Sunday, June 19, 2022

বাবা আর ফিশ

আট কার্ডের খেলাটাকে আমরা 'ফিশ' বলি৷ তিন কার্ডের 'রানিং লাইসেন্স'৷ আমরাই আমাদের বিসিসিআই, কাজেই ইচ্ছেমত ঘরোয়া ইনোভেশন জুড়ে দেওয়া যায়৷ এই যেমন লাইসেন্স না হলে 'জোকার' দেখা যাবেনা, ইত্যাদি৷ ফেসবুকে লিখে সে'সব 'নুয়ান্স' বোঝানো সম্ভব নয়৷ দশ দানের পর যার পয়েন্ট সবথেকে কম, সে জিতবে৷ 

খেলতে বসে রেগেটেগে লাভ নেই৷ তবে 'ব্যান্টার' টীকাটিপ্পনী ছাড়া 'ফিশ' খেলার থেকে সুইচ অফ করা টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা ভালো৷ এই হচ্ছে আমাদের থিওরি৷

এ খেলায় একদানে একজনকে ম্যাক্সিমাম আশি পয়েন্ট খাওয়ানো যেতে পারে৷ কিন্তু সে ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি, খানিকটা ওই এক ওভারে ছত্রিশ রান করার মত৷ কিন্তু যতক্ষণ একটা 'ম্যাথেম্যাটিকাল পসিবিলিটি' আছে, কয়েক কিলো পয়েন্টে পিছিয়ে গেলেও বাবা হাল ছাড়বে না৷ লজিক একটাই, "বলা তো যায় না, হলেও হয়ে যেতে পারে৷ আর না হলেই বা ক্ষতি কী, দু'দান দেখি"৷ 

আর সামান্য একটু জমি পেলে যে কোনও জায়গাতেই খেলতে বসে যাওয়া যেতে পারে৷ ডাইনিং টেবিল, সোফা, ট্রেনের বার্থ, পার্কের বেঞ্চি৷ হয়ত সময় খুব কম আছে, দশ দান খেলা সম্ভব নয়৷ তখনও বাবার ওই সহজ ফর্মুলা, "বলা তো যায় না, হলেও হয়ে যেতে পারে৷ আর না হলেই বা ক্ষতি কী, দু'দানই খেলব না হয়"৷ 




এই ছবিটা বারোটে (হিমাচল) তোলা। ২০১৫।


চালশে আর ফার্স্টইয়ারি



সুমনবাবুর চালশে গানটা প্রথম শুনেছি কৈশোরে৷ আমার অন্যতম প্রিয় 'সুমনের গান'। আজও এ গানটা আমার কৈশোরের গান। কলেজের গান৷ হাইস্কুলে থাকতে বাড়ির ফিলিপ্স টেপরেকর্ডারে এ গান বাজত। পরে কলকাতার মেসে বসে সস্তায় কেনা এফএম রেডিওতে সে গান মাঝেমধ্যেই শোনা যেত৷ সে বয়সে, গানটা গুনগুন শুরু করলেই আশেপাশের চালশেদের প্রতি অস্ফুট "আহা, উঁহু"-ভাব টের পেতাম৷ একটা প্রবল সিমপ্যাথি। 

মনে হত, "আহা রে, কত গুঁতোগাঁতা খেয়ে এ বয়সে এসে পৌঁছেছেন৷ মাঝবয়সী খিটমিটগুলোয় না জানি তাদের কতশত স্ট্রাগল আড়াল হয়ে যাচ্ছে"।  ফার্স্টইয়ারি মেজাজের সিংহাসনে বসে ভাবতাম, "আফটার অল, এই বাবা-জ্যাঠা-কাকা-মামাদের তো ইয়ুথটাই গন৷ লোহা চিবিয়ে হজম করার দম আর নেই৷ বেনিয়মে বন্ধুদের হুল্লোড় নেই। সোমবার বিকেলের কলেজ স্কোয়্যারের ঘটিগরম নেই৷ প্রেমের চিঠি নিয়ে ফলাও করে মেস-বৈঠক বসানোর সুযোগ নেই৷ বাজে গল্পে রাতকাবার করার ধক নেই৷ পুজোয় লম্বা ছুটি নেই৷ এদের আর আছেটা কী। আহা রে, এ'দের জীবনটাই তো ফিনিশ হয়ে গেছে৷ পড়ে আছে শুধু গাদাগুচ্ছের রেস্পন্সিবিলিটি"। ব্যাস, এইসব ভাবনাকে আরও একটু উস্কে দিত সুমনের এই গান৷

এ'বারে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, আজও এই গানটা আমি সেই ফার্সইয়ারি ছেলেবেলার কান ছাড়া শুনতে পারিনা৷ এমন অনেক গানই রয়েছে অবশ্য, যে'গুলো শিল্পী, সুর, কথার ওপরে গিয়ে স্মৃতি-ফসিল হয়ে রয়ে গেছে৷ কে সুমন, কীসের দামী লিরিক্স, কীসেরই বা মনকেমনের সুর- চালশের গানে সেই ক্লাস টুয়েলভ বা কলেজের বিকেল-রাত্রির গন্ধ লেগে৷ সেই গন্ধই সে গানের আইডেন্টিটি। এ'সব গান একটু মন দিয়ে শুনলে এখনও ক্যালকুলাসের ভয়টা বুকের মধ্যে ছ্যাঁতছ্যাঁতিয়ে উঠবে বোধ হয়৷ যাক গে, এই চালশের গান শুনলে এখনও ওই ফার্স্টইয়ারি একটা কণ্ঠস্বর ভারী মিহি স্বরে আহা উঁহু করে বলে, "আহা রে, যাদের বয়স চল্লিশ পেরোল তাদের কী দুঃখ গো৷ প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়ে চিন্তা করেই দিন গুজরান করতে হয়, কলেজ ফেস্টের খোঁজখবর আর তাদের নিরেট জীবনে দাগ কাটে না৷ জোড়া রোল খাওয়ার বদলে তারা একটা ভেজিটেবল চপ ইন্সটলমেন্টে খায়৷ ইশ৷ আর এরা বেপরোয়া বিরিয়ানিতে রইল না, সুবোধ স্যান্ডুইচে এসে ঠেকেছে৷ দলবেঁধে দীঘা যাবে কী, গ্রুপ ইন্সুরেন্স ছাড়া আর কোনও ভাবনায় এদের স্বস্তি নেই৷  এদের জন্য কী মনকেমন গো"। 

সমস্যা হল, সে সিমপ্যাথির বেলুনে সুট করে চুপসে দেয় অন্য একটা গাম্বাট কণ্ঠস্বর, " ওরে আমার কচি খোকা এলেন হে৷ এ'সব ভাবনা হাউই নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? অম্বলের ওষুধ কি তোমার গ্র‍্যান্ডফাদার খাবে"? অমনি, বুকের মধ্যে বরফঝড়।   এই গান যে আর 'ওদের' জন্য লেখা নয়। এ গান এখন ডাইরেক্ট আমার এবং আমাদের৷ আমি আর এ গানের অডিয়েন্স নই, সাবজেক্ট৷ আমি আর "আজকে যে.."র দলে নেই৷ সুট করে "কালকে সে.." টীমে এসে দু'দণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছি৷ চল্লিশ আসছে, ছোটবেলার সুমন দিয়ে তাকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই৷

Thursday, June 16, 2022

তুচ্ছ ইতিহাস



আজকাল ইতিহাস সিলেবাসের ঠিক-ভুল উচিৎ-অনুচিত নিয়ে বেশ তোলপাড় চলছে। সে বিতর্কের মূলে রয়েছে রাজরাজড়াদের নিয়ে টানাটানি। কতটা মুসলমান বাদশাদের কথা পড়লাম, কতটা হিন্দু রাজরাজড়াদের ব্যাপারে জানলাম; সে রেশিও নিয়ে ধুন্ধুমার ব্যাপার। গুঁতোগুঁতি করে তর্ক করতে আমাদের যতটা আগ্রহ, ততটা আগ্রহ অবশ্য ইতিহাসের বই উল্টেপাল্টে দেখায় নেই। সে'টা একদিক থেকে বাঁচোয়া, ইনফরমেশন আর অবজেক্টিভিটির জ্বালায় রসালো খিস্তিখেউর নিষ্প্রভ হয়ে যায় না। যাক গে। এ'সবের মাঝে একজন চমৎকার ইতিহাস প্রিয় চরিত্রের কথা মনে পড়ে গেল; বিভূতিভূষণের অপু। অপু আইএ পাশ করে আর কলেজে ভর্তি হল না। প্রফেসররা ডেকে অপুকে বোঝাতে চাইলেন যে অপুর অনার্স পড়া উচিৎ। কিন্তু সদ্য মাতৃহারা, সহায়-সম্বলহীন অপুর তখন ক্লাস করার আগ্রহ ছিল না। নিদারুণ অভাবের মধ্যে থাকার ফলে অবশ্য ভর্তি না হওয়ার সিদ্ধান্তটা আরও সহজ হয়ে গেছিল। কিন্তু অপুর অনাগ্রহ ছিল মূলত সেই স্ট্রাকচার্ড সিস্টেমটার প্রতি, জানার ইচ্ছেটুকু পুরো দমে তাকে ঠেলে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। আর প্রচণ্ড মুখচোরা হওয়া সত্ত্বেও নিজের পড়াশোনার ফোকাস সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না অপুর। অপুর নিজের মনের ভাষায়; "দু'বছর (বিএ'র) মিছিমিছি নষ্ট না করে, লাইব্রেরিতে তার চেয়ে অনেক বেশি পড়ে ফেলতে পারব'খন"।

অপুর ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে বসে নিজের ইচ্ছেমত পড়াশোনা করার বর্ণনা 'অপরাজিত'র সামান্য কয়েকটা পাতার মধ্যেই সীমিত। কিন্তু ও'টুকু অংশ যে আমার কী প্রিয়। ডিগ্রি পাওয়ার জন্য নয়, 'কেরিয়ারে' এক্সেল' করতে হবে বলে নয়, এমন কী দু'দশজনের মাঝে দু'চারটে মজবুত কথা বলে চমকে দেওয়ার জন্যও নয়। সে গোগ্রাসে একের পর এক বই গিলেছে শুধুই জানার আগ্রহে। ওই আগ্রহে সিস্টেমের বালাই ছিল না, তবে অচেনা অজানাকে জানবার উচ্ছ্বাস ছিল ষোলো আনা। অপুর মধ্যে একটা দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস ছিল যে কলেজের সিলেবাসে বাঁধা পড়ার মধ্যে সার্থকতা নেই। (একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছিনা। আমার সৌভাগ্য যে আমি এমন একজনকে চিনি যে কলেজের সিলেবাসকে কাঁচকলা দেখিয়ে লাইব্রেরির শেল্টারে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। এবং এক্সলেন্সকে পোষা বেড়ালের মত মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে পেরেছিল। ওঁর থেকে অনুমতি আদায় করে একদিন সে'সব গল্প ফলাও করে বলতে হবে। তবে এ'বার অপুতে ফেরত যাওয়া যাক)। 

অপু দুপুর দু'টো থেকে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত লাইব্রেরীতে বসে পড়ত। রোজ। একটা ছোটখাটো অল্প মাইনের চাকরী যে'টা জোগাড় করেছিল সে'খানে ছিল রাতের শিফটে কাজ। বেলায় দেরী করে ঘুম থেকে উঠে সে ছুটত লাইব্রেরীর দিকে। এই যে নির্বিচার পড়াশোনা, তার অনেকটা জুড়েই ছিল ইতিহাস। কিন্তু সে ইতিহাস অপু যত পড়ছে, তত তার মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বারবার তার মনে হয়েছে এই যে রাজরাজড়ার হিসেবকিতেব, সে'টুকুই কি সম্পূর্ণ ইতিহাস? ইতিহাসের এসেন্স কি সে'টুকুই? না না, বিভূতিভূষণ কোট করে খামোখা নতুন তর্কে পড়তে চাইনা মোটেও। ইতিহাস যে রাজাগজাদের ফোকাসে রেখেই গড়ে উঠবে, সে'টাই স্বাভাবিক। এবং লজিকাল। ভালোয় মন্দয় মিশিয়ে ইতিহাসের প্রাইম মুভার যে সে রাজাগজারাই। কিন্তু অপুর মনের মধ্যে যে উৎসুক রোম্যান্টিক মানুষটা রয়েছে, সে যে শুধু মাইলস্টোনের জাঁতাকলে আটকা পড়বে না, তা বলাই বাহুল্য। অপুর হয়ে বিভূতিবাবু বলছেন, "মানুষের সত্যকারের ইতিহাস কোথায় লেখা আছে? জগতের বড় ঐতিহাসিকদের অনেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজনৈতিক বিপ্লবের ঝাঁঝে; সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, মন্ত্রীদের সোনালি পোশাকের জাঁকজমকে; দরিদ্র গৃহস্থের কথা ভুলিয়া গিয়াছেন। পথের ধারের আমগাছে তাহাদের পুটুলিবাঁধা ছাতু কবে ফুরাইয়া গেল, সন্ধ্যায় ঘোড়ার হাট হইতে ঘোড়া কিনিয়া আনিয়া পল্লীর মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের ছেলে তাহার মায়ের মনে কোথায় আনন্দের ঢেউ তুলিয়াছিল - ছ'হাজার বৎসরের ইতিহাসে সে'সব কথা লেখা নাই।...কেবল মাঝেমাঝে এখানে ওখানে ঐতিহাসিকদের লেখার পাতায় সম্মিলিত সৈন্যব্যূহের এই আড়ালটা সরিয়া যায়, সারি বাঁধা বর্শার অরণ্যের ফাঁকে দূর অতীতের এক ক্ষুদ্র গৃহস্থের ছোট বাড়ি নজরে আসে। অজ্ঞাতনামা কোন লেখকের জীবন-কথা, কি কালের স্রোতে কূলে-লাগা এক টুকরো পত্র, প্রাচীন মিশরের কোন্‌ কৃষক পুত্রকে শস্য কাটিবার কী আয়োজন করিয়ে লিখিয়াছিল, - বহু হাজার বছর পর তাহাদের টুকরো ভূগর্ভে প্রোথিত মৃণ্ময়-পাত্রের মত দিনের আলোয় বাহির হইয়া আসে। কিন্তু আরও ঘনিষ্ঠ ধরণের, আরও তুচ্ছ জিনিসের ইতিহাস চায় সে। মানুষের বুকের কথা সে জানাতে চায়। আজ যাহা তুচ্ছ, হাজার বছর পরে তা মহাসম্পদ। ভবিষ্যতের সত্যকার ইতিহাস হইবে এই কাহিনী, মানুষের মনের ইতিহাস, তার প্রাণের ইতিহাস"। 

এই যে ইতিহাসের আড়ালে থাকা তুচ্ছ মুহূর্তদের নিবিড়ভাবে জানার লোভ, এ'টা কিন্তু কিছুতেই অপুর একার হতে পারে না। ঐতিহাসিকদের দোষ দিইনা, সমস্ত হরিদাস পালের গল্প বই বা স্টোনট্যাবলেটে বা প্যাপাইরাসে সাজিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু ওই 'খামোখা তুচ্ছের প্রতি আগ্রহে'র জন্যেই সুনীলবাবুর লেখা অর্ধেক জীবন আমার এত প্রিয়। অথচ মূল ইতিহাসের বই নিংড়ে সেই সাদামাটা মানুষের সাদামাটা গল্প বের করে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। যে কোনও ইতিহাসের বই হাতড়ালেই দেখব যে রাজারাজড়া, রাজনীতি আর ধর্ম - এই কনসেন্ট্রিক সার্কলগুলোর মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া ছাড়া গতি নেই। অবশ্য সে'ইতিহাসও সাংঘাতিক ভাবে গ্রিপিং। এবং জরুরী। তবে তা'তে ওই 'তুচ্ছকে জানার ঝোঁক' কমে না। এবং স্রেফ লাইব্রেরীতে বসে সে ইতিহাসের নাগাল পাওয়া অসম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, এই যে এক একটা সময়ের সাদামাটা মানুষদের আটপৌরে একঘেয়ে গতানুগতিক জীবনধারা, সে'টাকে রেকর্ড করে রাখতে গেলে তো সাহিত্যের ভাষা আর বইয়ের ডিসিপ্লিনে কাজ হবে না। হরিদাস পালের বায়োগ্রাফার আবুল-ফজল হলে চলবে কেন? হরিদাসের উঠোনে পাতা মাদুরের ওপর ভেজা গামছা, তার খোকা কাদায় ল্যাপ্টালেপ্টি করে খেলা করছে। তার বৌ এমনভাবে শাক ভাজছে যে তা দিয়ে ভাত মাখলে নবাবের হেঁসেলের পোলাও হার মানাবে। ধারালো ভাষা বা কাব্যের চাতুরী হরিদাস পালের সেই তুচ্ছ ইতিহাস ক্যাপচার করবে কী করে? 

আর এ'টা ভেবেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে হলে। ইউটিউবের জমানায়, এ যুগের হরিদাস পালদের তুচ্ছ ইতিহাস সাহিত্যে বা সিলেবাসে স্থান না পেলেও হারিয়ে যাবে না। আমাদের এ যুগের ইতিহাস স্রেফ ওই প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, যুদ্ধ, মিসাইলে আটকে থাকবে না। এলেবেলে যারা, যাদের জীবনগুলো এক্কেবারে স্কেল মেপে এবং ম্যাদামারা স্টাইলে চলে; তাদের দস্তাবেজও থেকে যাবে। উদাহরণ হিসেবে আমাদের অতি সহজ-সরল ফুড-ভ্লগগুলোই দেখুন। পাড়ার ইয়ারদোস্ত বা 'জুনিয়র' ছেলেমেয়েদের দল হাতে মোবাইল ক্যামেরা আর ইয়ারফোন নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। কেউ রানাঘাটের অনামা ভাতের হোটেলে বসে মাংসের ঝোল অর্ডার দিচ্ছে, এবং উপরি হিসেবে সে হোটেলের ম্যানেজার দাদার সঙ্গে জোর গপ্প জুড়ে ফেলছে। অথবা কেউ হরিদ্বারে পৌঁছে কোনও কচুরিওলার লম্বা ইন্টারভিউ রেকর্ড করছে। এই ভ্লগার, এই ভাতের হোটেলের ম্যানেজার, এই কচুরিওলা; এদের তো ইতিহাসের বইতে স্থান নেই। তবু এদের গল্প রয়ে যাচ্ছে অনন্তকালের পকেটে। মার্ক উইন্স সম্প্রতি বাংলাদেশ গেছিলেন, সে সাহেবের চোখ দিয়ে আমি চিনলাম সে দেশের এক চাকমা পরিবারকে। তাদের আমার চেনার কথা ছিল না। পাকিস্তানি ফুড ভ্লগার জিয়া তবারক ছিলেন তাই গুজরানওলার গুরুনানকপুরা স্ট্রিটের লস্যিবানিয়ে দাদা বা আরও কত সরলসিধে মানুষকে চিনে রাখি। 

আমার একটা  হঠকারী থিওরি হল, অপুর মত মানুষ পারত এই ইউটিউব নিংড়ে অতিপাতি মানুষের তুচ্ছ ইতিহাসে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে। আমরা অপূর্ব নই। তার রোম্যান্সের নাগাল পাওয়া আমাদের কম্ম নয়। কিন্তু আমরা সে তুচ্ছ ইতিহাসে ডুবতে না পারে, গোড়ালি ডোবানোর চেষ্টা করতেই পারি।

অতিতকুটের আকুতি

কী হতে চাই না? তিতকুটে। 

সবসময় খিটখিট করব না। যা অপছন্দ তাই পড়ে/দেখে/শুনে নিজের ভিতরটাকে মুগুরপেটা করব না। 

এ'টা হল না, ও'টা হল না; এ'সব দুঃখ যাওয়ার নয়। তবে শুধু সেই দুঃখটা আমায় ডিফাইন করবে না।

মোটাদাগের একঘেয়ে কাজগুলোকে 'বেফালতু' বলে গোঁসা করে বসে থাকব না। বরং কোনও আনন্দ ফর্মুলায় সে'গুলোকে বেঁধে নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকব।

"অমুক দাও, তমুক দাও" বলে হাজাররকমের ঘ্যানঘ্যান চালিয়ে যাচ্ছি, সে'সব এই বেলা কমিয়ে ফেলতে হবে। 

মাল্টি-টাস্কিংয়ের ফাঁদে পা দেবনা।  ব্রেনের মধ্যে সার্কাসের তাঁবু বসানোর দরকার নেই।

কলার টেনে জ্ঞান দেওয়ার লোভ ঠেকিয়ে রাখতেই হবে। আর কলার টানা যত জ্ঞান, সে'গুলোকে হেসে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সৎ সাহস তৈরি করতে হবে।

আর? 

আর, ভালো গল্প শোনার সুযোগ পেলেই ড্যাবড্যাবে চোখে বসে যাব।

চেনা-মানুষদের মাঝেমধ্যে ফোন করব। অদরকারে ফোন করব। (এখন করি না)।

কিছু ভালো লাগলে ভালো বলব। জোর গলায় বলব। আন্তরিকভাবে বলব।  পারলে লিখে জানাব। কিন্তু বাহবা জানানোর সুযোগ মিস করা চলবে না।

রোজ কিছু সহজ টার্গেট খুঁজে নেব। একেবারে জলবৎ-লেভেলের। সে'টা দু'পাতা কমিক্স পড়ার হতে পারে। আধ মাইল হাঁটা হতে পারে। নতুন দোকানের রোল খাওয়ারও হতে পারে। দিনের শুরুর টার্গেট বেশ দুলকি চালে রাতের অ্যাচিভমেন্ট হয়ে পড়বে। নিজেকে ইমপ্রেস করে বলতে হবে, "ভালো করেছ, আরও ভালো করতে হবে"।

সময়মত"সরি" বলতে হবে। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নয়, ইন্তুকিন্তু জুড়ে দিয়ে নয়, "আসলে কী হয়েছিল..." গোছের ভূমিকা ফেঁদে নয়। বিপদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে নয়। মনকেমনের কড়াইয়ে, "এহ, আর করব না মাইরি"-লজ্জার ডুবো তেলে ফ্রাই করে তুলে আনা যে "সরি"; সে'টা দরকার। সেই হাইক্লাস সরি সময়মত ডেলিভার করতে হবে। 

মোটের ওপর, তিতকুটে হওয়া চলবে না। কিছুতেই চলবে না।

ডায়োজিনিস আর আলেকজান্ডার



বড় শখ জানেন। বড় সাধ। 

একদিন, ডায়োজিনিসের মত ঘ্যাম নিয়ে আমি লেতকে পড়ে থাকব। চারদিকে বিস্তর হৈহল্লা, তুমুল ফুর্তি, আনন্দের বন্যা। এ ওকে জড়িয়ে ধরছে, ও একে হাই-ফাইভ অফার করছে, টেবিল কাঁপানো আড্ডা বসেছে। ও'দিকে ডায়োজিনিস-ঘ্যামে, আমি সোফায় হাত পা ছড়িয়ে আধশোয়া।  মুখে গুনগুন, তৃপ্তিতে বুজে আসা চোখ। যাবতীয় চিৎকার চ্যাঁচামেচি গলাগলি আবদার আমার গায়ে বাউন্স করে ফিরে যাচ্ছে। বন্ধুরা গপ্প ফাঁদতে আসবে, আমি বলব "রোককে ভায়া রোককে। মেডিটেশন মোডে রয়েছি"। পড়শিরা গসিপ করতে আসবে, আমি আঙুলের ইশারায় বলে দেব, "বাদ মে আইয়ে জনাব"। সবাই সেই ডায়োজিনিস-আমিকে দেখে বলবে "কী জিনিস রে ভাই"। 

এমন সময় ঘ্যাম-শিরোমণি সম্রাট-শ্রেষ্ঠ শ্রী শ্রী আলেকজান্ডার উত্তমকুমারিও হাসি হেসে আমার সোফার দিকে এগিয়ে আসবেন। মেজপিসে যে মেজাজে বৃষ্টির দিনে ফুলুরি খাওয়ান, আলেকজান্ডারবাবু তার চেয়েও সহজে বখশিশ বিলিয়ে বেড়ানো মানুষ। রাজ্য চাইলে রাজ্য, রাজকন্যে চাইলে রাজকন্যে। তুষ্ট করতে পারলেই হল। আলেকজান্ডারবাবুকে এগিয়ে আসতে দেখে বন্ধুরা ভাববে, এ'বার এই ডায়োজিনিস ব্যাটার ঘ্যাম-ঘুম ভাঙবেই। প্রতিবেশীরা চিল্লিয়ে উঠবে, "এ'বারে বাবুটি সোফা ছেড়ে উঠবেই। আলেকজান্ডারের ঝিলিক দেখে যাবে গলে। এ'টা দাও ও'টা দাও বলে মারাত্মক দাঁও মারার তাল করবেই"।

গ্রেটস্য গ্রেট আলেকজান্ডার এসে দাঁড়াবেন সোফার সামনে। বিশ্বজয় করা আওয়াজ দিয়ে চমকাতে চাইবেন, "এই যে ব্রাদার, হিয়ার আই অ্যাম। কী চাই? মুখ ফুটে যাই চাইবে, পাবে। মাইরি। কী চাই, অ্যাঁ? কেরিয়ার পালটে দেওয়া সুযোগ? না লটারিতে পাওয়া মিক্সার গ্রাইন্ডার? নাকি পরশপাথর,? না গানের গলা? না মার্গো সাবানের সুপারসেভার প্যাক? নোবেল প্রাইজ চাই? তাও হবে। নাকি ভোটে জিততে মন চাইছে"? এ'সব প্রশ্ন ভাসিয়ে দিয়ে, নিজের আদ্দির পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াবেন আলেকজান্ডার। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিখুঁত রিং ছাড়তে ছাড়তে আমায় করুণা দৃষ্টি দিয়ে জরীপ করবেন। শিস দিয়ে ধরবেন সলিল চৌধুরী। 

তারপর ফের বলে উঠবেন, 
"ভাই ডায়োজিনিস, লজ্জা কীসের। এই তো বাম্পার সুযোগ। মন খুলে চেয়ে নাও দেখি। তোমার ন্যাতানো হাবভাব আমার পছন্দ হয়েছে। হৈহল্লায় হাঁপিয়ে উঠছিলাম কিনা। তাই বলছি। চিন্তার কিস্যু নেই। চেয়ে ফেলো। মনঃপ্রাণ খুলে"। 

সোফা-মগ্ন আমি ঘাড়ের অ্যাঙ্গেল সামান্য পালটে নিয়ে আলেকজান্ডারের দেবতার মত মত উজ্জ্বল চেহারাটার দিকে তাকাব। বলব, "চেয়ে ফেলব? চেয়ে ফেলব কী"?

সিগারেটে একটা মোক্ষম টান দিয়ে আলেকজান্ডার বলবেন "চেয়েই দেখো না। আলেকজান্ডারের কথা হেরফের হলে পৃথিবী রসাতলে যাবে"। এরপর পকেট থেকে একটা পান বের করে মুখে দেবেন, জর্দার মনমাতানো সুবাসে ঘর মাতোয়ারা হবে। 

আবারও বলব, "ভেবেই দেখুন, পরে আবার রিফিউজ করবেন না যেন"।

আলেকদাদার আশ্বাস; "আহ্‌। বললাম তো ডায়োজিনিস ভাইটি। চাও। ডিম্যান্ড করো। ক্যুইক"। 

এ'বার আমার পালা হাইভোল্টেজ উত্তম-হাসিতে নিজেকে মুড়ে নেওয়ার। ডায়োজিনিস-কেতায় আমি বলে উঠবো, "স্যার, ডিমান্ডটা ফেলবেন না প্লীজ। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাতির স্যুইচটা বন্ধ করে যাবেন। ইলেকট্রিকের বাতি আমেজে একটু খোঁচা দিচ্ছে বটে। আর পারলে তার আগে ওই ফ্রিজ থেকে একটা জলের বোতল  বের করে আমার হাতের কাছে দিয়ে যান। এ'বেলাটা তা'হলে আর না উঠলেও হবে। দ্যাট ইজ অল"। এই বলে আমি গা আরও খানিকটা এলিয়ে নিয়ে ফের চোখ বুজব। 

তালেবর আলেকজান্ডার ততক্ষণে থ। পান চিবুনো থেমে গেছে। এ যেন দক্ষিণপাড়ার বালক সঙ্ঘ ক্লাবের ক্যারমখোরদের কাছে তার সৈন্যদল ইনিংস ডিফীট খেয়েছে। দু'একবার আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবেন। কিন্তু সম্রাটের মুখ দিয়ে টু-শব্দটি বেরোবে না। খানিকক্ষণ অসহায় ভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারী করে, ফ্রিজ থেকে জলের বোতল বের করে আমার সোফার পাশে রেখে রণেভঙ্গ দেবেন রাজাধিরাজ। আমার প্রতি অন্তত বাহাত্তরটা সেলাম ঠুকবেন, তবে মনে মনে। রুম থেকে বেরোনোর আগে স্যুইচ বোর্ডে হাত রেখে আর একবার আমার দিকে তাকিয়ে সেই বিশ্বজয়ী বলবেন, " আলেকজান্ডার হয়ে ছাই করলামটা কী! এমন নির্লোভ হতে পারলাম না কেন?আমি ডায়োজিনিস হতে পারলাম না কেন"?

বড় শখ জানেন। বড় সাধ; জীবনে একটিবার অন্তত এমন ডায়োজিনিস-ঘ্যাম নিয়ে জীবনের কোনও একটি আলেকজান্ডারিও বখশিশের অফার উড়িয়ে দেব। একটিবার অন্তত সে ঘ্যাম যেন স্পর্শ করতে পারি।

(আলেকজান্ডার-ডায়োজিনিসের মোলাকাতের ওপর যে উইকিপিডিয়া এন্ট্রি, সে'টার লিঙ্ক কমেন্ট সেকশনে দেওয়া রইল। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন)