Sunday, January 31, 2021

এক্সেলেন্স

- স্যার, বলছিলাম যে..।

- কিছু বলার দরকারটা কী দত্ত?

- না মানে...।

- তিনটে রিপোর্ট আজ সন্ধ্যের মধ্যেই চাই।

- আসলে তিনটেই এত দেরী করে হাতে পেলাম..।

- ওরে আমার  নেকুচন্দ্র ঘ্যানঘ্যানবাহাদুর রে৷ রিপোর্টের ফরমায়েশ নাকি দেরী করে হাতে পেয়েছেন। শোনো, বড়সাহেবকে তো তোমায় জবাবদিহি করতে হয় না, আমায় করতে হয়৷ রিপোর্ট তিনটে আজকেই চাই...। যেমন ভাবে খুশি কাগেরঠ্যাংবগেরঠ্যাং সাজিয়ে দাও, কিন্তু দিতে হবেই৷ 

- না মানে বলছিলাম যে..।

- আবার! আবার বলবে? কাজ ফেলে এত গপ্পগুজবের সময় পাও কোথা থেকে?

- ইয়ে, গল্পগুজব নয়৷ একটা জরুরী পার্সোনাল দরকারে..।

- অফিসে পার্সোনাল দরকার টেনে আনার দরকারটাই বা কী? দেখো দত্ত, তিনটে রিপোর্ট আমার মেলে আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চাই..।

- কিন্তু রিপোর্টগুলো ভালোভাবে তৈরি করতে তো সময় দরকার। ব্যাপারগুলো কম্পলিকেটেড..।

- এই শুরু অজুহাত।  

- কিন্তু এক্সেলেন্সের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে..।

- ও'সব শৌখিন ইংরেজি কফিহাউসের দেখনাই ফিল্ম ক্রিটিসিজমে ঝেড়ো দত্ত। অফিসে নয়। আর এক্সেলেন্সের ঝোল দিয়ে বরং কাল দুপুরে ভাত মেখে খেয়ো৷ এখন দয়া করে রিপোর্ট তিনটে ইমিডিয়েটলি জমা করো নয়ত বড়সাহেব আমায় আস্ত রাখবেন না।

 - কিন্তু স্যার, তার আগে ওই আমার ওই কথাটা..।

- কালকে শুনব। 

- কিন্তু স্যার..।

- আর একটাও বাজে কথা নয়।

***

- হ্যালো..।

- কী ব্যাপার? ফোন তুলছিলে না কেন?

- ইয়ে, আসলে জরুরী তিনটে রিপোর্ট..।

- বসকে বলেছ আগামীকাল ছুটি নেবে?

- ছুটি? 

- বলোনি, তাই না?

- আসলে আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কিছুতেই...ও কী...যাহ্। বোঝো কাণ্ড! কেটে দিল।

***

বাবুঘাটের এই বেঞ্চিটা দত্তবাবুর বড় পছন্দের। সন্ধ্যের দিকে ফাঁকাই থাকা। অফিসফেরতা বাস থেকে মাঝেমধ্যে নেমে পড়েন, থেরাপির জন্য৷ অফিসের ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসে গোপন ওষুধ; বাঁটুল সমগ্র বা নন্টে-ফন্টে সমগ্র বা হাঁদা-ভোঁদা সমগ্র৷ কাছের স্টল থেকে কেনা লেবু চা আর ডিমসেদ্ধর পাশাপাশি নারায়ণ দেবনাথের "ইয়াইকস, বাপস, গেলুম রে" মার্কা থেরাপিতে মনের জঞ্জাল সাফ হয়ে আসে। 

ওপরওলা তিনটে রিপোর্টে কোয়ালিটি আশা করেননি, শুধু আজ্ঞাবহ দাসের কলমপেষা নাকখত চেয়েছিলেন৷ কিন্তু গায়ে পড়ে সে রিপোর্টে 'এক্সেলেন্স' গুঁজে দিতে পেরেছেন দত্তবাবু৷ হ্যাঁ, তার জন্য তাঁকে ঘণ্টাদুই বেশি অফিসে বসে থাকতে হয়েছে, তা হোক। কিন্তু আজ্ঞাবহ হতে গিয়ে কাগেরঠ্যাংবগেরঠ্যাং গছিয়ে দেওয়ার বান্দা তিনি নন। অবিশ্যি এক্সেলেন্স আঁকড়ে বসে থাকাটা কর্পোরেট আখেরের জন্য যে তেমন সুবিধের নয় তা দত্তবাবু দিব্যি জানেন৷ তবে নারায়ণ দেবনাথের থেরাপি আর বাবুঘাটের গঙ্গার হাওয়ায় সমস্ত ক্লান্তি আর গ্লানি ভ্যানিশ হয়ে যায়, সে'টাই বড় কথা। 

কালকের ছুটির ব্যাপারটাও অবশ্য কিছুতেই মুখ ফুটে বলতে পারেননি। ওপরওলারা এক্সেলেন্সের কদর করে না, তাদের চাই আজ্ঞাবহ কেরানী। না করুক গে। নিজের পিঠ মাঝেমধ্যে নিজে চাপড়ে নিতে কসুর করেননা দত্তবাবু৷ তাই কালকের জন্য আগাম ক্যাসুয়াল লীভ না জুটলেও কুছ পরোয়া নহি। মাইনে কাটা গেলে যাক৷ কাল তিনি নিজের ছুটি নিজেই মঞ্জুর করেছেন। 

"বিকজ ইউ ডিজার্ভ ইট মিস্টার দত্ত", কথাটা নিজেকে বলে তৃপ্তির হাসি হাসলেন দত্তবাবু৷

Wednesday, January 27, 2021

আশ্রয়

- এসেছো সমরদা? উফ, কদ্দিন পর দেখা বলো তো৷ অন্তত তিনমাস তো বটেই?

- আরে অনন্ত৷ কদ্দিন পর তোমায় বাড়ি এলাম ভায়া৷ কদ্দিন পর। 

- বিধুকে বলি আগে দু'কাপ চা দিতে৷ কেমন? আপনার পছন্দের আর্লগ্রে আনিয়ে রেখেছি৷

- বিধুকে বরং দু'কাপ চা দিতে বলো৷ আর্লগ্রে আছে?

- ওহে বিধু দু'কাপ চা দিয়ে যা৷ ওই কাবার্ডে একটা নতুন চায়ের প্যাকেট রাখা আছে৷ সে'খান থেকে পাতা নিয়ে নে৷ তারপর সমরদা! খবরটবর সব ভালো?

- আমি তো অনেকদিন থেকেই বলছি ভায়া৷ তোমার এ বসার ঘরে আলো বড় কম৷ টিউবদু'টো চেঞ্জ না করলেই নয়। 

- আপনি দিল্লী গেলেন ছেলের কাছে কিছুদিন কাটাতে৷ এ'দিকে আমি এক্কেবারে একাবোকা৷ গোটাদিন অফিসের খ্যাচম্যাচ, আর ফিরে এসে বিধুর গজরগজর৷ আমাদের উইকলি আড্ডার অক্সিজেন ছাড়া নাভিশ্বাস উঠছিল যে। 

- তা অবশ্য ঠিক৷ আজকাল নিউজচ্যানেলগুলো দেখলেই বদহজম হয়৷

- এদ্দিন পর আপনি আসায় যেন বুকে বল পেলাম। কী ভালো যে লাগছে৷ ফ্রিজে মৌরলা আছে, বিধুকে মুচমুচে করে ভাজতে বলি?

- সে'টা অবশ্য ভুল বলোনি অনন্ত৷ যত নষ্টের গোড়া এই পলিটিক্স৷ 

- অ্যাই বিধু, ফ্রিজ থেকে মৌরলাটা বের করে রাখ৷ ভাজা খাব। তা সমরদা, দিল্লী শহরটা বৌদির কেমন লাগল?

- চিকেন চিলিটা বাড়াবাড়ি হবে৷ তুমি বরং বিধুকে ভাতেভাত করে দিতে বলো৷ রাতের খাওয়াটা না হয় তোমার এখানেই সেরে নেব।

- বৌদির জন্যও না হয় একটা টিফিন বাক্সে খাবার দিয়ে দেব'খন।

- হ্যাঁ, তোমার বৌদিও তাই বলে৷ দুষ্ট গরুর চেয়ে ভ্যাকেন্ট গোয়াল ইজ বেটার৷

- সমরদা৷ আপনাকে পেয়ে যে কী ভালো লাগছে৷

- শীত শীত ভাব যে একটা আছে সে'টা ডিনাই করছি না৷ তবে বাতাসে এখনও শীতের কামড় নেই।

- জানেন সমরদা৷ মিতা আর ফিরবে না৷ ডিভোর্সের কাগজপত্র তৈরি করছে ওর উকিল।

- হুঁ। সে শীতও নেই, পিকনিকের সে আমেজও নেই৷

- অবশ্য আমি মিতার দোষ দেখিনা৷ আমিই ঠিক ওর বন্ধু হয়ে উঠতে পারিনি৷ কিন্তু আপনি তো জানেন সমরদা, আমার ভালোবাসায় কোনও খাদ ছিল না। এখনও নেই।

- বেশ তো৷ বিষ্ণুপুরেই যাওয়া যাক একদিন৷ তোমার বৌদিও বলছিল..। নাকি পুরুলিয়া যাবে?

- বছরখানেক আগে একবার আমি আর মিতা দিনদুয়েকের জন্য পুরুলিয়া গেছিলাম৷ শীতকালেই৷ বিউটিফুল৷ বড় মনখারাপ হয় আজকাল সে'সব ভেবে জানেন৷ আর নিজের কান মলতেও ইচ্ছে করে খুব৷ একটু ভালো পার্টনার যদি হতে পারতাম...৷ মিতা বড় ভালো মেয়ে, জানে? বড় ভালো৷ আমিই শালা একটা আস্ত রাস্কেল৷ 

- আরে ধুর ধুর। ভালো মিষ্টি খেতে চাইলে বরং চন্দননগর চলো৷ তোমাদের কলকাতার মিষ্টিতে কেত আছে, কিন্তু সেনসিটিভিটিতে চন্দননগরকে টেক্কা দিতে পারবে না৷ 

- মিতা আমায় সুযোগ কম দেয়নি৷ আমিই ওর যোগ্য নই৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন সমরদা, আমি মনেপ্রাণে চাই ও ভালো থাকুক৷

- সত্যিই তো৷ সত্যিই তো৷ টপ-কোয়ালিটি বোঁদে দিয়ে মুড়ি মাখা..আহা, সে যে অমৃত।

***

- মালটা গেছে?

- কতবার বলেছি বিধু৷ সমরদার সম্বন্ধে তুই ওই ভাষায় কথা বলবি না৷

- ঘাট হয়েছে৷ তবে ওই বদ্ধ কালার সঙ্গে যে কী'ভাবে আপনি অত খোশ গল্প জোড়েন তা মা তারাই জানেন!

- তা'তে তোর কী? শোন৷ আগামী শনিবার সমরদা ফের আসবেন৷ ভালো বোয়াল রেঁধে খাওয়াস দেখি সে'দিন৷ সমরদা বেশ পছন্দ করে বোয়াল৷ 

***

- কাজটা কিন্তু মোটেও ঠিক করোনি তুমি।

- তুমি ব্যাপারটা বুঝছ না গিন্নী..।

- অনন্ত কিন্তু তোমায় সত্যিই ভালোবাসে৷ তুমি ওর বাড়িতে গেলে কত খুশি হয়৷ আর ওর কাছে এত বড় খবরটা তুমি চেপে গেলে?

- ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দেব৷ ভেবেছিলাম কথার মাঝখানে দুম করে জানাব যে খোকা দিল্লীতে আমার কানে অপারেশন করিয়েছে৷ এখন আমি মোটামুটি শুনতে পারি৷ অনন্ত খুব খুশিও হত৷ কিন্তু..।

- কিন্তু বললে না কেন?

- অনন্ত তো বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোট। অথচ আমাদের সাপ্তাহিক আড্ডা সে এত ভালোবাসে৷ কেন জান? কারণ এদ্দিন আমি শুনতে না পেলেও অনন্তর কাছে আমিই ছিলাম আদত শ্রোতা।  গল্পগুজবের মানুষ আকচার জুটে যায়, কিন্তু মনের কথা প্রাণখুলে নিশ্চিন্তে বলতে পারার আশ্র‍য় সহজে জোটেনা৷ আজ বুঝলাম আমি অনন্তর সেই আশ্রয়, আমি তাঁর কনফেশন বক্সও বটে৷ আমি এমন একজন শ্রোতা যে শুধু শুনে যায় অথচ তাঁকে পালটা জ্ঞান দিয়ে পর্যুদস্ত করে না, মর‍্যালিটির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এফোঁড়ওফোঁড় করে ফেলে না৷ এদ্দিন বদ্ধ কালা ছিলাম বলেই হয়ত I was the best listener that অনন্ত ever had। আর আজ যখন সে'টা টের পেলাম, কিছুতেই  অনন্তর সেই কনফেশন বক্সটুকু কেড়ে নিতে মন সরল না৷ 

- তুমি অনন্তকে কোনওদিনই জানাবে না যে তুমি শুনতে পাও?

- এই ভালো গিন্নী। এই ভালো।

Sunday, January 24, 2021

প্রিয় ফুল


- ইয়ে,তোমার কোন ফুল পছন্দ যেন?
- ফুল?
- বলো না৷
- তোমার শরীরটরীর ঠিক আছে? এতবছর পর আজ হঠাৎ প্রিয় ফুলের খোঁজ নিচ্ছ যে বড়?
- আহ, বলই না৷ তোমার সবেতেই একটা ইয়ে..।
- এই শোনো, ঝেড়ে কাশো দেখি৷
- মানে ওই৷ আসলে, এদ্দিনের ওই ঝুলে থাকা প্রমোশনটা শেষ পর্যন্ত হচ্ছে৷ বড়সাহেব আজ কনফার্ম করলেন৷ মেয়ের জন্য একটা জবরদস্ত কলম কিনলাম৷ ওই যে, যে'টা ও গত হপ্তায় দেখেছিল৷ ফাউন্টেন৷ তারপর ভাবলাম তোমায় সারপ্রাইজ দিয়ে যদি এক গোছা..কিন্তু ফুলের দোকানে এসে সব গুলিয়ে গেল। এত কিছু এ'খানে, অথচ আমি ওই জবা, রজনী, গাঁদার বাইরে কিছুই ঠিক ঠাহর করতে পারিনা৷
- ভালো মাফলারটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছ আজ,শীতের সন্ধ্যেয় টইটই করে না ঘুরে সোজা বাড়ি ফেরো দেখি৷ আজ একটা ট্যাক্সি নিও বরং৷ আর শোনো, ভালো ফুলকপি উঠেছে আজকাল৷ দু'জোড়া এনো, কেমন?

ডিসিপ্লিন

কিছুদিন আগেই টের পেলাম যে কথায় কথায় কারণে-অকারণে রোজ রোজ সন্দেশ রসগোল্লা খাওয়া হয়ে যাচ্ছে৷ ব্যাপারটা আদৌ স্বাস্থ্যকর নয়। আবার মিষ্টি একদম ঘ্যাচাং করে বাদ দিলেও মন আনচান করবে৷
কাজেই বাড়িতে এলো তালমিছরি। একটুকরো মুখে দিলেই আনচান কেটে যাবে। রোজ রোজ সন্দেশ-রসগোল্লা খাওয়ার যে বিশ্রী অপরাধ-বোধ; সে'টাও পাশ কাটানো যাবে। এক্কেবারে কম্পাস-বসানো হিসেব।
তাই বলে রোজ রোজ তালমিছরি খাব? সামান্য 'ভ্যারাইটি' না হলে কি চলে?
বেশ, ঘরে এলো পাটালি। রাতের খাবার পর, একটা ছোট্ট টুকরো - নিজেকে কথা দিলাম। তোফা।
এ'বার গত দিনচারেক ধরে গুড়ের রসগোল্লার পাশাপাশি পাটালি আর তালমিছরি একসঙ্গে নিজের ওপর ফায়্যার করে চলেছি।
মুক্তি নেই। নেই।

নির্ভুল

গিজার অন করলাম। বাহ্৷
দু'টো শ্যামল মিত্রের গান শুনলাম, এ সময়ে জল যথেষ্ট গরম হওয়া দরকার। নির্ভুল জানুয়ারিস্ট স্ট্র্যাটেজি।
বোনাসে শুনলাম মান্নাবাবুর "এ নদী এমন নদী"৷ জল এক্কেবারে ঘ্যাচাং-গরম চাই৷ বহুত খুব।
এরপর সেই মখমলে সুরে ভেসে ভেসে বাথরুমে গেলাম৷ দু'টো সুপরিচিত নল৷ তবে আগে মিনিট দুই গিজারের জ্বলন্ত লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে থেকে গাইলাম
"এখনও ডুব না দিলে হায়গো স্নান করবে কবে"?
গানের সুর স্তিমিত হয়ে আসার আগেই নল চালু করলাম। বালতি ভরল৷ তারপর ঝপাৎ স্পীডে আধ-মাইক্রোসেকেন্ডে কয়েক মগ স্ট্রেট-টু-তালু৷
ঠাণ্ডা জলের নল খুলেছিলাম৷
পরাস্ত বিধ্বস্ত বরফকুচি মাখানো দেহটাকে কোনও মত টেনে হিঁচড়ে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে গিজার বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম৷