Sunday, December 18, 2022

কমলবাবুর ভূত



মরে গিয়ে বেঁচে গেছে কমল দত্ত৷ জীবনের অ্যাটিচিউডটাই পালটে গেছে।

কী হলো, এ'তে নাক সিঁটকানোর কী আছে; মরলে কি আর জীবন থাকতে নেই? আজ জ্যান্ত বলে টের পাচ্ছেন না, একদিন ঠিক বুঝবেন; জীবন অত ঠুনকো নয়।

যাকগে। কমল দত্ত প্রসঙ্গে আসি৷ মাস তিনেক আগে সামান্য একটা বিষম খেয়ে অক্কা পেয়েছিলেন বাহান্ন বছরের ভদ্রলোক। গিন্নীর সঙ্গে রোজকার সকালের ঝগড়াঝাটি সেরে, ছেলের সঙ্গে নিয়মমাফিক খানিকক্ষণ খিটখিট করে বাজার করতে বেরিয়েছিলেন৷ নিমাইয়ের পানের দোকানে দাঁড়িয়ে 'একটা ফ্লেক দে দেখি' বলা মাত্রই টুক করে সেই বিষম; অমনি কমল দত্ত সটান রাস্তায়। ওই শেষ৷ 

অমন টাস করে মরে গিয়ে সামান্য মনকষ্টে ছিলেন বটে কমলবাবু৷ আরে মরার একটা তোড়জোড় চলবে তো; কোনও পেল্লায় অসুখ, নিদেনপক্ষে একটা মিনিবাসের ধাক্কা; কোনও একটা ধামাকা-টামাকা। তা নয়, একটা মিউমিউ মার্কা বিষম৷ ধ্যাত্তেরিছাইছাতারমাথা। 

কিন্তু সেই তিতিবিরক্তি ভাবটা দিনকয়েকের মধ্যেই কেটে গেল৷ ক'দিন কলকাতার ওপর দিয়ে ভেসেটেসে বেরিয়ে টের পেলেন যে শরীরটা বেশ ঝরঝরেই আছে৷ ওই দ্যাখো, ফের নাক সিঁটকানো। আরে জ্যান্ত মানুষের লম্ফঝম্পটুকুই শারীরিক ইয়ে হল? কমলবাবু যে হাওড়া ব্রিজের ডগায় পতাকার মত নিজেকে টাঙিয়ে রেখে পতপত করে সন্ধে কাটান, সে হাইক্লাস শরীর কে অ-মড়ার চোখ দেখতে পারছে না বলে তার মূল্য নেই? আছে৷ আলবাত আছে।

মোটমাট পিকনিকের মেজাজে দিন কাটছিল কমলবাবু৷ ভোরের দিকে ঘণ্টাখানেক ভিক্টোরিয়ার সিলিংয়ের গন্ধ শোঁকা, বেলার দিকে মিনিবাসের ভিড়ে পকেটমার খুঁজে খুঁজে কাতুকুতু দেওয়া (বাজে প্রশ্ন করবেন না, ভূতেরা কাতুকুতু দিতে পারে৷ নিজে মরে গিয়ে থাকলে এমন বাতিকগ্রস্ত প্রশ্নগুলোকে আস্কারা দিতেন না), দুপুরবেলা কলেজস্কোয়্যারের জলে ডলফিনের মত দোল-দোল-দুলুনি খেলা, বিকেলের দিকে চট করে একটু পুরীর সমুদ্রের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আসা (আছে। ভূতের গাও আছে, গা ম্যাজম্যাজও আছে) আর রাতটা ওই হাওড়া ব্রিজের পতাকা হয়ে কাটানো। ভালো না থেকে কি উপায় আছে? 

আর মেজাজ সবসময় শরিফ। আর পাঁচটা ভূত মুখোমুখি হলেই কমল দত্ত সাহেবি কায়দায় তাদের "হেল্লো" বলছেন। সঙ্গত না পেলে কারণে অকারণে নিজের সঙ্গে নিজে মাইডিয়ার গল্প জুড়ছেন৷ গত মঙ্গলবার তো নিজেকে এমন একটা চুটকি শোনালেন যে বিস্যুদ পর্যন্ত হাসি থামেনি ভদ্রলোকের। চুটকিটা পুরনো, কিন্তু এমন বিউটিফুল স্টাইলে ব্যাপারটাকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন, যে কমলবাবু নিজেই অবাক৷ কতবার ভাবলেন, "আহ্, বেঁচে থাকতে যদি অফিসের জমায়েতে এমন দু'চার পিস ছাড়তে পারতাম"। অবশ্য সে'টা ঠিক আফশোস নয়৷ কমল দত্ত জানে যে গুণীমানুষ সৃষ্টি করবেন নিজের তৃপ্তির জন্য, অন্যের বাহবা কুড়োতে ছুটবে পাতি পাবলিক। 

মোট কথা; এই মারাত্মক কনফিডেন্স ব্যাপারটা বেঁচে থাকতে টের পাননি কমলবাবু৷ কিন্তু এখন? এখন তাঁকে পায় কে৷ মরার আগের দিন পর্যন্ত গিন্নীকে গল্প করতে ডাকতেও কিঞ্চিৎ নার্ভাসনেস বোধ করতেন৷ অথচ আজ তাঁর বড় ইচ্ছে রবীন্দ্রনাথ বা সুভাষবাবুর আত্মাকে পাকড়াও করে একটু আড্ডা দেওয়ার৷ কাজেই মরে গিয়ে তার আনন্দের সীমা নেই৷ 

সেই আনন্দের স্রোতে গা ভাসিয়ে এক বৃষ্টির বিকেলে গঙ্গার ওপর উড়ে বেড়াচ্ছিলেন৷ এমন সময় ধাক্কা৷ কনফিডেন্সের জন্য ধাক্কা ব্যাপারটা মোটে ভালো নয়৷ কমলবাবুর ধারণা ছিল ধাক্কা ব্যাপারটা ভূতেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়৷ কনফিডেন্সটা আরও কয়েক ইঞ্চি নেমে গেল যখন কমলবাবু বুঝলেন যে ধাক্কাটা লেগেছে আর এক ভূতের সঙ্গে৷ কিন্তু মারাত্মক ব্যাপারটা অন্য জায়গায়; এই নতুন ভূতটাও কমলবাবুই৷ 

রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পেলে অসুবিধে ছিল না৷ কিন্তু নিজেকেই দেখতে পেয়ে কমল দত্তর গলা-বুক শুকিয়ে গেল (শুনুন, ভূতের গলা নেই, বুক নেই বলে ঘাবড়ে গেলে গলা-বুক শুকোবে না; এমন একগুঁয়ে বস্তাপচা ওপিনিওন আঁকড়ে বসে থাকবে না প্লিজ)। 

- এ কী! এ কী! আমার যমজ ভাইটাই ছিল নাকি?

- এক পিসই তো কমল দত্ত ভাই৷ নো যমজ বিসনেস৷ 

- তা'হলে?

- তা'হলে কী?

- আমি না হয় কমল দত্ত ভূত৷ কিন্তু আপনি স্যার?

- মানুষ একটা বলে ভূতও একটা হবে নাকি?

- হবে না?

- মোটেই না৷ কমল দত্তের অজস্র ভূত মার্কেটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে৷ এই যেমন আমি নিজেই হলাম গিয়ে বাইশ নম্বর ভূত।

- ব্যাপারটা বড্ড সাসপিশাস ঠেকছে। 

- এ'পাড়ায় নতুন তো, তাই অবিশ্বাস আর বাতিক এখনও ঝেড়ে ফেলতে পারেননি৷ ক'দিন যাক, একটু সেঁকা হয়ে গেলেই এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আর কনফিউশন থাকবে না৷ 

- ইয়ে, তা'হলে একটা কমল দত্ত মরে কতগুলো ভূত তৈরি হল?

- আরে এ কি সোনার গয়না নাকি যে একটা বালা গলিয়ে গণ্ডাখানেক দুল গড়াবেন৷ ভূত তৈরি হওয়ার জন্য কমল দত্তকে অক্কা পেতে হবে কেন?

- বাহ্, বিষম খেয়ে মারা যাওয়ার পরেই তো আমার ভূত হওয়া৷

- কত শখ মাইরি৷ সামান্য গ্যাস-অম্বল। নেকু একটা বিষম৷ তা'তে নাকি একটা একটা গোটা মানুষ পটল তুলবে৷ আরে মামারবাড়ির মোয়া নাকি৷ ও বুকে-পিঠে গ্যাসের ধাক্কায় একটু মাথা ঘুরে গেছিল আর চোখে অন্ধকার৷ তা'তেই মাঝরাস্তায় ধপাস৷ মুখে জল দিতেই যে কমল দত্ত সে কমল দত্ত৷ 

- আমার কেমন মাথাটা ঝিমঝিম করছে।

- তা ভূত বলে তো কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি যে মাথা ঝিমঝিম করবে না৷ করছে করুক৷ 

- কমল দত্ত বেঁচে আছে? তা'হলে আমি আপনি এলাম কোথা থেকে? এ কী বিশ্রী ব্যাপার।

- ভাইটি৷ হৃৎপিণ্ডের থেমে যাওয়াটাই কি একমাত্র মৃত্যু?  

- নয়? আরও ভ্যারাইটি আছে?

- প্রতিট মানুষ যে বেঁচে থাকতে থাকতেই কতবার মারা যাচ্ছে৷ এই যেমন আমি। গ্যাস্ট্রিকের প্রবল জ্বালায় যে'দিন থেকে কমল দত্তকে তেল-ঝাল-মশলা-শিঙাড়া-তেলেভাজা ছাড়তে হল; কমল দত্তের ভিতরের কবি মানুষটা জাস্ট মরে গেল৷ ডেড, ডিমলিশড৷ খতম৷ ব্যাস, ওই ট্র‍্যাজেডি থেকেই আমার যাত্রা শুরু। 

- জাস্ট ভেবড়ে যাচ্ছি। 

- বডি শ্মশানে যাচ্ছেনা বলে কি সে মৃত্যুগুলো এলেবেলে ভাই? ইন্সুরেন্স ক্লেম করা যাচ্ছে না বলে কি সে' মড়ার দাম নেই? আছে। দাম আছে৷ আর মৃত্যু থাকলেই ভূত৷ এই যেমন আমি। কমল দত্তের গ্যাস্ট্রিককে কাঁচকলা দেখিয়ে গোটা সকালটা কাটাই ওই স্টেশন বাজারের দত্ত সুইটসের কচুরিভাজার কড়াইয়ে বাটারফ্লাই স্ট্রোক দিয়ে৷ বেলার দিকে জগিং, জগার রোলের চাটুর ওপর৷ দুপুরের প্রাণায়ামটা সারি চ্যাটার্জিদের রাঁধুনি রমাকান্তর রান্না করা কোনও আইটেমের মধ্যে সেঁধিয়ে। লোকটা যা তেলমশলা দিয়ে রাঁধে; চ্যাটুজ্জ্যেদের বংশ নির্বংশ হতে আর বেশি দেরী নেই৷ সন্ধ্যের দিকে আবার গণশার তেলেভাজার দোকানে..।

- থাক থাক৷  বুঝেছি। কিন্তু যে'টা বুঝছি না সে'টা হল কোন কমল দত্তের গোপন লাশের ওপর আমি তৈরি হলাম।  

- সব জানবে ভাই৷ ক'দিন আর হল৷ 

***

হাসি মুখে বাজারের থলেটা গিন্নীর হাতে দিয়ে ছেলের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন কমল দত্ত। 

"সমু, কাল রাতের খেলাটায় কে জিতল রে"? দরজায় উঁকি দিয়ে মিহি গলায় প্রশ্ন করেন কমলবাবু। সমু একটা ইংরেজি নভেলে মগ্ন, একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে; " ক্রোয়েশিয়া"। 

"তোর আজ কলেজ নেই"?
এ'বার আর উত্তর এলো না।

" সমু, আজ ফ্যান্টাস্টিক পাবদা এনেছি রে"। 
সমু এ'বার একটু দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে; "সকাল সকাল বাজে না বকলেই নয়? খাওগে যাও পাবদা"।

"সরি সরি। সত্যিই, মন দিয়ে কিছু পড়ার সময় কানের কাছে কেউ ভ্যানরভ্যানর করলে কী বিচ্ছিরি যে লাগে৷ তুই পড়৷ আমি বরং রেডি হই"।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিনতি সবই শোনে৷ আচমকা মানুষটার জন্য একটু কষ্ট হয়৷ মাসখানেক ধরে কী যেন হয়েছে ওর। কী ভীষণ জমজমাট তর্কবাগীশ এক মানুষ ছিল, নানারকম শখ আহ্লাদে ভরপুর। সংসারের ঠেলা সামলাতে শশব্যস্ত মিনতির প্রায়ই বিরক্ত লাগত বড়৷ এত বছর সংসার করার পরে কমলের এই শখের প্রাণ মার্কা স্বাভাবটাকে প্রায়ই অসহ্য লাগত মালতির৷ সবসময় সে নিজের খেয়ালে ব্যতিব্যস্ত। ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম বাকি রয়েছে অথচ বাবু পাড়ার ছেলেদের পিকনিক করাতে নিয়ে যেতে চান নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে৷ মালতি বলছে মেজপিসির মেয়ের বিয়েতে না গেলেই নয়, কমল বলছে 'ধুর, চলো দীঘা যাই'। সমুর সঙ্গেও হাজার রকমের তর্ক লেগেই থাকত। আবার ভুল করলেও তর্কে ঘাটতি নেই৷ ইদানিং ঝগড়াটা বড্ড বেড়ে গেছিল।

কিন্তু গত মাস তিনেকে এক ঝটকায় যেন সব পালটে গেল৷ কোনও কথায় আর না নেই কমলের। যে কোনও ব্যাপারে মানিয়ে নিচ্ছে৷ সবসময় শান্ত, মুখে স্মিত হাসি। হুজুগের আর বালাই নেই। মিনতির অবাক লাগে৷ কখনও মনে হয় যাক, এদ্দিনে লোকটা সংসারী হল৷  আবার মাঝেমধ্যেই মনকেমনও হয়৷ কোথায় গেল চেনা মানুষটা? কোথায় সেই চেনা হুজুগে কমল দত্ত?

মালতির বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে ওঠে।

Tuesday, December 13, 2022

কবিতা অভিযান



- কী রে..এই সুমন..সবাই তোর খোঁজ করছে..আর তুই স্টেজের পিছনে এমন ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে আছিস..। চ'।
- দেবুদা।
- আরে কথাবার্তা পরে হবে৷ শ্যামলের পরেই তোকে স্টেজে উঠতে হবে৷ এদ্দিন সাধ্যসাধনা করে তবে তোর কবিতা পড়ার জন্য পাঁচ মিনিটের স্লট আদায় করতে পেরেছি৷ সামান্য দেরী হলে আর তোকে অ্যাকোমোডেট করবে না।
- দেবুদা, কবিতা আমি পড়ব না৷
- হোয়াট? তুই খেপেছিস? তোকে পড়তেই হবে৷ অডিয়েন্সে দীপকদা, সুমিত হাজরা আর অরুন্ধতীর মত কেউকেটারা বসে আছে৷ আমি নিশ্চিত একবার তোর মুখে তোর লেখা শুনলে হাজারো বড় অপরচুনিটি আসবে৷ সুমন, ক্যুইক৷
- আহ্, দেবুদা৷ আমার কবিতা পাচ্ছে না৷
- হোয়াট! কবিতা কি ইয়ে নাকি৷
- আমার আচমকা মনে হচ্ছে..।
- তুই অফিস কামাই করে কবি সম্মেলনে এলি, এখন বলছিস পড়বি না কবিতা! ইয়ার্কি নাকি!
- এক কথা বারবার জিজ্ঞেস করছ কেন৷ আমার আচমকা মনে হচ্ছে কবিতা পড়ার কোনও দরকার নেই৷ ইন ফ্যাক্ট, অফিস কামাই করেছি বলে বেশ একটা রিগ্রেট হচ্ছে।
- তোর শরীর ঠিক আছে সুমন?
- তুমি বোধ হয় জিজ্ঞেস করতে চাইছ আমার মাথা ঠিক আছে কিনা৷ তা'হলে বলব এদ্দিন পর মাথাটা ঠিক হয়েছে৷ হঠাৎ বুঝতে পারছি যে চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গেল৷
- কী'সব আগডুম-বাগডুম বলছিস! আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড?
- মাথা তোমাদের বিগড়েছে৷ কী পাও এ'সব কবিতা-কবিতা করে শহর মাথায় তুলে? কে পড়ে তোমার ছাপানো লিটল ম্যাগাজিন? তোমাদের কবিতা সবটুকুই তো ফেক আর ফাঁপা। এ পড়ে ওর পিঠ চাপড়াচ্ছে, ও পড়ে এর পিঠ চুলকে দিচ্ছে।
- বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু সুমন।
- আমিও বলিহারি৷ ইঞ্জিনিয়ারিং করে এত ভালো একটা চাকরিতে ঢুকে মাথায় যে কী ভূত চাপল..দিনের পর দিন অফিস কামাই করে আমি ভস্মে ঘি ঢালছি।
- সুমন শোন..যাস না..।
- দেখো দেবুদা৷ তোমাদের এই ম্যাগাজিন রইল কি গেল তা'তে কারুর কিছু এসে যায়না৷ ওই দীপক, সুমিত, অরুন্ধতীরা তাও এর ওর পা চেটে নিজেদের একটা স্টেটাস আর সরকারি পেট্রোনেজ বাগিয়ে নিয়েছে। তোমার আছেটা কী? অপ্রিয় সত্যটাও বলে রাখা ভালো৷ তুমি একজন পাতি রেলের ক্লার্ক৷ ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়িয়ে কবিতা সম্মেলন করাটাই তোমার জন্য একটা অ্যাচিভমেন্ট। কিন্তু আমার সামনে একটা প্রমিসিং কেরিয়ার আছে৷
- তুই আমায় যত গাল দেওয়ার দে৷ কিন্তু তা বলে, হুট করে লেখালিখি ছেড়ে দিবি?
- পোয়েট্রি ইজ ডেড টু মি৷ এখন যা লেখার সে'টা লিঙ্কডইনেই হবে৷ আসি৷
- স্রেফ আধঘণ্টার মধ্যে এমন কী হল..।
- বোধদয়৷ যাকগে৷ আমি আসি৷ আর প্লীজ আমায় ফোন কোরো না।
****
- নন্দিনী৷ হোয়াট অ্যান অনার টু মিট ইউ৷ আমি সুমন৷ সুমন দত্ত।
- ডমিনিক অ্যান্ড গ্লস্টার্সের সি-ই-ও৷ ম্যাগাজিন কভারের বাইরে আপনাকে দেখতে পাওয়াটা তো আমারই সৌভাগ্য মিস্টার দত্ত।
- প্লীজ৷ আমায় এমব্যারাস করবেন না৷ আর, একটা রিকুয়েস্ট৷ সুমন বলেই ডাকবেন।
- এই ধরণের কর্পোরেট জমায়েতে আমাদের মত কবিদের খাপ খাইয়ে নেওয়াটা খুব একটা সহজ নয়..। ইন ফ্যাক্ট, ইনভিটেশনটা পেয়ে আমি নিজেই খুব অবাক হয়েছিলাম..। আপনাদের পার্টি মানেই তো খানাপিনার সঙ্গে গানবাজনা। আধুনিক কবিতারও যে কর্পোরেট মহলে ডিমান্ড আছে..।
- সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আপনার কবিতা শুনেছে নন্দিনী৷
- আর আপনি?
- টু বি অনেস্ট উইথ ইউ, আমার কবিতা সম্বন্ধে কোনও ইন্টারেস্টই নেই৷ অন্তত যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলি। কিন্তু আজ আপনার কবিতা শুনে অনেকদিন পর থমকে দাঁড়ালাম, জানেন৷ মনে হল..।
- মনে হল?
- মনে হল দু'দণ্ড জিরিয়ে নিই। কদ্দিন পর হঠাৎ পুরনো পাড়ার কথা মনে পড়ল, জানেন। পুকুরপাড়ে বসে আমি আর তপন ফুটবলের গল্প করতাম। সে'সব বিকেলগুলোর গন্ধ হঠাৎ নাকে ফিরে এলো৷ মায়ের চুলে বিলি কেটে দেওয়া মনে পড়ল৷ বাবার প্রিয় খদ্দরের পাঞ্জাবিটা গালে ঠেকলে যে ভালোলাগা খসখসটা টের পেতাম, সে'টা যেন আবার গালে ফিরে এলো৷ মানে, হঠাৎ এই অফিসপার্টির থেকে যে ছিটকে গেলাম৷ স্রেফ আপনার কবিতা শুনে।
- সুমনবাবু, আর যাই হোক, আপনার মধ্যে কবিতার অভাব নেই।
- হেহ্৷ এককালে হয়ত আমার মধ্যে ছিঁটেফোঁটা কবিতা ছিল৷ তবে এখন আর..। সে যাকগে৷ ইয়ে, একটা থ্যাঙ্ক ইউ বলি৷ আপনার কবিতার মতই, আপনার কথাবার্তা খুবই কম্ফর্টিং৷
- সুমনবাবু, আমি পার্টির ইনভিটেশনটা কেন এক্সেপ্ট করেছি জানেন? আমি এ'সব জায়গা পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি কিন্তু৷
- কেন? ইনভিটেশন এক্সেপ্ট করলেন কেন?
- আপনার সঙ্গে দেখা করব বলে৷
- এক্সকিউজ মি? আপনি আমায় চিনতেন?
- ওই, বিজনেস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ দেখে চেনা নয়৷ আমি আপনাকে সত্যিই চিনি৷
- হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে নন্দিনী৷
- সুমনবাবু, যদি বলি এর আগেও আমাদের দেখা হয়েছে? আপনার মনে নেই, থাকার কথাও নয়৷ কিন্তু..আমার স্পষ্ট মনে আছে৷
- কবে বলুন তো?
- আমি অবশ্য এই কর্পোরেট জগত কাঁপানো সুমন দত্তর সঙ্গে দেখা করিনি৷
- সে কী৷ তার বাইরে আমার কোনও পরিচয় আছে নাকি?
- আজ থেকে বছর বারো আগে, দেবুদার অর্গানাইজ করা কবিসম্মলেনের স্টজের পিছনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আপনাকে দেখি। অবাক হয়ে৷ মুগ্ধ হয়ে৷ আপনার লেখার যে আমি কী ভক্ত ছিলাম..।
- আমি..আমি যে কী বলব..। ওই দিনটা আমার জন্য একটা..।
- টার্নিং পয়েন্ট? জানি।
- কী জানেন?
- সুমনবাবু। আমি এই পার্টিতে এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করে নিজের দোষ স্বীকার করব বলে।
- আপনার কবিতার ভাষা এত প্রাঞ্জল নন্দিনী৷ কিন্তু আপনি এখন যে কী বলছেন, আমার কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।
- আপনি ভুডুইজমে বিশ্বাস করেন? তুকতাক?
- কবিতা তো তুকতাকই।
- আমি আমার স্বীকারোক্তি আপনাকে জানিয়ে গেলাম৷ বিশ্বাস, অবিশ্বাস আপনার হাতে৷ আমি আপনাকে ঈর্ষা করতাম৷ ভীষণ৷ কী'ভাবে সে তুকতাক তন্ত্রমন্ত্রের খোঁজ পেয়েছি, সে ব্যাপারে ঢুকে লাভ নেই৷ তবে আপনার থেকে কবিতা শুষে নেওয়ার বিদ্যে আমার ছিল৷ আপনি স্টেজের পিছনে যখন নার্ভাস হয়ে পায়চারি করছিলেন, তখনই আপনার পাশ ঘেঁষে চলে যাই। ওই কয়েক সেকেন্ডেই ঘটে যায় ব্যাপারটা।
- ইউ মীন, আপনি আমার থেকে কবিতা শুষে নিয়েছেন? হিপনোটিজিম প্লাস ব্রেনড্রেন?
- আপনি হেসে উড়িয়ে দিতেই পারেন৷ তবে, ওই যে বললাম। বিশ্বাস অবিশ্বাস আপনার হাতে। কিন্তু ওই দিনটা যে টার্নিং পয়েন্ট ছিল, সে'টা স্বীকার করছেন তো?
- অস্বীকার করি কী করে।
- আমার জন্যও৷ সে'দিন রাত থেকেই আমার একটা নতুন কবিজন্ম হল৷ ঝরঝরিয়ে লিখতে থাকলাম, অবিকল আপনার স্টাইলে৷ আপনারই মত ভাব আর ভাষার দখলসহ। আপনি কবিতা ছেড়ে চলে গেলেন, আর কবিতা আমায় টেনে নিল। একপ্রকার চুরিই বলতে পারেন। তবে নাম, স্টেটাস; সবই পেলাম আপনারই গুণে ভর দিয়ে।
- নন্দিনী৷ যে কবিতাগুলো আজ আপনি পড়লেন, সে'গুলো কি শুধুই ভাষার খেল? না৷ ওই লেখাগুলোর মধ্যে যে অপরিসীম ভালোবাসা, তা তো মিথ্যে হতে পারেনা৷ আপনার স্বীকারোক্তি আপনারই থাক৷ আমি কিন্তু এ মুহূর্তে আপনার গুণমুগ্ধ ভক্ত ছাড়া আর কেউই নই। আজ এতবছর পর, আপনি হঠাৎ কবিতার প্রতি ভালোবাসাটা ফিরিয়ে দিলেন৷ কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই। সে হিসেবে আজকের দিনটাও একটা টার্নিং পয়েন্ট৷ একটা ইউরেকা-বোধ হচ্ছে, কবিতা লেখার ইচ্ছেটা ফেরত এসেছে মনে হয়৷ আচ্ছা, কয়েক মিনিটের জন্য আপনার কলমটা পেতে পারি? আপনার জন্য ক'টা লাইন না লিখলেই নয়।
নন্দিনী কাঁপা হাতে নিজের কলমটা সুমনের দিকে এগিয়ে দিলেন৷ টেবিলের ওপর রাখা একটা ন্যাপকিন নিজের দিকে টেনে নিয়ে তার ওপরই তরতরিয়ে লিখতে শুরু করলেন সুমন; কবিতা৷ নন্দিনীর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, কৃতজ্ঞতায়। তার সঙ্গে একটা পাহাড়প্রমাণ দুঃখ চেপে ধরছিল। সে জানে যে সুমনের কবিতা লেখা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই তার কবিজন্মের ইতি৷
নন্দিনীর আর কোনওদিনও কবিতা লেখা হবে না।

বাপ্পাদা আর পাশ-ফেল

- আচ্ছা বাপ্পাদা, একটা জরুরি কোশ্চেন ছিল।
- ফায়্যার করে ফেলো বিলুকুমার।
- তুমি আমার শিক্ষক, রেস্পেক্টেড গুরুজন, তাই ফ্র্যাঙ্কলি জিজ্ঞেস করছি...।
- ধুস। ফ্র্যাঙ্কলি কথা বলতে পারছিস, তা'হলে আর গুরুজন হিসেবে রেস্পেক্ট কই।
- আহ্‌, প্রশ্নটা করতে দাও। একটু ফিলোসফিকাল। বুঝলে তো।
- ট্রিগোনোমেট্রি বানান শিখলি না, ফিলোসফি নিয়ে প্রশ্ন করবি বিলু?
- ধ্যের। বাদ দাও।
- আরে মুখভার করতে নেই। করেই ফেল প্রশ্নটা।
- থাক।
- পেটে প্রশ্ন রাখলে খিদে কমে যায়।
- করি?
- শুট।
- ভেবে বলো বাপ্পাদা, পরীক্ষায় পাশ-ফেলটাই কি লাইফে সব গো?
- অনেস্টলি বলব রে বিলু?
- নিশ্চয়ই।
- বেশ। তা'হলে শোন। যারা ফেল করে, তাদের জন্য পাশ-ফেল কোনও ব্যাপারই নয়।
- যাচ্চলে।
- কাজেই; রিল্যাক্স।
- তার মানে পাশ করলে...।
- পাশ-ফেল মারাত্মক ইম্পর্ট্যান্ট। লাইফ অ্যান্ড ডেথ।
- আর ফেল করলে?
- পাশ-ফেল দিয়ে কি কিছু হয় রে পাগলা? ও'সব কিস্যু না। জঞ্জাল, জঞ্জাল। মায়া।
- এর মানে কি?
- তোর যা সিচুয়েশন বুঝছি, তোকে ওই জঞ্জাল কনসেপ্টেই ফোকাস করতে হবে।
- তুমি অত্যন্ত জঘন্য টিউশনি মাস্টার।
- তোর কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আফটার অল, আলেকজান্ডারকে মাটি কোপাতে দিলে হবে? প্লেটো-সক্রেটিস লেভেলের ডেপ্থ নিয়ে তোকে ক্যালকুলাস শেখাতে হচ্ছে। সাবলাইম ট্র্যাজেডি।

Wednesday, December 7, 2022

পাশ-ফেল-ফুচকা



- কী রে! ফোন ধরছিলিস না কেন?

- ধ..ধরলাম তো৷ 

- ছ'নম্বর কলে?

- ও, ওই একটু ব্যস্ত..।

- কাঁচকলা ব্যস্ত৷ কাওয়ার্ড কোথাকার!

- ক..কীসের কাওয়ার্ড বুকিন? দুম করে এদ্দিন পর ফোন করে এইসব..।

- বেশ করব বলব৷ যাক গে, কেমন আছিস?

- চমৎকার!  ফ্যান্টাস্টিক৷ 

- কোথায় আছিস?

- কেন? কী মতলব?

- বল না বিলু! কোথায় আছিস? পড়তে গেছিস? নাকি ক্লাবে বসে ক্যারম পিটিয়ে সময় নষ্ট করছিস?

- সা..সামনে এগজ্যাম৷ পড়ার খুব চাপ।

- সেই তো বড়জোর টেনেটুনে পাশ করবি। চাপ নিয়ে হবেটা কী!

- আরে, শোন। এ'বারে ব্যাপারটা একটু আলাদা৷ জব্বর প্রিপারেশন৷ বাপ্পাদা বেশ কনফিডেন্ট, টপক্লাস নম্বর পাব৷ শুধু আর একটু..আর একটু খাটতে হবে..।

- শোন না বিলু..এই সদ্য পাড়ায় ঢুকলাম৷ বাড়িতে এসে হাত-পা ধোয়ার আগে তোকে ফোন করছি৷ দেখা করবি?

- ও মা। বাপ্পাদার বাড়ির দিকে যাচ্ছি তো! আজ স্পেশ্যাল ক্লাস৷ 

- তোর বাপ্পাদা একটা ফ্রড৷ আর তুই একটা গবেট৷ শোন না, আধঘণ্টা! রেলের মাঠের ও'দিকে ফুচকা খেয়েই চলে যাস৷ বাবার পকেট থেকে কড়কড়ে টাকা সরিয়েছি৷ চলে আয়৷ 

- বুকিন, হবে না রে। 

- বিলু৷ এখনও রাগ করে আছিস? বাবার বদলি হল, তাই তো পাড়া ছেড়ে..। আর গোটা ব্যাপারটাই এত হুড়মুড় করে হল যে..।

- জানি তো। এতে আমি রাগ করব কেন? তুই গেছিস। বাপ্পাদা বলে তা'তে আমার ডিস্ট্র‍্যাকশন কমেছে, অতএব নির্ঘাৎ নম্বর বাড়বে৷ 

- বাপ্পাদা না হয় একটা হামবাগ ইডিয়ট৷ তুই এত ঢ্যাঁটা কবে থেকে হলি?

- আমি রাখছি৷ কোচিংয়ে ঢুকতে হবে৷ 

- খবরদার বিলু..।

- আসি।  

- শোন আমরা কাল ভোরেই কলকাতা চলে যাব..বিলু শোন..।

- টাটা। 

***

- এত্তটুকুন মেয়ে, তার কী মেজাজ। অসহ্য!

- হুঁ। 

- আমার হামবাগ বললে? আমার হাঁটুর বয়সী মেয়ে? বলে কিনা বাপ্পা সমাদ্দার একটা ইডিয়ট! কী অডাসিটি দেখলি বিলু!

- হুঁ। 

- কী রে..।

- বাপ্পাদা, এখন না৷ 

- আহ, জ্বালাচ্ছি না৷ আচ্ছা, চ্যুয়িং গাম খাবি রে?

- না। 

- চপ? নিতাইদার দোকান খোলা আছে৷ খাবি?

- না।

- আদা লজেন্স খাবি? 

- না৷ 

- এই ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মশার কামড়ই খাবি?

- হুঁ। 

- বুকিন কিন্তু একটু ডিস্যাপয়েন্টেড হয়েছে।

- বয়ে গেছে।

- বয়ে গেলে ফুচকার অফারটা রিফিউজ করতিস না৷ রেলের মাঠের ধারে আজকাল বসন্ত দাঁড়াচ্ছে তো? আলুটা টেরিফিক মাখে ছেলেটা। দিব্যি গিয়ে বুকিনের বাপের পকেটা-কাটা পয়সায় দু'ডজন ফুচকা সাঁটিয়ে আসতে পারতিস৷ খামোখা দূর থেকে ব্যালকনিতে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ফোনে কথা বলে একটা বিশ্রী মেলোড্রামা ক্রিয়েট করলি আর অপরচুনিটি মিস করলি। 

- আচ্ছা বাপ্পাদা, এ'বারেও বোধ হয় অঙ্কে আটকে যাব, তাই না?

- আমি নাইনটি পার্সেন্ট শিওর৷ তোর যা অবস্থা দেখছি, তুই একশোয় তিরিশ পেলে আমি তোকে মোগলাই খাওয়াব৷ চল্লিশ পেলে পর পর তিনদিন বিরিয়ানি। 

- বুকিন ঠিকই বলে। তুমি একটা ফ্রড, আর হামবাগ৷

- সে ঠিক বলতে পারে৷ তবে হাতের লক্ষ্মী টিউশনির ব্যাচকে ফিরিয়ে দিয়ে এ শর্মাই তোর পাশে দাঁড়িয়ে মশার কামড় হজম করছে।

- সরি৷ 

- বিলু।

- বুকিন বড় ভালো বাপ্পাদা।

- আপ্রাণ ডিনাই করতে চাই৷ পারছিনা৷ 

- আমি সে তুলনায় যাতা। 

- এগেইন৷ খুব ইচ্ছে ছিল বলার যে বুকিন তোর নখের যোগ্য নয়৷ কিন্তু ওই। আজ বোধ হয় পূর্ণিমা, তিতিফিথিও ভালো আছে বোধ হয়। নির্জলা মিথ্যে বলতে ইচ্ছে করছে না৷

- বাপ্পাদা৷ 

- বল বিলু।

- আমায় পাশ করিয়ে দেবে প্লীজ? আর ফেল করতে ভালো লাগেনা মাইরি৷ 

- সামান্য একটু ফোকাস৷ কেমন? তা'লেই হবে৷ ম্যায় হুঁ না।

- মাইরি?

- মাইরি!

- চলো, তোমার বাড়ি যাই৷ আজ কোন চ্যাপ্টার?

- সবার আগে রেলের মাঠ৷ ফুচকায় ওয়ার্ম আপ, ইন দ্য অনার অফ মিস বুকিন। তারপর প্রজেক্ট "এ'বার অন্তত পাশ করিয়ে দাও মা"। অল রাইট জওয়ান?

- ইয়েস স্যার!

- লেটস গো!

Sunday, November 6, 2022

চ্যাটার্জীবাবুর শেষ ইচ্ছে



- মিস্টার চ্যাটার্জী...।

- কে?

- আমার নাম বিনোদ।

- আমি তো আপনাকে ঠিক...।

- আমায় বস পাঠিয়েছেন।

- ওহ, মিস্টার চৌধুরী আপনাকে...।

- বসের নামটাম নেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। কাজ নিয়ে এসেছি। কাজ করে চলে যাব।

- আসুন, ভিতরে আসুন।

- আমি ভিতরে গিয়ে কী করব বলুন। সৌজন্যের তো আর তেমন প্রয়োজন নেই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। চটপট কাজ মিটে গেলে পৌনে এগারোটার লোকালটা পেয়ে যাব। আমায় আবার সেই সোনারপুর ফিরতে হবে।

- যা করার তা কি এ'খানেই সেরে ফেলা যায়না?

- এমন কনজেস্টেড এলাকায় ও'সব কাজ করা চলেনা। চুপচাপ ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে।

- প্লীজ দু'মিনিটের জন্য ভিতরে আসুন বিনোদবাবু। জামাটা অন্তত পালটে নিই।

- কী দরকার বলুন জামা পালটে।

- দরকার তেমন নেই। তবু। ওই, লাস্ট উইশ ধরে নিন।

- ক্যুইক প্লীজ। ট্রেন ধরার তাড়াটা ভুলে যাবেন না। আর ইয়ে, পিছন দিক দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। বসের লোকজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে।

- ও মা, ছি ছি। তা নয়। আসলে মিতুলের দেওয়া একটা জামা এখনও ভাঙা হয়নি। বাটিক প্রিন্টের হাফশার্ট। একটু ব্রাইট কালার কিন্তু বেশ একটা ইয়ে আছে। ও চলে যাওয়ার পর ও জামার ভাজ ভাঙতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু...আজ না হয়...।

- মিতুল আপনার...।

- ওয়াইফ। গতবছর একটা আচমকা অ্যাটাকে...। যাক গে। আসুন না।

***

- বাহ্‌, জামাটায় কিন্তু জেল্লা আছে মিস্টার চ্যাটার্জী।

- থ্যাঙ্কিউ। মিতুল বলেছিল পরলে নাকি আমার বয়স বছর পাঁচেক কমে যেতে বাধ্য। আমায় ইয়ং রাখার জন্য যে ও কতকিছু করত।

- মিসেসরা তো তাই চায়, হাসব্যান্ডরা যাতে চট করে ঢ্যাপস বুড়ো না হয়ে যায়।

- আপনার মিসেসও বুঝি...।

- হে হে...নয়ত কি আর এই লাল নীল চেক টিশার্ট আমি নিজে শখ করে কিনেছি নাকি মশাই।

- ভেরি নাইস ভেরি নাইস। আপনাকে খুব মানিয়েছে এই জামাটায়।

- থ্যাঙ্ক ইউ। ইয়ে, একটু পা চালিয়ে। রেলের মাঠের দক্ষিণের দিকটা ফাঁকা, নিরিবিলি। ও'খানেই কাজ সেরে নেব।

- ও হ্যাঁ। জায়গাটা সত্যিই বড় নিরিবিলি। রাতবিরেতে ধারেকাছে কেউ ঘেঁষে না। ইয়ে বিনোদবাবু, এই ব্যাপারটাকে কি না করলেই নয়?

- দেখুন, বসের হুকুম নড়চড় হওয়ার উপায় নেই।

- মানে, না হয় একটা সামান্য ভুল করে ফেলেছি। তার জন্য এত বড় একটা শাস্তি...।

- সামান্য? বসের তিনটে ট্রাক পুলিশে ধরেছে আপনার একটা ছোট্ট ভুলে। মিনিমাম চার কোটির লস। বসের রাইট হ্যান্ড ম্যান গুপ্ত পুলিশের হেফাজতে। ছোট্ট ভুল?

- ছোটো নয়, তাই না?

- সরি মিস্টার চ্যাটার্জী। রিয়েলি সরি। আপনি মানুষ খারাপ না। কিন্তু আমাদের কাজকর্মগুলো ঠিক ভালোমানুষি দিয়ে হয়না। এ'সব লাইনে আপনি এসেই ভুল করেছেন।

- আসলে, ক্রিয়েটিভ অ্যাকাউন্টিংয়ে আমার এলেম আছে। তাই ভাবলাম প্রতিভাটা ইউটিলাইজ করি। আমি কিন্তু টাকার জন্য এ লাইনে আসিনি জানেন। স্রেফ একটা অদম্য আগ্রহ...।

- আগ্রহের বসে মানুষ এভারেস্ট চড়তে চায়। বুড়ো বয়সে গান শেখার ক্লাসে ভর্তি হয়। আপনি ভিড়লেন স্মাগলারদের খাতা লেখার কাজে। মিস্টেক, মিস্টেক।

- আসলে মিতুল চলে যাওয়ার পর মাথাটা ঠিক...। বিনোদবাবু, কোনও উপায়ই কি নেই?

- কোনও উপায় নেই।

- তা, আপনার প্রসেসটা কী হবে?

- রিভলভার, পকেট ঢিপি হয়ে আছে দেখছেন না? সে'জন্যই তো এমন জায়গা দরকার যে'খানে নিশ্চিন্তে গুড়ুম করা যাবে। আড়াই সেকেন্ডের যন্ত্রণা। তারপর নিশ্চিন্দি।

- বুলেট? ইয়ে, সায়ানাইড টাইপ কিছু নেই? বুলেট ব্যাপারটা একটু ব্রুটাল।

- কিন্তু এফেক্টিভ। ঝামেলা কম। পয়জনটা ঠিক আমার এরিয়া নয়। ওতে বিস্তর পড়াশোনা করতে হয়।

- আই সি। যাক গে। আড়াই সেকেন্ডের হ্যাপা, তাই তো?

- আড়াই। দুইও হতে পারে। কিন্তু তিন হবে না। এ ব্যাপারে এক্সপিরিয়েন্স তো কম হল না।

- বিনোদবাবু, আমরা রেলের মাঠের দিকে যাচ্ছি তো?

- হ্যাঁ।

- আধ কিলোমিটার ঘুরে গেলে আশা করি কিছু মাইন্ড করবেন না? একবার রথতলার বাজার হয়ে গেলে ভালো হত।

- চালাকি করছেন না তো?

- মাইরি না। রথতলার বাজারে মিঠুনের ফুচকা খেতাম দু'রাউন্ড।

- ফুচকা?

- প্লীজ, না করবেন না। মিতুলের জন্যই ইচ্ছেটা। আসলে হপ্তায় মিনিমাম দু'দিন আমি আর মিতুল মিঠুনের কাছে ফুচকা খেতাম। আমি ম্যাক্সিমাম ঝাল, মিনিমাম টক। মিতুল মিনিমাম ঝাল, ম্যাক্সিমাম টক।

- ওহ, আমারও আবার বৌদির মত কেস। মিনিমাম ঝাল, ম্যাক্সিমাম টক।

- তা'হলে চলুন না বিনোদবাবু। মিঠুন বেশ রাত পর্যন্ত থাকে। চলুন না। লাস্ট উইশ।

- বাটিকের শার্ট আপনার শেষ ইচ্ছে ছিল।

- এ'টা সত্যিই ফাইনাল। প্লীজ।

- ফাইনাল কিন্তু! দু'রাউন্ড ফুচকা।

- মাইরি। প্লীজ। আর ইয়ে, আপনাকেও না খাইয়ে ছাড়ছি না কিন্তু।

***

- মিঠুনদা!

- খাবেন? আসুন তাড়াতাড়ি। এ'বার ঝাঁপি বন্ধ করব...।

- এইতো খেয়ে গেলাম আধঘণ্টা আগে।

- হুঁ?

- বাহ্‌, ওই যে, ওই বাটিক শার্ট পরা ভদ্রলোককে নিয়ে এলাম। দু'জনে তিরিশ তিরিশ ষাটটাকার ফুচকা খেলাম। আমি টক বেশি ঝাল কম, বাটিক ভদ্রলোক ঝাল বেশি টক কম।

- অ। তা কিছু ফেলে গেছেন?

- খানিকটা সে'রকমই।

- কী জিনিস?

- সামান্য অন্যমনস্ক থাকায় আমি আর সেই বাটিক-জামা-দাদা আমাদের ফাউ ফুচকা চাইতে ভুলে গেছিলাম। সে'টার জন্যই ফিরে এসেছি। তা বাটিকদাদাটি বিশেষ অসুবিধের কারণে আসতে পারলেন না। ওই দু'জনের ফাউটাই আপনি আমায় দিয়ে দিন প্লিজ।

- কী?

- দু'জনের ভাগের ফাউ ফুচকা, আমায় দিন। চটপট। হাত চালিয়ে। আমার আবার পৌনে এগারোটার লোকালটা ধরতে হবে।