Friday, October 30, 2020

লক্ষ্মী

- কে? বিমল?

- হ্যাঁ ভজাদা।

- বাইরে দাঁড়িয়ে কেন। ভেতরে আয়।

- না, মানে..ঠিক বলেকয়ে আসার সুযোগ পাইনি তো।  তুমি মক্কেলদের নিয়ে ব্যস্ত আছ কিনা এই ভেবে একটু হেসিটেট করছিলাম আর কী।

- কাতলা আর ওয়াসাবি দিয়েএকটা এক্সপেরিমেন্টাল রেসিপি ফ্রেম করছিলাম।  সে'দিক থেকে বলতে গেলে ব্যস্ত তো বটেই। আয়, বস। এ, কী। ভিজে কাক অবস্থা যে।

- অসময়ের বৃষ্টি। আর এমন ঝমঝমিয়ে নামল। ট্যাক্সি থেকে নেমে গিয়ে গলির ভিতর দৌড়ে আসতে গিয়েই..।

- উকিলের চেম্বারে ব্যাকআপ শার্ট  এক্সপেক্ট করিস না, গামছাও নেই। তুই বরং শার্টটা খুলে টেবিল ফ্যানের সামনের ওই চেয়ারটায় মেলে দিয়ে বস। আর আমি কফি বানাই গিয়ে। ফ্লাস্কের নয়, টাটকা। সে'সরঞ্জাম আজকাল অফিসেই রাখছি। তবে ব্ল্যাককফি।

- না না। অত ব্যস্ত হয়ো না। আমি এখুনি বেরোব। গলির মুখে ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করিয়ে এসেছি।

- সে কী৷ এমন শশব্যস্ত হয়ে এ'খানে এলি? আমি ভাবলাম ওই ইউসুয়াল তাস আর আড্ডার টানে এসেছিস। তা, কোনও আইনি ফাঁপরে পড়লি নাকি?

- না ভজাদা। 

- তবে?

- ব্যাপারটা খুবই পাতি..।

- বলেই ফেল না বিমল। ভেজা গায়ে অত ভূমিকা ফাঁদার কোনও দরকার নেই।

- আজ সন্ধ্যেবেলা একবার আমার ফ্ল্যাটে ঢুঁ মেরে যেও৷ যদি খুব ব্যাস্ত না থাকো।

- সে কী৷ উইকেন্ড গুলজার? স্কচটচ এনে রেখেছিস নাকি? তা ফোনে বলে দিলেই তো হত..।

- তা হত। তবু, এ'দিক দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই..। তবে ইয়ে, আসরটা ঠিক স্কচ ফিশফ্রাইয়ের নয় কিন্তু।

- ব্যাপারটা কী বল তো?

- আজ লক্ষ্মীপুজো। জানো তো?

- আমি তো জানি। কিন্তু সে'খবরে তোর কী কাজ কে জানে। 

- সকালের দিকে একটা একটা মূর্তি এনেছি জানো। সঙ্গে ধুপ, ধুনো, ফুল আর সামান্য ফল। এই এখন ফিরে গিয়ে খিচুড়ি আর লাবড়া রাঁধব। সময় পেলে লুচি আর পায়েসও।

- প্রবল নাস্তিক শ্রীমান বিমল হালদারের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো? অথচ আমি কতদিন বলেছি চ' একবার আমার বেনারসের গুরুজির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ফ্যাসিনেটিং ক্যারেক্টার আর ব্রিজ চ্যাম্পিয়ন। সে'বেলা যত বইপড়া বাতেলা।  

- ব্যাপারটা ঠিক তা নয়৷ পুরুতঠাকুর কেউ আসছে না৷ সে অর্থে পুজোও হবে না।  তবে আমি পাঁচালি পড়ব। তুমি আসবে ভজাদা? আর কাউকে ডাকতে ঠিক সাহস পাচ্ছিনা।

- তোর শরীর ঠিক আছে? তুই পাঁচালি পড়বি? আমার গুরুজির চেয়েও হাইক্লাস কারুর পাল্লায় পড়লি নাকি?আর তাছাড়া হঠাৎ এই পুজো..।

- খুব মায়ের কথা মনে পড়ছিল ভজাদা। খুব। 

- আই সী।

- এই পুজোর দিনটায় মা উপোস করত। নির্জলা। গোটাদিন কেটে যেত ভোগ রান্না আর পুজোর জোগাড়যন্ত্রে৷ সন্ধ্যেবেলা পুরুতমশাই এলে শুরু হত লক্ষ্মীপুজো। তারপর মায়ের পাঁচালী পড়া। দুলে, দুলে। সে কী অপূর্ব রিদম ভজাদা। ভোগের ভুনো খিচুড়ি, বেগুনভাজা, সুজির হালুয়া, লুচি, পায়েসের পাশাপাশি ধুপ, ধুনো, ফুলফুলের গন্ধ মিশে যে কী মনভালো করা একটা ব্যাপার হত। তবে সমস্ত সুগন্ধ ছাপিয়ে যে'টা মনে লেগে থাকত সে'টা হল মায়ের সুবাস। মায়ের সুবাস অবশ্য রিক্রিয়েট করা সম্ভব নয়৷ কিন্তু বাকি গন্ধগুলোর জন্য হঠাৎ কেমন করে উঠল। ঈশ্বর বিশ্বাস নয়..। 

- তোরও বুঝি নির্জলা উপোস আজ? তাই কফি রিফিউজ করলি? বেশ, আমি বরং একটু আগেই যাব। পায়েসটা আমিই চাপাব'খন৷ আমার তাসের পার্টনার রতন মল্লিক গেলে কোনও অসুবিধে নেইতো? পুরুত সে নয়। তবে বড় ভালো বাউল গায়। আজ রাতে তোকে একা রাখব না ভাবছি। তোর পাঁচালী পাঠের অডিয়েন্সও একজন বাড়বে আর রাতের আড্ডায় তোর মনখারাপ বাড়লে বাউলেরও বন্দোবস্ত থাকবে।

- শেষের কয়েকবছর লক্ষ্মীপুজোয় বাড়ি ফিরতে পারিনি জানো। কাজের চাপে। মা অবিশ্যি কোনওদিনও অভিযোগ করত না।

- অভিযোগ করলে ভালো হত, তাই না রে বিমল?

- হেহ্। হয়তো। এই লক্ষ্মীপুজোর দিনটায় এমন দড়াম করব মায়ের কথা মনে পড়ে গেল..। এমন একটা অদ্ভুত আনচান। যাকগে, এখন আসি। দশকর্মার দোকান থেকে কিছু জিনিসপত্র নিতে হবে। 

- ঈশ্বরবিশ্বাসে তোর কাজ নেই। তবে এই আনচানটুকুও আস্তিকতা। বুঝলে বিমলচন্দ্র? নাহ্, আজ আর মক্কেলের অপেক্ষায় চেম্বারে বসে থেকে লাভ নেই। চ', আমিও বরং তোর সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ি।

সেতু কার

- কে? বিমল?

- হ্যাঁ ভজাদা।

- বাইরে দাঁড়িয়ে কেন। ভেতরে আয়।

- না, মানে..ঠিক বলেকয়ে আসার সুযোগ পাইনি তো।  তুমি মক্কেলদের নিয়ে ব্যস্ত আছ কিনা এই ভেবে একটু হেসিটেট করছিলাম আর কী।

- কাতলা আর ওয়াসাবি দিয়েএকটা এক্সপেরিমেন্টাল রেসিপি ফ্রেম করছিলাম।  সে'দিক থেকে বলতে গেলে ব্যস্ত তো বটেই। আয়, বস। এ, কী। ভিজে কাক অবস্থা যে।

- অসময়ের বৃষ্টি। আর এমন ঝমঝমিয়ে নামল। ট্যাক্সি থেকে নেমে গিয়ে গলির ভিতর দৌড়ে আসতে গিয়েই..।

- উকিলের চেম্বারে ব্যাকআপ শার্ট  এক্সপেক্ট করিস না, গামছাও নেই। তুই বরং শার্টটা খুলে টেবিল ফ্যানের সামনের ওই চেয়ারটায় মেলে দিয়ে বস। আর আমি কফি বানাই গিয়ে। ফ্লাস্কের নয়, টাটকা। সে'সরঞ্জাম আজকাল অফিসেই রাখছি। তবে ব্ল্যাককফি।

- না না। অত ব্যস্ত হয়ো না। আমি এখুনি বেরোব। গলির মুখে ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করিয়ে এসেছি।

- সে কী৷ এমন শশব্যস্ত হয়ে এ'খানে এলি? আমি ভাবলাম ওই ইউসুয়াল তাস আর আড্ডার টানে এসেছিস। তা, কোনও আইনি ফাঁপরে পড়লি নাকি?

- না ভজাদা। 

- তবে?

- ব্যাপারটা খুবই পাতি..।

- বলেই ফেল না বিমল। ভেজা গায়ে অত ভূমিকা ফাঁদার কোনও দরকার নেই।

- আজ সন্ধ্যেবেলা একবার আমার ফ্ল্যাটে ঢুঁ মেরে যেও৷ যদি খুব ব্যাস্ত না থাকো।

- সে কী৷ উইকেন্ড গুলজার? স্কচটচ এনে রেখেছিস নাকি? তা ফোনে বলে দিলেই তো হত..।

- তা হত। তবু, এ'দিক দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই..। তবে ইয়ে, আসরটা ঠিক স্কচ ফিশফ্রাইয়ের নয় কিন্তু।

- ব্যাপারটা কী বল তো?

- আজ লক্ষ্মীপুজো। জানো তো?

- আমি তো জানি। কিন্তু সে'খবরে তোর কী কাজ কে জানে। 

- সকালের দিকে একটা একটা মূর্তি এনেছি জানো। সঙ্গে ধুপ, ধুনো, ফুল আর সামান্য ফল। এই এখন ফিরে গিয়ে খিচুড়ি আর লাবড়া রাঁধব। সময় পেলে লুচি আর পায়েসও।

- প্রবল নাস্তিক শ্রীমান বিমল হালদারের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো? অথচ আমি কতদিন বলেছি চ' একবার আমার বেনারসের গুরুজির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ফ্যাসিনেটিং ক্যারেক্টার আর ব্রিজ চ্যাম্পিয়ন। সে'বেলা যত বইপড়া বাতেলা।  

- ব্যাপারটা ঠিক তা নয়৷ পুরুতঠাকুর কেউ আসছে না৷ সে অর্থে পুজোও হবে না।  তবে আমি পাঁচালি পড়ব। তুমি আসবে ভজাদা? আর কাউকে ডাকতে ঠিক সাহস পাচ্ছিনা।

- তোর শরীর ঠিক আছে? তুই পাঁচালি পড়বি? আমার গুরুজির চেয়েও হাইক্লাস কারুর পাল্লায় পড়লি নাকি?আর তাছাড়া হঠাৎ এই পুজো..।

- খুব মায়ের কথা মনে পড়ছিল ভজাদা। খুব। 

- আই সী।

- এই পুজোর দিনটায় মা উপোস করত। নির্জলা। গোটাদিন কেটে যেত ভোগ রান্না আর পুজোর জোগাড়যন্ত্রে৷ সন্ধ্যেবেলা পুরুতমশাই এলে শুরু হত লক্ষ্মীপুজো। তারপর মায়ের পাঁচালী পড়া। দুলে, দুলে। সে কী অপূর্ব রিদম ভজাদা। ভোগের ভুনো খিচুড়ি, বেগুনভাজা, সুজির হালুয়া, লুচি, পায়েসের পাশাপাশি ধুপ, ধুনো, ফুলফুলের গন্ধ মিশে যে কী মনভালো করা একটা ব্যাপার হত। তবে সমস্ত সুগন্ধ ছাপিয়ে যে'টা মনে লেগে থাকত সে'টা হল মায়ের সুবাস। মায়ের সুবাস অবশ্য রিক্রিয়েট করা সম্ভব নয়৷ কিন্তু বাকি গন্ধগুলোর জন্য হঠাৎ কেমন করে উঠল। ঈশ্বর বিশ্বাস নয়..। 

- তোরও বুঝি নির্জলা উপোস আজ? তাই কফি রিফিউজ করলি? বেশ, আমি বরং একটু আগেই যাব। পায়েসটা আমিই চাপাব'খন৷ আমার তাসের পার্টনার রতন মল্লিক গেলে কোনও অসুবিধে নেইতো? পুরুত সে নয়। তবে বড় ভালো বাউল গায়। আজ রাতে তোকে একা রাখব না ভাবছি। তোর পাঁচালী পাঠের অডিয়েন্সও একজন বাড়বে আর রাতের আড্ডায় তোর মনখারাপ বাড়লে বাউলেরও বন্দোবস্ত থাকবে।

- শেষের কয়েকবছর লক্ষ্মীপুজোয় বাড়ি ফিরতে পারিনি জানো। কাজের চাপে। মা অবিশ্যি কোনওদিনও অভিযোগ করত না।

- অভিযোগ করলে ভালো হত, তাই না রে বিমল?

- হেহ্। হয়তো। এই লক্ষ্মীপুজোর দিনটায় এমন দড়াম করব মায়ের কথা মনে পড়ে গেল..। এমন একটা অদ্ভুত আনচান। যাকগে, এখন আসি। দশকর্মার দোকান থেকে কিছু জিনিসপত্র নিতে হবে। 

- ঈশ্বরবিশ্বাসে তোর কাজ নেই। তবে এই আনচানটুকুও আস্তিকতা। বুঝলে বিমলচন্দ্র? নাহ্, আজ আর মক্কেলের অপেক্ষায় চেম্বারে বসে থেকে লাভ নেই। চ', আমিও বরং তোর সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ি।

অরুর গান

- একবার গান গাইতে বসলে অরুর আর সময় জ্ঞান থাকেনা।

- তাই নাকি?

- একদম৷ এই দেখ। বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। সেই তিনটে নাগাদ গলা সাধতে বসেছে। 

- বটে।

- জানিস মন্টু, অরুর সুরে বড় মায়া আছে৷ অনেকটা ব্যথাও মিশে আছে অবিশ্যি। এমনিতে হাসিখুশি ছটফটে হলে কী হবে, ছেলেবয়সে মাকে হারানোর যন্ত্রণাটা কি সহজে ভোলা যায়? মিনুর না থাকার ব্যথাটা ও সর্বক্ষণ বয়ে বেড়ায়। হ্যাঁ রে মন্টু, তুই এলেই মিনু কতরকমের পদ রান্না করতে বসত..মনে আছে?

- বৌদির হাতের রান্না ভোলা অসম্ভব। 

- না হয় সে চলেই গেছে। মানছি, আমার হেঁসেল বিদ্যেয়  ডাল ডিমের অমলেটের বেশি রেঁধে খাওয়ানো সম্ভব নয়৷ তাই বলে দাদা ভাইপোর খবর নিতে মাঝেমধ্যে আসবি না? বছর দুয়েক পর তুই এ বাড়িতে এলি মন্টু।

- ফোন তো নিয়মিত করি রে দাদা।

- তা করিস। নাহ্, খোঁজখবর তুই রাখিস বটে। আমিও অরুকে তাই তো বলি, রক্তের টান ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আর তাছাড়া..। ওহ্। আহা৷ এই যে।

- কী হল রে দাদা?

- অরু এ'বার একটা নজরুলগীতি ধরেছে৷ শুকনো পাতার নুপুর পায়ে৷ আহা। মিনু খুব গাইত। 

- দাদা, অরু গান করছে না।

- তুই শুনতে পারছিস না হয়ত। কিন্তু অরু গান গাইছে মন্টু৷ ওই যা না পাশের ঘরে, দেখ কেমন দরদ দিয়ে গাইছে।

- কিছু মনে করিসনা দাদা। তোর মাথাটা গেছে৷ আর আমার চিন্তা হচ্ছে যে তোর এই পাগলামো অরুকে আরও এফেক্ট করবে।

- কিন্তু অরু গান গাইতে বসে রে মন্টু৷ বিশ্বাস কর..।

- কারণ ওর মাথাটাও ঠিক ব্যালেন্সড নেই। আর সেই গোলমালকে তুই আরও প্রশ্রয় দিচ্ছিস।

- কী বলছিস তুই মন্টু!

- ঠিকই বলছি। অরু কথা বলতে পারেনা৷ বৌদির মারা যাওয়ার শকে হি লস্ট হিস স্পীচ। এই রিয়ালিটি থেকে পালিয়ে বেড়ালে ওর মঙ্গল হবে ভেবেছিস? বৌদির হারমোনিয়াম আঁকড়ে মাঝেমধ্যে সে পাগলামো শুরু করে আর তুই সেই পাগলামোকে তোল্লাই দিচ্ছিস এই সব করে৷ 

- না রে মন্টু। শুনতে পাই তো। বিশ্বাস কর। অনুভব করতে পারি ওর সুরের স্পর্শ। আমার চামড়ায় এসে ঠেকে সে সুর। অরু ওর মায়ের হারমোনিয়াম আঁকড়ে গান করার ভান করেনা, সে গান গায়। গতকাল সন্ধ্যেয় সে অতুলপ্রসাদ ধরেছিল। চোখে জলে এসে গেছিল মন্টু। বিশ্বাস কর।

- দ্যাখ দাদা, অরু এখন বোবা।

- মন্টু। তুই এ'বার আয়।

- দাদা! 

- আয়। আর নয়। 

**

অরুর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন বিমলেন্দু। সাদা নীল চাদরে ঢাকা বিছানার ওপর বসে অরু চোখ বুজে গাইছে, হারমোনিয়ামটা ছুঁয়ে আছে শুধু। 
শব্দ নেই, আছে শুধু সুরের শিহরণ।  

"আহা রে, খোকার মা নেই"। মিনুর ওপর মাঝেমধ্যেই বড় রাগ হয়। বদ্ধ কালাদের দুনিয়ায় অরুকে ফেলে চলে গেল সে। 

ততক্ষণে অরু রবীন্দ্রনাথে এসেছে। 

"আমার সুরের রসিক নেয়ে-
তারে ভোলাব গান গেয়ে..."।

Wednesday, October 28, 2020

সুবিনয়বাবু আর মনু


- আরে। মনু না?

- মনু? 

- তুই মনুই তো? প্রেসিডেন্সি? বারুইপুর বুলেটসের সেন্টার ফরওয়ার্ড? ফুচকা চ্যাম্পিয়ন? 

- জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ছেলেবেলা থেকে ক্রনিক হাঁপানি, তাই ফুটবল জীবনে খেলিনি।  বারুইপুরের ছোটপিসি থাকে বটে তবে ও'দিকে  বড় একটা যাওয়া হয়না। আর ক্লাস সেভেন থেকে গ্যাস্ট্রিক আলসারে জেরবার, একবারে ম্যাক্সিমাম তিনটে ফুচকা খেতে পারি, আলু আর টক জল ছাড়া।

- তা'হলে তো মনুর সঙ্গে মিলছে না। কিন্তু চেহারায় কোথায় যেন একটা স্ট্রাইকিং ইয়ে আছে। 

- স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার হল,আপনকে দেখেও আমার ঠিক তেমনই একটা ইয়ে বোধ হয়েছিল। চেহারায় ঠিক কোথায় যেন..।

- আপনি শিওর আপনি মনু নন?

- সেন্ট পার্সেন্ট৷ মানিব্যাগে আধার কার্ড আছে৷ চাইলে দেখতে পারেন।  আমি সুবিনয় দত্ত৷। কিন্তু ব্যাপারটা খুব ইন্ট্রিগিং, এই আপনার চেহারা দেখেও আমার এমন এই ইয়ে হওয়াটা৷ চেনা চেনা যেন। যাক গে, ভেরি সরি ভায়া৷ আমি মনু নই। খুব আশা করেছিলেন নিশ্চয়ই..পুরনো চেনামুখের সঙ্গে দেখা হল ভেবে। 

- কী আর করা যাবে বলুন।

- তা আপনার নামটা তো জানা হল না।

- আমার নাম? মনু। 

- এক্সকিউজ মি?

- মনু।

- আপনিই মনু? 

- প্রেসিডেন্সি। বারুইপুর বুলেটস। ফুচকা চ্যাম্পিয়ন৷ 

- কিন্তু তবে যে এই..।

***

গড়িয়াহাটের মোড়ে হঠাৎ দেখা৷ আর সামান্য গোলমেলে কথাবার্তার পর ভদ্রলোক যেন স্রেফ উবে গেলেন৷ এই মিস্টরিয়াস মনুকে নিয়ে সুবিনয়বাবুর মনে এক বিশ্রী অস্বস্তি তৈরি হল। সে অস্বস্তি কাটাতে সুবিনয়বাবু গিয়ে দাঁড়ালেন  দাস কেবিনের সামনে। গায়ে পড়ে এমন ফাজিল আলাপ করার কোনও মানে হয়?

দোকানের ভিতর থেকে স্পেশ্যাল মোগলাইয়ে সুবাস নাকে আসতেই সুবিনয়বাবুর ব্রেনে লাগল হাইভোল্টেজ স্পার্ক। তাই তো! মনু তো অচেনা নয়৷ বছর কুড়ি আগে, কলেজে পড়ার সময় নিজের ডায়েরীতে একটা উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন। দেড়শো পাতা পর্যন্ত তরতর করে সে'উপন্যাস এগিয়েওছিল। কিন্তু আর পাঁচটা ছেলেমানুষি ঝোঁকের মত সে লেখাটাও অসম্পূর্ণই রয়ে গেছিল। সেই অসম্পূর্ণ উপন্যাসের নায়ক মানবেন্দ্র ওরফে মনু চেহারায় ও স্বভাবে সুবিনয়েরই মত। কিন্তু সুবিনয়ের দুর্বলতাগুলো মনুর মধ্যে আদৌ নেই৷ মনু যেমন স্মার্ট, তেমনি সাহসী, তেমনি রোম্যান্টিক আর তেমনি চাবুক তার স্বাস্থ্য। 

 নিশ্চয়ই কোনও ব্যাটা সে ডায়েরী হাতিয়ে সে লেখা পড়েছে। আর তারপর আজ এসে গায়ে পড়ে সুবিনয়বাবুর ওপর এমন একটা বিচ্ছিরি প্র‍্যাক্টিকাল জোক চাপিয়ে সরে পড়ল। একটা তেতো স্বাদ সুবিনয়বাবুর গোটা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। দাস কেবিনের মোগলাই সুবাসও তার মনের চনমন ফেরাতে পারল না। কিন্তু ট্রাঙ্কে রাখা পুরনো ডায়েরী খুলে পড়ল কে? সর্ষের মধ্যে এমন ঘোড়েল ভূত এলো কী করে? প্রথমেই সন্দেহটা গিয়ে পড়ল নিজের ফিচেল শ্যালকটির প্রতি৷ 

যা হোক, মিনিবাসের বদলে ট্যাক্সি ধরে সোজা বাড়ি ছুটলেন সুবিনয়বাবু। 

**

ট্রাঙ্কের তালা ভাঙতে হল। সেই সাতপুরনো বহুবছরের জং পড়া তালার চাবি অনেক আগেই হারিয়েছে। কাজেই ডায়েরীটা বেহাত হওয়ার কথা নয়। ডায়েরী খুলতেই সুবিনয়ের চক্ষু চড়কগাছ।  উপন্যাসের জন্য লেখা দেড়শো পাতা লেখা গায়েব৷ পাতা গায়েব নয়, শুধু লেখা গায়েব। অথচ প্রথম পাতায় নিজের নাম দেখে বুঝতে অসুবিধে হয়না এ ডায়েরী সে ডায়েরীই।

তার বদলে পড়ে রয়েছে বিটকেল দু'লাইন। নিজের জঘন্য হাতের লেখা নিয়ে সুবিনয়বাবুর লজ্জার সীমা নেই৷ কিন্তু এই দু'লাইন লেখা রয়েছে মুক্তোর মত হাতের লেখায়৷ 

"সরকারী চাকরী, সংসার, হাঁপানি আর গ্যাস্ট্রিকে সুবিনয় বন্দী থাকতে পারে। কিন্তু ট্রাঙ্কের তালায় বা ডায়েরীর পাতায় এ শর্মাকে আটকে রাখা যাবে না।

- ইতি মনু"।

Thursday, October 22, 2020

দ্য গ্র‍্যান্ড তুকতাক

- কী চাই?

- হুঁ?

- কী চাই? চাকরীতে টপাটপ প্রমোশন বাগানোর মাদুলি? শুগার কন্ট্রোলে রাখার তাবিজ? হাড়বজ্জাত মানুষজনের বদনজর এড়িয়ে চলার জন্য কবচ?

- কই, না তো।

- তা'হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা কেন?

- দ্যাখ বুড়ো..।

- আমার সঙ্গে যারাই দেখা করতে আসে তারা আমায় চমৎকারিবাবা বলে ডাকে। আপনি-আজ্ঞে করে নুয়ে পড়ে। 

- তাঁরা তো আর তোর বাপ নয় বুড়ো।

- উফ। আদত তন্ত্রসাধকের বাপ-ঠাকুরদা থাকতে নেই।

- প্রায় এক বছর হতে চলল বাড়ি ছেড়ে এইসব ফোরটুয়েন্টিগিরি শুরু করেছিস।  আর কতদিন!

- ফোরট্যুয়েন্টিগিরি?  আমি রেগে গেলে একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটে যাবে কিন্তু। 

- মানছি আমি একসময় তোর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছি৷ পারিবারিক ব্যবসায় ফাঁকি দিচ্ছিস দেখে মেজাজ খিঁচড়ে গেছিল, না হয় ভালোমন্দ চারটে কথা বলেই দিয়েছি। কিন্তু তাই বলে তুই তারাপীঠে এসে পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার ব্যবসা শুরু করলি রে বুড়ো? 

- আর একটাও আজেবাজে কথা শুনলে এমন বাণ মারব..।

- বাড়ি ফিরে চল বুড়ো। আমি না হয় মায়াদয়াহীন স্ক্র‍্যাপের দালাল। মায়ের কথা ভেবে অন্তত বাড়ি ফের।

- তন্ত্রসাধকের আবার বাড়ি। তন্ত্রসাধকের আবার মা।

- তুই না হয় বাড়িতে গিয়েই একটা এই হোকাসপোকাসের চেম্বার খুলে বসিস বুড়ো। আমি নিজের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেব। নীচের তলার একটা ঘরে সর্ষের তেলের গোডাউন করব ভাবছিলাম। সে'খানে বসেই না হয় তুই  মাদুলি বেচিস।

- সাধনাটাকে ধান্দাবাজি বলে হ্যাটা করাটা রীতিমত অন্যায়৷  শ্মশানের মড়াপোড়া হাওয়া গায়ে না ঠেকলে তন্ত্রসাধনা চলে না। আর তাছাড়া গেরস্থালির গুমোট পরিবেশে আর আমায় বাঁধা সম্ভব নয়৷ 

- সম্ভব নয়?

- কভি নহি।

- কোনও ভাবেই আর তোকে বাড়ি ফেরানো যাবে না?

- শ্মশানকালী প্রাইভেটলি স্বপ্নে এসে রিকুয়েস্ট করলেও নড়ছি না। 

- হ্যাঁ রে বুড়ো, কাল থেকে পুজো। পুজোয় বাড়ি ফিরবি না?

- হুঁ?

- পুজোয় বাড়ি ফিরবি না?

- পুজো? বাড়ি। পুজো। বাড়ি।

- কী হল বুড়ো?

- না মানে...যদিও তন্ত্রসাধনায় পুজো পুজো আদেখলামো থাকতে নেই..।

- কাল থেকে পুজো। বাড়ি ফিরবি না তুই?

- বাবা।  পুজো সত্যিই এসে গেল। তাই না?

- তাই তো। এসেই গেলো।

- আমি বাড়ি যাব বাবা। বাড়ি যাব।

- আলবাত যাবি। পুজোয় বাড়ি না গেলে চলে?

বুড়োকে বাড়ি ফেরানোর তুকতাকটি চমৎকারিবাবার বাপ দিব্যি জানতেন। বাড়ি ফেরার নিশির ডাক - "পুজো"।