Sunday, August 23, 2020

রবিবারের হিসেবকিতেব


সকাল।

লুচি বেগুনভাজা মুখে দিয়ে শ্যামল মিত্রের গান, 
আর পাশাপাশি কয়েক পাতা শীর্ষেন্দু, অদ্ভুতুড়ে সিরিজ। 
জলখাবার শেষে জিলিপি চিবুতে চিবুতে নারায়ণ দেবনাথ।
আকাশের সিচুয়েশন যাই থাক, আদত রোদ্দুর জেনারেট করতে হবে মনের মধ্যে। এবং সে রোদ্দুর হতে হবে 'ও মন কখন শুরু কখন যে শেষ' মার্কা সুপার-মিঠে। 

***

প্রি-দুপুর।

রান্না চলাকালীন স্টিলের বাটিতে দু'পিস মাংস এক পিস আলু নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা। তখন আবার কানের ইয়ারফোনে মান্নাবাবুর 'ও আমার মন যমুনার' সুর ফ্লো করবে। স্নানের আগে মনটাকে একটু মাটন-মান্না রোম্যান্সে ম্যারিনেট না করলেই নয়।

***

দুপুর।

খেতে বসে তাড়া নেই। খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার হুড়োহুড়ি নেই। আড্ডা আছে, এঁটো হাত শুকিয়ে যাওয়া আছে। নিজের রান্নার অ্যানালিসিস আর অন্যের রান্নার প্রশংসা আছে। আর আছে লাঞ্চ সেরে খাটে ফ্ল্যাট হয়ে হেমন্তবাবুর হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া। প্রো-টিপঃ ব্যাকগ্রাউন্ডে লো ভল্যুমে জীবনপুরের পথিক আর চোখের সামনে ক্যালভিন অ্যান্ড হবসের কমিক্স বই দিব্যি খাপেখাপ মিলে যায়। 

ভাতঘুম শব্দটায় তুলসীবাবু রয়েছেন,সিয়েস্টায় রয়েছেন ছবি বিশ্বাস। গান আর কমিক্সের মিশেলে কোনও রবিবার হয়ত চোখ ভার করে নেমে আসবেন তুলসীবাবু। আবার অন্য কোনও রবিবার দুপুরে ঘুমের আয়েশে থাকবেন ছবি বিশ্বাস। 

***

সন্ধ্যে।

রোব্বার সন্ধ্যেয় ছাতে মাদুর পেতে বসতে পারায় শুনেছি গঙ্গাস্নানের পুণ্য। মুড়িমাখা আর লেবু-চায়ের কম্বিনেশনকে খোলা আকাশের নীচে না আনতে পারলে নাকি সমস্ত মাটি।

সোমবারের ব্যস্ততা শুরুর আগে, এমন ছাতসন্ধ্যে বেশ টনিকের কাজ করে। পাশে আধো-মনখারাপ আর স্নেহ মিলিয়েমিশিয়ে কিশোরবাবু গাইবেন পাখিদের না ফেরার গান।

***

রাত।

ইলিশের রোয়াব যে থাকতেই হবে তার কোনও মানে নেই। ট্যাংরার গরম গরম ঝোলে বা মৌরলার ঝালেও এস্পারওস্পার সম্ভব। বিয়ের আগের প্রেম জমে নন্দন চত্বরে বা মিলেনিয়াম পার্কে; এ কথা নেহাৎ ফেলনা নয়৷ তবে বিয়ের পরে প্রেম খোলতাই হয় পোস্ট-ডিনার একসঙ্গে বাসন মাজায়। এর হাতে কড়াই, ওর হাতে সসপ্যান; কিচেন সিঙ্কের সামনে গা-ঘেঁষাঘেঁষি গল্পগুজব। 

হাতে ভিম-ভারের ফেনা, মুখে হাসি, সস্তা ঠাট্টা-তামাশা আর ব্লুটুথ স্পীকারে সাতপুরনো যত হিন্দি গান; এর সামনে উত্তমবাবুর মোটরবাইক আর সুচিত্রাদেবীর 'তুমি বলো' ফেল পড়তে বাধ্য৷

Saturday, August 22, 2020

আইডিয়ালিস্ট


- ঘুষ?

- অফারটাকে আপনি ঘুষ হিসেবে কেন দেখছেন মিস্টার সান্যাল। আমাদের জন্য আপনার যে'টুকু ইনকনভিনিয়েন্স হবে, এ'টা তার জন্য সামান্য একটা কম্পেনসেশন।

- দেখুন মিস্টার তালুকদার। আমি নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন। আর নিজের কাজটাকে ইনকনভিনিয়েন্স বলে আমি মোটেও মনে করিনা। আপনার ফার্মের ফাইলটা আমি দেখেছি৷ ইট উইল বি প্রসেসড ইন ডিউ কোর্স।

- ডিউ কোর্সে তো হবেই৷

- অফ কোর্স। তাছাড়া আপনাদের প্রপোজাল আমি নিজে রিভিউ করেছি৷ ইউ হ্যাভ প্রেসেন্টেড আ ভেরি কমপেলিং কেস। বড়সাহেবদের মনে ধরবে নিশ্চয়ই। কাজেই এই বিশেষ কম্পেনসেশনের চিন্তাটা বাদ দিতে পারেন।

-  মিস্টার সান্যাল৷ বড়সাহেবরা তো স্রেফ সই করবেন। ডিসিশন মেকিং তো আপনার লেভেলেই..।

- বড়সাহেবরা ভেন্ডর সিলেকশনের মত জরুরি প্রপোজালে অন্ধের মত সই করবেন, আপনার এমন ধারণা কিন্তু ভুল।

- আমরা ছাপোষা ভেন্ডর। কিন্তু আপনার গুরুত্বটা বুঝি মিস্টার সান্যাল৷ আমাদের প্রপোজালটা যে ইনফিরিয়র কোয়ালিটির নয়, সে'টা আপনি জানেন। আপনি স্পেশ্যালি রেকমেন্ড করে আমাদের ফাইলটা এগিয়ে দিলে সার্ভিসের দিক থেকে আপনাদের ফার্মের যে কোনও ক্ষতি হবে না সে আশ্বাস আমি দিতে পারি।

- আপনাদের প্রপোজাল নিশ্চয়ই ইনফিরিয়র কোয়ালিটির নয়৷ কিন্তু আমার দায়িত্ব শ্রেষ্ঠ প্রপোজালটা রেকমেন্ড করার।

- সে কাজটা সহজ করে দিতেই আমাদের এই সামান্য অফার।

- ঘুষ।

- শব্দটা কানে বড্ড ঠেকে মিস্টার সান্যাল৷ ইউ আর মাচ বিগার দ্যান সাচ চীপ ওয়ার্ডস।

- মাফ করবেন তালুকদারবাবু। এথিকস-এর ব্যাপারে আমি একটু একগুঁয়ে।

- আমি আপনাকে জোর করতে পারিনা। তবে, ব্যাপারটা যদি রিকনসিডার করতে পারেন..প্লীজ গিভ মি আ কল। 

**

- এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি, ফোন ধরছ না কেন?

- সরি মিলি। ওই তালুকদারকে মনে আছে? 

- ওই সেই ফর্সা টাকমাথা? ক্লাবে দেখা হয়েছিল গত মাসে? তোমাদের অফিসের সেই সাপ্লায়ার? ভারী গায়ে পড়া লোক কিন্তু। 

- অফিসের বড়বাবুদের গায়ে পড়ে ইম্প্রেস না করলে চলবে কেন। সে এসে গল্প জুড়েছিল, তাই আর ফোনটা ধরিনি। ঘুষ দিতে এসেছিল।

- সে কী! অফিসে এসে সামনাসামনি ঘুষ অফার করলে? কী দুঃসাহস। তা, তুমি কী বললে?

- এরা গভীর জলের মাছ। এদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়াটা বিপদজনক।  তবে পত্রপাঠ বিদেয় করেছি।

- আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ। 

- আইডিয়ালিস্ট ছেলেকে বিয়ে করেছ শুনে তোমার প্রমোটার বাবা একসময় বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন কিন্তু।

- আইডিয়ালিজম আর সাকসেসকে যে দিব্যি পাশাপাশি বসানো চলে, সে'টা তুমি প্রমাণ করে ছেড়েছ। বাবা তো আজকাল সর্বক্ষণ তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷  

- আজকের ডিনারটা ভুলে যাওনি তো?

- না রে বাবা না। সে'টা জিজ্ঞেস করতেই তো ফোন করেছিলাম। কখন পিক করছ? 

**

- হ্যালো হালদারবাবু।

- গুড ইভনিং সান্যাল সাহেব। 

- আমার জিনিসটা?

- ডায়মন্ড সেটটা আজ সকালে আমি নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছি। ওই, ম্যাডামের জন্য আপনি যে'টা পছন্দ করে দিয়েছিলেন। তা আপনারা যেখানে ডিনার করতে যাবেন, সে'খানেই ডাইরেক্টলি পাঠিয়ে দেব না হয়? 

- এই বুদ্ধি নিয়ে ব্যবসা চালান কী করে? বউয়ের সামনে এসে আপনার লোক সেই সেট হাতে ধরিয়ে দেবে? আমার মানইজ্জত ফ্র‍্যাকচার না করালেই নয়, তাই না?

- ওহ হো। সরি সান্যাল সাহেব। সরি। আমি বরং ও'টা এখুনি আপনার অফিসেই পাঠিয়ে দিচ্ছি৷ 

- আধঘণ্টার মধ্যে যেন চলে আসে। আর একটু ডিসক্রিটলি..।

- শ্যিওর। ইয়ে, সান্যালসাহেব৷ আমাদের ফাইলটা কি এগোল?

- এগোবে৷ তবে শুধু এই ডায়মন্ড সেটে চিঁড়ে ভিজবেনা হালদারবাবু।

- কিন্তু আমাদের তো তেমনই কথা হয়েছিল..।

- তালুকদার এসেছিল আজ অফিসে৷ ওদের ফার্মও কম্পিট করছে৷ 

- ওহ।

- কোয়ালিটির দিক থেকে, ওদের ফাইলটা কিন্তু নেহাৎ ফেলনা নয়।

- সান্যালসাহেব। তালুকদার যাই অফার করেছে আমি সে'টার ওপরে যাবই। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। শুধু আমাদের ফাইলটা যেন...।

- আধঘণ্টার মধ্যে যেন জিনিসটা আমার হাতে চলে আসে। তারপর ওয়াইফকে পিক করে ডিনারে যাওয়া। দেরী হলেই মুশকিল৷ আজকাল ট্র‍্যাফিকের যা অবস্থা..।

পুজো আসছে


- পুজো আসছে বিপিনদা। পুজো আসছে।

- পুজোর পাঁচটা দিন বাদ দিলে গোটা বছরই তো বাঙালির "পুজো আসছে পুজো আসছে" করে কেটে যায়।

- ধ্যাত। আপনি বড় রুখাসুখা। ওই ফাইলবোঝাই টেবিল ছেড়ে একটু বারান্দায় এসে দেখুন না। আকাশের দিকে তাকালেই মনে হবে এই হল রিয়েল পুজোবার্ষিকী। 

- পুজো আসছে৷ করোনা থাকছে।

- তা বটে। তবু এমন আকাশ দেখলে..।

- এ'বছর জুমে প্যান্ডেল হপ করতে হবে।

- না। প্যান্ডেল হপার আমি নই।

- তবে কী? রেস্টুরেন্টে ঘণ্টা পাঁচেক লাইন দিয়ে পুজোসস্পেশাল বাসি বিরিয়ানি? 

- পুজোয় রেস্টুরেন্টের খপ্পরে পড়িনা। বড়জোর স্টলের রোল। পুজোর আদত হইহইরইরই তো নিজেদের হেঁসেলে।

- করোনাই তো, এমন আর কী। পুজোর পাঁচদিনই বরং ভীড় ঠেলে মাছ মাংস মুর্গি কিনুন। গিলুন যতখুশি। কী আর হবে, প্রাণটাই না হয় যাবে। এ বাজারে প্রাণ ধরে রাখাও বড় জ্বালা।

- না না। কোভিডিয়ট আমি নই। তাছাড়া জানেনই তো। মাইনেতেও কোপ পড়েছে৷ এ'বেলা ও'বেলা চর্ব্যচোষ্য হয়ত ম্যানেজ হবে না।

- কিছুই যখন হবে না, তখন পুজো আসছে পুজো আসছে করে লাফানোর কী আছে?

- যদ্দিন মা বেঁচে ছিল, পুজোয় প্রতিবার বাড়ি ফিরতাম জানেন। প্রতিবার। অগস্ট পড়লেই ফেরার টিকিট কাটতাম। মা নেই, পৈতৃক বাড়িও বেচে সাফ। কাজেই সেই ফেরাটুকুও বাদ গেছে বেশ কয়েক বছর হল। কিন্তু এই হাই কোয়ালিটির পুজো-আসছে-মার্কা আকাশ দেখলে এখনও মনের মধ্যে "এ'বার বাড়ি ফেরা" মার্কা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মাইরি বিপিনদা। জানি পুজোর দেরী আছে তবু..। আর এই প্যান্ডেমিকের বাজারে এই গন্ধটা যেন আরও জরুরী। বেশ বুকে বল পাচ্ছি কিন্তু।

- কবিতা লিখুন গুপ্তবাবু।  কবিতা৷ অফিসের খাজা সব ফাইলটাইল ঘেঁটে কী হবে। রবিনসন ইলেক্ট্রিকালসের ফাইলটা বড়সাহেব চাইলে বলে দেব, পুজো আসছে তো। গুপ্তবাবু ফাইল ক্লিয়ার না করে কবিতা লিখছিলেন। 

- কবিতার খোঁটা দিলেন বিপিনদা? তা দিন, ও আমার গায়ে লাগে না। আপনি যদি ভেবে থাকেন যে কবিতা শুধু খাতায় কলমে লেখা হয় তা'হলে সে ভাবনা পাল্টে ফেলুন। এই করোনায় রগড়ানো সময়ে পুজো-আসছে-মার্কা অকারণ ফুর্তি ইজ পোয়েট্রি ইনডীড। আর ক্রসওয়ার্ড পাজলে মুখ গুঁজে সময় নষ্ট না করলে আপনি ঠিক টের পেতেন যে রবিনসনের ফাইলটা ক্লীয়ার করে আধঘণ্টা আগেই আপনার টেবিলে রেখে এসেছি।

Thursday, August 20, 2020

ননীগোপালের খেল


১।

ল্যাম্পপোস্টে সাঁটা পোস্টারটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন ভবদুলাল মিত্র। ভরদুপুরে এমন দুম করে শশব্যস্ত ফুটপাথের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ায় বিস্তর ধাক্কাধাক্কি সহ্য করতে হচ্ছিল তাকে। কিন্তু পোস্টারের ওপর থেকে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিলেন না তিনি। পোস্টারে একজন জাদুকরের মুখের স্কেচ৷ মুখটা গোলগাল, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, সরু শৌখিন গোঁফ আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি৷ মাথায় একটা প্রকাণ্ড পাগড়ি। ওই সাদামাটা ময়লা পোস্টারটা যেন উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে সেই জাদুকরের আলো আলো হাসিতে। 

আশেপাশের একটা মানুষও সে পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে না। অথচ সে জাদুকরের মায়াময় হাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খানিকটা যেন বিহ্বল বোধ করছিলেন ভবদুলালবাবু। সামান্য মাথা ঝিমঝিমও শুরু হয়েছিল৷ হলুদ কাগজের ওপর কালো কালিতে ছাপানো সে পোস্টারটি অতি সাধারণ,  চোখে না পড়ার মতই। ঘোরটা কিছুক্ষণ কাটলে ভবদুলালবাবু ল্যাম্পপোস্টটার কাছে এগিয়ে গেলেন পোস্টারের লেখাটা পড়তে।

"জাদুসম্রাট ননীগোপাল হালদারের ইন্দ্রজাল"।
আগামী শো; বাইশে অগস্ট, ১৯৯২"।

১৯৯২। ১৯৯২। ১৯৯২। 

উনিশশো চুরানব্বই সালের ল্যাম্পপোস্টে এই পোস্টার কীভাবে এলো তা কিছুতেই ঠাহর করতে পারছিলেন না ভবদুলালবাবু। তাঁর চোখ ফের আটকা পড়লো জাদুকর ননীগোপালের হাসি হাসি মুখটায়৷ মুখটা তাঁর চেনা। ভবদুলালবাবুর পা'দুটো যেন অবশ হয়ে পড়েছিল। চারদিকে হঠাৎ একটা বিশ্রী হইহল্লা শুরু হল, কিন্তু সেই বিকট শব্দসমূহ মোহাচ্ছন্ন ভবদুলালবাবুর কানে আদৌ পৌঁছল না।

জাদুকর ননীগোপাল আর এই পোস্টার; সমস্তটাই ভবদুলালবাবুর চেনা। বড্ড চেনা।

২।

- তাই বলে এই সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য আমার চাকরী গেল?

- ইয়েস। ফিনান্সে বলে দিয়েছি৷ নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে এখুনি বিদেয় হও।

- আমার অপরাধ আমি শখের ম্যাজিশিয়ান?

- মিত্র কেমিক্যালসের একজন সিনিয়র এক্সেকিউটিভ পাড়ায় পাড়ায় সস্তা ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াবে আর এমডি হয়ে সে'টা আমি বরদাস্ত করব ভেবেছ?

- কিন্তু অফিসের কাজে আমায় কোনওদিনও ফাঁকি দিতে দেখেছেন ভবদুলালবাবু?

- শোনো অরিন্দম, তুমি একটা দায়িত্ববান পদে ছিলে৷ অনেক আশা নিয়ে এ বছর আমি তোমায় প্রমোটও করেছিলাম, সঙ্গে মোটাটাকার ইনক্রিমেন্ট। হাইপ্রোফাইল ক্লায়েন্টদের সঙ্গে তোমার ডিল করার কথা৷ এ'দিকে গত রবিবার ভবানীপুরের মনোহরলাল সিঙ্ঘানিয়া তোমায় দেখেছে পাড়ার সস্তা অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখাতে। তাও আবার জাদুসম্রাট ননীগোপাল নামে। সিঙ্ঘানিয়ার আর তোমায় সিরয়াসলি নেবে ভেবেছ? তোমার পাশাপাশি মিত্র কেমিক্যালসের রেপুটেশনও গোল্লায় যাবে। যাক গে। নাউ লীভ।

- আমার এই সামান্য শখের জন্য কোম্পানির সম্মানহানি ঘটবে ভবদুলালবাবু?

- ঘটেছে। সিঙ্ঘানিয়া বলেছে যে কোম্পানির সিনিয়র এক্সেকিউটিভ এমন ভাঁড়ের মত রঙ্গ-তামাশা করে বেড়ায়, সে কোম্পানির সঙ্গে সে কোনও ডীল করবে না৷ তুমি স্টেজে ডেকে মিসেস সিঙ্ঘানিয়ার কান থেকে কেউটে সাপ বের করেছ? ছিঃ! 

- কাজটা আপনি ঠিক করলেন না ভবদুলালবাবু। 

- ইউ স্কাউন্ড্রেল৷ তুমি আমায় থ্রেট দিচ্ছ?

- অরিন্দম দত্তের কলজের জোর নেই আপনাকে ধমক দেওয়ার। তবে জাদুসম্রাট ননীগোপালের আছে৷ 

- গেট আউট। আই সেড গেট আউট। নয়ত দারোয়ান ডেকে তোমায় গলাধাক্কা দেব..।

- যাচ্ছি। তবে এই পোস্টারটা রেখে গেলাম আপনার টেবিলে। দু'বছর বাইশে অগস্ট আমার একটা শো আছে। তদ্দিনে নিশ্চয়ই আপনার রাগ গলে জল হয়ে যাবে। আসতেই হবে কিন্তু স্যার। আজ আমি আসি।

অরিন্দম বেরিয়ে গেলে পোস্টারটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন ভবদুলাল৷  হলুদ কাগজের ওপর কালো কালি দিয়ে ছাপা সস্তা পোস্টারটা কেমন যেন টেনে ধরল তাঁকে। পোস্টারে আঁকা অরিন্দমের মুখ, অবশ্যই জাদুসম্রাট ননীগোপালের সাজে৷ হাড় জ্বালানো রাগ নিমেষে স্তিমিত হয়ে ভবদুলালবাবুকে বিহ্বল করে তুলল। মাথাটা যেম ঝিমঝিম করে উঠল৷ টেবিলে রাখা পোস্টার ভেদ করে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন একটা ব্যাস্ত ফুটপাথ। সে'খানে দিকভ্রান্ত অবস্থায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে তাঁকে চিনতে ভবদুলালবাবুর কোনও অসুবিধে হলনা।

অজ্ঞান হয়ে অফিসের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার আগে ভবদুলালবাবু স্পষ্ট দেখতে পেলেন যে সেই ফুটপাথে দাঁড়ানো ভবদুলালের মাথার ওপর সপাটে এসে পড়ল হঠাৎ ভেঙে পড়া একটা ল্যাম্পপোস্ট। 

৩।

তেইশে অগস্ট উনিশশো বিরানব্বুইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকার তিন নম্বর পাতাটা দেখার জন্য কতদিন মুখিয়ে ছিল অরিন্দম। 

গতকাল ভরদুপুরে উত্তর কলকাতার রাস্তায় একটি ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে পড়ে শহরের শিল্পপতি  ভবদুলাল মিত্রের মাথায়। 

স্পটডেড।

"গিলি গিলি গে" বলে হেসে ফেলে অরিন্দম। দু'বছর খেটে এ ম্যাজিক তাকে বুনতে হয়েছে। ট্রেন বা তাজমহল গায়েব তো সে তুলনায় ছেলেখেলা।
 
আর যাই হোক, আদত জাদুকরের শ্রেষ্ঠ 'আইটেম'গুলোকে কিছুতেই জনসমক্ষে আনা চলেনা।

Wednesday, August 19, 2020

কলকাতা ও পাহাড়


- ফুলু রে।

- নভেলের গুরুতর জায়গায় রয়েছি। ডু নট ডিস্টার্ব। 

- তাই বলে বন্ধুর হাহাকারটা অনুভব করবিনা?

- বোচা, তুই আমার রুমমেট৷ এই মেস ছাড়া আমাদের আর কোনও যোগসূত্র নেই। যে মানুষ গল্পের বই পড়ার কনসেন্ট্রেশনে ব্যাঘাত ঘটায়, সে আর যাই হোক বন্ধু নয়।

- ও তোর মনের কথা নয় ফুলু৷ শোন না।

- উফ। কী হয়েছে?

- কদ্দিন ঘুরতে যাই না রে।

- প্রায়ই তো দেখি ঘুরতে বেরোচ্ছিস। ইলিয়ট পার্ক, মিলেনিয়াম পার্ক..।

- ধুর ধুর। সে'সব নয়৷ কদ্দিন পাহাড়ে যাইনা।

- ঘুরে এলেই পারিস।

- ছুটি পাচ্ছি কই? আর যা রেজাল্ট করেছি, ছুটি পেলেও বাবা ঘুরতে যাওয়ার টাকা দেবে ভেবেছিস? ধুস৷ কলকাতায় বসে বসে মনটন এক্কেবারে হেচড়ে গেছে। পাহাড়ের একটু হাওয়া যদি গায়ে লাগাতে পারতাম রে৷ মনমেজাজ চনমনে হয়ে উঠত।

- পাহাড়ের হাওয়া গায়ে লাগানোর জন্য পাহাড়ে যাওয়ার দরকারটা কী?

- হুম?

- তোর মত ট্র‍্যাভেলারের একটাই অসুবিধে৷ ট্রেনে-বাসে ধাক্কাধাক্কি,  ব্যাগ-সুটকেসের ওয়েটলিফটিং আর ট্র‍্যাভেল এজেন্টের ধাতানি  ছাড়া তোরা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাটুকু স্পর্শ করতে পারিসনা।

- ট্রেনে বাস ব্যাগ সুটকেস ছাড়া পাহাড়ে ঘুরতে যাব?

- এক্সপ্লোর করার শর্টকাটগুলো জানলে স্কটসাহেবকে অমন ফাঁপরে পড়তে হত না।

- শর্টকাট? পাহাড়ে যাওয়ার?

- কাল প্রেম করতে রবীন্দ্রসদন যাবি বলছিলিস না? ফেরার পথে দু'বাক্স মোমো নিয়ে ফিরিস। আর অল্প রাম। তারপর মেসের ছাতে গিয়ে মাদুর পেতে গা এলিয়ে বসিস। কেমন? ল্যাপটপটা নিয়ে যাস। মিউট করে ইউটউবে হিমালয়ের কোনও হাইডেফিনিশন ভিডিও চালিয়ে দিস। পাশাপাশি কানে ইয়ারফোন গুঁজে কোমলগান্ধারের আকাশভরা শুনতে থাক। দু'বাক্স মোমো খেতে খেতে ওই গানটা লূপে শুনে যা। মোমো শেষ হলে গান পাল্টে অঞ্জন দত্তর দার্জিলিং প্লেলিস্ট চালিয়ে দে। আর তার সঙ্গে দু'পেগ রাম। পলিউশন বোঝাই কলকাতার বাতাসের অ-পাহাড় ব্যাপারটা শুধু অঞ্জনে কাটবে না, সামান্য ইনটক্সিকেশন ইজ নেসেসারি৷ ব্যাস, তারপর দেখিস তোর চারপাশ থেকে কলকাতার মেসের ছাত উবে গিয়ে পড়ে রইবে পাহাড়। স্মুদ অ্যান্ড ইজি৷ তোর পাহাড়ে যাওয়াও হল, আবার তোর বাবার টাকাও বাঁচল খানিকটা। টোটাল উইন উইন।

- ফুলু৷ তুই গল্পের বই পড়। আমি ঘুমোই৷ আর আমি তোকে ডিস্টার্ব করব না।