Tuesday, July 27, 2021

অ্যালিমনি



- এই যে, ট্যাক্সিটা আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? আর ট্যাক্সি দাঁড়ালেও ট্রেন কিন্তু হার ম্যাজেস্টির জন্য নতজানু হয়ে বসে থাকবে না৷ 

- আহ্৷ আসছি তো৷

- মালপত্তর সব তুলে দিয়ে এসেছি। 

- খুব ফুর্তি প্রাণে, তাই না? পারলে এখুনি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদেয় করে নাচানাচি শুরু করবি। 

- চারটে বড় সুটকেস পিছনে৷ 

- খুব ফুর্তি? 

- দু'টো সাইডব্যাগ ড্রাইভারের পাশের সীটে৷

- রাতের রান্না ফ্রিজে আছে। আজ থেকেই হুড়ুম করে বাইরে খাওয়া শুরু করিসনা৷ বাজারটাজার নিয়মিত যাস, মিতুলদি রান্নাবান্না যেমন করছিল তেমনই করবে৷ 

- ট্যাক্সিতে চারটে জলের বোতল রেখে দিয়েছি৷ একটা মাইল্ড ঠাণ্ডা ফর ইমিডিয়েট কনসাম্পশন। বাকিগুলো ম্যাক্সিমাম কনকনে, ঘণ্টাচারেক ওয়েট করতে হবে। ওভারনাইট জার্নি কেটে যাবে৷ তবে টনটনে টনসিলওলা মানুষদের ঠাণ্ডা জলের প্রতি এই সুইসাইডাল লোভ দেখলে গা জ্বলে যায়..। 

- ডিভোর্সটা হয়েই গেল বাবু৷ কেমন চটপট, সুটসাট৷ তাই না?

- নীল সাইডব্যাগের মাঝের খাপের চেনটা খুললেই..দু'টো বাক্স। একটায় ক্ষীরকদম, অন্যটায় গজা৷ এই গজা ব্যাপারটা তোর ওই অমৃতেন্দুর থেকেও খাজা। যেমন বিচ্ছিরি টেক্সচার৷ তেমনি ক্যাটক্যাটে মিষ্টি৷ যাক গে৷ হু অ্যাম আই টু ইন্টারফেয়ার... আমি কোন হরিদাস পালতোলা নৌকো৷ তোর পছন্দ যখন..।

- অমৃতেন্দুর ব্যাপারে এই ন্যাকাপনা মেশানো গবেট-মার্কা বাজে ধারণাটা এ'বারে অন্তত বাদ দে। আমাদের সেপারেশন হচ্ছে, কারণেই হচ্ছে৷ ঝগড়াযুদ্ধ কিছু ছিল বটে, কিন্তু স্ক্যান্ডেল তো কিছুই নেই৷ তুই মানুষটা ভালো৷ আমিও মন্দ নই৷ এবং আমরা দু'জনে ভালো বন্ধু বলেই খুনোখুনি করে সংসার টিকিয়ে রাখার পাগলামোটা করছি না৷ এখন তুই এই অযথা আজেবাজে কথা বলে গায়ে পড়ে তিতকুটে ঝগড়াটা শুরু করিসনা৷ 

- ওহ, আই মাস্ট মেনশন৷ কন্ট্র‍্যাব্যান্ডের মত স্টক করা ওই কাসুন্দিতে আমার ইন্টারেস্ট নেই। একটা প্যাকেটে মুড়ে চারটে শিশিই সাইডব্যাগেই দিয়ে দিয়েছি। লীক করবে না। 

- তুই কি আর কোনও কথাই বলবি না?

- ছোট সুটকেসের মধ্যে রাখা নীল পাউচটা থেকে নেলকাটারটা আমি সরিয়ে রেখেছি৷ গড়িয়াহাট থেকে আমি নিজে কিনেছিলাম৷ আশি টাকায়৷ আর এ মুহূর্তে নখ আমার বেড়েছে বেশি৷ ভুজুংভাজুং দিয়ে সে'টা নিয়ে তুই কেটে পড়বি আর আমি টের পাব না ভেবেছিলিস?

- এ'রকম কেন করছিস হঠাৎ?  তুই তো আপত্তি করিসনি কোনওদিন? উকিলের আইডিয়াটাও তোরই ছিল৷ তবে এই ভালো, জানিস। তুই দেখিস, আমরা ভালো থাকব। সুস্থ একটা বন্ধুত্ব থাকবে৷

- ওহ হো৷ একটা বিগশপার ব্যাগ রেখেছি পিছনের সীটে৷ দু'টো চিঁড়েভাজার প্যাকেট। দু'টো বর্বোন বিস্কুটের বড় প্যাকেট৷ তিনটে..।

- তুই থামবি?

- ট্যাক্সিদাদা মিটার চালু করে দিয়েছে৷

- বাবু, সরি। 

- একটা হেস্তনেস্ত বাকি আছে৷ 

- এখনও কী বাকি আছে?

- বাড়ির বইগুলো তোকে দিয়ে দেব৷ অ্যালিমনি। সময়-সুযোগ করে পাঠিয়ে দেব'খন। 

- তারপর সে বইয়ে লেগে থাকা দীর্ঘশ্বাসে আমার গায়ে লাগুক আর কী৷ আর শোন, আমি পড়ি, টপাটপ বই শেষ করি৷ বাড়ির আলমারির বেশির ভাগ বইই আমার পড়া। আমি তোর মত নই যে গাদাগুচ্ছের বই কিনে জমাব কিন্তু পড়ব না। এ'বার তো হাতে অঢেল সময়৷ জানপ্রাণ লাগিয়ে পড় দেখি৷ 

- ওহহো৷ দ্যাখো কাণ্ড৷ আসল ব্যাপারটা বলে রাখি৷ ফোনের  চার্জারগুলো সব সবুজ সাইডব্যাগটার সাইডের চেনে রেখেছি। 

- আমি মাঝমধ্যেই আসব কিন্তু, কেমন? আর প্রতিবার তোর জন্য ভালো ভালো বই নিয়ে আসব৷ অ্যালিমনি। 

- যাস না৷ 

- যাব না?

- টু সামারাইজ৷ চারটে বড় সুটকেস পিছনে৷ দু'টো সাইডব্যাগ ড্রাইভারের পাশের সীটে। বিগশপ্যারে স্ন্যাক্স৷ চারটে জলের বোতল৷ 

- আসি৷ টু সামারাইজঃ ফ্রিজে ডিনার রাখা আছে৷ ভুলে যাস না। 

Wednesday, July 21, 2021

অতএব




প্রেমিকা "উত্তমকুমার" বলে ডাকায় কোনও প্রেমিক কোনওকালে লজ্জায় মাখোমাখো হয়ে পড়েননি।

সুকুমার কোনওদিন রুমাল ব্যবহার করেননি বা বেড়াল প্রসঙ্গে ভাবনাচিন্তা করেননি৷

রবীন্দ্রনাথ কোনওদিন দাড়িতে হাত বুলিয়ে দেখেননি৷

নেতাজী বলতে মুলায়ম সিং ছাড়া কারুর কথা মনেই পড়েনা৷ 

শীর্ষেন্দুর ভূতেরা মগনলালের প্রাইভেট সার্কাসে কোরাস গেয়ে দিন গুজরান করে।

রবি শাস্ত্রী মাইক হাতে "কলকত্তা কেমোন আছি" বলে চ্যাঁচামেচি না জুড়লে ইডেনে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা হয়না৷ 

উচ্ছে-কোফতা ছাড়া পিকনিক টেনিদা বরদাস্ত করতে পারেনা। 

আলভারেজকে প্রথমবার দেখেই শঙ্কর তাঁর পকেট কাটার ফন্দি এঁটেছিল।

নিয়ম করে, দুলে দুলে, পাঁচালীর সুরে; আনন্দবাজারে প্রকাশিত জ্যোতিষী-তান্ত্রিকদের বিজ্ঞাপন না পড়লে- নিউটন কিছুতেই গ্র‍্যাভিটির বিটকেল হিসেবনিকেশ সামাল দিয়ে উঠতে পারতেন না।

পলাশীতে মুখ থুবড়ে পড়ে সিরাজ ককিয়ে উঠে বলেছিলেন, "এট্ টু মিরু"?

Tuesday, July 20, 2021

কর্পোরেট বাউল, রামপ্রসাদ আর দিল্লীর বৃষ্টি



- এ যে ক্যাটস অ্যান্ড ডগস ভায়া৷

- ট্র‍্যাফিকে জবাই হওয়া ছাড়া গতি দেখছি না৷

- আহ্, তোমার খালি হাফ গ্লাস এম্পটি৷ ট্র‍্যাফিকের হয়রানিটাই দেখলে? বৃষ্টির পারকুইজিটগুলো অবহেলা করলে চলবে কেন৷ সাফিশিয়েন্ট মিঠে হাওয়া, গরমের হাঁসফাঁস গন, সন্ধ্যের ফুলুরি রাতের খিচুড়ি..। ফোকাস অন দ্য কন্ট্রোলেবলস, ট্র‍্যাফিক তোমার হাতে নেই৷ কিন্তু খিচুড়ির পাশের ডিমভাজার কোয়ালিটি তোমারই হাতে রয়েছে৷ 

- চাকরীবাকরী ছেড়ে কর্পোরেট ট্রেনিংয়ে ঢুকে পড়ুন সুদীপদা৷ এ'সব সুড়সুড়ি দিয়ে বেশ টুপাইস ইনকাম হবে৷

- আমি নিজেকে কী বলি জানো? কর্পোরেট বাউল৷ প্রমোশনে নেই, ল্যাং মারামারিতে নেই৷ দিনের কাজ দিনের মধ্যে মিটিয়ে নাও আর তারপর জীবনপুরের পথিক মোডে মানুষ কালটিভেট করে বেড়াও৷

- তা এই বৃষ্টিকে কালটিভেট করতে হলে কী করতে হবে?

- জ্যামের দিকে দাঁত খিঁচিয়ে বসে না থেকে বৃষ্টির ফ্লোটা ফীল করো ব্রাদার৷ এ তো আর কলকাতা নয় যে ঘ্যানরঘ্যানর বৃষ্টি আড়াই মাস ধরে চলবে৷ দিল্লীতে এমন বৃষ্টি সহজে জোটে না৷ সো মেক দ্য মোস্ট অফ ইট৷ 

- কলকাতা৷ হুঁহ্৷

- ঝেড়ে কাশো৷ 

- কলকাতায় থাকতে কলকাতার বৃষ্টিকে কম গালাগাল দিইনি৷ অথচ এখন মনে হচ্ছে এমন দিনে গড়িয়াহাটে দাঁড়িয়ে ইলিশের দরদাম করলে মন্দ হত না৷ তারপর দাস কেবিন থেকে মোগলাই প্যাক করিয়ে নেওয়া৷ নাহ্, এ'সব ভেবে একটু খারাপই লাগছে সুদীপদা৷ আমি অবশ্য একটু হোমসিক বাই নেচার। 

- কী জানো ভায়া, বৃষ্টি ব্যাপারটা স্মৃতি আর সিনেমায় যতটায় সুন্দর, ডেলি প্যাসেঞ্জারিতে ততটা নয়। তবে আদত নির্বাণটা কোথায় জানো? টু রিয়ালাইজ দ্যাট ডেস্পাইট দ্য ইনকনিভিনিয়েন্সেস; সাম ডে, ইভেন দিস রেইন শ্যাল বি মিসড। একদিন এই দিল্লীর বৃষ্টির জন্যেও বুকের মধ্যে একটা হাহাকার অনুভব করবে৷ হাজার বারো বছর ধরে আমরা চাষবাস করে চলেছি হে, এই চাকরীর ঘানিটানা তো হালের ফ্যাশন৷ বৃষ্টিকে ভয় পাওয়া, শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা; এ আমাদের মজ্জায়৷ বহুদিন পর জবরদস্ত বৃষ্টি দেখলে বুক চলকে ওঠাটাই সিভিলাইজেশ্যন৷ 

- নাহ্৷ কর্পোরেট ট্রেনার না হয়ে বরং বাবাজী-টাবাজীই হয়ে পড়ুন৷ তা এই বৃষ্টির সন্ধ্যেকে ভালোবাসতে হলে কী করনীয়? 

- বাড়ি ফেরার তাড়া না থাকলে চলো তোমায় রামপ্রসাদ মিশ্রর মির্চি পকোড়া খাওয়াই৷ রামপ্রসাদের পকোড়া হাইক্লাস, তবে সে একটা ঝাল মিষ্টি চাটনি অফার করে; সে'টা লেজান্ডারি৷ সে আদতে বলিয়ার মানুষ, এবং দিল্লীর জামাই৷ তার চুয়ান্ন বছরের জীবনে বেয়াল্লিশ বছর দিল্লীতে থেকেছে সে, অথচ আজও নিজের গাঁয়ের কথা ভেবে সে ছটফট করে৷ আর সেই ছটফটটুকুই সে চ্যানেলাইজ করে তার পকোড়া ভাজায়৷ সে এক আর্টিস্ট ভায়া, কড়াই না ধরে ক্যানভাস ধরলে আজ সে ওয়ার্ল্ড ফেমাস হত। আর রামপ্রসাদ আমার ডিয়ারেস্ট বৃষ্টিতুতো ভাই৷ যাবে নাকি তার কাছে? তোমার দাসকেবিন আর গড়িয়াহাটের অভাব মিটিয়ে দেব, আই প্রমিস। 

- এ'সব জিনিয়াসের খবর আপনি পান কী করে?

- শুয়োরে শুয়োর চেনে আর বাউল চেনে বাউল। চলো, এ'বার রামপ্রসাদের দোকানে হানা দেওয়া যাক৷ তোমায় দিল্লীর বৃষ্টি না চেনালেই নয়৷ 

কাগুজে বাগ



- আসুন ডক্টর চ্যাটার্জি। বসুন। আপনার অপেক্ষাতেই..।

- ইয়ে, আপনার অনুচরটিকে সেই স্পেশ্যাল কফিটা আনতে বলে দিন প্লীজ৷ 

- আমার সঙ্গে দেখা করা চেয়েও দেখছি আপনার আগ্রহ কফিতে বেশি৷ 

- মাফ করবেন মিস্টার সেন, ক্যাবিনেট মিনিস্টার হিসেবে আপনাকে যে যথেষ্ট রেস্পেক্ট করিনা, সে বদনামটাটুকু অন্তত আমার প্রাপ্য নয়৷ তাছাড়া, মানুষ হিসেবেও তো আপনাকে কম ইয়ে করিনা৷ তবে আপনার অফিসের কফিটা..জাস্ট ইনক্রেডিবল। 

- কৃতিত্বটা আমার আর্দালি মনোহরেরই প্রাপ্য৷ ছোকরার হাতে জাদু আছে। তবে আজ শুধু কফি খেয়ে সরে পড়বেন না যে৷ লাঞ্চটাও এখানেই বলে রেখেছি৷ পাবদা আর পমফ্রেট যে আপনার ফেভারিট, সে খবর কিন্তু আমি রাখি৷  

- আমার পরম সৌভাগ্য বলতে হবে৷ 

- তা, প্রজক্টের ব্যাপারটা...?

- সে'টার জন্যেই তো আপনার সেক্রেটারির কাছে জরুরী অ্যাপয়েন্টমেন্টটা চাইতে হল মিস্টার মিনিস্টার৷  ইট ইজ রেডি।

- রেডি?

- একদম৷ বিদেশী টেকনোলজি ধার করতে গিয়ে বিস্তর খরচ হয়েছে বটে, তবে মিশন হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেসফুল। বিটা টেস্টিং পেরিয়ে ফাইনাল রোল আউটের জন্য আমরা রেডি৷  এবার আপনি প্রাইম মিনিস্টারের পারমিশন আদায় করতে পারলেই...।

- উনি তো এই ব্রেক-থ্রুর জন্যে মুখিয়ে রয়েছেন ডক্টর৷ 

- তা'হলে তো মিটেই গেলো৷ এ'বারে পঞ্জিকাটঞ্জিকা কনসাল্ট করে একটা ভালো দিন দেখে

- ডক্টর চ্যটার্জি, ইফ দিস ওয়ার্ক্স আউট..আর একদিনও।অপেক্ষা নয়।

- দিস বাগ উইল সার্টেনলি ওয়র্ক৷ 

- বাগ?

- ইট ইজ আ বাগ আফটার অল৷ আড়ি পাতার সফটওয়্যার বইতো নয়৷ কিন্তু আমাদের এই বাগের শক্তি অপরিসীম। অন্যান্য স্নুপিং সফটওয়্যারের মত হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের হাঁড়ির খবর শুধু নয়, গভর্নমেন্টের মুঠোর মধ্যে থাকবে এখন দেশের প্রতিটি মানুষের হাঁড়ি খবর৷ থুড়ি,  হাঁড়ির খবর নয়, পেটের খবর।

- গোটা ব্যাপারটাই সিক্রেট থাকবে তো ডক্টর?

- অফ কোর্স৷ নয়ত আমার মাথা ন্যাড়া করে, গাধার পিঠে চাপিয়ে দেশ থেকে খেদিয়ে দেওয়া হোক। শুনুন, দেশের প্রতিটা মোবাইল সিমকার্ডই এখন এক এক একটা ডেটা ট্রান্সমিটার, তা সে ফোন স্মার্ট হোক বা আনস্মার্ট৷ আমাদের গোপন সার্ভারে সমস্তটাই রেকর্ড করা থাকবে৷ 

- বাহ্ বাহ্ ডক্টর চ্যাটার্জি৷ তোমার করব কোতল? বাইশটা নোবেল পাওয়া উচিৎ অথচ এই ছাই সিক্রেসির জন্য তোমার এই ব্রিলিয়ান্ট প্রজেক্টের কথা কেউ কোনওদিন জানবেও না৷ 

- ইট ইজ ওয়ার্থ ইট মিস্টার মিনিস্টার৷ তবে এমন অদ্ভুত আব্দার কোনও পলিটিশিয়ান যে করতে পারে...।

- অদ্ভুত?

- একসময় শুনতাম গভর্নমেন্টরা আড়ি পাতে, মানুষের প্রাইভেসির খেলাপ করে৷ তবে এই প্রথম শুনলাম কোনও সরকার মানুষের ব্যক্তিগত কথাবার্তা শুনতে চাইছে না, বরং মানুষের খিদে পেয়েছি কিনা সে খবর গোপনে আদায় করতে চাইছে৷ 

- গোপনে অন্যের কথা শোনা? সে সব পলিটিকাল ডার্কএজে হত হে ডক্টর৷ সময় পাল্টেছে। স্নুপিং বাগ এখন আমাদের দরকার শুধু মানুষের খিদের খবর পাওয়ার জন্য৷ একটা গোটা ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছে ডক্টর, আন্ডার ডাইরেক্ট সুপারভিশন অফ দ্য পি এম৷ সেটাও টপ সিক্রেট৷ তোমার এই বাগ সাকসেসফুলি ছড়িয়ে দিতে পারলে সে ডিপার্টমেন্ট কাজে নামবে৷ মানুষের খিদের কষ্ট রেজিস্টার হলেই আমাদের গ্রাউন্ড লেভেল টীম সে মানুষের দোরে পৌঁছে যাবে গরম ডালভাত বা রুটি তরকারি হাতে৷ শিশুরা খিদেয় একটানা কষ্ট পেলে পৌঁছে যাবে দুধ৷ কিন্তু কাউকে ভিক্ষে করতে হবে না,  কারুর কাছে হাত পাততে হবে না৷ আর মূলত মানুষের আত্মসম্মানবোধের কথা ভেবেই গোটা ব্যাপারটাকে নিয়ে এত রাখঢাক আর গোপনীয়তা।  অন্তত মানুষের খিদেটুকু যদি পাবলিক স্পেক্টাকেল না করে; গোপনে, ঢাকঢোল না পিটিয়ে;  আমরা মিটিয়ে দিতে না পারি ডক্টর চ্যাটার্জি...তা'হলে আমরা সরকারে রয়েছি কি করতে?

- কফিটা কিন্তু এখনও এলো না মন্ত্রীমশাই৷ হেহ হেহ হেহ।

**
ছবিটার সঙ্গে এ গল্পের যোগাযোগ আছে এবং নেই।

Sunday, July 18, 2021

হোয়্যাটস্যাপিস্টস



পেল্লায় হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপগুলো দাঁড়িয়ে আছে দু'ধরণের মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে৷ 

প্রথম দল সর্বক্ষণ 'মডারেট' করে চলেছে৷ 'ডিসিপ্লিন' নিয়ে তারা সর্বক্ষণ শশব্যস্ত৷ তাদের ধারালো দৃষ্টি এড়িয়ে গ্রুপে হাওয়াও বইতে পারেনা। রাজ্যশাসনের ভার তাদের হাতে৷ কড়া ধমক, শ্লেষ, বিরক্তি আর নিয়মকানুন বানানোর হুজুগ; এ'সব মিলিয়েমিশিয়ে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখছে তারা৷ তারা নিয়মিত চাবুক কষাচ্ছে;

"দেখুন মিস্টার দত্ত, ফরওয়ার্ড মেসেজ পাঠাতে হলে অন্য গ্রুপে যান৷ এই গ্রুপ একটা সিরিয়াস পারপাস নিয়ে তৈরি হয়েছে, এ'সব ছেলেমানুষি যেন এ'খানে না দেখি"৷ 
মিস্টার দত্ত চোরাই সোনার বিস্কুট সমেত ধরা পড়লেও বোধ হয় এত ভেবড়ে যেতেন না। 

"এই যে, সাহাবাবু! আপনাকে কতবার বলেছি গুড মর্নিং মেসেজ পাঠাবেন না৷ গ্রুপ মেম্বারদের মোবাইলে স্পেস নষ্ট হচ্ছে৷ আপনাকে অনুরোধ করা হচ্ছে গ্রুপ কন্সটিটিউশনটা আর একবার পড়ে দেখতে"।
সাহাবাবু আজ পর্যন্ত খবরের কাগজের প্রথম পাতাখানা ছাড়া কিছু পড়ে দেখেননি৷ গ্রুপের কন্সটিটিউশন যে আছে তাই তিনি জানেন না, জানবেনও না৷ হোয়্যাটস্যাপের কড়া মেমোটিও তিনি পড়বেন না৷ পরের দিন ফের সকাল সাড়ে ছ'টায় টুং শব্দে গ্রুপ মডারেটরের ঘুম ভাঙাবেন ভদ্রলোক; গোলাপের ছবির ওপর লেখা থাকবে "শুভ সকাল বন্ধুরা"৷ 

"বঙ্কুবাবু আর অমিয়বাবু৷ আপনাদের ভাষা এ গ্রুপের পরিবেশ নষ্ট করছে৷ ঝগড়া করতে হলে পাড়ার মোড়ে দেখা করুন। অথবা নিজেদের মধ্যে ডায়রেক্ট মেসেজ চালাচালি করে খেউড় চালিয়ে যান৷ নয়ত আমর বাধ্য হব আপনাদের গ্রুপ থেকে এস্কপেল করতে"। 
ইন্টারনেট ঝগড়ার বড় হাইভোল্টেজ ব্যাপার, সে মায়া কাটানো অসম্ভব৷ মাঝেমধ্যেই শক্তির কবিতার লাইন শেয়ার করা বঙ্কুবাবু মডারেটরের কাছা খুলবেন; "গ্রুপটা তোর বাপের সম্পত্তি নাকি রে শালা"? অমিয়বাবু এক ধাপ ওপরে গিয়ে, "এমন ফোঁপরদালালের গ্রুপে আমি ইয়ে করি" বলে স্যাট করে গ্রুপত্যাগ করবেন৷ 

আর একদল মানুষ হল হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপের আদত লক্ষ্মী।  মডারেটর আর গ্রুপ-জ্যাঠাদের ডিফেন্স হেলায় উড়িয়ে তারা শুধু ফরওয়ার্ড খেলে যায়৷ এই পাঠালো মাজার বোতলে এবোলার গল্প, পরক্ষণেই চীনের প্লাস্টিক ডিমের কারখানার ওপর ডকুমেন্টারি, তারপরেই পলিটিকাল মীম বা এমন খবর যার গাঁজাখুরিত্ব পাঁচ বছরের খোকাও ধরে ফেলবে- এ'ভাবে একটানা অক্লান্ত ভাবে তারা গ্রুপ গুলজার করে রাখে৷ মডারেটর ধমক, সৎ মেম্বারের শুধরে দেওয়ার প্রচেষ্টা, ভূমিকম্প,  ঝড়,; কোনও কিছুই এদের রুখতে পারেনা৷ মাঝেমধ্যে 'সরি'ও বলে ফেলে এরাঃ

"ওহ হো, ফরওয়ার্ডটা আমি পাঠাইনি৷ আমার ভাইপোর হাতে ফোন ছিল তো, সেই ব্যাটা...(জিভ বের করা স্মাইলি-সহ)"৷ অবশ্যই পরের দিন ফের ফরওয়ার্ড চালু করবেন। 

"তাই কি? এ খবরটা গুজব? ওহ, আমি বুঝতে পারিনি৷ ক্ল্যারিফাই করে দেওয়ার জন্য থ্যাঙ্কিউ"৷ বলেই গুজব ব্রডকাস্টার অন্যান্য গ্রুপে সে গুজবই ফরওয়ার্ড করবে৷ 

এই হলো এ যুগের সবচেয়ে ধারালো ইডিওলজিকাল যুদ্ধ৷ ডিসিপ্লিনবাজরা কমল মিত্তিরের মত পাথুরে এবং হিমশীতল। অন্যদিকে ফরোয়ার্ডিস্টরা মাতাল কবি; অনিল চ্যাটুজ্জ্যে ঘরানায়৷ কবিতা এবং যশ চোপড়ার মহব্বতের নিয়ম মেনেই ডিসিপ্লিনকে মাথা নীচু করে সরে পড়তে হবে৷ প্রতিটা সৎ  হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপ হিজবিজ মেসেজের সমুদ্রে ভেসে যাবে আর নিয়মকাকুকাকীমারা যন্ত্রণায় ছটফট করে হদ্দ হয়েও বিপ্লবের স্বপ্ন ত্যাগ করবেনা; এই ভিসিয়াস সাইকেল থেকে বেরোনো অসম্ভব৷