Friday, January 14, 2022

মধুশালা



- মধুদা। কড়া করে একটা কফি দাও দেখি৷ 

- সে কী৷ আজ লেবু চা বাদ?

- দিনটা মোটেও সুবিধের ছিল না মধুদা৷ ম্যাক্সিমাম ক্যাফেইন না হলে চলছে না৷ ও হ্যাঁ, আজ সঙ্গে লেড়ো নয়৷ মামলেট৷ ডবল। 

- তা দিচ্ছি৷ কিন্তু, কেন গো৷ অমন ম্যাদা মেরে আছ কেন?

- সে লম্বা ফর্দ মধুদা৷

- শুনি৷ 

- এক নম্বর। কোহলি অফস্টাম্পের বাইরে খোঁচা দিয়েই চলেছে।

- হ্যাঁ, এ'টা চাপের। 

- দু'নম্বর। এলগার আউটটাউট হওয়া নিয়ে সবিশেষ মাথা ঘামাচ্ছে না৷

- কফিটা ভালোই কড়া করতে হবে।

- তাই তো বলি৷ তাছাড়া আরও আছে। তিন নম্বর৷ গিজারে জল গরম করে ঠাণ্ডা জলের কল খুলে মাথা ভেজালাম। 

- এহ হে৷ না ভাই, ব্ল্যাক কফিই দিই। সুপার কড়া।

- চার নম্বর। অফিসের জরুরী রিপোর্ট ড্রাফট করে, সাতপুরনো বস্তাপচা রিপোর্ট অ্যাটাচ করে মেল পাঠালাম৷ 

- নাহ। মামলেটটা খেও না৷ পোচ করে দিচ্ছি৷ ডবল ডিমেরই।

- পাঁচ নম্বর৷ আজ মাসের তেরো তারিখ৷ মোর দ্যান ফিফটি পার্সেন্ট অফ দ্য মান্থ রিমেইনিং৷ কিন্তু আচমকা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দেখে বুকটা শুকিয়ে গেল। লেস দ্যান থার্টি পার্সেন্ট অফ স্যালারি রিমেইনিং। 

- যাচ্চলে৷ আজ সিঙ্গল ডিমের পোচই অর্ডার দাও।

- তুমিও দাগা দেবে মধুদা? সাকি এই ছিল তোমার মনে?

- তুমি সিঙ্গল পোচ অর্ডার দেব৷ আর আমি বোনাস সিঙ্গল পোচ খাওয়াব। গতকাল পাড়ার ক্যারম টুর্নামেন্টে রানার্স হয়েছি৷ ভাবছিলাম তোমায় একটু ট্রীট দেব৷ আমার রিবাউন্ড শটটা তো তোমারই ডিরেকশনে ইম্প্রুভ করেছে। 

- তোমার জবাব নেই মধুদা৷ কতবার বলি, এই মধু টী স্টল পালটে দোকানটার নাম মধুশালা রাখো৷ আই ওয়ান্ট টু ওয়াক ইন্টু আ পানশালা এভ্রিডে৷ আর যাই হোক, আমার মেজাজটায় তো গালিবের সুবাস লেগে আছে, তাই না? আমি ডিজার্ভ করি মধুশালা৷ 

-  তা বটে৷ সামনের মাসে বরং সাইনবোর্ডটা রিপেন্ট করে নেব৷

-  মধুদা৷ জ্যাঠামশাই কেমন আছেন?

- মাসখানেকের মধ্যে ভেলোর একবার না গেলেই নয়। যাক গে। দেখি৷

- কত দরকার ছিল যেন?

- আড়াই মত। 

- কত জমল?

- দেড়।

- দ্যাখো৷ তবে শোনো, ভেলোর হবেই৷ আমরা আছি তো৷ মধুশালা কি তোমার একার প্রপার্টি শালা?

- বাপটা তো আমারই।

- মধুদা৷ খদ্দের তো আর কেউ নেই৷ কফি দু'কাপ বসাও না৷ তারপর বসো পাশে৷ তোমায় একটা দেশাত্মবোধক গান শোনাই৷ 

- দেশাত্মবোধক? 

- এলগার বিদেয় দে মা, জিতে আসি৷ এলগার বিদেয় দে মা, জিতে আসি। কফি নিয়ে এসো, বাকিটা শোনাবো৷ 

- বহুত খুব।

Thursday, January 13, 2022

ই-নরেন



- হ্যা..হ্যালো..।

- কী চাই?

- আপনি..আপনি..।

- আমিই। নরেন৷ থুড়ি, ই-নরেন দত্ত।

- প্রণাম নেবেন স্যার। আপনার সঙ্গে জ্যান্ত অবস্থায় ডাইরেক্ট মোলাকাত হলে পা জড়িয়ে শুয়ে থাকতাম। কিন্তু মুশকিল হল আপনি তো আমারই তৈরি সফটওয়্যার৷ তাই কী ভাবে ঠিক গ্রীট করব...।

- বাড়াবাড়ি আমার না-পসন্দ৷ 

- ইয়ে, আপনার ল্যাঙ্গুয়েজটা ঠিক..।

- বেদ-বেদান্ত থেকে কোট করব কী করে ব্যাটা৷ বানিয়েছিস তো তুই৷ বিবেকানন্দর কলেক্টেড ওয়ার্ক্স আর র‍্যান্ডম কোট কম্পাইল করলেই যদি রিয়েল নরেন দত্ত তৈরি করা যেত রে ভাই, তা'হলে তো আইনস্টাইন আর প্লেটোতে দেশ ভরে যেত।

- তবু স্যার, বড় খরচপাতি করে কম্পিউটার-বিবেক বানাতে হয়েছে৷ অমন চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কানে বড় লাগে তো, একটু ওই শিকাগো মোডে আসুন না। প্লীজ।

- বেশ৷ ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স অফ বেহালা। ন্যাকাপনা কম করো। গা জ্বলছে।

- ইয়ে, স্যার৷ বলছিলাম, কম্পিউটার বিবেক হিসেবে আপনার কাজ হল, মানুষের ফিলোসফিকাল সব প্রশ্নের বিবেকানন্দ লেভেল হাইক্লাস উত্তর দেওয়া। 

- হাইক্লাস চাই?

- তবেই না ভাইরাল হব। আপনি আর আপনার সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আমি; জ্যোতির্ময় চ্যাটার্জী।

- কিন্তু আমি তো আর আদত বিবেকানন্দ নই রে বাবা। সফটওয়্যার হিসেবে আমার ইন্টেলেকচুয়াল লেভেল তো জ্যোতির্ময় চ্যাটার্জীতে আটকে৷ হাইক্লাস জ্ঞান দেবটা কী করে। 

- আজ্ঞে পাবলিকের অত তলিয়ে দেখার সময় কই বলুন৷ লোকে এখন মেড-ইজি গাইড খুঁজছে৷ আর একটু হিস্ট্রি মিশে থাকলে তো কেল্লা ফতে৷ কাজেই বিবেকানন্দ সফটওয়্যার যাই বলবে তাই হাইক্লাস। দু'চারটে কোট, আর বাকিটা ব্যাকএন্ড থেকে হিজিবিজি যা ইনফর্মেশন তুলতে পারেন৷ ও ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে। 

- বটে?

- তবে আর বলছি কী স্যার৷ তাছাড়া নরেন ফেনোমেনাটা আজকাল মার্কেট বেশ খাচ্ছে৷ ও উতরে যাবে। আপনি ভাববেন না। 

- বেশ৷ প্রশ্ন করো বাবা জ্যোতির্ময়। 

- যুবসমাজকে আজকাল মাঝেমধ্যেই হতাশার মুখোমুখি হতে হচ্ছে৷ তাদের জন্য কোনও সাজেশন স্যার?

- আরাইজ, আওয়েক অ্যান্ড স্টপ নট টিল দ্য গোল ইজ রীচড৷ আর তাছাড়া ল্যাদ ব্যাপারটাকে রোম্যান্টিকের চোখে দেখতে হবে, হাভাতের ফোকাস নিয়ে নয়৷ কেমন, উত্তরটা ভালো হয়েছে ভাই জ্যোতির্ময়? 

- ফাসক্লাস। পরের প্রশ্ন৷ দেশের ভালো দশের ভালো করতে গেলে সবার আগে কী করতে হবে।

- খুব ভালো প্রশ্ন করেছ৷ খুব ভালো প্রশ্ন৷ প্রথমেই বলি জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।  তাছাড়া নলবনে ইলিয়ট পার্কে সন্ধ্যের দিকে বড্ড মশা৷ আর মনে রেখো, রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বেশিক্ষণ পাবজি না খেলাটাই ভালো৷ ডাইজেশন হ্যাম্পার করে।

- উম, এ'টা কেমন একটু৷ তবে লোকের অত সময় কোথায় তলিয়ে দেখার৷ ভালোই হচ্ছে৷ আর একটা প্রশ্ন করি।

- বেশ করো। 

- ধর্ম কী?

- শক্তি ও সাহসিকতাই ধর্ম। দুর্বলতা ও কাপুরুষতাই পাপ।

- বাহ্ বাহ্ বাহ্, এ'টা দারুণ হয়েছে। 

- আরে শালা উত্তর শেষ হয়নি আগেই ফুট কেটে দিলে। 

- ওহ সরি৷ আপনি বলুন৷ ধর্ম কী।

- যা বলছিলাম। শক্তি ও সাহসিকতাই ধর্ম। দুর্বলতা ও কাপুরুষতাই পাপ। বৃষ্টির বিকেলে চপমুড়িই ধর্ম, ট্যুইটারে তর্কই পাপ। খিস্তির মাধ্যমে পলিটিকাল তর্কজয়ই ধর্ম, রোব্বারে ভোরবেলা অ্যালার্ম দেওয়াটাই পাপ। কেমন? কেমন দিলাম?

- গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷  নেহাৎ আপনি স্রেফ সফটওয়্যার, তাই দেখতে পারছেন না৷ 

- বিশ্বাস করছি৷ সত্যিই কী চমৎকার ভাবে সমস্ত বলে গেলাম। গায়ে কাঁটা দেওয়াটাই স্বাভাবিক। 

-  আপনার এই কনফিডেন্সটা দারুণ দরকারী৷ ভাবছি আপনাকে পলিটিকাল পার্টিদের ভাড়া দেব, তারা আপনাকে ইলেকশন র‍্যালিতে নিয়ে যাবে৷ আপনি অবলীলায় ব্রিগেড ভরে দেবেন৷ আমি নিশ্চিত।  

- তোমার ফীড করা একটা কোটেশন ঝালাই করে বলতে পারি, তোমার এই বিজনেস মডেল দাঁড়িয়ে যাবে। 

- কোন কোটেশন স্যার?

- সাফল্য লাভ করতে হলে প্রবল অধ্যবসায় আর প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি থাকা চাই। জানো, অধ্যবসায়শীল সাধক কী বলেন?

- কী বলেন?

- তিনি বলেন, ' আমি গণ্ডূষে সমুদ্র পান করিব। আমার ইচ্ছামাত্র পর্বত চূর্ণ হইয়া যাইবে।' দু'হাজার বাইশে এসে আমরা এই কনফিডেন্সকে একটু এডিট করে নিয়ে বলব, "কয়েক কোটি মানুষকে গুলের পর গুল দিয়ে ভাসিয়ে দেব৷ আর আমার ইচ্ছেয় ধরা হবে সরা আর শুয়োর ত্যাগ করবে কচু"। এই কনফিডেন্স বেচেই আমরা গাম্বাটদের ইলেকশন ক্যাম্পেন আলো করব৷ নাও, এ'বার আমার নামে, অর্থাৎ এই জ্যোতির্ময় সফটওয়্যারের নামে জয়ধ্বনি করো।

- বলো বিবেকমাইকি..!

- জয়! জয়!

দারোগা অমিত দত্তর মুকুটের শেষ পালকটি

- আর পালানোর চেষ্টা করিস না ভাই ভুতো।

- খামোখা টেনশন নিচ্ছেন দারোগাবাবু৷ আপনি মন দিয়ে ড্রাইভ করুন দেখি৷ আরে, আমি পালাতে চাইলে কি আমায় ধরতে পারতেন? এমন জীপে বসিয়ে আদর করে থানার দিকে নিয়ে যেতে পারতেন?

- তুই বলছিস তোকে ধরায় আমার কোনও কেরামতি নেই?

- অধ্যাবসায় অবশ্যই আছে৷ নয় নয় করে অন্তত বছর তিরিশ তাড়া করে বেড়াচ্ছেন।

- সত্যিই ভাই৷ মাঝেমধ্যে মনে হয় তোর কথা যত ভেবেছি, তত বোধ হয় বৌকে নিয়েও ভাবিনি। একটা মায়া আছে তোর প্রতি, বুঝলি।

- মিথ্যে বলবনা দারোগাবাবু, সে মায়া আমি আপনার চোখে দেখেছি বটে৷ 

- তা ভুতো, তুই কি চুরিটুরি সত্যিই ছেড়ে দিবি?

- হাড়গোড়ের ফ্লেক্সিবিলিটি কমছে৷ পাইপ বেয়ে ওঠা নামার স্পীড কমে যাচ্ছে, জানালার গ্রিল খুলতে গিয়ে শব্দ করে ফেলছি৷ খুচখাচ চুরি চালানো যেত বটে, তবে ব্যাপারটার মধ্যে আর্ট থাকবে না আর। তাই ভাবলাম, খেলো হয়ে যাওয়ার আগে সরে পড়াই ভালো। 

- এ জন্যই তোকে আমার এত পছন্দ। সত্যিই তো৷ গাভাস্কার বলতেন, এমন সময় রিটায়ার হবে যাতে লোকে জিজ্ঞেস করে 'হোয়াই' ইন্সটেড অফ 'হোয়াই নট'। 

- আপনারও তো কালই রিটায়ারমেন্ট৷ তাই না দারোগাবাবু?

- আমরা তো সরকারবাহাদুরের চাকর। নিজের রিট্যায়ারমেন্ট তো নিজের পছন্দমত হওয়ার নয়৷ কাল হিসেবমত শেষ দিন। তেমনটাই হবে৷ তবে রিটায়ার করার আগে যে তোকে অ্যারেস্ট করতে পেরেছি ভুতো, সেটা ভেবে বেশ একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব বোধ করছি। ভুতো চোরকে তো গত তিরিশ বছরে কোনও শর্মাই ধরতে পারলে না৷ এই একটা বড় পালক নিজের মুকুটে সেঁটে বিদেয় নিতে পারব।

- দারোগাবাবু৷ 

- বলে ফেলো।

- আমি চোরছ্যাঁচড় মানুষ৷ তবু, যেহেতু ওই মায়ার কথা বললেন, তাই সাহস করে জিজ্ঞেস করছি৷ আমায় হাজতে পোরার আগে, একবার নিজের বাড়িতে বসিয়ে চা খাওয়াবেন?

- তোর মতলবটা কী বল তো ভুতো? নিশ্চয়ই সরে পড়ার প্ল্যান ছকেছিস কোনও।

- মা কালীর দিব্যি৷ বললাম তো, পালানোর ইচ্ছেই যদি থাকবে তবে ধরা দিলাম কেন৷

- চা খাবি? সঙ্গে ডিমের কচুরি? মিনু, মানে আমার মিসেস, জব্বর বানায়৷

- তাই হোক স্যার। বৌদিকেও প্রণাম করে আসা যাবে৷

**

- ভুতো! নেমে আয় জীপ থেকে। এই আমার বাড়ি৷

- আজ্ঞে দারোগাবাবু, জানি।

- জানিস? এই বাড়িতে তো আমি গত মাসেই শিফট করেছি।

- আজ্ঞে, গত হপ্তায় আপনার বাড়িতে এসেছিলাম। চুরি করতে।

- হোয়াট! দারোগার বাড়িতে চুরি! 

- আপনার স্পেশ্যাল নাইটডিউটি ছিল। আমি ভাবলাম, শেষ চুরিটা আপনার আস্তানাতেই হোক। ইচ্ছে ছিল সেই শেষ চুরি সেরে ফেলে তারপর ক্যানিংয়ের কাছে একটা গাঁয়ে গিয়ে জুড়ে বসব। নিজের নাম পালটে একট বাড়ি কিনব, মুদীর দোকান দিয়ে গা মৌজ করে দিন কাটাব। কিন্তু বৌদি সব গোলমাল করে দিলেন। 

- মিনু? মিনু কী করলে?

- যা আপনি তিরিশ বছরে পারেননি৷ বৌদি আমায় পাকড়াও করলেন৷ ইয়ে, কনুইয়ের চোটটা দেখুন দারোগাবাবু৷ বৌদি জুডো জানে।

- তা জানে। 

- আপনার মত ভুঁড়িও নেই৷ 

- শাটাপ ভুতো।

- কাজেই ফ্লেক্সিবিলিটি বেশি। পাশ কাটিয়ে বেরোতে পারলাম না। অবশ্য পাকড়াও করার পর বসার ঘরের চেয়ারে  বেঁধে রেখে মাছভাজা আর চা খাওয়ালেন। এবং বোঝলেন, পাপের সামান্য প্রায়শ্চিত্ত না করলে ক্যানিংয়ের মুদীর দোকান চলবে না৷ কাজেই একটু জেলের মুখ দেখাটা জরুরী। 

- বলিস কী! এত কিছু হল, তবু মিনু থানায় খবর দিল না?


- দিলেননা। কারণ আমাদের ডীল হল৷ 

- ডীল? দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী দারোগা অমিত দত্তর স্ত্রী শেষে চোরের সঙ্গে সমঝোতা করলে?

- আজ্ঞে। বৌদি আমায় ছেড়ে দিলেন৷ একটা শর্তে৷

- কী শর্ত?

- আপনাদের বত্রিশ বছরের বিয়ে৷ অথচ থানার কাজে আপনি এতই ব্যস্ত যে এত বছরে একদিনও ডিউটি শেষ করে সময়মত বাড়ি ফেরেননি৷ আপনার মত মুখ গুঁজে কাজ করার লোক ডিপার্টমেন্টে খুব কম, কিন্তু বৌদিকে এত অবহেলা করে আপনি ঠিক করেননি৷ বৌদির বড় সাধ, রিটায়ার করার আগে অন্তত একটা দিন আপনি বিকেল-বিকেল বাড়ি ফিরে ওঁর সঙ্গে চা বিস্কুট খাবেন। বৌদি আমায় এই শর্তে সে'দিন ছেড়ে দিলেন যে আপনি রিটায়ার করার আগে অন্তত একদিন আমি আপনাকে সময়মত বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব৷ 

- ওহ..মিনুটা সত্যিই..এত কিছু করে আমার জন্য অথচ আমি এদ্দিন কিছুই..।

- যাক। এ'বার থেকে করবেন।

- তা বলে ভেবো না তোমায় হাজতে চালান করা হবে না।

- ও মা। বৌদিকে কথা দিয়েছি যে জেলের ভাত ক'দিন খেয়ে তারপর ক্যানিংয়ের সন্ন্যাস৷ তার আগে নয়।

- বেশ৷ এ'বার চট করে জীপ থেকে নেমে আয়৷ মিনু কচুরি ভাজবে, আর আজ চা'টা বরং আমিই বানাব৷ আয় ভুতো। আয়৷ ওয়েলকাম টু দারোগাবাড়ি।

Tuesday, January 11, 2022

টিনটিন আর ক্লাস সেভেন



টিনটিনের গল্প যতবারই পড়তে বসি, ততবারই ক্লাস সেভেনের বয়সে চালান হয়ে পড়তে হয়। 

কাগজকাকুকে নিয়মিত বিরক্ত করতে হত পরের আনন্দমেলা কবে বেরোবে সে খবর আদায় করতে৷ কাকু উদভ্রান্ত হয়ে মাঝেমধ্যে বলতেন যে অত তাড়া লাগালে তো আর পত্রিকাটা কেউ সাততাড়াতাড়ি ছেপে দেবে না৷ আনন্দমেলার প্রতি সেই অমোঘ টানের মূলে ছিল টিনটিন৷ দু'পাতা করে সে কমিক্স প্রতি সংখ্যায় থাকত৷ আর ওই দু'পাতা যে কতবার পড়তাম তার হিসেব থাকত না৷ সেই দু'পাতা নিয়ে কতশত জরুরী আলোচনা চলত স্কুলে, বিকেলের খেলার মাঠে৷

মাঝেমধ্যে আনন্দমেলা চমকে দিত বিশেষ দু'সংখ্যায় পুরো কমিক্স শেষ করে৷ আমার সবচেয়ে প্রিয় টিনটনের কমিক্স 'চন্দ্রলোকে অভিযান' তেমন ভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল মূল আনন্দমেলায়; সেই কমিক্সই তখন প্রচ্ছদে৷ এই অ্যাডভেঞ্চারের পরের অংশ "চাঁদে টিনটিন"ও সে ভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল৷ আর চন্দ্রলোকে অভিযান পড়ার পর যদ্দিন না " চাঁদে টিনটিন" ছাপা হয়েছে; সে কী বিশ্রী অস্বস্তি, কী নিষ্ফলা ছটফট। আনন্দমেলার সেই সংখ্যাগুলো আগলে রাখতাম, আগলে রাখার মতই ছিল সে'গুলো। 

সমস্যা হল মূল কমিক্সের বইগুলোকে চিরকালই বড় দামী মনে হত৷ তুলনামূলক ভাবে বাঁটুল, হাঁদাভোঁদা বা অরণ্যদেব ছিল বেশ সুলভ৷ ইংরেজিগুলো ছেড়েই দিলাম, বাংলাগুলোও আওতার বাইরেই মনে হত। রেল স্টেশনের হুইলারে বা বড়সড় বইয়ের দোকানে সে বইগুলোর দিকে আমরা বন্ধুরা সোজাসুজি তাকানোরও চেষ্টা করতাম না বোধ হয়৷ অমন পেল্লায় সাইজ, অমন দুর্দান্ত মাখন-ছোঁয়ানো পাতার কোয়ালিটি, হাইক্লাস ঝকঝকে ছাপা; উফ্। ডায়মন্ড কমিক্সের অরণ্যদেবও সে জৌলুসের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারত না৷ আর সে কারণেই আনন্দমেলার সেই বিশেষ টিনটিন সংখ্যাগুলো রীতিমতো অমূল্য ছিল। 

একসময় সেই খোকা চাকরী পেয়ে লায়েক হল৷ শখআহ্লাদে টু-পাইস ঢেলে তৃপ্তি পেতে শিখলে৷ অলিপাবের স্টেক এলো, হুশ করে ঘুরে আসার হিমাচল এলো, হুট-শখে কিনে ফেলা অমুক অমনিবাস বা তমুক সিরিজ৷ কিন্তু সহজে এলো না টিনটিনের কমিক্স কিনে ফেলার দুঃসাহস। কারণ লায়েকবাবুটি টিনটিনের সামনে চিরকালের ক্লাস সেভেন৷ টিনটিনের বই কেনা যায় না, খেটেখুটে আনন্দমেলার মাধ্যমে টিনটিন সংগ্রহ করতে হয়ে; এ কন্ডিশনিং কাটিয়ে ওঠা সহজ নয় বোধ হয়। 

বড় হওয়ার কতশত ধাপ৷ কত সম্পর্ক, কত শেখা, কত জ্বালাযন্ত্রণা, কত ভালোবাসা-মায়া, কত সুনিবিড় দুঃখ; এ সমস্ত স্পর্শ করে তবে বড় হওয়া, বুড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু অ্যাডাল্টিংয়ের অন্যতম আর্মস্ট্রংয়িও পদক্ষেপ বোধ হয় টিনটিনের ইংরেজি বই কেনার সাহস জুটিয়ে উঠতে পারা৷ টিনটিন বক্স সেট অর্ডার দেওয়ার আগে কল্পনায় একটা ক্লাস সেভেনের খোকার হাত শক্ত করে ধরার দরকার পড়েছিল, 
"কিনে ফেলি? কী বলিস? কিনেই ফেলি! নাকি"?
একটা বড়সড় ঢোক গিলে মাথা নেড়েছিল কুমার ক্লাস-সেভেন। 

Monday, January 10, 2022

আতরঙ্গি



("আতরঙ্গি রে" সিনেমাটা প্রসঙ্গে এ'টা লেখা৷ স্পয়লার হয়ত আছে। 'হয়ত' বললাম কারণ আমি সে অর্থে ঠিক নিশ্চিত নই)


- বাবা।

- বল্।

- আবার কবে আসবে? 

- সামনের মাসে। যেমন আসি।

- ফের ওই দিন'দুয়েকের জন্য?

- সে'টা নিয়ে এখন থেকেই চিন্তা করবি না শিঙাড়াটা ঠাণ্ডা হওয়ার আগে জাস্টিফাই করবি।

- সামনের মাসের চোদ্দ তারিখ নতুন চাকরীটায় জয়েন করছি। 

- নতুন প্রফাইল।  সামলে খেলিস বুড়ি৷ কোনও ফচকেমো নয়। ইট ইজ আ হিউজ অপরচুনিটি।

- তুমি তার আগের হপ্তায় আসবে তো? প্রফাইলটা গোটাটাই টেকনিকাল। তোমার সঙ্গে একটু আলোচনা করে নিলে সুবিধে হত৷ 

- আমার জন্য আবার ওই টেকনিকাল আলোচনা কেন রে বাবা। আমি বরং তোকে কলকাতার ইতিহাসে কাঠিরোলের সিগনিফিক্যান্স বোঝাতে একটা ওয়াকে নিয়ে যাব পরের বার৷ ট্যুরটার নাম দেব রোলের উত্তর দক্ষিণ। 

-  বাবা, আমার নার্ভাসনেসকে পাত্তা না দেওয়ার বদঅভ্যাসটা এ'বার ছাড়ো দেখি। মা থাকলে এমন কথায় কথায় আমার চিন্তাগুলো উড়িয়ে দিতে পারতে?

- তোর মায়ের তো আবার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি ছিল। উফ, তুই একা রাস্তা পেরোলেও সুমির হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে পড়ত। অমন নার্ভাসনেস নিয়ে কি প্যারেন্টিং হয় নাকি! যাক গে, বুড়ি! মায়ের কথা ভেবে মনকেমন হয় খুব, তাই না?

- খুব৷ খুউব।

- আমারও। মাঝেমধ্যে এতটাই মনখারাপ হয় যে মনে হয় দূরের চাকরীটা ছেড়ে তোর সঙ্গে গিয়েই থাকি। তুইই না হয় বাপকে খাওয়াবি।

- আমি তো চাই তুমি আমার সঙ্গেই থাকো৷ কিন্তু, চাকরীটা ছেড়ে দিলে কলকাতায় তোমার মন টিকবে?

- টিকবে না, তাই না রে?

- আদৌ নয়৷ যাক গে, সামনের মাসে এগরোল পরিক্রমার জন্য মুখিয়ে রইলাম।

- নামটাকে ডায়লুট করিসনা প্লীজ। রোলের উত্তর দক্ষিণ। রিমেম্বার দ্য ট্যুর নেম। 

**

- সুমি৷ কেমন দেখলে মৃণালকে?

- একইরকম। প্রতিবার যেমন দেখি।

- জানি৷ 

- ডাক্তার, মৃণাল কি কোনওদিনও আমায় চিনতে পারবে না?

- আমরা চেষ্টা তো করছি সুমি। নিজের সন্তানের মৃত্যু৷ শকটা বড্ড ইন্টেন্স।

- মিলির মৃত্যু তো আমাকেও সহ্য করতে হয়েছে ডাক্তার৷ আমিও তো মা। কই আমি তো এমন..।

- সবার ডিফেন্স মেকানিজম একই রকম হয়না যে সুমি। আর মৃণালের কেসটা বড্ড কিউরিয়াস। তোমার মধ্যে সে মিলিকে খুঁজে নিয়ে সে স্বস্তি খুঁজে পেয়েছে৷ ওই ইমোশনাল কমফর্ট জোন থেকে ওকে টেনে বের করা সহজ হবে না।

- বারবার ইচ্ছে হয় ওকে ঝাঁকিয়ে বলি আমি সুমি। আমাদের মিলি আর নেই। ওর বুড়ি আর নেই।

- ইট উইল নট হেল্প।

- কিন্তু আমার যে ওকে দরকার৷ আমি যে আর পারছি না৷ আমাকে মুছে ফেলতে ওর আদৌ কষ্ট হলনা ডাক্তার?