Wednesday, April 29, 2020

পেন্টাগনের চোখে


- আরে! এ'টা কী?

- একটা সাধারণ রিমোট চিনতে অসুবিধে হচ্ছে হে?

- না মানে, আপনার ঘরে তো টিভি বা রিমোটচালিত কিছুই নজরে পড়ছে না..।

- রিমোট বলতেই টিভি মনে পড়ে। এই না হলে নাইনটিজ কিড। নাহ্, তোমাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া মানে চানাচুর জলে ভিজিয়ে খাওয়া। 

- বলুন না, কীসের রিমোট এ'টা?

- ও'টা দিয়ে আমি সেল্ফি তুলি।

- সেল্ফি? কিন্তু আপনার মোবাইল...।

- আমি মোবাইলে সেল্ফি তুলব? আমি? হাসালে। 

- তবে? তা'হলে এই রিমোট দিয়ে..?

- ওই রিমোট দিয়ে আমি ড্রোন ওড়াচ্ছি। সে ড্রোন গোটা দুনিয়া অবজার্ভ করে চলেছে আর আমায় খবর পাঠিয়ে চলেছে। ঘোরাঘুরির বয়স তো আর নেই, সে ড্রোনের দেওয়া খবরাখবরের ওপর নির্ভর করেই বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বাতলে দিতে হয় আজকাল। তা সেই খবর দেওয়ার কাজটা সে ড্রোন বাবাজী বেশির ভাগ সময় আড়াল থেকেই করে। আর মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মোলায়েম অ্যাঙ্গেল থেকে আমার ছবি তুলে  আমায় পাঠাচ্ছে। আমার ছবি তোলার সময় অবশ্য সে ড্রোনকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। 

- কিন্তু মেসের কেউ তো সে ড্রোন..।

- দেখেনি। জানি। তোমরা দেখতে পাওনি, সে'টাই তো স্বাভাবিক। ঘনশ্যাম দাসের ড্রোন তো আর ছেলেমানুষের ঘুড়ি নয় যে মেসের কচিছেলেরা তা দেখে হাহুতাশ করবে আর পদ্য লিখবে৷ সে ড্রোন তোমাদের চোখে পড়ার কথাও নয়৷ তবে পেন্টাগনের চোখে পড়েছে..এই আর কী।

গুরু আর হিমালয়

- পটা। অ্যাই পটা। আরে অ্যাই পটা!

- গুরু, অত চেঁচিও না। যোগব্যায়ামের ফোকাস নষ্ট হচ্ছে।

- নেকুচন্দর খাসনবীশ, যোগব্যায়ামের ফোকাস নষ্ট। বলি মান্থ এন্ডের রেভিনিউ স্টেটমেন্ট কই।

- কী হবে ও'সব দিয়ে বলো গুরু৷ তার চেয়ে বরং চলো; স্টকের আমতেল দিয়ে কষে মুড়ি মাখি। দু'জনে মিলে চিবুতে চিবুতে গপ্পগুজব করব, চারটে ইলিশ শ্যামল মিত্তিরের গান গাইব; ব্যাস, আজকের সন্ধ্যেটা আলগোছে কেটে যাবে।

- তোকে পিটিয়ে তক্তা করে দিতে পারলে তবে আমার শান্তি হয়। মাসের শেষ, ব্যবসার হিসেবকিতেব না করে হারমোনিয়াম বাজাব? মা লক্ষ্মী জুতোপেটা করবে যে।

- লকডাউন চলছে গুরু। খামোখা চাপ নিতে যেও না, এ করোনার বাজারে মা লক্ষ্মীও স্যাটাস্যাট নেমে আসতে পারবেন না৷ তা বলছিলাম, মুড়িতে কিন্তু অল্প কাঁচালঙ্কা কুচি না দিলে আমার চলবে না।

- শাটাপ পটা। শাটাপ। আমরা এ'দিকে মুড়িমাখা গিলি আর ও'দিকে দয়ালগুণ্ডার সিন্ডিকেট আমার মার্কেট ক্যাপচার করে নিক আর কী।

- আরে ধ্যাত্তেরি। কীসের মার্কেট ক্যাপচার করবে? কিডন্যাপিংয়ের বাজারে ঘুঘু চড়ছে। কেউ ছাই বাড়ি থেকেই বেরোচ্ছে না তায় তাদের কিডন্যাপিং।  আবার ছেলেরাও কিডন্যাপফিডন্যাপ করতে চাইছে না, কোন মাল কী বিষ ভাইরাস নিয়ে ঘুরছে তা বোঝা মুশকিল। বাজারে লোকজন মাঝেমধ্যে জমছে বটে তবে এই এক মিটারের তফাতে দাঁড়িয়ে পকেটকাটা যে অসম্ভব গুরু; কাজেই সেখান থেকেও রেভিনিউ কাঁচকলা। আর অন্যদিকে পলিটিক্সের ঝিঙ্কু দাদারা আর কালাটাকা ওড়ানো বিজনেসম্যান জ্যেঠুরাও সবাই নেতিয়ে পড়েছে; কাজেই ক্যালানির অর্ডারও তেমন আসছে না। মার্কেটফার্কেটই কিছু নেই; তা'তে কীসের কম্পিটিশন আর কীসের মান্থ এন্ড স্টেটমেন্ট।

- অমন কড়া কথা মুখের ওপর বলতে নেই পটা।

- কড়া। কিন্তু খাঁটি গুরু।

- টাকাপয়সা নিয়ে ভাবিনা রে পটা। টাকাপয়সা নিয়ে ভাবিনা। আমি নির্লোভ নির্লিপ্ত মানুষ। আজ বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছিস; তোফা তোফা করে খাব। কাল সাবু মেখে খাওয়াবি, তাও সোনামুখ করে খেয়ে নেব। পরশু বলবি লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে হিমালয়ের দিকে চলে যেতে, হাসিমুখে কেটে পড়ব।  চিন্তা শুধু একটাই; প্র‍্যাক্টিসের অভাবে এই হাইক্লাস স্কিলগুলো যেন হারিয়ে না যায়।

- সে' চিন্তা অবিশ্যি নেহাৎ ফেলনা নয় গুরু। হাঁটুর হাড় কীরকম গুঁতো মেরে ভাঙলে মানুষ সহজে সারেন্ডার করে সম্পত্তির কাগজে সই করে দেবে, ব্লেড কোন অ্যাঙ্গেলে চালালে হিপপকেটের মানিব্যাগ টুসটুসে আমের মত খসে পড়বে; এ'সব স্কিল তো আর ঘরে বসে পালিশ করা যায় না। 

- আমাদের কী হবে বল তো পটা?

- ছাতুর যা স্টক আছে, আরও মাস দেড়েক চলে যাবে। তারপর হিমালয়টিমালয় নিয়ে ভাবব'খন৷ 

- আমাদের ব্যাঙ্কে কত আছে রে পটা?

- ব্যাঙ্কে? হোয়াইট মানি? সাতশো চুয়ান্ন টাকা। গতমাসেই পাসবই আপডেট করিয়ে এনেছিলাম। 

- আর ওই সোফার নীচে আমাদের ওই গোপন গর্তে লুকোনো টাকা?

- ক্যাপিটাল? বত্রিশ লাখ বাহাত্তর হাজার তিনশো উনিশ টাকা। পরশুই গুনলাম তো। তা, তোমার মতলবটা কী বলো তো গুরু?

- টাকাটা থলেতে ভরে নিয়ে আয়।

- সে কী! 

- যা বলছি তাই কর পটা। ক্যুইক।

- কিন্তু করবেটা কী?

- কারা যেন কমিউনিটি কিচেন খুলেছে। শহরজুড়ে, অনেকগুলো। কত মানুষের স্টকে নাকি আমতেল নেই, মুড়ি নেই, এমন কি ছাতুও ফুরিয়েছে। মধুমাস্টারই বলল আমায়। ওই বত্রিশ লাখ বাহাত্তর হাজার তিনশো উনিশ ওদের হাতে তুলে দিলেই বরং...।

- তুমি খেপেছ গুরু? ওই মধুমাস্টার এক খ্যাপা আর তার পাল্লায় পড়ে তোমারও মাথাটা গেছে। শুরুতেই বুঝেছিলাম তোমার কোনও মতলব আছে। শুনে রাখো, ও টাকা প্রাণ থাকতে আমি তোমায় নিতে দেব না।

- শাটাপ পটা। তোর এত বড় সাহস? গুরুর মুখে মুখে তর্ক? তুই না আমার চ্যালা?

- দলে নেওয়ার সময় তুমি ব্লেড দিয়ে আঙুলের ডগা চিরে রক্ত নিয়ে শপথ করিয়েছিলে গুরু। কিডন্যাপিং, পকেটমারি আর গুণ্ডমি ছাড়া আমাদের কোনও ধর্ম নেই, ট্রান্স্যাকশনও নেই। থাকতে পারে না। তোমার লজ্জা হওয়া উচিৎ গুরু। ছিঃ ছিঃ, মধু মাস্টারের পাল্লায় পড়ে শেষে কিনা তুমি দানধ্যান করবে? এই তোমার এথিক্স গুরু? চ্যারিটি? ধর্মে সইবে? ছিঃ, তোমার সমস্ত শিক্ষা মিথ্যে। 

- আহ, কতবার বলব পটা। অমন কড়া কথা মুখের ওপর বলতে নেই। নেই। 

- কড়া কিন্তু খাঁটি।

- মধুমাস্টার বারবার বলছিল রে, মানুষের বড় কষ্ট৷ ওই টাকাগুলো যদি মাস্টারের হাতে তুলে দেওয়া যেত তা'হলে..।

- তার আগে তুমি আমার মরা মুখ দেখবে গুরু৷ বিজনেসের টাকা বিজেনেসেই লস খেয়ে গোল্লায় যাক, তা'তে ক্ষতি নেই। কিন্তু এ টাকা দানধ্যানের জন্য বিলিয়ে দিলে আমি গলায় দড়ি দেব। 

- গলায় দড়ি? ভর সন্ধ্যেবেলা অমন কথা তুই বলতে পারলি পটা? ছেলেবেলা তোকে কোলেপিঠে মানুষ করেছি। নিজের হাতে পকেটকাটা শিখিয়েছি, নাকে ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল চেপে ধরা শিখিয়েছি, বন্দুক বাগিয়ে চমকানো প্র‍্যাক্টিস করিয়েছি; আর আমায় শেষে কিনা তোর মরা মুখ দেখতে হবে! চুলোয় যাক মধুমাস্টার। দিস না তুই ওই টাকা। তার চেয়ে বরং মুড়িই মাখ। আর আন দেখি হারমোনিয়াম, আসর বসাই।

- যাক। বাঁচালে। তুমিই তো বলো গুরু, সবার আগে নিয়ম। নিয়ম ফেল করলেই দল ডুববে। গুরু হয়ে তুমি নিজেই নিয়ম ভাঙবে তা আমি কী করে হতে দিই বলো। যাকগে, তুমি মিনিটখানেক বসো। আচমকা মনে পড়ল মুড়ির টিন ফাঁকা পড়ে আছে। আমি হৃদয়দার দোকান থেকে দু'প্যাকেট মুড়ি নিয়ে আসি৷ চিন্তা নেই, মুখে মাস্ক পরে বেরোব, করোনাকাকার নজর আমার ওপর পড়বে না। 


***

- কী বলছ তুমি মধু মাস্টার! তুমি পটাকে দেখেছ?

- এইত্তো, খানিক আগেই। বিশুর চায়ের দোকানের পিছন দিকটায়। পটাই তো সেধে এসে কথা বললে তো। আর ওই তো আমায় তোমার কাছে পাঠালে। 

- দ্যাখো কাণ্ড মাস্টার। দ্যাখো কাণ্ড। এদিকে আমি ভয়ে কাঠ। ভর সন্ধ্যেবেলা বেরোল মুড়ি আনতে আর তারপর টানা তিনদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই। এক্কেরে গায়েব। এ'দিকে চিন্তায় আমি মরি আর কী। আসুক শালা এদিকে, ওর চামড়া তুলে যদি আমি গামছা না বানিয়েছি তো...।

- যাকগে, আমায় বলল এ চিঠিটা তোমায় দিতে। তাই তোমার কাছে এলাম কেষ্ট। 

- চিঠি? মাস্টার?

- এই সেই চিঠি।।


***

গুরু, 

আপনার স্যাঙাৎ শ্রীমান পটাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। বত্রিশ লাখ বাহাত্তর হাজার তিনশো উনিশ টাকা মুক্তিপণ না দিলে তার লাশ আপনার বাড়ির সদর দরজার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পুলিশে খবর দেবেন না, তাতে গোলমাল বাড়বে বই কমবে না।

মুক্তিপণের টাকাটা যেন অবিলম্বে মধুমাস্টারের হাতে নগদে তুলে দেওয়া হয়। আবারও বলছি, ওপরচালাকির ফল ভালো হবে না।

ইতি,

শ্রীপটা ওরফে নেকুচন্দর খাসনবীশ। 

পুনশ্চ ১ঃ 
তুমিই তো বলো গুরু; আমাদের ব্যবসা কালো কিন্তু হিসেবকিতেব পাকা। কিডন্যাপিং পকেটমারি গুণ্ডামির আয় ওই টাকা; আমাদের কালো ব্যবসার মূলধন। সৎকাজে ব্যয় করলে লোক হাসানো হবে যে। তার চেয়ে এই ভালো, উৎপাতের ধন চিতপাতে গেল। তাছাড়া তিনদিন আড়ালে থেকে ফলো করেছি মধুমাস্টারকে, লোকটা সত্যিই ভালো। ওর দলের লোকজনও মন্দ না। খেটে কাজ করে, লোকের উপকারই করে বেড়ায়। টাকাটা মুক্তিপণ হিসেবে দিলে বরং মধুমাস্টারের কাজেও লাগবে আবার তোমার গায়ে পুণ্যের কালোদাগ লাগবে না। 

পুনশ্চ ২ঃ

মধুমাস্টারের দলে লোক দরকার গুরু। কত কাজ। বিশেষ দরকার রাঁধুনির।  তোমার খিচুড়ি রান্নার হাতটা তোফা। আর নিজের মুখে আমার রান্না লাবড়ার গুণগান করতে বাঁধছে৷ কী বলো? 

হিমালয় তো সবার কপালে থাকে না, এদের সঙ্গেই ঝুলে পড়বে নাকি? 

Tuesday, April 28, 2020

নিতাইদার আত্মজীবনী



- নিতাইদা গো..। 

- সিগারেট চেয়ে লাভ নেই ভাইটি। বাক্স খালি। এই দ্যাখ।

- আহ, ধান্দা ছাড়া কি তোমায় মাইডিয়ার টোনে ডাকতে নেই গো? কত রেস্পেক্ট করি তোমায়।

- মদে রেস্পেক্ট-ভালোবাসার পরিমাণ সামান্য বাড়ে বটে।

- পেটে দু'পেগ রাম পড়েছে বলে বলছিনা নিতাইদা। এই যে ছ'সাত মাস অন্তর কলকাতা আর সংসার ছেড়ে তোমার এই মগরার ব্যাচেলর প্যাডে দু'রাত কাটিয়ে যাই, তার মূলে কিন্তু ওই; ডীপ অ্যান্ড সিনসিয়ার রেস্পেক্ট। আর অন টপ অফ দ্যাট..আ বুক ফুল অফ ভালোবাসা। 

- বুঝলি পলাশ, তোর মত ছেলেবেলার চ্যালাচামুণ্ডাদের আনাগোনা আছে বলেই...আমার এই একার গেরস্থালীও গুলজার রয়েছে।

- নিতাইদা, তুমি এই স্কুলমাস্টারি নিয়ে পাড়া ছাড়ার পর থেকে গোটা পাড়াটাই কেমন ম্যাদা মেরে গেল। দলের ছেলেপিলেরাও সবাই চাকরীবাকরি নিয়ে এমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল..।

- পাড়ার কথা আমারও খুব মনে পড়ে রে।

- তা'হলে আর আসো না কেন?

- বাপ-মা নেই। তোরা এখনও ভুলিসনি, এখানে মাঝেমধ্যেই ঘুরে যাস। আর ফিরব কী জন্য বল।

- তোমার মনে পড়ে নিতাইদা? তোমার ক্যাপ্টেনসি আর অফস্পিনে ভর দিয়ে আমরা টানা তিন বছর টুর্নামেন্ট জিতেছিলাম? 

- ওই সেই ভবতারণ সমাদ্দার স্মৃতি ট্রফি তো? ফাইনালিস্টদের পিকনিক করার জন্য টাকাও দেওয়া হত মাইরি। 

- হরেনদার দোকানে গেলেই এখনও ও তোমার কথা জিজ্ঞেস করে।

- ওর বানানো চা আর পোচের স্বাদ ভোলবার নয়।

- আর টুপাইদির সঙ্গে কম্পিটিশনে খাওয়া ফুচকা? তার স্বাদ? 

- টুপাই। টুপাই। 

- ব্যথা পেলে?

- ব্যথা যে'টুকু পেলাম তা ফুচকার কথা মনে করালি বলে রে। পাড়ার বিনোদদার ফুচকা খেয়েছি বলেই বলছি, বিনোদদার ট্রেনে কাটা পড়াটা ফুচকা-শিল্পের জন্য যে কী ভীষণ  ড্যামেজিং...ভাবলেই শিউরে উঠি। 

- তোমার পেটেও তো দু'পেগ পড়েছে দাদা৷ টুপাইদি সম্পর্কের ব্যথাটুকু একটু ঝেড়ে কাশো না।

- তোদের সবার কানটান মুলে ক্যালকুলাসে মোটের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছিলাম৷ শুধু টুপাইটার ফাউন্ডেশন এতটাই উইক ছিল...তেমন কিছু করা গেল না। আচ্ছা, ওর একটা মেয়ে হয়েছে না? আশা করি ওর মেয়ে অন্তত ওর ক্যালকুলাস-ইগনোরেন্সটা ইনহেরিট করবে না। 

- একটা কথা বলি গো নিতাইদা?

- পেটে কথা চেপে রাখলে ওল্ড মঙ্কের ইনসাল্ট রে পলাশ। চটপট বলে ফেল।

- তুমি এককালে তো লেখালিখি কম করতে নাম। কত পত্রপত্রিকায় সে'সব নিয়মিত ছাপাও হত। তা, নিজের বায়োগ্রাফি একটা লেখো না৷ তোমার লাইফে যে কী লেভেলের মশলা লুকিয়ে আছে তা তো আর আমার অজানা নয়। এক্কেবারে জম্পেশ হবে কিন্তু। 

- আমার জীবনী? 

- ইয়েস। তোমার জীবনী তো রীতিমত নভেল। লেখোই না। আমার ব্রাদার ইন ল'টি আজকাল পাবলিশার হিসেবে বইপাড়ায় কিঞ্চিৎ সুনাম অর্জন করেছে...তুমি যদি লেখ তা'হলে আমি বলে কয়ে...।

- সে কাজ অলরেডি করে রেখেছি।

- তোমার জীবনী? আইশ্লা...রেডি?

- টোটালি। তবে লিখেটিখে নয়। ফর্ম্যাটটা অন্য। 

- মাথায় রাম রাম ঝিমঝিম, হেঁয়ালি সইবে না নিতাইদা। কই তোমার বায়োগ্রাফি? দেখাও দেখি।

- একটা জবরদস্ত কোলাজ ফর্মে রয়েছে।

- কোলাজ?

- কোলাজ। ওই দ্যাখ।

- ও'টা...? ওই বেঢপ বুকশেল্ফগুলো? 

- ইয়েস। আমার বায়োগ্রাফিকাল কোলাজ।

- মাইরি নিতাইদা, আমি বেশি মাতলামি করছি না তুমি করছ, কে জানে।

- না রে পলাশ।  মাতলামি নয়। প্রতিদিনই এই বুকশেল্ফের দিকে আমি একটানা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। ওই যে, নীচের দিকে দেখ; রাদুগা প্রকাশনীর রাশিয়ান রূপকথার বই। আমার দাদু ছেলেবেলায় কিনে দিয়েছিলেন; তখনও আমি পড়তে শিখিনি, শুধু পাতা ওল্টাতাম আর ছবি দেখতাম হাঁ করে। উপেন্দ্রকিশোরের ছেলেদের মহাভারত দিদার দেওয়া, কী'ভাবে যে বইয়ের ভিতরে সতেরো নম্বর পাতায় দিদার রান্না করা হাতের হলুদের ছোপ লেগেছে জানিনা। খুব আবছা একটা দৃশ্য মনে পড়ে; দিদা রান্না করছে আর আমি একটা ছোট্ট কাঠের টুলের ওপর বসে ওই বই নাড়াচাড়া করতে করতে দিদাকে হাজার রকমের প্রশ্ন করছি৷ আর ওই বইটা দ্যাখ, ওই যে নীল বাঁধাইয়ের। ওটা অস্কার ওয়াইল্ডের সেল্ফিশ জায়ান্ট আর অন্যান্য নির্বাচিত গল্প। ক্লাস সেভেনের অঙ্ক পরীক্ষায় হাইয়েস্ট নম্বর পাওয়ার জন্য প্রাইজ। ওই বই ছুঁয়ে আমি টের পেয়েছিলাম আমি অঙ্ক ভালোবাসি। প্রসেসটা বোঝানোর ভাষা আমার নেই, তবে ভালোবাসা যেমনটা হওয়া উচিৎ আর কী; ভালোবাসি, ব্যাস৷ সেই প্রাইজ পাওয়ার দুপুরটা আমার আজও মনে আছে; অঙ্কের মাস্টার মধুময় স্যার স্টেজে সেদিন সে বই হাতে তুলে দিয়েছিলেন আবার স্টেজে দাঁড়িয়েই কানও মলেছিলেন পরীক্ষায় একটা কেয়ারলেস ভুলের কথা মনে করিয়ে। এ'বার এই শরদিন্দুর ঐতিহাসিক কাহিনীর বইটা দ্যাখ, ওই যে, ওপরের তাকের ডান কোণে। বাবা আমার মধ্যে ইতিহাসের প্রতি সমীহ ইঞ্জেক্ট করেছিল ওই বই থেকে পড়ে শুনিয়ে। শরদিন্দুর গল্পের ঘাড়ে বাবা চাপিয়ে দিতেন নিজের কিছু ফ্যাকচুয়াল ফুটনোট। বাবার কণ্ঠস্বর কানের মধ্যে গমগম করে ওঠে জানিস; ওই বইটার দিকে তাকালেই। মা আর আমি প্রায় একসঙ্গে পড়েছিলাম লোটাকম্বল; তখন আমি ক্লাস নাইনে বোধ হয়। এই বই পড়ার ব্যাপারে আমাদের বাড়িতে অদ্ভুত সাম্যবাদ ছিল। আমি কোনওদিন শুনিনি, ছোট বলে অমুক বই পড়তে পারব না। ওই দেখ, মাঝের তাকে ওই ছেঁড়া মলাটের লোটাকম্বলটা রাখা আছে। মা যেদিন মারা গেল, শ্মশান থেকে ফিরে গোটা রাত আমি শুধু সঞ্জীব পড়েছিলাম জানিস। সে সব কটা বইই মজুদ আছে, সে রাত্রের কান্না আর গন্ধ সমস্ত ওই বইগুলোয় জড়িয়ে। আর ওই যে শিব্রাম সমগ্রটা...দেখেছিস? হ্যাঁ ও'টা। ওইটে ছিল আমার প্রথম প্রেমের এনভেলপ।

- কী? কীসের এনভেলপ?

- টুপাই ওই বইটা ধার নিয়েছিল পড়বে বলে। ফেরত পাওয়ার পর দেখি পাতার ফাঁকে একটা দু'পাতার চিঠি। টুপাইয়ের ক্যালকুলাস নড়বড়ে হতে পারে, কিন্তু ওর হাতের লেখা সত্যিই মুক্তোর মত। আর আমার সব মিলে একশো তেরোটা চিঠি লিখেছিল; কোনওদিনও একটাও বানান ভুল করেনি। যাকগে। ওই যে পুরনো পুজোসংখ্যাগুলো দেখছিস; আমি প্রতিটি বইয়ের প্রতিটি উপন্যাস কোন দিন কাদের পাশে বসে শেষ করেছি, সবটুকু গড়গড় করে বলে যেতে পারব। আর এই যে, দ্বিতীয় তাকে জ্বলজ্বল করছে দ্যাখ।  আমার পাড়া ছাড়ার ফেয়ারওয়েলে তোরা...অর্থাৎ মাই ডিয়ারেস্ট চ্যালাচামুণ্ডাসরা এই আধবুড়োকে হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল আর নন্টে-ফন্টে সমগ্র উপহার দিয়েছিলিস। ওল্ডমঙ্কের বোতল আমার একা খুলতে ইচ্ছে করে না, তাই একা থাকলে নারায়ণ দেবনাথই আমার জন্যআইডিয়াল ফর্ম অফ স্কচ। কারণ ওই কমিক্সের বইগুলোর প্রতিটি পাতায় রয়েছে ভবতারণ সমাদ্দার স্মৃতি ট্রফি জেতানো উত্তেজনা। 

- হেহ্। বুঝলাম।

- দ্যাখ পলাশ। মোদ্দা কথা হল, আমার এই বাড়ির খানতিনেক বইয়ের শেল্ফ জুড়ে যে শ'চারেক বই রয়েছে; সেগুলোর আত্মাকে আমি লেখক ও প্রকাশকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের পোষ্য করে রেখেছি। ওগুলো এখন শুধুই আমার হয়ে,আমার জন্য আমার গল্প বলে। সে গল্পগুলো মিলিয়ে মিশিয়ে একটা চমৎকার বায়োগ্রাফি তৈরি হয়। অ্যাকশন, থ্রিল, রোম্যান্স, ট্র‍্যাজেডি, ইমোশনাল ওভারডোজ; কী নেই সে'খানে। যাকে বলে;  রীতিমতো সিনেম্যাটিক। রোজ আমি এই বইগুলোর সামনে এসে দাঁড়াই আর নিজের জীবনের এক একটা চ্যাপ্টার সিনেমার মত চোখের সামনে ভেসে ওঠে।  আলাদা করে লেখালিখি করে, প্রকাশক ধরে, পাঠক পাকড়াও করে এ ম্যাজিক নষ্ট করার মানে হয়? তুইই বল?

ট্র‍্যায়ো

কে যেন বললে যে প্রতিদিন সকালে খালিপেটে একটানা দশ মিনিট কমল মিত্রর ডায়লগ শুনলে নাকি "ইমিউনিটি বাড়ে"।

***
"সামনের ছুটিতে পাহাড়ে যাব" ইস কুল।

অবশ্যই। নিঃসন্দেহে। 

তবে।
তবে। 

"একটা গোটা দিন পাহাড়ি সান্যালের পান্তুয়া মেজাজের অভিনয় দেখে কাটিয়ে দেব" ইস কুলার৷

***
গলায় তরোয়ালের কোপ পড়লে ছবি।

ও'দিকে আল্ট্রা-ধারালো সারকাজমের কোপ পড়লে ছবি বিশ্বাস।



বৃষ্টি ও মাদুর


হুড়মুড় করে ঘরের উত্তর দিকের জানালাটা বন্ধ করার আগেই বিছানার অর্ধেকটা ভিজে গেল বৃষ্টির ঝাপটায়। কয়েক সেকেন্ডের বৃষ্টিতেই বালিশ তোষক সব সপসপে।

একরাশ বিরক্তি চেপে ধরেছিল অমিয়কে। একে অফিসের কাজের চাপে জেরবার অবস্থা, তারপর রোজ ফেরার পথে অটোর লাইনে হয়রানি, বাসের ভিড়ে ধ্বস্তাধস্তি আর বাড়ি ফিরে হাত পুড়িয়ে ভাতেভাত রান্না করা। শরীরে এতটাই ক্লান্তি নিয়মিত জমা হয় যে রাত্রে খাওয়া সেরে ফেলার পর টেলিভিশন বা গল্পের বইতে মন বসানোও দায় হয়ে পড়ে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতে পারলেই যেন শান্তি। অথচ কয়েক মুহূর্তের অবহেলায় বিছানাটাই ভিজেটিজে মাটি হল। ধুত্তোর।  এই এক কামরার ঘর, ওই খাট আর মায়ের রেখে যাওয়া আলমারিটা বাদে আসবাব বলতে আর কিস্যুই নেই; সামান্য সোফাও নেই যে সে'খানে লম্বা হয়ে অমিয় রাতটা কাটিয়ে দেবে।

ক্লান্তি, ঘুম আর জিভে লেগে থাকা নিজের হাতে পোড়ানো ভাতের স্বাদ; সব মিলে অমিয়র যে কী বিশ্রী লাগছিল। কোনও রকমে মেঝেতে একটা চাদর পেতে শুয়ে পড়লে সে। 

নাইট ল্যাম্পের আবছা আলোয় দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ছবিটার দিকে চোখ যেতেই বুকের ভিতর কেমন একটা চিনচিনে ভাব দলা পাকিয়ে উঠল অমিয়র। যদ্দিন মা ছিল, তদ্দিন এ সংসারে কেমন যেন সংসারের সুবাস লেগেছিল। মাসকাবারি ছিল, আলমারিতে ন্যাপথালিনের গন্ধ ছিল, এক চিলতে রান্নাঘরটায় পরিপাটি শান্তি ছিল। মায়ের ছবিটা থেকে চোখ সরিয়ে পাশ ফিরে শুলো অমিয়।

মেঝেয় পাতলা চাদর পেতে শোওয়া, কেমন যেন একটা কনকনে ছ্যাঁত অমিয়র গা বেয়ে উঠে আসছিল। সে দিব্যি বুঝছিল আজ রাত্রে আর কপালে ঘুম নেই। এমন সময় মোবাইলটা উঠল বেজে।

- হ্যালো।

- আমি।

-  মিনু, এত রাত্রে? কী ব্যাপার..।

- না মানে, তেমন কিছু না। 

- সব ঠিক আছে তো? তোর বর মেয়ে?

- আমার জন্য অত চিন্তা থাকলে নিজে ফোন করে আমার খবর নিতিস অমু।

- তাই বলে এই রাতবিরেতে...।

- জানি। কল করা উচিৎ নয়। শুধু ওই..।

- শুধু কী?

- আমাদের বিয়ে যে হয়নি তার দায় কিন্তু একা আমার নয় অমু।

- এদ্দিন পর সে'টা বলতে...এত রাত্রে..।

- এদ্দিন পর মাঝেরাতে ফোন করে সে'সব বাজে কথা বলতে আমারও ভারী বয়ে গেছে। তাছাড়া আমি বেঁচেছি তোর পাল্লায় না পড়ে। কিন্তু তুই পারলি কী করে রে মাসীমার মারা যাওয়ার খবরটা আমায় না দিতে? নেহাত গত মাসে পুলুদি ফোন করে জানালো...।

- আসলে আমি ভাবলাম..।

- তুই ভাবলি মিনু কোথাকার কে যে তাকে জানাতে হবে। যাক গে, বেশ করেছিস।  আর তুইই বা আমার কোথাকার কে রে অমু? কেউ না। এই ছেলেবেলা থেকে তোকে চেনাটাই হয়েছে দোষ। 

- কী যে তখন থেকে বলে চলেছিস..।

- শোন। গুগলে দেখলাম তোদের পাড়ায় প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমেছে। জানালা খুলে হাওয়া খাওয়ার শখ নিশ্চয়ই এখনও যায়নি? আর সময়মত জানালার পাল্লা বন্ধ করার বুদ্ধিটুকুও নিশ্চয়ই তোর নেই৷ বুদ্ধি থাকলে কি আর তুই মেজকাকার দেওয়া অত ভালো চাকরীটা রিফউজ করতিস? যাক গে। আমার আর কী৷  তোর বিছানাপত্তরের ভিজেটিজে একাকার অবস্থা নিশ্চয়ই। এখন রাত কাটা ওই ড্যাম্প ধরা বাড়ির মেঝেয় শুয়ে। 

- না মানে...ইয়ে...।

- অবশ্য তুই লাটসাহেব তো। কতটুকুই বা নিজের বাড়ির আর মায়ের খবর রাখতিস। তোর মা যে আলমারির পিছনে মোটা মাদুরটা গুটিয়ে রাখতেন, সে খবর তো রাখিস না৷ সে খবর রাখলে তোকে মেঝেয় শুয়ে রাতভর ছটফট করতে হত না। দিব্যি মাদুরের ওপর শুয়ে আরামসে ঘুম দিতে পারতিস। সে'টুকু বলতেই এত রাত্রে...।

- তোর এই জ্যাঠামোগুলো এ'বার ছাড় মিনু। আমার মায়ের মাদুরের কথা আমার মনে থাকবে না, থাকবে তোর? নিজেকে ভেবেছিস কী তুই?

- না আসলে..।

- আমি জানিনা সে মাদুর কোথায় রাখা আছে? তুই ভাবিস কী আমায়? অফিসে দশটা লোক চরিয়ে খেতে হয় রে আমায়, নেহাত গবেট নই।

- শোন অমু...আমি কিন্তু..।

- শোন। এমন দুমদাম অসময়ে আর ফোন করিস না। জেনে রাখ; আজ মোটেও জানালা বন্ধ করতে আমার দেরী হয়নি।  দিব্যি বিছানায় পাশবালিশ জড়িয়ে বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে শুনতে নাক ডাকছিলাম...মাঝখান থেকে তোর ফোন এসেই ঘুমে বিশ্রী ব্যাঘাত ঘটল..।

- সরি। রাখি।

- রাখ।

ফোন কেটে অমিয় সোজা চলে গেল আলমারিটার কাছে৷ 

কী আশ্চর্য,  সত্যিই আলমারির পিছনে যত্ন করে গুটিয়ে রাখা মায়ের সেই মাদুরটা। মেঝেয় মাদুর পেতে গা এলিয়ে দিতেই দু'চোখ ভেঙে ঘুম নেমে এল; আহ্, মায়ের গন্ধ।