Sunday, January 24, 2021

রাহানেবাবু...


অনেকদিন ছুটির অভাবে বাড়ি ফেরা হয়নি?
ফোনে মায়ের গলা শুনলেই বাড়তি মনকেমন?
রোববার-ফুরিয়ে-এলো মার্কা হাড়হিম?
ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে বহুদিন আড্ডায় মশগুল হতে না পারার জন্য মনভার?
আহা কদ্দিন কেউ-চিঠি-লেখে-না গোছের অভিমান বুকের মধ্যে জমে রয়েছে?
প্রিয় গানের প্লে-লিস্ট বা সঞ্জীবেও মন বসাতে পারা যাচ্ছে না, এমন বিশ্রী ছটফট আর অস্বস্তি মনের মধ্যে?
সে'সব গুমোট আর অন্ধকার সাফ করে মনের মধ্যে ফুর্তির ফ্লাডলাইট জ্বালতে দরকার এমন একটা সেঞ্চুরি..।
রাহানেবাবু, ওই মুহূর্তে আপনাকে শুধু রবীন্দ্রই বুকে জড়িয়ে ধরেননি..।

(২৭ ডিসেম্বর ২০২০তে লেখা, বক্সিং ডে টেস্টে রাহানের শতরানের পর)

বিমলদার জরুরী তলব


- কী ব্যাপার বিমলদা। এমন জরুরী তলব?
- বস৷ কথা আছে। এগুলো খা' আগে৷
- বাহ্৷ পিঠেগুলো তুমি বানিয়েছ?
- একামানুষ৷ আর কে বানাবে বল। খেয়ে ফেল পেট পুরে৷ আজ ও'টাই ডিনার৷
- এমন রাতবিরেতে কী এমন দরকার পড়ল, আগে সে'টা তো বলবে।
- বিনু, তুই আমায় বিশ্বাস করিস?
- তোমার প্রফেশনটাকে করিনা। তবে তোমায় বিশ্বাস করি৷ আফটার অল, গত সাতবছর ধরে তুমিই আমার পাহাড়ে ঘোরার গাইড। আর সর্বোপরি আমার ক্যারম-পার্টনার৷
- অ্যাস্ট্রলজি ইস নট এভ্রিওয়ানস কাপ অফ টী। জ্যোতিষ বিদ্যার পজিটিভ সাইডটা বোঝার জন্য একটা প্রশস্ত মন দরকার৷ সে'টা তোর নেই৷ তবে তোর আগ্রহ আছে৷ সারল্য আছে৷ সে'জন্যই তোকে আমার এত ভালো লাগে৷
- ব্যাপারটা কী বলো তো বিমলদা? তোমার কথাবার্তা বেশ মিস্টিরিয়াস বোধ হচ্ছে৷
- মিস্টিক ব্যাপারস্যাপারে আমার বরাবরই প্রবল আগ্রহ৷ আমি নিজেও তো মিস্টিসিজম নিয়েই কাটিয়ে দিলাম এতগুলো বছর।
- তোমার বুজরুকিগুলো দিনদিন বাড়ছে বাড়ুক৷ তবে তোমার পাটিসাপটাগুলো কিন্তু এ-ক্লাস হয়েছে৷
- যে'কাজের জন্য তোকে ডেকেছি..।
- হ্যাঁ বলো।
- তোর কুষ্ঠীটা বানিয়ে দিয়েছিলাম৷ গেল মাসে। পড়েছিলিস তো ভালো করে? না তার আগেই ডাস্টবিনে৷
- সেই রাবিশ মাল? ও জিনিস ডাস্টবিনের যোগ্যও নয়৷ সোজা পুড়িয়ে ফেলেছি৷ তবে তার আগে অবিশ্যি বারচারেক পড়ে খুব একচোট হেসে নিয়েছিলাম।
- তোর রাবিশ মনে হতেই পারে। ওই যে বললাম, তোর মন এখনও ততটা প্রশস্ত নয়৷ যাকগে, কুষ্ঠীতে যে ক্রিটিকাল ব্যাপারটা লিখেছিলাম, সে'টা মনে আছে তো?
- ওই যে। আমার হাতে একটা খুন হবে? সেই ফালতু ভবিষ্যৎবাণীটা?
- করেক্ট৷
- সেই কথাটা বলতে তুমি এত রাত্রে আমায় ডেকে পাঠালে বিমলদা? নাহ্৷ তোমার মাথাটা সত্যিই গেছে৷ নেহাৎ এই হাই-কোয়ালিটি পিঠে দিয়ে বশ করে রেখেছ৷ নয়ত এখুনি বেরিয়ে যেতাম।
- বিশ্বাস কর বিনু, আমার হিসেবে ভুল থাকলে আমি সত্যিই খুশি হতাম৷ তুই আমার অত্যন্ত স্নেহের৷ আনফরচুনেটলি, আমার অঙ্কে ভুল নেই। তোর হাতে খুন হবেই৷
- বিমলদা। কাউকে কোনওদিন চিমটি কেটেছি বলেও মনে পড়েনা৷ মাছ-মাংস নিজে আনতে যাই না রক্ত দেখতে পারিনা বলে৷ আর তোমার ধারণা আমি খুন করব?
- তোর গত বছর যে স্কুটার অ্যাক্সিডেন্টটা হল, সে'টার ব্যাপারে আমি তোকে আগেভাগে সাবধান করে দিইনি? বা সে'বার উত্তরাখণ্ডের ট্রেকটা করতে বারণ করেছিলাম না? বারণ না শুনে আমার লেজুড় হয়ে গেলি আর পা হড়কে হাড়গোড় ভেঙে দু'মাস পড়ে রইলি।
- ঝড়েবক আনতাবড়ি কতকিছুই তো বলো তুমি বিমলদা৷
- হিসেব৷ স্কেল কম্পাস বসানো হিসেব৷ বিনু, সবই নিরেট অঙ্ক৷
- আমার মেজাজটা খারাপ না করলেই নয়? তোমার কথা না শুনে পা হড়কে পড়েছি কোনকালে, তাই বলে আমি খুন করব?
- তুই আমার ভাইয়ের মত বিনু৷ আমি তোকে ভালোবাসি।
- তা'বলে আমি খুন করব? এ'টা তোমার মনে হল কী করে! আমি অতটা নীচে নামতে পারি বিমলদা?
- পরিস্থিতি তোকে কাজটা করিয়ে নেবে বিনু৷ পরিস্থিতি মানুষকে দিয়ে কী না করিয়ে নেয়।
- নাহ্৷ এ'সব শোনার ধৈর্য আমার নেই৷ কাজের কথাটা বলে ফেলো, যার জন্য ডেকেছিলে।
- আমার ডিপ্রেশনের ব্যাপারটা তো জানিস৷ সুইসাইডাল টেন্ডেন্সিগুলোও তোর অজানা নয়।
- তা'তে কী? কতবার বলেছি থেরাপিস্টের কাছে যাও। ও'সব ঠিকুজি মার্কা গাঁজাখুরি হিসেব নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকলে হবে?
- শোন৷ অনেকদিন ধরেই ভাবছি আত্মহত্যার কথা। কিন্তু সুবিধেমত দিনক্ষণ পাওয়া যাচ্ছিল না।
- কী বলতে চাইছ?
- আরে সুইসাইড করব বললেই তো আর করা যায়না৷ গ্রহ নক্ষত্রের মুভমেন্ট যদি অ্যালাইন না করানো যায় তা'হলে হিতে বিপরীত হতে পারে৷ সে যাকগে৷ পজিটিভ নিউজ হল, আজকের রাতটা ও'কাজের জন্য আদর্শ।
- সুইসাইডের জন্য?
- শনি আর বেস্পতি এক্কেবারে সঠিক স্পটে বসে আছে রে৷ বহুবছর অপেক্ষা করে এমন দিন পেয়েছি৷ এ জিনিস হাতছাড়া হতে দেওয়া যায়না।
- তোমার মাথাটা সত্যিই গেছে।
- আগে কথাটা শোন। আজ রাত একটা বত্রিশ নাগাদ গোপালপুর ব্রিজের ওপর থেকে ঝাঁপ দেব, স্ট্রেট নদীতে৷
- ধুস। পাগলের প্রলাপ যত।
- বিনু। ভাইটি৷ একবার অন্তত মন দিয়ে আমার কথাটা শোন৷ তোর সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডে আমি যেচে আলাপ করেছিলাম, মনে আছে? কারণ আমি তোর মুখ দেখে ধরতে পেরেছিলাম আমাদের আত্মার যোগ আছে৷ দেখ বিনু। আমাকে আজ মরতেই হবে। আর তোর হাতেও খুন হবেই৷ আমাকেই বরং ব্রিজের ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দে না ভাই! তা'তে তোর খুনের ব্যাপারটাও মিটে যাবে, আত্মহত্যার পাপটাও আমি পাশ কাটাতে পারব৷ নেহাৎ তুই কুওপারেট না করলে নিজেকেই ঝাঁপ দিতে হবে৷ কিন্তু এত বড় সুযোগ তুই হাতছাড়া করিস না..।
- এই রইল তোমার পাটিসাপটা...আচ্ছা উজবুক তো তুমি..।
- বিনু শোন৷ খুন তোকে একটা করতেই হবে৷ আজ আমায় খুন করে ফেলে সে ফাঁড়াটা কাটিয়ে নে৷ তোর দাদার মত আমি, তোকে বাজে কথা বলব না৷ তিন কপি সুইসাইড নোট লিখে রেখেছি৷ এই দেখ। একটা লোকাল থানার সামনে গোপনে ফেলে দিয়ে ব্রীজে যাব৷ একটা থাকবে আমার এই বাড়িতেই৷ আর একটা রিষড়ার মাসীর ঠিকানায় পোস্ট করে দেব৷ কারুর সন্দেহ হবে না, সহজেই প্রমাণ হয়ে যাবে যে ব্যাপারটা সুইসাইড। আর গোপালপুরের ব্রিজটা রাতের বেলা এক্কেবারে সুনসান থাকে, কেউ আমাদের দেখবে না৷ চ'না ভাই৷ রথ দেখা কলা বেচা দুইই হবে৷ একটা আলতো ধাক্কা দিবি শুধু৷ আমার মরাও হবে, তোর খুন করার ব্যাপারটাও নিঃশব্দে মিটিয়ে ফেলতে পারবি৷ নয়ত ভাব, পরে কখন কী ভাবে খুন করে বসবি আর তারপর থানা-পুলিস-আদালত-ফাঁসি, সব নিয়ে কী হুলুস্থুল ব্যাপার ঘটবে।
- আমি আসছি বিমলদা। আমার গা গুলিয়ে উঠছে৷ তুমি বদ্ধ পাগল হয়ে গেছ।
- শোন বিনু, তুই আমার থেকে পালাতে পারবি কিন্তু ভবিতব্যকে এড়াতে পারবি না। পারবি না!
- আসি আমি৷
- খুন তোকে করতেই হবে৷ তোর ভাগ্য তোকে দিয়ে ঠিক খুন করিয়ে নেবে।
- ধুর।
- পারবি না তুই পরিস্থিতির চাপ সামলাতে৷ খুন তোকে করতেই হবে।
***
বাড়ি ফেরার ঘণ্টাখানেক পরও বুকের ধড়ফড়টা কমল না বিনুর৷ একবার মনে হলো থানায় ব্যাপারটা জানানো দরকার৷ সেই ভেবে ফের জামাকাপড় গায়ে চাপালো৷ কিন্তু মোটোরবাইকটা স্টার্ট করেই বিনুর মনে পড়ল উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ে পা হড়কে পড়ে যাওয়ার কথা৷ মনের মধ্যের বিশ্রী তোলপাড়টা যেন সহস্রগুণ বেড়ে গেল।
বাইকটাকে থানার দিকে না নিয়ে গোপালপুর ব্রিজের দিকে ছুটিয়ে দিল বিনু৷ রাত একটা বত্রিশের আগেই সে গোপালপুর ব্রীজের ওপর পৌঁছে যেতে পারবে। কানের মধ্যে তখন বিমলদার পাগলাটে গলাটা দামামার মত বাজছে - "পারবি না তুই পরিস্থিতির চাপ সামলাতে"।
***
গোপালপুর ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন বিমল৷ সম্ভবত তার শেষ সিগারেট৷ নদী ছুঁয়ে বয়ে আসা মিঠে হাওয়ার ঝাপটা মুখে লাগায় একটা আরামদায়ক ঝিমঝিম ভাব গোটা শরীরে৷ রিস্টওয়াচ বলছে রাত একটা বেজে সাত মিনিট, এখনও বেশ কিছুটা সময় আছে হাতে।
বিনু আসবেই, বিমল সে'টা জানেন।
মনটা বেশ ফুরফুরে বোধ হচ্ছিল৷ বহু বছর ধরে জ্যোতিষবিদ্যের প্রতি বিনুর অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য শুনেশুনে হদ্দ হয়ে পড়েছিলেন বিমল। উত্তরাখণ্ডের গাইডকে গোপনে ঘুষ খাইয়ে বিনুকে ঠেলে ফেলে দিয়ে হাড়গোড় ভাঙানোর পরেও ওর অবিশ্বাসকে টলানো যায়নি৷ কাজেই বড় কিছু একটা না করলে চলছিল না৷ এইবার সে ব্যাটাকে পথে আনা যাবে, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত৷

ঝিনুকে মুক্ত


- বুঝলে ভায়া, এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না যাতে মুক্ত আছে।
- আহা, কী মন্দ কপাল আপনার দাদা।
- ভেবেছ এমন মানুষ খুঁজে পেয়েছি যার মন আছে?
- পেয়েছেন কি?
- সে গুড়েও বালি।
- আহা৷ এহ্ হে৷ টোটালি ট্র্যাজিক দাদা৷ টোটাল ট্র্যাজেডি৷
- তা, মাইনর ট্র্যাজেডি তো বটেই।
- মাইনর?
- মাইনর৷ মুক্তো পাইনি, মনটনও জোটেনি৷ তবে..।
- তবে?
- সে না পাওয়াগুলো কে ভাসিয়ে দিয়ে খুঁজে পেয়েছি মনের মত মাংসের মোগলাই পরোটা বানানেওলা দোকান, কলকাতা থেকে হাজার মাইল দূরে বসে।
- ব্রেভো! ব্রেভো দাদা! মুক্তোয় কী এমন ঘ্যাম, মন কউন সি ক্ষেত কি মুলি৷ মনের মত মোগলাই পেয়েছেন...আহা! তাই আজ আপনার মুখে এমন বুদ্ধ-লেভেল হাসি।
- ওয়েল-স্পটেড ব্রাদার৷ ওয়েল-স্পটেড।

গোবরদার টোটকা


- আপনার পিঠে যে'টা ঠেকছে, সে'টা বন্দুকের নল। কাজেই নড়াচড়া করবেন না, বেফালতু আওয়াজ করলেই কিন্তু সোজা গুড়ুম!
- আরিব্বাস। পিঠে বন্দুক? মা কালীর দিব্যি?
- মাইরি৷
- আমি প্রাইভেট ফার্মের পাতি চাকুরে মশাই, থোড়বড়িখাড়া জীবন৷ শখ বলতে রাতের খাবার হজম করতে রোজ এই ফুটপাথ ধরে আধঘণ্টা হাঁটা৷ দুম এ'রকম একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার ঘটবে, ভাবতেই পারিনি।
- এই, খুব ফুর্তি হচ্ছে নাকি? দেব নাকি দু'রাউন্ড ফায়ার করে?
- যাই বলুন মশাই৷ বন্দুকের ফায়্যারে রক্তারক্তি আছে, কিন্তু রোজ অফিসে বসের ফায়্যারিংয়ের মত বিষ নেই৷
- তা অবিশ্যি মন্দ বলেননি৷ আমার ওস্তাদেরও এমন তিরিক্ষি মেজাজ৷ উফ৷ আরে সবে মাসখানেক হল লাইনে নেমেছি৷ পকেটকাটার ব্যাপারটা এখনও জলবৎ হয়নি। এ'দিকে আমায় ধরিয়ে দিল পিস্তল, বলে কিনা কেরিয়ার প্রগ্রেস চাইলে রাহাজানিতে ঢোকো৷
- এই এক নতুন বাতিক হয়েছে, বুঝলেন৷ কথায় কথায় নাকের ডগায় কেরিয়ারের গাজর ঝুলিয়ে ড্যাঙশপেটা করবে। তা যাকগে, পিঠে যে বন্দুক ঠেকালেন, কী চাই ভাই?
- মানিব্যাগ, মোবাইল, রিস্টওয়াচ, আঙটি।
- আপনার দ্বারা এ'সব হবে না৷ কেমন? পকেটমারি রাহাজানি ছেড়ে বরং টিউশনি খুঁজুন।
- একদম চালাকি নয়। বেশি প্যাটরপ্যাটর করলেই গুড়ুম।
- আমার ভালোনাম সঞ্জয় কিন্তু ডাকনাম গোবর, কেন জানেন? কারণ বাপ-মা বুঝেছিলেন যে আর যাই হোক আমার মগজে বিন্দুমাত্র চালাকি নেই৷ পাড়াতে সঞ্জয় চাকলাদারের বাড়ি খুঁজতে গিয়ে হন্যে হবেন কিন্তু গোবরদার বাড়ি সক্কলে চেনে৷ কাজেই আর যাই হোক, চালাকির জন্য গুলি খেয়ে মরব না, এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি৷
- ইয়ে, আমার দ্বারা লুঠপাট হবেনা কেন গোবরদা?
- ঢলঢলে পাজামা পরে হাঁটতে বেরিয়েছি ভাই৷ আমার কাছে মানিব্যাগ থাকবে কেন? আর ফতুয়ার ওপর এই যে র্যাপারটা জড়ানো- এ'টা এখন খয়েরী হলেও, নব্বুইয়ের দশকে এ'টার রঙ ছিল নীল। হাতে আঙটি নেই তবে গলায় একটা সস্তা মাদুলি আছে, তারাপিঠ থেকে আনা৷ রিস্টওয়াচ রিস্টে যখন নেই, তখন তো আর বুকপকেট হাতড়ালে পাওয়া যাবে না৷ তবে মোবাইল আছে, সাত বছর পুরনো একটা থ্যাবড়া ফোন, পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। তার বেশি কিছু হবে না এ দিয়ে৷
- ধুর৷ ট্রেনিংটাই মাটি৷ ওস্তাদের শুধু বড় বড় কথা৷ এ'দিকে যা শেখায় সবই গাঁজাখুরি যা বুঝছি। আমায় দু'হপ্তা ধরে শেখালে যে লুঠপাট করার টার্গেট ধরতে হবে পোশাকের জেল্লা দেখে নয়, চোখের ঝিলিক বুঝে৷ চোখ দেখেই নাকি সঠিক রহিসি মেজাজ চেনা যায়৷ চোখের ঝিলিক বিচার করার কত টেকনিক শেখালে ওস্তাদ৷ অথচ কাজের বেলায় দেখছি গুবলেট।
- আমার চোখে রহিসি ঝিলিক দেখতে পেয়েছ নাকি বন্দুকবাবু?
- হিসেব তো তাই বলছে৷ রহিসি, লাটসাহেবি, সুখী দৃষ্টি৷ আমি তো ভেবেছিলাম প্রথম কোপেই বড় দাঁও মারব।
- ওস্তাদের ফর্মুলা মন্দ নয় হে ভায়া৷ এন্তার পাটিসাপটা আর পাটালির পায়েস খেয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম আজ৷ ঢপ নয়, টপকোয়ালিটি পাটালি৷ নিজেকে সত্যিই বেশ কেউকেটা মনে হচ্ছে বটে, তৃপ্তি উপচে পড়ছে৷ রাজারাজড়ার মেজাজ বোধ হয় এমনই৷ এমন কী অফিসের বসের ফোনটাও সাহস করে কেটে দিলাম কিছুক্ষণ আগে৷ পিঠে-পাটালির এফেক্ট কাল সকালে কেটে যাবে৷ তখন আবার নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি হয়ে বসের সামনে ফ্ল্যাট হব৷ কিন্তু তার আগে পর্যন্ত আমিই রাজা।
- যাহ্৷ আচ্ছা ঝামেলা হল তো৷ রাস্তাঘাটও শুনশান, জাঁদরেল কাউকে পাব বলে তো আর মনে হচ্ছে না..৷ ওস্তাদ এমন দাঁত খিঁচুনি দেবে এখন..।
- ইয়ে ভায়া, পিঠ থেকে বন্দুকের নলটা সরালে একটা ওস্তাদ-সামলানোর উপায় বাতলাতে পারি।
- মাইরি গোবরদা?
- সাকসেসফুল টেকনোলজি বন্দুক-ভায়া৷ হাতেকলমে প্রমাণিত। শোনো, আমার পকেটে এক টুকরো পাটালি আছে, ভেবেছিলাম হন্টন শেষে বাড়ি ফেরার পথে মুখে দেব৷ সে'টা বরং তুমিই খেয়ে ফেলো৷ দেখবে ওস্তাদের দাঁতখিঁচুনি সয়ে আসবে, বুকে বল পাবে৷ দেব নাকি?
- দিন। এই প্রথম পিঠে বন্দুক ঠেকালাম, সোনাদানা টাকাকড়ি ঘড়িমোবাইল জুটল না৷ অন্তত পাটালি দিয়ে বউনিটা হয়ে যাক৷ জয় মা।
***
(ছবিটা ২০১৯ ডিসেম্বরের)

বড়দিন আর রাত্রিবেলার হাওয়াখাওয়া



- এই যে৷ ট্যাক্সিভায়া। বেহালা যাবে?
- না৷
- শেয়ালদা?
- কাকা, আপনি বেহালা যাবেন না শেয়ালদা?
- বেহালা নিয়ে গেলেও যাব৷ শেয়ালদা নিয়ে গেলেও যাব৷ নেহাত ঝুলোঝুলি করলে গড়িয়া যেতেও আপত্তি নেই।
- ইয়ার্কি করছেন না তো?
- ক্রিসমাসের দিন ভায়া৷ এই সময় পার্কস্ট্রিটের পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে ফাজলামো করব? না না ভায়া৷ নেভার। তা'হলে কী ঠিক হল? কোথায় যাব?
- টালিগঞ্জের প্যাসেঞ্জার পেলে ভালো হত কাকা৷ ও'দিকেই বাড়ি কিনা।।
- আহা বেশ তো৷ টালিগঞ্জই সই৷ চলো।
- উঠে আসুন।
- থ্যাঙ্ক ইউ ভায়া৷ মিটার চালু করো দেখি৷
- কেসটা কী বলুন তো কাকা? এত রাত্তিরে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন নাকি? তা বয়সে ঠাণ্ডাফান্ডা লেগে গেলে মুশকিল তো।
- এই সময়টা আমি একটু ঘোরাঘুরি করি বটে৷ তবে ঠাণ্ডা লাগার ভয় আমি পাইনা ভাই৷ এর চেয়ে অনেক কড়া শীত আমি দিব্যি ম্যানেজ দিয়ে থাকি৷ আর আমার এই ঘোরাঘুরি আমি শুরু করি পার্ক স্ট্রিট দিয়ে৷
- হ্যাঁ, এ সময়টা পার্ক স্ট্রীটের ইয়েই আলাদা।
- হ্যাঁ৷ সত্যিই হাইক্লাস ইয়ে।
- তা টালিগঞ্জের হয়ে কোথায় যাবেন কাকা?
- টালিগঞ্জের পর ভাবছি চট করে একটু গিয়োথোনবিনে ঢুঁ মেরে আসব।
- গিয়ো..কী?
- গিয়োথোনবিন।
- বারাসাতের দিকে কোনও হাউসিং কম্পলেক্স কি?
- না হে৷ গিয়োথোনবিন একটা হদ্দ গ্রাম। বার্মায়৷
- নেশাটেশা করা হয় নাকি? কাকা?
- নেশার টানেই তো ফি-বছর পার্কস্ট্রীট থেকেই যাত্রা শুরু করি হে। প্রথমেই কুসুমের রোলের দোকানের সামনে গিয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রোলের সুবাসে মনপ্রাণ ভরে ফেলি৷ তারপর শুরু অভিযান।
- অভিযান?
- এই ডিবেটায় কী আছে বলো দেখি ভায়া?
- কেকের ডিবে তো৷
- ফ্লুরিজের প্লাম৷ তুমি তো কেক খুব ভালোবাসো, তাই না ট্যাক্সিভায়া? ফ্লুরিজের আলো সুবাস মায়া তোমায় বড্ড টানে, তাই না?
- কাকা! আপনি কি তান্ত্রিকটান্ত্রিক নাকি?
- হলেই বা! এ কেকের স্বাদ তো আর কমছে না৷ চলো, কেকটা ভাগ করে সাবাড় করে ফেলা যাক৷ রাতের ফাঁকা রাস্তায় টালিগঞ্জ পৌঁছতে সময় বেশি লাগবে না৷ কাজেই, ক্যুইক৷ আমার আবার গিয়োথোনবিন ছুটতে হবে।
- আপনি কে বলুন দেখি কাকা?
- কেক মুখে না দিয়ে খামোখা প্রশ্নে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয়? হো হো হো।

***
সনাতন দত্ত যখন বাড়ি ফিরলেন তখন রাত পৌনে একটা৷ বহুচেষ্টা করেও কেক-তৃপ্ত ট্যাক্সিভায়াকে ভাড়ার টাকাটা গছানো যায়নি৷
প্রতি বড়দিনে এক ধরনের ছেলেমানুষি তাঁকে পেয়ে বসে - পার্ক্সস্ট্রিটে কাউকে হুট করে পাকড়াও করে কেক না খাওয়ালে তার মন ভরে না৷ তাছাড়া কেক-পিপাসু চোখ আর টালিগঞ্জের দিকে যেতে চাওয়া ট্যাক্সি ড্রাইভারদের একনজরে চিনতে পারার একটা দুরন্ত ক্ষমতা রয়েছে তাঁর৷ ধেড়েখোকাদেরও গোপন-স্যান্টার প্রয়োজন পড়ে, এ সত্যটি বিলক্ষণ জানেন সনাতনবাবু৷