Monday, December 27, 2021

চাইনিজ ও বাঙালি



চাইনিজ রেঁধে চীনাদের তৃপ্তি দেওয়া তাও সম্ভব। কিন্তু কলকাতার মানুষদের কলকাতার বাইরে চাউমিন অফার করা মানে আইনস্টাইনকে এলসিএম জিসিএম শেখাতে বসা।
"আরে এই চাউমিন গাম্বাট মোটা যে, হোস পাইপ চেবাচ্ছি মনে হচ্ছে"।
"এত মশলা দিয়ে মাছের কালিয়া রাঁধা উচিৎ ভাই, চাউমিন নয়"।
"এ তো ম্যাটম্যাটে! আলুনি! এর চেয়ে ভাতেভাত খাওয়া ভালো"।
"এ'টা গ্রেভি চাউ? সে কী! কবে শুনব ব্রয়লারের পিসকে ট্রায়্যাঙ্গুলার শেপে কেটে বলবে ইলিশের পেটি"।
"আজ সামোসার মধ্যে চাউমিন ঢুকিয়েছে, কাল এগরোলে রসগোল্লা কুচি ছড়াবে"।
" রাখ তোর ফাইন ডাইনিংয়ের এক্সোটিক নুডলস৷ সেলিমপুরের ফুটপাত আলো করে দাঁড়ানো চাউমিন দাদা এই জিনিসকে বলে বলে হাফডজন গোল দেবে"।
এহেন কলকাতার মানুষ যখন কলকাতা থেকে হাজারখানেক মাইল দূরে বসে, আচমকা চাউমিন চেখে "বাহ্, দিব্যি তো" বলে ওঠে; তখন জানবেন সে "বাহ্" আঁকড়ে থাকা চলে। কলকাতার কসম, দিল্লী হাটের মেঘালয়ের স্টলের এই চিকেন চিলি গার্লিক চাউমিন প্রশংসার দাবী রাখে।

রমাপদর ক্রাইম



রাত পৌনে একটার সময় বিশুর চায়ের দোকানে লোকজনের আনাগোনা বাড়ে৷ হাইওয়ে ঘেঁষা জীর্ণ দোকানঘরটা গোটা দিন ঝিমিয়েই থাকে, কিন্তু রাত বাড়ালেই চনমনে ভাব৷ মূলত যাদের আড্ডা বসে, তারা সকলেই গোলমেলে৷ চোর, মাস্তান, ছিনতাইবাজ, তোলাবাজ, এমন কী খুনি মানুষজনের আনাগোনাও রয়েছে৷ কিন্তু বিশুর ব্যবসাটা ষোলোআনা সৎ৷ চায়ের কোয়ালিটি টানটান, বিস্কুট টাটকা এবং মুচমুচে, মামলেটের পেঁয়াজ লঙ্কা তরতাজা আর থালা-বাসন-প্লেট সবই ঝকঝকে তকতকে৷ খদ্দেরদের হাঁড়ির খবর নিয়ে সাধারণত মাথা ঘামান না বিশু৷ তাদের জামাই-আদরে চা-বিড়ি-বিস্কুট-মামলেট-ডিমরুটি খাইয়ে, সে'সবের দাম বুঝে নিলেই বিশুর কাজ শেষ৷ আর হ্যাঁ, নিজের চায়ের দোকানের পরিসরে মদ ও মাতলামি ব্যাপারটা বরদাস্ত করেন না তিনি৷ তবে তার চায়ের এমনই টান, যে মাস্তানরা চোলাই বাদ দিয়ে সে চা খেতে তার দোকানে ছুটে আসে৷ তাদের আবদার সামাল দেওয়া কি কম কাজ? সঙ্গত দেওয়ার জন্য দু'টো ছোকরা রয়েছে, তবুও রোজ সন্ধের পর থেকে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ভুলে বিশুকে ছুটে বেড়াতেই হবে৷
শুধু রমাপদ এলে ব্যস্ততা বাদ দিয়ে দু'দণ্ড তার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসেন তিনি৷ রমাপদর পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, আলাভোলা চোখের দৃষ্টি, মুখে সর্বক্ষণ হাসি। হাফ শার্ট আর ট্রাউজার দেখে মনে হয় যেন সে বিশুর চায়ের দোকানের রাতের আড্ডায় খানিকটা বেমানান৷ ভদ্রলোক চোর, খুনি না মাস্তান; বিশু তা জানেন না৷ পুলিশের ইনফর্মার হলেও আশ্চর্যের কিছু নয়৷ বিশু শুধু জানেন যে রমাপদর কথা শুনতে তার ভালো লাগে৷ ব্যবসা হিসেব ছুটোছুটি; এ'সব কিছুর মাঝে রমাপদ যেন নদীর গা ছুঁয়ে ভেসে আসা মিঠে বাতাস৷ রমাপদকে বন্ধু হিসেবে ভাবতেই ভালো লাগে বিশুর৷ হপ্তা-পনেরোদিনে একবার আসেন রমাপদ৷ টেবিলে বসে বিশুর নাম ধরে হাঁক পাড়লেই হল৷ নিজের হাতে বাড়তি দুধে চা বানিয়ে নিয়ে আসবেন বিশু৷
তারপর শুরু হবে গল্প৷ আজ চায়ের সঙ্গে আলুর চপ ভেজে এনেছিল বিশু৷ চপে কামড় পড়তেই রমাপদর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ খুশি হল বিশু৷
- বিশু, এমন নিখুঁত চপ ভেজেছ! মুচমুচে, অথচ তেল চুপচুপে নয়৷ ভিতরের আলু যেমন মোলায়েম তেমনই তার স্বাদের স্পার্ক৷ অথচ মশলার বাড়াবাড়ি নেই৷ তুমি যে শিল্পী ভায়া৷
- আহ, তোমার সবেতেই বাড়াবাড়ি রমা।
- আমাদের জীবনে অত হিসেব করে চললে চলবে কেন বলো৷ এই আছি, এই নেই৷ আজ ঝাড়াহাতপা, কাল চালান৷ বাড়াবাড়ি ছাড়া আমাদের চলবে কেন?
- ইয়ে, ভাই রমা৷ তুমিও কি এই বাকি ছেলেপিলেগুলোর মতই..। ইয়ে..মানে..।
- ক্রিমিনাল? হ্যাঁ।
- ও মা। ওইভাবে বলতে চাইনি।
- ক্রিমিনালের আবার এইভাবে ওইভাবে কী?
- মানে..ও'ভাবে জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হয়নি৷
- এমন আলুর চপ খাইয়ে তুমি যদি দু'এক পিস হাড়গোড় খুলে দিতে বলতে, না করতাম না৷ বিশ্বাস করো।
- হে হে৷ কী যে বলো।
- কাজেই ভাই বিশু৷ তোমার মত সৎপথে খেটে খাওয়া মানুষ আমি নই৷ তোমার বেশিরভাগ খদ্দেরের মত, আমিও ক্রিমিনাল৷
- মাস্তানি?
- ছোহ্৷ ও'সব তো ছেলেখেলা।
- ইয়ে, চুরিটুরি?
- ফুহ্৷ ও'সব এলেবেলে ব্যাপার।
- তবে..তবে কি ওই ব্যাঙ্ক ডাকাতি টাকাতি? শোনো রমা, আমি কিছু মনে করব না৷ তুমি আমার বন্ধু।
- তুমিও যে আমার বন্ধু ভাই বিশু৷
- ইয়ে মানে, খুনটুন গোছের কিছু? মানে..কপালের ফেরে পড়ে মানুষকে কবে যে কী করতে হয়..।
- না ভাই৷ খুন তো ফটাফট এস্পারওস্পার৷ তাছাড়া ইতিহাস পড়লে জানবে কত দেশের হর্তাকর্তারা হাজারে হাজারে মানুষ সাফ করে দেবতার আসন আলো করে বসেছেন৷ কাজেই মানুষ খুন ব্যাপারটা মানেই যে ক্রাইম, সে'টা ঠিক নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না৷
- তবে?
-সবার কাছে স্বীকার করতে সাহস পাইনা৷ তবে এই আলুর চপের প্রতিদান হিসেবে তোমায় আমার ক্রাইমের হদিস জানিয়ে রাখি৷
- আমি কিন্তু তোমার কথা পাঁচকান করব না।
- করলেও আমায় জেলে চালান করতে পারবে ভেবেছ? সে গুড়ে বালি। শোনো ভায়া, আমি রোজ গুম করি৷ কিডন্যাপ করি৷ কাকে? নিজেকে৷ হপ্তায় ছ'দিন, মাঝেমধ্যে সাতদিনই৷ সকাল ন'টা থেকে রাত আটটা৷ মাঝেমধ্যে মাঝরাত হয়ে যায়। যে কাজের প্রতি টান নেই, ভালোবাসা নেই; সে কাজে জানপ্রাণ লড়িয়ে দিই টিকে থাকার জন্য৷ কাদের জন্য এ'ভাবে টিকে থাকা? ভালোবাসার মানুষ৷ পরিবার৷ বন্ধুবান্ধব৷ যাদের ফোন আমি নিয়মিত কেটে দিই৷ যাদের মেসেজের উত্তর দিই না ব্যস্ততার অজুহাতে৷ যাদের কথা ভাবলেই মনখারাপ অথচ যাদের সামনে বসলে কথা ফুরিয়ে যায়৷ কারণ আমি ব্যস্ত মানুষ৷ ক্রিমিনাল নই কি? ভাই?
- আলুর চপ আর এক রাউন্ড ভাজতে বলে আসি ভাই রমা?
- তুমি যে আমার থেরাপিস্ট ভাই। তোমার প্রেসক্রাইব করা ওষুধ ফেরাই কী করে।
- আমি কী? ওই থেরা কী বললে ভাই?
- চপ নিয়ে এসো৷ বুঝিয়ে বলছি৷

কর্পোরেট লীডারশিপ

কর্পোরেট লীডারশিপের বাংলা তর্জমা হয়না৷ হওয়া উচিৎও নয়৷ এই ব্যাপারটা মূলত দু'রকমের৷ প্রথম ধরণেরটা পাওয়া যায় পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এবং বক্তৃতায়৷ সে'খানে লীডারশিপ ব্যাপারটা ভরপুর বিভিন্ন গা-কাঁপানো শব্দে৷ অবশ্য এ ক্ষেত্রে, শব্দ মানে নিরেট 'সাউন্ড'; যেমন 'এমপ্যাথি' বা 'কমপ্যাশন', 'ইমোশনাল কোশেন্ট' ইত্যাদি৷
এরপর রয়েছে আদত কর্পোরেট লীডারশিপের ফল্গুধারা যার তুলনা স্রেফ সাঁড়াশির সঙ্গে চলতে পারে৷ এ জিনিস অবশ্য পাওয়ারপয়েন্টের বাজারে অচল। এই জবরদস্ত লীডারশিপ দিয়ে নিজের 'পয়েন্ট'গুলো, বোধ- বুদ্ধি-যুক্তি নির্বিশেষে অন্যদের ওপর 'পাওয়ার'ফুলি চাপিয়ে দেওয়ার যায়৷ এ'দিয়ে চিমটিও কাটা যায় আবার টাইটও দেওয়া যায়৷
এ প্রসঙ্গে বলি বলি, টাইট দিতে পারাটা একটি সুবৃহৎ কর্পোরেট 'কোয়ালিটি'৷ হাজার রকমের প্রেজেন্টেশন, পেপটক বা সেমিনার দিয়ে এ পরম সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়৷ প্রসেস স্ট্রিমলাইন করতে চেয়ে সিস্টেম ওলটপালট করতে যাওয়া মানে বিস্তর খাটুনি। তার চেয়ে বরং দু'এক পিস এলেবেলেকে টাইট দেওয়াটা অনেক বেশি সহজ আর উপাদেয়৷
দেখুন, ভবিষ্যতের জন্য কী ভালো, দশের জন্য কোনটা উপকারি, কোন রিস্কগুলো আজ না নিলেই নয়; সে'সব নিয়ে বেশি মাথা ঘামালে রিভিউ মিটিংয়ে অস্বস্তি বাড়বে বই কমবে না৷ এর চেয়ে জমাটি হল টাইট দেওয়া-নেওয়ার গালগল্প৷ এক্সেলেন্সের দাবীর চেয়েও বেশি কাজ দেয় টাইট দেওয়ার হুমকি৷
টাইটেই উত্তরণ।

গীতা দত্ত আর গানের ল্যাজামুড়ো



গানের ল্যাজামুড়ো বোঝা হলো না৷ সে বোঝা না বোঝায় অবশ্য ভালোবাসা আটকে নেই৷ এই যেমন চাষবাস জানা নেই বলে তো আর ঝোল দিয়ে ভাত সাপটে মেখে খাওয়াটা আটকে থাকে না। সুরের ওঠানামা, রাগরাগিণীর ক্যালকুলাস, ক্লাস-বনাম-মাস; অধ্যাবসায়ের অভাবে এ'সব জরুরী কনসেপ্টগুলো সম্বন্ধে সঠিক ধারণা গড়ে তোলা গেল না৷ তবে ভালোবাসাটুকু নিপাট৷
সে ভালোবাসার টানেই ভোররাতে মেসের ঢাউস জানালার ধারে বসে থাকা ছেলেটার বুকের ভিতরে একটা বিদঘুটে ভালোলাগা আর বেঢপ কান্না মেশানো অনুভূতি তৈরি হয়, রেডিওয় সুমনের জাতিস্মর শুনে৷ সে ভালোবাসায় হেমন্তর সুরে ঘুরপাক খেতে খেতে যাবতীয় গোপন যন্ত্রণা মেরামত করে নেওয়া যায়৷
আর সেই ভালোবাসাতেই নতজানু হয়ে একটা সত্যি স্বীকার করে নেওয়াই যায়৷ গীতা দত্তর কণ্ঠ শুনে 'আহা দিব্যি' বা 'কী সাংঘাতিক ভালো' মার্কা সেলুট ঠুকবে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়৷ আর পাঁচজনের মত আমিও শুনে আসছি, সেই ছেলেবেলা থেকে৷ স্মার্ট, রোম্যান্টিক, মায়াবী কণ্ঠ৷ কিন্তু সেই ভালো লাগাটুকুই গীতা দত্ত প্রসঙ্গে শেষ কথা নয়৷ আচমকা একদিন সমস্ত চেনা ভালো লাগাগুলোকে হুশ্ করে উড়িয়ে দিয়ে এক অচেনা গীতা দত্ত মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে'টাই নিয়ম বোধ হয়৷
আটপৌরে ভালোলাগায় সে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে কণ্ঠের বর্ণনা হয় না৷ নিশির ডাকের যে গা ছমছম, শিউলি সুবাস মাখানো যে স্নেহ আর শীতের রাতে আচমকা ঘুম থেকে উঠে ছলছলে চোখে সাতপুরনো চিঠির উত্তর লিখতে বসার যে আনচান; সে'সমস্ত মিলেমিশে গড়ে ওঠা এক অন্য গীতা দত্তকে আবিষ্কার করার জন্যই যেন বহুবছরের অপেক্ষা৷ হাজারবার শোনা, সুপরিচিত গানগুলো নতুন ভাবে কানে এসে ঠেকবে৷ খানিকটা ভূতের ভয়ের মত ঘাড়ে চেপে বসবে সেই গানগুলোর নেশা৷
আজীবন গীতা দত্তর গানের ভক্ত হয়ে থাকাটা নেহাতই সহজ৷ কিন্তু প্রবল পাগলামোর মুহূর্তে, দুম করে এক অন্য গীতা দত্তকে আবিষ্কার করাই বোধ হয় গীতা দত্তর ম্যাজিকের নাগাল পাওয়ার একমাত্র উপায়। গীতা দত্তর সুরের আদত রোম্যান্সকে হয়ত প্রতিটি মানুষই এমনভাবে দু'ধাপে চিনতে পারেন৷ আর একবার সে পাগলাটে ভালোবাসা চিনতে পারলে আর মুক্তি নেই৷ অথবা হয়ত সে'খানেই মুক্তি৷

মনমোহন দত্তর ডিসিপ্লিন



গার্জেনরা লাগাম সামান্য আলগা করলেই ছেলেপিলেরা গোল্লায় যাবে৷ গার্জেনের শাসন সামান্য এ'দিক ও'দিক হলেই ছেলেপিলেদের ফিউচর ডকে উঠবে৷ শক্ত হাতে, পেটাই মেজাজে কচিকাঁচাদের মানুষ করতে হবে৷
এ'টাই নিয়ম!
তেমনটাই হয়ে এসেছে!
চিরকাল!
আর শিক্ষকরা তো গার্জেন পিরামিডের মাথায় বসে, তাদের দায়িত্ব সতেরোগুণ বেশি৷
চিরকাল এ বিশ্বাসই আঁকড়েই কাটিয়েছেন তালডাঙা বয়েজ হাইস্কুলের ভূগোল শিক্ষক মনমোহন দত্ত।
ডিসিপ্লিনে সামান্য গড়বড় দেখলেই দাঁত খিঁচিয়ে ওঠা,
বেয়াদবি দেখলেই হাতের বেত নাচিয়ে গর্জে ওঠা,
ফাঁকি নজরে পড়লেই চোখ থেকে আগুন ঝরিয়ে টেবিল চাপড়ানো;
এ'সব কপিবুক শাসন টেকনিকের ব্যাপারে মনমোহন মাস্টার অতুলনীয়৷ মনমোহনবাবুর "এ'দিকে আয়" শুনলেই ছাত্রদের বুকে এক বিশ্রী কাঁপুনি শুরু হয়৷ হাড়বজ্জাত কোনও ছেলেকে শায়েস্তা করতে চাইলে হেডমাস্টার হরিহর সেন মাঝেমধ্যেই মনমোহন মাস্টারের শরণাপন্ন হন৷ এমনই দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী তিনি৷
ক্লাস রুমে পায়চারি করতে করতে ছাত্রদের নার্ভাস করে দিয়ে মাঝেমধ্যেই হুঙ্কার ছাড়েন তিনি; "সাফার দ্য পেইন অফ ডিসিপ্লিন টুডে অর সাফার দ্য পেইন অফ রিগ্রেট টুমরো"৷ ক্লাসের সব চেয়ে খতরনাক বিচ্ছুটিও মনমোহন মাস্টারের ক্লাসে সবিশেষ ট্যাঁফোঁ করে না।
স্কুল ছুটির পর বিকেলের দিকে বাড়ি ফেরেন মনমোহন দত্ত৷ একলা মানুষের পরিপাটি সংসার৷ হাতপা ধুয়ে চা-মুড়ি খেয়ে দেরাজ থেকে বর্মা কাঠের বাক্সটা বের করে দেখা৷ রোজকার নিয়ম৷ ডিসিপ্লিন। বাবার লেখা বাইশখানা চিঠি সে বাক্সে রাখা৷ এর মধ্যে একটাকে ঠিক চিঠি বলা চলেনা৷ চিরকুট৷ বাবার রেখে যাওয়া শেষ নোট। সে'টাই রোজ পড়ে দেখা।
"মনু,
ভুলে যাস না, ডিসিপ্লিন ছাড়া কোনও কিছুই হওয়ার নয়৷
আর এও মনে রাখিস, যে ডিসিপ্লিনে ভালোবাসা মেশানো নেই, তার সঙ্গে চাবুকের কোনও তফাৎ নেই৷ আর চাবুকের ভাষা মানুষ কোনওদিনও বোঝেনি, বুঝবেও না৷ কেমন?
তোর মধ্যে ভালোবাসা আছে মনু৷ মনে রাখিস৷ ভালোবাসা আছে।
বাবা"।
এরপর একটা ফতুয়া গায়ে চাপিয়ে নিজের হারকিউলিস সাইকেলে চেপে গাঙ্গুলিবাজারের দিকে এগিয়ে যাওয়া৷ মনমোহন দত্তের রোজকার রুটিন৷
গাঙ্গুলিবাজারের উত্তরে রেলের মাঠ৷ সে মাঠের একপাশে ফুচকার ঠেলা নিয়ে বিশু দাঁড়িয়ে থাকে৷ আর রোজ বুকেলে সে'ঠেলা আলো করে অপক্ষা করে থাকে বেশ কিছু ছেলেছোকরা৷ সে'দিক স্কুলে যাদের সবচেয়ে বেশি ধমকেছেন মনমোহন মাস্টার, সে'কজন৷ তালডাঙা বয়েজ হাইস্কুলের প্রতিটা ছাত্র এ নিয়ম জানে৷ মনমোহন মাস্টার যে'দিন যাকে কড়া স্টাইলে 'ডিসিপ্লিন' করবেন, সে'দিন তাদের কপালে অঢেল ফুচকা৷ আর ফুচকার শেষে মাঠে বসে মনোহর মাস্টারের অঢেল মনমাতানো গল্প৷
গল্প ফাঁদতে না পারলে মাস্টারি মিথ্যে৷
মনমোহন মাস্টার সে'টা বিলক্ষণ জানেন৷
গল্পের সুরে বাঁধতে না পারলেই ছেলেপিলেরা গোল্লায় যাবে৷ গল্পের মধ্যে দিয়ে সহজ সত্যিগুলো ধরিয়ে দিতে না পারলেই ছেলেপিলেদের ফিউচর ডকে উঠবে৷ ইতিহাসের গল্প দিয়ে, মানুষের সংগ্রামের গল্প দিয়ে কচিকাঁচাদের মানুষ করতে হবে৷
এ'টাই নিয়ম!
তেমনটাই হয়ে এসেছে!
চিরকাল!