Wednesday, June 1, 2022

একদিকের বৃষ্টি আর অন্যদিকের বৃষ্টি

একদিকে

- হ্যালো ভটকাই! আপডেট আছে।
- জরুরী?
- জরুরী।
- শুনি।
- দিল্লীতে মারাত্মক বৃষ্টি নেমেছে। মারাত্মক।
- কতটা মারাত্মক?
- রেইনিং ক্যাটস অ্যান্ড ডগস যাকে বলে।
- এক্সপ্রেশন শুধরে নে।
- কী'রকম?
- বল ইট ইজ রেইনিং বেগুনিজ অ্যান্ড ফুলুরিজ।
- ওউক্কে। যাই। ব্যবস্থা করি গিয়ে।
- বারিষ মুবারক ব্রাদার।
- থ্যাঙ্কিউ।



অন্যদিকে

আজ দুপুরের দিকে আড়াই মিনিট বৃষ্টি হয়েছিল।
আনন্দের আতিশয্যে
আড়াই হাজার প্লুভিওফাইল মার্কা হোয়্যাটস্যাপ ফরওয়ার্ড দেওয়া-নেওয়া করেছি৷
আড়াইশোবার "ইশ্, গাড়িতে ছাতা রাখতে ভুলে গেছি" বলে জিভ কেটেছি৷
আড়াই ঘণ্টা লূপে 'আজি ঝরঝর মুখর বাদরদিনে' শুনেছি৷
আর ট্র্যাফিকে সম্ভবত আড়াই হাজার বছর আটকে ছিলাম।
আদেখলাপনার যোগ্য শাস্তি৷

সব আমাদেরই জন্য



কাল রাত্রে আমার বয়সী (বা খানিকটা ছোট এবং খানিকটা বড় যারা) বহুমানুষ ছোটবেলার বন্ধুদের কথা ভেবেছেন। টিউশনি, ছুটির দুপুর, বিকেলের খেলার মাঠ। প্রেম-ট্রেম। একটা অদ্ভুত ব্যাপার, ধেড়ে বয়সে এসে সেই পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যে বড়সড় মনমালিন্যগুলো ঘটেছে, কাল মাঝরাতের দিকে সে'গুলোকে আচমকাই খেলো মনে হয়েছে। হয়ত, অন্যদের হয়ে নিশ্চিত হয়ে আর কী ভাবে বলি। কাল হয়ত অনেকেই ভেবেছেন ছেলেবেলার সে'সব দুর্দান্ত স্মৃতিগুলো তরতাজা থাকতে এইসব বুড়োটে ধান্দাবাজ ঝগড়াদের পাত্তা দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। আর সেই সব সাতপাঁচ ভেবে ভেবে সে কী বিস্তর মনখারাপ। হয়ত কাল রাতের চিন্তাগুলো আজ সকালেই অফিস-কাজকর্মের ঠেলায় ধুয়ে মুছে সাফ, কিন্তু সে মনভার ফেলনা নয়।

আমাদের দুঃখের সমস্তটুকুই যে কেকে নয়। তাঁর ফেলে যাওয়া গানগুলোর গুণগত পরিমাপই তো শেষ হিসেব নয়। আমার মত মানুষ ছাই গানের বোঝেই বা কী। কিছু গানের সুর সামান্য বেয়াদপ।
সে'সব সুরের ধাক্কায় কত কী মনের মধ্যে উদয় হয়;
কত বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার দুঃখ,
ছোটবেলার সুপরিচিত নিরিবিলি রাস্তাগুলো চিরে এগিয়ে যাওয়া সাইকেলের প্যাডেলের মচরমচর কানে ভেসে আসার দুঃখ,
কত অদরকারী তিক্ততা বয়ে বেড়ানোর আফসোস।

এই সব মিলে বুকের মধ্যে হুহু, তার মধ্যে কেকে কম, আমরা নিজেরাই বেশি। আর সে'জন্যই কেকে অনন্য। কালই হঠাৎ আমরা অনেকে টের পেলাম যে কোন ফাঁকে যেন ভদ্রলোক নিজেরই কয়েকটা গান দিয়ে আমাদের বহু জরুরী স্মৃতিতে মলাট দিয়ে গেছেন।

Sunday, May 29, 2022

পুজোবার্ষিকী আর আইপিএল



বছর কুড়ি আগে আচমকা পুজোসংখ্যায় আগ্রহ কমে গেছিল। বছরভর অপেক্ষা করে থাকা, তারপর খান পাঁচেক বিভিন্ন পুজোসংখ্যা সংগ্রহ করে ধীরসুস্থে পড়ে ফেলা। মাস দুয়েক ধরে রসিয়ে প্রতিটা গল্প উপন্যাস কমিক্স উপভোগ করা। বেশ মনোগ্রাহী একটা প্রসেস ছিল সেই ছেলেবেলায়৷ প্রায় একটা বাৎসরিক উৎসব। কিন্তু হুট করে আগ্রহ কমে গেল৷ ভ্যাকিউম তৈরি হল।

এরপর এলো আইপিএল। এক্কেবারে জমজমাট প্যাকেজ, বছর বছর দিস্তেদিস্তে পুজোর লেখা পড়ার মতই একগাদা ক্রিকেট ম্যাচ, পরপর-প্রতিদিন, মাস দুয়েকের কার্নিভাল।  খেলার মাঠ থেকে ফিরে আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোরভারতীর ওপর উপুড় হয়ে পড়ার মতই রোজ অফিস ফেরতা ক্রিকেট দেখতে বসা। 

এই সাত-আট হপ্তায় খানিকটা ঘোর মিশে থাকে। কোন দল কেমন খেলছে; কারা চমকে দিচ্ছে, কারা ধ্যাড়াচ্ছে। ফ্যান্টাসি টীমে কাকে রেখে কাকে ভুলতে হবে। টুক করে অফিসের আড্ডায় তর্ক, বাসে-ট্রামে স্কোর আদানপ্রদান। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করা যাবে না, কাজেই দু'একটা সন্ধ্যের কাজ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মজবুত কাল্পনিক কৈফিয়ৎ তৈরি করে রাখা৷ আর দু'একটা হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপে ঠিক এই মাসখানেক ধরে দেখা যায় 'হাইভোল্টেজ স্পার্ক''। আইপিএলের একটা মস্ত সুবিধে হল আমার মত গাম্বাট ক্রিকেট-মগজ মানুষেরও জোর গলায় মতামত দেওয়ার সাহস থাকে। ঠিক যেমন পুজোসংখ্যা পড়ে বলতে কচিবয়সেও ঘ্যাম নিয়ে বলে দিতাম, "খারাপ না। তবে এ'বার কিন্তু কাকাবাবু অতটা জমাতে পারেনি। জোজো জাস্ট বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে"। কাজেই সে'সব হোয়্যাটস্যাপ আইপিএল আড্ডা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে বইকি।

যা হোক। পুজোর মাসখানেক আগে থেকে পড়া শুরু হত। ওই লক্ষ্মীপুজো নাগাদ শেষ হত পুজোবার্ষিকী ম্যারাথন।  আর ছেলেবেলায় প্রায় প্রতিবারই আমি শীর্ষেন্দুর উপন্যাসটা রেখে দিতাম এক্কেবারে শেষবেলায় পড়ব বলে। সেই শেষ উপন্যাস শুরু করেই একটু মনকেমন হত। ছুটি শেষ, ছুটির দুপুর-সন্ধের গল্প-কমিক্স পড়া শেষ। সেই মন-ভালো-করা রুটিনে ফিরতে আবার বছরখানেকের অপেক্ষা। আইপিএলের ফাইনাল দেখতে বসেও প্রতিবার মনের মধ্যে ওই খুচরো একটা মাইনর-বিজয়া-লেভেল মনখারাপ তৈরি হয় বটে। দু'মাস ধরে তৈরি হওয়া একটা সিস্টেম উপড়ে ফেলতে হবে তো, সে এক যন্ত্রণা। আর একবছরের অপেক্ষা ছাড়া কোনও গতি নেই। 

আইপিএল এই ধেড়ে বয়সের পুজোসংখ্যাই বটে।

Thursday, May 26, 2022

গুলচন্দ্র গোলন্দাজ বনাম গুলশাহেনশাহ গুলগুলি



'অন্দাজ অপনা অপনা'র সেই অনাবিল দৃশ্য। 
অমর আর প্রেম দু'জনেই এন্তার গুল দিচ্ছে, প্রাণপণে যাতা বলে চলেছে৷ গুলের গণ্ডার মরে কাঠ আর বাতলের ভাণ্ডার সাফসুতরো৷ সবচেয়ে বড় কথা দু'জনেই বুঝতে পারছে যে দু'জনেই গুলবাজ; "আমি যেমন গুলচন্দ্র গোলন্দাজ, অন্যজনটিও গুলশাহেনশাহ গুলগুলি"৷ সেই সিনেমারই ভাষায় বলতে গেলে, দু'জনের মনের মধ্যেই ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে এক কাব্যিক উপলব্ধিঃ; "শালা! ম্যায় ভি ফেকু অউর ইয়ে ভি ফেকু"।

কিন্তু কেউই পিছু হটছে না৷ ক্লান্ত হচ্ছে না৷ লজ্জায় পিছিয়ে আসছে না৷ বরং গুলের তেজ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে৷ ও'দিকে গল্পের গরু ইউক্যালিপটাস গাছ পেরিয়ে মনুমেন্টের ডগায় পৌঁছে জর্দা পান চিবোয়৷ এ'রকম পরিস্থিতি শুধু বলিউডি কমেডিতেই থাকে ভেবেছেন? আদৌ নয়৷ 

অফিস মিটিংয়ে ভোম্বলদার বস তার টীমমেম্বারদের মোটিভেট করতে চেয়ে ফস করে একটা খটমট জার্গন বলে ফেললেন। বলে ফেলেই মনে মনে জিভ কাটলেন এই ভেবে যে একটা ফালতু কথা বেরিয়ে গেল যার না আছে মাথা, না আছে মুণ্ডু৷ কিন্তু রণেভঙ্গ দেওয়া অ্যাটিচিউড নিয়ে টীমলীডার হওয়া যায়না৷ অতএব জান লড়িয়ে দিলেন বস, নিজের গুল-জারগনকে নব-জাগরণের সূত্র হিসেবস প্রমাণ করতে চেয়ে। ভোম্বলদাও মহাসেয়ানা। বসের স্লিপ অফ টাং দিব্যি ধরতে পেরেও চেপে গেল৷ প্রমোশনের মায়া বড় মায়া আর প্রমোশন দেনেওলাদের খোঁটা দেওয়া মানে নিজের মুখে দু'চামচ পেট্রোল ঢালার পর সিগারেট ধরানো। কাজেই বসের মুখ ফসকে বলা কর্পোরেট-গুলকে অমৃতবাণীর লেভেলে টেনে তুলতে জান কবুল করলেন ভোম্বলদা। 

ভোম্বলদার বস জানেন তিনি গুল দিয়ে ফেলেছেন৷ তিনি এও জানেন যে ভোম্বলদা সে গুল ধরে ফেলেছে৷ ভোম্বলদাও টের পাচ্ছে যে বস জানেন যে ভোম্বল দত্ত খচ্চরশ্রেষ্ঠ। কিন্তু দু'জনে আধঘণ্টা আলোচনা চালাবেন এমন ভাবে যেন বস হলেন রামকৃষ্ণ আর ভোম্বলদা আজ বিকেলেই শেয়ালদা থেকে শিকাগোর ট্রেন ধরবে৷ সে আলোচনায় যেমন ধার, তেমনি ঘ্যাম৷ 

বস বলছেন, "কেমন দিলাম হে ভোম্বল"? 
ভোম্বলদা বলছেন, " কী ভাবে পারেন এমন পার্লস অফ উইসডম এত কেয়ারলেসলি ছড়িয়ে দিতে"?
বস বলছেন, "ভাবতে পারো কী সাংঘাতিক ডেপথে গিয়ে বলেছি"?
ভোম্বলদা মাথা নাড়ছে, "গতকাল ইউটিউবে বিল গেটসের টেডটক শুনছিলাম৷  এ'রকমই বলতে চাইছিল৷ তবে আপনার মত ক্ল্যারিটি ছিল না"।

দিনের শেষে, যখন গুলগুলিস্তানের উৎসাহ স্তিমিত, তখন বসের মনে সামান্য সন্দেহ দানা বাঁধবে, " সত্যিই কি ভুল বলেছিলাম? না বোধ হয়৷ দামী কিছুই বলে ফেলেছি হয়ত। নয়ত ভোম্বল অত শার্প ছেলে, সে কিনা বলদের মত মাথা নেড়ে গেল"। আর লোকাল ট্রেনে ঝালমুড়িওলার ধাক্কা খেতে খেতে ভোম্বলদা হয়ত টের পাবে, "নাহ্, বস মানুষটার অতশত ডিগ্রী৷ কত হাজার বছরের এক্সপিরিয়েন্স৷ যা বলেছেন ভালোই বলেছেন নির্ঘাৎ।  আমারই বুঝে উঠতে সময় লাগছে"। 

ভাবছেন এ সিচুয়েশন শুধু অফিস আর সিনেমাতেই থাকবে? কভি নহি।

পকেট গড়ের মাঠ৷ এ'দিকে দ্যাবা বলছে সামনের মাসে পাহাড়, দেবী বলছে সমুদ্র৷ ধুন্ধুমার তর্ক৷ প্রায় রক্তারক্তি ব্যাপার৷ কেউই পিছু হঠবে না৷ দার্জিলিং বনাম পুরী; সে এক বিশ্রী আগুন৷ অথচ দু'জনেই জানে যে বসিরহাটে পিসির মেয়ের বিয়েতে যাওয়ার খরচটুকুও জোগাড় করা যাবে না৷ তবু তর্কের ঝাঁজ কমবে না৷ সেই ঝাঁজটুকুতেই বলভরসা। আবার ধরুন দু'জন ব্যর্থ ভালোবাসাবাসির মানুষ। তাদের আর পাশাপাশি এসে বসা হলো না৷ হাত টেনে ধরা হলো না৷ বিপদেআপদে 'আমি আছি তো' বলে জাপটে ধরা হলো না; কোনওদিন সে সুযোগ হবেও না৷ তবু, তাদের গল্পের আকাশকুসুম কমার নয়। আর সেই আকাশকুসুমটুকু থেকে যাবে বলেই হয়ত এই পৃথিবীটা নির্দ্বিধায় ঘুরে চলেছে। 

Thursday, May 19, 2022

বংপেনের পনেরো বছর



পনেরো বছর আগে, ঠিক আজকের দিনে (১৯শে মে, ২০০৭) বংপেনের প্রথম 'পোস্ট' 'পাবলিশ' হয়েছিল৷ লেখালিখির মানুষ নই আদৌ, আগ্রহ ছিল ব্লগ ব্যাপারটাকে বোঝার৷ অমন টপ করে নিজের ওয়েবসাইট খুলে বসা যায়৷ যা খুশি লেখা যায়, ছবি আপলোড করা যায়৷ ব্যাপারটা রীতিমতো থ্রিলিং মনে হয়েছিল৷ তখন আমি সামার ইনটার্নশিপ করতে কলকাতায়৷ মাস দুয়েকের জন্য সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের পুরনো মেসবাড়িতে ফিরে গেছি৷ সেই সময়ই এই আগ্রহটা দানা বাঁধে আর সূর্য সেন স্ট্রিটের একটা সাইবার ক্যাফেতে বসে ব্লগারে রেজিস্টার করি৷ প্রথমে ভেবেছিলাম ইংরেজিতে লিখব৷ পরীক্ষার খাতার বাইরে একদমই বাংলায় লেখার অভ্যাস ছিল না৷ ওই যে বললাম, উদ্দেশ্য ছিল ব্লগ ব্যাপারটাকে বোঝার৷ ব্লগের বিষয় কী হবে, সে'খানে কী থাকবে; সে'সব ভাবনা নেহাতই অপ্রয়োজনীয় ছিল৷ 

বাংলা ব্লগের সংখ্যা তখন নেহাতই হাতে গোনা৷ কিন্তু তদ্দিনে অনেকেই ইংরেজিতে ব্লগ লিখতে শুরু করেছেন৷ আর সে'সব লেখা খুঁজেপেতে পড়তে বেশ লাগছিল৷ মিডিয়ামটা যে ছাপার থেকে একটু স্বতন্ত্র, পাঠক হিসেবে সে'টা বুঝতে অসুবিধে হয়নি৷  তখনও আমরা ফেসবুক ট্যুইটার দেখিনি, ছিল সবেধন নীলমণি অর্কুট। অর্কুটের স্ক্র‍্যাপ ব্যাপারটা খুবই ব্যক্তিগত ছিল; ওয়ান-টু-ওয়ান প্রসেস৷ ব্লগ তা নয়৷ সে'খানে বহু মানুষ নিজের চিন্তা,ভাবনা, লেখালিখি সাজিয়ে নিজের মনের মত জার্নাল তৈরি করছেন৷ সে ব্যাপারটা যতটা ব্যক্তিগত, ততটাই খোলামেলা৷ যাদের প্রাক-ফেসবুক-ইন্টারনেট-যুগের স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে (বা ছোটরা যারা সে সময়টা দেখেইনি), তারা সেই প্রথম ব্লগ দেখার 'উরিব্বাস' অনুভূতিটা ঠিক ধরতে পারবেন না৷

আমার চিরকালই ধারণা ছিল অলিখিয়ে মানুষদের নিজের লেখা ফলাও করে লোক হাসানো উচিৎ নয়৷ কিন্তু ইন্টারনেট একটা অদ্ভুত স্পেস দিল নির্লজ্জ হওয়ার৷ খারাপ লিখি, বেশ করি; কারুর কপালে বন্দুক রেখে তো পড়তে বলছি না৷ লিখেই দেখিনা৷ 

আমি সবচেয়ে মজা পেয়েছিলাম নিজের ব্লগকে নিজের মত সাজাতে পারার ব্যাপারটায়৷ বরাবরই আমার হাতের লেখা ভয়াবহ৷ গভীর প্রেমে পড়েও নিজের হাতে চিঠি লেখার দুঃসাহস কোনওদিন হয়নি৷ কিন্তু ব্লগে সে দুশ্চিন্তা নেই। লেখার বিষয় কাগের ঠ্যাং হোক, লেখার কোয়ালিটি বগের ঠ্যাং হোক; আমি মনের মত ফন্ট বেছে নিতে পারি৷ ইচ্ছে মত মাস্টহেড ঠিক করা যায় (বহুদিন একটা কাকের ছবি আমার ব্লগের মাথায় ছিল, কেন সে ছবি বেছে নিয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই)৷ ব্লগের রংচঙও ইচ্ছে মত বদলে নেওয়াই যায়৷ গোটা প্রসেসটা যে কী ভালো লেগেছিল৷ তাই ভাবলাম ব্লগ একটা খুলেই ফেলি৷ নিজে লিখব, নিজেই পড়ব, আর নিজেই নিজের ব্লগকে ক্রমাগত কাস্টোমাইজ করে যাব। ক্লাস ইলেভেনে উঠে প্রথমবার রোডর‍্যাশ কম্পিউটার গেমটা খেলে যে আনন্দ পেয়েছিলাম, ব্লগ আবিষ্কারেও সম্ভবত আমি সে আনন্দই পেয়েছি। 

তা, ব্লগ শুরু হলো গুগলের ব্লগারে। অন্য কোনও প্ল্যাটফর্ম চিনতামও না৷ কী মনে করে ঠিক করলাম ইংরেজিতে নয়, বাংলাতেই লিখব৷ তবে রোমান হরফে৷ তখনও অভ্র সম্বন্ধে সচেতন হইনি৷ আর বাংলা ওয়ার্ডে লেখার চেয়ে ডালভাতের সঙ্গে স্টোনচিপস ভাজা চেবানোও সহজ মনে হত৷ কাজেই একটা গোলমেলে বাংরেজি মার্কা শুরু৷ সেই পাঁচমেশালি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই বোধহয় বংপেন নামটা বেছে নেওয়া৷ বছরখানেক পর শুরু করি অভ্রতে বাংলা লেখা।

আর পাঁচটা মানুষের মত আমারও মনের মধ্যে অনেক হুজুগ আসে, আবার ফাঁকতালে কেটেও পড়ে৷ আর সত্যি বলতে কী; হাল ছাড়ার ব্যাপারে আমার জুড়ি মেলা ভার৷ তা'ছাড়া কত মধ্যবিত্ত ভয় আর লজ্জা মনের মধ্যে আছে৷ কোনও কিছু করতে নেমেই মনে হয়ে, "এহ হে, লোকে হাসবে"। বা "কী দরকার, এ দিয়ে আখেরে কিছু হবে কী", এমন কতশত ভয়৷ এমনি'ভাবেই কত শখ ভেসে যায়৷ এহেন মানুষ হয়ে, একটা কথা ভাবতে কিন্তু বেশ ভালো লাগে; যে এদ্দিনেও ব্লগটা ছেড়ে দিইনি৷ বংপেন ডট নেট৷ ও'টা সত্যিই আমার "এলাকা"৷ লোক হাসানোর ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া সে'খানে নেই৷ সবচেয়ে বড় কথা, ওই একটা ব্যাপারে আমি আজও 'রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট' ভেবে নার্ভাস হইনা৷ বাথরুমের গান আর ব্লগের লেখা, এ'দুটো ব্যাপারে পিছপা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এই স্পেস শুধুই আমার৷ নিজের ব্লগে (ফেসবুক পেজ নয়, আদত ব্লগটা) আমি নিয়মিত (রোজ) ঢুঁ মারি৷ পড়ি, পুরনো ভুল শুধরে নিই, ছবি পাল্টাই, ফন্ট এ'দিক ও'দিক করি, ট্যাগগুলো ঝালিয়ে নিই৷ এই গোটা প্রসেসটা আমার মনের ঝুলবারান্দা, আত্মার বিরিয়ানি৷ আর একবার বলি, বড় ভালো লাগে এই ভেবে যে এমন একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছি যে'খানে ইচ্ছেমত কেরদানি ফলানো যায়৷ জায়গাটা ডিজিটাল কিন্তু ছোঁয়াও যায়৷ 

একটা ব্যাপার না জুড়লেই নয়৷ লিখতে লিখতে হাজার রকমের দোষ বেরিয়ে এসেছে, সে'গুলো অত্যন্ত সহৃদয়ভাবে ধরিয়ে দিয়েছেন এবং শুধরে দিয়েছেন মানুষজন৷ বংপেনের পাঠকরাই মোটামুটি ঠুকেঠাকে চালিয়ে দিয়েছেন এই ব্লগটাকে৷ বানান শুধরে দেওয়া, টাইপো দাগিয়ে দেওয়া, লেখার ভুল ধরিয়ে দেওয়া; সবচেয়ে বড় কথা, পিঠ চাপড়ে দেওয়া৷ তাঁদের যোগানো দুঃসাহসের ভরসাতেই মনে হয়েছে, আর একটু লেখাই যায়৷ বংপেনের সূত্রে, এই পনেরো বছরে কত কিছু শিখেছি৷ কত ভালো বই, সিনেমা, খাবারদাবারের সাজেশনে সমৃদ্ধ হয়েছি৷ সবচেয়ে বড় কথা, ঢিমেতালে হলেও আমার মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসাটা ক্রমশ বেড়েছে৷ এই যে নিয়মিত বাংলা লিখছি, সে অভ্যাসটাও তৈরি হয়েছে স্রেফ এই বংপেন ছিল বলে। কৃতজ্ঞতা প্রসঙ্গে একটা জরুরী কথা না বললেই নয়৷ বংপেন ব্লগটা না থাকলে কিছু জরুরী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগই হত না৷ 

বংপেন আদৌ কোনও জার্নাল নয়৷ তবে ব্লগের প্রতিটা লেখার সঙ্গেই কোনও না কোনও স্মৃতি জুড়ে আছে৷ হয়ত কোনও পরিচিত মানুষের কথা বলার স্টাইল, কোনও সুপরিচিত জায়গার গন্ধ, কোনও প্রিয় সিনেমার সিচুয়েশন, কোনও হঠাৎ মনে পড়া ঠাট্টা বা মনখারাপ৷ কাজেই কতশত খাজা লেখাও স্রেফ সেই নিজের রকমারি স্মৃতির সঙ্গে আবছা যোগাযোগের জন্য আমার কাছে জরুরী হয়ে রয়ে গেছে৷ আজকাল একটা ইচ্ছে জোরালো হচ্ছে; আমার ছেলে বড় হয়ে বাপের আগডুম-বাগডুম লেখাগুলো পড়বে আর সে'সব লেখায় সেঁধিয়ে থাকা স্মৃতিগুলো ডিকোড করে আনন্দ পাবে৷ হয়ত মাঝেমধ্যে মুচকি হাসবেও।