Sunday, February 27, 2022

বিরিয়ানির কবিগান



বিরিয়ানি ব্যাপারটা নিয়ে এত মাতামাতি বোধ হয় আইডিয়াটার নিপাট সারল্যের জন্য৷ ভাত-মাংস, একই পাত্রে, একই সঙ্গে৷ অবশ্য সরল ব্যাপারটা খাইয়েদের জন্য৷ রাঁধিয়েদের কাজটা সহজ নয় তেমন, এ বড় জটিল শিল্প৷ ভাতের দানা কতটা শক্ত রইল, মাংস যথেষ্ট তুলতুলোলো কিনা, মশলার ব্যবহারে যথেষ্ট সংযম দেখানো গেছে কিনা; এমন হাজারো হ্যাপা৷ 

কিন্তু আউটপুট ব্যাপারটা সুকুমার সমগ্রর মত জম্পেশ; সহজসরল অথচ ম্যাজিকে টইটুম্বুর একটা ব্যাপার। বিরিয়ানি ছাড়া খানাপিনা ভাবতে হলে আপনাকে ঝোল বাছতে হবে, রুটি বা ভাতের রকমফের দেখতে হবে, তার পাশাপাশি এ'টি এবং ও'টি৷ বিরিয়ানি ব্যাপারটা তুমুল; মাংস-ভাত, ঝোলে ল্যাপ্টালেপ্টি নেই কিন্তু শুকনো দলা হয়ে গলাতেও আটকে যাবে না৷ আর সেই অনাড়াম্বরের জন্য হয়ত খানিকটা খরচেরও সাশ্রয় ঘটে; ওই তিনচারটে পদের দরকার স্রেফ বিরিয়ানিতে মিটে যাওয়ায় (এই ছবিতে বিরিয়ানির পাশাপাশি যে মুর্গির রগরগে ঝোল আছে, সে'টা নেহাতই উত্তমকুমার পাশে আমার মত গাম্বাটের হ্যা-হ্যা করে দাঁতিয়ে দাঁড়ানোর মত অদরকারী)। 

বিরিয়ানি চিনামাটির প্লেটেও চলে, রূপোলী থালাও আলো করে থাকে আবার  সস্তা সাদা কাগজের বাক্সেও একই রকম জমজমাট এবং উপভোগ্য৷ এর ফলে ব্যাপারটার মধ্যে রয়েছে দুর্দান্ত 'ইজি অ্যাকসেস'। সে'ভরসাতেই শেয়ালদা স্টেশনের কাছে জীর্ণ ঠেলার হাঁড়ির বিরিয়ানি খাওয়ার থ্রিল য কোনও কুলীন রেস্তোরাঁয় বসে দাঁত চিবিয়ে বিরিয়ানি বিষয়ে সিঙ্গলমল্টিও বিশ্লেষণ করার সমান৷ 

আর এই ভালোবাসাটা মোটামুটি রোববার ভালোলাগার মত, অথবা ট্রেনের জানালায় বসে মিঠে হাওয়া মুখে লাগানোর তৃপ্তির মত।  ব্যাপারটা এতই মোটা জাতের যে এ প্রসঙ্গ উঠলেই বিরিয়ানি-ভালোবাসা মানুষজনের ইমোশন পিলপিলিয়ে হ্যামিলিনের ইঁদুর-দলের মত বেরিয়ে আসে৷ আলোচনায় খোঁচাখুঁচিও থাকে, থাকে ব্যান্টার; অমুক জায়গা ওভাররেটেড, তমুক জায়গার বিরিয়ানি ডালডা চোবানো, ইত্যাদি৷ তবে গোটাটাই পান্নালালের "যেথা আছে শুধু ভালোবাসাবাসি"র জায়গায় থেকে৷ বিরিয়ানি যুদ্ধ বলে কিছু হয়না, পুরোটাই কবিগানের রসালো লড়াই।

যা বলতে এতটা ধানাইপানাই, সে'টা বলি৷ এত বিরিয়ানি-বিরিয়ানি আদেখলাপনার মূলে একটাই কারণ; বিরিয়ানি-কমরেডদের সেলাম জানানো৷ আর ইয়ে (ফিসফিসিয়ে, অপরাধবোধ খানিকটা চেপে রেখে) একটা মোক্ষম কথা জানিয়ে রাখা দরকার। হ্যাংওভার কাটানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র লেবুজল নয় কিন্তু, বিরিয়ানির কার্ব আর সুবাসই আপনার শ্রেষ্ঠ ভরসা৷ চিয়ার্স!

Saturday, February 26, 2022

দুধে-ভাতে-মেডিক্লেমে

মেডিক্লেমের মত ভালো খরচ আর হয়না৷ প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা জমা হওয়ার চেয়েও জরুরী বোধ হয় মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স৷ নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার দেশে অবশ্য সে ব্যাপারটা অনেকের জন্যই সহজলভ্য নয়৷ তবে ঈশ্বরী পাটনীর দুধে-ভাতে থাকার স্বপ্নে একটা বড় অংশ জুড়ে বোধ হয় বিপদেআপদে ফতুর না হয়ে খানিকটা লড়তে পারার ক্ষমতা৷ 

সরকারি হাসপাতালের নিখরচায় চিকিৎসার সুযোগও অবশ্যই আছে৷ কিন্তু মেডিক্লেমের ভরসায় বেসরকারি চিকিৎসার দিকে তাকানোর দুঃসাহসটুকু অন্তত পাওয়া যায়৷ প্রাইভেট মানেই ভালো? না৷ কিন্তু, কোনও দরজাই বন্ধ নেই; এ ভরসার মূল্য ওই দুধভাতের সমান৷ 

আমার এক পরিচিত মানুষ মাঝেমধ্যেই চেনা লোকজনকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স আছে কিনা, থাকলে প্রিমিয়াম নিয়মিত জমা করা হচ্ছে কিনা৷ এমন গায়ে পড়া প্রশ্নে অনেক বিরক্ত হন, আমিও হয়েছি একসময়৷ কিন্তু তা'তে সেই পরিচিত মানুষটার উৎসাহে ভাটা পড়েনা৷ তিনি জোর গলায় বলেন, "ভালো আছিস কিনা জিজ্ঞেস করার চেয়ে মেডিক্লেমের খোঁজ নেওয়া ভালো"। 

তবে সেই পরিচিত মানুষটির গায়ে-পড়া যতই উড়িয়ে দিই, একটু অবাক হই যখন অনেকে একটা নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স ব্যাপারটা নিয়ে গা করেন না৷ কিছু ভাসা ভাসা কারণ শুনতে পাই। "আরে এই জোয়ান বয়সে আবার মেডিক্লেম কেন"৷ "খামোখা অতগুলো টাকা প্রিমিয়াম দেব, কিন্তু গোটা বছর শেষে কোনও ক্লেমই হবে না। গোটাটাই জলে"৷ "ও'সব আমি বুঝি না ভাই"৷ 

প্রতিটা মানুষের মেডিক্লেমের প্রিমিয়াম যেন বছরের পর বছর জলে যায়; কাউকেই যেন হাসপাতালমুখো না হতে হয়৷ তবে ওই, খেটেখুটে জমানো সঞ্চয় উজাড় হয়ে যাওয়ার দুঃখ যে কী নিদারুণ৷ হাসপাতাল চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে সবেধন নীলমণি ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙার প্ল্যান করতে করতে বুকের মধ্যে যে কী বিশ্রী মচরমচর শব্দ হয়, সে'টা কল্পনা করে নিতে অসুবিধে হয়না৷

মেডিক্লেম মানেই কি সব সমস্যার সমাধান? আদৌ নয়৷ আজকাল সত্যিই মেডিকাল ইন্স্যুরেন্সের দর আকাশ ছোঁয়া৷ দরাজ ইনস্যুরেন্স কভার বাগানো চাট্টিখানি কথা নয়৷ কিন্তু বিপদে-আপদে একটা উজ্জ্বল ভরসা, ব্যাপারটা সত্যিই বড় দামী৷ কত দামী? বছরে একবার পুরী ঘুরতে যাওয়ার চেয়েও, মাসে দু'বার রেস্তোরাঁয় খাওয়ার থেকেও, বইমেলায় ঝাঁপিয়ে পড়ার থেকেও; ঢের বেশি দামী৷ 

Monday, February 21, 2022

বাংলার ক্লাস



বাংলায় আমি চিরকালই নড়বড়ে। হাতের লেখা মারাত্মক খারাপ, বানানে বৃহস্পতি। অবশ্য অন্যান্য ভাষায় আমার অবস্থা আরও করুণ। সত্যি বলতে কী; ভাষাগত ভাবে আমি চিরকালই জুবুথুবু৷ তা সত্ত্বেও  ব্লগটা শুরু করেছিলাম নেহাতই টেকনোলজির মায়া কাটিয়ে উঠতে না পেরে৷ ২০০৭ নাগাদ ব্লগ ব্যাপারটা বেশ নতুন৷ উঠলো বাই তো করে নিজের একটা কটক-যাই-ওয়েবসাইট দাঁড় করিয়ে ফেলা যায়, যা কিছু হিজিবিজি লিখেও ফেলা যায়৷ এ লোভ পাশ কাটিয়ে চলে আসা সহজ নয়৷ সেই থেকে বংপেন৷ পরে বহুবার মনে হয়েছে নামটা কেমন যেন; বং এবং পেন, দু'টোর কোনওটাতেই বাংলার ব'ও নেই। কিন্তু নামটা তদ্দিনে ডাকনামের মত হয়ে গেছে৷ বাবাই, টুকাই, পাপাই; এই ধরণের ডাকনামের মানে নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও মানেই হয়না৷ তেমনই, আমার মাথার মধ্যে বংপেনও খানিকটা ওই বাবাই-পাপাইয়ের মতই একটা ডাকনাম৷ 

ব্লগে প্রথম লেখা শুরু করেছিলাম ইংরেজি ফন্টে৷ মানে লিখতাম বাংলাতেই, কিন্তু রোমান হরফ ব্যবহার করে৷ সে'খানে বাংলা হয়ে যেত Bangla। এর মূল কারণ দু'টো৷ এক, তখনও অভ্র কীবোর্ড ততটা ছড়িয়ে পড়েনি বা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি৷ ওয়ার্ড ফাইলে বাংলা টাইপ করা একটা বিশ্রী অভিজ্ঞতা ছিল৷  দুই, পরীক্ষার খাতার বাইরে বাংলা আদৌ লেখার অভ্যাস ছিল না৷ সে সময় হাতে স্মার্টফোন না থাকায় বাংলা টাইপ করার ব্যাপারটা নেহাত এলেবেলে ছিল না৷ সবচেয়ে বড় কথা, একটানা বাংলায় লিখব ভাবলেই গলা শুকিয়ে আসত৷ 

কাজেই রোমান হরফে বাংলা লিখে ব্লগের শুরু৷ তখন লেখা ব্যাপারটাকে আদৌ পাত্তা দিচ্ছি না। ইন্টারনেটে লেখা ভেসে উঠছে; থ্রিল সে'টুকুই৷ কিন্তু এরপরেই টের পেলাম আদত ম্যাজিকটা। সোশ্যাল মিডিয়ার ম্যাজিক৷ আমরা (আমিও) সোশ্যাল মিডিয়াতেই অনবরত দুঃখ করে চলি যে এই মাধ্যমটা ভীষণ নির্মম। মানুষ এ'খানে একে অপরের কলার টেনে কাদায় গড়াগড়ি যাচ্ছে, এ ওর বাপ তুলে গাল দিচ্ছে, ও এর গুষ্টির পিণ্ডি চটকাচ্ছে৷ গুজব আর গালিগালাজে পরিপূর্ণ চারদিক৷ অথচ ফেসবুক ট্যুইটারের নেশা ছাড়তে না পেরে আমরা ক্রমাগত হাহুতাশ করে চলেছি৷ 

যাকগে, যে ম্যাজিকের কথা বলছিলাম। এই প্রবল গোলমেলে ইন্টারনেটের জগতে ব্লগের ঝাঁপ খুলে টের পেলাম দু'চারজন মানুষ পাশে এসে বসতে শুরু করেছেন (ইয়ে, ভার্চুয়ালি), লেখার দিকে চোখ বুলোতে শুরু করেছেন৷ আর সবচেয়ে বড় কথা; কথাবার্তা শুরু হল৷ লেখা নিয়ে, বাংলাভাষা নিয়ে। একসময় টের পেলাম আমারই বয়সী এক ছোকরা মাঝেমধ্যেই ব্লগে কমেন্ট ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায়, "ভায়া, রোমান হরফে নয়৷ ইউনিকোডে লেখো৷ বাংলায় লেখো"৷ যাই লিখি ছাই একই কমেন্ট৷ খানিকটা বাধ্য হয়ে খোঁজ নিলাম ইউনিকোড ব্যাপারটা কী, আবিষ্কার করলাম অভ্র৷ একটা বিচ্ছিরি দুরুদুরু নিয়ে শুরু হল অভ্রতে লেখা৷ সেই ছোকরাটি অবশ্য নিজের 'সুপারভিশন' সরিয়ে নেয়নি৷ ওর নাম রোহণ, ওর মত বাংলাপ্রাণ মানুষ আমি খুব বেশি দেখিনি (ইয়ে, আমি কতটুকুই বা দেখেছি)।  রোহণের (বলাই বাহুল্য ওর একার নয়) সৃষ্টিসুখই বাংলা প্রকাশনায় এখন নতুন হাওয়া (ততটাও নতুন নয় আর৷ রীতিমত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে)।

কপাল বটে আমার৷ হিজিবিজি যা কিছু লেখা, কিছু সহৃদয় মানুষ যত্ন করে পড়তেন এবং খেটেখুটে প্রুফ রীড করতেন। কারুর কারুর সঙ্গে আলাপও হল৷ ক্রিকেট লিখিয়ে অভিষেকদার সঙ্গে আলাপও ওই ব্লগেরই মাধ্যমে৷ অভিষেকদা রীতিমতো মাস্টারি করেছে বেশ কিছু বছর। লেখার ভুলত্রুটিতে বিরক্ত হয়ে বাড়ি এসে পেটানোর হুমকিও দিয়েছে৷ কিন্তু হাল ছাড়েনি৷ বানান এখনও গুলিয়ে যায়, ভাষা এখনও নড়বড়ে, তবে ভুলের ভয়াবহতা খানিকটা কমেছে মূলত অভিষেকদার বকুনির ভয়ে। (লেখায় গোলমাল আছে এখনও বিস্তর, খানিকটা কমেছে, এই যা)৷ 

পত্রভারতীর ত্রিদিববাবু প্রবল ব্যস্ততার মধ্যেও বংপেনের গল্প পড়েছেন আর ধৈর্য ধরে ভাষা এবং স্টাইলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়েছেন৷ সে আলাপও ইন্টারনেট ধরে। আমায় সামনে বসিয়ে একদু'বার লেখা পড়েছেন৷ প্রতিবারই মনে হয়েছে পত্রপাঠ বিদেয় করবেন৷ কিন্তু ওই, লাখটাকার কপাল; ভদ্রলোক কোনওবারই তিতিবিরক্ত হননি৷ " ও এমন কিছু নয়" ভাব করে ভুলচুকগুলো দাগিয়ে দিয়েছেন৷ আমি সমৃদ্ধ হয়েছি। 

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, বংপেন ব্লগে লেখা পড়ে বহু মানুষ প্রুফরীড করে আমার লজ্জা ঢেকেছেন (চেষ্টা করেছেন অন্তত)৷ কত মানুষ ভালো বাংলা বইয়ের খোঁজ দিয়েছেন৷ ব্লগতুতো সম্পর্কের কত সহৃদয় মানুষ ভালো বাংলা সিনেমা দেখিয়ে ছেড়েছেন৷ কত মানুষ লেখার ভুল ধরিয়ে দিয়ে সরে পড়েননি, ভাষাগত বদঅভ্যাস ছাড়ানোর সহজ উপদেশ দিয়ে উপকার করেছেন৷ স্বীকার করে নিই, বংপেন ফেসবুকের পেজের কমেন্ট সেকশনের মত ধারালো প্রুফরীডার না থাকলে আমি সত্যিই বড় বিপদে পড়তাম। 

মোটের ওপর, বংপেন সম্ভবত গোটাটাই 'ক্রাউড ফান্ডেড'৷ কেউ বানানের লেগো টুকরো এগিয়ে দিয়েছেন, এগিয়ে দিয়েছেন ভাষার স্টাইলের লেগো টুকরো। এ সমস্ত জুড়েটুরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বংপেন; মচমচ শব্দ আছে কিন্তু ভেঙেচুরে পড়ছে না৷ এই ব্লগের সূত্রেই বাংলাভাষা প্রসঙ্গে বিস্তর ধমক, কানমলা, গাঁট্টা, আর স্নেহপ্রাপ্তি ঘটেছে। সে'সব নিয়েই আমার বাংলা-শিক্ষা। বংপেন থেকেই জুটেছে বাংলার 'মাস্টারমশাই-দিদিমণি'দের৷ 

পনেরো বছর আগের তুলনায় ভুলভ্রান্তি খানিকটা কমেছে (তবে আবারও বলি, কমেছে মানে স্রেফ ওই সমুদ্র থেকে দু'চার মগ জল সরেছে আর কী)। আরও কমবে, আরও একটু ভালো বাংলা লিখতে শিখব ধীরেসুস্থে; উচ্চাশা বলতে সে'টুকুই৷ 

ধন্যবাদ। 

আর, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা৷

Sunday, February 20, 2022

মিহিরবাবু দায়িত্ব


রাতের দিকে ঘাটটা বেশ নিরিবিলি৷ কে বলবে যে এ'খানেই দিনেরবেলা একটা ছোটোখাটো মেলা বসে যায় প্রতিদিন৷ পাশেই সুপ্রাচীন মন্দির, লোকে বলে বড় জাগ্রত এ'খানে অধিষ্ঠিত দেবী। এককালে নরবলি হত, এখন শুধু প্রতি অমাবস্যায় পাঁঠাবলি হয়৷ প্রতিদিন ভোরবেলা থেকে ঘাট ভরে যায় মানুষে, ভক্তরা এ'খানে এসেই স্নানটান করে৷ দোকানপাটও রয়েছে বেশ কিছু, পুজোসামগ্রী থেকে কচুরিমিষ্টির দোকান, এমন কি ভাতের হোটেলও আছে দু'চারটে৷ কিছু নৌকাও থাকে, অল্প ভাড়ায় দিব্যি আধঘণ্টা নদীর বুকে ঘুরে আসা যায়। অন্ধকার হলেই অবশ্য সব শুনশান; শুধু হরেনের চায়ের দোকান খোলা থাকে৷

মিহিরবাবু ভক্তও নন, ট্যুরিস্টও নন৷ কাজেই দিনেরবেলা এ'অঞ্চলটা এড়িয়ে চলেন। সন্ধ্যের পরেই অবশ্য তাঁর এ'দিকে আসাটা জরুরী। হরেনের সঙ্গে দু'হাত তাস খেলে বাঁধানো ঘাটে একটা জুতসই জায়গা বেছে নিয়ে খানিকক্ষণ বসে থাকেন৷ খানিকক্ষণ নদীর হাওয়া খাওয়া আর গুনগুন করে মুকেশের গান গাওয়া৷ রাত আটটার পর দোকান বন্ধ করে ঘাটের দিকে এগিয়ে এসে হাঁক পাড়েন হরেন, "ওঠো মিহিরদা, রাত হল"৷ 

ঘাড় ঘুরিয়ে মিহিরবাবু বলবেন, "ঝাঁপ নামিয়েছিস'? এরপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই উঠে আসবেন৷ 

এরপর ঘাটে দাঁড়িয়েই খানিকক্ষণ খেজুরে গপ্প চালান দু'জনে৷ এরপর গল্পের সুতো কাটতে না দিয়ে দু'জনে হেঁটে ফেরেন।

এ নিয়ম পালটায় না৷ 

মিহিরবাবু রোজ রাতে নদীর দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন৷ বুকের ভিতরের হিমশীতল ওঠানামাগুলোকে শত চেষ্টা করেও দাবিতে রাখতে পারেন না ভদ্রলোক৷ মুকেশের গানের সুরেও বুকের ধড়ফড়ানি থামে না৷ হরেনকে ঠকাতে মন চায় না, কিন্তু আজ পর্যন্ত অন্য কোনও উপায় খুঁজে পাননি ভদ্রলোক৷

মাঝেমধ্যে মনে হয় পুলিশের কাছে গিয়ে সমস্তটাই জানিয়ে দেবেন৷ তারপর যা হয় হবে৷ কিন্তু পরক্ষণেই ব্যাপারটা অনেকেত কানেই গোলমেলে ঠেকবে৷ তাছাড়া তিনি পথ থেকে সরে গেলেই আবার খুনখারাপি শুরু হবে৷ এই রক্তবীজের দলকে থামানো সহজ নয়, একমাত্র তিনিই পারেন এদের ঘোল খাইয়ে শান্ত রাখতে৷ মিহিরবাবু এক বড় অদ্ভুত বংশের মানুষ৷ তিনি নিজে বিয়েথা করেননি, তাঁর ভেবে ভালো লাগে যে তাঁর পর আর এই বংশের পাপ কাউকে বয়ে বেড়াতে হবেনা৷ কেউ না জানুক, মিহিরবাবু জানেন যে এ মন্দিরের নরবলি এখনও বন্ধ হয়নি৷ বছরে তেরোটা নরবলি না দেওয়া হলে নাকি দেবী পুজো গ্রহণ করেন না। অন্তত যে পুরোহিত বংশের শরিকদের একছত্র অধিকার আজও বহাল আছে, তাদের মত তেমনই৷ আর মিহিরবাবুরা বংশানুক্রমেই সে পুরোহিত বংশের ঋণে বাঁধা পড়ে৷ এই বিশ্রী কাজটাও বংশানুক্রমেই মিহিরবাবুর কাঁধে এসে চেপেছে৷ নয় পুরুষ ধরে এ মন্দিরের নরবলি দেন দিয়েছে মিহিরবাবুরই বংশের পুরুষরা। গত একশোবছর ধরে অবশ্য মন্দির প্রাঙ্গণে আর বলি হয়না, কিন্তু মিহিরবাবুর বাপ-দাদুদের দায়িত্ব ছিল বছরে অন্তত তেরোবার মানুষ খুন করে তাজা রক্ত মন্দিরে নিয়ে যাওয়া৷ মিহিরবাবুর কাজটাও পালটায়নি, তাঁর স্কুলমাস্টারির কাজটা স্রেফ দেখনাই।

এ পাপের বোঝা হালকা করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন মিহিরবাবু। তাঁর শেষ শিকার হরেন৷ বয়সে সামান্য ছোট হলেও হরেন তার ছেলেবেলার বন্ধু। আজ থেকে বছর দশেক আগে একবার, সুবিধেমত শিকার না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন মিহিরবাবু। সময়মত মন্দিরে রক্ত পৌঁছে দিতে না পারলে পুরোহিতের বংশরা তাঁর ঘটিবাটি কেড়ে নেবে, গুমখুনও করতে পারে।  কাজেই একরকম বাধ্য হয়েই রাতের বেলা বাড়ি ফেরার মুখে খুন করতে হয়েছিল অসহায় হরেনকে৷ ভাগ্যিস হরেনের পরিবার-পরিজন বলতে কেউই ছিল না, কাউকে বিধবা হতে হয়নি, কোনও শিশু পিতৃহারা হয়নি৷ 

এই হরেনই ভাগ্য খুলে দিয়েছিল মিহিরবাবুর৷ আসলে খুন হয়েও কিছুতেই নিজের মৃত্যুটাকে পাত্তা দেয়নি হরেন৷ আজও সে নিয়মতি নিজের চায়ের দোকানে এসে বসে। কিছুতেই টের পায়না যে কোনও খদ্দেরই তার দোকানমুখো হয়না, কেউ তাঁকে দেখতেই পারেনা৷ শুধু সন্ধ্যের পর মিহিরবাবু তাঁর দোকানে এসে বসে; তাস পেটায় আর গল্প করে। সবচেয়ে বড় কথা, এখনও হরেনের গলায় ছুরি বসালে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়৷ কী আশ্চর্য! কাজেই বছরে তেরোবার তাঁর গলায় ছুরি বসিয়েই নিজের দায়িত্ব সেরে ফেলতে পারেন মিহিরবাবু। সে রক্ত এতটাই তাজা যে পুরোহিতরাও সন্দেহ করেনি কোনওদিন৷

কিন্তু প্রতিবার খুন হওয়ার মুখে মিহিরবাবু বিশ্বাসঘাতকতায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন হরেন।  আর প্রতিবারই পরের দিন সকালে সমস্ত ভুলে গিয়ে চায়ের দোকানের পরিত্যক্ত গুমটিটায় এসে উদয় হন তিনি। আর তারপর হাসিমুখে সন্ধ্যেবেলা মিহিরবাবুর সঙ্গে তাস খেলতে বসা। 

বহু খুনের অপরাধ থেকে মিহিরবাবুকে মুক্তি দিয়েছেন হরেন৷ তাই আজও সাহস করে সত্যি কথাটা মিহিরবাবু তাঁকে বলে উঠতে পারেননি৷ অবশ্য হরেনকে তিনি সত্যিই স্নেহ করেন, তাঁর প্রতি মিহিরবাবু কৃতজ্ঞতার শেষ নেই৷ 

আজও, হরেনের "ওঠো মিহিরদা, রাত হল" ডাক শুনে সস্নেহে ঘুরে তাকিয়েছিলেন তিনি৷ উঠে হরেনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে পকেটে হাত দিয়ে শোধন করা ছুরিটার হাতলে হাত বুলিয়েও নিয়েছিলেন তিনি৷ বছরের তেরো নম্বর খুনটা এ'বার সেরে ফেলতে হবে৷ আজ অমাবস্যা৷

Saturday, February 19, 2022

সুন্দর নার্সারি




দিল্লীর সুন্দর নার্সারি যেমন সবুজ, তেমনই ছিমছাম৷ জানুয়ারির উইকেন্ড-ভিড়েও দেখেছি যে নিজেদের জন্য নিরুপদ্রব, ঘেসো এবং পরিস্কার এলাকা দিব্যি জুটিয়ে নেওয়া যায়৷ আজ একাই দুপুর-দুপুর ঝোল-ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম৷ প্রথমে ভাবলাম নতুন কোনও জায়গায় যাই, তারপর মনে পড়ল সুন্দর নার্সারির কাছাকাছিই রয়েছে নিজামুদ্দিন মার্কেট যে'খানে দিনকয়েক আগেই এসেছিলাম চমৎকার কাবাব খেতে৷ কাজেই নার্সারি ঘুরে সুন্দর কাবাব খেয়ে বাড়ি ফেরার প্ল্যানটাই যুক্তিযুক্ত মনে হল৷ 


প্রথম দিল্লী এসে যখন সুন্দর নার্সারির কথা শুনেছিলাম তখন ভেবেছিলাম  শৌখিন মানুষের ডালিয়া পিটুনিয়া আর ভালো কোয়ালিটির সার কিনবার জায়গা বোধহয়৷ ইতিহাস আর জেনারেল নলেজে কাঁচা হলে যা হয়৷ কিন্তু ভুল ভাঙার জন্য সশরীরে আসার দরকার নেই, গুগল করলেই হল৷ ষোলো শতকে মুঘলরা বানিয়েছিল পেল্লায় আজিম বাগ, সাহেবসুবোদের হাতে এ'খানে নার্সারি তৈরি হল ১৯১৩ নাগাদ৷ বর্তমানে নাকি শ'তিনেক রকমের গাছপালা রয়েছে এ'খানে৷ আমার মত অসবুজ গাম্বাট মানুষের জন্য অবশ্য গাছপালা মূলত চার রকমের; পেল্লায়, মাঝারি,  ছোটখাটো আর ঘাস-জাতিয়৷ কাজেই 'রেয়ার প্ল্যান্টস' দেখে লাফিয়ে ওঠার জ্ঞানগম্যি আমার নেই, যাদের আছে তাদের জন্য সুন্দর নার্সারি আরও উপভোগ্য৷ 


আমার জন্য সুন্দর নার্সারির মূল টান হল ওই সুবিশাল এলাকা, তাও আবার শহরের ঠিক মধ্যিখানে৷ এ বিষয়ে অবশ্য দিল্লীর জবাব নেই৷ লোধি গার্ডেন, সুন্দর নার্সারি ছাড়াও অজস্র এমন জায়গা রয়েছে যে'খানে হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি একটা বেলা কাটানো যায়; ভালোমন্দ খেয়ে, গা এলিয়ে গল্পের বই পড়ে ফেরা যায়৷ ভিড়ের চোটে এক বাড়ির লুচির পাশে অন্য বাড়ির চচ্চড়ি পড়ে যায়না৷  এই সুন্দর নার্সারিতে আর একটা দারুণ ব্যাপার হল কানে দিব্যি ঘণ্টাখানেক স্রেফ হেঁটেও কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে, গোটা ব্যাপারটাই একটা হাইক্লাস 'ওয়াক ইন দ্য পার্ক' আর কী৷


মাঝামধ্যেই রয়েছে বিভিন্ন মোগলাই স্থাপত্য।  কোনওটাই পেল্লায় নয় তবে সুন্দর, যেমন সুন্দর বুর্জ (সুন্দর নার্সারি এই সুন্দরেই সুন্দর), সুন্দরওলা মহল, লক্কড়ওলা বুর্জ ইত্যাদি৷ সুন্দত বুর্জের সামনে যে সেন্ট্রাল অ্যাক্সিস এবং খানিকটা এগিয়ে যে জলাশয়, সে'সবই অতি চমৎকার৷ আর্কিটেকচার নিয়ে কিছু বলার ক্ষমতা আমার নেই, তবে অন্য একট বিষয়ে নিজের ভালো লাগা জাহির করতেইব হয়৷ সবচেয়ে সুন্দর নার্সারির মধ্যের স্থাপত্যগুলোর মধ্যে একটা দুর্দান্ত মিঠে আর মনোগ্রাহী নাম রয়েছে; ছোটা বাতাসেওয়ালা৷ ওই নামে একটা রেলস্টেশন, একটা হিলস্টেশন আর একটা গ্রাম্য মেলাও থাকা উচিৎ৷ এ'ছাড়া রয়েছে প্রচুর ফুল। আর লক্কড়ওলা বুর্জের সামনের গোলাপ বাগানটা অত্যন্ত চমৎকার।


যা হোক৷ সুন্দর নার্সারিতে আমার মূল টান অবশ্য শীতের দুপুরে ঘাসের ওপর চাদর পেতে গা এলিয়ে বসায় (এবং শোওয়ায়)৷ সঙ্গে সামান্য খানাপিনা না থাকলে আসর জমজমাট হয় না৷ গতমাসে যখন সবাই মিলে এসেছিলেম তখন সঙ্গে ছিল তিনকোণা পরোটা, ডিম কষা, কাশ্মিরি আলুর দম, গাজরের হালুয়া আর সি আর পার্ক থেকে কেনা রসের মিষ্টি৷ বিকেলের জন্য কফিও আনা হয়েছিল ফ্লাস্কে, সঙ্গে নিমকিটিমকি৷ 

আজ হুট করে একাই চলে আসায় সে আড়ম্বর বাদ পড়েছে৷ চাদরের বদলে ঘাসের ওপরেই গা এলিয়ে বসতে হয়েছে। তবে ইয়ারফোনে গান ছিল, আর ছিল বই৷ মুখ চালানোর জন্য এক প্যাকেট বাপি চানাচুর এনেছিলাম অবশ্য। দিল্লীতে এখন সেই কড়া ঠাণ্ডা আর নেই, দিব্যি আরামদায়ক দুপুরের রোদ৷ গান, বই সরিয়ে রেখে খানিকক্ষণ ঝিমটিও দেওয়া গেল৷ তরতর করে দুপুর গড়িয়ে গেল৷ সন্ধ্যে নামার আগে হাঁটাহাঁটি করে খিদেটাকে চাগিয়ে তুলতে হবে, নয়ত নিজামুদ্দিনের কাবাব-সাফারিটাই মাটি৷