাশে মানিয়েই যেত বোধ হয়। সামান্য উনিশ-বিশ হলেও আমি অ্যাডজাস্ট করে নিতাম। যাকগে, সবার কপালে তো সব জোটেনা; সুমনা না হয় সব কিছু নাই পেলো।

দেখলাম সুমনার একহাতে একটা স্প্রাইটের দু'লিটারের বোতল, তার মধ্যে নির্ঘাত ও'টা কোল্ডড্রিঙ্কস নয়। জল। সে'টা এগিয়ে দিয়ে বললে, 

"নাও"। 

"উইশ ইউ অল দ্য ভেরি বেস্ট", জলের বোতলটা নিয়ে সাহেবি উচ্চারণে বললাম। 

"তুমি এমন গাধা কেন"? এই সুমনার এক রোগ। স্মার্ট ইংরেজি কথার উত্তরে ভেতো বাংলায় গাম্বাটের মত কথা বলবে। গা জ্বলে গেল ফস করে। 

"তোমার চোখে ঠুলি আছে সুমনা। তবে তোমার বাবা আমায় চিনেছেন। আমি যে কতটা ব্রাইট..."। 

"লোক না হাসালে চলছিল না"?

"লোক হাসানো? এখসখিউজ ম্যি"?

"শোনো। বিয়ের ক'দিন পর একবার আমাদের বাড়িতে আসবে? আমি আর সোম খুব খুশি হব"।

"সোম? ওহ। সোমেশ্বর। ওউখখে। শ্যুওর"।

"আমি ঠিকানা পাঠিয়ে দেব"।

"থ্যাঙ্খস"।

"এখন তুমি বাড়ি চলে যেও। কেমন? আমার বাবাকে তো চেনো। নয়ত গোটা রাত ধরে কিছু না কিছু বেগার খাটাবে"।

"বিয়েবাড়ির কাজকর্ম। খুব রিলায়েবল কেউ না হলে তো আর তার ওপর দায়িত্ব দেওয়া যায় না"।

"ভাস্কর। আজ এসো। আমি নিজের হাতে রেঁধে তোমায় রোগনজোশ আর বিরিয়ানি খাওয়াব। আর সঙ্গে ভেটকির ফিশফ্রাই। বোনাস। কিন্তু প্লীজ আর বাবার পাল্লায় পড়ো না আজ"। 

"ফিশফ্রাই ব্যাপারটাকে আমি খুব রেস্পেক্ট করি"।

"জানি তো"।

"অফ কৌর্স। ওউখখে দেন"। 

"খুব মন খারাপ ভাস্কর"?

"তা...তাই মনে হচ্ছে নাকি? আসলে আচমকা ফিশফ্রাই ভেবে মেডিটেট করছিলাম। তবে দেখো, নেমন্তন্ন করে আবার ভেটকির বদলে বাসা খাইও না। আফটার অল, আমি শিবতলা সেভেন স্টার ক্লাবের শীতলাপুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলাম বছর দুই"।

"মনে থাকবে। এ'বার আমার খোঁজ পড়ার আগে আমি কাটি"। 

"আমিও। আসি"। 

"আর শোনো। তোমার কাঁধের ওপর অমন সুন্দর যে শালটা ছিল। ওই দ্যাখো, ও'দিকে ও'টা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ধুলো-কাদায় একাকার কাণ্ড। ও'টা নিয়ে যেতে ভুলো না"। 

সুমনা চলে গেল। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সুমনার নতুন সংসার, পালিশ করা সেগুন কাঠের ডাইনিং টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো বিভিন্ন পদের কথা ভাবার চেষ্টা করলাম। মাংস কষা, পোলাও, বিরিয়ানি, রাধাবল্লভী ইত্যাদি। সঙ্গে এক ট্রে ফিশফ্রাই। আহা। জেনুইন ভেটকি বোধ হয়। সুমনা মাছ ভালো চেনে। কিন্তু কিছুতেই সেই কল্পনায় নিজেকে দেখতে পেলাম না। তাজ্জব ব্যাপার।

যা হোক। চোখে জল এলো; সম্ভবত বাবার অমন সাধের কাশ্মীরি শালটার কাদামাখা অবস্থা দেখে। সিঁড়ির নীচেই সুমনার বাবা দাঁড়িয়ে কাজকর্ম তদারকি করছিলেন। পাইপ বেয়ে উলটো দিক দিয়ে নেমে সরে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হল।

Monday, March 20, 2023

প্রফেসর দত্তর শেষের লেখা

একটা পেল্লায় ক্লাসরুম, দেওয়ালের রঙ হালকা নীল। সারি-সারি বেঞ্চি, সমস্তই ফাঁকা। ক্লাসঘরের উত্তরের দেওয়ালে একটা ঢাউস কাচের জানালা, বিকেলের নরম রোদে ঝলমলে। সে জানালার উলটো দিকের দেওয়ালে একটা পেল্লায় ব্ল্যাকবোর্ড। তাঁর সামনে একটা সাদামাটা কাঠের টেবিল-চেয়ার। সে চেয়ারে বসে এক বৃদ্ধ, এক মাথা কাঁচাপাকা চুল, পাতলা ফ্রেমের চশমা। বয়স অন্তত সত্তর-বাহাত্তর। পরনে সাদা হাফশার্ট, কালো ট্রাউজার। এক মনে টেবিলের ওপর ঝুঁকে ডায়রিতে কিছু লিখে চলেছেন। শব্দ বলতে ক্লাসরুমের দেওয়ালঘড়ির টিকটিক আর বৃদ্ধের কলম-চালানোর খসখস।

তাঁর সামনে যে দাঁড়িয়ে, তাঁর পেটাই চেহারা, ইস্পাত-কঠিন মুখ। কিন্তু চোখে সামান্য অস্বস্তি, খানিকটা চঞ্চল বোধ হয়। সে ভদ্রলোকের গায়ে সামরিক পোশাক। 

দম-বন্ধকরা মিনিট দশেকের মাথায় দাঁড়ানো ভদ্রলোক সামান্য ঝুঁকে বললেন, "প্রফেসর দত্ত। সময় হয়ে এলো"।

"মেজর তেওয়ারি। হাতে এখনও সাড়ে পাঁচ মিনিট রয়েছে"। 

"তাই বলছিলাম...আপনি কারুর সঙ্গে কথা বলতে চান না প্রফেসর"?

"তা তো চাইই"। 

"আমার কাছে ফোন আছে। আপনি চাইলে..."। 

"একজনের সঙ্গে কথা বলে কী হবে মেজর? তার চেয়ে বরং এই ডায়েরিতেই লিখে রেখেছি শেষ কথাগুলো। ফোনে তো সেই একদু'জনকে ফোন বলা। এই ভালো। শেষ কিছু কথা তো, অনেকের কাছে পৌঁছক। এই ভালো"। 

"আপনার এ ডায়রির লেখাগুলো তো কারুর কাছে পৌঁছতে দেওয়া হবে না"।

"তবু। আপনার দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা পড়বেন। আপনাদের হাইকম্যান্ড পড়বে। চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে। তা'তেই হবে"।

"আপনার পরিবার? বন্ধুবান্ধব"?

"তাদের আর নতুন করে কিছুই বলার নেই"। 

"ডায়রিতে নিশ্চয়ই বিপ্লব সম্বন্ধে নিজের মতামত লিখে রাখছেন প্রফেসর"?

"আমি ভারি মধ্যমেধার মানুষ মেজর তেওয়ারি। যা ঠিক মনে হয়, সে'টার হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে পারি। যা ভুল মনে হয়, নিশ্চিন্তে সে'টার প্রতিবাদ করতে পারি। তবে কী, নিজের মতামতগুলোর সম্বন্ধে নিজেই এতটা ধন্ধে থাকি যে ঠিক-ভুল মাঝেমধ্যেই গুলিয়ে যায়। কাজেই বিপ্লব নিয়ে কিছু লিখে যাওয়ার দুঃসাহস আমার নেই"। 

"এ'বারে আর সত্যিই সময় নেই, প্রফেসর"।

"অলরাইট মেজর। চলুন, যাওয়া যাক"। 

"যাওয়ার তো কোথাও নেই প্রফেসর"। 

"ওহ্‌। সেই ভালো। এই ভালো। ক্লাসরুম ছাড়া আমার আর ঠাঁই হবেই বা কোথায়।

"আই অ্যাম সরি প্রফেসর"।

"মেজর তেওয়ারি। আমার ডায়রিটা আপনাকেই গছিয়ে যাই তা'হলে"।

"জানতে খুব আগ্রহ হচ্ছে...এত মন দিয়ে কী লিখে গেলেন"।

"এখনও তো মিনিট দুয়েক আছে। পড়ে দেখুন না। নেহাতই একটা অণুগল্প"। 

ঘড়ি দেখে মাথা নাড়লেন মেজর তেওয়ারি। প্রফেসরের হাত থেকে ডায়রিটা নিয়ে পেজমার্কটা সরিয়ে পড়তে শুরু করলেন মেজর।

পড়তে পড়তে, ক্রমশ গলা শুকিয়ে এলো ভদ্রলোকের। আরে! এ তো প্রফেসর দত্ত আর মেজর তেওয়ারির গল্প।

** প্রফেসর দত্তের ডায়রি থেকে**

একটা পেল্লায় ক্লাসরুম, দেওয়ালের রঙ হালকা নীল। সারি-সারি বেঞ্চি, সমস্তই ফাঁকা। ক্লাসঘরের উত্তরের দেওয়ালে একটা ঢাউস কাচের জানালা, বিকেলের নরম রোদে ঝলমলে। সে জানালার উলটো দিকের দেওয়ালে একটা পেল্লায় ব্ল্যাকবোর্ড। তাঁর সামনে একটা সাদামাটা কাঠের টেবিল-চেয়ার। সে চেয়ারে বসে এক বৃদ্ধ, এক মাথা কাঁচাপাকা চুল, পাতলা ফ্রেমের চশমা। বয়স অন্তত সত্তর-বাহাত্তর। পরনে সাদা হাফশার্ট, কালো ট্রাউজার। এক মনে টেবিলের ওপর ঝুঁকে ডায়রিতে কিছু লিখে চলেছেন। শব্দ বলতে ক্লাসরুমের দেওয়ালঘড়ির টিকটিক আর বৃদ্ধের কলম-চালানোর খসখস। 

তাঁর সামনে যে দাঁড়িয়ে, তাঁর পেটাই চেহারা, ইস্পাত-কঠিন মুখ। কিন্তু চোখে সামান্য অস্বস্তি, খানিকটা চঞ্চল বোধ হয়। সে ভদ্রলোকের গায়ে সামরিক পোশাক। 
এমন দম-বন্ধকরা মিনিট দশেকের মাথায় দাঁড়ানো ভদ্রলোক সামান্য ঝুঁকে বললেন, "প্রফেসর দত্ত। সময় হয়ে এলো"।

"মেজর তেওয়ারি। হাতে এখনও সাড়ে পাঁচ মিনিট রয়েছে"। 

"তাই বলছিলাম...আপনি কারুর সঙ্গে কথা বলতে চান না প্রফেসর"?

"তা তো চাইই"। 

"আমার কাছে ফোন আছে। আপনি চাইলে..."। 

"একজনের সঙ্গে কথা বলে কী হবে মেজর? তার চেয়ে বরং এই ডায়েরিতেই লিখে রেখেছি শেষ কথাগুলো। ফোনে তো সেই একদু'জনকে ফোন বলা। এই ভালো। শেষ কিছু কথা তো, অনেকের কাছে পৌঁছক। এই ভালো"। 

"আপনার এ ডায়রির লেখাগুলো তো কারুর কাছে পৌঁছতে দেওয়া হবে না"।

"তবু। আপনার দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা পড়বেন। আপনাদের হাইকম্যান্ড পড়বে। চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে। তা'তেই হবে"।

"আপনার পরিবার? বন্ধুবান্ধব"?

"তাদের আর নতুন করে কিছুই বলার নেই"। 

"ডায়রিতে নিশ্চয়ই বিপ্লব সম্বন্ধে নিজের মতামত লিখে রাখছেন প্রফেসর"?

"আমি ভারি মধ্যমেধার মানুষ মেজর তেওয়ারি। যা ঠিক মনে হয়, সে'টার হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে পারি। যা ভুল মনে হয়, নিশ্চিন্তে সে'টার প্রতিবাদ করতে পারি। তবে কী, নিজের মতামতগুলোর সম্বন্ধে নিজেই এতটা ধন্ধে থাকি যে ঠিক-ভুল মাঝেমধ্যেই গুলিয়ে যায়। কাজেই বিপ্লব নিয়ে কিছু লিখে যাওয়ার দুঃসাহস আমার নেই"। 

"এ'বারে আর সত্যিই সময় নেই, প্রফেসর"।

"অলরাইট মেজর। চলুন, যাওয়া যাক"। 

"যাওয়ার তো কোথাও নেই প্রফেসর"। 

"ওহ্‌। সেই ভালো। এই ভালো। ক্লাসরুম ছাড়া আমার আর ঠাঁই হবেই বা কোথায়।

"আই অ্যাম সরি প্রফেসর"।

"মেজর তেওয়ারি। আমার ডায়রিটা আপনাকেই গছিয়ে যাই তা'হলে"।

"জানতে খুব আগ্রহ হচ্ছে...এত মন দিয়ে কী লিখে গেলেন"।

"এখনও তো মিনিট দুয়েক আছে। পড়ে দেখুন না। নেহাতই একটা অণুগল্প"। 

ঘড়ি দেখে মাথা নাড়লেন মেজর তেওয়ারি। প্রফেসরের হাত থেকে ডায়রিটা নিয়ে পেজমার্কটা সরিয়ে পড়তে শুরু করলেন মেজর। আরে! এ তো প্রফেসর দত্ত আর মেজর তেওয়ারির গল্প। শুধু গল্পটা পড়তে শুরু করার আগে মেজর তেওয়ারি যে'টা টের পাননি, সে'টা হল প্রফেসর দত্তর কলমের কালিতে ছিল সাঙ্ঘাতিক বিষ। প্রফেসর খেয়াল করেছিলেন যে মেজর তেওয়ারির ডান হাতের আঙুলের তর্জনীতে সামান্য চোট রয়েছে, ডায়রির কালি ছোঁয়া সে'খানে লেগেছে। আর মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার।

***

ডায়েরি থেকে উদ্ভ্রান্তের মত মুখ তুললেন মেজর তেওয়ারি। টেবিলে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন প্রফেসর দত্ত, কলমের নিবটা তাঁর মুখে পোরা।

চিৎকার করতে চেয়েও পারলেন না মেজর তেওয়ারি, চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসছিল। মুহূর্তের মধ্যেই কাচের জানালার ওপর থেকে পড়ন্ত বিকেলের রোদটুকু কেউ যেন হুট করে শুষে নিলো।

Sunday, March 12, 2023

সেদ্ধয় সিদ্ধ



- বুঝলে প্রশান্ত, বুকের ধড়ফড়টা কিছুতেই কমছে না।
- জামাইবাবু, আপনি বড্ড নেদু হয়ে পড়ছেন!
- তাই কি? ওভাররিয়্যাক্ট করছি বলছ?
- আবার কী। ভাইটালস সব ঠিকঠাক। রিপোর্টটিপোর্ট যাই এসেছে সব খাপেখাপ। কখন থেকে বলছি চলুন দু'বোর্ড ক্যারম খেলি। অথচ আপনি সেই থেকে বুক ধড়ফড় নিয়ে পড়ে আছেন।
- জেনুইন ধড়ফড় ভাই প্রশান্ত। আরে, নাড়ি ধরে কি সব ধড়ফড় ডিকোড করতে পারবে? ডাক্তারি কি অতটাই মুখস্থবিদ্যের জিনিস? আরে, মনের আনচানটাকে ইগনোর করলে তো চলবে না।
- নাহ্‌! আপনার বয়স হচ্ছে।
- সেভেন্টি ফোর। এক্কেবারে কচি তো আর নই।
- আপনার মধ্যে রীতিমত ভীমরতি জেনারেট হচ্ছে।
- আহ্‌, কদ্দিন পর ভীমরতি কথাটা শুনলাম ভাই। তোমার দিদি থাকতে কথায় কথায় শুনতে হত বটে।
- দিদিরও বলিহারি। আপনাকে মারাত্মক প্যাম্পার করে মার্কেটে একা ছেড়ে চলে গেল। আর এখন প্রতি হপ্তায় দু'বার আমি আপনার গুপি-দেওয়া-বুক-ধড়ফড়ের খবর শুনে ছুটে আসি। আমার প্র্যাকটিস-ট্র্যাকটিস তো লাটে উঠবে এ'বার।
- কথায় কথায় প্র্যাকটিস দেখিও না প্রশান্ত। প্র্যাকটিস দেখিও না। আরে, হিপোক্রেটিক ওথ নিয়ে পথে নেমেছ। ডাকলে আসবে না মানেটা কী!
- আপনাকে কতবার বলেছি জামাইবাবু। আমি বলেছি, সুমি বারবার বলেছে। এ'বারে চলুন আমাদের নাকতলার ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকবেন। আমাদেরও গার্জেন হল, আপনার বুক ধড়ফড়েরও একটা পার্মানেন্ট হিল্লে হল।
- তুমি শালা একটা ইউজলেস। বাজে কথায় সময় নষ্ট না করে এই আনচানটার কিছু একটা করো ভাই। একটা স্ট্রেঞ্জ ধরণের নার্ভাসনেস বুঝলে। এই মনে হচ্ছে পায়চারি করি, তো পরক্ষণেই মনে হচ্ছে বিছানায় শুয়ে সিলিঙের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে খানিকটা রিলীফ পাওয়া যাবে। এই মনে হচ্ছে বই পড়ি, তো পরক্ষণেই মনে হচ্ছে যাই ক্লাবে গিয়ে আড্ডা মারি। এই মনে হচ্ছে চা বানাই, তো পরক্ষণেই মনে হচ্ছে আমার দরকার আসলে আলু-ভাজা। এই মনে হচ্ছে...।
- থাক থাক...আর সিম্পটম সাজাতে হবে না। আপনি এ'বার আর একটা বিয়ে করুন।
- তুমি কি ডাক্তারি টুকে পাশ দিয়েছ প্রশান্ত?
- উফ। মহাঝ্যামেলা।
- ট্রিটমেন্ট বাতলাও।
- আপনি বললে শুনবেন?
- তুমি ডাক্তার। যা প্রেসক্রাইব করবে, লেটার অ্যান্ড স্পিরিটে ফলো করব।
- আপনার দরকার মেডিটেশন।
- তুমি দূর হও প্রশান্ত। আর পারলে অ্যালোপ্যাথি ছেড়ে দাও।
- এই মাইরি। শুনুন না জামাইবাবু। জপতপ করতে বলছি না। হাইক্লাস টেকনিক, বেনিফিট গ্যারেন্টেড।
- এরপর আবার শেকড়বাকড় ধারণ করতে বলবে না তো?
- আরে না। শুনুন না।
- শুনি।
- আজ দুপুরের মেনুতে কী রেখেছেন?
- মুর্গি-কষা। পাবদার ঝাল। সজনের চচ্চড়ি। বেগুন ভাজা। নারকোল দেওয়া মুগের ডাল। রিভার্স অর্ডারে খাবো, অফ কোর্স।
- না না, এ'সব আনচান-ধড়ফড়ের দিনে ও'সব গুরুপাক সইবে না।
- মেডিটেশনটা কী?
- সবার আগে মেনু পাল্টাতে হবে। আর সে'খানেই খেল।
- হেঁয়ালি না করে স্পষ্ট করে বলো।
- শুনুন। সবার আগে - আলু, ডিম, ডাল; সেদ্ধ করে নেওয়া যাক। কেমন?
- শুনছি। এরপর?
- এরপরেই হল আসল থেরাপি। মিউজিক প্লেয়ারে মনের মত গান চালিয়ে...।
- রফি।
- রফি? রফি। অবশ্যই রফি। চালিয়ে দিন। লো ভল্যুমে। কেমন? তারপর, সর্ষের তেল, লঙ্কাকুচি আর হোয়াটএভার-ফ্লোটস-ইওর-বোট মালমসলা মিশিয়ে, মাখতে শুরু করুন। দায়সারা মাখা নয়। অনুভব করতে হবে জামাইবাবু। আলু বা ডিম ভাঙলেন, আঙুলের ডগায় যে নরম স্পর্শ; সে'টাকে গোটা শরীর দিয়ে অ্যাবসর্ব করে নিতে হবে। এইবারে কনসেন্ট্রেশনকে পুরোপুরি এনে ফেলুন চটকানিতে। আলু বা ডিম নরম হয়ে আসবে, ডুমোডুমো ভাব হারিয়ে গিয়ে মোলায়েম টেক্সচার আপনার হাতে ছড়িয়ে পড়বে। প্রসেসটা কল্পনা করুন...। চোখ বুজে ব্যাপারটাকে ফীল করুন...।
- উম...টোটালি কল্পনা করতে পারছি। আলুমাখা নরম তুলতুলে হয়ে আসছে, ডিমসেদ্ধর আলট্রা-স্মুদ পেস্ট আমার হাতে...একদম ফীল করতে পারছি ভাই প্রশান্ত...।
- ব্রাভো জামাইবাবু। এ'টাই তো চাই। এইবারে কনসেন্ট্রেশনটা ম্যাক্সিমাম পর্যায়ে পৌঁছবে। আপনার সম্পূর্ণ ফোকাস আলু-ডিম চটকানিতে, কান থেকে রফি হারিয়ে গেছেন; আপনার ফোকাস এতটাই ইন্টেন্স।
- নিজেকে লামা মনে হচ্ছে যেন।
- লাভলি। এরপর একইভাবে মনঃসংযোগ করুন ডালসেদ্ধ, ঘি, সর্ষেরতেল দিয়ে ভাত মাখতে। একদম পার্ফেক্টলি স্মুদ আউটপুট না হওয়া পর্যন্ত আপনি থামছেন না। আপনাকে রোখা যাচ্ছে না, জামাইবাবু। আপনাকে রোখা যাবে না!
- আজ মুর্গি, পাবদা, সজনে ক্যান্সেল। শুধুই থেরাপি।
- এ'টাই তো চাই। চলুন রান্নাঘরে।
- তোমার এলেম আছে প্রশান্ত।
- ফিজ হিসেবে মুর্গি আর পাবদাটা নিজের পাতে টেনে নিলে আশা করি খুব একটা মাইন্ড করবেন না?

পাঠক গুলজার

আমরা যারা 'ভোর্যেশাস রীডার' নই, অথচ বই ভালোবাসি; তারা যেন ঘাবড়ে না যাই। বই দেখলেই হয়ত আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি না, কিন্তু আলতো মলাট-স্পর্শকে ধুরছাই-কুছভিনহি বলে যারা নস্যাৎ করে থাকেন, তাদের মতামতকে তোল্লাই দিয়ে নিজেদের ক্রমাগত ইমোশনাল-ঝ্যাঁটাপেটা করার কোনও মানেই হয়না। আড়াই বছর আগে কেনা বই এখনও পড়া হয়নি, সে'টাকে শুধুই ব্যর্থতা বলে যারা দেখলেন, তাঁরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল আউটপুটটুকুতেই নিজেদের আটকে রাখলেন। রোম্যান্স কোশেন্টকে বুঝে উঠতে পারলেন না। সব প্রেমই যদি টপাটপ ছাদনাতলায় গিয়ে পড়ত, তা'হলে কি গজলের দুনিয়াটা এমন রঙিন হত?
আড়াই বছর আগে কেনা একটা বই, যে'টা আজও পড়ে ওঠা হয়নি; সে'টাকে একটা প্রবল সম্ভাবনার উৎস হিসেবে দেখতে হবে। বইয়ের তাকে বোকাসোকা হয়ে পড়ে আছে; ফুলদানির বা আমাজনের ফাঁকা বাক্সের আড়ালে ঢাকা পড়ছে, ঠিক আছে। কিন্তু দেখবেন; স্যাট করে যে'কোনও একদিন নামিয়েই ফ্যাট করে পড়া শুরু করে দেব। এই যে একটা দুর্দান্ত "পুজো আসছে পুজো আসছে" ব্যাপার, সে'টাকে উড়িয়ে দিলেই হবে নাকি। হঠাৎ একদিন বইয়ের তাক থেকে পুরনো না-পড়া বই নামিয়ে আনা হবে। ধুলো ঝেড়ে মলাটে হাত বুলনো হবে, ওজনটা অনুভব করা হবে, পাতাগুলো ফরফরিয়ে দেখা হবে খানিকক্ষণ। তবেই না আসল খেল্‌। আর তারপর সে বই হাতে খাটে বা সোফায় গা এলিয়ে বসা। বইটা কেনার মুহূর্তটা মনে করে একটা তৃপ্তির হাসি জেনারেট করার চেষ্টা করা। বছর-খানেক আগে কেনা বই হলে সে বইয়ের ছাপা দাম দেখে অবশ্যই একবার মনে হবে, "উফ, ইনফ্লেশন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে রে ভাই"। এরপর, সেই বইয়ের প্রথম প্যারাগ্রাফের (বা প্রথম লাইনের) প্রতিটা শব্দ, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা। সাদা কাগজে কালো ছাপা অক্ষর, এক এক পিস মুক্তো। দেখুন, বইয়ের ভালো-মন্দ, তা পরে আসে। সে শুচিবাইয়ের আগে আসে অন্য আনন্দ; একটা ছাপা শব্দ থেকে অন্য ছাপা শব্দে গড়িয়ে যাওয়ার। সে এক হাইক্লাস থেরাপি। ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি; সিলেবাসে নেই এমন যে কোনও বই পড়ার মধ্যেই একটা গোবেচারা বিপ্লব রয়েছে। বইটা কেমন ভাবে পড়লাম, কতটা মন দিয়ে পড়লাম, কতটা যত্ন করে আত্মস্থ করলাম; সে'টা বাছবিচার করতে চেয়ে কেউ কোশ্চেনপেপার ধরিয়ে দেবে না। এ'টাই আমার কাছে বরাবর একটা ম্যাজিকের মত মনে হত। মার্কশিটের বাইরেও একটা পড়াশোনার জগত তা'হলে আছে যে'খানে আমার মত এলেবেলে মানুষও মাস্তানি করতে পারে। সেই জাদু-জগতের বইগুলোকে আমি গোগ্রাসে গিলব না চেটেচেটে ধীরেসুস্থে খাবো; সে'টা আমিই ঠিক করে নেব। তেমনটাই হওয়া দরকার।
তা, হয়ত সেই নতুন বইয়ের প্রথম কয়েক লাইন পড়ার পরই মনের মধ্যে একটা তৃপ্তির ঝিম লেগে গেল। তারপর বাড়ির মধ্যে যে'খানেই ঘুরঘুর করছি, হাতে বইটা ঝুলছে। পড়ছি না, কিন্তু হাতছাড়া করছি না। সোফার পাশের টেবিলে, বিছানায় বালিশের পাশে, কাজের টেবিলে ল্যাপটপের গায়ে; বই-বাবাজীটি আছেন। কিলো কিলো পড়লেই হল নাকি, রসিয়ে বইটাকে ভোগ করতে হবে তো। এ'ভাবে হয়ত এক হপ্তায় বইটা বড়জোর বিশ-তিরিশ পাতা এগোল। তদ্দিনে বইটার সঙ্গে একটা মাইডিয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। সম্পর্কটা বেশ, ইয়ে, শারীরিক। লেখকের গুণ, সাহিত্য-মান; সে'সব নিয়ে পরে ভাবলেও হবে। কিন্তু প্রথম ক'দিনে বইটার গন্ধ, স্পর্শ, জ্যাকেটের ঘষটানি; সমস্ত চেনা হয়ে গেছে; সেই চেনার দাম লাখ-টাকা। যা হোক, হপ্তা-খানেক পর হয়ত সে বই চালান হবে অফিসের ব্যাগে। লাঞ্চের সময় টিফিন কৌটোর পাশাপাশি টেবিল আলো করে বেরিয়ে আসবে সেই বই। ফের এগোবে দু'পাতা-তিন পাতা করে। সে দু'পাতার অক্সিজেনেই অফিস গুলজার হয়ে উঠবে। ডেলিপ্যাসেঞ্জারির ক্ষেত্রে হয়ত সে বই বেরিয়ে আসবে বাসে-ট্রেনে-ট্রামে, মোবাইল ফোন আর ইয়ার-ফোনের সঙ্গে কম্পিটিশনে নামবে। পড়া হয়ত কয়েক লাইনের বেশি এগোবে না। কিন্তু সেই প্রতিটি লাইন পড়ার দামই ভরিতে মাপতে হবে।
এই'ভাবে। চিকনের মিহি সেলাই যে'ভাবে শম্বুক-গতিতে এগোয়, সে'ভাবে আমাদের মত অলস পাঠকের এ পাতা থেকে ও'পাতায় এগিয়ে যাওয়া। পৌষের শীতে শুরু হওয়া বই যখন জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরমে শেষ পরিচ্ছেদে এসে দাঁড়াবে, পাঠক ততক্ষণে শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন। তিনদিন বুক চিতিয়ে মিনিমাম স্ট্রাইকরেটে ব্যাটিং করে দলকে টেস্ট জেতানোর আনন্দ তখন তাঁর হাতের মুঠোয়।
কাজেই আমরা যারা ঢিমেতালে বই পড়ি, তাঁদের পাঠককুলের কলঙ্ক বলে পাশ কাটিয়ে দেবেন না। কেমন?

দোল সাফাই

খুব ছোটবেলার দোল খেলার স্মৃতির চেয়েও জমজমাট স্মৃতি হল ঘষেমেজে গায়ে-মুখের রঙ তোলা৷ বেশিরভাগ দোলের ছুটি মোটের ওপর মামারবাড়ির পাড়াতেই কাটত৷ দুপুরবেলা রঙে চুবনি খেয়ে বাড়িতে ফিরে বড়মামার কাছে সারেন্ডার করতে হত৷ আর বড়মামার তত্ত্বাবধানে হত রঙ-সাফাই৷ দু'টো জরুরি ব্যাপার মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
এক, মুখে যে বিশ্রী এবং ঢ্যাঁটা রঙের পরত পড়ত, সে'টা সাধারণ সাবানে যাওয়ার নয়৷ তখন তো আর অর্গানিক রঙ বাজারে আসেনি, সে'সময় পারলে মুখে প্লাস্টার করে দেওয়াটাই ফ্যাশনের পর্যায় ছিল। সেই রঙকে কাবু করতে বড়মামা একটা ন্যাকড়া প্যারাশুট নারকোল তেলে ভিজিয়ে মুখ ঘষত। সে এক হাইক্লাস ফেসিয়াল, বড়মামার হাতের গুণে সে ঘষটানিও মনে হত মখমলে মালিশ৷ অসীম ধৈর্যে সে বাঁদুরে রঙ নরম হয়ে আসত।
দুই, দু'রাউন্ড শ্যাম্পুর আগে মাথার চুলে এক রাউন্ড সার্ফ-ট্রীটমেন্ট পড়ত। এক খাবলা কাপড় কাচার সাবানগুঁড়ো দিয়ে মাথার চুলের দলাইমলাই। সে'টা ধুয়ে ফেলে ক্লিনিক অল্কক্লিয়ারের দু'টো পাউচ পরপর ফায়্যার করা হত৷ তা'তে আবির রঙ গায়েব, চুল মারাত্মক ফুরফুরে। অমন দরদী হেয়ারস্পা কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রীট ঘেঁষা বাহারে সানফ্লাওয়ার সেলুনেও দেখিনি।
আজ ডাভ সাবান শ্যাম্পু দিয়ে গা-মাথা বিস্তর রগড়ে দেখলাম, নেকু অর্গানিক আবিরের কলারও তারা টেনে ধরতে পারছে না৷ ধুস্।