Sunday, March 12, 2023

হাই কোয়ালিটির চা-পাতা

- মেসোমশাই!
- কে? অভ্র? কখন এলি?
- সাতটা বাজে, আলো জ্বালোনি কেন?
- এ বয়সে চোখ অন্ধকারেও ঝাপসা। আলোতেও৷
- দ্যাখো দেখি৷ জানালা-টানালা বন্ধ করে কী গুমোট অবস্থা। তোমার শরীর ভালো হবেটা কী করে।
- একটু চা বসাবি বাবা?
- তোমার বলার আগেই বসিয়ে দিয়েছি৷ আজ বিপুলদার দোকান থেকে শিঙাড়া এনেছি৷ চায়ের সঙ্গে দিচ্ছি, দাঁড়াও।
- শিঙাড়া? সইবে রে? আজকাল তো ভাতেভাত খেলেও অম্বল হচ্ছে।
- দ্যাখো মেসো! বয়স তো কম হল না৷ ফ্যামিলি বলতে ফক্কা, কেউ কোত্থাও নেই। তাই অম্বল-টম্বল নিয়ে বেশি ভেবো না৷ যে'কদিন ভাগ্যে আছে, মনের সুখে ভোগ করে যাও।
- বলছিস? দে' তা'হলে। বুঝলি অভ্র, শিঙাড়ার সঙ্গে যদি দু'টো দানাদার হত..।
- দ্যাখো বুড়োর শখ৷ আজ চা দিয়েই সেরে ফেলো। পরের দিন বরং..আচ্ছা মেসো, সামনের শনিবার সিনেমা দেখতে যাবে? বাংলা সিনেমা এসেছে অপর্ণাতে। প্রসেনজিৎ ঋতুপর্ণা। হেবি হিট করেছে।
- নাহ্, তিন ঘণ্টা বসতে পারব না।
- তোমার সব কিছুতেই বাগড়া। আরে চলো৷ ইভনিং শো, তারপর অলকানন্দা রেস্টুরেন্টে মোগলাই পরোটা। ফেরার পথে দানাদারও হবে।
- ও'সব খেলে পরের দিনই হার্ট অ্যাটাক।
- আরে ধুর। তুমি বড্ড নেগেটিভ মেসোমশাই।। একটু সাহস না করলে চলবে কেন৷
- বেশ বেশ। দেখা যাবে৷ তা, হ্যাঁ রে অভ্র..।
- বলো..।
- তুই ছোকরা মানুষ। ইয়ারদোস্ত আছে৷ হাবেভাবে মনে হয় প্রেমট্রেমও করিস৷ তার ওপর এই বাড়িবাড়ি কাগজ দেওয়ার কাজটা নিশ্চয়ই খুব খাটনির৷ রোজ বিকেলে যে এসে পড়ে থাকিস..কেন?
- তোমার সম্পত্তি হাত না করে ছাড়ছি না৷
- আছে বলতে এই চৌকি৷ ওই আলমারি। আর ব্যাঙ্কে দু'চার পয়সা যা আছে, তা দিয়ে তোর দীঘাও যাওয়া হবে না।
- মেসোমশাই..চা।
- শিঙাড়াটা?
- নোলা দ্যাখো। দাঁড়াও৷ আনি৷
- হে হে হে।
- মেসো। ও মেসোমশাই।
- যাবে? সিনেমা দেখতে?
- যাব?
- যাবে?
- যাব। বেশ।
- সুপার! টিকিট কেটে রাখব৷ এই যে, শিঙাড়া।
- কেন আসিস? অভ্র?
- কী'সব ফালতু প্রশ্ন আজ শুরু করেছ৷ বলি, কাগজের টাকা ফাঁকি দেবে না তো? ও'টা বিজনেস৷ ও'খানে কিন্তু বাপ-মাকেও রেয়াত করা নেই মেসো৷ বলে রাখলাম।
- বল না। খামোখা রোজ আসিস কেন?
- এই৷ তুমি বাপ-মা নও৷ ইয়ারদোস্ত নও। প্রেমিকা নও। তোমার সঙ্গে গপ্পে হিসেব নেই৷
- তুই হিসেব ছাড়া গপ্প করতে আসিস?
- জানো মেসো৷ তুমি আমায় কথা বলতে দাও৷ যা খুশি তাই৷ যা খুশি তাই৷ কাজেই, আমি কিন্তু নিজের ধান্দাতেই আসি৷
- কী'সব যে তুই বলিস।
- তুমি কি আমায় বাপ-মায়ের মত চেনো? কাঁচকলা। তুমি কি আমায় শ্যামলীর মত চেনো? ধুর ধুর৷ ঘোঁতনা, বাবলা, নীলু; এরাও আমায় তোমার চেয়ে অনেক বেশি চেনে, ছেলেবেলার বন্ধু বলে কথা৷ অথচ দ্যাখো, একমাত্র তুমিই জানো যে আমার হেমেন-পুরুতের মন্ত্র পড়ার স্টাইলে কাগজ পড়তে হেব্বি ভালো লাগে৷ শুধু তুমিই জানো যে আজকাল আমি চায়ে ডুবিয়ে আলুর চপ খাচ্ছি। শুধু তুমিই জানো আমার সাইকেলের সঙ্গে অটোর ধাক্কা লেগেছিল গত বিস্যুদে৷ সমস্ত হাবিজাবি কথা তোমায় যে কী'ভাবে বলে ফেলি..। কোনও কথাই কাজের নয়, অথচ..।
- অভ্র। শোন না৷ আমি টাকা দেব, কাল ভালো চা-পাতা এনে দিবি? আমি নাম বলে দেব৷
- ঠিক হ্যায়। এনে দেব।
- হাইকোয়ালিটির চা-পাতা না থাকলে বাজে গপ্প জমবে কী করে বল?
- হে হে হে।

আর বলবেন না মশাই

মুখে (ছবি বিশ্বাস ঘ্যামে):
"একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, বুঝলেন"। 😎

মনে মনে (তুলসী চক্কোত্তির হাঁপানি-সহ):
"আর বলেন কেন। ব্যাঙ্ক একটা ফ্ল্যাট কিনে আমায় বহু বছরের জন্য ভাড়া দিয়েছে। এমন বিটকেল বাড়িওলা যে উঠে যেতে চাইলেই জুতোপেটা করবে৷ কী ঝ্যামেলা বলুন দেখি"। 🥲

Thursday, March 2, 2023

লুচি-চাই লুচি-চাই



নিজেকে সবসময় বুঝিয়ে চলেছে যে  মনের মধ্যে সবসময় ওই লুচি-চাই লুচি-চাই ভাবটাকে জিইয়ে রাখতে হবে। লুচি-চাই লুচি-চাই ভেবে যাওয়া মানে অবশ্য গাণ্ডেপিণ্ডে লুচি গিলে যাওয়া নয়। শরীর -স্বাস্থ্য বলে একটা ব্যাপার আছে তো; সমুদ্র ভালো লাগে বলেই তো আর রোজ বিকেলে স্বর্গদ্বারের সমুদ্রে গোড়ালি ডুবিয়ে গামছা কাচতে বসব না। তাছাড়া বয়স ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়, হজম-শক্তি আর আগের মত নেই। পোড়া তেলে কাউকে চপ-ফুলুরি ভাজতে দেখতেই গলার কাছটা কেমন জ্বালাজ্বালা করে। এ'সব রূঢ় সত্যকে তো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তবে ওই লুচি-চাই লুচি-চাই ভাবটা হচ্ছে মনের তরতাজা থাকার লক্ষণ। সে'টাকে টিকিয়ে রাখাটা আমার দায়িত্ব।

ছোটবেলায় শরীর কেমন যাচাই করতে হলেই দাদু বলত, "জিভ বের করো দেখি ভাই"। জিভের রঙ বিচার করে দাদু অ্যানালাইজ করতেন শরীরস্বাস্থ্য কেমন আছে। সে'ভাবেই, মনের হাল-হকিকত বুঝতে হলে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, "কী ব্রাদার, লুচি হবে নাকি খান কয়েক"? যদি মনের মধ্যে "একটু লুচি পেলে বড় ভালো হত" গোছের আনচান শুরু হয়ে যায়, তা'হলে বুঝতে হবে সমস্ত ঠিক আছে, সূর্য-চন্দ্র ঠিকঠাক ওঠানামা করছে, মানুষ এখনও কবিতা লিখছে, শ্যামল মিত্রের গান এখনও বুকে হুহু জেনারেট করছে, ইয়ারদোস্তরা এখনও টিকে আছে, প্রেমের চিঠি লেখার ক্ষমতা এখনও খতম হয়ে যায়নি, বাজে চুটকিতে এখনও হো-হো করে হাসতে হাসতে খাট থেকে গড়িয়ে পড়তে পারি। কিন্তু, যদি কখনও মনে হয়; নাহ্‌, এই অবেলায় লুচির কোনও দরকার নেই। তা'হলে বুঝতে হবে সর্বনাশ। লুচি-না-চাওয়া-ভ্যাপসা মন-মেজাজ দিয়ে এ দুনিয়ায় কোনও কাজের কাজ করা সম্ভব নয়। যে মন লুচি সম্বন্ধে নিঃস্পৃহ, তাকে ভরসা করলে ঠকতেই হবে যে। কাজেই, যদ্দিন মনের মধ্যে লুচি-চাই লুচি-চাই ভাব, তদ্দিনই জ্যান্ত।

Saturday, February 25, 2023

কবিতা কাহারে বলে, গান কাহারে বলে



মগজ ব্যাপারটা যে কী ধুরন্ধর চিজ। আর আমার মত গাম্বাট মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের নিজেদের মাথাই যথেষ্ট।

আমার বুকশেলফে, কোনও অজানা কারণে কয়েকটা কবিতার বই আছে। কলকাতার কম্বলদের মতই, সে'সব বইদের সচরাচর ঘাঁটানো হয়না। আবার কলকাতার মানুষের মতই, আজ হঠাৎ উথলে ওঠা হুজুগের বশে সে'সব কম্বল...থুড়ি বইদের তাক থেকে নামালাম। উল্টেপাল্টে দেখেটেখে, ধুলোটুলো ঝেড়ে তাকের বই তাকে ফেরত যাবে, তেমনটাই হওয়ার কথা। কী মনে করে দু'একটা কবিতা পড়ার চেষ্টা করলাম। খানিকটা শক্তি, খানিকটা সুনীল, খানিকটা শঙ্খ। নিজের ওপর গর্ব হচ্ছিল, কবিতা পড়ছি ভেবে। আরে, কবিতা মানে গানই তো, সুরটাকে নিজের মত মনে মনে বসিয়ে নিলেই অ্যাপ্রিশিয়েশন ব্যাপারটা তরতরিয়ে বইবে। 

যা হোক, সে'সব কবিতার বইয়ের ফাঁকে একটা বই ছিল রবিস্যারের শ্রেষ্ঠ কবিতার। সে'গুলো বেছে নিয়েছেন সুনীল গাঙ্গুলি স্বয়ং। বইয়ের শুরুতে একটা চমৎকার মুখবন্ধ লিখেছেন সুনীল; শিরোনাম - "রবীন্দ্রনাথ এবং আধুনিক কবিতা"। কবিতা বুঝিনা, তায় আবার আধুনিক। রবীন্দ্রনাথ বুঝি, সে'কথা বলার দুঃসাহসও নেই। তবে বাংলা ভাষাটা যেহেতু খানিকটা বুঝি, তাই মুগ্ধ হয়ে পড়াটা ঠেকায় কে।

তা সেই বইয়ের দ্বিতীয় কবিতা একটা গান; সখী, ভাবনা কাহারে বলে। অনেকের মতই, এ গানটা আমার মুখস্থ; কমা, ফুলস্টপ, হাঁচি, বিষম সহ। আমার গলায় সুর নেই, প্রাণে কবিতা নেই; অথচ এ গান গাইতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। কাজেই, কবিতা হিসেবে এই গানটা বইয়ের পাতায় ছাপা আছে দেখে প্রথমেই মনে হল; এ পড়ে হবেটা কী, পুরোটাই কণ্ঠস্থ তো। চোখ বুজলেই এ গান কানে-বুকে বেজে উঠবে; মায়ের গলায়, শ্রাবণী সেনের গলায়। সে গান আবার বইতে পড়তে যাব কেন?

তবু। মানুষ হয়ে জন্মেছি যখন, হিসেবের বাইরে পা না রাখলে চলবে কেন? শুরু করলাম পড়া। এ'খানেই সেই মগজের চমক। আমি যা লিখছি তা হয়ত গোটাটাই অযৌক্তিক; তবে যুক্তিবাজ হলে কী আর ব্লগ লিখে লিঙ্ক শেয়ার করে মানুষজনকে জ্বালিয়ে মারি। কাজেই লিখেই রাখি। কী অদ্ভুত, মুখস্থ একটা গান; সে'টাকে যখন সাদা কাগজের ওপর কালো ছাপা অক্ষরে পড়ছি; কানের বদলে চোখ অ্যাক্টিভেট হচ্ছে, চেনা সুর আবছা হয়ে একটা অন্য রিদম আবিষ্কার করছি এ লাইন থেকে ও লাইনে যাওয়ার সময়। এ গানের সুরের ম্যাজিক বর্ণনা করার দুঃসাহস আমার নেই। কিন্তু কবিতাটা পড়তে গিয়ে, সে সুর সরে গিয়ে যে'টা পড়ে রইল; সে'টাকেও একটা অন্য জাতের জাদু হিসেবে মগজ চিনে নিল। প্রতিটা শব্দই পূর্বপরিচিত, অথচ পড়তে গিয়ে দেখলাম তারা সক্কলে অন্য মেজাজে উঠে দাঁড়ালে। গানের মানে পালটে গেল না, তবু সে কবিতাটা গানের থেকে আলাদা হয়ে ধরে দিল যেন। সে লেখা সুরের সঙ্গে মিলে একটা জলতরঙ্গ সৃষ্টি করেছে বটে, কিন্তু কথাগুলো সুরের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। সুর বাদেও তাদের অস্তিত্ব জোরালো; জমজমাট।

একটা নতুন কবিতা পড়ে ফেলল মগজ। বহুবার শোনা গানটার সঙ্গে যাকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না কিছুতেই। ভাগ্যিস সুনীলবাবু এ গানকে "রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কবিতা"র বইয়ের প্রথম দিকেই চালান করেছেন। নয়ত টের পেতাম কী করে সুরের পরিচয়টাই কবিতার জন্য শেষ কথা নয়? আর আমাদের মত গদ্য-গাম্বাটদেরও কবিতার জগতে স্থান আছে, সে'টাকেও ক্লেম করতে হবে তো।

Friday, February 24, 2023

ছোটবেলার স্মৃতি আর কয়েকটা বইয়ের টুকরো



বই পড়ার মধ্যে আর ডিসিপ্লিন আনা হলো না। এ বইয়ের দু'পাতা, ও বইয়ের চার পাতা, তার পাশাপাশি আর এক বইয়ের দু'প্যারাগ্রাফ৷ এইভাবেই খামচাখামচি করে ঢিকিরঢিকির করে এগোনো। কোনও বই হপ্তাখানেকে শেষ হয়, কোনও বই কয়েক মাস জুড়ে এগিয়ে চলে৷

অনেকগুলো বই পাশাপাশি বেহিসেবি স্টাইলে পড়াটা নির্ঘাৎ একটা "ব্যাড হ্যাবিট"৷ তবে সেই বদভ্যাসের মধ্যে একটা মজাও আছে; অনেক সময় সম্পূর্ণ আলাদা কয়েকটা বইয়ের মধ্যে খুব মনোগ্রাহী কিছু যোগসূত্র বেরিয়ে পড়ে৷ আর মনের লাটাইয়ে সেই যোগাযোগের সুতো জড়িয়ে চলায় যে কী প্রবল আরাম আর আনন্দ, আহা! 

এই যেমন অরুণাভ সিনহা কয়েকটা সহজ প্যারাগ্রাফের মধ্যে দিয়ে কী সুন্দরভাবে লিখেছেন ছেলেবেলায় মায়ের মুখ থেকে গল্প শোনার কথা৷ বলেছেন কী ভাবে মায়ের পড়া গল্পের রেশ ধরেই বাংলা ছোটগল্পের চমৎকার দুনিয়াটাকে আত্মস্থ করেছেন তিনি৷ সেই ছোট্ট পরিচ্ছেদে, উপন্যাসের আর ছোটগল্পের মধ্যে যে মৌলিক তফাৎ, তা নিয়েও চমৎকার কয়েকটা কথা বলেছেন। কিন্তু সেই সব অ্যানালিসিসের বাইরে গিয়ে যে'টা উজ্জ্বল সে'টা হল তার ছেলেবেলার স্মৃতির ঝলক।

আবার এর পাশাপাশি পড়ছি নাসিরুদ্দিন শাহর ছেলেবেলায় স্মৃতিচারণ৷ আত্মকথা বেশ কিছু পড়েছি৷ কিন্তু সততা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে রূপকথা বলার স্টাইল যে এমন নির্ভেজাল ভাবে মিশতে পারে, সে'টা আগে টের পাইনি। ভদ্রলোক আরও লেখেন না কেন? সিনেমা এবং অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়ার নিয়ে লিখতে গিয়ে যেন কুয়াশাঢাকা কবিতার মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছেন ভদ্রলোক; ছেলেবেলাটা যেন কবিতা৷ ব্যথা, যন্ত্রণা, ট্রমা, হতাশা সত্ত্বেও সেই কবিতা সুমিষ্ট।

আর এর সঙ্গে পড়ছি (অডিওবুক, অতএব শুনছি) স্টিফেন ফ্রাই সাহেবের আত্মজীবনী৷ এই আর এক ভদ্রলোক। ঠোঁটকাটা অথচ কাটখোট্টা নন, সোজাসাপটা কথার মানুষ অথচ রূঢ় নন৷ তাঁর ভাষা যতটা সহজ, ততটাই গভীর; যতটা সরল, ততটাই স্মার্ট হিউমরে ঋদ্ধ। সেই প্রাণোচ্ছল ভাষা নিয়ে ফ্রাইবাবু নিজের ছেলেবেলায় ফিরে গেছেন৷ অঙ্কের হিসেবে সে শৈশবকে নিশ্চিন্তে অন্ধকারাচ্ছন্ন বলা যায়; ছোট্ট স্টিফেনের মধ্যে অকারণ মিথ্যে বলার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে, সে চুরি করছে, লোক ঠকাচ্ছে, নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে৷ সে'সব কথা সোজাসুজি সাজিয়েও দিচ্ছেন ফ্রাইবাবু, ইনিয়েবিনিয়ে নিজেকে অসহায় প্রতিপন্ন করতে চাইছেন না৷ অথচ কী আশ্চর্য; সেই স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও তাঁর ছোটবেলার গল্পগুলো তিতকুটে হয়ে উঠছে না৷ বরং চমৎকার নভেলের মত তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে৷ 

ছোটবেলার স্মৃতির মধ্যে যে কী মায়া৷ সে স্মৃতিতে অঙ্কস্যারের মুখচোপার স্মৃতি ফিকে হয়ে যায় আর আলোয় আলোময় হয়ে ওঠে অঙ্কখাতার পাতায় নোট করা ক্রিকেট স্কোর। কমিক্স বইয়ের ছিঁড়ে যাওয়া মলাট মনে পড়ে, মেটে রঙের লক্ষ্মীর ঘটের গায়ে স্কেচপেনে আঁকা ডোনাল্ড ডাক মনে পড়ে। আর সে অদরকারী সমস্ত স্মৃতির টুকরোর মধ্যে মারাত্মক সব "লাইফ লেসন" মিশেছ,  মাঝবয়সে এসে এ'সব থিওরি কপচাতে কপচাতে নিজেকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে; "নাহ্, আমি মানুষটা নেহাৎ ফেলনা নই"৷ ইচ্ছে করে, সে বয়সের আমিটার মাথায় যদি হাত বুলিয়ে বলি, "ভালোভাবে থেকো খোকা, কেমন"? আর সেই ইচ্ছেটাই আমার মত এলেবেলে পাঠককেও সহজেই জুড়ে দেয় অরুণাভ, নাসির বা স্টিফেনের সঙ্গে। 

(ছবি: দ্য সানি-সাইড-আপ, শিল্পী: বালিশেন্দ্র)